Uncategorized

রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র পর্ব ৬০(প্রথমাংশ)


পর্ব_৬০(প্রথমাংশ)

নিলুফানাজমিননীলা

★★★

তৃণার চোখের সামনে যেন অন্ধকার নেমে এল। তার প্রতিটি নিশ্বাস তখন যন্ত্রণায় ভারী হয়ে উঠছে। তৌহিদকে এখানে, এই অবস্থায় দেখতে হবে তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। তৃণা নিজের ভাঙা কণ্ঠে বিস্ময় আর আতঙ্ক মিশিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“তৌহিদ… তুমি? তুমি এসবের সাথে জড়িত?”
​তৌহিদ কোনো উত্তর দিল না, বরং পৈশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়ল। সেই অট্টহাসি বন্ধ ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে পুরো রুম কাঁপিয়ে তুলল। তৌহিদের সাথে সাথে সেই পাশবিক হাসিতে যোগ দিল রৌশনারা বেগম আর খলিল তৃণা কেবল অসহায় চোখে চেয়ে।
​তৌহিদ হাসতে হাসতেই তৃণার একদম সামনে এসে মেঝেতে বসল। তৃণার বিধ্বস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে তার চোখের মণি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। তৃণার ঠোঁট কেটে র’ক্ত ঝরছে, কপাল থেকেও তাজা র’ক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ছে। তৃণার এই র’ক্তা’ক্ত অবস্থা দেখে তৌহিদ হঠাৎ হিংস্র বাঘের মতো গর্জে উঠে খলিল আর রৌশনারা বেগমের দিকে তাকাল। ​সে চিৎকার করে ঘর কাঁপিয়ে বলল,
“তোমাদের সাহস কী করে হলো ওর গায়ে হাত তোলার? আমি কি তোমাদের বলেছিলাম আমার তৃণার গায়ে কোনো আঘাত করতে? আমি ওকে অক্ষত অবস্থায় চেয়েছিলাম!”

​তৌহিদের সেই ভয়ংকর চিৎকারে খলিল আর রৌশনারা দুজনেই ভয়ে কেঁপে উঠলেন। তারা তৌহিদের এই উন্মাদনা দেখে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেন। তৌহিদ পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “কাজীকে খবর দিয়েছিলে তো?”

​‘কাজী’ শব্দটা শোনামাত্র তৃণার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে বড় বড় চোখ করে বিস্ময় আর আতঙ্কে বলে উঠল, “কাজী? কিসের কাজী? কেন ডাকছেন তাকে?”
​তৌহিদ তৃণার কোনো কথার উত্তর দিল না। তার নীরবতা যেন আরও বেশি ভয়ংকর। ওদিকে খলিল আর রৌশনারা বেগম যেন অবাক হওয়ার শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছেন। খলিল তোতলাতে তোতলাতে বলে উঠলেন,
“এসব কী বলছিস তৌহিদ? এখন কাজি দিয়ে কী কাজ? আমাদের তো এখান থেকে দ্রুত সরতে হবে!”

​তৌহিদ তৃণার চোখের দিকে তার সম্মোহনী অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ঘোষণা করল, “কাজ কী মানে? বিয়ে করব তৃণাকে, এই মুহূর্তেই। ও আজ এই ঘর থেকে তৌহিদের স্ত্রী হয়েই বের হবে।”

রৌশনারা বেগম যেন নিজের কানেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তৌহিদের কথা। তিনি তীব্র বিস্ময় আর বিরক্তি নিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
“তৌহিদ, তুই কি সত্যি পাগল হয়েছিস? এই মেয়েকে কেন বিয়ে করতে যাবি এখন? তুই তো কেবল আমাদের কথামতো তৃণার সাথে ভালোবাসার নাটক করছিলি। কিন্তু তৃণা তোকে কোনোদিন ভালোবাসতে চায়নি, তাই তো আমাদের সেই সাজানো প্ল্যান ভেস্তে গেল!”

​তৃণা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে রৌশনারার দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি কীভাবে এমন এক জঘন্য ষড়যন্ত্রের প্রধান কারিগর হতে পারেন, তা তার কল্পনাতেও ছিল না। অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণার মাঝেও সে কেবল অশ্রুজল নয়নে ফ্যালফ্যাল করে এই নোংরা খেলার দিকে তাকিয়ে রইল।
​তৌহিদ এবার ধীরগতিতে তৃণার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত উন্মাদের মতো জেদ। তৃণা ভয়ে আর ঘৃণায় কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের সাথে মিশে গেল। তৌহিদ ভাঙা অথচ গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করল,
“তৃণা, তুমি আমাকে ভুল বুঝো না। বাবা আর ফুপির কথাগুলো সবটা সত্যি নয়। আমি তোমাকে সব খুলে বলছি। তোমার বাবার সব সম্পত্তি নিজেদের নামে নেওয়ার জন্য আমরা প্ল্যান করেছিলাম তোমাকে আমার প্রেমের জালে ফাঁসাব। কিন্তু তুমি আমার প্রেমে পড়লে না, আমাকে ভালোও বাসলে না।”
​তৌহিদ এক মুহূর্ত থামল, তার চোখে তখন এক হিংস্র আক্ষেপ ফুটে উঠল। সে আবার বলল, “তারপর দুর্ভাগ্যবশত ওই আরিয়ানের সাথে তোমার বিয়ে হয়ে গেল। তারপরও আমি দমে যাইনি। আমি ভেবেছিলাম তোমাকে আরিয়ানের থেকে আলাদা করে ছিনিয়ে এনে বিয়ে করব, কিন্তু তাও সম্ভব হলো না। তবে জানো তৃণা, এই ভালোবাসার নাটক করতে করতে আমি কখন যে সত্যিই তোমার প্রেমে পড়ে গেছি, আমি নিজেও জানি না। তাই এই মুহূর্তে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি দুনিয়া যেদিকেই যাক, আজ আমি তোমাকেই বিয়ে করব।”

​তৃণা নিজের শরীরের শেষ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু অনাহার আর অমানুষিক নির্যাতনের কারণে সেই চিৎকার ভীষণ ক্ষীণ আর করুণ শোনাল। সে ধুঁকতে ধুঁকতে বলল, “অসম্ভব! আপনাকে বিয়ে করা কোনোদিন সম্ভব নয়। আমি বিবাহিত, আরিয়ান আমার স্বামী!”

​ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা রৌশনারা বেগম এক চরম সত্য ফাঁস করে দিলেন। তিনি তীক্ষ্ণ স্বরে তৌহিদকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,
“তুই ভুল করছিস তৌহিদ! এই মেয়েকে নিয়ে কী করবি? তৃণা প্রেগন্যান্ট!”

​তৌহিদ যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার পুরো শরীর মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল। পরক্ষণেই সে এক হিংস্র পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তৃণার মুখটা দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখদুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“তৃণা, আমার তৃণা, জান আমার! সত্যিই কি তুমি প্রেগন্যান্ট? ফুপি যা বলছে তা কি সত্যি? আমি কিছুতেই বিশ্বাস করি না!”

​তৃণা ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল, তার পেটের ভেতর এক অসহ্য মোচড় অনুভব করছিল সে। সে কাঁদতে কাঁদতে আকুতি করল,
“প্লিজ… আল্লাহর দোহাই লাগে আমাকে যেতে দিন। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। এভাবে করলে আমার গর্ভের বাচ্চার ক্ষতি হয়ে যাবে!”

​তৌহিদ যেন থমকে গেল। সে তৃণার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে অস্ফুট স্বরে আবারও জিজ্ঞেস করল,
“তার মানে সত্যিই তুমি গর্ভবতী? আরিয়ানের সন্তান তোমার গর্ভে?”

​তৃণা যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে অসহায়ভাবে শুধু উপর-নিচ মাথা নাড়াল।
তৌহিদ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তৃণার দিকে তাকিয়ে রইল। তার পাথরের মতো স্থির দৃষ্টি দেখে তৃণার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। হঠাৎ তৌহিদের ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। সে খুব শান্ত গলায় বলে উঠল,
​“তোমার পেটের বাচ্চাকে আমি মারব না তৃণা। আমি এতটাও পাষাণ না। আসলে আমি তো তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি, তাই তোমার ওপর এতটা নির্দয় হতে পারছি না।”

​তৌহিদের মুখে এই কথা শুনে তৃণা যেন মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির দেখা পেল। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে ভাবল, তৌহিদের ভেতরে হয়তো এখনো সামান্য মনুষ্যত্ব বাকি আছে। সে খুব মিনতি ভরা কণ্ঠে বলল,
“তাহলে দয়া করে আমাকে যেতে দিন। আমাকে আমার স্বামীর কাছে ফিরে যেতে দিন।”

​তৃণার কথা শেষ হতেই তৌহিদ পশুর মতো ক্ষিপ্রতায় ওর একদম কাছে সরে এল। তৃণার কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে পৈশাচিক স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,
“বাসর রাতে তোমার পেটের সন্তান এমনিতেই নষ্ট হয়ে যাবে মেরি জান। তখন আর তোমার শরীরে ওই আরিয়ানের কোনো চিহ্ন বাকি থাকবে না।”

​তৃণা এক মুহূর্তেই জমে বরফ হয়ে গেল। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। আতঙ্কে মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না, কেবল দুচোখ বেয়ে নোনা জলের ধারা নামছে। তৌহিদ ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। খলিল দিকে তাকিয়ে কর্কশ স্বরে বলল,
​“কী বলছি কানে যাচ্ছে না বাবা? আমি যা বলি তা-ই করি। এখনই কাজীকে আসতে বলো!”

​খলিল কিছুটা শঙ্কিত হয়ে বললেন,
“তৌহিদ, তুই এটা ঠিক করছিস না। এই অবস্থায় বিয়ে করলে বড় ঝামেলায় পড়বি তুই। পুলিশ আমাদের হদিস পেয়ে যাবে।”

​তৌহিদ সপাটে হাত ঝামটা দিয়ে বলল, “তোমাদের সম্পত্তি দরকার, সেটা তোমরা পেয়ে যাবে। আমি তৃণাকে বিয়ে করে আজ রাতের মাঝেই দেশ ছাড়ব, বুঝতে পারলে? কেউ আমাদের নাগাল পাবে না।”

​তৃণা নিজের শেষ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে আবারও চিৎকার করে উঠল, “এটা ঠিক করছো না তোমরা! আরিয়ান তোমাদের কাউকে আস্ত রাখবে না। আল্লাহর দোহাই লাগে, আমাকে যেতে দাও! আমার বাচ্চার ক্ষতি করো না!”

​তৌহিদ এবার আর কোনো কথা শোনার ধার ধারল না। সে কর্কশভাবে তৃণার দুই হাত টেনে ধরে শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল। তৃণার দুর্বল শরীর সেই অমানুষিক শক্তির সামনে হার মানল। এরপর একটা নোংরা কাপড় দিয়ে তৃণার মুখটা শক্ত করে বেঁধে দিল তৌহিদ।

★★★
মির্জা বাড়ির ড্রয়িংরুমে তখন শ্মশানের নীরবতা। চারিদিকের বাতাস যেন ভারী হয়ে আছে। প্রত্যেকের মুখে উৎকণ্ঠা আর আশঙ্কার কালো ছায়া। তৃণা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই বাড়ির প্রতিটি মানুষ যেন পাথর হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে, তারা চারপাশের রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছেন।
​ঠিক সেই মুহূর্তে ঝড়ের বেগে মির্জা বাড়িতে এসে উপস্থিত হলো রিনি। মেয়েটার চোখের জল থামছেই না, চেহারায় রাজ্যের দুশ্চিন্তা আর অপরাধবোধের ছাপ স্পষ্ট। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেল তূর্ণা রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ একটি কালো গাড়ি এসে তার সামনে থামল। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ি থেকে তিনজন লোক বেরিয়ে এসে তৃণার মুখে রুমাল চেপে ধরল এবং নিথর তূর্ণাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে নিমেষেই অদৃশ্য হয়ে গেল।
​এই দৃশ্য দেখার পর মির্জা বাড়ির সবার বুক কেঁপে উঠল। আরিয়ান যেন হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না, কেবল দুচোখ দিয়ে আগুনের ফুলকি ঝরছে। গাড়ির নম্বর প্লেটটা কায়দা করে ঢেকে রাখা হয়েছে, তাই পুলিশও কোনো কূল-কিনারা করতে পারছে না।
​ঠিক তখন রিনি কাঁপাকাঁপা গলায় সিসিটিভির স্ক্রিনের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলে উঠল, “আমি এই গাড়িটা চিনি!”
​রিনির কথা শোনামাত্র ঘরের সবাই একযোগে তার দিকে তাকাল। আরিয়ান পাগলের মতো রিনির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর দুকাঁধ শক্ত করে চেপে ধরে ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করল, “কার গাড়ি এটা রিনি? জলদি বল, কার গাড়ি এটা?”

​রিনি বলল, “এটা আমার মামার গাড়ি। খলিল মামার গাড়ি।”
​রিনির কথাটি শোনার পর মুহূর্তের জন্য পুরো বাড়ি স্তব্ধ হয়ে গেল। সবার চোখের সামনে যেন এক ভয়ংকর সত্য উন্মোচিত হলো। খলিল হাওলাদার আর রৌশনারা বেগম!
★★★
তৃণাকে একটা জরাজীর্ণ চেয়ারের সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার হাত-পাগুলো দড়ির বাঁধনে নীল হয়ে আছে। অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা আর মানসিক আতঙ্কে তৃণা নিজের চোখ দুটো খুলে রাখতে পারছে না, বারবার চেতনা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। তবুও সে অবচেতনে অনুভব করার চেষ্টা করছে তার পেটের ভেতর বেড়ে ওঠা সেই ছোট্ট অস্তিত্বকে তার আর আরিয়ানের ভালোবাসার শেষ চিহ্ন।
​সামনে তৌহিদ এক পৈশাচিক শান্তিতে বসে আছে। এর মধ্যেই ঘরে প্রবেশ করেছেন একজন বৃদ্ধ কাজী সাহেব। তার ভীত-সন্ত্রস্ত মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, তাকে জোর করে তুলে আনা হয়েছে। তৃণা শেষবারের মতো আকুতি জানিয়ে কাঁপা গলায় বলল, “আমি অন্তঃসত্ত্বা! আল্লাহর দোহাই লাগে এসব করবেন না। দয়া করুন আমাকে!”

​কাজী সাহেব তৌহিদের দিকে ফিরে করুণ স্বরে বললেন,
“বাবা তৌহিদ, তুমি এসব ঠিক করছো না। এই বিয়ে তো শরীয়ত মতে জায়েজ হবে না। আমি এই বিয়ে দিতে পারব না।”
​কাজী সাহেবের কথা শেষ হওয়ার আগেই তৌহিদ তার পকেট থেকে চকচকে রিভলবারটা বের করল। এক মুহূর্ত দেরি না করে সেটা কাজীর কপালে ঠেকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল, “বিয়ে করাবি নাকি মরবি, সেটা তোর সিদ্ধান্ত। আমার সময় খুব কম!”

​খলিল আর রৌশনারা বেগম তৌহিদকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তৌহিদ এখন হিতাহিতজ্ঞানশূন্য। রৌশনারা বেগম ভয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন,
“ভাইজান, তোমার ছেলে যা করছে সেটা নির্ঘাত পাগলামো! আমরা সবাই ধরা পড়ব, দেখে নিও।”
খলিল কেবল নিজের কপালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন, নিজের সাজানো ছক যে এভাবে বুমেরাং হয়ে আসবে, তা তিনি ভাবেননি।

​মৃত্যুর ভয়ে কাজী সাহেব কাঁপতে কাঁপতে বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন। যখন তৃণাকে ‘কবুল’ বলার জন্য চাপ দেওয়া হলো, তখন তৃণা তার শরীরের অবশিষ্ট সমস্ত শক্তি এক করে চিৎকার করে উঠল, “জীবন থাকতে আমি কবুল বলব না! আমি আমার সব সম্পত্তি তোমাদের নামে লিখে দিচ্ছি, যা চাও তা-ই নাও। শুধু আমাকে এখান থেকে ছেড়ে দাও!”

​তৌহিদ এবার আদুরে গলায় বলল,
“দেখো তৃণা জান আমার, জিদ করো না। বিয়েটা করে নাও। কথা দিচ্ছি আরিয়ানের চেয়েও বেশি ভালোবাসব তোমায়।”

​তৃণা ঘৃণায় তৌহিদের চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে বলল, “আমি শুধু আমার রাগী সাহেবকেই ভালোবাসি। আপনাদের মতো জানোয়ারকে নয়!”
​রাগী সাহেব নামটা শোনামাত্র তৌহিদের মাথার রক্ত চড়ে গেল। সে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পশুর মতো গর্জে
উঠে রিভলবারটা তৃণার কপালে সজোরে ঠেকাল।
রৌশনারা বেগম আর খলিল হাওলাদার এখন আতঙ্কে দিশেহারা। তৌহিদের উন্মাদনা দেখে তাদের বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে। তৌহিদ এখন পুরোই হিতাহিতজ্ঞানশূন্য, সে ঝাপটা মেরে তৃণার পেছনের দিকে গিয়ে ওর চুলের মুঠি শক্ত করে টেনে ধরল। তৃণা ব্যথায় ককিয়ে উঠল, কিন্তু সেই চাপা আর্তনাদ শোনার মতো কোনো মানুষ সেখানে নেই। তৌহিদ দাঁতে দাঁত চেপে তৃণার মুখের একদম কাছে নিজের বিষাক্ত নিশ্বাস ফেলে হিসহিসিয়ে বলল,
​“তোরে ভালোবাসি বলে আজও জানটা রেখেছি, নাহলে কবেই তোরে মে’রে এই মাটির নিচেই চাপা দিয়ে দিতাম!”
​বলেই চুলের মুঠিতে এক প্রবল হ্যাঁচকা টান দিয়ে তৃণাকে ছেড়ে দিল সে। তৃণা সামলাতে না পেরে চেয়ারসহ উল্টে সজোরে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। মাথার ক্ষতটা আবার ফেটে রক্ত ঝরতে শুরু করেছে। তৃণার এখন আর চিৎকার করার মতো সামান্য শক্তিটুকুও নেই, কেবল এক অসহ্য যন্ত্রণায় সে জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। তার সেই হাপর টানা নিশ্বাসের শব্দই যেন ঘরের ভারী নীরবতাকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে।
​ঠিক সেই মুহূর্তে রাতের নিস্তব্ধতা চিরে বাইরে থেকে পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ ভেসে এল। নীল-লাল আলোর ঝিলিক জানলার কাঁচ ভেদ করে অন্ধকার ঘরে আছড়ে পড়ছে।
​রৌশনারা বেগম আর খলিল শোনামাত্রই থরথর করে কাঁপতে শুরু করলেন। রৌশনারা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “ভাইজান, পুলিশ এসে গেছে! এখন কী হবে? আমরা তো শেষ!”

​তৌহিদ পুলিশের গাড়ির শব্দ শুনে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তৌহিদ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক কী ঘটছে, তা বুঝে ওঠার আগেই সশব্দে দরজা ভেঙে ভেতরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল পুলিশ বাহিনী। আর তাদের সাথেই ঝড়ের বেগে ঢুকল আরিয়ান।
​ঘরের মেঝেতে র’ক্তাক্ত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় তৃণাকে পড়ে থাকতে দেখেই আরিয়ানের বুকের ভেতরটা যেন আছড়ে পড়ল। সে পাগলের মতো দৌড়ে গিয়ে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে তৃণাকে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তৃণার কাটা ঠোঁট থেকে তখনো তাজা রক্ত ঝরছে। শাড়ির নিচের অংশে লাল রক্তের গাঢ় ছোপ। তৃণা অতি কষ্টে তার ক্ষীণ ও ঝাপসা দৃষ্টি মেলে আরিয়ানের দিকে তাকাল। আরিয়ান নিজের সবটুকু আবেগ দিয়ে তৃণাকে পাঁজরের সাথে পিষে ধরে আর্তনাদ করে উঠল,
​“শ্যামলিনী!”
​“রাগী সাহেব… আমাদের সন্তান…” তৃণা নিজের পেটের ওপর হাত রেখে কাঁপা কাঁপা গলায় অস্ফুট স্বরে কথাটা বলল।

​কথাটা আরিয়ানের কানে পৌঁছাতেই সে যেন পাথর হয়ে গেল। সে বাবা হতে চলেছে! এই চরম সত্যটা এই ভয়ংকর মুহূর্তে তাকে আনন্দ দেবে নাকি প্রিয়তমার এই মুমূর্ষু অবস্থা দেখে বুক ফেটে যাবে, সেটুকু ভাবার বা বোঝার ক্ষমতাও তার এখন নেই। তৃণা তার রক্তমাখা দুর্বল হাতটা আরিয়ানের গালের ওপর রেখে শেষ মিনতি করে বলল,
​“বাঁচান… আমাদের সন্তানকে বাঁচান…”
​বলেই তৃণার হাতের শেষ শক্তিটুকু যেন শূন্যে মিলিয়ে গেল। হাতটা খসে পড়ল আরিয়ানের গাল থেকে, আর পুরো শরীরটা নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়ল আরিয়ানের বুকের ওপর। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল।
​আরিয়ানের মাথাটা তখন বনবন করে ঘুরছে। নিজের জগতটাকে এভাবে নিস্তেজ হয়ে যেতে দেখে সে তৃণাকে আঁকড়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার সেই বুকফাটা কান্নায় ঘরের ভারী বাতাসও যেন কেঁপে উঠল। এক পর্যায়ে নিজেকে সামলে নিয়ে সে তৃণাকে দুই হাতে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু সামনের দিকে এক পা-ও বাড়াতে পারছে না সে। পুরো দুনিয়াটা যেন তার চোখের সামনে টলমল করছে। তবুও নিজের অস্তিত্বকে বাঁচাতে আরিয়ান তার টলমলে, আঁকাবাঁকা পায়ে তৃণাকে বুকে চেপে ধরে সেই নরক থেকে বেরিয়ে গেল।

চলবে….

Share On:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 


0 Responses

Leave a Reply