রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৯
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
রাত তখন গভীর নিশিথ। বাইরের নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝে মাঝে দু-একটা কুকুরের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে, যা রাতের নিঝুমতাকে আরও রহস্যময় করে তুলছে। মির্জা বাড়ির সবাই হয়তো এতক্ষণে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, কিন্তু তৃণার দুই চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। সে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করল অনেকক্ষণ, কিন্তু এক অদ্ভুত অস্থিরতা আর অজানা টেনশন তাকে কিছুতেই শান্ত হতে দিচ্ছে না। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ঢিবঢিব করছে একদিকে ভয়, অন্যদিকে এক শিহরণ জাগানিয়া অনুভূতি।
তৃণা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। অস্থির পায়ে রুমের এমাথা থেকে ওমাথা পায়চারি করতে লাগল সে। কয়েকবার আরিয়ানের শিয়রে গিয়ে দাঁড়াল, ইচ্ছে হলো ডাক দিয়ে জাগিয়ে তোলে। কিন্তু পরক্ষণেই থমকে গেল, লোকটা সারা দিন অফিসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছে, এখন তার গভীর ঘুমের প্রয়োজন। ঘড়ির কাঁটা রাত তিনটার ঘর ছুঁইছুঁই।
হাঁপিয়ে উঠে তৃণা বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের আকাশটা আজ অদ্ভুত সুন্দর। রুপালি চাঁদের আলোয় চারদিক যেন দুধসাদা চাদরে ঢাকা পড়েছে। এই অপার্থিব সৌন্দর্য দেখে তৃণার মনটা আরও উচাটন হয়ে উঠল। হঠাৎ নিজের পেছনে কারো ছায়া আর তপ্ত নিশ্বাস অনুভব করতেই সে আঁতকে উঠে পেছনে তাকাল। দেখল আরিয়ান অগোছালো চুলে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে এখনো ঘুমের ঘোর।
আরিয়ান ভাঙা গলায় শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“এখনও ঘুমাওনি তুমি?”
“ঘুম হচ্ছিল না।”
আরিয়ান তৃণার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল,
“কেন? কোনো সমস্যা হচ্ছে?”
তৃণা দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“জানি না। কেন জানি চোখে ঘুম আসছে না।”
আরিয়ান এগিয়ে এসে তৃণার পাশে দাঁড়াল। এক হাতের শক্ত বাঁধনে নিজের শরীরের সাথে ওকে লেপ্টে নিল। রাতের এই শীতল বাতাসে আরিয়ানের দেহের ওম পেয়ে তৃণা যেন কিছুটা শান্তি পেল। আরিয়ান ওর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“ঘুম হচ্ছিল না তো আমাকে ডাকলেই পারতে। একা একা এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
তৃণা অপরাধীর মতো মুখ করে বলল, “আপনি খুব ঘুমাচ্ছিলেন, তাই ডাকিনি।”
আরিয়ান মুচকি হেসে ওর চিবুকটা একটু উঁচিয়ে ধরল,
“আমি ঘুমাচ্ছিলাম বলে কি আমার প্রিয়তমা আমাকে
ডাকতে পারবে না?”
তৃণা আরিয়ানের বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল,
“কেমন যেন লাগছে। একটু ভালো লাগছে, আবার খুব অস্থিরও লাগছে। ঠিক বোঝাতে পারছি না।”
আরিয়ান ওর চুলে বিলি কেটে দিয়ে হাসল,
“এটা আবার কেমন রোগ শ্যামলিনী? ভালো লাগা আর অস্থিরতা কি একসাথে চলে?”
তৃণা আরিয়ানের শার্টের বোতাম নিয়ে খেলতে খেলতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমি শুধু সকাল হওয়ার অপেক্ষায় আছি।”
আরিয়ান অবাক হয়ে তৃণার দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে কৌতূহল। সে কিছুটা সংশয়ের সুরে বলল,
“সকাল হওয়ার অপেক্ষায় মানে? কোনো স্পেশাল জায়গায় যাবে নাকি?”
তৃণা আরিয়ানের দিকে ফিরে তার দুহাত আরিয়ানের গলায় জড়িয়ে ধরল। এক রহস্যময় হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বলল,
“উহু, তবে আগামীকাল আপনাকে যা বলব, তাতে আমার মনে হয় আপনি দুনিয়ার সবচেয়ে খুশি মানুষ হবেন।”
আরিয়ান ছোট বাচ্চাদের মতো বায়না ধরে বলল,
“আরে, এখনই বলো না! এত সাসপেন্স রাখা কি ভালো?”
তৃণা তার নাক দিয়ে আরিয়ানের নাকে আলতো ঘষা দিয়ে বলল, “উহু, আগামীকাল।”
আরিয়ান হার মেনে নিল। তৃণা হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলল,
“আমার না এই মুহূর্তে খুব নদীর পাড়ে বসে থাকতে মন চাচ্ছে।”
আরিয়ান তৎক্ষণাৎ উৎসাহিত হয়ে বলল,
“চলো যাই! এখান থেকে কিছুটা দূরেই একটা নদী রয়েছে। এই জোছনায় নদীটা দারুণ দেখাবে।”
তৃণা খুশি হয়েও পরক্ষণেই থেমে গেল। চারদিকের নিস্তব্ধতা আর সময়ের কথা ভেবে মাথা নাড়ল।
“না, থাক। এত রাতে যাওয়া ঠিক হবে না।”
আরিয়ান হাসল। তৃণার কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“আচ্ছা মহারানী, আপনি যাহা বলিবেন তাহাই সই।”
তারা দুজন বেলকনিতে ঝোলানো দোলনাটায় গিয়ে বসল। চারপাশ নিঝুম, শুধু মাঝে মাঝে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। দুজনের দৃষ্টি আকাশের অগণিত তারার দিকে। আরিয়ান সহসা তৃণার কাঁধে মাথা রেখে আবেগপ্রবণ গলায় বলল,
“তুমি জানো না শ্যামলিনী, তুমি আমার ঠিক কতটা প্রিয়। আমি কোনোদিন ভাষায় তা ব্যাখ্যা করতে পারব না। মাঝে মাঝে ভাবি, তুমি কি আমায় কোনো জাদু করেছ?”
তৃণা আরিয়ানের কথা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, “হুম করেছি। একটা গান বলবেন? খুব গান শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে আপনার গলায়।”
আরিয়ান বলল, “তুমি বলো, আমি শুনছি।”
তৃণা আবদার করল, “চলুন না, একসাথে বলা যাক।”
রাতের গভীর নিস্তব্ধতা ভেঙে আরিয়ান আর তৃণা গুনগুন
করে গান ধরল। সুর মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল সেই রূপালি জোছনায়,
Kasum hai tumhe tum
আমাকে কসম দাও তুমি
agar mujhse rute
আমার উপর কখনো বিরক্ত হবে না
Rahe sans jab tak
আমার বেঁচে থাকা পর্যন্ত)
ye bundun na tute
এই বন্ধন ছিন্ন হবে না
তারপর তৃণা আরিয়ানের বুকে আরও নিবিড়ভাবে মাথা রেখে গেয়ে উঠল,
Tumhe Dil diya hai.
আমি তোমাকে আমার হৃদয় দিয়েছি
Ye wada Kiya hai
এবং আমি এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি
tumhari Sanum main tumhari Rahungi Sada…
আমি সবসময় তোমার প্রিয়তমা হয়ে থাকব।
গানটি শেষ করার সময় দুজনের কণ্ঠস্বর একই রেখায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল,
Ye rathain, Ye musum
এই রাতে, এই আবহাওয়া
Nadi ka kinara
এই নদীর তীর
Ye chal chal hawa
এই মৃদুবাতাস, সবই অসাধারণ
গান শেষ হওয়ার পর এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। আরিয়ান তৃণার কপালে দীর্ঘক্ষণ ঠোঁট ছুঁইয়ে রাখল। নদীর তীরে যাওয়া না হলেও, এই বেলকনির দোলনায় বসেই তারা যেন ভালোবাসার এক অগাধ সমুদ্রে হারিয়ে গেল। তৃণা মনে মনে ভাবল, কালকের সকালটা সত্যিই এক নতুন পৃথিবী নিয়ে আসবে তাদের জীবনে।
★★★
সকাল সকাল তৃণা আজ ভীষণ খুশি। মেয়েটার চোখেমুখে আজ যেন এক অলৌকিক আভা, এক অদ্ভুত প্রশান্তি। বাড়ির যে কেউ তার দিকে তাকালেই বুঝতে পারছে বড় কোনো খুশির খবর তার মনে দোলা দিচ্ছে। পরিবারের অনেকেই কৌতূহল ভরে জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু তৃণা শুধু রহস্যময় এক চিলতে হাসি হেসে এড়িয়ে গেছে। তার এই অহেতুক লাজুক ভাবটা যেন আজ একটু বেশিই চোখে পড়ছে।
তৃণা এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি বানিয়ে ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে নিজের ঘরে গেল। রুমে ঢুকে দেখল আরিয়ান এখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছে, বিছানায় একদম উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সে। তৃণা কফির মগটা পাশের সাইড টেবিলে রাখল। এরপর আলতো করে আরিয়ানের এলোমেলো চুলে হাত রেখে নরম গলায় ডাকল,
“শুনছেন? একটু উঠুন না।”
আরিয়ান তৃণার ডাকে চোখ মেলল না ঠিকই, তবে তার হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুমের ঘোরেই ঘুরে তৃণার উরুতে মাথা রেখে আরও গুটিসুটি মেরে শুয়ে রইল। তৃণা তার এই আদুরেপনা দেখে মুচকি হাসল। সে যখন পরম মমতায় আরিয়ানের কপালে হাত বুলিয়ে বড় কোনো কথা বলতে যাবে, ঠিক তখনই আরিয়ানের ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল।
আরিয়ান বিরক্তি নিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে কানে ধরল। আধো ঘুমে থাকা গম্ভীর গলায় বলল,
“হ্যালো, আরিয়ান স্পিকিং।”
ওপাশ থেকে অফিসের ম্যানেজারের জরুরি কল। আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে ওপাশের কথাগুলো শুনল, তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। কিছুক্ষণ পর সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে সে কলটা কেটে দিল। এরপর অলসতা ঝেড়ে বিছানায় উঠে বসল। তৃণা উদ্দীপ্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কোনো সমস্যা হয়েছে?”
আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“হ্যাঁ, অফিসে যেতে হবে। বিদেশি ক্লায়েন্টরা চাচ্ছে মিটিংটা যেন এখনই হয়। আজই ওদের ফ্লাইটের সময়, তাই বড্ড তাড়া দিচ্ছে।”
তৃণার মুখটা মুহূর্তেই কিছুটা মলিন হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর সযত্নে রাখা সেই আনন্দের খবরটা জানানোর মুহূর্তটা যেন আবার থমকে গেল। সে নিচু স্বরে বলল,
“এখনই যেতে হবে?”
আরিয়ান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হুম, এখনই বেরোতে হবে।”
বলেই সে দরজার দিকে এগোতে গিয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তৃণার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কৌতূহলী স্বরে বলল,
“ও হ্যাঁ, তুমি তো কাল রাত থেকে কী যেন একটা বলবে বলছিলে। বলো না, কী এমন কথা?”
তৃণা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি । সে নিজের ভেতরকার চপলতাটুকু সামলে নিয়ে মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বলল,
“না, এখন না। আগে আপনি অফিস থেকে ফিরুন, তারপর শান্তিতে বলব।”
আরিয়ান আর জোরাজুরি করল না। সে জানে তৃণা যখন একবার না বলেছে, তখন তাকে দিয়ে কথা বের করা কঠিন। সে চটজলদি রেডি হয়ে ডাইনিং টেবিলে সামান্য নাস্তা মুখে দিয়েই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। আর তৃণা বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার গাড়ির চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
এখন বিকেল প্রায় পাঁচটা। সারাটা দিন তৃণার জন্য যেন এক অন্তহীন প্রতীক্ষার মতো কেটেছে। মনের গহিনে সযত্নে রাখা সেই গোপন আনন্দটা কাউকে বলতে না পেরে তার ভেতরটা ছটফট করছে। এক অদ্ভুত অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরলেও সে বারবার নিজেকে এই বলে শান্ত রাখছে যে রাতে আরিয়ান ফিরলে সে খুব সুন্দর করে গুছিয়ে খবরটা তাকে দেবে।
তৃণা ড্রয়িংরুমের সোফায় একা বসে জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল। গোধূলির ম্লান আলোয় আকাশটা কেমন মায়াবী দেখাচ্ছে। হঠাৎ তার ভীষণ ইচ্ছে হলো আরিয়ানের গলার স্বর শুনতে। ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট থেকে আরিয়ানের নাম্বারটা বের করে কল দিল সে। দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে আরিয়ানের সেই অতি পরিচিত গম্ভীর অথচ অসম্ভব মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে আসল,
“শ্যামলিনী!”
তৃণা এক মুহূর্ত নীরব থেকে খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কখন আসবেন?”
আরিয়ান নরম সুরে উত্তর দিল,
“এই তো, কাজ প্রায় শেষের দিকে। তবে মিটিংয়ের পর কিছু ফরমালিটিজ বাকি আছে, তাই ফিরতে ফিরতে বেশ অনেকটাই রাত হবে আজ।”
তৃণার মনটা একটু বিষণ্ণ হয়ে গেলেও সে নিজেকে সামলে নিয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, “আচ্ছা।”
তৃণার এই ছোট্ট উত্তরের পেছনে লুকিয়ে থাকা অভিমান আরিয়ান ঠিকই টের পেল। সে তৎক্ষণাৎ কুণ্ঠিত স্বরে বলল,
“কী হলো? তোমার মন খারাপ? তুমি বললে আমি সব কাজ ফেলে এখনই চলে আসব। আসব?”
তৃণা মনে মনে একটু হাসল। লোকটা তাকে কতটা গুরুত্ব দিলে সব কাজ তুচ্ছ করে ছুটে আসতে চায়! সে নিজেকে সংবরণ করে বলল, “না, না! পাগল হয়েছেন? আপনি কাজ শেষ করেই আসুন। আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।”
“আচ্ছা, নিজের খেয়াল রেখো।”
এভাবেই কিছুক্ষণ অসংলগ্ন কথা বলে তারা কলটা কেটে দিল। তৃণা ফোনটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
★★★
সন্ধ্যা তখন সাড়ে ছয়টা। বাইরের আকাশে গোধূলির রেশটুকু মুছে গিয়ে অন্ধকারের চাদর নামতে শুরু করেছে। আরিয়ান সারাদিনের ক্লান্তি আর ব্যস্ততা শেষে মাত্রই বাড়িতে ফিরল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখল সোফায় বাড়ির বড়রা সবাই বসে গল্প করছেন, কিন্তু তার চোখ যাকে খুঁজছে, সেই তৃণাকে কোথাও দেখা গেল না।
আরিয়ান ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তৃণা কোথায়? ওকে তো দেখছি না।”
মায়মুনা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললেন,
“তৃণা তো তার বাবার বাড়ি গিয়েছে রে।”
মায়ের কথা শুনে আরিয়ান অবাক হলো। সকাল থেকে মেয়েটা তাকে কতবার কল করল, তাড়াতাড়ি আসতে বলল, অথচ সে নিজেই এখন বাড়িতে নেই! আরিয়ান বলল,
“বাবার বাড়ি গিয়েছে মানে? আমাকে একবারও জানাল না যে!”
মায়মুনা বেগম বললেন,
“আসলে ওমর হাওলাদার কল দিয়েছিলেন তৃণার ফোনে। তিনি নাকি মেয়েকে দেখার জন্য খুব অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, তাই তৃণা আর না করতে পারেনি। বাবার কথা শুনে ওখানেই চলে গেল।”
আরিয়ান এবার একটু গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তৃণা কি একা গিয়েছে?”
“হ্যাঁ, একাই গেল।”
“একা কেন গেল? বাড়িতে কি আর কেউ ছিল না সাথে যাওয়ার মতো?”
মায়মুনা বেগম বললেন,
“বাড়িতে তখন আসলে তেমন কেউ ছিল না। নৌশি আর মিতু আগে থেকেই শপিং মলে গিয়েছিল। আর বাড়ির পুরুষরা তোমরা সবাই তো কাজের প্রয়োজনে বাইরে ছিলো।”
আরিয়ানের বুকের ভেতরটা কেমন জানি খচখচ করে উঠল। একে তো রাতের বেলা, তার ওপর তৃণার শরীর আর মনের যে অবস্থা, তাতে ওর একা যাওয়াটা একদমই পছন্দ হলো না আরিয়ানের। সে কাঁধের ব্যাগটা সোফায় একরকম ছুড়ে ফেলেই বলল,
“আচ্ছা মা, আমি তাহলে ওখান থেকেই তৃণাকে নিয়ে আসছি।”
মায়মুনা বেগম কিছু বলার আগেই আরিয়ান দ্রুত কদমে বেরিয়ে গেল। গ্যারেজে গিয়ে স্টার্ট দিল গাড়িতে। এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল সে। তড়িঘড়ি করে তৃণার নাম্বারটা বের করে কল দিল।
আরিয়ান তৃণার নাম্বারে কয়েকবার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই যান্ত্রিক কণ্ঠে ভেসে আসছে ‘আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি বর্তমানে বন্ধ আছে।’ বুকের ভেতর ধক করে উঠল তার। অস্থিরতা নিয়ে সে এবার সরাসরি ওমর হাওলাদারের নাম্বারে কল দিল। ফোন রিসিভ হতেই আরিয়ান দ্রুত সালাম জানিয়ে কুশল বিনিময় সেরে নিয়ে বলল, “বাবা, তৃণার কাছে কি ফোনটা একটু দেওয়া যাবে? ওর নাম্বারটা বন্ধ পাচ্ছি।”
ওপাশ থেকে ওমর হাওলাদারের অবাক কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“ আমি তো এখন হসপিটালে একটা কাজে এসেছি। তৃণা কি হাওলাদার বাড়িতে গিয়েছে নাকি?”
আরিয়ান গাড়িতে উঠতে গিয়েও দরজায় হাত রাখা অবস্থায় পাথরের মতো জমে গেল। হৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে। সে শুকনো গলায় বলল,
“আপনি না তৃণার ফোনে কল দিয়ে বললেন যে আপনি মেয়েকে দেখতে চান? তাই তো ও আপনার বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হলো!”
ওমর হাওলাদার এবার আরও বেশি বিস্মিত হয়ে বললেন,
“কই! আজ তো সারাদিনে তৃণার সাথে আমার একবারও কথা হয়নি। আমি তো ওকে কল দিইনি!”
আরিয়ানের কপালে মুহূর্তেই বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। এসি থাকা সত্ত্বেও তার পুরো শরীর যেন আগুনের মতো তপ্ত হয়ে উঠছে। অজানা এক আশঙ্কায় বুকটা দুরুদুরু করছে তার। সে এবার কাঁপা হাতে কল দিল রিনির নাম্বারে। কিন্তু রিনিও যা জানালো তাতে আরিয়ানের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। রিনি স্পষ্ট বলল যে তৃণা সেখানে যায়নি।
আরিয়ানের পুরো শরীর এবার থরথর করে কাঁপছে। মাথার রগগুলো যেন রাগে আর আতঙ্কে ছিঁড়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতর আত্মাটা যেন খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ছটফট করছে। এক ভয়াবহ শূন্যতা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
তৃণা তাহলে কোথায় গেল? কার কথায় সে বাড়ি থেকে বের হলো? আর ওমর হাওলাদারের নাম করে কার এত বড় সাহস যে তাকে এভাবে ফাঁদে ফেলল? আরিয়ান স্টিয়ারিং হুইলে সজোরে একটা ঘুষি মারল। তার শ্যামলিনী কি তবে কোনো বড় বিপদে পড়েছে? এই অন্ধকার রাতে শহরটা যেন আরিয়ানের কাছে এক বিশাল গোলকধাঁধা মনে হতে লাগল।
★★★
চারদিকে মৃত্যুপুরীর মতো পিনপতন নীরবতা। একটি জীর্ণশীর্ণ, স্যাঁতসেঁতে বদ্ধ ঘর। দেওয়ালগুলোর প্লাস্টার খসে গিয়ে কঙ্কালসার ইটের পাঁজর বেরিয়ে পড়েছে। পুরো ঘরটা গা ছমছমে অন্ধকারে ডুবে আছে, শুধু মাথার ওপর একটি লাল বাল্ব টিমটিম করে জ্বলছে। রুমের ঠিক মাঝখানে মেঝের ওপর পড়ে আছে কালো শাড়ি পরিহিত একটি নিথর দেহ। হঠাৎ ভারী লোহার দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল। বাইরের এক চিলতে আলো এসে সরাসরি আছড়ে পড়ল সেই দেহটির ওপর। ফুটে উঠল এক লহমায় তৃণার সেই মায়াবী অথচ বিধ্বস্ত শ্যামলাবরণ চেহারা। তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। কারো পায়ের শব্দে তৃণা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে আলতো করে চোখ মেলল।
তৃণার হাত দুটো তার পেটের সাথে মিলিয়ে বাঁধা। মুখের ভেতর একটি রুমাল শক্ত করে গুঁজে দেওয়া হয়েছে, যাতে তার কোনো আর্তনাদ দেওয়াল ভেদ করে বাইরে যেতে না পারে। এক সময়ের পরিপাটি চুলগুলো আজ ধুলো আর ঘামে জট পাকিয়ে আছে। মেঝেতে লতার মতো পড়ে থাকা তৃণা অনেক কষ্টে ঘাড় উঁচু করে সামনে তাকাল।
সামনে তাকাতেই তৃণার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল, শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক নিমেষে হিম হয়ে গেছে। বিষাক্ত সাপের মতো সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার সৎ মা রৌশনারা বেগম এবং তার কুখ্যাত সৎ মামা খলিল।
তৃণা আবারও ছটফট শুরু করল, বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার এক আপ্রাণ কিন্তু বৃথা চেষ্টা করল। তার মুখ দিয়ে গোঙানির মতো কিছু অস্পষ্ট শব্দ বের হচ্ছে, যা কান্নার চেয়েও করুণ। খলিল বিকট এক হাসি দিয়ে তৃণার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তার লোলুপ দৃষ্টি তৃণার আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। লোকটার চোখের কোণে এক জঘন্য লালসা চিকচিক করছে। তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে তৃণার শরীরে নিজের ওই নোংরা হাতের স্পর্শ লাগাতে, কিন্তু পাশে নিজের বোন রৌশনারা দাঁড়িয়ে থাকায় সে সুযোগটা নিতে পারছে না।
খলিল তৃণার মুখের বাঁধনটা খুলে দিতেই সে ফুসফুস ভরে বাতাস নিল। তৃণা চিৎকার করে উঠল,
“তোমরা আমাকে এভাবে বেঁধে রেখেছ কেন? মা, আমাকে এখানে কেন এনেছ? কী চাও তোমরা?”
রৌশনারা বেগম এক ঝটকায় তৃণার বাহু ধরে টেনে তাকে সোজা করে বসালেন। তারপর তৃণার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বললেন,
“তুই বুঝতে পারছিস না কেন আমি তোকে এখানে এনেছি? এত বোকা তো তুই নোস!”
তৃণা শুধু ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল। খলিল তখন পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ বের করল। কুটিল হেসে বলল,
“এই যে মা জননী, এখানে একটা সই করে দাও। তাহলেই কেল্লাফতে! সই করবি আর মুক্তি পাবি।”
তৃণা কাঁপা গলায় বলল, “সই! কিসের কাগজ এটা?”
রৌশনারা বেগম দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“তোর বাবার সব সম্পত্তির দলিল। তোর বাপ সব সম্পত্তি তোর নামে লিখে দিয়েছিল। সেগুলোই আজ তুই আমার নামে লিখে দিবি।”
বলতে বলতে রৌশনারা বেগম তৃণার হাতের বাঁধন খুলে দিলেন। কর্কশ গলায় বললেন,
“লক্ষ্মী মেয়ের মতো এখানে সই করবি।”
তৃণা মুহূর্তের মধ্যে কাগজটা খপ করে ধরে দূরে ছুড়ে মারল। গর্জে উঠে বলল,
“আমি কখনো এসবে সই করব না! তোমরা এত নিচ হতে পারো? এই সামান্য সম্পত্তির জন্য আমাকে কিডন্যাপ করলে?”
রৌশনারা বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। প্রচণ্ড আক্রোশে তৃণার গালে এক কষে চড় মারলেন। চড়ের চোটে তৃণা টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে ছিটকে পড়ল। কপালটা গিয়ে ঠেকল মেঝের এক ভাঙা ইঁটের কোণায়। যন্ত্রণায় কপাল ফেটে র’ক্ত বের হতে শুরু করল, কিন্তু তৃণা সাথে সাথে নিজের হাতটা পেটের ওপর রাখল। যতটা সম্ভব নিজেকে গুটিয়ে রেখে সে নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করল।
রৌশনারা বেগম আবারও তৃণার চুলের মুটি ধরে হ্যাঁচকা টানে তাকে দাঁড় করালেন। মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসে ধমকে বললেন,
“ভালোই ভালোই বলছি সইটা করে দে, নইলে কিন্তু ফল ভালো হবে না!”
তৃণা এবার এক অবিশ্বাস্য কাজ করে বসল। প্রবল ঘৃণা আর রাগের বশে রৌশনারার মুখে এক দলা থুতু ছিটিয়ে দিল। তারপর বাঘিনীর মতো গর্জে উঠল,
“আরিয়ান যদি জানতে পারে তোমরা আমাকে আটকে রেখেছ, তাহলে তোমাদের সে আস্ত রাখবে না!”
রৌশনারা বেগম রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। অপমানে তার চোখ মুখ লাল হয়ে উঠল। তিনি সর্বশক্তি দিয়ে তৃণার বুকে এক প্রচণ্ড লাথি মারলেন। তৃণা এক আর্তচিৎকার করে লুটিয়ে পড়ল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে আবারও পাগলের মতো নিজের পেটটা চেপে ধরল। কিন্তু রৌশনারা বেগমের রাক্ষুসী রূপ তখন চরমে। তিনি তৃণার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লাথি দিতে শুরু করলেন।
রৌশনারা বেগম যখন তৃণার পেটে লাথি দিতে উদ্যত হলেন, তৃণা তখন প্রাণপণে রৌশনারার পা চেপে ধরল। যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে মাটির সাথে মিশে গেল। খলিল পাশ থেকে এতক্ষণ সব লক্ষ্য করছিল, সে হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এল। কুটিল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“কী ব্যাপার? অনেকক্ষণ ধরেই দেখছি তুই শুধু পেটে হাত চেপে আছিস! পেটে কী আছে শুনি?”
রৌশনারা বেগমও থেমে গেলেন। সন্দেহী চোখে তাকিয়ে বললেন,
“ঠিকই তো! বল, সত্যি করে বল পেটে হাত দিয়ে আছিস কেন? পেটে কী?”
তৃণা আরও কুঁকড়ে গেল। দুই হাত দিয়ে নিজের পেটকে আষ্টেপৃষ্ঠে আগলে রেখে ধরা গলায় বলল,
“কিছু না… কিছু না আমার পেটে!”
রৌশনারা বেগম যেন এক পৈশাচিক আনন্দ খুঁজে পেলেন। তৃণার ওই কুঁকড়ে যাওয়া আর পেটে হাত দিয়ে আড়াল করার ভঙ্গিটা তাঁর সন্দেহকে নিশ্চিত করে দিল। তিনি আবার পা উঁচিয়ে তৃণার পেটে আঘাত করতে উদ্যত হতেই তৃণা পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর পা দুটো জড়িয়ে ধরল। কান্নায় ভেঙে পড়ে হাহাকার করে উঠল সে,
“দোহাই লাগে মা, আমার পেটে আঘাত করো না! তুমি আমার শরীরের যেখানে খুশি আঘাত করো, আমি কিচ্ছু বলব না। কিন্তু আমার পেটে যে ছোট একটি প্রাণ বড় হচ্ছে। আমি তো এখনো ওর বাবাকে এই সংবাদটা দিতে পারিনি। ওর অস্তিত্ব যে কেবল আমার গর্ভে দানা বেঁধেছে! দয়া করো মা, আমার বাচ্চাকে মেরো না!”
তৃণার এই বুকফাটা আর্তনাদ আর আকুতি রৌশনারা বেগম এবং খলিলের কাছে যেন স্রেফ এক সস্তা কমেডি নাটকের সংলাপ মনে হলো। তাঁদের পাথর হৃদয়ে বিন্দুমাত্র করুণা জাগল না, উল্টো দুজনের মুখে ফুটে উঠল পৈশাচিক হাসি। রৌশনারা বেগম কোনো কথা না শুনেই পূর্ণ শক্তিতে পা চালিয়ে দিলেন। তবে এবার লাথিটা সরাসরি পেটে না লেগে পেটের এক পাশে সজোরে আঘাত করল।
তৃণা ছিটকে গিয়ে পাশের দেওয়ালের সাথে ধাক্কা খেল। মেয়েটার আকাশফাঁটা যন্ত্রণার চিৎকারে জীর্ণ রুমের চারপাশ কেঁপে উঠল, কিন্তু সেই জঘন্য মানুষ দুটোর হৃদয় গলল না। তৃণা মেঝের ধুলোয় পড়ে ছটফট করতে লাগল, তার মনে হচ্ছিল ফুসফুসের বাতাস ফুরিয়ে আসছে, দম নিতে পারছে না সে। যন্ত্রণায় তার চোখের মণি যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ভারী বুটের শব্দে লোহার দরজাটা আবার খুলে গেল। ঘরে আরেকজন মানুষের প্রবেশ ঘটল। সেদিকে তাকাতেই তৃণার বিস্ময়ের সীমা রইল না, যন্ত্রণার মাঝেও তার শরীর যেন হিম হয়ে গেল। রৌশনারা বেগম এবং খলিলের মুখে এক চওড়া হাসি ফুটে উঠল আগন্তুককে দেখে।
তৃণা নিজের পেটে দুই হাত দিয়ে প্রাণপণে আগলে রেখে ব্যাথাতুর, কম্পিত কণ্ঠে অস্ফুটে বলে উঠল,
“তুমি…!”
চলবে…
(অনেকটা বড় পর্ব কোথাও ভুল থাকলে ধরিয়ে দিবেন। আমি শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করব।)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৯
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র বোনাস পর্ব (আদনান-নৌশি)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫২ (প্রথমাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫০(বর্ধিতাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩১