তুমিএলেঅবেলায় 🍂 (পর্ব – ১৩)
লেখকঃ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা
সামাইরা এখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার দীর্ঘ কালো চুলগুলো বালিশের ওপর অগোছালোভাবে ছড়িয়ে আছে। ঘুমের ঘোরেও তার চোখের পাতা দুবার কেঁপে উঠছে। যেন অবচেতন মনেও সে তার সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ছে।
শ্যলে-র পাইন কাঠের দেয়ালে বাতাসের ঝাপটা আছড়ে পড়ার শব্দটা অদৃশ্য কোনো দানবের কান্নার মতো শোনাচ্ছিল। শেহজাদ খুব মনযোগ দিয়ে সেই শব্দ শুনছিল। ক্ষণিককাল পর মেসেঞ্জারে একটি টেক্সট পেয়ে সে তার ল্যাপটপের সামনে পাথরের মতো স্থির হয়ে বসল। কানে এয়ারপড গুঁজে নিল।
কলের ওপাশে রয়েছে তার পার্সোনাল সাইবার সিকিউরিটি টিমের প্রধান। লোকটি এখন লন্ডন থেকে পুরো ‘ক্লিন-আপ’ অপারেশনটা লিড করছে।
শেহজাদ অতি শান্ত স্বরে বলল,
-আমি কোনো অজুহাত শুনতে চাই না। আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে ইন্টারনেটের প্রতিটি জায়গা থেকে ওই ভিডিওর শেষ পিক্সেলটুকুও যেন মুছে যায়। যে নিউজ পোর্টালগুলো সস্তায় ভিউ পাওয়ার জন্য আমার স্ত্রীর ছবি ব্যবহার করে এই ন*গ্ন ব্যবসা শুরু করেছে, তাদের সার্ভার এমনভাবে ক্রাশ করাও যেন আগামী সাত দিনেও তারা অনলাইনে ফিরতে না পারে।
টিমের প্রধান জানতে চাইল ,
-স্যার, আমরা কি কোনো আইনি ব্যবস্থাতে যাব?
-সেসব পরের ব্যাপার। আগে তাদের ডিজিটাল অস্তিত্ব মিটিয়ে দাও। ডু ইউ গেট মি?
-ইয়েস স্যার। আমরা অলরেডি নব্বই শতাংশ ওয়েবসাইট থেকে ভিডিওটি রিমুভ করেছি। যেসব বট অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি অটো-শেয়ার হচ্ছিল, সেগুলোর সোর্স কোড আমরা ডিসেবল করে দিয়েছি। আমাদের একটি ডেডিকেটেড অ্যালগরিদম এখন চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করছে। কেউ যদি নতুন করে আপলোড দেওয়ার সামান্যতম চেষ্টাও করে, তবে ফ্র্যাকশন অফ সেকেন্ডের মধ্যে তা অটো-টেইক ডাউন হয়ে যাবে।
শেহজাদ মুখে তৃপ্তির হাসি ঝুলিয়ে ল্যাপটপের ঢাকনাটা সজোরে বন্ধ করল।
সময় অপচয় করা শেহজাদের পছন্দ নয়। তার মনের সন্দেহের খাতায় একজনের নাম টুকে রাখা আছে। সে নিজেই তাকে ইন্টারোগেট করতে চাইল।
শেহজাদ রাইসাকে কল করল। ওপাশ থেকে কয়েকবার রিং হওয়ার পর রাইসা ফোন ধরল।
-কী ব্যাপার শেহজাদ? মাঝরাতে হানিমুনে বউকে একা ফেলে আমায় কল করলে যে? মধু খাওয়া শেষ নাকি? এত দ্রুত বিরক্তি চলে এসেছে?
রাইসার হাসি ভরা তাচ্ছিল্য।
শেহজাদ দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করল,
-রাইসা, আইপি অ্যাড্রেস ট্র্যাক করা শুরু হয়ে গেছে। সত্যিটা বললে হয়তো তোমার আভিজাত্যটুকু অন্তত বেঁচে থাকবে।
রাইসা অবাক হয়ে প্রথমে জানতে চাইল,
-কিসের আইপি ট্র্যাক হচ্ছে?
পরক্ষণেই ঘটনা বুঝতে পেরে সে হো হো করে হেসে উঠল। দম্ভের ভারে নুইয়ে গিয়ে বলল,
-শেহজাদ, আমার সময় কি এতটাই সস্তা? একটা সামান্য বস্তির মেয়ে, যার কোনো অস্তিত্বই নেই আমার লাইফে। ওর জন্য আমি এই নোংরা পথে হাঁটব?
তোমাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের জন্য কোনো ভিডিওর প্রয়োজন নেই। আমার উপেক্ষাই যথেষ্ট। আর শোনো, এসব বুলশি*ট ঝামেলায় আমাকে জড়ানোর চেষ্টাও করবে না।
যদি কোনোদিন নিজের ভুল বুঝতে পারো আর ওই মেয়েটাকে ডিভোর্স দিয়ে আসতে পারো, তবেই আমার সাথে কথা বলতে আসবে।
লাইন কেটে গেল। শেহজাদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। রাইসার কণ্ঠের অহংকার তাকে স্পষ্ট ভাবে বুঝিয়ে দিল, সে অন্তত এই ষড়যন্ত্রে নেই।
শেহজাদের পুরো রাত কেটে গেল নির্ঘুম। এক চরম অস্থিরতার মাঝে। ভোরের দিকে যখন পর্বতের চূড়ায় স্নিগ্ধ রোদ্দুরের আলো উঁকি দিতে শুরু করেছে, তখন টিমের হেড রিপোর্ট করল,
-স্যার, সকল নিউজ পোর্টাল ডাউন। সকল সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে ভিডিওটি সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। আমরা সফল।
শেহজাদ স্বস্তিমাখা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার রক্তাভ চোখদুটো স্বাভাবিক হয়ে আসতে লাগল। সে ধীর পায়ে বেডরুমে ঢুকল। জানালা ভেদ করে আসা ভোরের সেই মৃদু আলোয় সামাইরাকে রূপকথার পরীর ন্যায় দেখাচ্ছে।
শেহজাদ নিঃশব্দে সামাইরার পাশে বসল। ওর গালের ওপর শুকিয়ে যাওয়া লোনা জলের দাগ দেখে তার বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠল।
কেন এই মেয়েটির যন্ত্রণা তাকে এভাবে বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে? যে সামাইরাকে সে কেবল তার দম্ভ দিয়ে জয় করতে চেয়েছিল, আজ সেই মেয়েটির চোখের পানি।কেন তাকে অপরাধী বানিয়ে দিচ্ছে?
এই অনুভূতির নাম খুঁজতে খুঁজতে শেহজাদ অতি সন্তপর্ণে সামাইরাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল।
সামাইরা ঘুমের ঘোরেই শেহজাদের শরীরের সেই পরিচিত পারফিউম আর তামাকু মিশ্রিত ঘ্রাণ পেয়ে কিছুটা শান্ত হলো। অবচেতন ভাবে শেহজাদের বুক খাঁমচে ধরল।
শেহজাদ সামাইরার কপালের সামনের অবাধ্য কয়েকটি চুল সরিয়ে দিয়ে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
-ক্ষত তোমার, অথচ যন্ত্রণা পাচ্ছি আমি।
ভালোবাসি অন্য কাউকে, তবুও গোটা মন জুড়ে তুমি!
তোমায় স্পর্শ করি ঘৃণাভরে, কারণ জিততে চাই আমি,
অথচ জেদটাকেও বড় তুচ্ছ লাগে, যখন সামনে থাকো তুমি!
শেহজাদ সামাইরার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। গলার স্বর আরোও নিভু নিভু করে বলল ,
-কেন সামাইরা? কেন তুমি আমার সব পরিকল্পনা ওলটপালট করে দিতে চাইছো? আমি তো তোমাকে ঘৃণা করি! আই হেইট ইউ সো মাচ, ব্লাডি মিড*ল ক্লাস ওমেন। এই ঘৃণার মাঝেও তোমার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস আমাকে ক্ষতবিক্ষত করছে কেন?
বেলা তখন ভালোই গড়িয়েছে।
ঘুমটা যখন ভাঙল, সামাইরা প্রথম কয়েক সেকেন্ড বুঝতে পারল না সে কোথায় আছে। শরীরের সাথে মিশে থাকা পুরুষালি সুবাস নাকে আছড়ে পড়তেই তার ঘুম পুরোপুরি ভেঙ্গে গেল।
চোখ পিটপিট করে দেখল, সে এক জোড়া পেশিবহুল বাহুর মাঝে বন্দি হয়ে আছে। শেহজাদের প্রশস্ত বুকটা তার গালের ভীষণ কাছে। তার পুরো শরীর শেহজাদের শরীরের সাথে লেপ্টে আছে।
সজ্ঞানে আসা মাত্রই সামাইরা এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। এক লাফে নিজেকে শেহজাদের বাহুপাশ থেকে মুক্ত করে বিছানার একদম কিনারে চলে এল।তার এই আকস্মিক ঝটকায় শেহজাদের তন্দ্রাচ্ছন্ন ঘোরটাও কেটে গেল। শেহজাদ চোখ খুলে দেখল সামাইরা বিছানার ওপর দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। তার চোখদুটো রাগে আর বিস্ময়ে সরু হয়ে আছে।
সামাইরা আঙুল উঁচিয়ে সরাসরি আক্রমণ করল,
-এই আপনি… আপনি আমাকে ওভাবে বুকে জড়িয়ে ধরে শুয়েছিলেন কেন? কোন অধিকারে?
শেহজাদ তখনো বিছানায় শুয়ে। তার চোখে গভীর ঘুমের রেশ। গলার স্বর বরফ শীতল। সে উঠে বসে হাত দুটো মাথার পেছনে নিয়ে হেলান দিয়ে বসল। স্বাভাবিকভাবে জবাব দিল,
-গতরাতে তুমি নিজেই আমার জামা খামচে ধরে কাঁদতে কাঁদতে আমার বুকে আশ্রয় নিয়েছিল। আমি তো কেবল মানবতার খাতিরে তোমাকে দূরে সরিয়ে দেইনি। এখন জেগে উঠে এই ড্রামাটা করার কি খুব প্রয়োজন ছিল?
সামাইরা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। গতরাতে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঝাপসা স্মৃতি তার মস্তিস্কে একে একে ভিড় জমাতে লাগল।
ভিডিওর খবর দেখা, শেহজাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া, তারপর একসময় তার বুকেই মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠা, সব মনে পড়ে গেল তার।
সামাইরার তেজি ভাবটাও কোথায় যেন উবে গেল।
তার চোখের সেই উদ্ধত চাহনি নিভে গিয়ে সেখানে জায়গা নিল এক বিশাল শূন্যতা। সে মাথা নিচু করে ফেলল অপরাধীর মত।
সামাইরার এভাবে নিস্তেজ হয়ে যাওয়াটা শেহজাদের মোটেও সহ্য হলো না। সে সামাইরার এই শান্ত রূপের সাথে পরিচিত নয়। এই মেয়েটি প্রথম দিন থেকেই তার অহংকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তার বিশাল ইগোকে তুচ্ছ করে কথা বলেছে। শেহজাদ সেই যুদ্ধাংদেহী সামাইরাকে চেনে। এই কুঁকড়ে যাওয়া তরুণীকে নয়। সামাইরার ব্যক্তিত্বের এই পতন শেহজাদকে ভেতর থেকে দুমড়েমুচড়ে ফেলল।
শেহজাদ বিছানায় শুয়ে থেকেই সিগারেট ধরালো। এরপর বিছানা থেকে নেমে দ্রুত পায়ে সামাইরার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সামাইরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই শেহজাদ তার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে সজোরে ঝাঁকিয়ে উঠল। চরম রুক্ষ স্বরে বলল,
-কী হলো? মাথা নিচু করে আছো কেন? ব্লাডি মিডল ক্লাস মহিলা! কার কাছে নিজের সর্বস্ব খুইয়ে এসে এখন আমার গলায় ঝুলে সতী সাধ্বী সাজার চেষ্টা করছো হ্যাঁ? ওই ভিডিওতে সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তোমার এই ড্রামাটা বন্ধ করো, বি*চ। তোমার মতো মেয়েরা এভাবেই বড়লোকের মায়েদের সামনে ভালো সেজে তাদের ট্র্যাপে ফেলে।
শেহজাদের মুখে এই চরম অপমানজনক কথাগুলো সামাইরার কানে গরম সিসার মতো বিঁধল। সে আর এক দণ্ড ভাবল না। তার শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিল শেহজাদের বাঁ গালে।
আঘাতটা বেশ জোরে ছিল তবুও শেহজাদের মুখটা এক চিলতেও নড়ল না। সে কেবল স্থির দৃষ্টিতে সামাইরার দিকে তাকাল। সামাইরা রাগে আর অপমানে থরথর করে কাঁপছে।
শেহজাদ দাঁতের ফাঁক দিয়ে গালি দিয়ে বলল,
-হাউ ডেয়ার ইউ, বিচ! তোমার এত বড় সাহস! তুমি আমার গায়ে হাত তুললে?
সামাইরা এবার হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠল,
-আজ শুধু চড় দিয়েছি। আর কোনোদিন যদি আমার চরিত্র নিয়ে একটা নোংরা কথা আপনার ওই মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেন, তবে আমি আপনাকে জানে মেরে ফেলব। আপনি যদি সত্যিকারের পুরুষ হয়ে থাকেন, তবে ওই শয়তান অপরাধীকে খুঁজে বের করে আমার সামনে নিয়ে আসুন। আমি নিজের হাতে ওর হাত দুটো কেটে ফেলব। কিন্তু তা তো আপনি পারবেন না! আপনি শুধু পারবেন আমার মতো একলা একটা মেয়ের ওপর নিজের বস্তা পঁচা মেইল ইগো দেখাতে। নিজেকে পুরুষ দাবি করেন? আগে একজন মানুষ হতে শিখুন। বি এ ম্যান, মিস্টার রহমান!
কথাগুলো শেষ হতেই সামাইরা আর সেখানে এক সেকেন্ড দাঁড়াল না। গটগট করে পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল এবং পাশের লাগোয়া গেস্ট বেডরুমে ঢুকে গেল।
সামাইরা চলে যাওয়ার পর ঘরে নীরবতা নেমে এল। শেহজাদের বা গাল সামান্য জ্বলছে। তবুও তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল তৃপ্তির হাসি। তার নিষ্ঠুর পরিকল্পনা বিফলে যায়নি। সামাইরা আবার তার সেই বিধ্বংসী রূপে ফিরে এসেছে। তার এই তেজটুকুই তো প্রয়োজন! সামাইরাকে আঘাত না করেও হয়ত এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত। কিন্তু শেহজাদ মানুষটাই যে ত্যাড়া! তার সিদ্ধান্ত সমান্তরাল হবে কিভাবে? শেহজাদ গালে সেই হাসি ঝুলিয়ে রেখেই সিলিং এর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ ধোঁয়া ছাড়ল।
কিছুক্ষণ পর শেহজাদ তার ল্যাপটপটা পুনরায় খুলল। তার সাইবার টিমের উদ্দেশ্যে সে মেসেজ পাঠাল,
-ক্রিমিনালের আপডেট কী?
ফিরতি উত্তর এল,
-স্যার, অপরাধী অত্যন্ত ধূর্ত। সে নিজের আইপি লুকানোর জন্য একের পর এক মাল্টি-লেয়ার ভিপিএন এবং প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করছে। যার ফলে তার একচুয়াল লোকেশন এখনো ট্রেস করা সম্ভব হয়নি। সে খুব শক্তিশালী এনক্রিপশন ব্যবহার করে ভিডিওটি আপলোড করেছিল।
শেহজাদের চোখের মণি সরু হয়ে এল। সে কিপ্যাডে দ্রুত হাতে টাইপ করল,
-আই ডোন্ট কেয়ার হাউ ইউ ডু ইট। যখনই ট্রেস করতে পারবে, তাকে জীবিত ধরে ‘জোন জিরো’তে নিয়ে আসবে।’
কয়েক সেকেন্ড পরেই রিপ্লাই এল,
-নো ওরিস, বস। হি উইল বি দেয়ার।
কিছুক্ষণ পর সকালের ব্রেকফাস্ট টেবিলে বাটলাররা সাজিয়ে দিয়ে গেল। কিন্তু খাবার টেবিলের একপাশে শেহজাদ একা বসে থাকলেও অন্য পাশের চেয়ারটা শূন্য।
শেহজাদ একবার শান্তভাবে সামাইরাকে ডাকল।কিন্তু কোনো উত্তর এল না। দ্বিতীয়বার একটু গলা চড়িয়ে ডাকল। তবুও পাশের ঘর থেকে কোনো সাড়া মিলল না। শেহজাদের ধৈর্যের বাঁধ এবার আলগা হতে শুরু করল। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে পাশের গেস্টরুমে ঢুকল।
দেখল সামাইরা জানালার পাশে বসে শূন্য দৃষ্টিতে আল্পসের নিচের জনজীবন দেখছে। শেহজাদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
-ব্রেকফাস্ট টেবিলে দেওয়া আছে। খেতে এসো সামাইরা। খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
সামাইরা একবারও পেছন ফিরে তাকাল না। শেহজাদ এমনভাবে কথা বলছে যেন তাদের মাঝে একটু আগে কিছুই হয় নি! বিরক্তিভরা স্বরে সামাইরা বলল,
-আমার খিদে নেই। আপনি খেয়ে নিন।
শেহজাদ কথা বাড়াল না। সে দ্রুত পায়ে সামাইরার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সামাইরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই শেহজাদ তার হাত ধরে টানতে টানতে টেবিলের সামনে নিয়ে এলো। জোর করে চেয়ারে বসিয়ে দিল। সামাইরার চিবুক আর দুগাল শক্ত করে চেপে ধরল। সামাইরা যন্ত্রণায় সামান্য আর্তনাদ করে উঠল। কিন্তু শেহজাদের আঙুলের চাপ তাতে কমল না। সে বাম হাতে একইভাবে গাল চেপে ধরে অন্য হাতে টেবিল থেকে তুলে আনা ক্রোসঁ-র এক টুকরো সামাইরার মুখে পুরে দিল।
রাগী গলায় বলল,
-খাবে না মানে? আমার অবাধ্য হওয়ার ফল কিন্তু ভালো হয় না সামাইরা।
সামাইরা কোনোমতে খাবারটুকু গিলে ফেলে অগ্নিদৃষ্টি মেলে তাকাল শেহজাদের পানে।
শেহজাদ এবার তাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
-কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বের হব। ওই যে জলপ্রপাত দেখতে যাওয়ার কথা ছিল আমাদের, মনে আছে তো? খেয়ে দ্রুত তৈরি হয়ে নাও। আমি আর কোনো সিন ক্রিয়েট করতে চাই না। গট ইট?
সামাইরা চাহনি বলছে, সে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়েই শেহজাদকে খুন করে ফেলবে!
শেহজাদ খেতে বসতেই তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে সুফিয়া রহমানের নাম দেখে শেহজাদ একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর বারান্দায় চলে গেল।ফোনটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে মায়ের উদ্বিগ্ন আর কান্নামাখা স্বর ভেসে এল।
-তোর ফুফু আর আবির এসেছিল বাসায়। এসব কী শুনছি রে শেহজাদ? ওরা সামাইরার ভিডিওর কথা বলছে। এসব কি সত্যি?
শেহজাদ চোয়াল শক্ত করে আকাশের দিকে তাকাল। সে খুব ধীরস্থিরভাবে মাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল,
-মা, ওসব একদম মিথ্যে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আর ডিপফেইক প্রযুক্তি দিয়ে এসব বানানো হয়েছে। কেউ শত্রুতা করে আমাদের সম্মানহানি করতে চেয়েছে।
সুফিয়া রহমান হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
-কিন্তু এসব কে করবে? কেন করবে?
শেহজাদের গলার স্বরে পুরোনো অহংকার ফিরে এলো। বলল,
-শত্রুর কি অভাব আছে মা? তোমার ছেলে এত কম বয়সে দেশ-বিদেশে নিজের সাম্রাজ্য বিছিয়ে বেড়াচ্ছে। তার শত্রু থাকবে না তো কার থাকবে? তুমি ওসব নিয়ে চিন্তা কোরো না।
-সামাইরা ঠিক আছে তো?
মায়ের মায়াভরা প্রশ্নটি শুনে শেহজাদের ভালো লাগল। সে ভেতরের ঘরের দিকে একবার তাকাল। সামাইরা এখনো মুখ গোমড়া করে বসে আছে। যে কোনো সময় ফণা তুলবে!
শেহজাদ মৃদু হেসে বলল,
-ঠিক নেই মা। তবে ঠিক হয়ে যাবে। আমার সাথে কেউ বেশিক্ষণ বেঠিক থাকতে পারে না। রাখছি মা। নিজের যত্ন নিও।
ফোনটা রেখে শেহজাদ বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। অস্ফুট স্বরে বলল,
- নাহ! আই রিয়েলি হেইট ইউ, মিসেস রহমান। আমি তোমায় ঘৃণা করার নেশায় পড়ে গেছি।
(চলবে…)
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, তুমি এলে অবেলায়
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৫
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩১
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৮
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩৪
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৫
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ১০
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২০