. #বজ্রমেঘ . ❤
পর্বসংখ্যা_৩২ .
ফাবিয়াহ্_মমো .
যখন বুঝল ওপাশ থেকে বজ্রকণ্ঠ নয়, বরং নারীকণ্ঠ, তখন বিশ্রীভাবে ধাক্কা খেল শাওলিন। ভয়ানক চমকে ঝড়ের বেগে ফোন নামাল কান থেকে। আশ্চর্য চোখে নামটা দেখল স্নেহা মাহমুদ। রিভলবিং চেয়ারটা বেশ উঁচু বলে বেঁচে গেল, নয়ত ধিড়িম করে ডান পাটা কাঠের শক্ত টেবিলে আঘাত পেত। ওপাশ থেকে উদগ্রীব নারীকণ্ঠ এল,
- হ্যালো?. . শাওলিন? উফ, কী অবস্থা নেটওয়ার্কের!
শব্দগুলো শুনে দ্রুত ফোনটা কানে ধরল সে। সমস্ত অপ্রস্তুত ভাব গোপন করল একনিমিষে। কণ্ঠে সংযত ভাব ফুটিয়ে বলল,
- হ্যালো। আসসালামুয়ালাইকুম স্নেহা ম্যাম। দুঃখিত, বুঝতে পারিনি আপনি কল দিয়েছেন। আমি অন্য কেউ ভেবেছিলাম।
স্নেহা যেন পরিস্থিতিটা বুঝল। বেশ শান্ত, স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
- ওয়াআলাইকুমসসালাম। এতো রাতে কল দিলাম বলে খুব দুঃখিত। কিন্তু ব্যাপারটা আর্জেন্ট!
- ম্যাম, প্লিজ দুঃখিত বলবেন না। আপনি জানেন আপনি যেকোনো সময় আমাকে কল দিতে পারেন। কিন্তু এখন টেনশন হচ্ছে। আপনি ঠিক আছেন তো? কী হয়েছে?
কথাটা বলার জন্যই কল দিয়েছিল স্নেহা। অথচ মুখে আনতে গিয়ে খানিকটা থেমে গেল। কিছুক্ষণ নিরুত্তর হয়ে সামান্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
- আমি ঠিক আছি। বিকেলে শ্রেষ্ঠা কল দিয়েছিল। প্রথমে কোর্স রিলেটেড আলোচনা। তারপর তোমার প্রসঙ্গ উঠতেই চুপ। তখনি বুঝেছি কিছু একটা ঠিক নেই।
গতকাল সেই হুলস্থুল ঘটনার পর শ্রেষ্ঠার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। এখানে আসার পর কেউ কাউকে কল করেনি। শারীরিক অবস্থা জ্বরের দিকে ধাবিত হলে ব্যাপারটা ওর মাথা থেকে চলেই যায়। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে শাওলিন ক্লান্ত সুরে বলল,
- আমি এখন ঠিক আছি। যদি সত্যি বলতে হয়, হ্যাঁ, কালরাতে জ্বর এসেছিল। জ্বরটা একরাতে কমে গেছে। কীভাবে কমলো এ ব্যাপারে কিছু জানি না। সকাল থেকে অনেকটাই সুস্থ লাগছে।
স্নেহা থমকে গেল। অসুস্থতার খবর শুনে চমকে ওঠে বলল,
- কালই জ্বর উঠেছিল? তাহলে তুমি ঢাকাতেই থেকে গেলে না কেন? ওখানের কেউ তো জানে না তুমি অসুস্থ ছিলে!
- জানি না. . কেন যেন ওই পরিবেশে থাকতে পারছিলাম না। মনে জেদ চেপেছিল চলে যাব। তাই চলে এসেছি।
- কী আশ্চর্য! তোমার হাসবেণ্ড খেয়ালই করেনি? গাড়িতে ওঠানোর পরও বোঝেনি তার বউ জ্বরে কাতরাচ্ছে? কেমন লোক!
সেই মানুষটার বিরুদ্ধে সামান্য কথাতেই মন কেমন বিদ্রোহী হতে চাইল। স্নেহাকে তখুনি পাই পাই জবাব জোগাতে উদ্যত হয়েছিল, কিন্তু একেবারে শেষমুহুর্তে নিজেকে থামায় শাওলিন। চোখদুটো বুজে, গভীর শ্বাস ছেড়ে, নিজেকে শান্ত বানিয়ে বলল,
- উনি বোঝেননি, কারণ উনাকে বুঝতে দেয়া হয়নি। উনি শান্ত মানুষ। নিজেই ঢাকায় এসেছেন অফিশিয়াল কাজে।
কথাটা উচ্চারণ করতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল শোয়েবের ক্লান্ত মুখ। সেই দিন শুধু মর্তুজা বাড়িতেই ঝড় বয়ে যায়নি, বরং সেই মানুষটার উপরও দূর্যোগ হানা দিয়েছিল। কাউকে কিছু বলেনি বাড়ির বাইরে কেন ছিল, ওরকম আহত-ক্লান্ত অবস্থায় কেন ফিরল, ঢাকা ছাড়ার জন্য কেন অতোটা অস্থির ছিল, এসব ব্যাপারে শাওলিন কিছুই শুধায়নি।
- আপনি আমাকে যতটা সুস্থ পাচ্ছেন, এর পেছনেও তার হাত। যদিও গতরাতের কিছু মনে নেই। শুধু মনে আছে মাথায় পানি দেবার মুহুর্তটা।
ঠোঁটে উচ্চারণ করছিল কথাগুলো, কিন্তু মন যেন দেখতে পাচ্ছিল ছবির মতো সবটা। যে ছবিটা সাদা-কালো দৃশ্যপটে, কিন্তু হৃদয় সে দৃশ্যগুলো রঙিন রঙে দেখছে। ওপাশ থেকে স্নেহা নিঃশ্চুপ। মন দিয়ে সেও শুনছে শাওলিনের মুখ নিঃসৃত কথা। কথা যখন অনেক কিছুই বুঝিয়ে দিচ্ছে, তখন স্নেহা স্মৃতিতর্পণে ফিরে যাচ্ছিল নিজের পুরোনো সময়ে। যখন নিজ জীবনে পেয়েছিল এমন এক মানুষ, যার বুদ্ধি ও বোধগম্যতা আজও প্রখর। যাকে আজও স্নেহা নতুন করে চেনে, নতুন করে জানে, নতুন করে তার প্রতিটি সুক্ষ্ম বিষয় হৃদয় দিয়ে দেখে। তার ভাষ্য চোখে দেখা নয়, তার ভাষ্য যে এরকম “স্নেহময়ী, চোখে দেখা সত্য অনেক সময় নিষ্ঠুর মিথ্যা হয়। মানুষকে চোখ দিয়ে বোকা বানাতে পারো, কিন্তু হৃদয় দিয়ে নয়। হৃদয় সবসময়ই আরাধনার জায়গা, যেখানে ভণ্ড কিছু জায়গা পায় না।”
স্নেহা অমন অদ্ভুত আলাপে বই থেকে চোখ সরায়। মাথা পিছু করে দূরের ডিভানে শোয়া সুপুরুষ মানুষটার মুখে তাকায়। বিসিএসের পড়া রেখে প্রশ্নাতুর কণ্ঠে বলে, “তুমি বোঝাতে চাইছ তুমি কখনো মিথ্যে ছিলে না? তাই প্রথমেই সেই আরাধনার জায়গাটা লুটে নিয়েছ?” অফ হোয়াইট ডিভানে শোয়া তাশরিফ সাগ্রত মুচকি ঠোঁটে হাসে। হাসিটা ভারি সুন্দর! বুকের ভেতর কাঁপন তুলে দেবার মতো! সেই ব্যক্তি আজও এতটুকু বদলে যায়নি! হাতে ইউএস ফেডারেলের কিছু কাগজ দেখতে দেখতে সে মৃদু হাস্যেই বলল, “কিছু মিথ্যে সত্যের কাছাকাছি হয়। এতোটাই সুক্ষ্ম তফাত থাকে যে, মানুষ তখন মিথ্যেকেই সত্য জানতে থাকে। কিন্তু স্নেহময়ী, কিছু মিথ্যে যদি আরাধনার জায়গাকে শ্রদ্ধা করে, কাউকে বাঁচিয়ে তোলে, তাহলে ক্ষতি কী? কেউ তোমার হৃদয় পাওয়ার জন্য খানিকটা সত্য গোপন করল, এতে কী খুব অপরাধ হয়ে গেল?” ডানহাতে ঝামটা দিয়ে পুরুষ্টু বইটা বন্ধ করল স্নেহা। চেয়ারে বসে স্বামীর দিকে পুরোপুরি মুখ ঘুরিয়ে বলল, “ তুমি মিথ্যেকে সহজ করে দিচ্ছ না? যদি তোমার মতো এই ধারণা রেখে মানুষ একশোটা মিথ্যে বলে, তখন কী অবস্থা হবে ভেবেছ? মিথ্যে যদি এতোই গুরুত্বপূর্ণ হয় তবে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ পাক কেন সত্য বলতে বাধ্যতামূলক করেছেন?” সাগ্রত এবার হো হো করে হেসে উঠে। প্রিয়তমা স্ত্রীকে খানিকটা চটিয়ে দিয়ে সে স্বাভাবিক স্বরে বলে, “আমি বলিনি মিথ্যে বলা ফরজ। কিন্তু কিছু মিথ্যে যদি না বলা হতো, তখন পরিস্থিতি বোধহয় খারাপ হতো স্নেহময়ী। আমি যদি শুরুতেই বলে দিতাম আমি কী কাজ করি, তখন তুমি আমাকে ভয় পেয়ে দূরে থাকতে। অথচ এই দূরে থাকাটাই আমার সত্য না বলার কারণ। যদি জানতাম তুমি সত্য শুনলে স্বাভাবিক থাকবে, তাহলে একসেকেণ্ডও ভাবতাম না তোমাকে ওরকম মিথ্যে কিছু বলতে। সব সত্যিটাই বলতাম। আমার পেশা, আমার পরিচয়, আমার যাবতীয় সব প্রথমেই বলা হয়ে যেতো।” স্নেহা কান ও মগজ দুটোই একসঙ্গে ব্যবহার করছিল। কানে শুনে মগজে পাঠিয়ে বুঝে উঠতে চাইছিল পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো। কিছু একটা ভাবতেই স্নেহা কৌতুহল গলায় বলল, “তাহলে মানুষ মিথ্যে বলে কেন?” ফেডারেল পেপারের একটা পাতা উলটে সাগ্রত শান্তভাবে বলল, “কথাটা কারেক্ট করো। বলো, পুরুষ মিথ্যে বলে কেন।” স্নেহা ঝট করে সেই প্রশ্নটাই শুধিয়ে উঠে, “পুরুষ মিথ্যে বলে কেন?” সাগ্রত বাঁহাতে পেপার ধরে ডানহাতের তর্জনী আঙুলটা ঠোঁটের ওপর রেখেছিল। ভাবুক ভঙ্গিতে ভ্রুঁ কুঁচকানো কপালে সেভাবেই উত্তরটা দিল, “পুরুষ মিথ্যে বলে — কাউকে হারানোর ভয়ে। সত্য বললে যতটা দূরে চলে যাবে, মিথ্যে বললে সেই মানুষটার কাছাকাছি থাকবে। যখন বুঝবে এখন সত্য বললেও কারো দূরে যাবার ভয় নেই, তখন সুযোগ সন্ধিক্ষণ বুঝে সত্যটা বলে দেয়। এতে কারো দূরে যাবার ভয়, হারানোর চিন্তাটা থাকে না। সে মানুষটা নিজের কাছেই থেকে যায়।” শেষের কথাগুলো ডানধারে মুখ ঘুরিয়ে বলছিল সাগ্রত। দূরে চেয়ারে বসা স্নেহার চোখে চোখ মিলিয়ে। তখন যেভাবে ওই দৃষ্টির কাছে কেঁপে উঠেছিল স্নেহা, এখনো সেভাবে চমকে ভ্রম ভেঙে গেল ওর। ফিরে এল বাস্তব ভূমিতে, যেখানে শাওলিনের সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল। শাওলিন ওপ্রান্ত থেকে চুপ করে আছে। মেয়েটা সবসময়ই নির্বাক। প্রয়োজনীয় কথার পর বাড়তি একটা কথা বলে না। যেন প্রয়োজন নেই। স্নেহা ঠোঁট গোল করে সশব্দে শ্বাস ছেড়ে বলল,
- শাওলিন দুটো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করব। সমস্যা আছে?
- না। আপনি জিজ্ঞেস করুন।
- শ্রেষ্ঠার কাছে মোটামুটি সব শুনেছি। তুমিও জানো, রাখ-ঢাক আমার পছন্দ নয়। প্রথম প্রশ্ন, খাগড়াছড়িতে এর আগে যে দেখা হয়েছিল, এটা কাউকে বলেছ?
শাওলিন টেবিলঘড়িটার দিকে তাকাল। সেই মানুষটার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছে গতরাতে, ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা পেরুতে চলল। কণ্ঠে আপনাআপনি একটা সতর্ক ভাব আচ্ছন্ন হল,
- কাউকে কিছু বলিনি। বলার ইচ্ছেটাও আসলে নেই। কিছু বিষয় ব্যক্তিগত থাকা ভালো। যা মানুষ বুঝবে না, তা বোঝানোর দরকারও নেই।
- ঠিক আছে।
স্নেহা একটু থেমে পুনরায় বলে উঠল,
- তোমার ভাবী রেবেকা শুরুতেই প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিছু বলেছে এ ব্যাপারে?
- না। উনি অনেক কিছুই আমার কাছে খুলে বলতেন না। আমিও সেভাবে জানার আগ্রহ দেখাইনি। একটা বিশ্বাস ছিল, উনি আমার জন্য ভালোটা ভাবেন।
- আচ্ছা। তাহলে ভেঙে বলা যাক। ব্যাপারটা শ্রেষ্ঠার সঙ্গেও আলোচনা করেছি। এবার তোমাকে এটা বলা দরকার।
কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ দেখা দিল শাওলিনের। কণ্ঠে হালকা বিস্ময় নিয়ে বলল,
- জ্বি ম্যাম, বলুন।
- ফরেস্ট সাহেব কেমন মানুষ? যতটুকু চিনেছ, সেই চেনা থেকেই বলো।
- শান্ত মানুষ। খুব চুপচাপ থাকেন। নিজের মতো পেশাগত কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কোথাও কিছু ঘটতে দেখলে দক্ষ ভাবে সামলান। অযথা চিৎকার চেঁচামেচি পছন্দ করেন না।
- ঠাণ্ডা মাথার মানুষ?
- সেরকমই। খুব একটা চটেন না।
শেষ কথাটা বলার সময় একটু আগের প্রতিচ্ছবিটা চিন্তা করল। কলের ভেতর সামান্য একটা ধমক দিয়েছিল, তাতেই মনে হয়েছিল সে চটে গেলে তাকে চেনা যায় না। তাকে আর খেপানো উচিত না। কেন যে অবচেতন মন শাওলিনকে সাবধান করেছিল, নিজেও ঠিক জানে না। ওপাশ থেকে স্নেহা একটু থেমে আবার বলল,
- তোমার ভাবীকে কী বলে ডাকেন?
সেভাবে ভাবতে হলো না, চট করেই জবাবটা রাখল শাওলিন,
- রেবা। বাড়ির মানুষ উনাকে রেবা বলেই ডাকেন।
- রেবেকাকে রেবা?
- জ্বি।
- নাম ধরে ডাকে?
- হ্যাঁ।
- যারা বয়সে বড়ো, তাদেরই তো নাম ধরে ডাকা হয়… তাই না?
- জ্বি।
- তাহলে তোমার হাসবেণ্ড সিনিয়র?
শাওলিন অদ্ভুত ভাবে কপাল কোঁচকাল। চোখের তারাদুটো অস্থিরভাবে ডানে-বামে ঘুরছে। যেন গভীর মন দিয়ে কিছু ভাবছে ও, মনে পড়ল তাশফিয়া ওকে বলেছিল ‘বিগ ব্রো’, মানে যিনি সবার বড়ো! হঠাৎ ভাবনা সেরে বলে উঠল,
- জ্বি। কিন্তু এতে কী প্রমাণ হয়?
কেন যেন মনে হলো, স্নেহা ঠিক খুলে বলছে না। কথা বলার সময় বাঁধো বাঁধো ব্যাপারটা ফুটে উঠছে। কী নিয়ে ইতঃস্তত করছেন? এতো রাতে কল দিয়ে কী বলতে চাচ্ছেন? এখনো কিছু বুঝল না দেখে শাওলিন নিজেই বিহিত করতে চাচ্ছিল, কিন্তু স্নেহা বহুক্ষণ পর কুয়াশা কাটিয়ে বলল,
- নরমালি চিন্তা করো শাওলিন। আমি তোমাকে চিনি শ্রেষ্ঠার মাধ্যমে। যখন প্রফেসর সেগুফতা জামান তোমাকে বরখাস্ত করার বন্দোবস্ত করেছে। ব্যাপারটা ট্যাকেল দিলাম আমি। সাক্ষ্য প্রমাণ সব ঠেলে দিলাম আড়াল থেকে। আমি কিন্তু সামনে আসিনি।
- জ্বী। কিন্তু..
শাওলিনকে বলতে দিল না। স্নেহা তখনো একভাবে বলে চলছে,
- প্রফেসর সেগুফতা তারপর থেকে সমঝে চলেন। উনি জানেন আমি কে। সেদিন উনার বিরুদ্ধে কে কাজটা করেছে।
- জ্বি ম্যাম।
এবার স্নেহার কণ্ঠ বদলে গেল। একটু গভীর, একটু হিসেবি স্বরে বলল,
- এখন এই চিন্তাটা এখানে আনো। আনোয়ার মর্তুজা, অর্থাৎ মর্তুজা বাড়িকে চেনো রেবেকার থ্রোতে। রেবেকা আপন জেঠাতো ভাইয়ের সঙ্গে তোমার বিয়ে ঠিক করে। যে ভাই পেশায় ডিজিএফআই-এর সদস্য, বাবার ডানহাত। একমত?
- হ্যাঁ। এটাই।
- সব শুধু একজন ব্যক্তি জানে। ভেবে দেখো নামটা শুধু রেবেকা। তোমার সব, মর্তুজা বাড়ির সব, এমনকি মর্তুজাদের সঙ্গে অন্যান্যরা। ঠিক বলেছি কিনা?
- জ্বি ম্যাম।
মুখে সম্মত হলো ঠিকই, কিন্তু তখনো কিছু বুঝতে পারছিল না ও। মনে হচ্ছে ম্যাম ওকে কিছু ধরিয়ে দিতে চাচ্ছেন। ঠিক ওই মুহুর্তেই স্নেহা এতোক্ষণের বোমাটা ফাটিয়ে দিল,
- বনবিভাগে বসে কেউ গোয়েন্দা বিভাগে হস্তক্ষেপ করছে, চট্টগ্রাম থেকে ক্যান্টনমেন্টের ঘুম উড়াচ্ছে, এমন তাজ্জব ঘটনা আমি তো কক্ষণো দেখিনি, শাওলিন!
ফোন ধরা আঙুলগুলো কেঁপে উঠেছে। স্থির হয়ে গেছে ডাগর চোখদুটো। গলার ভেতর খামচে এসেছে নিঃশ্বাস! বুকের ভেতর দ্রিম দ্রিম আঘাত হানতেই শাওলিন ইতঃস্তত গলায় বলল,
- আপনি বলতে চাইছেন . .
অসম্পূর্ণ বাক্যে থেমে যায় শাওলিন। যেখানে থামল সেখানে থেকেই স্নেহা হাল তুলে ধরে বলল,
- তোমার স্বামী শোয়েব ফারশাদ… উনার সত্যিই বেশ সাহস। মর্তুজাকে চিরুনি অভিযানে খোঁজ করা হচ্ছে, সেটা শুধুমাত্র ওই একজনের জন্য। তুমি কী সত্যিই জানো না রেবেকা জেনে-বুঝে কার কাছে তোমাকে সপলো?
