ইশরাতজাহানজেরিন
পর্ব_১৭
রাতে আরযান বাড়ি ফিরতেই বাড়ির পরিবেশ বদলে গেল। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে গোল হয়ে বসানো চেয়ারগুলো। একেবারে বিচার সভার মতো। আলোটা ইচ্ছে করেই কম রাখা হয়েছে, যেন প্রতিটা মুখের ছায়া আরও গাঢ় হয়। দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও আজ অস্বাভাবিকভাবে জোরে শোনা যাচ্ছে।
পুরুষেরা একে একে উঠে দাঁড়িয়েছে। এখন এই ঘরে শুধু রয়ে গেছে মহিলারা। হাফসা বেগমের ঠোঁট শক্ত করে চেপে আছে, চোখে একরাশ অবদমন। ইলমা হোসাইনের মুখে তাচ্ছিল্যের ছাপ, যেন সব জানে, সব বোঝে। নাজিরা ওয়ালেদের দৃষ্টি স্থির। সাইরা শেখ চুপচাপ। লোক বাড়ির ছেলে তার মা-চাচিদের নিয়ে বিচার সভায় বসে? আর এই বাড়ির কর্তাগুলোও এক একটা। একটু বউদের পাশে থাকবে। না ওরা সব ভেগেছে। এখন আরযানের বয়ান তাদেরকেই শুনতে হবে। আর তাজ টাও না। একটু না হয় সবাই তার ঘরের সামনে উঁকি দিয়েছিল। তাই বলে আরযান বাড়ি আসতে না আসতেই কথা লাগিয়ে দিবে? ছেলেটা এত কুটনিগিরি কথা থেকে শিখল? সকলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সাঁঝ। তার পাশেই তার দাদা, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু চোখের ভেতরটা কাঁপছে।
কারণ সে জানে আজকের বিচারটা শুধু নিয়মের নয়, সম্পর্কেরও। চিকুও সাঁঝের কাঁধে গুটিসুটি মেরে বসে আছে, মাঝে মাঝে কুঁকড়ে উঠছে। যেন সে-ও বুঝতে পারছে, আজ কিছু একটা ভীষণ খারাপ হতে চলেছে।
হঠাৎ তাজ ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এল। তার উপস্থিতিতেই যেন পুরো ঘরটা থমকে গেল।
“আজকের বিচার,” সে থামল, চারপাশে তাকাল,
“শুধু ভুলের না… বিশ্বাসঘাতকতার। এমা তোমাদের লজ্জা সরম কিংবা কমসেন্স বলতে কিছু নেই? ওই মেয়েটা আমার আন্ডারে কাজ করে। এখন কি ভাববে?”
সাঁঝ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার আঙুলগুলো একে অপরকে এমনভাবে চেপে ধরেছে, যেন নিজেরই ব্যথা সহ্য করছে। নাজিরা ওয়ালেদ গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “তা আমরা কি আর এমনি এমনি উঁকি মারি? পরিস্থিতি এমন ছিল উঁকি না মেরে উপায় ছিল না!”
ইলমা হোসাইন সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল, “হ্যাঁ, দরজা বন্ধ, ভিতরে ফিসফাস… আমরা তো ভেবেছি… ছেলে বুঝি প্রেম করছে! এই বয়সে না করলে কবে করবে?”
হাফসা বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন, “আমি তো প্রথমেই বলছিলাম। এই আমাদের রাত চুপচাপ টাইপ, এদেরই নাকি বেশি গোলমাল থাকে!”
সাইরা শেখ ধীরে ধীরে বলল, “আমি কিন্তু শুধু পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম… উঁকি মেরেছি একটু….মানে… খুবই সামান্য। একচোখে!”
ইলমা হোসাইন হেসে উঠল, “একচোখে না, তুমি তো পুরো শরীর ঢুকিয়ে দিয়েছিলে দরজার ফাঁকে! আমি পেছন থেকে ধাক্কা খেয়েছি!”
হাফসা বেগম তেড়ে উঠে বললেন, “এই ধাক্কা আমি দিইনি! আমি তো শুধু ব্যালান্স রাখার জন্য তোমার কাঁধে হাত রেখেছিলাম!”
নাজিরা ওয়ালেদ ঠোঁট চেপে হাসলেন, “ব্যালান্স রাখতে গিয়ে তিনজন মিলে একসাথে দরজায় লেগে গিয়েছিলে এটা কি নতুন কোনো যোগব্যায়াম?”
সাইরা শেখ একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “আমি তো ভাবছিলাম, ভিতরে হয়তো সিনেমা চলছে… তাই একটু”
“ওই ‘সিনেমা নাকি অফিসের মিটিং ছিল!” ইলমা হোসাইন চোখ ঘুরিয়ে বলল। হাফসা বেগম হঠাৎ সাঁঝের দিকে আঙুল তুলে বললেন, “সব দোষ কিন্তু এই মেয়ের! এই সাঁঝই প্রথম বলল ‘চলো দেখি কী হচ্ছে!’”
সাঁঝ মাথা তুলে অবাক হয়ে, “আমি? আমি তো খালি বলেছিলাম দরজা বন্ধ কেন।”
নাজিরা ওয়ালেদ নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন, “এই যে! দরজা কেন বন্ধ। এই প্রশ্নটাই তো সর্বনাশের মূল!”
সাইরা শেখ চাপা গলায় বলল, “আসলে… কৌতূহল একটা খারাপ জিনিস…”
ইলমা হোসাইন সঙ্গে সঙ্গে, “কিন্তু মজার জিনিসও!”
চিকু হঠাৎ “চিক চিক” করে উঠতেই হাফসা বেগম বললেন, “দেখো, পাখিটাও জানে। আজকে বড় অন্যায় হয়ে গেছে!”
সাঁঝ ফিসফিস করে বলল, “চিকুও এখন আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে বুঝি…” ঠিক তখনই আরযান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। মুখটা একদম গম্ভীর। সবাই চুপ।
সে চারপাশে তাকিয়ে বলল, “তো… সবাই নিজের নিজের দোষ স্বীকার করেছ?”
সবাই একসাথে মাথা নেড়ে। “হ্যাঁ… মানে… একটু-আধটু…”
আরযান ধীরে ধীরে সাঁঝের সামনে এসে দাঁড়াল।
সাঁঝের বুক ধকধক করছে। “তাহলে শাস্তি ঘোষণা করছি…” সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে।
আরযান গম্ভীর মুখে বলল, “এই পুরো ঘটনার মূল হোতা…. সাঁঝ।”
সাঁঝ হতবাক, “আমি আবার কিভাবে?!”
“কারণ,” আরযান যুক্তি দিল, “তুই প্রশ্ন করেছিস —
‘দরজা কেন বন্ধ?’ এই প্রশ্ন না করলে কেউ উঁকি মারত না। অতএব… রুট কজ তুই।”
ইলমা হোসাইন ফিসফিস করে, “ওহহ… কী লজিক!”
নাজিরা ওয়ালেদ মাথা নেড়ে, “এই ছেলের বিচারক হওয়া দরকার ছিল!”
আরযান আবার বলল, “শাস্তি…..আগামী তিনদিন সাঁঝ সবার জন্য চা বানাবে। আর… কারো রুমের সামনে দিয়ে গেলে চোখ বন্ধ করে যাবে।”
সাইরা শেখ হেসে ফেলল, “চোখ বন্ধ করে হাঁটলে আবার দরজায় ধাক্কা খাবে না তো?”
হাফসা বেগম গম্ভীর মুখে বললেন, “তা হলেও শাস্তি কম না!”
সাঁঝ মুখ কুঁচকে, “মানে সবাই মিলে উঁকি মারবে, আর শাস্তি শুধু আমি পাব?!”
ইলমা হোসাইন কাঁধে হাত রেখে বলল, “বাবু, এই বাড়িতে একটা কথা মনে রাখো যে দোষ করে না, শাস্তিটা সে-ই পায়!”
চিকু আবার “চিক” করে উঠতেই নাজিরা ওয়ালেদ হেসে বললেন, “দেখো, চিকুও একমত!”
সাঁঝ অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল…
আর বাকিরা হেসে লুটোপুটি। যাক ছেলের হাত থেকে মা-চাচিরা শাস্তি পাবে বিষয়টা কেমন যেন দেখায়। এর থেকে সাঁঝকে দিয়ে ম্যানেজ করা যায়। আর এমনিতেও সাঁঝের আবার আরযানের হাতের মার আর শাস্তি খাওয়ার ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা আছে। হাসির রেশটা তখনও ঘরের বাতাসে ঝুলে আছে। সাঁঝ দাঁড়িয়ে। মুখ গোমড়া, চোখে স্পষ্ট প্রতিবাদ জমে উঠছে। কিন্তু এই বাড়িতে প্রতিবাদ মানেই নতুন বিপদ এটা সে ভালো করেই জানে। তবুও থামতে পারল না।
সাঁঝ হঠাৎ মুখ তুলে বলল, “আচ্ছা… আমি একাই সব করলাম? দাদা তো ছিল! উনি কি ফুল তুলতে গিয়েছিল নাকি?” ঘরটা মুহূর্তেই চুপ। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দাদা গলা খাঁকারি দিল, “এই… আমি তো আসলে… মানে… আমি তো ওদের থামাতেই গেছিলাম। ”
ইলমা হোসাইন সঙ্গে সঙ্গে, “হ্যাঁ হ্যাঁ! থামাতে গিয়েই আগে উঁকি দিলেন, তাই না?”
সাইরা শেখ চাপা হেসে বলল, “থামানোর আগে একটু দেখে নেওয়া জরুরি ছিল কি থামাচ্ছেন!”
নাজিরা ওয়ালেদ মুচকি হেসে বললেন, “দেখে না থামালে তো ঠিকভাবে থামানো যায় না। এটা নতুন থিওরি!”
দাদা অসহায়ের মতো বলল, “আমি কিন্তু কাউরে ধাক্কা দিইনি! আমি দূরে ছিলাম!”
হাফসা বেগম ভ্রু তুলে, “দূরে ছিলেন? দরজার ফাঁকে আপনার নাকটা কে ঢুকিয়েছিল?”
ঘরে আবার হাসির ঢেউ উঠতেই হঠাৎ সেই হাসি থেমে গেল। কারণ আরযান ধীরে ধীরে মাথা তুলেছে।
তার চোখ দুটো সরাসরি গিয়ে পড়ল সাঁঝের ওপর।
“মানে?”
সাঁঝ গিলল, কিন্তু এবার পিছু হটার উপায় নেই, “মানে… দাদা তো ছিলই। তাহলে শাস্তি শুধু আমি পাব কেন?”
দাদা দ্রুত বললেন, “না না, আমি কিছুই করি নাই! আমি নির্দোষ!”
“ওহ, নির্দোষ!” ইলমা হোসাইন ফিসফিস করে হাসলেন।
আরযান এবার এক পা এগিয়ে এল। “ঠিক আছে…”
সে ধীরে ধীরে বলল, “তুই দাদার কথা তুলেছিস?”
সাঁঝ কিছু বলার আগেই আরযান দাদার দিকে তাকাল।
দাদা সঙ্গে সঙ্গে বুক সোজা করে দাঁড়াল, “আমি কিন্তু কিছুই করি নাই।” আরযান আবার সাঁঝের দিকে ফিরল। “তাহলে শোন….. নতুন সিদ্ধান্ত। দাদার ভাগের শাস্তিটাও এখন তোর…” সে থামল, একটু ঝুঁকে এল সাঁঝের দিকে। “তুই পাবি শাস্তি।”
“কি?!”সাঁঝ প্রায় চিৎকার করে উঠল।
ইলমা হোসাইন মুখ চেপে হাসছে, “গেল… পুরো গেল!”
সাইরা শেখ ফিসফিস করলেন, “দোষ না করেও ডাবল শাস্তি এই বাড়ির ট্র্যাডিশন!”
নাজিরা ওয়ালেদ মাথা নেড়লেম, “এই মেয়ে না, জন্মগতভাবেই বিপদে পড়ে!”
সাঁঝ এবার সত্যি রেগে গিয়ে বলল, “এটা অন্যায়! পুরো অন্যায়!” আরযান একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল।
দুজনের মাঝখানে এক ইঞ্চি দূরত্ব। “অন্যায়?”
সাঁঝ একটু পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু পা যেন মেঝেতে আটকে গেছে। আরযান ধীরে ধীরে বলল,
“তোর শাস্তি এখন আরো বাড়ল।”
সাঁঝের গলা শুকিয়ে গেল,
“আরো?!”
“হ্যাঁ…”
সে সোজা হয়ে দাঁড়াল, গলা শক্ত করে বলল,
“এখনি… আমার রুমে আয়।”
ইলমা হোসাইন চোখ বড় বড় করলেন, “শেষ! আজকে এই মেয়ের আর রক্ষা নাই!”
সাইরা শেখ বললেন, “চা বানানোতে শেষ হয়নি এবার প্র্যাকটিক্যাল শুরু!”
হাফসা বেগম মুখ গম্ভীর করে থাকলেও ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি, “যা, শিক্ষা হয়ে যাবে।”
দাদা ধীরে ধীরে সাঁঝের কানে বলল, “তুই যাস… পরে এসে আমাকে জানাস কী হয়…”
সাঁঝ চোখ বড় বড় করে তাকাল, “তুমি আসবে না?!”
দাদা সঙ্গে সঙ্গে এক কদম পিছিয়ে, “আমি? আমি তো নির্দোষ!”
চলবে?
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪+৫
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪১
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৩
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৪
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪০ ( প্রথম অর্ধেক+শেষ অর্ধেক)
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৬
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৩+২৪
-
পরগাছা পর্ব ৮