ইরিন_নাজ
প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা পর্ব ৪
তোহফার আরসালানের সাথে ওবাড়ি চলে যাওয়ার কথা কানে যাওয়া মাত্র হন্তদন্ত হয়ে ওর রুমে উপস্থিত হলেন ফারুক আহমেদ এবং নাইসা আহমেদ। বাবা-মাকে রুমে আসতে দেখে চোখের পানি মুছে ফেলল তোহফা। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে শক্ত হয়ে বসে রইল।
নাইসা আহমেদ কাঁদতে কাঁদতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু প্রতিবারের মতো আজ আর তোহফা মাকে পাল্টা জড়িয়ে ধরল না। বুকে মুখ গুঁজে আহ্লাদও করল না। চুপটি করে অন্যত্র তাকিয়েই বসে রইল সে। ব্যাপারটা নাইসাকে আহত করল। উনি অধৈর্য হয়ে জোর করে তোহফার মুখটা নিজের দিকে ফিরালেন। কাঁদতে কাঁদতে শুধালেন,
“কি হয়েছে, মা? এমন করছিস কেনো? তুই বলে এক্ষনি ওবাড়ি চলে যেতে চাচ্ছিস?”
তোহফা শক্ত কণ্ঠে জবাব দিলো,
“হ্যাঁ। আজ, এক্ষনি চলে যাব। আর এমনটা কেনো করছি, সেটা অবশ্যই তোমাদের অজানা নয়। বিয়ে দিয়েছো, স্বামীর ঘরে তো যেতেই হবে। তাইনা?”
ছটফটে আহ্লাদী মেয়ের মুখে এমন শক্ত কথা শুনে অবাকই হলেন নাইসা এবং ফারুক আহমেদ। ফারুক আহমেদ মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। মিইয়ে যাওয়া স্বরে বললেন,
“আমরা তো বলেছিই আমাদের মেয়েটা এখন ছোট। আরেকটু বড় হলে তখন…”
বাবার কথা শেষ হতে দিলো না তোহফা। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“ছোট হলে কি আর বিয়ে দিতে! তোমাদের কাছে তো আমি বোঝা হয়ে গিয়েছিলাম। তাই তো আমাকে নিলে, আর একজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে। নিজেদের ঘাড় থেকে বোঝা নামালে। আমার মত-অমতের ধার তো ধারো নি তোমরা। বিয়ে দেয়ার যেহেতু বয়স হয়েছে, সেহেতু সংসারও করতে পারব। আসলে মেয়ে মানুষের নিজের বাড়ি, নিজের লাইফ, নিজের ডিসিশন বলে কিছু এক্সিস্টই করে না বোধহয়। তোমাদের উপরে তো বোঝা হয়ে গিয়েছিলাম। দোয়া করিও তাদের উপরে যেনো বোঝা না হই।”
রাগে, অভিমানে যা মুখে আসলো বলে গেল তোহফা। কিন্তু ওর প্রতিটা কথা ক্ষত-বিক্ষত করলো নাইসা এবং ফারুক আহমেদের হৃদয়। নাইসা তার সেই ছোট্ট আদুরে মেয়েটির বলা কঠিন কথাগুলো সহ্য করতে পারলেন না। শব্দ করে কেঁদে ফেললেন উনি। ফারুক আহমেদও যেনো কিছু বলতে ভুলে গেছেন। উনারা কখনো কল্পনাও করেন নি মেয়েকে নিয়ে এমন কিছু।
তোহফার চোখ দুটো জলে টলমল করছে। নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল সে। অতঃপর নিজেকে মায়ের কাছ থেকে ছাড়িয়ে আঁচলে চোখের পানি মুছতে মুছতে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। বের হতেই মুখোমুখি হলো আরসালানের। লোকটার মুখ একটু বেশিই থমথমে। তোহফা সেই মুখের দিকে এক পলক তাকিয়েই নজর ফিরিয়ে নিলো। আরসালান গম্ভীর স্বরে বলল,
“দুটো মিনিট ওয়েট করো। আমি আসছি।”
তোহফা কোনো উত্তর না দিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে হাঁটা দিলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুমে প্রবেশ করল আরসালান। নাইসা আহমেদ চুপচাপ চোখের পানি ফেলছেন। ফারুক আহমেদও বসে আছেন থম মেরে। চোখ দুটো টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করেছে উনার। আরসালানকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন উনি। কাতর স্বরে বললেন,
“কি থেকে কি হয়ে গেল, বাবা! মেয়েটা আমাদের ভুল বুঝে এভাবে চলে যেতে চাইছে। আমি, আমি কি করব!”
আরসালান কাঁধে হাত রাখল উনার। বলল,
“শান্ত হোন, আঙ্কেল। আজ যেভাবে যা হয়েছে, তাতে ওর এভাবে রিএক্ট করাটাই স্বাভাবিক। আপাতত ও যখন যেতে চাইছে, যেতে দিন। একটু সময় দিন ওকে। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ফারুক আহমেদ সম্মতি দিলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“মেয়েটাকে একটু দেখো, বাবা। সামলে নিও একটু।”
ফারুক আহমেদের চিন্তা বুঝল আরসালান। আশ্বাস দিয়ে বলল,
“চিন্তা করবেন না আপনারা। ওর কোনো অযত্ন হবে না।”
আরসালান আর অপেক্ষা করল না। সালাম জানিয়ে বেরিয়ে গেল। ধপ করে বিছানায় বসে পড়লেন ফারুক আহমেদ। নাইসা আহমেদ খামচে ধরলেন স্বামীর বাহু। কাঁদতে কাঁদতে মৃদু চিৎকার করে বললেন,
“কি হলো এসব! এমনটা তো আমরা চাই নি। আমাদের মেয়েটা, আমাদের মেয়েটা অভিমান করে চলে গেল। কি পরিমান কষ্ট পেলে ও ওমন ওমন কথা বলল! কতটা ভুল বুঝেছে ও আমাদের! আমাদের, আমাদের এত তাড়াহুড়ো করাটা ঠিক হয় নি। ওর মত না নিয়ে আগানোটা বড্ড ভুল হয়েছে। বড্ড বেশি আঘাত করে ফেলেছি আমরা মেয়েটাকে।”
অপরাধবোধে জর্জরিত হলো ফারুক আহমেদের মন। স্ত্রীকে একহাতে আগলে নিলেন উনি। উদাস কণ্ঠে বিড়বিড় করে বললেন,
“সব ঠিক হয়ে যাবে, নাইসা। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা যাবো ওবাড়িতে। ওকে বুঝাব। দেখবে, ঠিক ওর রাগ, অভিমান পড়ে যাবে। নিয়ে আসবো আমরা ওকে।”
আরসালানের পিছু পিছু সদর দরজা অবধি এসে থামলো তোহফা। সামনেই দেখতে পেলো আরসালানদের ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। লোকটা তবে গাড়ি আনিয়েছে! অবশ্য ভালোই হয়েছে। অভ্যেস না থাকায় শাড়ি পড়ে দু কদম চলা বড্ড মুশকিল তার জন্য। সাবধানে হেঁটে গাড়িতে উঠে বসল তোহফা। সিটে শরীর এলিয়ে তাকিয়ে রইল চিরপরিচিত প্রানপ্রিয় নীড়ের পানে। চোখ থেকে আরেক ফোঁটা অশ্রু গড়াল তোহফার। চোখ বুজে ফেলল সে। বড্ড ক্লান্ত লাগছে এখন। চোখ দুটোসহ পুরো মাথা ব্যথায় টনটন করছে। কান্নাকাটি করলে প্রতিবারই তার এই এক দশা হয়। বন্ধ চোখেই তোহফা অনুভব করল আরসালান পাশে এসে বসেছে। সে বসতেই গাড়ি চলতে শুরু করল।
গাড়িটা যখন খান বাড়ির সামনে এসে থামল, তখন ঘুমে ঢুলছে তোহফা। আরসালান ঢুলতে থাকা তোহফাকে নীরব চোখে পরখ করল। অতঃপর বেশ শান্ত ভঙ্গিতেই বলল,
“বাড়ি চলে এসেছি আমরা…”
কিন্তু এই শান্ত স্বরে ছুড়ে দেয়া বাক্য শুনেও আতঙ্কিত হলো তোহফা। ধরফরিয়ে উঠার কারণে মাথায় বেশ জোরে বারি খেলো। এমনিতেই মাথায় যন্ত্রনা করছে। তার উপর বারি খেয়ে ব্যথায় চোখ কুঁচকে ফেলল সে। আরসালানকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জায়, যন্ত্রনায় মুখটা কাঁদো কাঁদো হলো। রক্তিম বর্ণ ধারণ করল চোখ-মুখ। আরসালান ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল সে। ফিরে আসলো তোহফার সাইডে। গাড়ির ডোর ওপেন করল। বের হলো তোহফা। মাথায় হাত বুলানোর পাশাপাশি নিজেকে গালি দিতে দিতে আরসালানের পিছু ছুটতে লাগল সে। এমনিতেই এই জল্লাদ লোক তাকে সহ্য করতে পারে না। সুযোগ পেলেই তাচ্ছিল্য করে কথা বলে। আর এই লোকের সামনেই কিনা সে বারংবার লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়ে!
বিশাল ডুপ্লেক্স এই ‘খান বাড়ি’ অচেনা নয় তোহফার। এর আগেও আসা হয়েছে বাবা-মায়ের সাথে। তবে আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। আজ সে এই বাড়িতে এসেছে এই বাড়ির পুত্রবধূ হিসেবে। তাও এমন একটা সিচুয়েশনে। বুঁকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে তোহফার। মনটা বড্ড অশান্ত হয়ে আছে। ভেতরের মানুষগুলো না জানি তাকে নিয়ে কি ভাববে!
নানারকম অশান্ত ভাবনা-চিন্তা করতে করতে শাড়ি খানিকটা উঁচিয়ে আরসালানের পিছু পিছু একপ্রকার ছুটে ছুটে হাটছিল তোহফা। আরসালানের বড় বড় কদমের সাথে তাল মিলাতে ছুটতেই হচ্ছিলো তার। কিন্তু বাড়ির ভেতর প্রবেশ করার পর থেমে গেল আরসালান। অন্যমনস্ক তোহফা ছোটার তালে দুম করে বারি খেলো আরসালানের শক্তপোক্ত পিঠের সাথে। ঠাস করে ফ্লোরে পড়ল সে। আরসালান পিছু ফিরল। একহাত কোমরে রেখে অধর কামড়ে তাকাল ফ্লোরে পড়ে থাকা রমণীর পানে। অবাক হলো না সে। যেনো স্বাভাবিক কিছুই ঘটেছে।
আড়চোখে অপরাধীর ন্যায় আরসালানকে দেখল তোহফা। পরোক্ষনেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। মনে মনে দোষারোপ করল আরসালানকেই। এই অভদ্রলোক হুট করে থেমে না গেলে মোটেও এমনটা হতো না।
চূড়ান্ত লজ্জায়, ব্যথায় চোখ দুটো টলমল করে উঠল তোহফার। ইচ্ছে করল নিজের হিরে জহরতে বাঁধানো কপালটাকে দেয়ালে ঠুকতে। নিজেকে সামলে ওঠার চেষ্টা করল তোহফা। কিন্তু কোমরে বেশ ভালো ব্যথা পাওয়ায় এবং শাড়ির কারণে উঠতে ব্যর্থ হলো সে। ছলছল চোখে তাকাল আরসালানের দিকে। লোকটা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। একটু হাতটাও বাড়িয়ে দিচ্ছে না দেখে রাগ হলো তোহফার। রাগে, দুঃখে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“জল্লাদ লোক। একটুও মায়া-দয়া নেই। এরসাথে আমি সংসার করব কিভাবে আল্লাহ!”
নিজ ধ্যানে মশগুল তোহফা পরমুহূর্তেই নিজেকে আবিষ্কার করল শূন্যে। আরসালান ততক্ষনে তোহফাকে কোলে তুলে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠছে। অপ্রত্যাশিত স্পর্শে এবং আরসালানের এত নিকটে নিজেকে আবিষ্কার করে সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল তোহফার। অবাক হলো সে, এতটাই অবাক হলো যে মুখটা সামান্য হা হয়ে গেল। গোল গোল চোখে আরসালানের দিকে তাকিয়ে রইল সে। আরসালান এক পলক ভ্রু কুঁচকে তাকাল। অতঃপর দৃষ্টি সামনে রেখে উপরে উঠতে উঠতে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
“বাকিজীবন কোলে নিয়েই হাঁটাচলা করতে হবে বোধহয়। কারণ একজনের পা ফ্লোরে থাকলে একবার বামে আছাড় খায়, তো একবার ডানে। এমন ইম্যাচিউর মেয়েই কপালে ছিল!”
অপমানে শরীরটা জ্বলে উঠল তোহফার। নাকের পাটা ফুলে উঠল তার। সে রাগে মৃদু চিৎকার করে বলল,
“কে বলেছিল ইম্যাচিউর মেয়ে বিয়ে করতে! ম্যাচিউর কাউকে খুঁজে নিতেন। বেঁচে যেতাম আমি। এক্ষনি নামান আমাকে। নামান বলছিইইই। আপনার কোলে উঠতে আমার বয়েই গেছে। কে উঠতে চায় আপনার মতো জল্লাদের কোলে?”
তোহফার অতিরিক্ত মোচড়ামোচড়িতে বিরক্ত হলো আরসালান। হাতের বাঁধন সামান্য আলগা করে শক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
“আর একবার এমন মোচড়ালে ছুড়ে নিচে ফেলে দিবো।”
ভয়ে আঁতকে উঠল তোহফা। দুহাতে খামচে ধরল আরসালানকে। বিশ্বাস নেই এই লোকের, সত্যি সত্যি ছুড়ে ফেলে দিতেই পারে।
চলবে,
(বহুদিন পর কন্টিনিউ করা শুরু করলাম। কেমন লেগেছে আজকের পর্ব, জানাবেন অবশ্যই। আর ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল।)
পেজ লিংক :
https://www.facebook.com/profile.php?id=100084228455276
গ্রুপ লিংক:
https://www.facebook.com/groups/793917018458290/?ref=share
আইডি লিংক:
https://www.facebook.com/profile.php?id=100078880801895
Share On:
TAGS: ইরিন নাজ, প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা পর্ব ১
-
প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা পর্ব ৩
-
প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা পর্ব ২
-
প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা গল্পের লিংক