প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪৭
ফারজানারহমানসেতু
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে একটু আগে। তুবা আজ থেকে মিসেস আরিয়ান মির্জা। তুবার চোখের পানি যেন বাধ মানছে না। মানবেই কিভাবে? একটা মেয়ে যেখানে ছোট থেকে বেড়ে ওঠে, সেখানে তার শৈশব, কৌশোর, পার করে ফেলে, সেখান থেকে এভাবে যাওয়া কতটা ব্যাথাদায়ক তা কেবল ওই নারীই জানে।
রাফিয়া, নূর এখনো তুবা শান্ত করার চেষ্টায় আছে। কিন্তু বেপরোয়া মনের তুবা কিছুতেই বুঝ মানছে না।
এদিকে রোজা আর তূর্জানের বিয়ে সম্পূর্ণ হয়েছে। পাশাপাশি সোফায় বসে আছে দুজন। রোজা কবুল বলার সময় যখন কাপছিলো, তখন তূর্জান নিজের হাতে রোজার হাত আকড়ে ধরেছিলো। হয়তো বিশ্বাসের জোরে এখন রোজা স্বাভাবিক অবস্থায় আছে। রোজা তূর্জানের দিকে তাকাতেই দেখল, সে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। এভাবে তাকানোর কি আছে? আজব! রোজা চোখ নামিয়ে নিল, তূর্জান হাত ছেড়ে দিল। তূর্জান কি করে বুঝল রোজা তুবার কাছে যেতে চাচ্ছে? রোজাকে নির্বিকার বসে থাকতে দেখে আবার নিজের হাতে রোজার হাত ধরে, তুবার দিকে যেতে যেতে বলল,
~ “ চলুন মিসেস নেওয়াজ। আপনার আনমনে বলা বাক্যের গন্তব্য স্থানে।
রোজা বেশ খুশিই হলো। কি সুন্দর রোজার কথা বুঝে গেছে। তুবার সামনে গিয়ে দাড়াতেই তুবা ভাইকে জড়িয়ে ধরল। কান্নার বাধ ভেঙে সকল কথারা যেন উগড়ে যেতে লাগল। বিয়ের আগে মেয়েদের বাবার পরে এই একটামাত্র ভরসার জায়গা যেখানে তারা নিশ্চিত। তুবাও এতদিন তাই ছিলো। তূর্জান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল। মেয়েরা সারাজীবন বাবার বাড়িতে থাকে না। তাদের আসল গন্তব্য ওই স্বামীর বাড়ি। তারপর সব বুঝিয়ে বলে, একটু শান্ত করে, আরিয়ানের কাছে গেল।
রোজাও প্রায় কান্না করে দিচ্ছে, তবুও কান্না থামালো। রোজা এখন কান্না করলে নিশ্চই তুবা আরও ভেঙে পড়বে। আগের থেকে একটু থেমেছে কান্না। ওদিকে তানিয়া নেওয়াজ কোনায় দাড়িয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। এভাবে মেয়ে তার এতবড়ো হয়ে গেল, অথচ তার কাছে এখনো একটা শিশুর ন্যায় মাত্র। মেয়েরা বাবা মায়ের কাছে কখনো বড় হয় না।
তাজারুল নেওয়াজ তো বাবা, বাবা নামক মানুষকে যে কখনো ভেঙে পড়তে দেখা যায় না। তাইতো তিনি এখনো পাষণ্ডের মতো সবার সাথে হেসে কথা বলছেন। অথচ ভিতরে তার দগ্ধ হচ্ছে ভীষণভাবে। মোস্তফা নেওয়াজ ভাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ ভাইজান , তুমি বরং ওপাশে গিয়ে বসো, আমি এদিকটা সামলে নেবো। “
“ আমাকে দুর্বল ভাবছিস? আমি কিন্তু মোটেও কষ্ট পাচ্ছি না। “
“ জানো তো ভাইজান , কিছু না জিজ্ঞাসা করতেই মানুষ যে উত্তর গুলো সামনে মেলে ধরে। ওগুলো আসলই হয়। তারা ভাবে তারা ওই উত্তর দিলে হয়তো সত্যি থেকে বাচতে পারবে। অথচ তারা মনের অজান্তেই তা প্রকাশ করে ফেলে।“
দুই ভাইয়ের কথোপকথনের মধ্যে রেহেনা নেওয়াজ বলল, “ ভাইজান, তুবার শশুরবাড়ি থেকে তাড়া দিচ্ছে, তাছাড়া সন্ধ্যাও ঘনিয়ে এসেছে। নিয়ম অনুযায়ী বিদায়ের পালা। “
তাজারুল নেওয়াজ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “ যাও, আমরা আসছি। “
রাহেলা নেওয়াজ তুবার পাশে বসে বোঝাতে লাগল।শশুরবাড়িতে কিভাবে সবার সাথে মিলেমিশে চলতে হবে? কিভাবে সবাইকে আপন করতে হবে? রোজা তার পাশে বসে আছে। রাফিয়া, নূর, অনন্যাও বসে আছে। হঠাৎ মিরান রোজাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ বনু। “
“ হুমম!”
“ তোর কি একটুও দয়া-মায়া নেই? “
“ কেন ভাইয়া আমি কি করলাম? “
“ শশুরবাড়ি যাচ্ছিস, অথচ আমাকে জড়িয়ে ধরে একটু কান্নাকাটি করলি না! কেমন পাষান তুই? “
রোজা উঠে মিরানের কাছে যাওয়ার আগেই হাত উচিয়ে বলল, “ এই থামম। আমার নতুন পাঞ্জাবী, নষ্ট করার দরকার নেই। “
বলে নিজেই রোজাকে জড়িয়ে নিল। তার এই তো বোন। যে বোনের আশা পূরণ করে এসেছে এতদিন। মিরানের জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন। যে তার বোন তাদের বাড়িতেই থাকবে।
তারপর তুবাকেও এনে, দুইবোনকেই আলিঙ্গন করে,রাফিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ দেখে ভাবি, আমার বোনরা আমাকে রেখে বিয়ে করে নিল। আমার যত কষ্ট! “
বলতেই তুবা মিরানের পাঞ্জাবী রুমাল হিসাবে ব্যবহার করল। মিরান তুবার দিকে ভ্রু কুচকে বলল, “ আরিয়ানের থেকে হিসাব বুঝে নেব। “
একেএকে বিদায়ের পালা চলেই আসলো। তুবা কান্নাকাটি করে নিজের বেহাল দশা বানিয়ে ফেলেছে। পরিবারের সবার থেকে বিদায় নিয়ে, গাড়িতে বসানো হয়েছে তাকে। এখনো গাড়ির জানালা দিয়ে চেয়ে চেয়ে দেখছে প্রিয় মুখগুলো। আরিয়ানও সবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে বসল। তূর্জান বারবার বলে দিয়েছে, সে নাকি নেওয়াজ বাড়ির জান নিয়ে যাচ্ছে। তার যথাযথ খেয়াল রাখতে। বাবারে যে ভাই বিয়ের দিনই বোনের জন্য বোনের হাজবেন্ড কে এই হারে ইনডাইরেক্টলি হুমকি দেয়। সে না জানি ভবিষ্যতে কি কি করতে পারে? সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় সব রীতি তাড়াতাড়ি শেষ করে দেওয়া হয়েছে। মির্জা বাড়ি নেওয়াজ বাড়ি থেকে অধিক দূরত্বে হওয়ায় আগেই বেরোতে হচ্ছে। তাও যেতে যেতে প্রায় বারোটা বাজবে।
আরিয়ানের বাবা তাজারুল নেওয়াজের থেকে বিদায় নিলেন। তারা এক খাটি সম্পর্ক থেকে অন্য আরেকটা পারিবারিক সম্পর্কে গেলেন। বন্ধু থেকে বেয়াই সম্পর্ক। সবশেষে বিদায় নিয়ে মির্জা বাড়ির গাড়িগুলো ছুটে গেল, তার গন্তব্যে।
বিদায়ের পালা শেষে অনেক অতিথিই তার গন্তব্যে ছুটলেন। বাড়িতে এখন কেবল নেওয়াজ পরিবার আছেন। সারাদিন ভীষণ খাটুনির পর, সবাই ক্লান্ত। বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। সবাই সবাইকে ডেকে বিশ্রামের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন। রোজাকে আগেই বরণ করে নিয়েছেন তানিয়া নেওয়াজ। সবাই গেলেও তানিয়া নেওয়াজ এখনো দাড়িয়ে আছেন। রোজাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে মাথায় হাত রেখে কপালে চুমু একে বললেন, তাড়াতাড়ি ভিতরে আসতে। তূর্জান চলে আসবে।