- আমি জানি না মণি কী জানতো। কিন্তু আমি এটা জানি লোকটা ভদ্র।
- ভদ্রই। ক্রিমিনাল রেকর্ড যেহেতু নেই, সেহেতু বলা যায় ওসব দিকে মুক্ত।
শাওলিন জানে স্নেহা এ কথা কীসের ভিত্তিতে বলছে। উনার স্বামী বাংলাদেশ গোয়েন্দা সংস্থার একজন মান্যগণ্য সদস্য। ব্যাপারটা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে মোটামুটি দলগতভাবে সক্রিয় শিক্ষার্থীরা জানে। শাওলিন যদিও কোনো ছাত্র স্থানীয় দলভুক্ত নয়, কিন্তু শ্রেষ্ঠার মারফত এ তথ্য জানে। আর প্রফেসর সেগুফতা যখন প্রায় ওকে বরখাস্ত করে ফেলছিল তখন স্নেহা মাহমুদই ‘ট্রাবল শ্যুটার’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। যেখানে বিসদৃশ ব্যাপার দেখেন তা সাথে সাথে ঠিকঠাক করে দেন। এমন সময় অস্থির সপ্রতিভ স্বরে স্নেহা বলে উঠল,
- শাওলিন, তোমার স্যার চলে এসেছেন। পরে কথা বলি। কোনো দরকারে অবশ্যই কল করবে। আজ রাখছি। আল্লাহ হাফেজ। ভালো থেকো।
- আল্লাহ হাফেজ ম্যাম। কথা হবে।
- আর হ্যাঁ, একটা কথা! আলোচনাগুলো দুপক্ষের ভেতরে থাকলেই ভালো হয়। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে শ্রেষ্ঠার মতো কেউ — সমস্যা নেই। কিন্তু অমন বাদে অন্য কেউ — একদমই নয়।
- মাথায় থাকবে।
একটু থেমে একসেকেণ্ড বিরতি দিল স্নেহা। শাওলিন ফোন নামাবে ঠিক তখুনি স্নেহা শেষমুহুর্তে বলল,
- শান্ত লোকদের চটাবে না। একবার চটে গেলে থামানো যায় না। যদি এদের বোঝো, এরাও বুঝবে। কিন্তু রাগিয়ে দিয়ো না, সাবধান।
- ঠিক আছে, ম্যাম। মনে রাখব।
কল কেটে ফোন টেবিলে রেখে দিল। কিছুক্ষণ মূর্তির মতো বসে রইল শাওলিন। পশ্চিমের আখোলা জানালা দিয়ে হুঁ হুঁ করে ঢুকছে পাহাড়ি মাতাল হাওয়া। শীত লাগার মতো শিহরণ লাগলে গায়ে ভালো করে আঁচলটা টেনে নিয়ে বসলো। এই ডায়েরিটা নতুন। কিনেছে নীলক্ষেত থেকে। পাতাগুলো ধবধবে সাদা। এতোক্ষণ কলম ঘুরিয়ে কত কথা লিখল, অথচ একবারও খেয়াল করেনি কালিটা গাঢ় নীলবর্ণ। কলমটাও দেখতে ব্যতিক্রম। শাওলিন সমস্ত অস্থিরতা ভুলে গিয়ে সেই অদ্ভুত কলমটা আশ্চর্য হয়ে হাতে নিল। ঠিক তখুনি কানে টুট. . টুট. . টুট . . একটানা মেটালিক সাউণ্ড! যেন ধাতব ইলেকট্রনিক যন্ত্র থেকে আসছে। তৎক্ষণাৎ মাথাটা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে শব্দটা কোথা থেকে আসছে, খুঁজতে লাগল শাওলিন! হঠাৎ চক্ষু স্থির হয়ে গেল একদিকে। প্রবল বিস্ময় নিয়ে রিভলবিং চেয়ার থেকে খটাশ দাঁড়িয়ে পড়ল শাওলিন। হতবাক মুখ, বিপন্ন হয়ে উঠছে চাহনি, বিমূঢ় ভঙ্গিতে দেখল অদূরে বিশাল কম্পিউটার সেট-আপ। যেটা স্বয়ংস্ক্রিয়ভাবে চালু হয়ে গেছে। মনিটরের ডিসপ্লেতে ফুটে আছে, ওই কলমে লেখা সমস্ত বিষয়বস্তু। যা এতোক্ষণ ডায়েরিতে লিখেছিল, তা ওই কম্পিউটার স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে রিডিং দিচ্ছে। এমন ভয় জীবনে পায়নি ও! বুকের ভেতর যেন হামান-দিস্তার শব্দ! কলমটার দিকে ঝট করে তাকাল ও। ঠোঁটদুটো থরথর করে কাঁপছে তখন। নিজের প্রতি বশ্যতা নেই একটুও। মনে মনে তখন বলছিল, এটা . . এটা কী কলম? কী ছিল এতোক্ষণ? এটা কী সাধারণ কলম ছিল না?
মুখে কোনো রা ফুটল না। ক্রমাগত বিপ্ বিপ… বিপ্ বিপ… বিপ্ বিপ শব্দগুলো ঘরময় ছড়িয়ে গেল। কম্পিউটারের মনিটর রিডিং শেষে অটোমেটিক শাট-ডাউন হয়ে গেছে।
.
রাঙামাটি, পার্বত্যাঞ্চল, চট্টগ্রাম।
নীল জ্বলজ্বলে চোখদুটোতে সূর্যোদয়ের ছবি ফোটা। পরিপূর্ণ দৃশ্য জ্বলে ওঠেছে ওই ধারালো ক্ষুরধার চাহনিতে। উঁচু এক টিলার ওপর একাকি বসে আছে শোয়েব। বন্য প্রকৃতির মাঝে এক পশলা পাহাড়ি হাওয়ায় উড়ছে তার সৌম্য কপালের চুল। রৌদ্রের ঝলকে বাদামি কালচে চুলগুলো ঝরঝর করে নড়ছে। গায়ে গাঢ় সবুজ শার্টের টপ দুটো বাটন খোলা, হুঁ হুঁ বাতাসে উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে সুপোক্ত বুকের সুঠাম খাঁজ। বাঁদিকে গভীর সেলাই দাগ। পা থেকে বুট জোড়া খুলে বাঁপাশে রেখেছে সে। ডান পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলে ফোসকার দগদগে ঘা। চামড়া ওঠে লাল অংশ বের হয়ে গেছে। চোখদুটো সহসা বন্ধ করল শোয়েব। চোখে ভাসলো ফাইরুজের হাস্যমুখ, কানে বাজল ওর কথা,
- শোয়েব স্যার, রেহানা আপা কী পরিমাণ পাগল হয়েছে জানেন? আপনার ফোন নাম্বার পর্যন্ত হাত করে ফেলেছে। আপনি যদি সামান্য ইশারা দেন, তাহলে দেখবেন ওই বারুদ গলে মাখন হয়ে গেছে!
শোয়েব নির্বিকার মুখে স্থানীয় এক ছোট্ট মেয়েকে দেখতে দেখতে বলল,
- এখন এসব আলাপ বাদ দাও ফাইরুজ। বাচ্চাটার কী অবস্থা সেটা জানাও।
ফাইরুজ বেডে শোয়া ঘুমন্ত মেয়েটাকে একপলক দেখে নিল। স্বস্তি মাখানো অদ্ভুত কণ্ঠে বলল,
- ব্যথার ইনজেকশন দেয়া হয়েছে স্যার। এখন আর কোনো টেনশন নেই। ঘুমাচ্ছে। কাল সকালের ভেতর অনেকটাই সুস্থ হয়ে যাবে।
ছোট্ট মেয়েটার উশকো-খুশকো চুলে নিজের আঙুল বুলিয়ে আদর করল। কপালে হাত ছুঁয়ে জ্বর আছে কিনা দেখে শোয়েব মৃদু গলায় বলল,
- একটু দেখে রেখো। বাচ্চাটার মা এলে আমাকে একবার খবর দিবে। আমি সরাসরি একবার ওর মায়ের সঙ্গে কথা বলব। ওই খালু-খালার বাড়িতে অবুঝ বাচ্চাটাকে রেখে ভদ্রমহিলাকে দূরে যেতে হবে না। আমি এখন থেকে ব্যবস্থা নিচ্ছি।
ফাইরুজ মুচকি হেসে সম্মতি জানায়। এই বাচ্চাটা আরেকটু হলে খালুর কাছে শিশুত্ব হারাতো। কিন্তু খালুর ভাল্লুকের মতো পশমওয়ালা হাতে এক কামড় বসায় বাচ্চাটা। নরপিশাচ জানোয়ারটাকে সেখানেই ফেলে জান বাঁচিয়ে মেয়েটা নিকটস্থ একটি চেকপোস্টে ছুটে আসে। তারপরই জল এতদূর গড়াল। ফাইরুজ অকপটে বলে উঠল,
- ঠিক আছে শোয়েব স্যার। ওর মা এলেই আপনাকে জানাব। আপনি কি কফি খাবেন? ক্যান্টিন থেকে এনে দিই এককাপ?
শোয়েব সরল মেয়েটার চঞ্চল অনুরোধে তেমন গম্ভীর থাকতে পারে না। মুচকি হেসে হালকা করে মাথাটা নেড়ে হ্যাঁ জানায়। ফাইরুজ চট করে মুখভরা হাসি নিয়ে দৌড়ে এককাপ কফি নিয়ে আসে। লম্বা করিডোর ধরে যখন ডক্টর রেজার খোঁজে হাঁটে, তখন পাশাপাশি চলতে থাকা ফাইরুজ মৃদু কাশি দিয়ে বলে,
- থার্ড ফ্লোরে যে পেশেন্ট আছে, তাকে আপনি দেখেছেন স্যার?
গরম ধোঁয়া ওঠা পেপার কাপে ঠোঁট ঠেকায় শোয়েব। ছোট্ট চুমুক দিয়ে দৃঢ় গলায় বলে,
- নাহ।
- ইয়া আল্লাহ! চেনেন না? বলেন কী? তাহলে রেহানা আপা কালসাপের মতো ফুঁসছে কেন? উনি ভেবেছেন কী না কী! দাঁড়ান দাঁড়ান, মেবি আমার কাছে পার্ফেক্ট একটা জিনিস আছে।
কথা শুনে ক্ষীণ আগ্রহ জন্মাল শোয়েবের। সে কফির কাপটা ডানহাতে ধরে বাঁদিকে ফাইরুজের ছটফটে কাজ দেখল। ফাইরুজ দ্রুত এপ্রণের পকেট থেকে কী একটা বের করল, সঙ্গে সঙ্গে ডানদিকে বাড়িয়ে ধরে বলল,
- এবার দেখুন। দেখলেই বুঝবেন হসপিটালে কীসের মরিচ লেগেছে। এমনিতেও আপনি এলে যে অবস্থা হয়! এখন মরিচ পোড়ার গন্ধে টেকা যাচ্ছে না, স্যার।
শোয়েব ভ্রুঁ কুঁচকে পকেট থেকে হাতটা বের করে ছবিটা নিল। একটা অ্যালবাম সাইজের ছবি। যতটুকু স্মরণে আছে এই ছবিটাই একটু আগে ফ্লোরে পড়েছিল, সেটা তুলে সেই মেয়েটার টোটব্যাগে রেখে এসেছে। শোয়েব ছবিটা উলটো ভাবে সাদাপিঠ ধরেছিল, পাশে থাকা ফাইরুজকে ‘ ছবিটা কোথা থেকে.. ‘ প্রশ্নটা করার আগেই কথা আঁটকে গেল তার। শোয়েব দাঁড়িয়ে পড়ল মূর্তিমান অটল ভঙ্গিতে। চশমা ঢাকা চোখদুটো নিষ্পলক দৃষ্টিতে স্থির হয়ে গেছে। বুকের ভেতর বাজছে কী তীব্র ঝড়! শোয়েব অদ্ভুত হিম গলায় বলল,
- পেশেন্ট হাই ফিভ. .
মাঝপথে থেমে গেল জিভ। নীল তারা দুটো তীক্ষ্ম হতে হতে ঠোঁট ফসকে নিচু সুরে বলল,
- শাওলিন আলম।
যেন কথাগুলো সম্মোহন স্বরে বলল। সে যেন ঠিক মূর্ত ভূমিতে নেই, দূরলোকে কোথাও। পাশে তখন ফাইরুজ ছিল না। একটা জরুরি কল আসায় কিছুটা সামনে এগিয়েছে ও। যদি একবার পিছু ফিরে তাকাতো, তবে বুঝতো যে দলটার ক্যামেরা চুরির জন্য মাত্র কলটা এল, সেই দলের মেয়েটাকেই স্থির চোখে দেখছে শোয়েব। অদ্ভুত মাদক লাগা অশান্ত, উত্তাল চোখে।
ঝট করে বতর্মান সময়ে ফিরল শোয়েব। ফিরে এল সেই সময়ে, যখন ফাইরুজ দু কদম সামনে একটা কল রিসিভের পরপরই বদলে গেল। সেই রাতে, সেই ঝড় থামা মুহুর্তে, হাসপাতালের সেকেণ্ড ফ্লোরে ফাইরুজ ফোনকলে নির্দেশবাক্য পেয়েছিল। এরপর ক্যামেরাটা পরদিন সকালে চুরি হলো, সোহানার ব্যাগ শুদ্ধো গায়েব হলো, ফাইরুজ অকপটে জানালো বাইরের কেউ চুরি করেছে। মনে মনে ক্লান্ত হয়ে শোয়েব বলল, ওহ…ফাইরুজ, তুমি আমাকে কল করেছিলে, কিন্তু আমি ঢাকায় ছিলাম। যখন তোমার সাড়া পেলাম, তখন তুমি বলার অবস্থায় নেই। তুমি কাদের হয়ে ক্যামেরাটা চুরি করেছিলে? কেন একবার সুনীলদার কাছেও গেলে না? তোমার কী এ অঞ্চলে থাকা পুলিশ-আর্মি-আনসারকেও ভরসা ছিল না? আই উইশ আই ক্যুড হেভ সেভড ইয়্যু… আই ডোন্ট নো হুজ লয়্যাল এনিমোর… অ্যাণ্ড হুজ বিট্রেয়িং মি।
পকেট থেকে সেলফোন বের করল শোয়েব। সময় সাড়ে নটার একটু বেশি। খাগড়াছড়িতে যে ব্যক্তি এখন প্রস্তুত থাকতে পারে, শোয়েব ঠিক তাকেই কলটা দেয়। কিছুক্ষণ যান্ত্রিক সংযোগ যেতেই খট করে রিসিভ। কেউ বলার আগে শোয়েবই বলে উঠল,
- হ্যালো। কী অবস্থা আপনার?
তাহিয়া ঠেস দেয়া বাক্যে বলে উঠল,
- ডিউটির মাঝে বিউটির খবর চাচ্ছ, মনে করো যে বুঝি না?
- আচ্ছা?
- যার অবস্থা জানতে চেয়ে কল দিয়েছ, তারটা আগে শুনবে না?
শোয়েব মাথা নিচু করে হাসলো। দৃঢ় অথচ মৃদুকণ্ঠেই বলল,
- কার খবরে সুস্থ থাকব, এটা তো আপনার ওপর দায়িত্ব।
- আমিই যদি এতো দায়িত্ব দেখি, তাহলে তোমার কর্তব্য কোথায় শুনি? বিয়ে করে ভাবীদের কাঁধে বউ ঝুলিয়ে গেছ, আর এখন তুমি অন্য জেলা থেকে কল করে বলছ আমাদের দায়িত্ব?
- আপনারা অভিজ্ঞ লোক। আপনাদের দলে একজন অনভিজ্ঞ নতুনকে রিক্রুট দেয়া হলো। তাকে গড়ে-পিটে তৈরি করবেন না? মেয়েটা ছোটো তো। মির্জার বাড়ির কিছুই জানে না।
- অ্যাই! কথার প্যাঁচে ফেলবে না। শাওলিন যেমন আছে তেমনি থাকুক। ছোটো আছে, কিন্তু ভালো আছে। মির্জা বাড়ির মতো ওসব মারপ্যাঁচে নেই। তুমি কখন ফিরছ?
মাথাটা নত করল মাটি বরাবর। চুলগুলো কপাল ছেড়ে মাটিকে কুর্নিশ করল যেন। বাতাসে রেশম চুলগুলো ঝরঝর করে উঠলে শোয়েব চোখ বুজে বলল,
- জানি না. . এদিকটা শেষ করি। জানাব কখন ফিরছি। আপডেট দিন প্লিজ, কল ড্রপ হবে।
- কালরাতে উপরে ছিল না শোয়েব। রোকেয়া ঘর ঝাঁট দিতে গিয়ে অবাক! অফিস ঘরটা ভেতর থেকে বন্ধ। রাতে কখন নেমে এসেছে, কেউ বলতে পারছে না।
- ঘুমায় নি ?
- তোমার চেয়ারে ঘুম। জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে থেকে যতটা বোঝা, তাতে এই যে রাতে জেগে ছিল। ঘুমটা সকালেই এসেছে হয়ত। ডেষ্কের ওপর একটা ডায়েরি, একটা কলম আর ওর ফোন। এলোমেলো আছে… রাতে কী করছিল, তা জানি না।
কথা শুনে চোখদুটো বন্ধ করে শোয়েব। প্রথম রাতের স্মৃতিটুকু মনের আগল খুলে দেখে। তার খোলা বুকের ভেতর ওর উষ্ণ পিঠের ওম। তার বাহুর ওপর ওর নরম মাথা। তার দেহের মাঝে যতবার কেঁপে ওঠছিল ও, ততবার কঠোরভাবে জড়িয়ে রাখছিল নিজের বুকের ভেতর। ডানহাতের আঙুলগুলো মুঠো পাকালো শোয়েব। তার রুক্ষ আঙুলে এখনো উষ্ণ স্পর্শটা ছুঁয়ে আছে। মেখে আছে ওই কবোষ্ণ ত্বকের কোমলত্ব। শোয়েব খুব ধীরে ধীরে বলল,
- জানতে দিন। যদি অস্থির হয়, এটা ভালো। যদি রাত ছটফটে কাটে, আমি এটাই চাইব। ও জানুক, যখন কেউ বারবার ওর জন্য ঠকে যাচ্ছে, কিন্তু সে শোধ তুলছে না, শুধু এটা ভেবে ওর আদরের মানুষ কষ্ট পাবে। তখন বুঝুক আমারও অসহ্য হয়, প্রচণ্ড জেদ চাপে, রাগে আমার মাথা সুস্থ থাকে না। কিন্তু আমি বলতে পারি না, কিছুই বলি না!
শক্তভাবে দাঁত চিবিয়ে কথাগুলো বলছিল শোয়েব। এবার বুকে গভীর শ্বাস টেনে নিল। ওপাশে তাহিয়া প্রচণ্ড চুপ হয়ে গেছে। খানিকটা ঢোক গিলে ভেতরটা শান্ত করল। এরপর দ্বিতীয় খবরটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক ভাবে বলল,
- দাদীজান কাল বিকেলে সবাইকে খবর দিয়েছে। জানিয়েছে তুমি তাহমিদের . . .
হিম গলাটা তৎক্ষণাৎ থমকে দিল তাহিয়াকে। তাহিয়া থতমত খেয়ে উঠলে শোয়েবের ভয়ংকর গলাটা শুনল,
- আমি আমার জনকেই। তাহমিদের কাউকে না।
নিজের ভুলটা দ্রুত শুধরাল তাহিয়া। শুকিয়ে আসা কণ্ঠে ঢোক ফেলে বলল,
- ওদিকের অবস্থা শোচনীয়। তোমার দুই চাচা আর চাচী, তোমার ভাইরা… কেউ ভাবেনি হঠাৎ এমন কিছু হবে। কেউ স্বপ্নেও কল্পনা করেনি! তুমি এখন বিবাহিত, অথচ কেউ কল করার সাহস পাচ্ছে না।
খানিক থেমে কিছু শোনার অপেক্ষা করল তাহিয়া। কিন্তু বুঝতে পারছিল কল কেটে দিবে শোয়েব। যখন তাহিয়া প্রবল অস্থির হয়ে কিছু বলবে, তার আগেই বজ্র গলাটা বেজে উঠল সশব্দে,
- কল করতে হবে না। কল আমি দিব। সিএসটি, ভোর পাঁচটায় বলবেন। কল যাবে খালিদ চাচার ফোনে। রাখছি!
নোটবার্তা — এ পর্বে ফ্ল্যাশব্যাক এসেছে। কে কীভাবে যুক্ত, এখানে সুক্ষ্ম আঁচ দেয়া। আগামী পর্বগুলোতে শোয়েব ফারশাদ মির্জার ‘মির্জা দলকে’ জানবেন। এরপর শাওলিন জানবে। আপনারা জানবেন। আর আমি জানাব।
FABIYAH_MOMO .
ছবি – সৌমিক । ❤
Share On:
TAGS: ফাবিয়াহ্ মমো, বজ্রমেঘ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৬
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩১ [ অংশ সংখ্যা – শেষ ]
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২৮
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৩(১ম+২য়+শেষাংশ)
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২১(২১.১+২১.২)
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১২
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৯(৯.১+৯.২)
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৮.১
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১১
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩৩