Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৯.১


শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৯.১

সাদিয়াসুলতানামনি

পূর্ণতা কিছু সময় বেকুবের মতো তাকিয়ে থাকে জাওয়াদের দিকে। হুট করে এত র”ক্ত দেখায় তার মস্তিষ্ক বিষয়টা সহজভাবে নিতে না পেরে ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গিয়েছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে তার কি করা উচিত বা প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত সেটা সে বুঝে উঠতে পারছে না। কিন্তু জাওয়াদ যখন ব্যথায় ককিয়ে উঠে তখনই তার সম্বিত ফিরে।

সে জাওয়াদের কাছে এগিয়ে যায় অস্থির ভঙ্গিমায়। তার পিঠের ক্ষত জায়গায় হাত দিলে বুঝতে পারে জায়গাটা একটা বেশ মোটাসোটা গোলাকৃতির ক্ষ”ত হয়েছে এবং সেই ক্ষ”তই এই র”ক্ত নির্গমনের পথ হয়েছে।

ব্য”থায় ও র”ক্তক্ষ”রণের কারণে জাওয়াদের চেতনা হারিয়ে ফেলার জোগাড় হয়। জাওয়াদকে ক্রমেই নুইয়ে যেতে দেখে পূর্ণতা পূর্বের থেকেও বেশি বিচলিত ও অস্থিরতা নিয়ে বলল–

—”অ্যাঁই, চোখ বন্ধ করবেন না। তাকিয়ে থাকুন, তাকান…. আমার দিকে তাকান দেখি…. ড্রাইভার হসপিটালে চলুন দ্রুত…..কোন সিগন্যালের তোয়াক্কা করবেন না…. এজ সুন এজ পসিবল হসপিটালে পৌঁছান যেভাবেই হোক….”

ড্রাইভার নির্দেশনা পাওয়া মাত্রই সর্বচ্চ স্পিড তুলে গাড়ি চালাতে শুরু করে। জাওয়াদ লম্বা একটা শ্বাস টেনে নিয়ে ভেঙে ভেঙে বলে–

—”আমায় নিতে তো..মার এ.ই বিচলতা, অস্থিরতা, চিন্তা আ..আমাকে এ…ত কেন শান্তি দিচ্ছে পূর্ণ? কতোওওওগুলো দিন পর তো…মার চোখে আমার জন্য চিন্তা দেখলাম। ছটফটানি দেখলাম। এখন তো মনে হচ্ছে, আমি সারাজীবন এমন আ”হত, র”ক্তা”ক্ত হয়ে থাকি৷ আর তুমি আমার চিন্তায় মগ্ন থাকো। শুধু আমাকে নিয়েই ভাবো, যেমনটা ভাবতে পাঁচ বছর আগে।”

কথাগুলো বলতে বলতে জাওয়াদ নিজের শরীরের সম্পূর্ণ ভাড় ছেড়ে দেয় পূর্ণতার উপর। পূর্ণতা তাঁকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে দুই হাত দিয়ে। জাওয়াদ তার বুকে মাথা রেখে চোখগুলো অর্ধ বুজিয়ে রেখে টেনে টেনে নিঃশ্বাস নিতে থাকে, কিছুটা হাঁপানি রোগীদের মতো। পূর্ণতা জাওয়াদকে এমনভাবে নিঃশ্বাস নিতে দেখে বেশ ভ”য় পেয়ে যায়। সে একহাত দিয়ে জাওয়াদের গালে আলতো করে চাপড় দিতে দিতে বলে–

—”অ্যাঁই, চোখ বন্ধ করবেন না প্লিজ। আরেকটু… আরেকটু চেষ্টা করুন… আমরা এসে পড়েছি হসপিটালে।”

জাওয়াদ টেনে টেনে বলে–

—”পা…রছি না তোওওওও চোখ খুলে রাখতে। ভীষণ ক”ষ্ট হচ্ছে শ্বাস নিতেএএ, বু….বুকেওওও ব্যএএথা করছে ভীষওওণ।”

পূর্ণতা জাওয়াদের বুকের বাম পাশে হাত দিয়ে ডলে দিতে থাকে। জাওয়াদের এমন কষ্ট দেখে পূর্ণতা চোখ বেয়ে আপনাআপনিই পানি টপটপ করে পড়ছে। শত অভিমান, রাগ থাকুক না কেন মানুষটার প্রতি, কিন্তু তার হৃদয়ে এখনও যে জাওয়াদেরই বসবাস তা পূর্ণতা কস্মিনকালেও অস্বীকার করতে পারবে না। সে বিভিন্ন কথা বলে জাওয়াদকে জাগিয়ে রাখার প্রচেষ্টা করে–

—”প্লিজ… প্লিজ চোখ বন্ধ করবেন না। আপনি এবার আমার কথা না শুনলে কিন্তু আমি তাজকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো। আর ধরা দিবো না। আমার কথা না ভাবুন, আমাদের ছেলের কথাটা অন্তত ভাবুন। আপনার মা…তার কথা ভাবুন। ওরা কি করে থাকবে আপনাকে ছাড়া?”

—”ও…রা আমায় ছাড়া থাকতে পারবে না, কিন্তু তুমি ঠিকই পারবে। আর তুমি পারলে ও…রাও একদিন শিখে যাবে আমায় ছাড়া থাকতে। তা…জের আর কতই বা বয়স। আ.মার কিছু হয়ে গেলে কয়েকদিন কাঁ..দবে তারপর সময়ের স্রো..তে একসময় ঠিকই ভুলে যাবে। আর আমার কিছু হয়ে গেলে নতুন কারো সাথে জীবন শুরু করো।”

জাওয়াদের কথা শুনে পূর্ণতার প্রচন্ড রাগ হয়, সেই রাগ চেপে রাখতে না পেরে সে কাঁদতে কাঁদতে ক্রোধান্বিত গলায় বলে–

—”আপনার কিছু হয়ে গেলে আমি নতুন জীবন শুরু করবো কেনো? আপনার সামনেই করবো। এই যে আপনাকে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি, ওখানে গিয়ে সুস্থ করিয়ে তারপর আপনার সামনেই আমি নতুন জীবন শুরু করবো। অসভ্য, ইতর লোক! আপনি কোনদিন আমার ভালোবাসাকে দুই টাকার দাম তো দূরের কথা, আমাকেই মানুষ হিসেবে দাম দেন নি।

আমার নতুন জীবন শুরু করার ইচ্ছে থাকলে এই পাঁচটা বছর আপনার সন্তানকে ঠিকই আরেক পুরুষকে বাবা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে পারতাম। আরেক পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করা আমি পূর্ণতার জন্য শুধু সময়ের খেলা ছিল। সেখানে চাইলেও আপনি হস্তক্ষেপ করতে পারতেন না। কিন্তু আমি করিনি। কেন করিনি সেটা আপনি কখনোই বুঝতে পারবেন না। কখনোই না। আপনি শুধু বুঝেন কি করে আমাকে কষ্ট দেওয়া যায় কথার মাধ্যমে।

কিন্তু আজ আমি আপনাকে একটা কথা বলে রাখছি, আমি আবারও বিয়ে করবো। আপনার আমার উভয়ের পরিবারকে স্বাক্ষী রেখে। আপনি শুধু হা হয়ে দেখে যাবেন। আপনি কিছু বুঝে উঠার আগেই আমি অন্যকারো হয়ে যাবো।”

পূর্ণতার কথা শুনে জাওয়াদ এত ব্যথার মাঝেও ঠোঁট এলিয়ে হেঁসে ওঠে। নিজের মাথাটা আরেকটু ভালো করে ঠেসে দিয়ে ভাঙা গলায় বলে–

—”তোমাকে অন্য কারো হতে দেখার চেয়ে আমি মৃ..ত্যুকে আ.লিঙ্গন করা বেশি পছন্দ করবো।”

পূর্ণতা দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল–

—”আমার বুকেই আছেন তাও সংকটাপন্ন অবস্থায়। গলাটা একটু জোরে টিপে দিলেই আপনার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। আজাইরা কথা না বলে কাজের কথা বলুন। মেজাজ এরচেয়ে বেশি খারাপ করলে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে বের করে দিবো।”

জাওয়াদের ক্রমেই নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ফেলছে। চোখজোড়াও বহু কষ্টে খুলে রেখেছে যা পূর্ণতা অনুধাবন করতে পারছে। তাই তো এই কঠিন সময়েও এসব অপ্রয়োজনীয় কথা বলে জাওয়াদকে জাগিয়ে রাখছে।

—”এ…ই স..ময়ে কি কাজের কথা বলবো? এরচেয়ে ভা…লো হয় তো.মার বুকে একটু শান্তিতে ঘুমাতে দাও। চিরনিদ্রায় যাওয়ার আগে একটা গভীর আলি..ঙ্গন অনুভব করতে চাই তোমার থেকে।”

পূর্ণতার বুক চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে কান্না পাচ্ছে। জাওয়াদের এসব কথা তার একটুও ভালো লাগছে না। সে শক্ত থাকতে চাইছে কিন্তু জাওয়াদের এসব কথা ক্রমেই পূর্ণতা দূর্বল হয়ে পড়ছে।

পূর্ণতা জাওয়াদকে নিজের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে তখনই ড্রাইভার গাড়ি ব্রেক করে। পেছনের দিকে না ফিরেই বলে–

—”ম্যাম এসে পড়েছি হসপিটাল।”

পূর্ণতা জাওয়াদের থেকে চোখ সরিয়ে বাহিরে তাকিয়ে দেখে সত্যিই তারা হসপিটালে এসে পড়েছে। পূর্ণতা ড্রাইভারের সহায়তা নিয়ে জাওয়াদকে গাড়ি থেকে বের করে। তারপর তারা দু’জন ধরে ধরে জাওয়াদকে হসপিটালের ভেতরে নিয়ে যায়। হসপিটালে প্রবেশের পর দুইজন নার্স আহত জাওয়াদকে দেখে একটা স্ট্রেচার এগিয়ে নিয়ে আসলে পূর্ণতা তাঁকে ধরে সেটায় শুয়ে দেয়।

জাওয়াদের তখন চেতনা নেই বললেই চলে। একজন নার্স গিয়ে কর্তব্যরত ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে আসলে, ডাক্তার জাওয়াদকে প্রাথমিক পরীক্ষা করার পর তার ক্ষত দেখে নার্সদের নির্দেশনা দেয় জাওয়াদকে ওটিতে নিতে।

নার্সরা যখন জাওয়াদকে বহনকারী স্ট্রেচারটি নিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখন জাওয়াদের হাতে মুঠোয় থাকা পূর্ণতার হাতটিও ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যেতে থাকে। জাওয়াদ অচেতন অবস্থাতেও পূর্ণতার হাতটি শক্ত করে ধরে রেখেছিল। তাদের দু’জনের হাত দু’টো পুরোপুরি আলাদা হয়ে যাওয়ার ক্ষণে পূর্ণতা জাওয়াদকে উদ্দেশ্য করে কিছুটা উঁচু গলায় বলে–

—”আমার থেকে একটা শক্ত আলিঙ্গন পেতে হলেও আপনাকে ফিরতে হবে জাওয়াদ সাহেব। আমি আর তাজওয়াদ আপনার অপেক্ষায় থাকব।”

পূর্ণতার কথা জাওয়াদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করলো কি? পূর্ণতার এমন একটি প্রতিশ্রুতির সত্যতা পরখ করতে কি জাওয়াদ ফিরে আসবে? নাকি সত্যি সত্যিই ফাঁকি দিবে পূর্ণতাকে?

জাওয়াদকে নিয়ে যেতেই ডাক্তার পূর্ণতাকে বলে–

—”দেখুন এটা একটা এটেম টু মা”র্ডার কেস। পুলিশি ব্যাপার-স্যাপার। এক্ষেত্রে আগে পুলিশকে জানিয়ে রিপোর্ট করতে হবে আপনাকে। তারপর চিকিৎসা শুরু করতে পারব আমরা। “

ডাক্তারের কথা শুনে পূর্ণতা যেন ক্রোধে উন্মাদ হয়ে যায়। মানে কি ভাই? এখন সে পুলিশকে রিপোর্ট করতে করতে যদি জাওয়াদের কিছু হয়ে যায়? তাহলে এর দায়ভার কে নিবে? নিবে ডাক্তাররা এর দায়ভার?

—”আপনারা ট্রিটমেন্ট শুরু করেন আমি রিপোর্ট দাখিল করে আসছি। একটা রিপোর্টের জন্য আপনারা এমন একজন সিরিয়াস পেশেন্টকে এভাবে চিকিৎসা না দিয়ে ফেলে রাখতে পারেন না। উনার যদি ভালো মন্দ কিছু একটা হয়ে যায় তাহলে এর দায়ভার আপনারা নিবেন?”

শেষের কথার টোনে ডাক্তারটি বুঝতে পারে পূর্ণতা ঠিক কতটা রেগে আছে। কিন্তু নিয়মের কাছে তার হাত-পাও বাঁধা। সে পূর্ণতাকে বুঝ দেওয়ার ভঙ্গিমায় বলল–

—”দেখুন…আপনার টেনশন আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু নিয়মের কাছে আমরাও অসহায়। “

পূর্ণতা এবার করিডর কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলে–

—”গো টু হেল ইউথ ইউর ফা*কিং রুলস। লেট মি ক্লিয়ার ওয়ান থিং ডা. আমার হাসবেন্ডের যদি কিছু হয় না তাহলে আমি আনাবিয়া আহমেদ পূর্ণতা এই হসপিটালের নাম-নিশানা ধূলোয় মিশিয়ে নিঃশচিহ্ন তো করবোই, সেই সাথে আপনি কি করে ডাক্তারি করেন সেটাও আমি দেখবো।

নিয়ম বানানো হয় মানুষের সুবিধার জন্য। তার জীবন নেওয়ার জন্য নিয়ম বানানো হয় না। একজন পেশেন্ট মুমূর্ষু অবস্থায় কাতরাচ্ছে আর আপনারা আমায় নিয়ম শেখাচ্ছেন? আপনাদের মধ্যে আদোও মানবিকতা বেঁচে রয়েছে?”

পূর্ণতার নাম শুনে ডাক্তার কিছুটা ভয় পেয়ে যায়। একসময়কার ঢাকার খ্যাতিমান বিজনেসম্যানের একমাত্র মেয়ে ও ইয়াং বিজনেস ওমেন হিসেবে পূর্ণতার কম খ্যাতি ছিলো না। পূর্ণতার চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যেই একজন নার্স ওটি থেকে দৌড়ে বের হয়ে এসে ডাক্তারকে বলে–

—”স্যার, পেশেন্টের অবস্থা ভালো নয়। হার্টবিট কমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, পালস রেটও খুবই কম। আপনি তাড়াতাড়ি চলুন।”

নার্সের কথা শুনে পূর্ণতার পুরো পৃথিবী দুলে উঠে। ডাক্তার নার্সটির সাথে চলে যায় তড়িঘড়ি করে ওটিতে। পূর্ণতা শূন্য দৃষ্টি নিয়ে ওটির বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে।


—”কিহ্হ্হ্হ্হ্??? গু”লিটা পূর্ণতার গায়ে না লেগে জাওয়াদের গায়ে লেগেছে? কু*ত্তার বাচ্চা তোকে এতগুলো টাকা দিলাম কি এই অকাজটা করতে?”

রায়হানা বেগম চিল্লিয়ে বলার কারণে আঞ্জুমানও তার কথাগুলো শুনতে পেয়ে যান। সে মাত্র তার মায়ের রুমে ঢুকতে যাচ্ছি কিন্তু দরজার সামনে এসে দাড়ানোর পরপরই উনার কথাগুলো শুনতে পায়। গত সপ্তাহই তাঁকে গ্রামে নিয়ে এসেছে রায়হানা।

জাওয়াদের গায়ে গুলি লেগেছে শুনে আঞ্জুমানের মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। সে হনহনিয়ে তার মায়ের রুমে ঢুকে অস্থির ভঙ্গিমায় বলে–

—”আম্মু, কি বললে তুমি? জাওয়াদ ভাইয়ের গায়ে গু”লি লেগেছে? কিন্তু কিভাবে? এখন কেমন আছে সে? বলো আম্মু, চুপ করে থেকো না। বলোওওওওও….”

এই অসময়ে মেয়েকে নিজের ঘরে আসতে দেখে রায় হানা যতটা না অবাক হয়, তার চেয়ে বেশি ঘাবড়ে গিয়েছে আঞ্জুমান জাওয়াদের সত্যিটা জেনে ফলায়। সে কলটা সাথে সাথে কেটে দিয়ে আমতাআমতা করে বলতে শুরু করে–

—”মা রে! তোর এই অবস্থা যে করেছে তাকে আমি কি করে ছেড়ে দিতাম বল মা? এজন্য আমি গত কয়েকদিন আমার লোকদের লাগিয়ে পূর্ণতার খবর জোগাড় করেছি। যার জন্য আমার ফুলের মতো মেয়ের সুন্দর মুখখানা নষ্ট হয়ে গিয়েছে, একটা হাত অকেজো হয়ে গিয়েছে তাকে কি করে শান্তিতে থাকতে দেই বল?

এজন্য আমি আমার লোকদের মাধ্যমে আজকে পূর্ণতাকে শেষ করে দেওয়ার নির্দেশ দেই। কিন্তু ঘটনাক্রমে গু”লিটা পূর্ণতার গায়ে না লেগে জাওয়াদের গায়ে লেগে যায়।”

মায়ের থেকে এসব কথা শুনে আঞ্জুমান পাগলের মতো করতে থাকে। তার জাওয়াদ ভাই আহত হয়েছে এটা সে কিছুতেই মানতে পারছে না।

—”আম্মু, এটা তুমি কি করলে আম্মু? জাওয়াদ ভাইয়ের কিছু হলে আমি বাঁচতে পারব না আম্মু। “

আঞ্জুমান আহাজারি করতে করতে কথাগুলো বলতে থাকে। রায়হানা বেগম মেয়ের এমন আহাজারি দেখে বেশ অবাকই হন। সে আঞ্জুমানের থেকে জাওয়াদ সম্পর্কে বেশ কিছু কথা জানতে পেরেছে। এটাও জেনেছে যে, জাওয়াদ তার বউকে পাগলের মতো ভালোবাসে। তাহলে সেই ছেলের জন্য এমন আহাজারি, এমন পাগলামি করার মানে কি?

রায়হানা বেগম আঞ্জুমানকে ধরে নিজের রুমের বেডে বসিয়ে দেয়। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে–

—”মা রে! আমার তো এমন কোন উদ্দেশ্য ছিল না। আমি তো ছেলে গুলোকে পাঠিয়েছিলাম ঐ পূর্ণতা ডাইনিকে শেষ করতে। কিন্তু এমন দূর্ঘটনা ঘটে যাবে সেটা তো আমি আর বুঝতে পারিনি।

আর তাছাড়া, তুই ঐ বিবাহিত ছেলের জন্য এমন হাহুতাশ করছিস কেন? তুইই তো আমায় সেদিন বললি, ও নাকি ওর বউকে পাগলের মতো ভালোবাসে। তাহলে ওর বাঁচা-ম’রায় তোর কি আসে যায়?”

আঞ্জুমান ক্রোধান্বিত গলায় বলল–

—”আসে যায় মা। আমি আজও জাওয়াদ ভাইকে ভালোবাসি। আমি আরিয়ানকে বিয়েই করেছিলাম, আরিয়ানের মাধ্যমে কোন একভাবে পূর্ণতা পর্যন্ত পৌছে ওকে শেষ করবো। তারপর আরিয়ানকে ডিভোর্স দিয়ে জাওয়াদ ভাইকে ফাসিয়ে বিয়ে করবো।

পূর্ণতা মা-রা গিয়েছে শুনে জাওয়াদ ভাই এক না একসময় আমাকে ঠিকই মেনে নিতে বাধ্য হতো। সেই জাওয়াদ ভাই তোমার কারণে এভাবে আহত হলো মা। আমি এটা কিছুতেই মানতে পারছি না।”

কি ক্রিমি”লান মাইন্ড মা-মেয়ের। রায়হানা বেগম মেয়ের এমন কথা শুনে আবারও অবাক হন। সে বেশ কিছুক্ষণ লাগিয়ে মেয়েকে শান্ত করেন। কারণ আঞ্জুমান এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। ডাক্তার তাকে স্ট্রেস নিতে বারণ করেছেন।

রায়হানা বেগম মেয়েকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলেন–

—”আর কাঁদিস না মা আমার। আচ্ছা শুন, তোর মনের ইচ্ছে এখনও পূরণ হতে পারবে। আমি পূরণ করবো তোর ইচ্ছে। জীবনে তোর জন্য কিছুই করতে পারিনি মা হিসেবে, কিন্তু এবার তোকে সুখী করার জন্য যা যা করতে হবে আমি তাই করব। “

আঞ্জুমান অশ্রু ছলছল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। রায়হানা বেগমের দৃষ্টি বলে দিচ্ছে তার মস্তিষ্কে পূর্বের থেকেও ভয়ংকর কোন প্ল্যান ঘুরপাক খাচ্ছে।


—”মাম্মা, আজ পাপাল সাতে একতুও কথা হয়নি আল দেখাও হয়নি।”

মন খারাপ করে কথাটি বলে তাজওয়াদ তার মা’কে। এদিকে ছেলের কথা শুনে পূর্ণতার বাঁধন ভাঙা কান্না বের হয়ে আসতে চায় গলা দিয়ে। সে বহু কষ্টে নিজের কান্নাকে চেপে রেখে বলে–

—”তোমার পাপা একটা কাজে আউট অফ সিটি গিয়েছে সোনা। সেখানে নেটওয়ার্ক নেই। আমায় বলে গিয়েছে, তাই তুমি মন খারাপ করো না, ঠিক আছে?”

পাপা শহরের বাহিরে গিয়েছে অথচ তাজওয়াদের সাথে একবার দেখাও করলো না। আর নাই বা তাকে একটু আদর করে গিয়েছে। এই কথাগুলো মনে করে তাজওয়াদের আরো মন খারাপ হয়ে যায়। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে–

—”পাপা আমাকে একতু আদলও দিয়ে গেলো না। আমি পাপা আসলে একতুও কথা বলবো না, লাগ কলে থাকব।”

—”কাজটা হুট করেই চলে এসেছে। নাহলে তাজওয়াদ তো জানেই, তার পাপা তাকে কতটা ভালোবাসে। জানে না সে?”

—”হুম, জানে।”

—”ইমার্জেন্সি এসে গিয়েছে বলেই তো না বলে গিয়েছে। এর জন্য রাগ করে কথা না বলাটা কি ঠিক হবে?”

তাজওয়াদ একটু ভেবে বলে–

— “না, ঠিক হবে না। আমি পাপাল সাতে লাগ কলে থাকব না।”

—”এই তো আমার গুড বয়। এখন তুমি আরেকটু গুড বয়ের পরিচয় দিয়ে এঞ্জেল আন্টির হাতে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো তো। মাম্মা অনেক বিজি আজ বাচ্চা। “

—”আচ্ছা মাম্মা। তুমি তালাতালি আসবে আর আমাল জন্য চকলেট আনবে।”

—”ওকে সোনা। রাখি তাহলে এখন মাম্মা? “

—”ওকে মাম্মা। বায় বায়।”

—”বায় বায় সোনা।”

ছেলের সাথে কথা বলে কল কাটে পূর্ণতা। আজ সে তাজওয়াদকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে পারেনি দেখে বাচ্চাটা রাগ করে দুপুরে এসে কিছু খায়নি। এজন্য আরওয়া পূর্ণতাকে ফোন দিয়ে বিষয়টা জানালে পূর্ণতা কৌশলে তার রাগ ভাঙায়।

পূর্ণতা ফোনটা নিজের প্যান্টের পকেটে রেখে ওটির দিকে তাকালে দেখতে পায়, ডাক্তার আফসার বের হচ্ছে ওটি থেকে। সে সহ জিনিয়া, মি.শেখ, টনি সবাই এগিয়ে যায় ডাক্তারের কাছে। মি.শেখ ছেলের কথা জিজ্ঞেস করতেই, ডা.আফসার বললেন–

—”গু”লিটা আলহামদুলিল্লাহ বের করতে সফল হয়েছি। কিন্তু পেশেন্ট এখনও ডেঞ্জার জোনে রয়েছে। কারণ, বু”লে”টের গায়ে একটা ভয়ংকর বিষ লাগানো ছিল। বিষটা এতটাই ভয়ংকর ও দ্রুত কার্যকরী যে, এটা অলরেডি জাওয়াদ সাহেবের বডিতে অনেকটা ছড়িয়ে পড়েছে।

আমরা সম্ভাব্য সকল ট্রিটমেন্ট দিয়েছি তাকে, কিন্তু তাও সিউরিটি দিয়ে কিছু বলতে পারছি না। আগামী ২৪ঘন্টার জন্য জাওয়াদ সাহেবের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়। এর মাঝে যদি উনার জ্ঞান না ফিরে সরি টু সে, বিষয়টা আর আমাদের হাতে থাকবে না। উনার কার্ডিয়াক অ্যাটাক হতে পারে বা কোমায় চলে যেতে পারে। উভয়ই ঘটার চান্স ৭০% টার চেয়েও বেশি। আপনারা ওপরওয়ালাকে ডাকুন, কোন একটা মিরাক্যাল ব্যতীত তার ফেরাটা চান্স কম।

ডাক্তার একনাগাড়ে কথাগুলো বলে সেখান থেকে চলে যান নিজের কেবিনে। ডাক্তারের কথা শুনে মি.শেখ মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিলে টনি তাকে ধরে ফেলে। জিনিয়াও ভাইয়ের এমন শারীরিক অবস্থার কথা শুনে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে নিচে বসে পড়ে। বাকি থাকে পূর্ণতা। যে কিনা পাথর হয়ে দাড়িয়ে থাকে ওটির দিকে তাকিয়ে।

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]

শব্দসংখ্যা~২৩০০

চলবে?

[সতর্কতার জন্য জাওয়াদকে কি বি**ষ দেওয়া হয়েছে সেটার নাম উল্লেখ করিনি।

এই গল্পের পাঠকদের একটি বড় সংখ্যা আজও জাওয়াদকে সহ্য করতে পারে না। এখন এত বিরাট সংখ্যক পাঠকদেরকে খুশি করে দিয়ে, জাওয়াদকে টপকিয়ে দেই? কি বলেন আপনারা?

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply