Golpo romantic golpo প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা

প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা (অন্তিম পর্ব-শেষাংশ )


প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা (অন্তিম পর্ব-শেষাংশ )

ফারজানারহমানসেতু

সন্ধ্যা হতেই আকাশে মেঘেরা বর্ষনের আভাস দিচ্ছে। ক্ষনেক্ষনে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হয়তো বৃষ্টিও পরবে, কিছুক্ষনের মধ্যে। প্রকৃতির ইশারাও আজকাল বোঝা দায়। এদিকে অনন্যাদের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া পর্ব শুরু হয়েছে। একসাথে সবাই খেতে বসছে। তূর্জানের পাশে বসেছে রোজা। যদিও সবাই যার যার মতো বসে, কৌশলে ওই একটা চেয়ার ফাকা রেখেছে। অসভ্য পুরুষ সুযোগ বুঝে রোজার হাত চেপে ধরে আছে। পা দিয়ে রোজার পায়ের পাতা চেপে ধরে আছে। রোজা চেচাতেও পারছে না। তবে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো।

অনন্যার মা আর নূর মিলে সবাইকে খাবার সার্ভ করছে। সাথে অনন্যা হেল্প করছে। সবাই যার যার প্লেটে খাবার তুলে নিলেও রোজা এখনো নির্বিকার হয়ে আছে। সে খাবার প্লেটে তুলবে কি করে? তার ডানহাত তো অসভ্য পুরুষ ধরে আছে। তূর্জান নিজের প্লেটে খাবার নিয়ে রোজার প্লেটে তুলে দিল। খাবার তুলে দিল, অথচ খাবে সেই হাত ধরে রেখেছে। কি অদ্ভুত মানুষ।

হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই তাকে শুনতে হলো, আরেকটা অসভ্য কথা। তূর্জান রোজার দিকে খানিকটা ঝুকে বলল, “ হিসাব নিবো, বাড়িতে চল। “

“ অসভ্যতামো করছেন কেন? আমার আপনার সাথে কোনো কথা নেই। হাত ছাড়ুন!”

“ হাত ছাড়ুন, হাত ছাড়ুন করলে, কোলে বসিয়ে দিবো। “

রোজা চোখ বড়বড় করে তাকালো। কি অসভ্য ভাবা যায়। রোজা চুপ করে বসে রইলো, বলা যায় না। যদি সত্যি সত্যিই কোলের উপর বসায়। রোজার পাশে রাফিয়া বসেছে। রোজাকে চুপ করে থাকতে দেখে একবার তাকালো, যা বোঝার বুঝে গেছে। অগত্যা সে বলল, “ রোজা আমি তোকে খাইয়ে দিই? “

বলেই তূর্জানের দিকে তাকালো।দুজনেই হাসলো মনে হলো। মানে কি? এই দেবর ভাবি প্লানিং করে এমন ভাবে বসেছে। রোজার আর কি করার? যদিও সে ভীষণ খুশি, কতদিন পর সে বোনের হাতে খাবে। এদিকে তুবা আরাজকে খাইয়ে দিচ্ছে। আরিয়ান, মিরান, রাফেজ দুনিয়ার সবগল্প নিয়ে মেতেছে। তাজারুল নেওয়াজ, মোস্তফা নেওয়াজ খেতে খেতে অনন্যার মায়ের সঙ্গে আলাপচারিতা করছে। নেওয়াজ বাড়ির তিন সদস্য বাড়িতে আছে, রাহেলা নেওয়াজ, তানিয়া নেওয়াজ, আর রেহেনা নেওয়াজ। রাহেলা নেওয়াজ অসুস্থ থাকায় তার দেখাশোনার জন্য দুইজন বাড়িতে রয়ে গেছে।

সবার খাওয়া শেষের দিকে। তবে খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ রোজা থেমে গেল। খেতে তার ভালো লাগছে না,উঠল। রাফিয়াকে বলল, সে আর খাবে না। রাফিয়া জোর করতেই রোজা মুখ কুচকে বসল। রাফিয়া জোর করল না আর।

কি ভেবে তূর্জানের দিকে আহত দৃষ্টি ফেলল। তূর্জান হাত ছেড়ে দিতেই দৌড়ে বেসিনে চলে গেল। তবে বেসিনে যেতেই বমি করে দিল। বেসিন ধুয়ে দিয়ে, হাতমুখ ধুয়ে বাইরে আসলো। হঠাৎ মাথা ঘুরে উঠতেই, দাড়িয়ে পড়ল ড্রয়িং রুমে। মাথা কেমন ঘোরাচ্ছে। ইদানিং এমন হয়। খেতে ভালো লাগে না, মাথা ঘোরায়, আর কিছু খেতে গেলেই বমি আসে। কি বাজে পরিস্থিতি। রোজার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আছে বিধায় এমন আগেও হতো। তাই এসব স্বাভাবিক । তবে আগের থেকে দুর্বল লাগে নিজেকে।

রোজার পাশ দিয়ে তূর্জান বেসিনে চলে গেছে। অথচ সে খেয়াল করেনি। কি অদ্ভুত! মাথা এমন ঝিম ধরছে কেন? হঠাৎ মাথা ঘুরে ড্রয়িংরুমের ফ্লোরে পরে গেল রোজা। সকলে একপ্রকার চেচিয়ে উঠতেই তূর্জান দৌড়ে এসে রোজাকে আগলে নিল। সবাই রোজার চারপাশে জড় হয়ে গেছে। পালস চেক করতেই দেখা গেল, একদম আস্তে পালস চলছে। তাজারুল নেওয়াজ এক সেকেন্ড সময় ব্যায় না করে, ডাক্তার কে নেওয়াজ বাড়িতে যেতে বললেন। তূর্জানকে বলল, বাড়িতে ফিরে যেতে, ডাক্তার বাড়িতে যাবে।

তূর্জান যত্ন করে রোজাকে কোলে তুলে নিয়ে হাঠা ধরল, গাড়ির উদ্দেশ্য। তূর্জান যেতেই অনন্যার মা আর নূর, সমুদ্রের থেকে বিদায় নিয়ে তারা সবাই বেরিয়ে পড়ল, নেওয়াজ বাড়ির উদ্দেশ্যে। রাফিয়া কেদে নিজের অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে। তার বোনের আবার কি হলো?


তূর্জানের রুমে নেওয়াজ বাড়ির সকল সদস্য। সবাই চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, ডাক্তারের দিকে। শুধু একপাশে বিধ্বস্ত অবস্থায় তূর্জান বসে আছে। রোজার জ্ঞান ফেরেনি এখনো। অজানা ভয় কাজ করছে তূর্জানের মাঝে, দশবছর আগের কথা.. না ভাবতে পারছে না তূর্জান।

রেহেনা নেওয়াজ, আর তানিয়া নেওয়াজ রোজার পাশে বসে কেদে চলেছে। তুবা, রাফিয়া, অনন্যার অবস্থাও বেগতিক। সবার ধারণা, যদি রোজা আগের মতো হয়ে যায়।

ডাক্তার পালস চেক করে, চোখ দেখে নিলেন। বারবার একই ভাবে পালস চেক করলো। সবার দিকে তাকাতেই একটু ঘাবড়ে গেলেন। সবার চোখে প্রশ্ন। কার কি প্রশ্ন তাই তো তিনি বুঝতে পারছেন না । ডাক্তার তাজারুল নেওয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল, “ আমি আগে কার প্রশ্নের উত্তর দিবো? “

মোস্তফা নেওয়াজ বলল,“ কারোর না। আপনি যা বুঝেছেন ওটা বলুন।আমার মেয়ে ঠিক আছে তো? “

“ মেয়ে তো ঠিক নেই। “

মোস্তফা নেওয়াজ একমিনিট দেরি না করে তাজারুল নেওয়াজ কে বলল, “ ভাইজান, এক্ষুনি রোজাকে নিয়ে হসপিটালে যাবো।”

“ আরে থামুন মি নেওয়াজ। “

“ কি থামবো? আমার মেয়ে জ্ঞান হারিয়ে পরে আছে, আর আমি থেমে থাকবো। “

ডাক্তার ভনিতা করে একটু হেসে বললেন,“এত চিন্তা করার কিছু নেই। আগে পুরোটা শুনুন।”

সবাই যেন নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তূর্জানের বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে অস্বাভাবিকভাবে।ডাক্তার ধীরে ধীরে বললেন,
“আপনাদের মেয়ে না কি বৌমা? সে যাইহোক সে একটু অসুস্থ, কিন্তু খুব ভালো সুসংবাদ আছে।”

ঘরে এক মুহূর্তে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। তাজারুল নেওয়াজ কপাল কুঁচকে বললেন,“ভালো খবর মানে? ডাক্তার আপনি পাগল, বৌমা অসুস্থ আপনি ভালো খবর বলছেন।”

ডাক্তার যেন আকাশ থেকে পরলো। তাকে পাগল বানিয়ে দিচ্ছে সবাই। নিজের অপমানকে একপাশে রেখে হালকা হেসে বললেন,“ আপনারা দাদু-নানা হতে চলেছেন। মিসেস রোজা প্রেগন্যান্ট।”

কথাটা শেষ হতেই যেন পুরো ঘর থমকে গেল।
“কি…!”একসাথে কয়েকজনের মুখ থেকে বের হলো। রাফিয়া কান্না থামিয়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তুবা মুখে হাত দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়ল, ভাগ্যিস আরিয়ান সামলে নিয়েছে।

জোরে চেচিয়ে উঠল, আম্মু আমি ফুপি হচ্ছি আবার। আম্মু তুমি দাদুভাই হবে, বাবা তুমি দাদাভাই, কাকামনি নানাভাই , আর কাকিমনি নানুভাই। আমার যে কি মজা হচ্ছে। “

তুবার চেচানো শুনে রাফিয়া রাফেজের দিকে চেয়ে বলে উঠল,” আমি কাকিমনি,আর তুমি কাকামনি। “

রেহেনা নেওয়াজ আর তানিয়া নেওয়াজ একে অপরের দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসল। আরাজ এতকিছুর মধ্যে বললো, “ তোমরা সবাই কিউটিপাইকে এখনি ভাগ করে নিচ্ছো? তাহলে আমি কি? “

তুবা আরাজের নাক টেনে দিয়ে বলল, “ তুই, ভাইয়া। “

নাক কুচকে আরাজ বললো, “ ভাইয়া..? কেমন ভাইয়া? তূর্জান কাকামনির মতো, না মিরান কাকামনির মতো ভাইয়া হবো?”

বড়রা কেশে উঠলো, আরাজের কথা শুনে। ডাক্তার কিছুই বুঝতে পারছে না। এক এক জনের এমন রিয়াকশন, কোনটা ঠিক, সবাই খুশি। না কি সবাই অবাক? ডাক্তারের এখন মনে হচ্ছে ডাক্তার দেখাতে হবে। কি পরিবার রে বাবা!

আর তূর্জান সে যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। চোখ স্থির হয়ে আছে রোজার দিকে। মিরান আর রাফেজ তূর্জানের দিকে তাকিয়ে আছে। তূর্জানের কি দোষ এখানে, এমন আসামীর কাঠগোড়ায় দাড়ানো আসামীর মতো চেয়ে দেখছে সবাই।

তানিয়া নেওয়াজ রোজার দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে ফেলল। তিনি দাদুভাই হবে, এর চেয়ে কি আনন্দ হতে পারে।

ডাক্তারের এখান থেকে যাওয়াই উত্তম মনে হচ্ছে। তিনি না আবার এই পরিবারের সাথে পাগল হয়ে যায়,মাথা নেড়ে বললেন,“ মি. নেওয়াজ শুনুন, উনি একটু দুর্বল হয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করছে না মনে হচ্ছে।আর স্ট্রেসও বেশি যাচ্ছে ওনার উপর। কিছু টেস্ট করাতে হবে, আর এখন থেকে খুব যত্ন নিতে হবে। আর জ্ঞান ফিরেছে ওনার, জাস্ট শরীর দুর্বলের জন্য অবচেতন হয়ে আছে।”

তূর্জানের চোখে অদ্ভুত এক ঝিলিক ফুটে উঠল। ভয়, স্বস্তি আর অজানা আনন্দ,সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি। বাইরে তুমুল বর্ষন শুরু হয়েছে। এই ওয়েদারে এমন খবর, সব মিলে বাড়িতে যেন আনন্দের শেষ নেই।

তূর্জানের বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে, সবাই মিটিমিটি হেসে রুম ত্যাগ করলো। মিরান এখনো দাঁড়িয়ে আছে। তূর্জানের দিকে তাকিয়ে বলল, “ আমার বুদ্ধিতে তুমি আজকে বাবা হচ্ছো। নয়তো…

কথা শেষ না করে চলে গেল। তূর্জান তো কিছু খেয়ালই করেনি। তার দৃষ্টি রোজার উপর নিবদ্ধ।
সে ধীরে ধীরে রোজার পাশে গিয়ে বসে পড়ল। কাঁপা হাতে রোজার কপালে হাত রাখল। আস্তে করে ডাকল, “ রোজা। এই রোজা..!ওঠ, আমি একা এতবড়ো খুশির সংবাদ হজম করতে পারছি না।”

রোজা একটু নড়ে উঠল। তবে শরীর দুর্বল থাকায় চোখ খুলতে পারলো না। ওভাবেই কেটে গেল, কিছু সময়।খানিকবাদে রোজা তাকালো।
চোখে ঝাপসা দেখছে। তবুও তূর্জানের চোখের পানি তার চোখে স্পষ্ট। তূর্জান কান্না করছে কেন? কিন্তু কেন? রোজা তো ঠিক আছে!’ তাহলে? এভাবে কান্না করছে কেন? রোজা উঠতে গেলে, তূর্জান উঠতে দিলো না। রোজা তাও জোর করে উঠে বসল। রোজার সব অভিমান তো এই চোখের পানি দেখে বিদায় নিয়েছে। রোজারও যে প্রিয় পুরুষের চোখে জল দেখে কান্না উগড়ে আসছে। হৃদয়ে ব্যাথা লাগছে।

উঠে দুহাতের আঁজলায় তূর্জানের মুখ নিয়ে বলল, “ কি হয়েছে? এভাবে কাদছেন কেন? “

বলতেই তূর্জান রোজাকে কোলে তুলে নিল। আকস্মিক এমন করাতে রোজা ভড়কে গেল। দুহাতে তূর্জানের গলা জড়িয়ে নিল। তূর্জান রোজাকে কোলে নিয়ে ঘুরতে লাগল। রোজা ভ্রু কুচকে তাকাতেই ঘোরা থামিয়ে দিল। কপালে আলতো চুমু দিয়ে বলল, “ আমাকে এতো সুন্দর উপহার দেওয়ার জন্য থ্যাংকস। আমি আজকে সবচেয়ে বেশি খুশি। আজকের খুশি আমি বলে বোঝাতে পারবো না। “

রোজা কিছুই বুঝল না, কি নিয়ে এতো খুশি। প্রশ্নসূচক তাকাতেই বলল, “ কেউ একজন আমাকে পাপা বলার জন্য চলে এসেছে। “

“ কোথায়? আপনি কি আবল তাবোল বকছেন? বলুন তো। আর এভাবে কোলে তুলে রেখেছেন কেন? নামিয়ে দিন। “

তূর্জান রোজাকে বেডে বসিয়ে দিয়ে নিজে ফ্লোরে বসল। শাড়ির উপর দিয়েই রোজার পেটে হাত রাখল। রোজার দিকে তাকিয়ে বলল, “ এই যে, এখানে। আমার সবথেকে সুন্দর গিফ্ট এখানে রেখে দিয়েছিস। “


রাত হয়ে গেছে, আর বাইরে বৃষ্টি পরছে বিধায় তুবা, আরিয়ান আজ নেওয়াজ বাড়িতে রয়ে গেছে। বেলকনিতে দুজন বসে আছে। তুবা আরিয়ানের পাশে বসে দুজনে বৃষ্টি উপভোগ করছে। কি নিদারুন দৃশ্য। এই কোনো এক বৃষ্টিস্নাত রাতেই আচমকা কোনো এক মানব ওপাশ থেকে কথা বলেছিল। রোজা তার কণ্ঠের প্রেমে পরেছিলো সেদিন। আজকে তার বুকে লেপ্টে আছে। হাজার মাইল দুরুত্ব ঘুচিয়ে, অচেনা লোক তাকে আপন করে নিয়েছে। তুবার আজ বলতে ইচ্ছে করছে,
“ শোন পৃথিবী, ভালোবাসা সত্যি হলে ; হাজার মাইল দুরুত্ব তা কমাতে পারে না।
ঠিক খুজে নেয়, তার আপন ঠিকানা, যেখানে থাকে তার আপন জনেরা।”

*
মিরান রুমে এসেই ধপাস করে শুয়ে পড়ল। ক্লান্ত লাগছে অনেক। অনন্যা তখন কেবল ফ্রেশ হয়ে শাড়ি চেঞ্জ করে এসেছে। গায়ে থ্রী-পিস জড়ানো। দেখতে মিষ্টি লাগছে। বাইরে বৃষ্টি, আর ঘরে সুন্দরী মিষ্টি বউ। অথচ চোখ ভর্তি ঘুম। অনন্যা বেলকনিতে গিয়ে দাড়াল। বৃষ্টি তার পছন্দ, ভীষণ পছন্দ। মিরান উঠে ফ্রেশ হয়ে অনন্যা কে শুয়ে পড়তে বলল। সকালে উঠতে হবে, মিরান বলেছে, পড়াশোনা আবার শুরু করতে। অনন্যা রুমে এসে দেখল মিরান রুমে নেই। কোথায় গেছে? অনন্যা লক্ষী মেয়ের মতো শুয়ে পরল। ঘুমের ঘোরে টের পেল, কেউ তাকে আষ্টেপৃষ্টে আছে। উহু অনন্যা ঘুমায়নি, সে তো মিরান আসার অপেক্ষা করছিলো। মিরানের দিকে ঘুরে মুখখানা তার বুকে গুজে দিল।

*
রাফিয়া, রাফেজ আর আরাজ মিলে মুভি দেখছে। বৃষ্টির দিনে মুভি দেখার মজাই আলাদা। সাথে পপকর্ন হলে আর কি লাগে? তাদের খুনসুটি আর মুভিতে পুরো জমে উঠল। নেওয়াজ পরিবারের আজ খুশির দিন। আর আল্লাহ তায়ালা খুশি হলে বৃষ্টি বর্ষিত করেন। এর থেকে আর বেশি কি চাই। রাহেলা নেওয়াজ শুনেই বলেছে আল্লাহ খুশি হলে ঘরে মেয়ে দেন। রোজার মেয়েই হবে। কেউ বলেছে ছেলে হবে, অথচ শেষে গিয়ে সবাই বলেছে। যা হবে তাতেই তারা খুশি।

দিন যেতে লাগল, আর রোজা যেন আরো আহ্লাদী হয়ে উঠল সকলের নিকট । সবাই তাকে নিয়ে ব্যাস্ত, কোনো কাজ করা যাবে না, এই খাও সেই খাও। সারাদিন বসে থাকা। ওয়াশরুমেও একা যেতে দেয় না। তূর্জান একা কিভাবে কি করছে?

ভার্সিটি শেষ করে, আবার বিসনেসে সময় দেয়। রাতে এসে আগে, রোজার সব বিষয়ে খোজ নেওয়া। তূর্জান এখন খুব কম ঘুমায়। অর্ধেকরাত জেগে তো রোজার পেটে আকিবুকি করতে থাকে। রোজা ঘুমিয়ে গেলে, তারপর ঘুমায়। রোজা এমনিতেই ঘুমাতে পারে না, তারউপর দুষ্টুর গুতা। এদিকে রোজা না ঘুমানো পর্যন্ত সে জেগে থাকে।
তাজারুল নেওয়াজ আর মোস্তফা নেওয়াজ এই সেই এনে দেয়। সাথে মিরানের কথা বাদ, সে পারলে ফলের দোকান তুলে আনত। রাফেজও নিয়ে আসে। আরিয়ান তুবা মাঝে মাঝেই এসে দেখে যায়।

আর তার প্রিয় পুরুষ তো হিসেবের বাইরে। ওত যত্ন কি আর মুখে বলে শেষ করা যায়। রোজা এখন বোঝে,

” নারী যত্নে গড়ে, যত্নে বাচে,
যত্নেই তার অন্তঃবাস..!
জীবন কাটায়, প্রিয় পুরুষের বক্ষে,
জন্মান্তর আর , শেষ নিঃশ্বাস..! ”

কিন্তু তাও,এত করতে হবে কেন? রোজা যথেষ্ট বোঝে, তাও এমন ছোটমানুষি করে তাকে নিয়ে। একপ্রকার বিরক্ত রোজা। এভাবে চলা যায়? তারপরে কিছুক্ষন পরে পরে দুষ্ট পেটের সাথে যুদ্ধ করে।সন্ধ্যা হতেই তাকে খাবার খাইয়ে দিয়ে তানিয়া নেওয়াজ চুল বেধে দিলেন। রেহেনা নেওয়াজ রুমে দিয়ে আসলেন।

রাত বারোটা বাজতে চলল, তূর্জান ফেরেনি। বাইরে বর্ষন, রোজা ঘুমিয়ে পড়েছিল। আবার উঠে গেছে। ঘড়ির কাটার দিকে চোখ পরতেই চমকালো। আজকে বাইক নিয়ে গেছে, কোথাও কি বৃষ্টিতে আটকে গেছে? হয়তো, তাছাড়া রোজাকে একা রেখে তো এতো দেরি করে না।
ভাবনার মাঝেই তূর্জান রুমে ঢুকল। ভিজে জবজবে অবস্থা। রোজাকে বসে থাকতে দেখে বলল, “ বসে কেন? ঘুমাস নি? “

“ হুমম! ঘুমিয়েছিলাম। একটু আগেই উঠেছি। আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন। কোথাও দাড়িয়ে থাকতেন, এতো ভিজে আসার কি দরকার ছিল?”

“ বাড়িতে জান রেখে বাইরে থাকা সম্ভব হয়নি। “

বলেই ওয়াশরুমে ঢুকল। রোজা হেসে ফেলল। খানিকবাদে, ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখল রোজা বসে আছে। ভ্রু কুচকে বলল, “ ঘুমাচ্ছিস না কেন? শরীর খারাপ করবে তো। “

রোজা এগিয়ে এসে তূর্জানের জড়িয়ে ধরল। হাত দুটো তূর্জানের পিঠে রেখে, মাথা বুকে এলিয়ে দিল। তূর্জানের মাথা চুইয়ে পানি এখনো পড়ছে। মাথা মোছা হয়নি ভালো করে। তূর্জান রোজাকে ঠেলে দিয়ে বলল, “ ভিজে যাবি তো। ঠান্ডা লাগবে। “

রোজা মাথা বুকে দিয়ে তূর্জানকে আরেকটু শক্ত করে আলিঙ্গন করে নিল। তাদের দুজনের মাঝে উচু হওয়া পেট, তূর্জানের পেটে ঠেকেছে। তূর্জান রোজাকে ওভাবে রেখেই, মাথা মুছে নিল। টাওয়াল সেন্টার টেবিলে রেখে রোজাকে জড়িয়ে নিল বাহুডোরে। রোজা প্রশ্ন করে বসল, “ একটা কথা বলবো? “

“ হুমম। “

“ আমি শুনেছি, অনেক মেয়ে মা হতে গিয়ে আর ফেরে না। আমিও যদি ওমন হই.. আপনি কি..

কথা শেষ করার আগেই তূর্জান ধমকে উঠল। এইসব কথা রোজা আগেও বলেছে। তূর্জান নিষেধ করেছে তাও শোনেনি। বারবার এই কথা বলে, সে কি জানে এইকথা তূর্জানের হৃদপিন্ড খান খান করে দেয়। রোজা হেসে বলল, “ বললেন না। আমি মা’রা গেলে, দুষ্টর আরেকটা মা আনবেন কি না? “

তূর্জান রোজাকে জোর করে ছাড়িয়ে নিল। এইসব কথা সে শুনতেও চায়না। কি ভয়ঙ্কর কথা! না খেয়েই বেডে গা এলিয়ে দিল। একপাশে সরে রোজার জন্য সব বেড ফাকা রাখলো। রোজা ইদানিং হাতপ ছড়িয়ে শুয়ে থাকে। রোজা বুঝল অভিমান করেছে। সামনে গিয়ে ডাকল, তবে চোখের উপর হাত দিয়ে তূর্জান চুপচাপ শুয়ে আছে। খাবার খেয়ে নিতে বললো, তাও উঠল না, রোজার কথার প্রতিউত্তরও করল না।

রোজাও শুয়ে পড়ল। তার বুঝি এমন কথা বলতে ভালো লাগে? লাগে না তো। তাও ভাবনায় আসে যদি এমন কিছু হয়ে যায়। রোজা তো চায় না তূর্জানকে ছেড়ে থাকতে। চায় না, এই প্রিয় বক্ষ ছেড়ে চলে যেতে। তূর্জানকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করলো, তূর্জান রোজার পাশ ফিরে শুয়ে পরল।

এইমাত্র তূর্জানের একটু ঘুমের রেশ ধরেছে। রোজা গুঙিয়ে উঠল। ধরপর করে উঠে বসল তূর্জান। উদ্দীগ্ন হয়ে বলল, “ কি হয়েছে জান? ব্যাথা করছে? “

রোজা মাথা নাড়ল, অথাৎ না। সে কি একটু উহ করতে পারবে না। এত কেয়ার ভালো না। তবে উঠেই যখন পরেছে, আর ঘুমাবে না। তা রোজা ভালো করেই জানে। রোজা মুখ ছোট করে বলল, “ আপনার দুষ্ট আমাকে জ্বালাচ্ছে, আজকেও ঘুমের ঘোরে পেটে লাথি দিয়েছে। আমার পেটে থেকে আপনার মতো হচ্ছে কেন? “

“ মেয়ে আমার তাই আমার মতো। “

“ আপনার মেয়ে? আপনার মতো রাগী হবে নিশ্চই? আচ্ছা আপনি আমার মতো শান্ত, অগোছালো, ছন্নছাড়া মেয়ে চান, না-কি রাগী, গম্ভীর, মেয়ে চান?“

“ তোর মতো, ছন্নছাড়া, অগোছালো মেয়ে চাই। কারণ আমি যেভাবে তোকে আগলে নিতে চাই, কোনো এক সুপুরুষ আমার মেয়েকে এভাবে আগলে নিবে। মানে পৃথিবীতে আমি একাই কেন অগোছালো মেয়েকে সামলাবো, আমার মতো আরও একজন আমার অগোছালো মেয়েকে সামলাবে। “

বলেই পেটে চুমু দিল। খুব করে বলে দিল, “ মাম্মাকে ডিসটার্ব কেন করছো? এটা ঠিক না। তোমার মাম্মা কষ্ট পেলে পাপাও কষ্ট পাবে। তুমি পাপার গুডগার্ল, তাই এখন চুপচাপ থাকো। পরে নাহয় আমাকে জ্বালিয়ো। “

তারপর রোজার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভালোবাসি বউ! ভীষণ বাজে ভাবে ওই তুমিতে আসক্ত হয়ে পড়েছি। তবুও ওই তুমিকেই ভালোবাসি, ভালোবাসতাম, ভালোবাসবো! তবে তোমার প্রতি আমার আসক্তি বহুবছরের ; এই আসক্তি এ জন্মে না কাটুক। যেন তোমাকে ভালোবাসার তৃষ্ণা আমার কোনকালে না কমে,তুমি আমার জীবনের শেষ হয়ে থেকে যেও। আমার প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা হয়ে!”


সময় চলমান, রাত শেষে দিন, দিন শেষে রাত করে বছর পেরিয়ে যায়। বসন্ত চলে যায়, আবার ফিরে আসে। তেমনি নেওয়াজ বাড়িতে এখন সবসময় বসন্ত লেগে থাকে। পাঁচ বছর কেটে গেছে। নেওয়াজ বাড়িতে এখনো আগের মতোই আনন্দ উল্লাসে মেতে থাকে। আরাজ এবার প্রার্থমিক শেষ করে, মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে। তুবার কোলে তিনবছরের একটা ফুটফুটে ছেলে। অনন্যা প্রেগন্যান্ট। সামনের মাসেই তার ডেলিভারি ডেট।

তানিয়া নেওয়াজ রেহেনা নেওয়াজকে এখন আর কিচেনে যেতে হয়না। রোজা, রাফিয়া, অনন্যা মিলে সবটাই সামলে নেয়।তাজারুল নেওয়াজ আর মোস্তফা নেওয়াজ বাড়ির ছোটদের সাথে সময় কাটান আর অফিসের হালকা পাতলা কাজে যোগ দেন। তূর্জান আর রাফেজ দুভাই সবটা সামলে নেয়। তূর্জানের একটু কষ্ট হয়ে যায়, ভার্সিটি সামলে আবার অফিস। রাহেলা নেওয়াজ বছর তিনেক আগে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন।

সকালের নাস্তা সেরে তাজারুল নেওয়াজ আর মোস্তফা নেওয়াজ ছোটদের সাথে গল্প করে অফিসে বেরিয়ে গেছেন। এখন ছোটরাও খেয়ে স্কুলে যাবে। আরাজ ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে, তার স্কুলে দেরি হয়ে যাবে নয়তো। এদিকে সবাই নানা কাজে ব্যাস্ত থাকলেও রোজা দৌড়ে বেরাচ্ছে। দুষ্ট মেয়েটা তাকে জ্বালিয়ে শেষ করে দিল। আরাজ ব্রেকফাস্ট করে কাকিমনিকে ওভাবে ছুটতে দেখে বলল, “ কি হয়েছে কাকিমনি? “

“ কাভিয়া ব্রেকফাস্টও করছে না, স্কুলেও যাবে না। “

“ দাড়াও আমি দেখছি। “ বলেই দৌড়ে গিয়ে কাভিয়ার বেনুনি করা ছোট চুল টেনে ধরল। ধমক দিয়ে বলল, “ ইউ আর এ ভেরি ব্যাডগার্ল কাভিয়া। কাকিমনি কখন থেকে তোর পিছনে ছুটছে? “

কাভিয়া চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। যে কেউ দেখলে বলবে, তূর্জানের কার্বন কপি। মুখ ফুলিয়ে বলল, “ উফ, ছাড়ো তো। ইউ আর এ ব্যাড বয়। পাপা বলে, গুড বয়’রা কখনো হিট করে না। “

আরাজ বেনুনি ধরে রোজার দিকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল, “ মেরে তক্তা বানিয়ে দিবো। আমার কাকিমনি কে জ্বালাবি না। “

বলতেই কাভিয়া আরাজের হাতে কামড় বসিয়ে দিল। ছেলেটা একপ্রকার চেচিয়ে উঠল। রোজা দৌড়ে এসে হাত ছাড়াতেই রক্ত বের হয়ে গেল। কাভিয়াকে বকা দিল,রেগে একটা থাপ্পড় দিয়ে দিয়েছে।অতিরিক্ত দুষ্ট হয়ে গেছে এই মেয়ে। কাভিয়া দৌড়ে কোথায় যেন চলে গেল।

আরাজকে সোফায় এনে বসিয়ে রক্ত বন্ধের চেষ্টা করল।হাত লাল হয়ে গেছে। রক্ত বন্ধ হতেই রাফিয়া রোজাকে রাগ করল, কাভিয়া ছোট বোঝেনি তাই কামড়ে দিয়েছে। এতে এত রাগ দেখানোর কি আছে? তাছাড়া কাভিয়ার চুল ধরলে রেগে যায়, এটা আরাজও জানে। তাও সারাদিন কাভিয়াকে জ্বালায় কেন? মেয়েটা ছোট তাই আরাজকে জ্বালায়, কিন্তু সে বড় হয়ে কেন জ্বালাবে?

রোজা চুপ করে আরাজকে নিয়ে তার রুমে গেল। আরাজ মুচকি হেসে বলল, “ ইউ নো খালামনি? মায়ের থেকে খালামনিরা বেস্ট হয়। “

রোজা হেসে কপালে চুমু দিয়ে বলল, “ স্কুলে লেট হয়ে যাবে, রেডি হয়ে নে। “

রোজা কাভিয়াকে খুজতে লাগল। আসলেই মেয়েটাকে এভাবে মারা ঠিক হয়নি। কত জোরেই না লেগেছে কে জানে? রোজা খুজতে খুজতে নিজের রুমে গেল। যা ভেবেছে তাই, পাপার কাছে বিচার দেওয়া শেষ। তূর্জান উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে, কাভিয়া রাতে জ্বালিয়েছে আজকে। রোজা তো ঘুমাচ্ছিলো। তূর্জানকে জ্বালিয়ে ঘুমোতে দেয়নি। কাভিয়া পাপার কাছে শুয়ে পরেছে। তূর্জানের একহাত কাভিয়ার গায়ে জড়িয়ে রাখা। বাবা মেয়ে, একেবারে একদম এক। দুজন দুজনকে ছেড়ে থাকতেই পারে না।

রোজা রুমে যেতেই কাভিয়া বলল, “ পাপা, পচা মাম্মা চলে এসেছে।”

তূর্জান উঠে বসল। চোখ দুহাতে ডলে কাভিয়াকে কোলে তুলে নিল। রোজাকে ধমকে বলল, “ আমার মেয়েকে বকেছিস কেন? আর কোন সাহসে গায়ে হাত তুলেছিস? “

রোজা অবাক, মেয়ে তার একার। রোজার কি তাহলে? রোজা বলল, “ ও আরাজের হাত কামড়ে দিয়েছে। কত রক্ত বের হয়েছে জানেন? “

“ আমি বুঝে নেব। বুঝিয়ে বললে ও আর এমন করতো না। কিন্তু তুই গায়ে হাত কেন তুলেছিস? “

রোজা বিরক্ত হলো ভীষণ। এই বাপ মেয়ে কি লজিক নিয়ে ঘোরে কে জানে। কাভিয়াকে কোলে নিতে গেলে তূর্জানের গলা জড়িয়ে ধরে উল্টে গেল।
“ কাভিয়া চলে এসো, ব্রেকফাস্ট করে স্কুল যেতে হবে। “

“ যাবো না স্কুলে। আজকে ম্যাথ আছে, আমার ম্যাথ করতে একটুও ভালো লাগে না। “

“ ম্যাম বকা দিবে কিন্তু। চলে এসো। “

“ আমার ওই পচা ম্যামের ক্লাস ভালো লাগে না। পাপা, তুমি বলো; ওই ম্যাম আর মাম্মা এক তাইনা? দুজনেই আমাকে বকা দেয়।ইউ আর এ বেস্ট পাপা।“

তূর্জান মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বলল, “ আমার কাভিয়া মাম্মা গুডগার্ল। ম্যাথ এক ঝটকায় সলভ করতে পারে। তাইনা বাটারফ্লাই? “

“ আপনি একটু বেশি আদর দেখাচ্ছেন না? আপনার জন্য ও বেশি দুষ্টামি করে।”

“ করলে আমার মেয়ে করে। তোর কি? আমার মেয়ের গায়ে নেক্সট টাইম হাত তোলার দুঃসাহস দেখাবি না। “

রোজা মুখ ফুলিয়ে চলে গেল। কাভিয়া বুঝে গেছে তাকে আজ স্কুলে যেতে হবে। তাই অন্য বাহানা ধরল, “ তাহলে স্কুল থেকে তুমি রিসিভ করে আনবে। বলো পাপা, ইউ আর ভেরি বিজি,পাপা। বাট আমার বিজি পাপা ভালো লাগে না। “

“ ওকে, ব্রেকফাস্ট করে রেডি হয়ে নাও। পাপা তোমাদেকে নামিয়ে দিয়ে ভার্সিটি যাবে। “

“ পাপা আজকে কয় তারিখ? “

“ বাইশে এপ্রিল। কেন মাম্মা? “

“ ওহ তুমি দেখছি, আমার বার্থডে ভুলে যাচ্ছো? “

“ বাটারফ্লাইয়ের বার্থডে পাপা কি ভুলতে পারে? কিন্তু কাভিয়া মাম্মার বার্থডে তো চব্বিশে এপ্রিল।”

“ পাপা ইউ নো, তুমি ভুলে যেতে পারো। তাই আমি তোমাকে মনে করিয়ে দিলাম। “

“ পাপা কি কাভিয়ার বার্থডে ভুলতে পারে। ভোলেনি তো, কাভিয়া মাম্মা যা চায়, পাপা তাই দিবে। তোমার উইশ বক্সে ঝটপট উইশ করে দিও, পাপা তোমায় তা এনে দেবে।”

তূর্জান ফ্রেশ হয়ে কাভিয়াকে রেডি করে ব্রেকফাস্ট করতে নামলো, ব্রেকফাস্ট শেষে কাভিয়াকে ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে সিটবেল্ট লাগিয়ে দিল। রোজা ব্যকসিটে বসেছে। তূর্জান গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল। গাড়ি চলতে থাকলো তার গন্তব্যে।

একজন উপন্যাস পাঠিকা হিসেবে তনুশ্রীর এই উপন্যাস পড়ে শান্তি হলো না। একটা ডাইরিতে এই উপন্যাসের সমাপ্ত কেন লেখা হয়নি। কেনইবা যে ডাইরিতে গল্প লিখেছে, সে সমাপ্ত লেখে নি। পৃষ্ঠা তো এখনো অনেক আছে। তাহলে কেন লেখেনি। তনুশ্রীর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিল, ডাইরিটা সে সকালে এই বেঞ্চে পেয়েছে। এখানেই পড়তে শুরু করেছে। যদিও পড়া ঠিক মনে হয়নি, তবে ডাইরির কভার দেখে বিশেষ কিছু মনে হয়েছে। এক বসায় পুরোটা শেষ করেছে। এখন দুপুর বারোটা বাজে। আচ্ছা তূর্জান কি রোজার অভিমান ভাঙিয়েছিলো। কাভিয়া কি জেদি প্রচুর। তূর্জান এখনো আগের মতোই ভালোবাসে রোজাকে। ভাবনার মাঝেই
একটা ছোট্ট পাঁচ বছরের মেয়ে কে রাস্তায় দেখল। গাড়ি ছুটছে, তার বাবা মা কেউ কি খেয়াল করছে না।

হঠাৎ এগারো বছরের একটা ছেলে দৌড়ে এসে তাকে রাস্তার একপাশে নিয়ে গেল। ছেলেটার হাতে ব্যান্ডেজ। মেয়েটা ফুপিয়ে কান্না করতেই ধমকে উঠল, “ তোকে বলিনি এভাবে রাস্তায় ছুটবি না। কাকিমনি কতটা ভয় পেয়েছে তুই জানিস। “

কাভিয়া ভয় পেয়েছে। আরাজকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে ফেলল। ততক্ষনে রোজা দৌড়ে এসেছে। ভাগ্যিস আরাজ এই স্কুলের মাধ্যমিকে পড়ে। তাইতো এভাবে আগলে নিয়েছে। আরাজ রোজার কাছে কাভিয়া কে রেখে ক্লাসে চলে গেল। কাভিয়া মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কেদে ভাসালো। রোজা সেই সকাল থেকে তার ডাইরি খুজে পাচ্ছে না। কোথায় রেখেছে মনেই নেই। রোজা মেয়ে কে আগলে নিয়ে বলল, “ তোমার পাপা তো এক্ষুনি চলে আসবে। এভাবে ছুটে এসে গাড়ি এসেছে কি না দেখার কি দরকার ছিলো। “

বলেই একটা বেঞ্চে বসল। মেয়েকে বোঝাতে গিয়ে চোখ পড়ল পাশের তনুশ্রীর উপর। যার হাতে রোজার ডাইরি। মেয়েটাও অবাক, সে ভেবেছিলো কোনো কাল্পনিক উপন্যাস পড়ছে এতক্ষন। অথচ নাম পরিবার, পরিচয় সব সামনে থাকা মেয়েটার সাথে মিলে যাওয়াতে বেশ অবাক। রোজা তাকাতেই মেয়েটা এগিয়ে এলো, ডাইরি রোজার হাতে দিয়ে বলল, “ সমাপ্ত কেন লিখেননি? “

“ আমাদের গল্প এখনো সমাপ্ত হয়নি। “

“ আমি শেষের অংশ পড়ে শান্তি পায়নি। আপনি কিছু না মনে করলে, ভাইয়া আসার আগ পর্যন্ত একটু শোনাবেন? “

একটু থেমে বলল, “ সরি, আমি কিন্তু ভাইয়া বলেছি, মায়ের পেটের বোন হিসাবে। “

দুজনেই হেসে ফেলল। কাভিয়াকে কোলে নিয়ে বসল তনুশ্রী। কাভিয়ার সাথে খেলতে লাগল। হালকা কথাবার্তা চলল, এর মধ্যে গাড়ি এসে থামল তাদের সামনে। তূর্জান গাড়ি থেকে নামতেই তনুশ্রী অবাক হলো, একদম রোজার বর্ণনা দেওয়া পুরুষ। একটুও গাফিলতি নেই এই লেখায়। কাভিয়া দৌড়ে পাপার কাছে যেতে গেলে তূর্জান হাত দিয়ে বোঝালো সে আসছে। তূর্জান এসেই কাভিয়াকে কোলে তুলে নিল। শুরু হয়ে গেল তার পাপার সাথে কথা। রোজা হালকা হেসে বলল, “ তনুশ্রী, চব্বিশে এপ্রিল, আমার মেয়ের বার্থডে। ইনভিটেশন রইলো। চলে এসো বাকিটা নাহয় সামনে থেকে দেখে নিও। “

তনুশ্রী মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “ তুমি তো ভাইয়ার উপর রেগে আছো, ভাইয়া অভিমান ভাঙালো না? “

রোজা হেসে বললো, “ তার কথা লিখতে গেলে পুরো উপন্যাসের পাতা শেষ হয়ে যাবে, তবুও মনে হবে এইতো কেবল সূচনা করলাম। “

বলতেই তূর্জান এসে রোজার হাত ধরে বলল, “ মিসেস তূর্জান নেওয়াজ, এবার যাওয়া যাক? “

“ হুমম। “

পিছন থেকে তনুশ্রী তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “ তোমাদের ভালোবাসার তৃষ্ণা এ জনমে না শেষ হোক। দুজন এভাবেই দুজনের হয়ে থেকে যেও, থেকে যেও #প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা হয়ে।

             ~সমাপ্ত ~

আমাদের সফর শেষ হলো। সূচনা ১২-০২-২০২৬
সমাপ্ত ২২-০৪-২০২৬।
এতদিন আমার পাশে থাকার জন্য ধন্যাবাদ। আমি ভাবিনি এভাবে সবাইকে পাশে পাবো। সৃষ্টিকর্তার দোয়ায় আজ তাদের সমাপ্ত ঘঠালাম,কিন্তু তারা আমাদের মনে থেকে যাবে। এই সফরে আমার পাশে থেকেছেন, আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। ধন্যাবাদ দিলেও কম হয়ে যাবে। হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে ভালোবাসা। #ইনশাআল্লাহ আমি ওদের আবার নিয়ে আসবো, তারা আসবে আবার কোনো গোধূলি বেলায়।

চব্বিশে_এপ্রিল কাভিয়াকে উইশ করতে ভুলবেন না।

আর আজকে বড় পর্ব দিয়েছি । শব্দ সংখ্যা ৩৭৫০+
বড় মন্তব্য চাই কিন্তু। সাথে চাইলে রিভিউ দিয়ে দিয়েন। দেখি #তূর্জাননেওয়াজ আর #রোজাস্মিতামেহরোজ সাথে #কাভিয়া_নেওয়াজ আপনাদের মনে কতটুকু দাগ কাটতে পেরেছে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply