তুমিএলেঅবেলায় 🍂 (পর্ব – ১০)
লেখকঃ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা
জুরিখ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে যখন প্লেনের চাকা স্পর্শ করল তখন সুইজারল্যান্ড এ রাত ১০ টা বাজে। এই দীর্ঘ জার্নির সমাপ্তি দেখতে পেয়ে সামাইরা জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে সন্তপর্ণে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল।
বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকারে। রানওয়ের আলোগুলো জোনাকিপোকার ন্যায় নিভু নিভু জ্বলছে।
তুষারধবল এক স্বপ্নপুরীর দুয়ারে সে এখন দাঁড়িয়ে। ডিসেম্বরের শেষ ভাগ চলছে।সুইজারল্যান্ডের এখন শুভ্রতার চাদরে মোড়ানো রূপকথার রাজ্য।
প্লেনের দরজা খোলার পর যখন সামাইরা অ্যারোব্রিজে পা রাখল, হিটিং সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও রাতের সেই হাড়কাঁপানো কনকনে ঠাণ্ডার এক চিলতে রেশ তার মেরুদণ্ড দিয়ে প্রবাহিত হল। শিউরে উঠল সে।
জুরিখ এয়ারপোর্ট যেন আধুনিক স্থাপত্যের এক অন্যতম জাদুকরী প্রদর্শনী। কাঁচ আর স্টিলের কারুকার্যে ঘেরা এই বিমানবন্দরটি রাতের রঙবেরঙের আলোয় আরও রাজকীয় হয়ে উঠেছে।
সামাইরা লক্ষ্য করল, শেহজাদ এখানেও এক রাজপুত্রের মতোই বিচরণ করছে। ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় যখন লম্বা লাইন, তখন এক সুটেড-বুটেড অফিসার এসে শেহজাদকে এবং তাকে বিনীতভাবে আলাদা এক ভিআইপি গেটের দিকে নিয়ে গেল।
সামাইরা বুঝলো, শেহজাদ রহমান কেবল বাংলাদেশে নয় বরং ইউরোপের কর্পোরেট জগতেও তার বেশ পরিচিতি আছে।
অফিসারটি হাসিমুখে শেহজাদের সাথে জার্মান ভাষায় কুশল বিনিময় করলেন,
- Willkommen zurück, Herr Rahman!
এর মানে হল, স্বাগতম, মিস্টার রহমান!
সামাইরা পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখে যাচ্ছিল শেহজাদের সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য আর ক্ষমতার ছটা। সে অধিকাংশ উত্তর কেবলমাত্র মাথা নেড়ে দিচ্ছে! ভি’আই’পি লাউঞ্জে তারা একটু বিরতি নিল। বাহিরের হাড় কাপানো ঠান্ডার সাথে লড়াই করতে গরম কাপড় পরিধান করল।
এয়ারপোর্টের মূল ফটক দিয়ে বাইরে পা রাখতেই সামাইরার মনে হলো তার ফুসফুস যেন বিশুদ্ধ শীতল বাতাসে ভরে গেছে!
তাপমাত্রা তখন মাইনাস চার ডিগ্রি। আকাশটা মেঘহীন, তিমিরাচ্ছন্ন। ক্ষীণ চাঁদের আলো আছড়ে পড়েছে চারদিকের বরফঘেরা ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটের ওপর। বরফের পুরু আস্তরণ চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে।
ক্রিসমাসের আগমনের অপেক্ষায় শহরজুড়ে ঝুলে আছে মরিচ বাতির মালা। রাতের অন্ধকারে গোটা শহরটাকে সেই বাতিগুলোই রূপকথার রাজ্য বানিয়ে রেখেছে।
সামাইরা ওভারকোটের ওপর নিজের শালটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শেহজাদ তার পাশে এসে দাঁড়াল। আচমকা সামাইরার ওভারকোটের কলারটা ঠিক করে দিল।
শান্ত গলায় বলল,
-ভালো লাগছে?
সামাইরা মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিল,
- হুঁ।
শেহজাদ মুচকি হেসে বলল,
- আমরা এখন জুরিখ এ। তবে আমরা এখানে থাকব না। আমাদের গন্তব্য আল্পসের কোলে।
এয়ারপোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল এক রাজকীয় কালো রঙের মার্সিডিজ এস-ক্লাস। ড্রাইভার শেহজাদকে দেখা মাত্র মাথা নিচু করে দরজা খুলে দিল। ওদের গন্তব্যস্থল, সুইজারল্যান্ডের গ্রিন্ডেলওয়াল্ড। জুরিখ থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ।
গাড়ি যখন শহর ছেড়ে পাহাড়ি রাস্তার দিকে মোড় নিল, সামাইরা তখন নির্বাক হয়ে জানালার ওপাশে তাকিয়ে রইল। রাস্তার দুই পাশে পাইন গাছগুলো বরফের ভারে নুয়ে পড়েছে। দূরে দেখা যাচ্ছে বিশাল আল্পস পর্বতমালা। এর চূড়াগুলো চাঁদের ক্ষীণ আলোয় যেন রুপোর মতো জ্বলজ্বল করছে।প্রকৃতি যেন এক কালো ক্যানভাসে সাদা আর রূপালী রঙের খেলায় মেতে উঠেছে!
শেহজাদ এবং সামাইরার থাকার জন্য কোনো সাধারণ হোটেল বুকিং দেওয়া হয়নি। বরং এটি ছিল ব্যক্তিগত লাক্সারি ‘শ্যলে’। পাহাড়ি ঢালে এর নিঃসঙ্গ অবস্থান। তবে আভিজাত্যের কোনো কমতি নেই!
নাম ‘দ্য ক্রিস্টাল আল্পাইন রিট্রিট’।
শ্যলে-র ভেতরে ঢোকার পর সামাইরার চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম। পুরো ঘরটা পাইন কাঠের তৈরি। এক কোণে ফায়ারপ্লেসে পটপট শব্দে পাইন কাঠ পুড়ছে।
সামাইরার বিস্ময় আরোও তুঙ্গে উঠল, যখন শেহজাদ তাকে বেডরুমের লাগোয়া একটি কাঁচের দেয়ালঘেরা ঘরের দিকে নিয়ে গেল।
এখানে একটি প্রাইভেট থার্মাল পুল রয়েছে। ঘরের ভেতরেই উষ্ণ পানির নীলচে আভা! কাঁচের দেয়ালের ঠিক ওপারেই বরফে ঢাকা পাহাড় আর পাইন বন। কেমন নীরব রহস্যময় স্তব্ধতা সমেত দানবের মত থম মেরে রয়েছে!
বাইরের কনকনে শীতের রাত আর ভেতরের উষ্ণতা। এই অদ্ভুত বৈপরীত্য যেন শেহজাদ এবং সামাইরার সম্পর্কের প্রতিফলন।
শেহজাদ ওভারকোটটা খুলে আলগোছে সোফায় রাখল। সে সামাইরার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। স্বাভাবিক গলায় বলল,
- তোমার ক্লান্ত লাগছে না? ফ্রেশ হয়ে নাও।
সামাইরা জানালার ওপারে অন্ধকারের বুক চিরে জেগে থাকা পাহাড়ের ছায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
-জায়গাটা বড্ড বেশি সুন্দর। ক্লান্ত লাগার প্রশ্নই আসে না।
শেহজাদ মৃদু হাসল। বলল,
-সুইজারল্যান্ড মানুষের মাঝে ক্লান্তি আসতে দেয় না। সে মানুষকে নিজের সৌন্দর্যের মাঝে ডুব দিতে বাধ্য করে।
জানালা ভেদ করে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস সামাইরার গালে আলতোভাবে স্পর্শ করে গেল। মাথার ওপরে হীরের টুকরোর মতো জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য তারকারাজি। এখানে কোনো কৃত্রিম আলোর রাজত্ব নেই। চারিদিকে কেবল বিরাজমান প্রকৃতির শুদ্ধতা।
শেহজাদ সামাইরার পেছনে এসে দাঁড়াল। কিন্তু তাকে স্পর্শ করল না। উদাস ভঙ্গিতে বলল,
- ছোটবেলায় যখন মায়ের সাথে বাবার অশান্তি হতো, মাকে বেধড়ক পেটাতো, আমি কল্পনা করতাম মাকে নিয়ে এমন কোনো বরফের দেশে পালিয়ে আসব!
সামাইরা অবাক হয়ে শেহজাদের দিকে তাকাল। শেহজাদ ওর বিস্মিত দৃষ্টিকে তোয়াক্কা না করে বলল,
- ফ্রেশ হতে যাও। নয়ত এরপর ঠান্ডা লেগে যাবে।
সামাইরা আর কথা বাড়াল না। সে বাথরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে।
সুইজারল্যান্ডের গ্রিন্ডেলওয়াল্ডে রাত যখন গভীর থেকে গভীরতম হয়, তখন চারদিকের নিস্তব্ধতা জেঁকে বসে। এই নিস্তব্ধতা এত প্রগাঢ় হয় যে নিজের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানিও কানে এসে বাজে।
ফ্রেশ হয়ে সামাইরা শোবার ঘরে পা রাখল।
তার পরনে তখনো একটি সাদা বাথরোব। কোমরে ফিতে দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। তার দীর্ঘ ঘন কালো ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। চুল থেকে চুঁইয়ে পড়া পানির কণাগুলো সাদা কার্পেটের ওপর ছোট ছোট বৃত্ত তৈরি করছে। বাষ্পের ওমে ওর গায়ের রঙ আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
শেহজাদ তখন জানালার ধারের সোফায় গা এলিয়ে বসে ছিল। তার হাতে দামী ক্রিস্টাল গ্লাস। বিদেশি মদের ওপর ভাসছে চারটে আইস কিউব। সামাইরাকে ঘরে ঢুকতে দেখে সে গ্লাসটা পাশের টেবিলে রাখল। মুহুর্তেই তার চাউনি বদলে গেল। সে চাউনি গতানুগতিক অবজ্ঞার নয় বরং তাতে মিশে আছে এক দুর্নিবার আদিম আকর্ষণ।
শেহজাদ সোফা ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ সুঠাম দেহ আগুনের আলোয় এক বিমূর্ত ছায়া ফেলল দেয়ালে। সে এক পা, দু পা করে সামাইরার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ নিঃশব্দ শিকারীর পদধ্বনির ন্যায় শোনাল।
এক জোড়া শিকারী চোখ সামাইরার দিকে এগিয়ে আসছে। স্বভাবতই সে ভড়কে গেল। শেহজাদের চোখের গাঢ় মাদকতা আর চোয়ালের কঠোরতা তাকে স্থির হতে দিচ্ছিল না কোনোভাবেই।
কাজেই সামাইরাও এক পা দু পা করে পিছিয়ে যেতে লাগল।
- আপনি… আপনি ওভাবে এগিয়ে আসছেন কেন? দূরে সরুন!
সামাইরার কণ্ঠে মৃদু কম্পন। যদিও এই কম্পন সে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল।
শেহজাদ থামল না। সে এক দৃষ্টিতে সামাইরার ভেজা চুলের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসতে লাগল।
সামাইরা পেছাতে পেছাতে একেবারে বিছানার কাছে পৌঁছাল। সহসা সে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। পা বিছানার কোণায় লেগে টাল সামলাতে পারল না। ধপ করে বিশাল নরম বিছানায় পড়ে গেল।
শেহজাদ এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। সেও সামাইরার ওপর ঝুঁকে পড়ল। সামাইরার ওপর প্রায় অর্ধশোয়া অবস্থায় থেকে তাকে নিজের বাহুবন্দি করে ফেলল। সামাইরার হৃদপিণ্ড তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। তার নিঃশ্বাস আটকে আসছে বারবার। শেহজাদের শরীর থেকে বেরিয়ে আসা দামী পারফিউম আর সিগারেটের তামাকু মিশ্রিত ঘ্রাণ তাকে অসাড় বানিয়ে দিল।
ঠিক সেই চরম উত্তেজনার মুহূর্তে শেহজাদ তার পকেট থেকে ফোনটা বের করল। কল লাগাল রাইসাকে। সামাইরা শেহজাদের এহেন কর্মকান্ডে স্তব্ধ হয়ে গেল।
শেহজাদ সামাইরাকে নিজের দেহের নিচে বন্দি রেখেই ফোনটা স্পিকারে দিল। ওপাশ থেকে রাইসার তিক্ত গলার স্বর শোনা গেল।
- কেন ফোন করেছো? আমাকে মানাতে? আমি এবার এত অল্পতে মানছি না, শেহজাদ!
শেহজাদ রাইসার এসব কথা একদম গায়ে মাখল না। তার দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে ছিল সামাইরার চোখের মণির ওপর। সে খুব ঠান্ডা গলায় রাইসাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-রাইসা, শোনো। তুমি ঠিকই বলেছিলে। আই ফেল ইন লাভ উইথ হার। আমি সামাইরার প্রেমে পড়ে গেছি। আজকের পর থেকে তুমি আমাদের মাঝে আর কোনোদিন আসবে না। ইটস অভার, রাইসা। আজকের পর আমাকে আর কখনও ফোন করবে না।
ওপাশ থেকে রাইসার বুকফাটা আর্তনাদ স্পিকারে স্পষ্ট শোনা গেল। সে পাগলের মতো চিৎকার করতে শুরু করল,
-শেহজাদ! তুমি এটা করতে পারো না! ওই বস্তির মেয়ের জন্য তুমি আমাকে ছাড়ছ? শেহজাদ!
শেহজাদ অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে এক ঝটকায় ফোনটা কেটে দিল। ফোনের স্ক্রিনটা কালো হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ঘরে আবার সেই ভয়াবহ নীরবতা ফিরে এল।
সামাইরার গালে ফায়ারপ্লেসের আলো এক বিচিত্র আলোছায়ার খেলা তৈরি করছে।
সে বিস্ময়ে পাথর হয়ে গিয়েছিল প্রায়! সে বিশ্বাস করতে পারছিল না শেহজাদ সত্যিই রাইসাকে তার ত্যাগ করল। কিন্তু পরক্ষণেই তার ভেতরকার দাপুটে সত্তা জেগে উঠল। সে শেহজাদের চোখের দিকে তীক্ষ্ণভাবে তাকিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
-স্বামীর অধিকার খাটানোর জন্য এত বড় নাটক? রাইসাকে ত্যাগ করার এই করুণ দৃশ্য কি আমাকে ইমপ্রেস করার জন্য সাজিয়েছেন?
একথা শোনা মাত্রই শেহজাদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার চোখের সেই শীতল আভা মুহূর্তেই আগুনের ললিহান শিখার মতো টকটকে লাল হয়ে উঠল। সে সামাইরার দুই হাত শক্ত করে বিছানার সাথে চেপে ধরল।
সামাইরা ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল। কিন্তু শেহজাদ যেন আজ বিন্দুমাত্র দয়া দেখানোর মুডে নেই। সামাইরা দ্রুত তার মুখ অন্যপাশে সরিয়ে নিল, শেহজাদের সেই দগ্ধ করা দৃষ্টি থেকে বাঁচতে।
শেহজাদ তার মুখ সামাইরার গালের খুব কাছে নিয়ে এল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস সামাইরার কানের লতি ছুঁয়ে যাচ্ছে এখন। সে নিজের ঠোঁট সামাইরার নরম গালে সজোরে চেপে ধরে রাগন্বিত স্বরে বলল,
-অধিকার খাটানোর জন্য নাটক করার প্রয়োজন কোথায়, সামাইরা? তুমি আমার জন্য বৈধ। সম্পূর্ণ লিগ্যাল। নিজের বৈধ স্ত্রীর ওপর অধিকার খাটাতে আবার কিসের নাটক করব আমি? আমি চাইলে তোমার এই তথাকথিত সম্মতির তোয়াক্কা না করেই অনেক কিছু করতে পারি। কি পারি না?
সামাইরা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করল। সে শরীর মোচড় দিয়ে শেহজাদের লোহার মতো শক্ত কবজি থেকে নিজের হাত দুটো বের করতে চাইল। কিন্তু শেহজাদের দেহের শক্তির কাছে সে নস্যি। শেহজাদ এবার সামাইরার দুটো হাত এক করে এক হাতে চেপে ধরল মাথার ওপরে। অন্য হাত দিয়ে সে সামাইরার চিবুকটা নিজের দিকে ঘোরাল। তার আঙুলের চাপে সামাইরার গাল দুটো কুঁচকে গেল। শেহজাদের দৃষ্টি এখন সরাসরি সামাইরার কাঁপতে থাকা লালচে ঠোঁটজোড়ার দিকে নিবদ্ধ।
-আমি চাইলে জোর করে অধিকার ফলাতে পারি। কি পারি না? উত্তর দাও!
সামাইরা ব্যথায় আর অপমানে পুনরায় কঁকিয়ে উঠল। তার চোখের কোণে অজান্তেই এক ফোঁটা লোনা জল চিকচিক করতে লাগল। সামাইরার সেই টলটলে এক ফোঁটা জল দেখে শেহজাদের ভেতরের সেই অশান্ত দানবটা থমকে গেল। সে হাতের জোর সামান্য আলগা করল।
শেহজাদ সামাইরার গলার ভাজে নিজের মুখ গুঁজে নিচু স্বরে বলল,
-সামাইরা, আমি সত্যিই আমার আগের সকল আচরণের জন্য অনুতপ্ত। আমি জানি আমি তোমার সাথে অন্যায় করেছি। কিন্তু আমি এখন তোমার সাথে নতুন জীবন শুরু করতে প্রস্তুত। আমাকে একটা সুযোগ দাও সামাইরা। আমি বদলে যেতে চাই। আমাকে ঘৃণা না করে একবার অন্তত বোঝার চেষ্টা করো, প্লিজ?
সামাইরা মোটেও আবেগের স্রোতে গা ভাসাল না। সে চোখমুখ শক্ত করে বলল,
-কখনো না। আপনি আমাকে কোনোদিনও অর্জন করতে পারবেন না। আপনার এই হিপোক্রেসি আমার খুব ভালো জানা আছে।
শেহজাদ এবার মুচকি হাসল। সে সামাইরার সংকুচিত করা গাল ছেড়ে দিল। নিজের হাত সরিয়ে নিল, কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠল না। সে বলল,
- তুমি আমাকে সুযোগ দেবে সামাইরা, আমি জানি। টুডে অর টুমোরো, ইউ হ্যাভ টু! কারণ তুমি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছো যে আমি নাটক করছি না। আমি পুরোপুরি ভাবে তোমাকে চাই। তোমার মন, তোমার শরীর – সবটা আমার চাই।
যাজ্ঞে, এখন গিয়ে চুল শুকিয়ে নাও। তোমাকে এমন আধভেজা অবস্থায় আরেকটুক্ষণ দেখলে নিজেকে সামলে রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে যাবে। আমি তো কোনো ফেরেশতা না, সামাইরা। আমি স্রেফ একজন রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ যার প্রতিটি শিরায় শিরায় এখন শুধুমাত্র তোমার নাম বইছে।
শেহজাদ সামাইরাকে ছেড়ে দিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। জানালার ধারে গিয়ে সিগারেট ধরাল। সামাইরা দ্রুত বিছানা থেকে উঠে পড়ল। তার এলোমেলো বাথরোবটা ঠিক করে নিয়ে সে দ্রুত বড় আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রাগে আর অপমানে ওর চোখজোড়া এখন লাল হয়ে আছে। নরম গাল দুটো শেহজাদের হাতের আঙুলের ছাপে নীলচে হয়ে উঠেছে।
সামাইরার মস্তিস্ক এখন এক তীব্র গোলকধাঁধায় বন্দি। একদিকে শেহজাদের এই পৈশাচিক অধিকারবোধ, অন্যদিকে রাইসার সাথে ব্রেক-আপের সেই অভাবনীয় ঘোষণা।
সামাইরা আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল।
সে আজ এক রহস্যময় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মুখোমুখি। সে জানে না এই যুদ্ধে কার জয় হবে। তবে শেহজাদ রহমানের সামনে সে কোনোদিন আত্মসমর্পণ করবে না। প্রয়োজনে অসমাপ্ত থাকুক এই ঘৃণায় ভরা দাম্পত্য জীবন।
চলবে…
পর্যাপ্ত রেসপন্স পেলে আগামীকাল পরবর্তী পর্ব দিব ❤️
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, তুমি এলে অবেলায়
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৩
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ১
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১০
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৫
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১২
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১১
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৮
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৭