Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৩


নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৩

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

রাত নেমেছে প্রাসাদজুড়ে। দীর্ঘ দিনের ক্লান্তি যেন প্রতিটা দেয়ালে জমে আছে। নিচের বড় বৈঠকখানায় খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। লম্বা টেবিল, কাচের বাসন, মৃদু আলোয় সবকিছুই রাজকীয়, অথচ আজ কেমন যেন প্রাণহীন।
বাইজিদ ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
তার মুখ থমথমে, চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সে কোনো দিকে না তাকিয়ে গিয়ে বসে পড়ল বাকের শাহ্ এর সামনে টেবিলের ওই নির্দিষ্ট জায়গাটায়।
কেউ কিছু বলছে না। খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে, কিন্তু শব্দগুলোও যেন দম বন্ধ হয়ে আসা নীরবতায় হারিয়ে যাচ্ছে।
বাকের শাহ্ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।
তার অভিজ্ঞ চোখ এড়িয়ে যায় না এই নীরবতা, এই চুপসে যাওয়া মুখ, এই ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়া অবস্থা।তিনি বুঝে গেলেনবএটা কেবল ক্লান্তি না। স্ত্রীর সঙ্গে দূরত্ব, এই বিচ্ছেদই তার ছেলেকে এভাবে নিঃশব্দ করে দিয়েছে।

তিনি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন ঠিক তখনই দরজার দিক থেকে পায়ের শব্দ এলো। মারজান।নসে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল। তাকে দেখে বাকের শাহ্ এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলেন। তার চোখ দ্রুত ঘুরে গেল বাইজিদের দিকে। একটা প্রশ্ন, একটা বিস্ময়। কিন্তু বাইজিদের মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। সে মাথা একটু কাত করে, ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্যের রেখা টেনে বলল
“নিন… আপনার স্ত্রী।”

তার কণ্ঠ ঠান্ডা, নিরাসক্ত।
“সে কারাগারে থাকলে আপনার আবার কষ্ট হবে।”
কথাটা বলেই সে আবার সামনে তাকাল, যেন বিষয়টা তার কাছে আর গুরুত্বপূর্ণ না।
কিন্তু সেই ঠান্ডা কথার ভেতরেও লুকিয়ে ছিল অদৃশ্য এক তীব্রতা। যা হয়তো রাগ, হয়তো আঘাত, নাকি নিজের ভেতরের শূন্যতাকে ঢাকার এক চেষ্টা। লম্বা টেবিলজুড়ে খাবার সাজানো, রুপোর বাসনে ক্ষীর রাখা, তাতে গোলাপের পাপড়ি ছিটানো। আলো পড়ে ঝকঝক করছে। কিন্তু সেই ঝলমলে আয়োজনের ভেতর আজ যেন কোনো প্রাণ নেই।
বাকের শাহ্ কিছু বললেন না। তিনি চুপচাপ বসে রইলেন, কিন্তু তার দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও ছেলের উপর থেকে সরল না। অভিজ্ঞ চোখ যা মানুষের ভেতরের ভাঙনও দেখে ফেলে।

বাইজিদ মাথা নিচু করে বসে আছে।
তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য যেটা সবার চোখ আটকে দেয়, আজ যেন নিভে গেছে। তার সবুজাভ চোখদুটোতে থাকে তীক্ষ্ণতা আর আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি, আজ মলিন। সেই চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, আর ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতা।
তার চোয়াল শক্ত, ঠোঁট চাপা যেন নিজেকে ধরে রাখার শেষ চেষ্টা।

সে সামনে রাখা খাবারে হাত দেয়। কিন্তু খাওয়ার জন্য না শুধু নাড়াচাড়া করতে থাকে।
ভাতের দানা এদিক-ওদিক সরায়, তরকারির দিকে তাকায়, আবার চামচটা থামিয়ে দেয়।
একবারও মুখে কিছু তোলে না। মাঝে মাঝে তার দৃষ্টি শূন্যে চলে যায়।মেহেরুন্নেসার স্মৃতি এসে তাকে আঘাত করে।
এই টেবিলেই সে চুপচাপ বসে খেয়েছে, আর মেহেরুন্নেসা পাশে দাঁড়িয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করেছে
“আর কিছু লাগবে, শাহজাদা?”
তার সেই স্বর তার উপস্থিতি হঠাৎ যেন কানে বাজতে থাকে। বাইজিদের আঙুল থেমে যায়।
চামচটা হাতেই স্থির হয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার বুকের ভেতর আবার সেই অজানা চাপটা ফিরে আসে। কিন্তু সে মাথা নিচু করে রাখে কেউ যেন কিছু বুঝতে না পারে।

বাকের শাহ্ সবকিছু দেখছিলেন। ছেলের চোখের সেই মলিনতা, তার খাবার না খেয়ে শুধু নাড়াচাড়া করা, হঠাৎ হঠাৎ থেমে যাওয়া সবকিছুই তার দৃষ্টির বাইরে যায় না। তবুও তিনি কিছু বলেন না।
কারণ তিনি জানেন এই মুহূর্তে কোনো কথা বললে বাইজিদ আরও অপ্রস্তুত হয়ে পড়বে।
ধীরে ধীরে তিনি নিজের খাবার শেষ করলেন।
তারপর নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালেন।
একবার ছেলের দিকে তাকালেন দীর্ঘ, গভীর দৃষ্টি।
তার চোখে কোনো রাগ নেই। শুধু এক ধরনের বোঝাপড়া।
তিনি বুঝে গেছেনবএই ছেলেটা আজ নিজের সিদ্ধান্তের ভারেই ভেঙে পড়ছে। কিছু না বলেই তিনি সরে গেলেন।
বৈঠকখানায় তখনও বাইজিদ একা বসে। সামনে খাবার, কিন্তু তার দিকে তাকানোর শক্তিটুকুও যেন নেই। ঠিক তখনই নরম পায়ের শব্দ।
সিমরান ধীরে ধীরে এসে তার পাশে দাঁড়াল। মুখে মৃদু হাসি, চোখে এক ধরনের হিসেবি কোমলতা।
“আপনি কিছুই খাননি…”
খুব নিচু স্বরে বলল সে।
উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে হাত বাড়িয়ে প্লেটে খাবার তুলে দিতে শুরু করল।
“এটা খান… এটা আপনার পছন্দের…”
সে আরও একটু ঝুঁকে এল, প্রায় গা ঘেঁষে।
বাইজিদের ভ্রু কুঁচকে উঠল। এই স্পর্শ এই উপস্থিতি তার কাছে একেবারেই অস্বস্তিকর।
সে হঠাৎ করেই হাতটা সরিয়ে নিল। এক মুহূর্তও আর বসে থাকল না।
চেয়ারের শব্দ হালকা করে ঠুকে উঠল মেঝেতে।
কোনো কথা না বলেই উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেল।
সিমরান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার হাত মাঝপথে থেমে গেল। বাইজিদ একবারও পেছনে তাকাল না। দ্রুত পায়ে সে নিজের কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
ভেতরে ঢুকেই যেন সব ধৈর্য ভেঙে পড়ল।
এই ঘর এই নীরবতাএই বাতাস সবকিছু আবার তাকে মনে করিয়ে দিল, মেহেরুন্নেসা নেই।

সে নেই। বাইজিদ ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে ঘরের মাঝখানে এসে থামল। তার বুকের ভেতর চাপটা আবার বাড়তে লাগল।
সে একবার বিছানার দিকে তাকাল এই জায়গায় সে ছিল, এই ঘরেই তার কণ্ঠ ভেসে আসত। হঠাৎই সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।
“মেহের…”
শব্দটা আবার বেরিয়ে এলো। এইবার স্পষ্ট, কিন্তু ভাঙা। সে হাঁটতে হাঁটতে দেয়ালের কাছে গিয়ে হাত ঠেকাল। মনে হচ্ছে, কিছু একটা খুঁজছেকিন্তু পাচ্ছে না। ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা বাড়তে লাগল। সে এদিক-ওদিক হাঁটতে লাগল, থামছে, আবার হাঁটছে একটা অদ্ভুত ছটফটানি।
“কোথায় গেল…”
খুব নিচু গলায় বলে উঠল সে। তার চোখে জল চলে এসেছে, কিন্তু সে মুছছে না।
এই প্রথম সে অনুভব করল সে না থাকলে একটা পুরো ঘর কতটা ফাঁকা হয়ে যায়।

সে বিছানায় বসে পড়ল, তারপর আবার উঠে দাঁড়াল স্থির থাকতে পারছে না।
তার ভেতরটা যেন চিৎকার করছে সে তাকে চায়।
তার উপস্থিতি চায়। তার কণ্ঠ, তার ছোঁয়া সবকিছু। কিন্তু কিছুই নেই। শুধু নীরবতা।
আর সেই নীরবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাইজিদ ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে, নিজের অজান্তেই।


মেহেরুন্নেসা বসে আছে তার বাবার বাড়ির ছোট্ট মাটির ঘরের ভেতর। ঘরটা খুব বড় না। মাটির দেয়াল, টালির ছাউনি, এক কোণে পুরোনো কাঠের তাক সবকিছুই খুব সাধারণ। সেই রাজকীয় প্রাসাদের জৌলুসের সাথে এর কোনো মিল নেই। বসার ঘরের মাঝখানে মাদুর পাতা হয়েছে। সেখানেই সবাই গোল হয়ে বসে খেতে শুরু করেছে। কেউ বিশেষ কথা বলছে না, কিন্তু পরিবেশটা অদ্ভুত ঠান্ডা। মেহেরুন্নেসা আসার পর মল্লিকা, রমলা, মিরাজ সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছিলো। কারণ আগের বার যখন মাহবুব এর মৃত্যুতে মেহেরুন্নেসা এলো, শাহজাদা মোটা অঙ্কের মুদ্রা দিয়ে গেছিলো।

এবারও হয়তো এনেছে। তাদের মেয়ে জমিদার বাড়ির বউ। কিন্ত সবটা শোনার পর তাদের মুখ চুপসে যায়। ব্যাবহার পাল্টে যায় মুহূর্তেই।

“জমিদার বাড়ি থেকে ফেরত এসেছে” এই কথাটাই যেন তাকে আবার অবহেলার জায়গায় নামিয়ে দিয়েছে।
তার সামনে একটা থালা রাখা হয়েছে।
সাধারণ ভাত, ডাল, একটু তরকারি। সে চুপচাপ বসে আছে। খাবারে হাত তুলছে না। তার চোখ ধীরে ধীরে ভিজে উঠছে। শিমু খেয়াল করছে, কিন্তু কিছু বলছে না।

মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে থালার দিকে তাকায় তারপর তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে আরেকটা দৃশ্য
প্রাসাদের সেই বড় টেবিল বাইজিদ বসে আছে
আর সে পাশে দাঁড়িয়ে।
“তুমিও বসো, একসাথে খাই?”
তার স্বামীর কণ্ঠ যেন কানে বাজে। তার বুকটা হঠাৎ চেপে ধরে।
“সে কি খেয়েছে?”
মনে মনে প্রশ্নটা উঠে আসে।
তার শাহজাদা যে মানুষটা বিয়ের পর থেকে একবারও তাকে ছাড়া খাবার খায়নি। আজ কি সে একা বসে খেয়েছে?
নাকি সেও কিছু খেতে পারেনি? মেহেরুন্নেসার হাত কেঁপে ওঠে। চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারে না। নীরবে গড়িয়ে পড়ে তার গাল বেয়ে। সে মুখ নিচু করে ফেলে, যাতে কেউ ভালো করে দেখতে না পায়। এক ফোঁটা অশ্রু তার থালার ভাতের উপর পড়ে। সে হাত দিয়ে সেটা মুছতে যায়, কিন্তু হাতটাই থেমে যায় মাঝপথে।

খাবার সামনে রেখেই সে বসে থাকে। কারণ তার ক্ষুধা নেই। তার ভেতরটা শুধু একটাই প্রশ্নে ভরে আছে, সত্যিই কি বাইজিদের মনে পড়ছে না তার কথা? মাদুরের উপর বসে সবাই যখন খেতে শুরু করেছে, তখনও মেহেরুন্নেসা শুধু থালার দিকে তাকিয়ে আছে।
ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার হাত উঠছে না।
এই দৃশ্যটা মল্লিকার চোখ এড়ালো না। সে হঠাৎ খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল।
“কি রে? খাচ্ছিস না কেন?”
তার কণ্ঠে তাচ্ছিল্য।
“জমিদার বাড়ির ভালো ভালো খাবার মুখে ধরে গেছে নাকি? এখন এই গরিবের ভাত আর রোচে না?”
কথাগুলো এমনভাবে বলল, যেন ইচ্ছা করেই আঘাত করতে চাইছে। মেহেরুন্নেসার হাত কেঁপে উঠল। সে ধীরে মাথা তুলল। চোখে পানি জমে আছে, ঠোঁট কাঁপছে।
খুব আস্তে বলল
“উনি… খেয়েছেন কিনা কে জানে”
তার কণ্ঠে কোনো প্রতিবাদ নেই, শুধু একটা নিঃশব্দ কষ্ট। এই কথাটা শুনে মল্লিকা আরেকবার হেসে উঠতে যাচ্ছিল।
কিন্তু তার আগেই রমলা বেগম তীব্র স্বরে বলে উঠলেন।
“পিরিত দেখো!”
তিনি থালায় হাত থামিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন, চোখে বিরক্তি।
“তোকে ওরা গিন্নি করতে নেয়নি। বুঝলি?
তাদের বাড়ির মেয়েকে আমরা কষ্ট দিয়েছি। তার ফলেই তোকে আজ কলঙ্ক লাগিয়ে তাড়িয়ে দিল!”

কথাগুলো ছিল কঠিন, কাঁটা হয়ে বিঁধে যাওয়ার মতো। মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে গেল। তার চোখ থেকে একের পর এক অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে কিছু বলল না। কারণ বলার মতো কোনো ভাষা নেই তার কাছে। সে শুধু মাথা নিচু করে বসে রইল
একদিকে স্বামীর জন্য দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে নিজের ঘরেই অবহেলা।
তার সামনে রাখা ভাতের থালাটা এখন যেন আর খাবার না, তার ভাঙা জীবনের নীরব সাক্ষী।মেহেরুন্নেসা আর কিছু বলল না।
মাথা নিচু করেই উঠে দাঁড়াল। কারও দিকে তাকাল না, কোনো প্রতিবাদও করল না। ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

ঘরে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে খিল তুলে দিল।
তারপর আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
খাটের উপর বসে পড়তেই বুকের ভেতর জমে থাকা সবকিছু ভেঙে বেরিয়ে এলো। সে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল পুরো ভেঙে পড়ে।
আজ সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, যে বাইজিদকে কতটা ভালোবেসে ফেলেছে।
এই দূরত্ব এই বিচ্ছেদ এটা তার জন্য শুধু কষ্ট না। এটা যেন ধীরে ধীরে তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে।
“আমি… পারছি না…”
কাঁদতে কাঁদতে ফিসফিস করে উঠল সে। ঘরের চারপাশে তাকাল। এখানে কোনো পরিচিত ঘ্রাণ নেই, কোনো সান্ত্বনা নেই।
হঠাৎ তার মনে পড়ল বাইজিদের সেই চওড়া বুক, যেখানে মাথা রাখলেই সব কষ্ট থেমে যেত।
সে যদি এখন থাকত হয়তো তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলত “চুপ করো, আর কেঁদো না”

এই ভাবনাটুকুই তার কান্না আরও বাড়িয়ে দিল।
সে গভীর শ্বাস নিতে চাইল কিন্তু না, সেই পরিচিত আতরের ঘ্রাণটা নেই। এই বাতাসে নেই। এই ঘরে নেই। এই অনুপস্থিতিটাই যেন তাকে আরও বেশি ভেঙে দিল। হঠাৎ সে তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে নিজের গুছানো জিনিসের ভেতর হাতড়াতে লাগল।
তারপর বের করল একটা পাঞ্জাবি। এটা বাইজিদের। মহল থেকে সে লুকিয়ে এটা নিয়ে এসেছিল। হাত কাঁপতে কাঁপতে কাপড়টা বুকে চেপে ধরল সে। তারপর ধীরে ধীরে মুখের কাছে এনে শুঁকল।
সেই পরিচিত ঘ্রাণ… মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট আতর, তার শরীরের গন্ধ, তার উপস্থিতি। মুহূর্তের মধ্যে মেহেরুন্নেসার চোখ আবার ভিজে উঠল।
সে পাঞ্জাবিটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন এটাই এখন তার একমাত্র আশ্রয়।
খাটে বসে দুলতে দুলতে কাঁদতে লাগল
“আমায় নিয়ে যান, শাহজাদা…”
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে।
“আমি… আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারছি না…”

ঘরের ভেতর তার কান্নার শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
কেউ শুনল না। কেউ জানল না একটা মানুষশুধু ভালোবাসার মানুষের অভাবে এভাবে ভেঙে পড়তে পারে।


সারা রাত বাইজিদ ঘুমায়নি। কক্ষের মেঝেতে, পালঙ্কে হেলান দিয়ে বসে ছিল সে। আলো নিভে গিয়েছিল অনেক আগেই, কিন্তু তার চোখে কোনো ঘুম নামেনি। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করেছে, কিন্তু পরক্ষণেই খুলে গেছে। মনে পড়েছে সেই শূন্যতা, সেই অনুপস্থিতি। ভোরের আযান ভেসে উঠতেই সে উঠে দাঁড়াল।
নামাজ পড়ল খুব মনোযোগ দিয়ে। কিন্তু তার মন যেন কোথাও আটকে ছিল। তারপর কোনো বিশ্রাম না নিয়েই চলে গেল তলোয়ার অনুশীলনে।
প্রাসাদের অনুশীলন প্রাঙ্গণে সূর্যের প্রথম আলো পড়েছে। বাইজিদ তলোয়ার চালাচ্ছে দ্রুত, শক্ত, প্রায় আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে।

প্রতিটা আঘাত যেন কারও উপর না, নিজের ভেতরের যন্ত্রণার উপর। কিন্তু তার শরীর বলছে সে ক্লান্ত। চোখের নিচে কালি, মুখে নিদ্রাহীনতার ছাপ, আর সেই সবুজাভ চোখদুটো আজ নিভে যাওয়া আগুনের মতো। দূর থেকে সব দেখছিলেন বাকের শাহ্। তার বুক টা ধক করে উঠলো। একদিনেই ছেলের এই পরিবর্তন? কি হাল করেছে নিজের।
তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন, তারপর ধীরে সরে গেলেন। নিজ কক্ষে ফিরে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ডেকে পাঠালেন তার বিশ্বস্ত নায়েব, নেওয়াজে আবিদকে।
কিছুক্ষণ পর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
“আসো”
শান্ত গলায় বললেন বাকের শাহ্। ভেতরে প্রবেশ করল এক জোয়ান তাগড়া যুবক।
নেওয়াজে আবিদ। লম্বা দেহ, কাঁধ চওড়া, গায়ের রং উজ্জ্বল গমের মতো। তার চেহারায় এক ধরনের পরিমিত সৌন্দর্য চোখদুটো তীক্ষ্ণ, গভীর, যেন সবকিছু খেয়াল করে। নাক-চোখের গঠন স্পষ্ট, মুখে হালকা দাড়ি, যা তাকে আরও পরিণত দেখায়। তার চলাফেরায় আত্মবিশ্বাস আছে, কিন্তু অহংকার নেই।

সে সামনে এসে মাথা নুইয়ে দাঁড়াল
“হুকুম করুন, হুজুর।”
বাকের শাহ্ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন শব্দগুলো গুছিয়ে নিচ্ছেন। তারপর ধীরে বললেন
“ বাইজিদকে দেখেছ আজ?”
নেওয়াজ মাথা তুলল
“জি, হুজুর।”
বাকের শাহ্ দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন।
“একদিনেই কি হাল হয়েছে ছেলেটার।”
তার কণ্ঠে উদ্বেগ স্পষ্ট।
“এই দূরত্ব এই বিচ্ছেদ এভাবে চলতে পারে না।”

তিনি চেয়ার থেকে উঠে জানালার দিকে গেলেন।
“শাসক হিসেবে সে ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু মানুষ হিসেবে?”

তিনি থেমে গেলেন। তারপর ফিরে তাকালেন নেওয়াজের দিকে।
“এই দূরত্ব ঘোচানো দরকার।”
তার কণ্ঠ এবার দৃঢ়।
“যেভাবেই হোক, ওদের আবার কাছাকাছি আনতে হবে।”
আবিদ মাথা নুইয়ে বলল
“ক্ষমা করবেন হুজুর, আমি ঘটনাস্থলে থাকতে পারিনি। দুজন প্রজার জমিজমা নিয়ে বিশাল দন্দ। তার সমঝোতা করতে আমায় যেতে হয়েছিল। কিন্তু মহলে ফিরেই আমি সবটা শুনেছি”

কিঞ্চিৎ থেমে সে বলল
“বেয়াদবি মাফ করবেন হুজুর। তবে শাহজাদা যেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, তা কেবল প্রজা, রক্ষী এবং দাসীদের জন্য। ছোট বেগম মেহেরুন্নেসা নূর শাহজাদার স্ত্রী। তার অধিকার আছে স্বামীর বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার। এই বিষয়টা কি কারো মাথায় আসেনি? তার চেয়ে বড় কথা ওই বন্দি নারীটি বেগম কে ধোকা দিয়েছে। শাস্তি হলে তার হওয়া দরকার। যদিও সে শাস্তি ভোগ করছে”

বাকের শাহ্ ঠোঁট জোড়া প্রসস্থ করে বলল
”তুমি সঠিক বলো সবসময় নায়েব। এজন্যই তোমাকে আমি এত ভালোবাসি”

“এ তো আমার সৌভাগ্য হুজুর”

“এবার এই কথা গুলো বাইজিদ কে বোঝাও গিয়ে”

আদিব একটু ঘাবড়ালো। হতে পারে সে কথা বলায় খুব পটু। কিন্তু শাহজাদা বাইজিদ এর সামনে গেলে সম্মানে তার মুখে প্রয়োজন হেতু কথা টুকু ছাড়া আর কিচ্ছু বেরোয় না। সে বাকের শাহ্ কে বোঝাতে পারে। কিন্তু বাইজিদ কে পারে না। শুকনো ঢোক গিলে বলল
“চেষ্টা করছি জনাব”

বাকের শাহ্ কপাল কুঁচকে বলল
“চেষ্টা নয় আদিব। তোমার ওপর দ্বায়িত্ব ভার পড়লো এর। কারণ বাইজিদ এভাবে ভেঙে পড়লে রাজ্য অচল হয়ে পড়বে। বিগত আটটি বছর ধরে আমরা যেই বিভীষিকা ময় নিপীড়ন থেকে এই রাজ্যকে বাঁচাতে গিয়ে রক্তঘাম ছোটাচ্ছি, তা নিশ্চয়ই তোমার অজানা নয়”

“জ্বী, আমি আমার সর্বোচ্চ টুকু প্রয়োগ করবো”

বিদায় জানিয়ে বেড়িয়ে এলো। কক্ষের দরজা খুলে একটু অন্যমনষ্ক ভাবেই বেরোলো নেওয়াজে আবিদ। অসাবধানতা বসত ধাক্কা লাগলো সুনেহেরার সঙ্গে। সেও ঘাগড়ির দুই পাশের অংশ সামান্য উঁচু করে ধরে ছুটে আসছিলো এই দিকেই। দুজনের বাহু ঠুকে গেলো। নেওয়াজ চট করে সরে দাঁড়য়ে সামান্য মাথা নিচু করে বলল
“মার্জনা করবেন শাহজাদি। খেয়াল করিনি”

সুনেহেরার মেজাজ তুঙ্গে তখন। ভ্রু কুঁচকে বলল
“চোখের কি মাথা খেয়েছেন?”

“জ্বী”

“হ্যাঁ?”

“না না। না চোখের মাথা খাই নি। আসলে নগরে যাব তো। একটু তাড়া ছিল। আসছি। ক্ষমা করবেন”
নেওয়াজ এক মূহুর্তও দেরি না করে হাঁটা দিলো অনুশীলনের জায়গা টায়। একটু পর শাহজাদা কক্ষে যাবে, গোসল সেরে মজলিসে বসবে। আর পাওয়া যাবে না তাকে। সুনেহেরা নগরের কথা শুনে কিছুক্ষণ কপাল কুচকে কিছু একটা ভাবলো। তারপরই পিছন থেকে বলল
“নগরে যাবে? তাহলে তো…..ও নেওয়াজ সাহেব শুনছেন?”

ততক্ষণে সে অনেকটা দূর এগিয়ে গেছে। বিধায় সুনেহেরার ডাক কানে গেল না। সুনেহেরা ফের ঘাগড়া দু’হাতে ধরে পিছু পিছু দৌড় লাগালো
“ও নেওয়াজ সাহেব। আরে দাঁড়ান না। কেমন লোকরে বাবা”

“বলি ও নেওয়াজ সাহেব। দেখো তো কেমন জিরাফের মত একেকটা পা ফেলছে। এই খচ্চর লোক। দাঁড়ান বলছি”

“এসব কি ভাষা সুনেহেরা? কোথ থেকে শিখছো এসব?”

রত্নপ্রভার কথায় পিছন ফিরলো সুনেহেরা। মাত্রই সে অস্ত্র প্রশিক্ষণ থেকে ফিরল। ফের বলল
“উনি এই রাজ্যের সম্মানিত নায়েব। তাকে কি বলে সম্বোধন করলে তুমি?”

“সে অনেক কথা আপা। আমি আসছি। নেওয়াজ সাহেব দাঁড়াআআন”

ততক্ষণে নেওয়াজ কাঁটাতার এর বেড়া পেরিয়ে অনুশীলন প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়েছে। সুনেহেরাও গেল পিছু পিছু। সেখানে গিয়ে সবার থেকে জানতে পারলো বাইজিদ কিছুক্ষণ আগেই মাঠ ছেড়েছে। কিন্তু কোথায় গেছে জানে না। ভাবলো মাহাদি হয়তো জানবে। বরাবরের মত লোহার বর্মে আবৃত মাহাদি সৈন্য দের প্রশিক্ষণ জোরদার করতে ব্যাস্ত। নেওয়াজ গিয়ে দাঁড়াতেই সম্মান প্রদর্শন করলো। নেওয়াজ তার হাত ধরে বলল
“কতবার বলেছি আপনাকে, আমাকে বন্ধুর মত গ্রহণ করবেন। আপনি না, কেমন জানি পরপর ভাবেন আমায়”

বর্মে আবৃত মুখখানায় কেবল চোখ জোড়া দৃশ্য মান। তার চোখ হেসে উঠে
“তা নায়েব আজ প্রশিক্ষণশালায়? অস্ত্র চালনা শিখবেন নাকি?”

নায়েব হাসে।
“আমার গায়ে অত শক্তি কই এই বিশাল বিশাল অস্ত্র গুলো তুলব যে? আমি তো শাহজাদার ক…..

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই সুনেহেরা ঘাগড়া ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে থামলো। নায়েব আর মাহাদি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। রোদে ঘেমে পুতুলের মত মেয়েটাকে একদম জীবন্ত পুতুল লাগছে।
“কখন থেকে ডাকছিলাম। কানে তুলো গুঁজেছেন নাকি? আসুন আমার সাথে।”

নেওয়াজ কে কিচ্ছু বলার সুযোগ না দিয়ে হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো সুনেহেরা। নেওয়াজ মিটিমিটি হেসে তার পিছু পিছু যেতে লাগলো। সেদিকে তাকিয়ে মাহাদির হাত তলোয়ার এর হাতলে আপনাআপনি শক্ত হয়ে ওঠে। যেন কি কেমন একটা জ্বলন অনুভূত হচ্ছে।

গত পর্বে কিছু মানুষের কমেন্ট দেখলাম। 🙂🙂 কি আর বলব। শুধু এতটুকুই বলি, আমি মেশিন না যে এর চেয়ে বড় পর্ব দিব। বা দিনে দুই পর্ব দিব। রিয়্যাক্ট টার্গেট আমার ৩.৫k করে দেওয়া উচিত এদের ব্যাবহারে। শুধু নিয়মিত পাঠিকা দের কথা ভেবে গল্প দিই। আর গল্প হারিয়ে ফেলে অন্যান্য গ্রুপে লিংক চেয়ে যারা পোস্ট দেয়, তাদের মত বোকামি না করে ফলো দিয়ে রাখুন আমার পেইজ টা। গল্প হারাবে না।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply