নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
৩৪ এর প্রথমাংশ
দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে সারাটাদিন। সকালে বা দুপুরের কোনো সময়ই খাবার টেবিলে পায়নি কেউ তাকে। ফের রাত নামলো ধরণী তে। রাত টাকে যেন বেশিই ভয় করছে বাইজিদের। সারাদিন এদিক ওদিক নিজেকে ব্যাস্ত রাখতে পারলেও রাতটা তাকে নিঃশব্দে গলা টিপে ধরে। মেহেরুন্নেসার স্মৃতি ভয়ংকর ভাবে চেপে বসে তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কি ভয়ানক যন্ত্রণা। হঠাৎ মনে ভাবনারা উঁকি দেয়
“মেহেরুন্নেসারও কি আমায় মনে পড়ছে? খেতে পারে সে আমাকে ছাড়া? ঘুম আসে চোখে? আমার বুকে মাথা রাখা টা মনে পড়ে না? কষ্ট হয় না তখন?”
দু’হাতে চুল খামচে ধরে বসে পড়লো মেঝেতে। এভাবে আর পারবে না নিজের সাথে যুদ্ধ করতে। কালই মহল ছাড়বে সে। চলে যাবে মেহেরুন্নেসা কে নিয়ে দূরে কোথাও। লাগবে না তার জমিদারি এত টাকা পয়সা আর জৌলুস। দ্রুত উঠে চলে গেলো বড় কাঠের টেবিল টার সামনে। চেয়ার টেনে বসলো। দোয়াত আর কালি নিয়ে লিখতে শুরু করলো। কাল কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দেবে মেহেরুন্নেসার কাছে
আমার অর্ধাঙ্গিনী
শুনছো মেহের, গতরাত টায় আমার একটুও ঘুম হয়নি। তোমার আঙুলের স্পর্শ হীন খাবারের একটা কণাও আমার গলা দিয়ে নামছে না। তোমার অভাবে তোমার স্বামী যে পাগলপ্রায়। ওই কোমল ওষ্ঠদ্বয়ের স্পর্শ ছাড়া কি আমার ক্লান্তি যায় বলো? আমি মিথ্যে বলেছি তোমায়, বলেছি ভালোবাসি না। সত্যি এই যে, আমি ভীষণ ভালোবাসি তোমায়। খুব শিঘ্রই আমি তোমায় নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাব। ততক্ষণে আমার বউ টা কে দেখো রাখার দ্বায়িত্ব কিন্তু তোমার।
তোমার উন্মাদ প্রেমিক
চিঠিটা ভাজ করে একটা খামে ভরলো। তাতে জমিদারি সিলমোহর দিয়ে দিল। ভোর হতেই প্রহরী পাঠাবে।
রাতের অন্ধকার পেরোনোর আগ মূহুর্তে আযানের ধ্বনি শোনা যায়। বাইজিদ তখনো জানালার পাশে বসে। উঠে অযু করে নামাজ পড়ে নিলো। আজ জুম্মা বার, মজলিস এর আয়োজন করা হয়েছে প্রাসাদে। তাই আজ অস্ত্র অনুশীলনে যাবেন না বাইজিদ। বৈঠকে মারজান আর সিমরান নাশতা প্রস্তুত করছে। কিন্তু এত সকালে নাশতা কে করবে? বাইজিদ সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে একজন প্রহরী কে ডেকে খামটা দিলো তার সাথে একটু সময় নিয়েই কথা বলল। মারজান সেটা খেয়াল করছে খুব ভালো করে। বাইজিদ দরবার এর দিকে যেতেই প্রহরী টাকে ডাকলো।
“আজ্ঞা করুন মা বেগম”
মারজান ভ্রু উঁচিয়ে বলল
“হাতে ওটা কি? কি দিলো শাহজাদা?”
“জ্বি এটা পত্র মা বেগম। এটা যাবে সাহাবাদের শেষ সীমানা, ছোট বেগম এর বাবার বাড়ি”
মারজান এর দৃষ্টি সচেতন হয়।
“আমার একটা কাজ করে দেবে? তোমায় ৫০ টা স্বর্ণমুদ্রা দেবো”
প্রহরীর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে মুদ্রার লোভে। কিন্তু পরক্ষণেই মারজান এর প্রস্তাব শুনে মুখটা মলিন হয়ে আসে প্রাণের ভয়ে। শাহজাদা কে ধোঁকা দেওয়ার ফল খুব ভয়াবহ হবে। কিন্তু মারজান কড়া হুমকি দেয়
“কিচ্ছু হবে না তোর। তার নিশ্চয়তা আমি দিচ্ছি। তবে কাজটা না করলে তোর মরা কেউ ঠেকাতে পারবে না”
খামটা বদলে ফেলল।
“এটা নিয়ে মেহেরুন্নেসা কে দিবি। তারপর তার উত্তর হিসেবে বাইজিদ কে এনে আবার এটা দিবি।”
এতে করে মেহেরুন্নেসা ভাববে বাইজিদ পাঠিয়েছে, আর বাইজিদ ভাববে মেহেরুন্নেসা পাঠিয়েছে। প্রহরী চলে গেলো চিঠি হাতে। মারজান এর ঠোঁটে ফুটলো বিশ্বজয়ের হাসি।
সুনেহেরা ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে এসে প্রাসাদের সামনের বাগানটাতে করা মার্বেল পাথরের বেঞ্চে বসলো। সামনে পাথর দিয়ে বানানো ধবধবে সাদা একটা টেবিলও। তাতে অনেক প্রকার খাবার রাখা। প্রভা থালায় খাবার দিতে দিতে একবার সুনেহেরার দিকে তাকালো। মনে মনে ভাবে মেয়েটা সন্ধ্যা হতেই ঘরে খিল তুলে মরার মত ঘুমায়। ডেকে মরে গেলেও পাওয়া যায় না, অথচ রোজ সকাল টায় এমন ভাবে ঢুলে, যেন সারারাত এর নিদ্রাহীন। বড় জারুল ফুল গাছটার তলায় যেমন ছায়া তেমন ফুরফুরে বাতাস। পাশেই টলটলে স্বচ্ছ পানিতে ভর্তি পুকুর। তাতে পদ্ম ফুটে আছে। সাদাসাদা রাজহাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে পুকুর জুড়ে। প্রভা ইচ্ছে করেই বাইরে খাবার আনিয়েছে। আজকাল মহলটায় কেমন দম বন্ধ লাগে তার। সুনেহেরা টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। চোখ গুলো আধখোলা।
“তোর আর আমার চেহারায় কোনো মিল নেই আপা”
প্রভার বুকটা ছ্যাত করে উঠলো। কথা ঘোরাতে বলল
“তুই সুন্দরী, আমি নই বলে খোঁটা দিচ্ছিস?”
সুনেহেরা চোখে বুজেই বলল
“ না রেএএএ, তোর আগের চেহারাটাই ভালো ছিলো। কি সুন্দর আমার সাথে মিলে যেত। চিকিৎসার পর তোর আদল বদলে গেলো।”
হাই তুলতে তুলতে অস্পষ্ট ভাবে বলল
“এখন আর তোর আমার চেহারা মেলে না রে”
প্রভা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
“রোজ ওমন সকাল সকাল নেশাখোর দের মত ঢুলিস কেন? সুরা টুরা পান করা শুরু করলি নাকি?”
থালায় পরোটা মাংস দিয়ে সুনেহেরার দিকে এগিয়ে দিলো। সুনেহেরা খাবারে হাত দেয় না। নাক সিটকিয়ে বলে
“কিসের গোশত এটা?”
প্রভা রুটি ছিড়ে মাংসে মুড়ে সুনেহেরার মুখে গুজে দিয়ে বলল
“নেওয়াজ সাহেব নাসিরাবাদ থেকে ফেরার পথে একটা বন্য মোরগ কিনে এনেছে। সেটাই জবাই হয়েছে সকালে। ভালো না খেতে?”
সুনেহেরা মুখে খাবার নিয়েই বলল
“হাঁদারাম টা এসে গেছে?”
প্রভা আরেক টুকরো রুটি সুনেহেরার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল
“এসব কি ভাষা সুনেহেরা? কতবার বলেছি ওনাকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে । উনি এ রাজ্যের নায়েব। আর যেন এসব না শুনি তোমার মুখে”
সুনেহেরা বিরক্ত ভঙ্গিতে রুটি মাংস চিবোতে চিবোতে বলল
“কেমন হুতুমপেঁচার মত দেখতে না?”
প্রভা চোখ পাকিয়ে তাকাতেই চুপ করে গেলো। প্রভা বলল
“মেহের মহল ছেড়ে চলে গেল, এত ঘটনা ঘটে গেল। তোকে মহলে দেখলাম না। তুই বড় হচ্ছিস, এমন গা ছাড়া ভাব কেন তোর?”
“থেকে কিছু করতে না পারলে থেকে লাভ আছে?”
“মানে?”
সুনেহেরা চকচকে স্বচ্ছ কাঁচের পাত্র থেকে পানি খেলো
“মানে তুমি তো তখন সেখানে উপস্থিত ছিলে। মেহেরুন্নেসা…… “
“তোকে লাগাবো এক চটকনা”
ভাবি না বলে নাম ধরে সম্বোধন করায় প্রভা কথাটা বলল। সুনেহেরা মৃদু জিভ কামড়ে বলল
“তো ভাবির হয়ে তুমি কি বললে?”
“আমি কি বলবো?”
সুনেহেরা অবাক হওয়ার মত করে বলল
“ওমা, দু একটা যুক্তি দিতে পারলে না যে সে নির্দোষ? তোমায় ও প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচালো। পরিবারের বিরুদ্ধে গেলো। আর তুমি ভরা সভায় ওর হয়ে দুটো কথা বলতে পারলে না আপা?”
প্রভার মুখ টা থমথমে হয়ে এলো। আসলেও তো। যদিও সব সাজানো ছিলো, তবুও মেহেরুন্নেসা যা করেছে তার জন্য। তারও উচিত ছিল মেহের এর হয়ে কথা বলার। সুনেহেরা বলল
“কয়েকটা যুক্তি দিয়েই দেখতে”
ঠিক তখনই দূর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো
“এই যে, যুক্তিবাদী নারী। একবার এদিকটায় আসা হোক।”
সুনেহেরা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
দেখল নেওয়াজে আবিদ দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটে হালকা হাসি, চোখে একরকম খুশির ঝিলিক।
সে চামচটা নামিয়ে রেখে মনে মনে বলল
“বোধহয় জিনিস টা পেয়ে গেছে?”
প্রভা তার আগেই বলল
“কোনো সমস্যা নায়েব মশাই? ওকে ডাকছেন হঠাৎ?”
নেওয়াজ সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে বলল
“উনি ছাড়া আর কে এত যুক্তি দিয়ে কথা বলে এই রাজ্যে? তাই ওনার থেকে কিছু পরামর্শ নিতাম”
সুনেহেরা উঠে দাঁড়ালো । প্রভা চোখ পাকিয়ে বলল
“বেয়াদবি করবে না কিন্তু”
সুনেহেরা ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেল।
“বলুন, কি দরকার?”
তার কণ্ঠে কৌতূহল আর খানিকটা খোঁচা।
নেওয়াজ হালকা হেসে বলল
“আপনার কাছে একটা পরামর্শ চাই।”
“পরামর্শ?”
সুনেহেরা চোখ সরু করল।
“আপনি? আপনি তো সব জানেন, সবজান্তা গামছাওয়ালা”
নেওয়াজ মুচকি হাসল
“সব জানি না বলেই তো আপনার কাছে এসেছি।”
সুনেহেরা হাত গুটিয়ে দাঁড়াল।
“বলুন, দেখি… কি সমস্যা?”
নেওয়াজ একটু কাছে এসে নিচু স্বরে বলল
“ধরুন… দু’জন মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে, কিন্তু ভুল বোঝাবুঝিতে দূরে সরে গেছে। তখন কি করা উচিত?”
সুনেহেরা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল
“প্রথমে সত্যিটা বের করতে হবে। কে ভুল করেছে, কেন করেছে। সব পরিষ্কার করতে হবে।”
নেওয়াজ মাথা নাড়ল
“যদি দু’জনই নিজের জায়গায় ঠিক থাকে?”
“তাহলে…”
সুনেহেরা একটু থামল
“তাহলে কেউ একজনকে আগে এগোতে হবে। অহংকার নামাতে হবে।”
নেওয়াজ হালকা হেসে বলল
“মানে, আপনি বলছেন দু’জনেই জেদি?”
সুনেহেরা চোখ রাঙাল
“আমি বলিনি। আপনি বলছেন।”
“আপনি তো অস্বীকারও করলেন না”
নেওয়াজ মজা করে বলল।
সুনেহেরা এবার চোখ পাকিয়ে তাকালো
“আপনি ভাইজান আর ভাবির কথা বলছেন?”
নেওয়াজ সামান্য মাথা ঝুকালো
“আজ্ঞে শাহজাদি। তাদের কথাই”
সুনেহেরা দাঁতে দাঁত পিষে বলল
“আমি মহলে থাকলে না, দেখতাম কি করে ভাবিকে বের……”
কথাটা মুখ ফসকে বলে, বুঝে ওঠার সাথে সাথেই কথা থামালো। ইশশশশ কি বলে ফেলেছে। নেওয়াজ চোখ সরু করে তাকিয়ে আছে।
“রাতে আপনি মহলে ছিলেন না?”
সুনেহেরা ধরা পড়া চোরের মত আমতা আমতা করতে থাকে।
“না মানে, মানে আমি মহলেই ছিলাম। কিন্তু ঘুমাচ্ছিলাম। কেউ ডাকে নি তো। তাই…..”
নেওয়াজ খিলখিল করে হেসে দুই হাত জড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল
“আপনার ঘুমের মা কে ঠাডা পড়া সালাম। শুনলাম চ্যাচামেচি তে কবরস্থানের মুর্দা গুলোর ও সমস্যা হচ্ছিল। আর আপনি জলজ্যান্ত একটা মানুষ টেরই পেলেন না”
সুনেহেরা নোওয়াজ এর ঝুকানো মাথায় গাট্টা মেরে দিলো। নেওয়াজের হাসি থামছেই না। এমন ঘুমের কথা বাপের জন্মে শোনেনি।
দূর থেকে সব দেখছিল মাহাদি। তার চোখে সেই দৃশ্যটা একেবারেই ভালো লাগছিল না।
সে অন্য কারও সাথে হাসছে, তর্ক করছে।
মাহাদির চোখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল।
তার ভেতরে যেন ছোট্ট একটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল।
অস্বস্তি, বিরক্তি নাকি অন্য কিছু যার নাম সে নিজেও ঠিক জানে না। সে দাঁড়িয়ে রইল, চুপচাপ
কিন্তু তার দৃষ্টি সরল না এক মুহূর্তের জন্যও।
হাসি থামিয়ে নেওয়াজ একটু থামল, যেন কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। তারপর হালকা অস্বস্তি নিয়ে পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকাল।
“আচ্ছা… আরেকটা কথা ছিল”
সে নিচু স্বরে বলল। সুনেহেরা ভ্রু তুলে তাকাল
“এত ভূমিকা কেন? বলুন।”
নেওয়াজ পকেট থেকে ধীরে ধীরে একটা ছোট কাপড়ের মোড়ক বের করল। খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একজোড়া নুপুর ছোট ছোট রুপালি ঘুঙুরে সাজানো, সূক্ষ্ম কাজ, কিন্তু খুব চোখে পড়ার মতো সুন্দর।
সুনেহেরা কিছুক্ষণ তাকিয়েই রইল।
“এটা…?”
তার চোখে বিস্ময়। নেওয়াজ একটু অপ্রস্তুত হেসে বলল
“যে জিনিসটা আনতে দিয়েছিলেন, সেটা পাইনি।”
সে এক মুহূর্ত থামল, তারপর নুপুরদুটো তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“তবে এটা বড্ড মনে ধরলো।”
কণ্ঠে কোনো বড় দাবি নেই, বরং এক ধরনের সরলতা।
“জানি খুব বেশি দামী কিছু না। তবুও… ভেবেছিলাম আপনার ভালো লাগতে পারে।”
সুনেহেরা একবার নুপুরের দিকে তাকাল, তারপর নেওয়াজের দিকে। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠল নরম, অবাক আর একটু মুগ্ধতার মিশ্রণ।
সে হালকা মাথা নাড়ল
“কথার চেয়ে কাজ বেশি করুন। বুঝলেন।”
সে নুপুরটা হাতে নিল, আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল ছোট ছোট ঘুঙুরগুলো। একটু হেসে বলল
“খুব সুন্দর।”
এই ছোট্ট হাসি, এই স্বাভাবিক গ্রহণ পুরো দৃশ্যটাকে আরও মোলায়েম করে তুলল।
কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মাহাদির কাছে এটা মোটেও মোলায়েম কিছু ছিল না। তার চোখে পুরো দৃশ্যটা অন্যরকম লাগছিল।
তার ভেতরে হঠাৎই এক তীব্র অস্বস্তি জমে উঠল।
চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। চোখে রাগের ছায়া। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। এগিয়ে এলো তাদের কাছে। সুনেহেরা নুপুর টা উল্টে পাল্টে দেখে বলল
“আপনার রুচি এত ভালো? দেখে বোঝা যায় না”
নেওয়াজ এর হাসি মিইয়ে গেল
“অপমান করলেন শাহজাদি? আপনার এই অপমান আমি সুদে আসলে ফেরত দিব”
সুনেহেরা নুপুর জোড়া হাতের মুঠোয় নিয়ে অল্প এগিয়ে গেলো।
“কি করবেন? যুদ্ধ করবেন? চলুন, করি”
নেওয়াজ গা ছাড়া ভাবে বলল
“কি যে বলেন শাহজাদি। ওসব অস্ত্র, সস্ত্র ধরা আমার কাজ নাকি। আপনি বরং মাহাদির সাথে যুদ্ধ করুন। উনি ভালো পারেন এসব। কি বলেন সেনাপতি মশাই”
নেওয়াজের দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছনে তাকাতেই দেখলো মাহাদি দাঁড়িয়ে আছে। সুনেহেরা আর কিছু বলল না। নেওয়াজ কে ভেংচি কেটে চলে গেলো।
সুনেহেরা যেতেই নেওয়াজ মাহাদির কাঁধে নিজের এক হাত তুলে দিয়ে বলল
“দিন কাল কেমন যাচ্ছে ভাই সাহেব?”
মাহাদি নিশ্চুপ কোনো কথা বলল না।
দু’দিন ধরে ঠিকমতো কিছুই খায়নি মেহেরুন্নেসা।
কাঁদতে কাঁদতে তার চোখ ফুলে গেছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে বিছানা থেকে উঠতেও কষ্ট হয়। তবুও ঘুম আসেনি। চোখ বন্ধ করলেই শুধু একটাই মুখ ভেসে উঠেছে। তার স্বামী বাইজিদ।
ঘরের ভেতরটা ভারী, বাতাস যেন থেমে আছে।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে হাকডাক শোনা গেল
“এই বাড়িতে কেউ আছেন? জমিদার বাড়ি থেকে এসেছি!”
কণ্ঠটা কর্কশ, স্পষ্ট। মেহেরুন্নেসা চমকে উঠল।
তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। ঠিক সেই সময় দরজায় ধাক্কা দিয়ে ঢুকল তার ছোট ভাবি, শিমু।
“মেহের!”
হাঁপাতে হাঁপাতে বলল সে,
“জমিদার বাড়ির প্রহরী এসেছে, চিঠি নিয়ে!”
কথাটা শুনে যেন মেহেরুন্নেসার শরীরে আবার প্রাণ ফিরে এলো। ক্ষীণ আশার আলো দেখতে পেলো। সে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল। মাথা ঘুরছিল, তবুও থামেনি।
মুখে ওড়না টেনে ঢেকে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
উঠোনে এসে দাঁড়াতেই দেখল একজন প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা খাম।
মেহেরুন্নেসার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল।
“আমার জন্য?”
কণ্ঠটা কেঁপে উঠল। প্রহরী মাথা নেড়ে খামটা এগিয়ে দিল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।
কাঁপা হাতে খামটা ছিঁড়ে ফেলল। তার চোখ দ্রুত শব্দগুলোর উপর ছুটে গেল
তারপর যেন হঠাৎই সবকিছু থেমে গেল।
তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল এক জায়গায়।
“তালাক…”
শব্দটা যেন চোখের ভেতর ঢুকে বুক পর্যন্ত গিয়ে আঘাত করল। তার হাত কেঁপে উঠল। কাগজটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল হাত থেকে। চারপাশের সব শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।
কেউ কিছু বলছে কেউ তাকিয়ে আছে কিন্তু সে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।
তার বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। সে এক পা পিছিয়ে গেল। চোখের সামনে সব ঝাপসা। এটা কি সত্যি? নাকি সে এখনো দুঃস্বপ্নের ভেতর আছে? মেহেরুন্নেসা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার ভেতরের সবকিছু এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ে গেছে। কাগজটা হাতে নিয়ে মেহেরুন্নেসা যেন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
“না… না… এটা হতে পারে না…”
তার কণ্ঠ ভেঙে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সেই কান্না চাপা নয়, বুক ফেটে বেরিয়ে আসা আহাজারি।
“শাহজাদা… আপনি এটা করতে পারেন না…!”
তার হাঁটু ভেঙে গেল প্রায়, মাটিতে বসে পড়ল। চারপাশে যারা ছিল মল্লিকা, রমলা, শিমু সবাই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। কেউ কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। প্রহরীটা বলল
“বেগম সাহেবা, আপনাকে শুধু সই করতে বলা হয়েছে”
মেহেরুন্নেসা মাথা ঝাঁকাল জোরে।
“না!”
তার কণ্ঠ কাঁপছে, কিন্তু স্পষ্ট। সে কাগজটা বুকের সাথে চেপে ধরে বলল
“আমি সই করব না। শাহজাদা যদি নিজে এসে বলেন… আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন…তাহলে সই করব। তার আগে না।কখনো না।”
প্রহরী চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মুখটা যেন পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। চোখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, তবুও ভেতরে ভেতরে একটা অস্থিরতা কাজ করছে। মেহেরুন্নেসা যে সই করেনি এই খবরটা নিয়ে সে কী জবাব দেবে, সেটাই যেন বুঝে উঠতে পারছে না। মারজানের রাগ কেমন হতে পারে, সেটা ভেবেই বুক কেঁপে উঠছে তার।
একটু থেমে, নিজের ভেতরের ভয়টাকে চাপা দিয়ে সে হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত নিলো। যদি সরাসরি সত্যিটা বলা হয়, তবে নিজেরই সর্বনাশ। বরং একটা চাল চালা যাক।
সে ধীরে ধীরে তালাক নামাটা গুছিয়ে নিলো। তারপর ফিরে গেল প্রাসাদে।
জমিদার বাড়ির করিডোরটা তখন অস্বাভাবিক নীরব। পায়ের শব্দগুলো পর্যন্ত প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে। প্রহরী দ্রুত পায়ে হেঁটে পৌঁছালো বাইজিদের কক্ষের সামনে। দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে ভারী কণ্ঠস্বর
“কে?”
“আমি, হুজুর।”
অনুমতি পেয়ে সে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো।
বাইজিদ তখন নিজের আসনে বসে ছিল। মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখে সেই আগের মতোই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। প্রহরী এগিয়ে গিয়ে কাগজটা বাড়িয়ে দিলো।
“হুজুর, এটা বেগম পাঠিয়েছেন।”
এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেলো।
বাইজিদের ভ্রু কুঁচকে উঠলো। সে ধীরে ধীরে কাগজটা হাতে নিলো। আঙুলগুলোতে হালকা কাঁপুনি যেন অজানা কোনো আশঙ্কা তাকে গ্রাস করছে।
কাগজটা খুলতেই তার চোখের মণি হঠাৎ বড় হয়ে গেলো। তালাক নামা? শব্দগুলো যেন ছুরির মতো এসে বিঁধলো তার বুকে। মুহূর্তেই তার মুখের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। ঠোঁট শুকিয়ে এলো। চোখে অবিশ্বাস, ক্ষোভ, আর একটা অদ্ভুত শূন্যতা সব একসাথে জমে উঠলো।
“না… এটা… এটা অসম্ভব…”
তার হাত থেকে কাগজটা প্রায় পড়ে যেতে যেতে সে সামলে নিলো। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছে। মনে হলো, কেউ যেন তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরিয়ে নিয়েছে। সে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ভরসা করার মতো কোনো জমিন নেই।
মেহেরুন্নেসা… তালাক পাঠিয়েছে? না, এটা হতে পারে না। তার চোখে ভেসে উঠলো মেহেরুন্নেসার মুখ নরম, নির্ভরশীল, ভালোবাসায় ভরা সেই চোখগুলো। সেই মেয়েটা এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে?
হঠাৎ করেই তার ভেতরে একটা ঝড় বয়ে গেলো।
এটা যেন হারিয়ে ফেলার ভয়… এমন কিছু হারানোর, যেটা ছাড়া সে নিজেকে কল্পনাও করেনি কখনো।
বাইজিদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। তার চোখে এখন আগের সেই স্থিরতা নেই বরং দপদপ করে জ্বলছে এক অজানা আগুন।
“মেহেরুন্নেসা… তুমি এটা কী করলে…”
প্রহরী আলগোছে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে। বাইজিদের চোখ এখনও সেই কাগজটার উপর স্থির। মনের ভেতর একটার পর একটা প্রশ্ন যেন ঝড় তুলছে।
তার মানে… ও সত্যিই আমাকে ভুলে গেছে?
আমার বুকটা যেমন ছিঁড়ে যাচ্ছে ওর কি তেমন কিছুই হচ্ছে না? না কি সবটাই ছিল অভিনয়?
মেহেরুন্নেসা! তুমি কি সত্যিই ছলনাময়ী? একটুও ভালোবাসোনি আমায়?
তার মুঠো শক্ত হয়ে উঠলো। তালাক নামাটা কুঁচকে গেলো তার আঙুলের চাপে। চোখে জমে উঠলো ক্ষোভ আর কষ্টের মিশ্র আগুন।
কিন্তু পরমুহূর্তেই সে চোখ বন্ধ করলো।
না এভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। মেহেরুন্নেসা এমন না। হয়তো এর পেছনে অন্য কিছু আছে।
হঠাৎ করেই তার ভেতরের ঝড়টা একটু থেমে এলো। জায়গা নিলো ঠান্ডা, হিসেবি এক ভাবনা।
সত্যিটা জানতে হবে তার আগে কিছুই বিশ্বাস করা যাবে না। বাইজিদ ধীরে ধীরে চোখ খুললো। সেই চোখে এখন আর আগের মতো আবেগের ছাপ নেই বরং ফিরে এসেছে তার স্বভাবসিদ্ধ কঠোরতা।
সে মনে মনে হিসেব কষতে লাগলো। মেহেরুন্নেসা বাড়ির পাশেই লোক বসানো আছে দিন রাত পাহারা দেয় তারা। প্রতিটা ছোটখাটো খবর রোজ ভোরে এসে পৌঁছায় তার কাছে। আজও তো খবর আসার কথা তাহলে কেন সে আগে শুনলো না?
নাকি এই তালাক নামা পাঠানোর আগেই কিছু ঘটেছে? তার চোখ চিকচিক করে উঠলো।
“না আগে খবর নিতে হবে।”
সে নিচু স্বরে বললেও কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা, যেন নিজের কাছেই শপথ করছে।
“ওর প্রতিটা নিঃশ্বাসের খবর আমার কাছে আসে। এটা কেন আসেনি? তালাক নামা বানাতে দেওয়ানী বা কাজীর কাছে যেতে হয়। আর নয়তো জমিদার মহল থেকে সংগ্রহ করতে হয়। কই এমন কোনো খবর তো সে পায়নি।
বাইজিদ হঠাৎ করেই সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তার উপস্থিতি মুহূর্তেই পুরো কক্ষটা ভারী করে তুললো।
“প্রহরী!”
তার ডাকে যেন বজ্রপাতের মতো ঝাঁকুনি খেলো চারপাশ। প্রহরী তাড়াতাড়ি সামনে এসে মাথা নিচু করলো
“জী, হুজুর!”
“এক্ষুনি মাহাদি কে আমার কক্ষে আসতে বলো”
বাইজিদ মাহাদি কে ডেকে পাঠালো। মাহাদি জানালো আজম আর শিকিম কে মেহেরুন্নেসার বাড়ির পাশে থাকার দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা সকালে ফিরে এসেছে। তাদের কেউ একজন মহল থেকে চিঠি পাঠিয়েছে যে তারা যেন ফিরে আসে।
ব্যাস। আর বোঝাতে হলো না বাইজিদ কে। সবটাই বুঝে গেলো সে। গমগমে গলায় বলল
“অশ্ববহর প্রস্তুত করো। আমি নিজে যাবো মেহেরুন্নেসার কাছে। শুনব সত্যিটা আসলে কি”
চলো আজ একটা চ্যালেঞ্জ নাও। আমি রোজ ২৫০০+ শব্দ দিই গল্পে। যদি এই পর্বে ৫ হাজার রিয়্যাক্ট করতে পারো। তবে ৫ হাজার শব্দে মানে ডাবল গল্প পাবা কাল। আবার ভেবো না ৫ হাজার না হলে গল্প দিব না। হল্প দিবো, তবে ৫ হাজার হলে পর্ব ডাবল হবে।
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪০ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৮ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪২ এর শেষাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৫
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৪ এর শেষাংশ