তিনি যেতেই রোজা গেটের দিকে উকি দিল। লোকটা সেই তখন কল রিসিভ করতে ওদিকে গেল। এখনো আসছে না কেন? তার জন্য রোজার এখনো কত শখ অপূরণীয় থেকে গেল। উকি দেওয়ার মাঝেই তূর্জান ফোনের দিকে তাকিয়ে সামনে এগিয়ে এলো। রোজার পাশ কাটিয়ে একটু সামনে এগোলো। রোজার এবার অভিমানের পাল্লা দ্বিগুন হলো। যার জন্য দাড়িয়ে আছে, সেই তাকে না দেখে ফোন স্কল করতে করতে চলে যাচ্ছে। রোজা কি অদৃশ্য হয়ে আছে?, যে তাকে দেখা যাচ্ছে না।
রোজা ওভাবেই দাড়িয়ে রইলো। পরনের ভারী লেহেঙ্গা আর গয়নায় জন্য ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। এতক্ষন ধরে এইসব পড়ে আছে। রোজা নিজের নখ খুটতে খুটতে তূর্জানের দিকে তাকাতে চাইলো। হঠাৎ শক্তপোক্ত কোনো বক্ষে বাধা খেল। সামনে স্বয়ং তূর্জান নেওয়াজ দাড়িয়ে আছে। রোজা হঠাৎ ধাক্কায় পিছপা হওয়ার আগেই তূর্জান সামলে নিলো। ফোন পকেটে রেখে দুহাত কোমড়ে দিয়ে প্রেয়সীকে আগলে নিলো। রোজা কথা বলবে না। তাই অন্যপাশে মুখ ঘুরিয়ে রাখলো।
“ মিসেস নেওয়াজ, শুনতে পাচ্ছেন? “
“ না। “
“ আমার একান্ত ব্যক্তিগত সুইটনেস রোজ শুনতে পাচ্ছো? “
“ না, শুনতে পাচ্ছি না। “
“ আমার মেয়ের আম্মু, শুনতে পাচ্ছে কি? “
“ না, সে শুনতে পাচ্ছে না। “
তূর্জান এবার রোজার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “ বউ, শুনতে পাচ্ছিস। “
রোজা অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে বলল, “ সরুন তো, আপনার সাথে আমার কথা নেই। আপনার জন্য আমার কত শখ পূরণ হয়নি। আমি আপনাকে বিয়ে করিনি। “
তূর্জান হেসে বলল, “ সত্যিই? “
“ হুমম। আমি আপনাকে নয়বার কবুল বলেছি, সব ফেরত নিয়ে নিলাম। “
বলেই আবার নয়বার কবুল বলল। রোজা যে কয়বার কবুল বলেছে, তূর্জান প্রত্যেকবার রোজার সাথে কবুল বলেছে।রোজা অভিমানী কণ্ঠে বলল,
“ ফেরত নিয়ে নিয়েছি কবুল। এইবার আমাকে ছাড়ুন। “
“ ফেরত নিতে গিয়ে আবার নয়বার বললি, মানে তুই আমাকে আবার তিনবার বিয়ে করলি। এতো ভালোবাসা রাখবো কই বউ? “
রোজা তূর্জানের কথায় আর কিছুই বলতে পারলো না। মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখলেও চোখের কোণে অভিমানের সাথে লুকানো একটা অদ্ভুত নরমতা কাজ করছে। তূর্জান সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। সে ধীরে ধীরে রোজার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে নিলো। এবার জোর করে না, একদম আলতো করে,যেন অনুমতি নিচ্ছে।
তূর্জান একটু নিচু গলায় বলল,“ তা শখগুলো কি জানতে পারি? আর আমার জন্য আপনার শখ পূরণ হলোনা, এটা জাস্ট মানতে পারছি না। “
রোজা নাক ফুলিয়ে বলল, “ আমি আপনার জন্য বিয়ের দিন কারে উঠতে পারলাম না। পুরো শহর ঘুরে দেখা হলোনা। “
তূর্জান কথা ঘুরিয়ে বলল,”এই ভারী লেহেঙ্গা পরে তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন এখনো?”
রোজা মুখ না ঘুরিয়েই বলল, “কারণ কেউ খেয়ালই করছে না আমাকে।”
তূর্জান এক সেকেন্ড চুপ থেকে হালকা হাসলো। তারপর রোজার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো।
“আমি যদি খেয়াল না করি, তাহলে এই হাতটা ধরলাম কেন?”
রোজা কিছু বললো না। শুধু তাকিয়ে রইলো। তার চোখে এখনো অভিমান আছে, কিন্তু সেই অভিমানের ভেতরেই কোথাও একটা ভরসাও জমে আছে।তূর্জান ধীরে বলল, “ তা এখানে যে একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলি কেন? “
রোজা একটু নড়ে উঠে বলল,“তাই নাকি? আমাকে দেখেছেন? তাহলে সামনে দিয়ে চলে গেলেন কেন?”
“কারণ আমি ভেবেছিলাম তুই ডাকবি।”
“আমি কেন ডাকবো?”
তূর্জান একটু ঝুঁকে বলল, “কারণ তুই অভিমান করলে আরও সুন্দর লাগে।”
এই কথা শুনে রোজা অবাক হয়ে তাকাল।
“আপনি কি আমাকে রাগাতে চান?”
তূর্জান খুব শান্তভাবে বলল,“না,আমি তোকে বুঝতে চাই।”
রোজা এবার চোখ নামিয়ে ফেললো। সে আর কিছু বলতে পারছে না। অভিমানটা যেন একটু একটু করে গলে যাচ্ছে।
তূর্জান আবার বলল, “চলো বউ ভিতরে যাই। সবাই ক্লান্ত। আর তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে তোমার পা ব্যথা করবে।”
রোজা এবার আস্তে করে বলল, “আপনি আগে আগে চলে গেলেন কেন?”
তূর্জান একটু থামলো। তারপর বলল, “আমি ফোনে একটা জরুরি কল পেয়েছিলাম। কিন্তু ভুল করেছি… তোমাকে না বলে চলে যাওয়া ঠিক হয়নি।সরি!”
রোজা এবার হালকা গলায় বলল, “ভুল তো করলেনই। সরি লাগবে না।”
তূর্জান একটু হেসে বলল, “তাহলে শাস্তি হবে কী?”
রোজা একটু ভেবে বলল, “আজকে আমার শখ পূরণ করবেন।”
তূর্জান মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে। শখ কী? ঘুরতে যাওয়া? “
রোজার নিশ্চুপতা বুঝিয়ে দিচ্ছে, এটাই তার শখ।
তবে এতো রাতে যাওয়া ঠিক হবে কি না ভেবে রোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকতে যাবে—ঠিক তখনই তূর্জান তার হাতটা হালকা টান দিয়ে থামিয়ে দিল।
“এক মিনিট। “
রোজা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “এবার আবার কি?”
তূর্জান একটু রহস্যময় হাসি দিল, “তোমার শখ পূরণ করতে হবে না?”
রোজা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “হুমম… কিন্তু এতো রাতে যাওয়া ঠিক হবে না ?”
“চল বাইরে যাই।”
“বাইরে?এখন?”
তূর্জান চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল, “বিশ্বাস আছে আমার উপর?”
রোজা এক সেকেন্ড চুপ থেকে আস্তে বলল,” আত্মবিশ্বাস আছে।”
“তাহলে চল।”
তূর্জান রোজার হাত ধরে বাড়ির ড্রয়িংরুমে নিয়ে এলো। দুইমিনিট দাঁড়াতে বলে দৌড়ে নিজের রুমে গেল। কি করল কে জানে? ফিরে এসে রোজার হাত ধরে বাইরে নিয়ে যেতে থাকল। হঠাৎ রাহেলা নেওয়াজ পিছন থেকে বলল, “ কি-রে এতো রাতে কোথায় যাচ্ছিস? “
“ লং ড্রাইভে। যাবা? “
তূর্জানের ত্যাড়া উত্তরে রাহেলা নেওয়াজ মুখ বাকালো। তার কি কাজ, এরা কোথায় গেল বা না গেল? তিনি তো পানি খেতে এসেছেন। তবে রোজার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ যেখানে যাবি যা। রোজার পোশাক পাল্টে নিয়ে যা। এত ভারী লেহেঙ্গা পড়ে ওর অস্বস্তি হবে। “
রাহেলা নেওয়াজের কথার মাঝেই রোজাকে কোলে তুলে নিল।যেতে যেতে রাহেলা নেওয়াজের উদ্দেশ্যে বাক্য ছুড়লেন, “বউ আমার! বউসহ বউয়ের ভারী লেহেঙ্গা সামলানোর দায়িত্বও আমার। “
তূর্জান এবার রোজাকে নিয়ে আবার গেটের বাইরে বেরিয়ে এলো। চারপাশে হালকা রাতের বাতাস, দূরে কিছু আলো, আর এক অদ্ভুত নিরবতা।গেটের ঠিক বাইরে এসে তূর্জান থামলো।
“চোখ বন্ধ করো তো বউ।”
রোজা একটু সন্দেহ নিয়ে বলল, “না করলে?”
“তাহলে সারপ্রাইজটা পাবা না।”
রোজা একটু ভেবে শেষমেশ চোখ বন্ধ করল। “ঠিক আছে… কিন্তু কিছু উল্টাপাল্টা করবেন না!”
তূর্জান হেসে বলল, “আমি কখনো তোর সাথে উল্টাপাল্টা করেছি ?”
রোজা কিছু বলল না, শুধু চোখ বন্ধ রেখেই তূর্জানের বক্ষে পরে রইলো। রোজাকে দাড় করিয়ে দিল।তূর্জান আলতো করে রোজার কাঁধে হাত রেখে কয়েক কদম সামনে নিয়ে গেল। তারপর থেমে বলল,“এবার চোখ খুলো।”
রোজা ধীরে ধীরে চোখ খুলল,আর খুলেই একদম স্থির হয়ে গেল।সামনে একটা সুন্দর ডেকোরেশন করা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে,পুরোটা ছোট ছোট ফেয়ারি লাইটে মোড়া, ফুল দিয়ে সাজানো। গাড়ির সামনে লেখা—
“Mrs. Neowaj’s First Ride ”
রোজার চোখ এক মুহূর্তেই ভিজে উঠল।তার গলা কাঁপছে।“এটা… আমার জন্য?”
তূর্জান পাশে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে বলল, “তুমি বলেছিলে তোমার শখ অপূর্ণ রয়ে গেছে। আমি ভেবেছিলাম… আজকে তোমার প্রথম রাতটা একটু আলাদা হোক।”
রোজা ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে ফুলগুলো ছুঁয়ে দেখল,যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।“আপনি… কখন করলেন এগুলো?”
তূর্জান হালকা হেসে বলল,“যখন তুমি ভেবেছিলে আমি তোমাকে খেয়াল করছি না,”
রোজা এবার তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। চোখে পানি, ঠোঁটে হালকা হাসি। দৌড়ে গিয়ে তূর্জানের গলা জড়িয়ে ধরল। তূর্জান কয়েক পা পিছিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়েছে। রোজার কোমড়ে হাত দিয়ে খানিকটা উচু করে ধরল। ফলস্বরূপ রোজার পা মাটি থেকে খানিকটা উচুতে।এই প্রথম নিজে থেকে আলিঙ্গন করলো, স্বামী নামক পুরুষকে। অভিমান ভরা কণ্ঠে বললো,
“ সরি,আমি আপনাকে ভুল বুঝেছি…”
তূর্জান মিটিমিটি হেসে বললো, “তুই ভুল বুঝলে সমস্যা নেই, আমি আছি তো ঠিক করে নেওয়ার জন্য । তবে এভাবে বারবার কাছে আনার জন্য হলেও তোকে রাগানো উচিত।”
রোজা এবার আর নিজেকে থামাতে পারলো না। হঠাৎ করে তূর্জানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।আস্তে করে বলল,“ধন্যবাদ…”
তূর্জান একটু অবাক হলেও, তারপর হাসল। বউ তার একদম পাগল। এখনো ছোটদের মতো অভ্যাস রয়ে গেছে।তূর্জান দরজা খুলে রোজাকে বসতে সাহায্য করল। তারপর নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসল।গাড়ি ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল। চারপাশে নিরব রাত, রাস্তার লাইটগুলো একে একে পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
রোজা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার মুখে এখন একদম অন্যরকম প্রশান্তি।জিজ্ঞেস করল,“কোথায় যাচ্ছি?”
তূর্জান একটু তাকিয়ে বলল, “যেখানে তোর মন ভালো হবে।”
রোজা হেসে ফেলল, “তাহলে তো অনেক দূর যেতে হবে।”
তূর্জান বলল,“সমস্যা নেই,আজ রাতটা পুরো তোর নামে লিখে দিলাম।”
গাড়ির ভেতরে নরম একটা গান বাজছে। রোজা আস্তে করে মাথা ঠেকিয়ে দিল সিটে।গাড়ি এগিয়ে চলল অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে…আর তাদের নতুন জীবনের গল্পটাও ঠিক সেভাবেই শুরু হয়ে গেল একটা ছোট্ট সারপ্রাইজ দিয়ে, কিন্তু অনেক বড় একটা ভালোবাসা নিয়ে।
তূর্জান ছোট্ট একটা রেস্টুরেন্টের পাশে গাড়ি পার্কিং করলো। রোজাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখেই তূর্জান বাইরে চলে গেল।রোজার জায়গাটা চিনতে বেশ কষ্ট হলো না। এখান থেকেই তূর্জান যাওয়ার আগে রোজাকে পায়েল আর চুড়ি কিনে দিয়েছিলো। আবার হঠাৎ এখানে কেন এলো? ভাবনার মাঝেই তূর্জান গাড়িতে ফিরে এলো। রোজার হাত দুটো নিয়ে সব ভারী চুড়ি খুলে দিতে লাগল। অবশেষে খুলে দিয়ে এইমাত্র কিনে আনা কাচের চুড়ি নিজ হাতে পড়িয়ে দিল।
ইশশ! কি সুন্দর লাগছে চুড়িগুলো। তারপর একেএকে রোজার সব ভারী গহনা খুলে ফেলতে বললো। এত গহনা পরতে হবে কেন? অস্থিরতা বাড়ায় এসব গহনা। রোজা প্রথমে অবাক হলেও তূর্জানের কথা ঠিকই মনে হলো। আসলেই তো এসব ভারী গহনা রোজা পরে আছে? তূর্জানের কথামতো গহনা খুলে একদম স্বাভাবিক হয়ে বসল। গহনা গুলোর জায়গা হলো গাড়ির ব্যকসিটে।
তূর্জান গাড়ির ডোর খুলে রোজাকে বেরিয়ে আসতে বললো। এই সেই নদীর পাড় যেখান থেকে তাদের দূরত্ব শুরু। এখান থেকে দেখার পর দশবছর কেউ কারোর মুখ দেখতে পায়নি। তূর্জান রোজার হাত ধরে সামনে এগোতে থাকল।
রোজা আজ একটা কথাও বলছে না। শুধু তূর্জানের মত অনুসারে তা মেনে চলছে। শুধু দেখছে একটা মানুষ ভালোবেসে আর কত পাগলামি করতে জানে?
মাথা নিচু করে হাঁটতে শুরু করলো, আর তূর্জান ঠিক তার পাশেই রইলো,একদম ছায়ার মতো, কিন্তু সবচেয়ে নিরাপদ ছায়া।
রোজার হাত এখনো তূর্জানের হাত আবদ্ধ হয়ে আছে । আর একটু শক্ত করে ধরে নিল হাতটা।
আর তূর্জান? সে একবারও হাত ছাড়েনি।
কারণ আজ থেকে, এই নতুন জীবনে—রোজার অভিমানও তার কাছে আর দূরত্ব না, বরং আরও কাছে টেনে আনার একটা অজুহাত। শুধু দুই নর-নারী নদীকে সাক্ষী রেখে অজানা গন্তব্যে হাটতে লাগল। নদী সাক্ষী হলো, এক অবিশ্বাসী ভালোবাসার গল্পের উপাখ্যান হয়ে। আর দুজন নদীকে সাক্ষী রেখে যেন বলে চলেছে, “ ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।
তূর্জান আনমনেই রোজার সাথে হাটতে হাটতে গেয়ে উঠলো,
” এ মন শুধু তোমার,
তুমি শুধু আমার
খুজে ফিরি আজও তোমাকে বারেবার..!
ভালোবাসি তোমায়,
কাছে চাই বারেবার,
তোমায় ছাড়া জগৎ লাগে বড় আধার..!
ভালোবাসি তোমায়,
কাছে চাই বারেবার,
তোমায় ছাড়া জগৎ লাগে বড় আধার..!”
ইনশাআল্লাহ চলমান….
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২১
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৫
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৮
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩৮
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৮
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩৯