.বজ্রমেঘ পর্ব ৩৪
ফাবিয়াহ্_মমো .
- হাতের ক্ষত যেভাবে সারিয়ে দিচ্ছ, সেভাবে আমাকেও সারিয়ে দাও। যেখানে তুমি আছ এখন, সেখানে শান্তি ছড়িয়ে দাও।
শব্দের রেশে চোখ বুজে ফেলেছে শাওলিন। তাকায়নি একবারও। অনুভব করতে পারছে বেপরোয়া নিঃশ্বাস। ক্ষণে ক্ষণে ছুঁয়ে যাচ্ছে কানের কাছ। বলশালী হাতের রুক্ষ থাবায় প্রচণ্ড আঁটো অনুভূত হচ্ছে কোমরের ডানপাশে। কিন্তু হাতটা সরিয়ে দেবার আকাঙ্ক্ষাটুকু কেন যেন হলো না। পৌরুষ-তপ্ত হাতের ওপর নিজের কোমল হাত বসিয়ে মৃদু গলায় বলল,
- হাতে ব্যথা আপনার। কাঁটা জায়গাটা ফুলে আছে।
এটুকুই যথেষ্ট ছিল। কানে শব্দগুলো পৌঁছুতেই সমস্ত বাঁধন ঢিলে করে দিল। যেটুকু তীব্র ভাব ধরা দিয়েছিল তা যেন নিমিষেই হাওয়া। আগের মতো কঠোরতার মুখোশে হারিয়ে গেল শোয়েব। নিজেই বসা থেকে ওঠে শাওয়ার ছেড়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। যেন তার চেহারা ও চাহনি শাওলিন না দেখতে পাক। দোনোমনা অবস্থা নিয়ে শাওলিন উচ্ছিষ্ট তুলোগুলো বিনে ফেলতে থাকে। কিন্তু আড়চোখে দেখতে থাকে মানুষটার গতিবিধি। সে নীরব হয়ে কৃত্রিম ঝর্ণায় ভিজছে। একটা হাত দেয়ালে রাখা। মাথা কিঞ্চিত ঝুঁকানো, চুল গড়িয়ে কপাল চুয়ানো পানিটা লম্বা হয়ে পড়ছে। কিছু হয়েছে অবশ্যই। ফেরার পর থেকেই চোখদুটো নিষ্প্রাণ। ওই অদ্ভুত সুন্দর তারা দুটো ওকে কিছু বুঝতে দিচ্ছে না। কী ভেবে কাঁচের কেবিনেট খুলে বডিওয়াশ, জেন্টস শ্যাম্পু, নরম লুফাহ্ বের করে নিল। বুকের ভেতর যে সংকোচের দানা কাঁটার মতো অস্বস্তি দিচ্ছিল, তা কাটিয়ে ওঠে পা বাড়াল তার কাছে। ইঙ্গিতপূর্ণ কাশি দিয়ে বলল,
- সাবান মাখানোর জন্য এদিকে ঘুরতে হবে। ঘুরবেন একটু?
চোখ খুলে দেয়াল থেকে হাত নামাল শোয়েব। ডানে তাকিয়ে ওর নিষ্পাপ মুখটায় তাকাল। সাদা স্যাটিনের শাড়ি ওর গায়ে, ছোটো হাতায় গাঢ় নীল ব্লাউজ, চুলগুলো খোঁপা থেকে মুক্ত হতে চাইছে, কোমল গলার যে পাশে ছোট্ট একখানি তিল, সেখানে কালি মেখে আছে। শোয়েব ওর কথামতো ঘুরে দাঁড়াল। শাওয়ার নবটা বন্ধ করে দিয়েছে। লুফায় সাবান মাখিয়ে ফেনা তুলে শাওলিনও চুপচাপ তার সারা গায়ে মাখিয়ে দিল। কিন্তু বিপত্তি দেখা দিল তার উচ্চতায়। এ পর্যন্ত মুখটা উঁচু করে তালগাছ সম উচ্চদেহী পুরুষটাকে দেখতে হতো ওর। এখনো যে খুব আরামে কাজ করছে তা নয়। ঘাড় ও গলায় হাত উঁচু করেই সাবান মাখাতে হচ্ছে। কিন্তু এখন আরো উঁচুতে হাত উঠাতে দুপায়ের ভরও কুলাবে না। বাধ্য হয়ে ব্যাপারটা মুখেই বলল শাওলিন,
- মাথা নোয়ানো যায়?
প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখতে পেল। মাথা নুইয়ে দিয়েছে শোয়েব। ওর উচ্চতা বরাবর নিজের ঘাড়কে নত করা তার। ব্যাপারটায় অদ্ভুত অনুভূতি টের পেল শাওলিন। কিছু না বলে এই প্রথম তার মাথাটা দুহাতে স্পর্শ করল। জানে না কেন হঠাৎ প্রশ্নটা করে ওঠে ও,
- আপনি সেদিন কোথায় ছিলেন?
চোখ বুজে উত্তর করে শোয়েব,
- কোন দিন?
- ধানমণ্ডিতে ফিরলেন না যেদিন।
হাত উঁচু করে পায়ের পাতায় ভর করে দাঁড়িয়েছিল শাওলিন। কোমরের কাছে গোঁজা আঁচল ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল নেই ওর। উঁচু হওয়ায় ব্লাউজের প্রান্ত উপরে উঠে যাচ্ছে, অনাবৃত হয়ে যাচ্ছে পেলব পেট। ক্ষণিকের জন্য চোখ খুলেছিল শোয়েব, তাতেই নিচু করা মাথায় ব্যাপারটা দেখতে পেল সে। অন্যদিকে শাওলিন চুলে আঙুল চালনা করতেই বলল,
- বিধ্বস্ত চেহারায় ফিরেছিলেন। মনে হচ্ছিল না স্বাভাবিক কাজে —
হঠাৎ কথা আঁটকে গেল। শাওলিন কী যেন আঁচ করে মাথাটা ধীরে ধীরে নিচু করল। চোখদুটো যখন নিজের দেহে পড়ল, স্পষ্ট দেখতে পেল ওই হাতদুটো ভয়ংকর কাজ করছে। সাদা শাড়িটা একপাশে সরিয়ে পেটের ডানদিকে উন্মুক্ত করেছে। শাওলিন দ্রুত বাঁধা দিতে চাইল, কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। শোয়েবের আঙুল ডেবে গেল নরম চামড়ায়, সমস্ত শরীর প্রচণ্ড শিউরে কুঁকড়ে উঠল। কানে শুনতে পেল শোয়েবের প্রশ্নবাণ,
- কীভাবে হয়েছে?
একবার নিচু চোখে তাকায় ও। ইতস্তত গলায় কিছু বলবে, তার আগেই কেউ অধৈর্য কণ্ঠে বলে উঠল,
- কীভাবে হয়েছে বলো না কেন?
এ বিষয়ে কিছু বলতে চাইছিল না। পারতপক্ষে বিষয়টা সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, যখন মায়ের আর্তমুখ ওর শিশুমনে ভয় জাগাতো। কখনো বলতে পারতো না ওই নৃশংস শব্দ কতটা লোমহর্ষক! রাতে ঘুমোতে গেলেও স্বপ্নে হানা দিতো। শোয়েব ওই মুহুর্তে এতোটাই স্তব্ধ ছিল যে, মাথা ওঠাল ওর চোখের দিকে। চুপ করে খানিক পর্যবেক্ষণ করল, ওকে দেখল, ওকে বুঝে নিল; তারপর গভীর শ্বাস ফেলে খুব হালকা গলায় বলল,
- এরকম আরো আছে?
শাওলিন স্থির চোখে মাথা ডানে-বাঁয়ে নাড়ায়। আর নেই পোড়া দাগ। শুধু এটিই। স্বস্তির চাহনি ছড়ায় নীল চোখে। মাথা নিচু করে ফরসা চামড়ায় পোড়া দাগটা ছুঁয়ে যেতে থাকে। এবার যেন চেপে থাকা আঙুল নয়, বরং নাজুক কিছুতে সাবধানে ছোঁয়া হাত। যে লোকটা দেখল, বুঝল, তারপর চুপ হয়ে গেল, সে লোকটা ওর সবটুকু নীরবতাকে চুপচাপ বুঝে নিল। শাওলিন এই প্রথম নিজ থেকে ব্যক্ত করল কিছু,
- কিছু বীভৎস দাগ। ছোটো থাকতে দাদা, আর এখন আপনি দেখছেন।
চোখ তুলে ওর দিকে তাকায় শোয়েব। কপালের ডানদিক চুয়ে শ্যাম্পুর ফেনা নামছে। ভ্রুঁর কাছে পৌঁছবে দ্রুত চোখটা বাঁচাতে হাত নামিয়ে মুছে দিল শাওলিন। কিন্তু সেসময় খেয়াল নেই শ্যাম্পু ওর হাতেই মাখা। চোখ বাঁচাতে গিয়ে চোখেই ঢুকে গেল খানিক। শোয়েব মুহূর্তেই দুচোখ খিঁচিয়ে ফেললে শাওলিন ত্রস্ত হাতে শাওয়ারটা ছেড়ে দিল। পানির ফোয়ারা থেকে বাঁচতে যখন দু পা পিছাবে, ঠিক তখনি গতি আঁটকাল শোয়েব। যে হাত ওর কোমরের একপাশ চেপে ধরেছিল, সেই হাতই বেড়িবাঁধের মতো ওকে বুকে টেনে আনলো। এক ঝর্ণার নিচে জবুথবু ভিজতে থাকা শাওলিন চোখ খুলে দেখার অবকাশ পেল না। টের পেল খোঁপাটা খুলে দেয়া হচ্ছে, সাদা শাড়িটা বাঁ কাঁধ থেকে পিনমুক্ত হয়েছে, কিছুক্ষণ পর ভেজা ফ্লোরে ঝপ করে লুটালো শাড়ির আঁচল।
.
পাহাড়ি রাত নটা। মাঝরাতের মতো ঝিঁঝিঁ পোকার স্বর চারধার থেকে মুখর। বাতাস ছুটে আসছে সদ্য সাজানো ডাইনিং টেবিলের দিকে। পরিবেশটা হইচইয়ে পূর্ণ ছিল, কিন্তু এখন গভীর নীরবতায় ঢাকা। ডিম্বাকার টেবিলের ডানদিকে পুরুষ, বাঁদিকে সমস্ত নারী বসা। দুই চাচী সবিতা ও আরিফা, দুজনের গর্ভে দুটি করে পুত্র, যারা প্রত্যেকেই শোয়েবের বয়সে বড়ো। আহসান, শাহেদ, তৌহিদ, জাবের। শোয়েবের কাছ ঘেঁষে জাবের বসা, তার পরপর তৌহিদ, শাহেদ, শেষে আহসান। টেবিলের ও-মাথায় ছোটো চাচা খালিদ মির্জা বসে আছেন। মুখে পরাক্রম গাম্ভীর্য। কাঁচা-পাকা এক মাথা চুল ছোট করে ছাঁটা, পরনে ধূসর পাঞ্জাবী-পাজামা, চেয়ারের পাশে দুটো স্ক্র্যাচ উনার পঙ্গুত্বকে ইশারা করছে। শোয়েব সদাসর্বদার মতো টেবিলের এ মাথায় শির-উচুঁ চেয়ারে বসা। তার বাঁদিকে ফাতিমা নাজ বসতেন; কিন্তু ফাতিমা নিয়ম বদলে শাওলিনকে বসিয়েওর পাশের চেয়ারে আসন গ্রহণ করেছেন। ব্যাপারটায় মুখ কালো করলেন সবিতা। নিজের ছেলে আহসান যখন সেগুফতার সঙ্গে পাশে বসতে চাইতো, তখন ফাতিমা যে অগ্নিদৃষ্টি বর্ষণ করতেন তা জীবনেও ভুলবেন না। কত বড়ো দজ্জাল হলে একচোখে দুই নীতি! আরিফা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নতুন বধূর কর্ম দেখছিলেন। তাহিয়ার সহযোগিতায় প্রত্যেকের পানির গ্লাস ভরে দিল নিজেই। অধরা ভাত বেড়ে প্লেট এগিয়ে দিচ্ছে। সেগুফতা বাবার বাড়িতে বিয়ে খেতে ব্যস্ত। সঙ্গে জুটিয়ে নিয়ে গেছে মিথিলাকেও। সবিতা সব জানা সত্ত্বেও একটা না জানার ভঙ ধরে বললেন,
- তাহিয়া কী সেগুফতার সঙ্গে কথা বলো না?
হঠাৎ চমকে ওঠে চাচী শ্বাশুড়ির দিকে চাইল। ভদ্রমহিলা ভালো করে জানে সেগুফতা তাহিয়াকে সুনজরে দেখে না। ছোটো হয়েও সেগুফতাকে যেটুকু মর্যাদা দেয়, উলটো তাচ্ছিল্য পেয়েছে সে। তাহিয়া শান্তভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়,
- বিয়ে বাড়িতে কথা বলার সময় কোথায় চাচী? ভাবী আসুক, এখানে তো সবাই আছিই। এখানেই কথাবার্তা হবে।
ভাতের পাশে মিষ্টি কুমড়ার ভাজি তুলে নেন সবিতা। ঠোঁটে ক্রুর হাসিটা ফুটল উনার,
- জায়ে জায়ে মিল থাকতে হয় বউ। নইলে কার বিপদে কার দরজায় যেতে হয় বলা যায় না।সংসারে হাঁড়ি-পাতিল একসাথে হলে শব্দ একটু হবেই। তাই বলে খোঁজখবর নিবে না এ কেমন কথা?
সবিতার কথায় বিরক্ত হলো পুরুষরা। আহসান মায়ের দিকে তাকালে কী ভেবে ছোটো ভাইয়ের দিকেও দৃকপাত করল। মুহুর্তেই শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা কনকনে স্রোত নামলো! শোয়েব ব্যগ্র বাঘের দৃষ্টিতে সবিতাকেই দেখছে। পরিস্থিতি বিপণ্ণ! থামানো দরকার! আহসান মিথ্যে হাসির জোয়ার তুলে শাহেদকে ধরতে চাইল। কিন্তু পারল না, দেরি হয়ে গেছে। শাহেদ প্রথম লোকমা মুখে দিয়েছে, তখনি গর্জন করা মেঘের মতো স্বর ভেসে এল,
- আমার সংসারে হাঁড়ি-পাতিল চলে না, চাচী। এখানে পাথরের বাসন। পাথর শব্দ করে না। শাণ বাড়ায়। পরেরবার মনে রাখবেন।
মুখের ওপর চপেটাঘাত পড়ল। মুহুর্তে তীব্র অপমানে স্থির হয়ে যান সবিতা। মিষ্টি কুমড়োয় মাখানো ভাত লোকমায় উঠল না। ফাতিমা তৌকির সাহেবের দিকে তাকালে ভদ্রলোক স্ত্রীর দিকে ইশারা করেন। চোখদুটো যেন বলছে,
- তোমাকে বারবার বলেছি খেপাবে না। ওর সামনে এমন কথা তুলবে না! তুমি প্রতিবার সেটাই করো! লজ্জা করে না?
সবিতা থমথমে মুখে চুপ হয়ে যান। একমাত্র এই ছেলের মুখের কাছে সবিতা বাক হারান। তার স্বামী, দেবর, শ্বাশুড়ি, এমনকি ছেলেরাও ‘ফারশাদ’ বলতে অজ্ঞান। যদি ওকে চটায়, তাহলে গোটা ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ধুলিসাৎ। জাবের পরিবেশটা শান্ত করতে অধরার ইঙ্গিত পেল। আপন মনে ডালের বড়ায় ভাত মেখে বলল,
- ফারশাদ, একবার তোকে দেশের বাইরে যেতে হয়। ক্যালিফর্নিয়ার দিকে যে বিজনেস ডিলার, চিনিস তুই। তোর ভক্ত। লোকটা ইদানিং লাল সুঁতা চেনাচ্ছে।
- নাম কী?
- ক্রিস্টোফার ব্রাউন।
- ব্রাউন ইন্ড্রাস্ট্রির বোর্ড অফ ট্রাস্টি?
সাদা ভাতের ওপর দু চামচ সবজি তুলছে শোয়েব। শাওলিন আড়চোখে দেখল সবজিটা চাইনিজ ভেজিটেবল। মশলা ছাড়া, আধ সেদ্ধ, হালকা গোলমরিচ ও সামান্য হার্ব দিয়ে রান্না। রান্নাটা করেছে তাহিয়া। অন্য সময় হলে রোকেয়াই করতো। শোয়েব জাবেরের কথা শুনে মুখে খাবার তুলে বলল,
- মিস্টার হ্যারিস ব্রাউনের মেয়ের জামাই। একমাত্র মেয়ে, বুঝতেই পারছিস। উত্তরাধিকার সূত্রে মেম্বারশিপ পেয়েছে। এখন হ্যারিস বুড়া মেয়ের জামাইর হাতে সাম্রাজ্য ধরিয়ে দিয়ে নাকে খড় দিয়ে ঘুমাচ্ছে। মির্জা এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে কূটনীতিক ডিলগুলোর জন্য আবার বৈঠক বসাতে চাচ্ছে। তুই শিডিউল দিচ্ছিস না, তাই আমিও ডেট ফিক্সড দিইনি।
- ক্যালিফোর্নিয়ার এজেন্ট কী বলল? তারা সমঝোতায় বসতে চায় না?
- তারা তোকে চায়। ওদের প্রত্যেকটা ডিল সাইন তোর অথরিটিতে চাইছে। জানি না ওদের মাথায় এই পোকা কে ঢুকিয়েছে, সামহাউ কেউ তো এটা বলেছে! তুই স্টেটসে না থাকলে মির্জা এন্টারপ্রাইজ নাকি অস্তিত্ব হারাবে। এখন তুই বল আহসান ভাই আর আমি কতদিক সামলাব?
যে আলোচনা কখনো খাবার টেবিলে ওঠানো পছন্দ করে না, আজ সেই পর্ব অজান্তেই উঠে গেল। শাওলিন ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে আছে। ওর চাহনি চকচকে উজ্জ্বল, যেন বুঝতে চাইছে পারিবারিক ব্যবসাটায় শোয়েবের ভূমিকা কী। শোয়েব খাওয়ার ফাঁকে ও-মাথায় বসা খালিদ চাচার দিকে তাকাল। খালিদ সাহেব ধীরেসুস্থে মুরগীর ঝোল দিয়ে ভাত মাখাচ্ছেন। কান দুটো খরগোশের মতো সজাগ, সব কথাই শুনছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। শোয়েবের বুঝতে বাকি নেই মার্কিনী বাজারে বিখ্যাত পোকাটা কে ছেড়েছে। গভীর শ্বাস ফেলে শোয়েব খাওয়া সেরে উঠল। সবচাইতে কম সময়ে খাওয়া, কম খাবার নেয়া আরো একটি অভ্যাস। শাওলিন তখন কয়েক লোকমার বেশি শেষ করেনি, এমন সময় পাশ থেকে চেয়ার ফাঁকা হতে দেখল। কপাল কুঁচকে সবার দিকে শাওলিন তাকাচ্ছিল, কেন বেশি খাওয়ার জন্য সবাই জোর করল না, কিন্তু দেখল সবাই যার যার কাজেই মগ্ন। যেন এটা স্বাভাবিক ঘটনাই। অর্থাৎ উনার পরিবারই উনাকে ঘাঁটায় না।
.
সদস্য বেশি বলেই এঁটো বাসন বেশি। রান্নাঘরে একে অপরকে সাহায্য করার মাঝে চমৎকার আনন্দ করছে। তাহিয়া, অধরার খুনশুঁটি, রাবেয়া রোকেয়া ফাঁকে ফাঁকে মজা নিচ্ছে, আর শাওলিন হাতে হাত লাগাচ্ছে সবকিছু গোছাতে। কেউ দূর থেকে দেখলে বলবে না এখানে নতুন বধূ আছে। যাদের আত্মিক মন আন্তরিক, তাদের কাছে যেন নিবিড় প্রশান্তি। সেই প্রশান্তির কাছেই স্বস্তি খুঁজে পেয়ে শাওলিন তাহিয়ার আর অধরাকে যেতে বলল। আজ সারাদিন ওর চেয়ে বেশি কাজ করেছে এরাই। রাবেয়ার শরীর গরম। জ্বরের আশঙ্কা থাকায় রোকেয়াকেও যেতে বলল ঘুমাতে। রাত দশটার ওপাশে। চুলার কাছটা ছোটো কাপড়ে পরিষ্কার করছে, এমন সময় কে যেন বলে উঠল,
- ওমা! তুমি নাকি? তুমি এদিকে কী করছ? ফারশাদ কোথায়?
প্রশ্নগুলো এতোটাই খাপছাড়া, ঝটিতি পেছন ফিরে তাকায় শাওলিন। রান্নাঘরের চৌকাঠে সবিতা চাচি। রান্নাঘরে উনার ভাশুর পুত্র থাকবে? এই রাতে কী কারণে? উনি ভাইদের সঙ্গে বসে কথা বলছেন, এটা তো নিচতলায় হাঁটতে গেলেই বোঝা যায়! শাওলিন আশ্চর্য হলেও শান্ত ভাবে প্রত্যুত্তর করল,
- আপনার কিছু দরকার চাচি?
প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন শোনাটা সবিতার পছন্দ না।উনি প্রশ্ন করবেন অন্যরা দেবে উত্তর। সবিতা পায়ে পায়ে ভেতরে ঢুকতেই বলল,
- দরকার তো ছিল। কিন্তু তুমি পারবে কিনা জানি না। আমার দুই বউ বাড়িতে নেই, অন্যের বউদের কাছে কিছু বলাটা কেমন হয়, কে জানে। ফারশাদ এখানে থাকলে ভালো হতো। ওর কাছে অনুমতি চেয়ে ওর বউকে একটু সাহায্য করতে বলতাম।
কথাটা প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে জিলাপি পাকালো। সোজাসুজি বললেই হয় উনি কিছু দরকারে এসেছেন। এখন কাজের কথা মুখে বলবেন কিনা ওই ব্যক্তির জন্য ভয়ে আছেন। শাওলিন বেসিনে হাত ধুঁয়ে আঁচলে হাত মুছে বলল,
- আপনি বলুন, আমি করে দিচ্ছি। কাউকে ডাকতে হবে না। এখানে অনুমতির কিছু নেই।
ভদ্রমহিলা একটা কাঠের টুল পেয়ে বসলেন। চোখদুটো যেন শান দেয়া ছুরি। চকচক করে ছেঁনে দেখছে শাওলিনকে। সবিতা হাসিমুখে বললেন,
- চা খেতে চাচ্ছিলাম মা। বানাতে পারো?
- জ্বি, আপনি খাবেন? বানিয়ে দেব?
- হ্যাঁ হ্যাঁ। দাও দাও। অনেক উপকার হবে গো। রাতে এক কাপ চা না পেলে ঘুমই হয় না আমার।
- কেমন চা খাবেন চাচী?
- কেমন চা…
দ্বিধা কণ্ঠে কথা থামান সবিতা। গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে কোন অসাধ্য চায়ের নাম বলা যায়। খানিক ভেবে চোখে বিদ্যুৎ স্ফুরণ ঘটল। মুখটাকে নিমিষের ভেতর কাতর বানিয়ে টুল থেকে উঠতেই বলল,
- না, দরকার নেই। ছেলে আমার রেগে যাবে। এমনিই আমাকে দুচোখে দেখতে পারে না। তার ওপর যদি তোমাকে খাটাই, লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে দেবে। না না, থাক গো।
শাওলিন বাঁধা দিয়ে ওঠল। বোঝাতে চাইল সে এ ব্যাপারে কিছু জানবে না। এক কাপ চা বানাতে কী এমন সময় লাগে? শাওলিন বিনীতভাবে বলল,
- চাচী, আপনি ভয় পাচ্ছেন শুধু শুধুই। আপনি বসুন। আমার চা করতে বেশিক্ষণ লাগবে না। আপনি বলুন কোন চা খাবেন। বানিয়ে দিচ্ছি।
কথা দিয়ে কথা তুললেন সবিতা। মুখে ছদ্ম গর্বের সন্তুষ্টি। যেন নতুন বউয়ের প্রতি প্রশংসার সীমা নেই। আহা! তিনি প্রগাঢ় গলায় বললেন,
- অপরাজিতা চা বানাতে পারো গো?
ফুল দিয়ে কখনো চা বানানো হয়নি। কিন্তু চায়ের প্রস্তুত প্রণালী জানে ও। ফাতিমা নাজও এই চা-টা খান। মাথাটা সম্মতিতে নাড়িয়ে বলল,
- পারব। আপনি বসুন। আজ সকালেই কিছু অপরাজিতা ফুল ফ্রিজে রাখা হয়েছে। করে দিচ্ছি পাঁচ মিনিট।
তৎক্ষণাৎ তেড়ে বেগে চ্যাঁচিয়ে ওঠেন সবিতা,
- ফ্রিজের ফুল? ফ্রিজের ওসব তো বাসি ফুল। বাসি ফুলের চায়ে কোনো স্বাদ আছে? তুমি এক কাজ করো। ফারশাদের বাড়ির পেছনে অপরাজিতা ফুলের ঝোঁপ আছে। বিরাট বড়ো! সেখান থেকে বেছে-বেছে কয়েকটা ফুল আনো।
- এখন?
- হ্যাঁ এখন। কেন? পারবে না? রাতে অবশ্য তোমাদের মতো মেয়েরা ভয়-টয় পায়। আচ্ছা থাক, আমি —
- এখানে ভয়ের প্রসঙ্গ নয় চাচী। বাইরে যেয়ে ওটা আনতে পারব। কিন্তু ঝোঁপটা কোথায়, তা আমি জানি না। এখনো আশপাশটা ঘুরে দেখা হয়নি।
- বাইরে বের হলেই হাতের ডানদিকে তাকাবে। মাটির একটা রাস্তা দেখবে, দুপাশে সবুজ ঘাস। ওটা ধরে সোজা এক মিনিট হাঁটবে, বাঁদিকে ঝোঁপ। বড়ো বড়ো ফুল ধরে আছে দেখবে। যাও, কোনো সমস্যা হবে না। ওখানে সাপ নেই… অন্তত এখন আর থাকার কথা না।
- ঠিক আছে, চাচী। ধন্যবাদ।
বাইরে বেরোনোর আগে চুলটা খোঁপায় বেঁধে নিল। গোসলের পর হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি পরেছে ও। সুতির। পায়ে জুতা গলিয়ে ঘন অন্ধকারে বেরিয়ে গেল সে। আসার আগে একবার অধরার খোঁজ করেছিল, কিন্তু অধরা বাথরুমে। তাহিয়া দাদীর পায়ে তেল মালিশ করে দিচ্ছে। ভদ্র মহাশয় উনার অফিস ঘরের দুয়ার দিয়ে ভাইদের সাথে আলোচনায় মগ্ন। নির্দেশ মাফিক পায়ে চলা মাটির পথ, সবুজ ঘাসের আস্তরণ পেয়ে গেল শাওলিন, কিন্তু যেটা দেখে গা ছমছম করে উঠল, তা হলো নিশিরাতের নিশ্ছিদ্র আঁধার। চোখ সয়ে না এলে হাঁটা দুষ্কর। পথ সাবধানে বাতলে নিতে হয়। মচমচ শুকনো পাতার ওপর পা ফেলে শাওলিন আরো ভেতরের দিকে যাচ্ছিল, এক মিনিটের চেয়ে তিন মিনিট অনায়াসে কেটে গেল। কিন্তু কই? অপরাজিতা ফুলের ঝোঁপ কোথায়? হাতে টর্চ আনা দরকার ছিল। কিন্তু টর্চ আনতে গেলে কৈফিয়তের ফিরিস্তি দিতে হবে। এমনিতেই মাথায় ঢুকছে না কেন খাবার-টেবিলে চাচী-স্থানীয় মহিলাকে কড়াভাবে কথাটা বলল। উনার কী মাথা খারাপ? উনি কী একা ওই কথাগুলো আলাদা করে বলতে পারতেন না? সবার সামনে অপমান করাটা? উনি তো রগচটা, বদমেজাজি, বদরাগী না! প্রায় মিনিট পাঁচেক টানা হাঁটার পর অবশেষে বুনো ঝোঁপটা দেখল। তবে বাঁদিকে নয়, ডানদিকে। পা বাড়িয়ে অন্ধকারেই ফুল তুলতে লাগল শাওলিন। কিন্তু আঁধার ঘন বলেই কিছু একটা দেখা গেল না। গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে আছে জ্বলজ্বলে চক্ষু। ফোঁস শব্দ বেরুচ্ছে চেরা জিভ দিয়ে। ওঁত পেতে আছে ছোবল দেয়ার!
.
- তাহমিদ কেন ধরে নিয়ে গেল? ও কী সাধু সাজতে গিয়েছিল নাকি? ফুপা মিডিয়া গরম করে ফেলছে। কিন্তু মনে হচ্ছে এখানেও শক্তিশালী পক্ষ বাজিমাতটা করবে।
কথাটা ঘোষণার সুরে ব্যক্ত করছিল শাহেদ। অফিস ঘরের সুসজ্জিত ডিভানে বসে কফি হাতে ভাইদের দিকে জানাল। শোয়েব সিঙ্গেল সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসা। বাঁদিকে ছোট্ট একটি কাঠের টেবিল। তার উপর Nescafe লেখা কালো কফির মগ। কথাটা শুনে মন্তব্য করতে ভুলল না আহসান। ডিভানের ডানদিকে বসে এক চুমুক কফি খেয়ে বলল,
- দেশ এখন দুইভাগ। মানলে মান, না মানলে কিছু করার নেই। একপক্ষ সরাসরি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতিনিধি করছে। অন্যপক্ষ দেশের সার্বভৌম টেকাতে জনগণকে সচেতন করছে। অবশ্য লাত্থি-উষ্ট্রা খাচ্ছে এই অন্যপক্ষটাই। শালার বাঙালি, ভালো কথা বুঝালে বুঝবে না। যখন বাড়ির দুয়ারে আগুনটা লাগবে, তখন মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে হাহাকার করবে।
কথার মোড় রাজনৈতিক আলোচনায় ঘুরে যাওয়ায় সিঁধ কাটল জাবের। বেশ গম্ভীর সুরে ব্যাপারটা নিয়ে বলল,
- আমজণতার দোষ দিয়ে লাভ কী? ওরা তো ইতিহাস জানে না। পলাশীর প্রাঙ্গণ থেকে ঔপনিবেশিক রাজ্যত্ব শুরু হলো। সেই রাজ্যত্ব গিয়ে ঠেকল দেশভাগের পর। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকার এই উপদেশের মানচিত্রটাই দুই টুকরো করে দিয়ে গেল। হিন্দু আর মুসলিম আলাদা দুই প্রদেশ বানিয়ে গেল। অথচ আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আরো কটা রাষ্ট্রের নাম জানি না। কেউ জানো নামগুলো?
জাবেরের আলোচনা ইতিহাস-নির্ভর। দেশ আজ ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় ছিল ব্রিটিশ শোষক গোষ্ঠী, এখন প্রতিবেশী দ্বারা আগ্রাসন হামলা। প্রচণ্ড ভীতিকর এক সময় যাচ্ছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিরোধের ছদ্মবেশে। জাবের আবার বলে উঠল। এবার কঠোর হয়ে উঠেছে গলার স্বর,
- যে দেশের রাজনৈতিক যোদ্ধারা, সাংস্কৃতিক কর্মীরা, সমরনায়ক, আমলা, ব্যবসায়ীরা বিদেশি রাষ্ট্রের ইঙ্গিতে চলে, সেই দেশের বিপদ আসতে কতো দেরি? নিজ দেশের লোকেরাই গাদ্দার। চরম অকৃতজ্ঞ। এরা জানতেও চায় না ক্ষমতার কেন্দ্রে কী হচ্ছে।
আলোচনা এবার সংবেদনশীল দিকে যাচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করেই শোয়েব রণে যুক্ত হল। বাঁহাতের কনুই সোফার হাতলে রেখে আঙুলটা ঠোঁটের কাছে রাখা। ভাবুক ভঙ্গিতে চশমা আবৃত চোখ স্থির করে বলল,
- হায়দারাবাদের কথা উঠছে নাকি? স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র আজ নামে মাত্র শহর।
জাবের বিস্ফোরিত চোখে আশ্চর্যে হয়। ঠোঁট হাঁ করে বলতে লাগল,
- ফারশাদ, ইতিহাস পড়ছিস তুই? এই মারভেলাস ইনফোটা কীভাবে জানলি?
শোয়েব সেই ভঙ্গিতেই ধীরেসুস্থে বলল,
- গ্রেট ব্রিটেনের কাছ থেকে ফ্রিডম পেয়েছিল রাষ্ট্রটা। ১৯৪৭ সাল উইদ ভারত। বাংলাদেশের মতোই ছিল হায়দারাবাদ রাষ্ট্র। পতনের সময় আয়তন ছিল ৮২ হাজার ৬৯৮ বর্গমাইল। মেবি দিস কান্ট্রি ইজ ফলিং ফর অ্যা এনাদার হায়দারাবাদ। সো আই রিড দ্যাট হিস্টোরি।
জাবের প্রফুল্ল কণ্ঠে খুশি হয়ে বলল,
- আই কান্ট এক্সপ্লেইন হাউ হ্যাপি আই অ্যাম! ফাইনালি ইয়্যু আর অন দি রাইট ট্র্যাক ফারশাদ। ফারদিন আঙ্কেল অলওয়েজ থট এবাউট দিস, হোয়েন উই রিড হিজ পার্সোনাল ডায়েরি।
এমন সময় স্রোতের বাইরে থেকে প্রশ্ন উঠাল শাহেদ। যেন ঘুরেফিরে ফুপাতো ভাই তাহমিদের কথাই মনে পড়ছে। কীভাবে নিখোঁজ হলো? কারা ধরে নিয়ে গেল? আজ মিডিয়া পাড়া কাদের ইশারায় চুপ? প্রশ্নগুলো নিয়ে প্রচুর ভাবলেও উত্তর পায়নি শাহেদ। কফিতে ছোট্ট চুমুক দিয়ে অন্যমনষ্ক কণ্ঠে বলল,
- তাহমিদের ব্যাপারটা কেমন যেন স্বাভাবিক মনে হয় না। বাড়ির কাছ থেকে তুলে নিয়ে গেল। বিয়ের আগের দিন রাতে, তাও বাড়ির বাইরে ডাকিয়ে! এমন কাজটা কেউ কেন করতে পারে?
তৌফিক বহুক্ষণ পর নীরবতা ভাঙে,
- তাহমিদ সবসময়ই বলতো ওর প্রোমোশন দরকার। ওর ভেতরে একটা ক্ষুধা আছে। আমার যতদূর মনে হয়, তাহমিদ কোনো কেস নিয়ে চেকমেট করতে চাইছিল। কিন্তু ডাবল চেকমেট করে ওকেই সরিয়ে দিল। বাবা বলল, ফুপা উনাকে ইন্টারন্যাশনাল লিংকের জন্য হেল্প চাইছে। কিন্তু তোরা জানিস এটা অসম্ভব। একজন না চাইলে বাবা কখনো অ্যাপ্রোচ করবে না।
এই রেশ ধরে আহসান একবার সিঙ্গেল সোফাটায় চাইল। নির্বিকার মুখ শোয়েবের। চেহারায় গভীর অভিব্যক্তি নেই। একটু পরই হালকা কেশে বলল আহসান,
- তৌফিক কী তাহমিদের সাথে কথা বলতি? তোদের লাস্ট কথা কবে হয়েছিল?
তৌফিক একটু ভেবে বলল,
- ফুপা যেদিন স্ট্রোক করলেন সেদিনই। তাহমিনা ফুপু আম্মার কাছে কল করল। আমি খবরটা শুনে তাহমিদকে কল করি। তখনি শুনি, ওর কেস নিয়ে খুব লোড যাচ্ছে।
তৌফিকের কথা শেষ হতেই বাক্যের মোড় ঘুরাল শোয়েব। বারবার রিষ্টওয়াচে সময় দেখছিল সে। বুকের ভেতর চিনচিনে করছিল নাম না জানা অনুভূতি, যা তাকে স্বস্তি দিচ্ছে না একপলক। মন, ইন্দ্রিয়, মনোযোগ সমস্ত ঝুলে আছে তার প্রিয়তমার কাছে। শোয়েব গভীর শ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল,
- আগামীকাল বিশদে আলোচনা করি? আজ আমি খুব ক্লান্ত। বিজনেস স্ট্র্যাটেজি নিয়ে ভাবার পর্যাপ্ত সময় দরকার। তোমরা জেট ল্যাগে আছ নিশ্চয়ই?
চার ভাই একসঙ্গে নিজেদের ভেতর চাওয়া-চাওয়ি করল। প্রত্যেকের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠতেই দ্রুত সেটা মিলিয়ে গেল। জাবের শাহেদের দিকে ইশারা করে বোঝাচ্ছে,
- বাহানা দিচ্ছে!
শাহেদ নীচের ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে হাসি চাপলো। চোখের ইশারায় সেও বোঝাল,
- এক মিনিটে ষাট সেকেণ্ড। ষাট সেকেণ্ডে একশো বিশবার ঘড়ি দেখল। তর সইছে না মনুর।
নানী বাড়ির আঞ্চলিক ভাষাটা ইঙ্গিতে বলল শাহেদ। দুই ভাইয়ের ইতরামি দেখে পিঠের পেছনে চিমটি বসালো তৌফিক। সবাই ডিভান ছেড়ে বের হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তৌফিক জাবেরের কানে হালকা ফিসফিস করে জানাল,
- হারা.মজা..দারা, তোরা যেটা ভাবছিস, ঘটনা ওটা ঘটেই নি! গলায় ওটা নখের দাগ না। ধানমণ্ডি থেকে গাজীপুর গিয়েছিল। ওখান থেকেই ওই বিউটি স্পট নিয়ে এসেছে।
তৌফিকের জবাবে ভ্রুঁ কোঁচকালো আহসান। সে সবার সামনে হাঁটছিল, বাকিরা একসারিতে পেছনে। হঠাৎ পা থামিয়ে কৌতুহল চোখে শুধাল,
- কী নিয়ে আলোচনা করছিস?
জাবের ভালো মানুষের মতো মুখ করে বলল,
- যে বয়সে বউয়ের আঁচড় খাবে, সে বয়সে ছুরির ধার খেয়ে আসছে। লজ্জায় মাথা তুলতে পারি না। এসব নিয়েই টুকটাক কথা চলছে ভাই।
আহসান কোনো কথা বলল না। পাথর কঠিন মুখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল সে। জাবেরের দিকে ঠাণ্ডা গলায় বলতে যাচ্ছিল ‘ কারো হানিমুন সাজাতে আসিস নি জাবের। এখানে কার্যোদ্ধার করতে এসেছিস। কাজটাই কর!’, কিন্তু কথাগুলো উচ্চারণ হলো না তার। অফিস ঘর দিয়ে বেরোচ্ছিল শোয়েব, তাকে দেখেই কথা থামিয়ে ঘরমুখো হাঁটা দিল। শোয়েব ব্ল্যাক ট্রাউজারের পকেটে সেলফোনটা ঢোকাচ্ছিল, গায়ে নেভি ব্লু টিশার্ট। হঠাৎ রান্নাঘরের দিকে চোখ যেতেই থমকে গেল পা। রিষ্টওয়াচে আবার তাকাল। দশটা বিশ। কী ব্যাপার? এখনো রান্নাঘরে কেন? উপরে যায়নি? পায়ে পায়ে দ্রুত রান্নাঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়াল শোয়েব। ভেতরে কেউ নেই। চুলায় টগবগ করে পানি ফুটছে। আলো জ্বালানো এখানে। একবার গলা ছেড়ে ডাকল ওকে,
- শাওলিন? আছ!
সাড়াশব্দ নেই। নিশ্চিত এখানে একটু আগেও ছিল। চুলার আঁচটা কমিয়ে দিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরোল। পকেটে ফোন বাজছে। ভাইব্রেশনের কম্পনটা টের পেতেই পকেটে হাত গলিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল। একহাতে রিসিভে টিপে কানে ধরল শোয়েব; ওভাবেই কথা বলতে বলতে অস্থির চোখে খুঁজছিল ওকে।
- হ্যালো। ডি. এফ. ও. শোয়েব ফারশাদ।
- …….. .
- জ্বি। খাগড়াছড়ি, সিটিজি হিল ট্র্যাক্টস। . . আহ.. পুরো পরিচয়ের দরকার নেই। তোমাকে চিনেছি, গাজীপুর অন দি স্পট। ওটা আমার দায়িত্ব ছিল। কেমন আছ?
- …….. .
- বারবার ধন্যবাদ দিয়ে আমাকে ছোটো করছ। তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে এভাবেই আমার সহযোগিতা পেতে। তোমার ফ্যামিলি কেমন আছে?
কলে তখনো কথা বলছে শোয়েব, ওপ্রান্তের বুঝতেই পারবে না সে অন্য কাজেও মগ্ন। কান একদিকে, বাকি সব মনোযোগ অন্যত্র। সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসলো। চর্তুদিক বৃক্ষছায়ায় আচ্ছন্ন। আঁধারের কুণ্ডলী কেমন কুয়াশার মতো পাক খেয়ে খেয়ে উঠছে। শোয়েব ঠোঁটের ডানকোণটা দাঁতে কামড়ে ধরল। কোথায় গেল ও? এই দশটার দিকে কোথায় বেরোল? রোকেয়াদের পাকাঘরের কাছ দিয়ে শোয়েব যাচ্ছিল। যেতে যেতে কানে শুনল,
- মূর্খ মানুষের কথা ইট-পাথরের মতোন। জ্ঞানী মানুষের কথা বিশাল পাহাড়। যখন তুমি পাথর দিয়া ঢিল ছুঁড়বা, নদীতে সাময়িক ঢেউ তুলতে পারবা — তার বেশি কিছু পারতা না। কিন্তু পাহাড় বসাইলে পানির দিকই খুঁইজা পাইবা না, উল্টা নদীর চেহারাই বদলাইয়া যাইব। তাই কথা যখন বলবা, জ্ঞানী মানুষের মতোন বলবা। না পারলে আজাইরা কাটাকুটি লাগায়ে নদী ঘোলা করার দরকার নাই।
কথাগুলো শুনে শোয়েব থামতে চাইল, কিন্তু তখনি দেখল অদ্ভুত এক দাগ। ছোটো পায়ের জুতার ছাপ! শোয়েব তিরিক্ষি মেজাজে ভয়ংকর চটে যায়! চোয়াল খিঁচে আসে ভয়ংকর মূর্তিতে। কলটা কেটে ত্রস্ত পায়ে ভেতরের দিকে পা চালাল। মাটির পথ ধরে সোজা চলে গেছে ঘন জঙ্গলের অস্তিত্ব। বুকের ভেতর এই প্রথম শঙ্কা ভর করল। ঢিপ ঢিপ করছে হৃৎপিণ্ড, কানে অনুভব করছে বেগতিক হাতুড়ি পেটা! শোয়েব চিৎকার করে ডাকল,
- শাওলিন! শাওলিন, কোথায় আছ! জবাব দাও! কথা বলো শাওলিন!
মেজাজি স্বরটা বিস্ফোরণের মতো ছড়াল। কানে শুনতে পেল শাওলিন। আমূল কেঁপে হাতটাই ফুল থেকে সরে গেল। ওভাবে ডাকছে কেন? রাগান্বিত গলায় চেঁচালো যেন? আঁচল ভরে অপরাজিতা ফুল তুলেছে, কিন্তু এখন আর একটা সেকেণ্ডও দাঁড়িয়ে থাকল না। অদ্ভুত কৌতুহলে জর্জরিত হয়ে শাওলিন পা বাড়াল তখুনি। ফুলভর্তি আঁচল সামলে দ্রুত এগোতেই হঠাৎ স্থির হয়ে যায় ও। সমুখেই ছয়-সাত দূরে দীর্ঘ ছায়ামূর্তি দাঁড়ানো। অস্পষ্ট হলেও বুঝেছে, মানুষটা কে। শাওলিন হিমশিম খেয়ে অপ্রতিভ সুরে বলল,
- কী ব্যাপার? এভাবে চেঁচাচ্ছেন কেন? আমি তো এদিকে ফুল—
শব্দটা মুখেই আঁটকে গেল। শাওলিনের চোখ স্থির হয়ে গেল সামনে। অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার চেহারা স্পষ্ট নয়, কিন্তু চোখ দুটো,
সেই চোখ দুটো চিনতে একটুও ভুল হলো না।
শোয়েব। কিন্তু এই শোয়েব, ওর চেনা শোয়েব না।
নিঃশ্বাস ভারী। কাঁধ ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখ দুটো জ্বলছে অদ্ভুত এক আগুনে। রাগ? ভয়? নাকি দুটোই একসাথে? এক পা এগোতেই থেমে গেল সে। কণ্ঠটা নিচু, কিন্তু ভেতরে জমে থাকা জেদ স্পষ্ট,
- এখানে কেন এসেছ তুমি?
এ যেন প্রশ্ন না, কটাক্ষ জিজ্ঞাসাবাদ। শাওলিন কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। আঁচলে ধরা ফুলগুলো ধীরে ধীরে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে, ও খেয়ালই করল না। শোয়েব এগিয়ে এলো। দ্রুত, ভারী, অদ্ভুত পায়ে।
- আমি কি বলিনি একা বাইরে বের হতে না?
কথার ভেতরে যেন চাপা গর্জন। ঠিক সেই মুহূর্তে ওদের দুজনের মাঝখানের ঝোপের ভেতর শব্দ উঠল। ফোঁসসস আওয়াজ। শব্দটা এত কাছে, এত জোরালো, হঠাৎ মাটির ওপর কুঁচকে থাকা কালো ছায়াটা নড়ে ওঠে। মাটিতে চলা সরর সরর আওয়াজ। শাওলিনের গলা থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। কালো কুচকুচে বিষধর একটি সাপ! ফণা তুলে চেরা জিভে ফুঁসছে! ঠিক তখনি শোয়েব বজ্রস্বরে ডেকে উঠল!
- রেইন্জার, ইয়া জ্দিয়েস!
FABIYAH_MOMO .
নোটবার্তা — তারপর . . কী হবে?
Share On:
TAGS: ফাবিয়াহ্ মমো, বজ্রমেঘ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৯(৯.১+৯.২)
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৫
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩১
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২০
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১২
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৮
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩৩
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৮.১