Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৮.২


শেষপাতায়সূচনা [৪৮.২]

সাদিয়াসুলতানামনি

বাসার ভেতরে সবাই যখন স্ব-স্ব কাজে ব্যস্ত, তখনই আমাদের গল্পের আরেকটি জুটি মুখোমুখি হয়েছে নিজেদের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি নিতে। সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাগানে এসেছে আরিয়ান-আরওয়া। জানতে ও জানাতে কি হতে চলেছে তাদের জীবনের অপ্রকাশিত গল্পখানা।

—”তাহলে কি সিদ্ধান্ত নিলে? দেখো তোমার উপর আমি কোনপ্রকার চাপ সৃষ্টি করছি না, আর নাই বা জোর করে তোমার জীবনে প্রবেশ করতে চাইছি। আমি শুধু তোমার সিদ্ধান্তটা জানতে এসেছি। তোমার সবধরনের সিদ্ধান্ত আমি বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নেবো।”

একরাশ ভয় ও অনিশ্চয়তা নিয়ে কথাগুলো বলে আরিয়ান। ভেতরে ভেতরে তার নিঃশেষ হওয়ার অভিপ্রায় হলেও, তার বাহ্যিক আচরণ দেখে কেউ তার ভেতরের অবস্থা ঘুনাক্ষরেও টের পাবে না।

আরওয়া শান্তভাবেই তার কথাগুলো শুনে। একটি মাস সময়ের হিসাবে ক্ষুদ্র হলেও, অনুভূতির বিচারে যেন এক দীর্ঘ যুগ। এই অল্প সময়েই সে জীবনের মোড়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে বহুবার প্রশ্ন করেছে, ভেবেছে, ভেঙেছে, আবার গড়েছে।

অবশেষে বহু ভাবনা-চিন্তার পর সে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে–সে আরেকটি সুযোগ দেবে; জীবনকে, আর আরিয়ানকে। উভয়কেই। কারণ চাইলেও অস্বীকার করা যায় না, তাদের দু’জনের কাছ থেকেই সে পেয়েছে গভীর কষ্ট, যা তাকে বদলে দিয়েছে ভিতর থেকে।

একসময় তার স্বপ্নগুলো ছিল রঙিন। ইচ্ছেগুলো ডানা মেলো উড়তে চাইত শুধুমাত্র আরিয়ানের হাত ধরে। সে কল্পনা করত, তারা একসাথে পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়াবে, হাসি-খুশিতে ভরিয়ে তুলবে ছোট্ট এক সুখের সংসার।

কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো আজ আর স্পষ্ট নয়। সবকিছু কেমন যেন ধোঁয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে আঞ্জুমান নামক এক বিষাক্ত উপস্থিতির ছোবলে, যা এক নিমিষেই তার গড়ে তোলা স্বপ্নরাজ্যকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

কিন্তু আরওয়ার ভীষণ লজ্জা লাগছে মনের কথা মুখে বলতে। তাই সে তার দুই হাত জড়ো করে একে অপরের সাথে মোচড়াতে থাকে। তাঁকে কিছু না বলে চুপ থাকতে দেখে আরিয়ানের বুকের ভেতরকার অস্থিরতা, সংশয় ও ভয় সময়ের তালে তালে বাড়তেই থাকে।

নিজের ভেতরের অস্থিরতা দমাতে না পেরে একসময় আরিয়ান কাতর গলায় বলে–

—”কি হলো? বলো? তোমার নীরবতা আমায় কতটা কষ্ট দিচ্ছে, কতটা অস্থির করে তুলছে সেটা হয়ত তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।”

আরওয়া আমতাআমতা করতে করতে বলে–

—”আপনার স্ট্যাটাসের সাথে আমার স্ট্যাটাস যায় না স্যার। লোকে পরে আমার চরিত্রে আঙুল তুলবে। বলবে, আমি হয়ত……”

—”সংসার কি তুমি লোকদের সাথে করবে নাকি আমার সাথে? কে কি বললো? কি ভাবলো সেটা নিয়ে পড়ে থাকলে জীবনে সুখ নামক বস্তু কখনো তোমার ঝুলিতে এসে জমা হবে না।

আর কেউ যদি তোমার চরিত্র আঙুল তুলেও, তাহলে আমি দায়িত্ব নিয়ে সেই আঙুল ভেঙে গুড়িয়ে দেবো।”

আরওয়া বুঝতে পারে, আরিয়ান তার ব্যাপারে কতটা সিরিয়াস। এসব সিরিয়াসনেস সে আগেও দেখেছে আরিয়ানের মধ্যে। আঞ্জুমানের সাথে বিয়ে হওয়ার আগে। সত্যি বলতে, আরিয়ান তাকে নিয়ে একটু বেশিই ভাবত, ভালোবাসত।

আরিয়ান আগের থেকে আরেকটু অস্থিরতা নিয়ে জিজ্ঞেস করে–

—তাহলে আমি কি ধরে নিবো, তুমি আমাকে একটা সুযোগ দিতে চাচ্ছো?

আরওয়া নিজের সংকোচ কাটিয়ে মুখ ফুটে বলতে পারে না মনের কথাগুলো। নিজের এই অপারগতার কারণে তার কান্না পেয়ে যায়। বাগানের দিকে আজ তেমন একটা লাইট না জ্বালানোর কারণে আরিয়ান দেখতে পায় না আরওয়ার চোখে থেকে ঝরা সংকোচের অশ্রুগুলোকে।

নাক টানার আওয়াজে আরিয়ান বুঝতে পারে, আরওয়া কাঁদছে। সে বিচলিত হয়ে বলল–

—”কাদছো কেনো? কেঁদো না, প্লিজ। আমি তো তোমায় কোনো জোর করছি না। আচ্ছা তোমার উত্তর কি তাহলে ভিন্ন কিছু? তাহলে বিনা দ্বিধায় বলে দাও। বিশ্বাস করো, আমি প্রস্তুত তোমার সকল ধরণের উত্তর শোনার জন্য।”

আরওয়ার এই পর্যায়ে নিজের প্রতিই রাগ হয়। লোকটা কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে তার উত্তর শোনার জন্য, মুহূর্তে মুহূর্তে কেমন অস্থির হয়ে উঠছে। অথচ সে ঢংয়ের দ্বিধা কাটিয়ে নিজের উত্তর খানা জানাতে পারছে না। এখন আবার ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদছে। উফফফ! অসহ্যকর!

অবশেষে আরওয়া নিজের সকল জড়তা, দ্বিধা, সংকোচ কাটিয়ে বলে উঠে–

—”আপনি ভাইয়া আর আম্মুর সাথে আমাদের বিষয়ে কথা বলুন। তারা যা সিদ্ধান্ত নিবে তাই আমি মেনে নিবো।”

আরিয়ান চমকে ওঠে আরওয়ার কথা শুনে। সরাসরি মা আর ভাইয়ের সাথে কথা বলতে বলছে আরওয়া তাকে। তার মানে আরওয়া পজিটিভ ইঙ্গিত দিচ্ছে তাদের রিলেশনটা নিয়ে।

তবে এখানেও একটা “কিন্তু” থেকেই যায়। যদি আরওয়ার ভাই ও মা তাকে এক্সেপ্ট না করে নিজেদের মেয়ের স্বামী হিসেবে? তাহলে আরওয়া কি করবে? আরওয়া তো বললোই সে তার মা-ভাইয়ের সব ডিসিশন মেনে নিবে। তাহলে তারা যদি আরিয়ানকে মেনে না নেয়, তাহলে কি আরওয়াও তাকে রিজেক্ট করবে? প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যায় আরিয়ানের মনে। সে তার মনের মধ্যে প্রশ্নটা চেপে না রেখে আরওয়াকে জিজ্ঞেসই করে বসে–

—”আচ্ছা, ধরো আমি কথা বললাম তোমার ভাইয়া আর মায়ের সাথে। সব জানার পরও বাই এনি চান্স, তারা আমাকে না মানে। আর না মানাটাই তো স্বাভাবিক। তারা আবেগ দিয়ে না ভেবে বিবেক দিয়ে ভাবলে, দেখা যাবে তুমি ঠকে যাচ্ছো আমার দ্বারা। আর কোন পরিবারই চায় না, তাদের অবিবাহিত মেয়ে কোন বিবাহিত ছেলেকে বিয়ে করুক। তাহলে তুমি কি করবে? তুমিও কি আমায় ফিরিয়ে দিবে?”

আরিয়ানের প্রশ্ন শুনে আরওয়া কয়েক পলকের জন্য থমকে যায়। আরিয়ান যা বলছে তা একশতে একশ সত্য। সব জানার পরও আরিয়ানকে সে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেককে একটুও ভাবনার আশেপাশেও আসতে দিচ্ছে না। যাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সবই আবেগ দিয়ে। সে নাহয় আবেগ দিয়ে সব ভাবছে, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু তার পরিবারের লোকেরা তো তার বিয়ের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আবেগ দিয়ে নিবে না। সেও এই বিষয়টা নিয়ে বর্তমানে চিন্তিতবোধ করে।

কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তার পর আরওয়া জিভ দিয়ে নিজের ঠোঁটজোড়া একটু ভিজিয়ে নেয়। তারপর বলে–

—”আমি যতটুকু আমার মা-ভাইকে চিনি তারা শুরুতে বিষয়টা প্র্যাকটিক্যালিই ভাববে। কিন্তু আমরা দু’জন যদি তাদের বুঝাতে সক্ষম হই, তাহলে তারা হয়ত মেনে নিবে।”

—”আর যদি না মেনে নেয়? তখন?”

—”বললাম তো মেনে নিবে। আগের থেকে এত নেগেটিভ না ভেবে পজিটিভ ভাবুন। মানুষের লাইফে কি এক্সিডেন্ট হয় না। সেসব এক্সিডেন্টে মানুষ তাদের হাত-পা বা বিশেষ কিছু হারায় না? সেই বিশেষ কিছু হারানোর কারণে, কি তারা বেঁচে থাকা ছেড়ে দেয়? উত্তর হলো, না। আপনার সাথে আঞ্জুর বিয়েটাও তো একটা এক্সিডেন্টই। না, আপনি জানতেন আপনার স্ত্রী সে নয় যাকে আপনি ভালোবেসে আপন করেছিলেন। আর নাই বা আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার বেস্টফ্রেন্ড আমার প্রিয় মানুষটিকে এভাবে কেড়ে নিবে। একটা মানুষের জন্য আমরা কেন পুরোটা লাইফ সাফার করবো?

এই কথাগুলোই আমার আম্মু আর ভাইয়াকে বুঝাতে হবে। আশা রাখছি তারা বুঝবেন। আর আপনি তো আপনার বন্ধুকে চিনেনই। ইনশা আল্লাহ, উপরওয়ালা চাহে তো সব ঠিক হবে।”

শান্ত গলায় বুঝদারের মতো পুরোটা বিষয় সুন্দর করে বুঝায় আরওয়া আরিয়ানকে। তার এমন করে বুঝানোয় আরিয়ানের মনের সকল সংশয়, ভয়, অনিশ্চয়তা কেটে যায় পলকের মাঝেই।

—”কিন্তু যাই করার আপনার আর আঞ্জুর ডিভোর্সের পর করতে হবে। কারণ আমার মা যতই বুঝদার হোক না কেন, সে কখনোই সম্মতি দিবে না একটা মেয়ের সংসার ভেঙে নিজের মেয়ের রাস্তা করে দিতে।”

—”ঐ ফ্র”ডকে পেলে আমি আজই তালাক দিবো। ব্লাডি বি”চ একটা! তুমি টেনশন করো না, আমি ইতিমধ্যেই আমাদের ডিভোর্সের পেপার রেডি করে ফেলেছি। রুহীর পূর্বের কাজগুলোর প্রমাণসহ পেশ করার কারণে কোর্ট থেকে ডিভোর্স পেতে বেশি একটা বেগ পেতে হয়নি।

পুলিশ ওকে পাওয়া মাত্রই আমি ডিভোর্স পেপার সাইন করে পুলিশের কাস্টাডিতে পাঠিয়ে দিবো। অপেক্ষা শুধু ঐ বেয়াদবটাকে খুঁজে পাওয়ার।”

—”আচ্ছা।”

আর কি কথা বলা যায় এটা ভেবে পায় না তারা দু’জনই। বেশ খানিকটা সময় চুপ থাকার পর হঠাৎই দু’জন প্রায় একসাথেই বলে ওঠে–

—”ভেতরে যাওয়া যাক।”

—”চলুন ভেতরে যাই।”

একই সময় একই কথা দু’জনে একসাথেই বলায় তারা দু’জনই থতমত খেয়ে যায়। আরওয়া খানিক লজ্জালু ভাব নিয়েই আরিয়ানকে পেছনে ফেলে আগে আগে টেনে বাসার ভেতরে চলে যায়। আরিয়ান কিছুক্ষণ পর ভেতরে আসে। তার মুখে তখন ঝুলছিল একটা সুন্দর মিষ্টি হাসি। যেটাকে বলা যায়, স্বস্তির হাসি, পূর্ণতার হাসি।


—”জানো মাম্মা, সিঁলিল পেছনে পিপি আল টনি মামা হাইড এন্ড সিক কেলছিল। আমি বললাম, আমাকেও তোমাদেল সাথে নাও। কিন্তু ওলা আমাকে নেয় নি খেলায়।”

মুখের খাবারটুকু গিলে তাজওয়াদ তার মায়ের কাছে নালিশ জানিয়ে উপরিউক্ত কথাটি বলে।

খেতে বসে সকলের সামনে তাজওয়াদ এমন একটা বো//ম ব্লা/স্ট করবে সেটা জিনিয়া কস্মিনকালেও ভাবেনি। বেচারি আয়েশ করে মাত্রই লেগপিসে কামড় বসিয়েছিল, কিন্তু তার গুণধর ভাতিজার কান্ড দেখে সেটা আর গেলা হয়ে ওঠে না তার।

টনিও এমনভাবে ধরে পড়ে যাওয়ায় চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সকলেই খাওয়া থামিয়ে দিয়ে একবার টনি ও জিনিয়ার দিকে আরেকবার তাজওয়াদের দিকে তাকাচ্ছে। উপস্থিত সকলেই জানে, তাজওয়াদ দুষ্টুমি করে ঠিক আছে, কিন্তু কখনো মিথ্যে কথা বলে না। এটার প্রমাণ তারা সবাই বেশ কয়েকবার পেয়েছে। তাই তার এই কথাটি সন্দেহ ব্যতীত বিশ্বাস করা যেতেই পারে।

জাওয়াদ চোখ পাকিয়ে বোনের দিকে তাকাতেই জিনিয়া ডানে-বামে না তাকিয়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকে প্লেটের খাবারগুলো। টনিও পূর্ণতার বাঁকা চাহনি দেখে কোনমতে খেয়ে, জরুরি ফোনকলের কথা বলে সেই জায়গা ত্যাগ করে তৎক্ষনাৎ।

সারাদিন আনলিমিটেড দুষ্টুমি, ছুটোছুটি, হৈ-হুল্লোড় করার কারণে রাত সাড়ে নয়টা না বাজতেই তাজওয়াদ ঘুমে ঢলে পড়েছে। ওকে খাইয়ে ফ্রেশ করিয়ে দিতেই পিচ্চি জনাব আজ একা একাই ঘুমিয়ে পরেছে। পূর্ণতা ছেলেকে ভালো করে শুইয়ে দিয়ে আবারও নিচে চলে আসে।

খাওয়া শেষে জাওয়াদদের বাসার জন্যও প্যাক করে দেয় খাবার। সকলে যে যার বাসার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ার আগে পূর্ণতা আরো একবার সকলকে ড্রয়িংরুমে একত্রিত করে।তারপর সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে–

—”সবার কাছে আমি একটা কথা ক্লিয়ার করে রাখতে চাই, সেটা হলো–আজকের পর থেকে কিছুই চেঞ্জ হবে না। তোমরা যদি ভেবে থাকো আমি মি.শেখের সাথে আবারও ফিরে গিয়ে সংসার করব তাহলে বলবো, ভুল ভাবছো। আমি শুধু আমার ছেলের ইচ্ছেটাকেই পূরণ করেছি। কোন ফেলে আসা অতীতকে পুনরায় বর্তমানের সাথে জোড়া লাগাচ্ছি না।”

সন্ধ্যা থেকে সকলের মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাওয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর মিললো এখন। সবাই বেশ শঙ্কাতেই ছিলো, পূর্ণতা আর জাওয়াদের সংসার করা নিয়ে। কিন্তু সবকিছু ঠিক হয়েও হলো না আবারও।

পূর্ণতার কথাটা শুনে জাওয়াদ বেশ কষ্টই পায়। ভেবেছিল, এবার হয়ত তাদের সব দুঃখ-কষ্টের সমাপ্তি হতে চলেছে। কিন্তু এবারও শূন্যতা ব্যতীত আর কিছুই রইলো না তার ঝুলিতে। তবে জাওয়াদ ধৈর্যহারা হয়ে পূর্ণতাকে জোর করে না নিজের কাছে ফেরার। কারণ সে বুঝতে পেরেছে, যে কষ্ট তার থেকে পূর্ণতা পেয়েছে তা শুধু প্রায়শ্চিত্তের মাধ্যমেই ভোলানো সম্ভব।

—”কিন্তু ভাবীপু, তাজওয়াদ যদি আর পাঁচটা বাচ্চার মতো তার বাবা-মা দু’জনের সাথেই থাকতে চায়, তখন কি হবে? এরচেয়ে ভালো হয় না, তুমি ফিরে চলো আমাদের সাথে?”

আকুতিভরা দৃষ্টি নিয়ে কথাটা বলে জিনিয়া। তার কথাটা একদমই সঠিক। তাজওয়াদ পাঁচ বছরের ছোট একটা বাচ্চা। সে তো চাইতেই পারে আর পাঁচটা নরমাল পরিবারের মতোই সেও বাবা-মাকে নিয়ে একসাথে থাকবে।

পূর্ণতা জিনিয়ার কথার প্রতুত্তোরে মলিন একটা হাসি হেঁসে বলল–

—”তুমি চিন্তা করো না, আমি আমার ছেলেকে ঠিক বুঝিয়ে নিবো। ওকে বুঝাবো, ওর বাবা-মার সম্পর্কটা আর পাঁচটা কাপলের মতো না। তাই সে চাইলেও বাকিদের মতো একই সময় বাবা-মা উভয়কেই পাবে না।”

পূর্ণতার কথার পৃষ্ঠায় আর কেউ কিছু বলে না। জিনিয়া যদিও নিজের যুক্তি উপস্থাপন করতে চেয়েছিল, কিন্তু জাওয়াদ তাকে থামিয়ে দেয়। রাত বাড়ছে দেখে তারা বিদায় নিয়ে রওনা হয় নিজেদের বাসার উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে সকলের অগোচরে জাওয়াদ পূর্ণতাকে বলে যায়–

—”আমাদের ভুলগুলো কেন ফুল হয়ে ঝরে যায় না? ভুলের বোঝা বইতে বইতে এই পথিক ক্লান্ত আজ।”


মাঝে কেটে গিয়েছে বেশ কয়েকটা দিন। ইদানীং সবকিছু একটু বেশিই স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। ঐতিহ্যে “সামার ফেস্টিভ্যাল” চলছে বলে জাওয়াদ নিজের কাজে ব্যস্ত ভীষণ। তবু দিনের একটা সময় বরাদ্দ রাখে ছেলের জন্য।

গত কয়েকদিনে তাজওয়াদ বাবার আরো বড় ন্যাওটা হয়ে গিয়েছে। ইদানীং সে প্রায়ই বায়না ধরে বাবার সাথে থাকার বা বাবাকে তাদের সাথে নিয়ে আসার। কিন্তু পূর্ণতা প্রতিবারই তাকে বুঝায় এটা পসিবল না। তাজওয়াদ তখন তো বুঝে ঠিকই, কিন্তু দুয়েক দিন পর আবারও যা-তাই হয়ে যায়।

আজ বহুদিন পর পূর্ণতা সাইট ভিজিটিংয়ে এসেছে। বসুন্ধরার সাইট ভিজিট করতে গিয়ে সেখানে গিয়ে জাওয়াদকেও পেয়ে যায় সে। জাওয়াদ অবশ্য টনির কাজ থেকে জানতে পেরে তবেই সে এখানে এসেছে। নাহলে তার তো কোন প্রয়োজন পড়ে না সাইটে যাওয়ার। এসব ভিজিটিং, মনিটরিং সব মাহবুবই দেখে।

জাওয়াদ পূর্ণতাকে দেখে এমন একটা ভান করে যেন তাদের সাক্ষাৎটা নিতান্তই কাকতালীয়। রানিং ক্লাইন্ট বলে পূর্ণতাও তাকে মুখের উপর ইগনোর করতে পারে না। তারা পুরোটা সাইট একসাথেই পরিদর্শন করতে থাকে। বসুন্ধরার এই শো-রুমটার এখনও ছাঁদ ঢালাই বাকি।

হঠাৎই জাওয়াদ দেখতে পায়, পূর্ণতার বুকের বাম পাশে কালো কোর্টের উপরে কেমন একটা লাল বিন্দু। বিন্দুটা একবার পূর্ণতার কপালে দেখা যাচ্ছে তো আরেকবার বুকে। বলতে গেলে মুখ ও বুকের কাছে লাল বিন্দুটা ঘোরাফেরা করছে। জাওয়াদ শুরুতে এই বিন্দুর ব্যাপারটা বুঝতে পারে না। কিন্তু যখন সে খেয়াল করে পূর্ণতা তার হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পরে বিন্দুটা একদম তার বুকের বাম পাশে স্থির হয়ে থাকে।

হঠাৎই জাওয়াদের মস্তিষ্কে একটা বিষয় এসে ধাক্কা খায়। সে দ্রুত পূর্ণতাকে সেখান থেকে নিয়ে চলে আসতে চায়, তাই সে পূর্ণতার সামনে এসে অস্থির গলায় তখনই একটা তীক্ষ্ণ আ/ঘা/তে তার পুরো পিঠ অবশ হয়ে যায়। ব্যথার তীব্রতায় জাওয়াদ তার পায়ের ভারসাম্য হারিয়ে কিছুটা পূর্ণতার উপর ঝুকে পড়লে, পূর্ণতা তাড়াতাড়ি করে কোনমতে তাকে দুইহাত দিয়ে আগলে নেয়।

পূর্ণতা নিজেকে সামলে নিয়ে খানিক কর্কশ গলায় বলল–

—”কি সমস্যা কি? দেখে চলতে পারেন না? না ধরলে তো পরে যেতেন।”

জাওয়াদ একবার লম্বা করে শ্বাস টেনে নিয়ে বলল–

—”গাড়িতে চলো। তোমার এখানে থাকা সেইফ না।”

সেইফ না মানে? কি হয়েছে যার কারণে পূর্ণতার এখানে থাকা সেইফ না?

পূর্ণতা জাওয়াদকে ঠেলে নিজের উপর থেকে সরাতে সরাতে বলে–

—”সরুন তো। কাজের জায়গায় এসে এসব আজাইরা ঢং করলে একদম খবর করে ছাড়বো। সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে কিভাবে দেখুন। সরুউউউন।”

জাওয়াদ বহু কষ্টে নিজের পায়ে দাঁড়ায়, কিন্তু তখনও তার পা টলমল করছে। সে পূর্ণতার ডান হাত শক্ত করে চেপে ধরে সেখান থেকে চলে আসার জন্য পা বাড়াবে, ঠিক তখনই আরেকবার বি”কট আওয়াজ হয় পাশের একটা দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে রাখা টাইলস গুলোয়।

পূর্ণতা খানিক ভয় পেয়ে জাওয়াদের সাথে সেঁটে গেলে জাওয়াদ তাঁকে একহাত দিয়ে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বলে–

—”আমি বেশি একটা ভুল না হলে, তোমার উপর কেউ অ্যাটাক করেছে। বেশি কথা না বলে গাড়িতে চলো দ্রুত।”

কথাটা শেষ করে জাওয়াদ বড় বড় পা ফেলে পূর্ণতাকে নিজের সাথে চেপে ধরেই অর্ধনির্মিত শো-রুমটা থেকে বের হয়ে আসে। জাওয়াদ পূর্ণতাকে নিজের সাথে নিজের গাড়িতে বসায়।

গাড়িতে বসে জাওয়াদ নিজের গা থেকে কোর্টটা খুলে ফেললে, পূর্ণতা দেখতে পায় জাওয়াদের পরিহিত স্কাই ব্লু শার্ট টার পেছনের দিকে রক্তে চুপচুপে হয়ে আছে।

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]

শব্দসংখ্যা~২১৩০

চলবে?

[গেস করুন তো, এই আকামটা কোন ভালো মানুষ করলো?😁🤭

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply