নতুন প্রেমের গান পর্ব ২১
“সুপ্রভার কোনো যোগ্যতাই নেই প্রফেসর শেখ সিয়াদাত শাহারিয়ার বউ হওয়ার।আমি সুপ্রভাকে নয় নোরা চৌধুরীকে বিয়ে করতে চাই।।নোরা এডুকেটেড, স্টাইলিশ আমার স্ট্যাটাসের সাথে মানানসই।”
উপস্থিত সকলে চমকে উঠে। ঈশিতা চৌধুরী কপালে চোখ তুলে বলেন– “ এসব কী বলছো তুমি সিয়াদাত? বিয়ে কোনো খেলনা নয় যে যখন খুশি অদলবদল করবে! তুমি কি ভুলে গিয়েছো, সুভাকে বিয়ের কথা তুমি নিজেই বলেছিলে? আর এখন তুমি নোরার কথা বলছো? তুমি কি মানুষ নাকি কোনো রোবট? হৃদয়ের কোনো অস্তিত্ব কি তোমার মধ্যে নেই?”
সিয়াদাত মন্থর পায়ে এগিয়ে এসে সোফায় বসে। ধীরস্থির কণ্ঠে বলে–” আবেগ দিয়ে জীবন চলে না আন্টি। সুপ্রভার প্রতি আমার একটা প্রাথমিক দুর্বলতা ছিল, সেটা অস্বীকার করছি না আমি। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠোর। আমার মতো উচ্চশিক্ষিত মানুষের জীবনে এমন কাউকে প্রয়োজন যে শুধু সুগৃহিণী নয়, আমার সামাজিক অবস্থানের সমকক্ষ। নোরার চালচলন, কথা বলার ভঙ্গি সবকিছুর মধ্যে একটা আভিজাত্য আছে। ওর গায়ের রঙ, ওর সাজপোশাক, ওর কথা বলার ভঙ্গি সবই আমার ব্যক্তিত্বের সাথে হুবহু মানানসই।
নোরা যখন আমার পাশে এসে দাঁড়াবে, তখন লোকে আমাকে দেখে ঈর্ষা করবে। ওর ব্যক্তিত্ব আমার স্ট্যাটাসকে আরও উজ্জ্বল করে তুলবে। ও জানে কীভাবে একটা আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে বা হাই-প্রোফাইল ডিনারে নিজেকে প্রেজেন্ট করতে হয়।
সুপ্রভার মতো একজন সাধারণ মেয়েকে নিয়ে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া আমার জন্য অসম্ভবই নয়, বরং তা হবে আমার ক্যারিয়ারের জন্য এক বিশাল বাধা। আমি আমার জীবনসঙ্গিনীর কাছ থেকে এমন কিছু আশা করি, যা সুপ্রভার মধ্যে নেই।তুমি বরং সুপ্রভাকে অন্য কোথাও ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দাও। আমার জন্য নোরার বাইরে অন্য কিছু ভাবছি না আমি ।”
সিয়াদাতের প্রতিটি শব্দ সুপ্রভার কানে যেন উত্তপ্ত সীসা ঢালে।সিয়াদাত নোরাকে বিয়ে করতে চায়, এই নির্মম সত্যটা যখন তার কানে আসে অজান্তেই তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে হয় কেউ তার বুকের মাঝখানটা নিঃশব্দে ছিঁড়ে ফেলেছে।তার ঠোঁট কেঁপে উঠে, চোখের কোণে জমে থাকা জলের কণাগুলো আর বাঁধ মানে না। জলভর্তি চোখে সে কারো দিকে না তাকিয়ে, কারো কোনো কথা না শুনে হঠাৎ করেই দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দেয়।বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার।সে ধীরে ধীরে জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।বাইরে আকাশটা মেঘলা । মনে হয় যেন তার মনটাই ছায়া ফেলে দিয়েছে প্রকৃতির গায়ে। হালকা বাতাসে পর্দাগুলো দুলছে, আর সেই দোলায় তার ভাঙা স্বপ্নগুলোও যেন ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
তার চোখ বেয়ে টুপটাপ করে জল পড়ছে। মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে সে অবচেতনে, ভাঙা গলায় গেয়ে উঠে ,
“কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি
কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি
কেমনে রাখিব তোর মন
কেমনে রাখিব তোর মন
আমার আপন ঘরে বাধিরে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি
কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি…..”
আচানক কাঁধে কারো স্পর্শে গান বন্ধ হয়ে যায় সুপ্রভার।সুপ্রভা ত্বরিত পেছন ফিরে দেখে সিমি দাঁড়িয়ে রয়েছে।সিমিকে দেখা মাত্রই সুপ্রভা তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করে দেয়। সিমি হকচকিয়ে যায়। অবাক গলায় বলে –
“ কী হয়েছে তোর? এভাবে কান্না করছিস কেন?”
সিমির প্রশ্নে অটোমেটিক কান্না বন্ধ হয়ে যায় সুপ্রভার।সে চটজলদি হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে নেয়। ভাঙ্গা গলায় বলে– “ জানি না কেন কান্না করছি।হুট করেই কাঁদতে ইচ্ছে করল।কেন করল জানি না।”
সিমি ঈষৎ হেসে বলে– “ তুই না জানলেও আমি জানি প্রভা। তোর মনে দাভাইয়ের জন্য একটা সফট কর্নার তৈরি হয়েছে।তোর অবচেতন মন কোথাও না কোথাও দাভাইকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।দাভাই অন্য কাউকে বিয়ে করবে এটা তোর মন কিছুতেই মানতে চাইছে না।”
সিমির কথার সরাসরি আঘাতে সুপ্রভা যেন মুহূর্তের জন্য জমে যায়। সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেয়, যাতে সিমি তার চোখের গভীরের সত্যটা পড়তে না পারে। সে কাঁপা গলায় বলে, “তোর কল্পনাশক্তি বড্ড বেশি, সিমি। আমি কেন ওনার মতো একজন মানুষের জন্য ভাবব? যার কাছে আমার অস্তিত্বের চেয়ে তার অহংকার বড়, তার জন্য মনে সফট কর্নার থাকাটা কি বোকামি নয়?”
সিমি সুপ্রভার কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলে, “বোকামি কি না জানি না, কিন্তু হৃদয়ের টান কি আর যুক্তি মানে, প্রভা? দাভাই যা বলছে, তা হয়তো তার মস্তিষ্কের জেদ।কিন্তু তোর চোখের জল বলছে তুই তাঁকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছিস। তুই কি পারবি তাঁকে মন থেকে মুছে ফেলতে?”
সুপ্রভা জানালার বাইরের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়। সে জানে সিমি ভুল বলছে না, অথচ মানতে তার বুকটা দুমড়ে যাচ্ছে। সে মৃদু স্বরে বলে, “ভালোবাসা কি সব সময় প্রাপ্য মানুষের জন্যই হয়? হয়তো আমার কপালেই ছিল অসমাপ্ত গল্পের ক্ষত। তবে শোন সিমি, আমি আর নিজেকে ছোট করতে চাই না। উনি যদি আমাকে সাধারণ মনে করেন, তবে আমিও আজ থেকে নিজেকে সাধারণের উর্ধ্বে তুলব। নোরার মতো হতে আমি চাই না, কিন্তু নিজের মর্যাদা বিসর্জন দেওয়াও আমি বন্ধ করলাম।”
সিমি কিছু বলার আগেই সিয়াদাতের গম্ভীর গলা শোনা যায় – “ আসতে পারি?”
সুপ্রভা অতি সত্বর চোখের জল মুছে নেয়। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার মিথ্যা চেষ্টা চালিয়ে বলে– “ জ্বি আসুন।”
সিয়াদাত সুপ্রভার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে নেয়।কুটিল হেসে বলে– “ আসসালামুয়ালাইকুম ভাবী।”
সুপ্রভা কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সিয়াদাতের দিকে।সিয়াদাত সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে– “ না মানে আপনার ননদ আমার বউ হলে , আপনি তো আমার ভাবীই হন তাই না? অবশ্য আপনি বয়সে আমার ছোট হলেও সম্পর্কে আমার বড়।আমার গুরুজন।গুরুজন সম্মানীয় ব্যক্তি।”
সিয়াদাতের মুখে এমন বাঁকা শ্লেষ আর পরিহাসমাখা কথা শুনে সুপ্রভার সারা শরীর অপমানে রি রি করে উঠে। মুহূর্তের জন্য সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়। যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও নোরার আভিজাত্য আর নিজের স্ট্যাটাস নিয়ে আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখছিল, সে এখন সুপ্রভাকে গুরুজন সম্বোধন করে ব্যঙ্গ করছে! এটা অপমানের চূড়ান্ত।
সুপ্রভার থেকে রেসপন্স না পেয়ে সিয়াদাত আবারো বলে– “ আপনি চৌধুরী বাড়ির একমাত্র বউ।আপনার একমাত্র ননদের বিয়ে।ভাবী হিসেবে আপনার অনেক দায় দায়িত্ব রয়েছে।আশা করি আপনি আপনার দায়িত্ব পালনে কার্পন্য করবেন না। শুক্রবার আমাদের বিয়ে।হাতে মাত্র চারটা দিন সময় আছে।এরই মধ্যে বিয়ের শপিং, এনগেজমেন্ট, মেহেন্দি, গায়ে হলুদ… সবটা কিন্তু আপনাকেই সামলাতে হবে।”
সুপ্রভা কিছু বলে না। দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে থাকে।সিয়াদাত সুপ্রভার দিকে ঝুঁকে আসে। কটাক্ষ করে বলে – “ কষ্ট হচ্ছে নাকি?”
সুপ্রভার চোখে আগুন জ্বলে ওঠে।সে কঠিন গলায় বলে– “ কষ্ট হবে কেন?”
সিয়াদাত অবিশ্বাসী গলায় বলে– “ সত্যিই কষ্ট হচ্ছে না? কিন্তু আমি যে আপনার চোখে স্পষ্ট কষ্টের ছায়া দেখতে পাচ্ছি।”
সুপ্রভার কেন জানি খুব কান্না পায়।সে সিয়াদাতের দিকে না তাকিয়ে জানালার শিকগুলো শক্ত করে চেপে ধরে।ভেজা গলায় বলে– “ বড় ভাবী হিসেবে সমস্ত দায় দায়িত্ব পালন করব আমি। এবার আপনি আসুন প্লিজ।”
সিয়াদাত দরজার চৌকাঠে পা রেখে আবার কী মনে করে ফিরে আসে।সুপ্রভা তখনো জানালার শিকগুলো শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সিয়াদাত সুপ্রভার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বলে – “ আমায় ভালোবাসো লাল চমচম??”
চলবে !!!
® Nuzaifa Noon
[ প্রিয় পাঠক, আর মাত্র দুই এক পর্বেই এই গল্পের সমাপ্তি টানব। শুরুতে হাজার হাজার পাঠক গল্পটা পড়েছেন, আর এখন সেই গল্পের পাঠক নেই বললেই চলে।আমিও লেখার আগ্রহ পাই না।তাই মনে হয় শেষ করে দেওয়াই ভালো।আপনারা কি বলেন?]
Share On:
TAGS: নতুন প্রেমের গান, নুজাইফা নূন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
সুপ্রভা গল্পের লিংক
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৬
-
সুপ্রভা পর্ব ১
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৮
-
সুপ্রভা পর্ব ৪
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৪
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৫
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৯
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৬