Golpo romantic golpo তুমি এলে অবেলায়

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৯


তুমিএলেঅবেলায় 🍂 (পর্ব – ৯)

আতিয়া_আদিবা

সামাইরা তখনো অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। নরম কম্ফোর্টার গায়ে জড়িয়ে, গুটিসুটি মেরে বিচরণ করছিল স্বপ্নহীন ঘুমের রাজ্যে। শেহজাদের দৃষ্টি সামাইরার দিকে নিবদ্ধ। সারারাত ঘুমোয়নি ও। সোফায় গা এলিয়ে একের পর এক সিগারেট ফুঁকেছে আর ভেবেছে, কীভাবে এই অবাধ্য মেয়েটাকে নিজের বশে আনা যায়।

শেহজাদ তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল সামাইরার শান্ত মুখটার ওপর। ঘুমের ঘোরে সামাইরার ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। অবাধ্য কয়েক গাছি চুল ওর গালের ওপর এসে পড়েছে। শেহজাদ খুব আলগোছে চুলগুলো সরিয়ে দিল। সামান্য ঝুঁকল ওর ওপর।

সামাইরার গায়ের সেই চিরচেনা বুনো রজনীগন্ধার ঘ্রাণ শেহজাদের মস্তিস্ককে অবশ করে দিচ্ছিল। শেহজাদের অভ্যন্তরে এক তীব্র বাসনার জন্ম নিল। তার ইচ্ছে হলো এই মুহূর্তেই সামাইরার নরম ঠোঁটে নিজের ঠোঁটের অধিকার গেঁথে দিতে। একটা চুমু, শুধুমাত্র একটা চুমু কি তাদের মাঝের এই দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারবে?

শেহজাদ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাবার উপক্রম হলো। কিন্তু পরক্ষণেই ওর ভেতরে থাকা সেই নার্সিসিস্টিক ইগো জেগে উঠল।

না, এভাবে নয়। সামাইরা নিজে থেকে আমার কাছে আসবে, আত্মসমর্পণ করবে। এই জেদ ওকে স্থির করে দিল। সে নিজেকে সামলে নিল নিজেকে।

শেহজাদ গম্ভীর গলায় ডাকল,

-সামাইরা! ওঠো।

সামাইরা কোনো সাড়া দিল না। শেহজাদ এবার ওর কাঁধ ধরে সামান্য ঝাঁকুনি দিল। সামাইরা ভ্রুঁ কুঁচকে এবার চোখ মেলল। পিটপিট করে বোঝার চেষ্টা করল হচ্ছেটা কি? ওর চোখের পাতাগুলো এখনো ঘুমের ভারে ভারী হয়ে আছে। সে আধবোজা চোখে দেখল, শেহজাদের সুঠাম শরীর ওর ওপর পাহাড়ের ন্যায় ঝুঁকে আছে। ভয় আর বিস্ময়ে সামাইরা এক ঝটকায় বিছানায় উঠে বসল। গুটিসুটি মেরে চাদরটা বুকের কাছে টেনে ধরল সে। বলল,

-আপনি? এত সকালে কি চাই?
সামাইরার কণ্ঠে ঘুম জড়ানো জড়তা।

শেহজাদ সামাইরাকে আপাদমস্তক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করল। এরপর ফিসফিস করে বলল,

-আই ওয়ান্ট ইউ। অল অফ ইউ।

সামাইরা ভড়লে গেল। নিজেকে বিছানার সাথে একেবারে সিটিয়ে কাঁপা গলায় শুধালো,

-মানে?

শেহজাদ মৃদু হাসল। এরপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের কবজির দামী রোলেক্স ঘড়িটার দিকে তাকাল। পরিষ্কার আয়নার মতো ঝকঝকে ডায়ালে মিষ্টি রোদ্দুরের প্রতিফলন হচ্ছে। সে খুব নির্লিপ্ত গলায় বলল,

-ঠিক আড়াই ঘণ্টা পর আমাদের ফ্লাইট। সময় নষ্ট করার মত সময় আমাদের হাতে নেই। কাজেই ঘুম থেকে উঠে জলদি তৈরি হয়ে নাও।

সামাইরার মস্তিস্ক এখনো পুরোপুরি সজাগ হয়নি। সে অবাক হয়ে বলল,

-কিসের ফ্লাইট?

শেহজাদ হেসে বলল,

-আমরা হানিমুনে যাচ্ছি সামাইরা।

সামাইরা চোখ পাকিয়ে তাকাল এবার। থমথমে গলায় বলল,

-আপনাকে আমি বলি নি? আমি কোনো হানিমুন ফানিমুনে যাব না? আমি কোথাও যাচ্ছি না। আপনার যেতে হলে আপনি যান।

শেহজাদ জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিল। আজ তেমন একটা কুয়াশা নেই। আকাশটাও ভীষণ পরিষ্কার। বহুদিন পর পাখির কলরবে মুখরিত চারিপাশ। শেহজাদ পেছনে না ফিরেই বলল,

-আমি বলেছি রেডি হতে, তার মানে তুমি রেডি হচ্ছো। শুধু শুধু সময় নষ্ট করো না।

সামাইরার জিদটা এবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে বিছানা ছেড়ে নামল না, বরং পা দুটো গুটিয়ে বসে রইল। চোয়াল শক্ত করে বলল,

-আমি যাব না মানে যাব না! আপনি আমাকে জোর করতে পারেন না। আমি আপনার কেনা দাসী নই যে আপনি যখন যা আদেশ করবেন তখন তাই আমাকে মান্য করতে হবে!

শেহজাদ এবার ঘুরে দাঁড়াল। সে ধীর পায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে এল। ওর পায়ের প্রতিটা পদক্ষেপে ঝরে পড়ছে আভিজাত্য। সে সামাইরার খুব কাছে চলে এলো। নিচু স্বরে রূঢ় গলায় বলল,

-আমাকে বাধ্য করো না সামাইরা। আমাকে বাধ্য করো না এমন কিছু করতে যা তোমার একদম ভালো লাগবে না। তোমাকে কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হয় তা আমার জানা আছে।

সামাইরা এক ছুটে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল।আকাশছোঁয়া তেজ নিয়ে বলল,

-কী করবেন আপনি? শুনিই না! আর কী করা বাকি রেখেছেন আপনি? বিয়ের রাত থেকে অপমান করেছেন, অবহেলা করেছেন, নিজের প্রেমিকার সাথে সময় কাটিয়েছেন! এর চেয়ে বেশি আর কী করবেন? আমাকে মেরে ফেলবেন? মেরে ফেলুন!

শেহজাদ কোনো রাগ দেখাল না। ও কেবল এক মুহূর্ত শান্ত চোখে সামাইরার উত্তেজিত মুখটা দেখল। তারপর খুব সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল,

-শেষ বারের মত প্রশ্ন করছি, তুমি কি রেডি হতে যাবে কি না?

-যাব না! বলেছি তো যাব না! কথা কানে যায় না? বয়রা নাকি?
সামাইরা প্রায় চিৎকার করে উঠল।

শেহজাদ এবার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। চলচিত্রের হিরোদের মত ভীষণ স্টাইলবদ্ধভাবে সিগারেট মুখে পুরল। এরপর ধোঁয়া ছেড়ে এক সেকেন্ডও সময় নিল না। কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই ও দুই হাতে সামাইরার কোমর জড়িয়ে ধরল। এক হেঁচকা টানে ওকে নিজের কাঁধে তুলে নিল।

ঘটনার আকস্মিকতায় সামাইরা আকাশ থেকে পড়ল। ও ভাবতে পারেনি শেহজাদ এতবড় একটা কাজ করতে পারে। যদিও ঘরে কেউ নেই।

সামাইরার মাথাটা নিচের দিকে ঝুলছে, আর শেহজাদ ওকে কাঁধে নিয়ে গটগট করে ড্রেসিং রুমের দিকে হাঁটছে।

-নামান আমাকে! ছাড়ুন বলছি! আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? লজ্জাও করে না আপনার?

সামাইরা শেহজাদের পিঠে কিল-ঘুষি মারতে শুরু করল। পা ছুড়ে চিৎকার করতে চাইল।
ঠিক তখনই শেহজাদ থেমে গেল। ও সামাইরাকে কাধ থেকে নামাল না। বরং ওর শরীরের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করল। শেহজাদ খুব শান্ত গলায় বলল,

-ডোন্ট মেইক মি ম্যাড, সামাইরা! আরেকবার চিৎকার করলে আমি কিন্তু এই মুহূর্তেই তোমাকে কিস করে বসব। মনে রেখো, আমার ধৈর্যের বাঁধ অনেক ছোট।

এমন কথা শুনে সামাইরার দেহ নিথর হয়ে গেল। ওর চিৎকারের শব্দ গলা অব্দি এসে দলা পাকিয়ে গেল। শেহজাদের কণ্ঠস্বরের তীব্রতা ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে লোকটা যা বলছে তা অনায়াসেই করতে পারে। সামাইরার গাল লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। শেহজাদ রহমানের স্পর্শ ওর কাছে বিষাক্ত সাপের ছোবলের ন্যায় মনে হয়। এই ছোবল এড়াতে হবে। সামাইরা বুক ভরে শ্বাস নিল। এরপর বলল,

-ওকে… ওকে ছাড়ুন আমাকে। আমি রেডি হতে যাচ্ছি।

শেহজাদ সামাইরাকে নামিয়ে দিল বটে তবে ছেড়ে দিল না। ওর কোমড় ধরে নিজের কাছে টেনে নিয়ে নাকের সাথে নাক ঘষে ফিসফিস করে বলল,

-গুড গার্ল। সবসময় এরকম গুড গার্ল হয়ে আমার কথা শুনতে পারো না?

সামাইরা অন্যদিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে বলে বলল,
আপনি একটা অসভ্য মানুষ!

শেহজাদ নির্বিকারভাবে উত্তর দিল,

-বউয়ের সামনে সভ্য হয়ে লাভ কি? বরং অসভ্যতাকেই প্রায়োরিটি দিতে হবে এখন থেকে।

সামাইরা নিজেকে ঝ্যাংটা মেরে ছাড়িয়ে নিল। শেহজার মৃদু হেসে ওয়াশরুমের দরজার দিকে ইশারা করল। সামাইরা এক প্রকার বাধ্য হয়ে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। ধড়াম করে দরজা বন্ধ করার শব্দে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল।

শেহজাদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করল। ওর ঠোঁটে লেগে আছে বিজয়ের হাসি।

আধ ঘণ্টা পর সামাইরা বের হয়ে এল। বাড়ির কর্মচারীরা আগেই সুটকেসগুলো গুছিয়ে নিচে রেখে দিয়েছে। শেহজাদ সামাইরাকে নিয়ে নিচে নেমে এলো।

লিভিং রুমে সুফিয়া রহমান অপেক্ষা করছিলেন। ওনার সামনে গরম চায়ের কাপ। শেহজাদ আর সামাইরাকে একসাথে নিচে নামতে দেখে ওনার মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি উঠে দাঁড়ালেন।

-বের হচ্ছিস তোরা? যাক, আমার কথা যে তোরা মান্য করেছিস এতেই আমি খুশি।

সুফিয়া রহমান এগিয়ে গেলেন সামাইরার নিকট। ওর মাথায় হাত রাখলেন। সামাইরাও ওনার বুকে মাথা রাখল। ওর খুব ইচ্ছে করছিল ডুকরে কেঁদে বলতে,

-মা, আমি হানিমুনে যেতে চাই না!

কিন্তু শাশুড়ীর হাসিমুখ দেখে সে নিজেকে সংবরণ করল।

সুফিয়া বললেন,
-মা রে, ভালোমতো ঘুরে আয়। শেহজাদ তো বড্ড কাজের পাগল, ওকে একটু আগলে রাখিস।

এরপর তিনি ছেলের দিকে ফিরে বললেন,
-আর শেহজাদ, মনে রাখিস সামাইরা এখন তোর সবচেয়ে বড় আমানত। ওর যত্নে যেন কোনো ত্রুটি না হয়।
সুফিয়া বেগমের গলায় মাতৃত্বের স্নেহ।

শেহজাদ এবং সামাইরা খুব ভদ্রভাবে ওনার পায়ে হাত ঠেকিয়ে দোয়া নিল। শেহজাদ আশ্বাস দিয়ে বলল,

  • চিন্তা করো না মা। আমি সবকিছু ঠিকঠাক সামলে নেব। তুমি নিজের যত্ন নিও।

★★★

এয়ারপোর্টের দিকে যখন মার্সিডিজটা ছুটছে, সামাইরা তখনো ওর স্বভাবমত জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। মনে মনে ভাবছিল, এই যাত্রা ওকে কোথায় নিয়ে যাবে? পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম স্থানটি কি ওর মনের মলিনতা দূর করতে পারবে? নাকি শেহজাদের এই দম্ভের নিচেই ওর বাকি জীবনটা তিলে তিলে শেষ হয়ে যাবে? চোখজোড়া মনের অজান্তেই ভিজে উঠল সামাইরার।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে যখন সামাইরা পা রাখল,
তার মনে হলো সে কোনো এক ভিনগ্রহে ঢুকে পড়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চতুর্দিক। মেঝেতে বিছানো দামী কার্পেট আর চারপাশের মানুষের কেতাদুরস্ত চলাফেরা। সবকিছুই তার চেনা পরিচিত মধ্যবিত্ত জগতের গন্ডির বাইরে। সম্পূর্ণ বিপরীত। এই আভিজাত্যের মাঝে নিজেকে বড্ড বেমানান মনে হচ্ছে তার।

শেহজাদ গট গট করে হাঁটছে। ওর দীর্ঘ সুঠাম দেহ, পরনে কালো রঙের দামী ওভারকোট আর চোখে রোদচশমা। এয়ারপোর্টের প্রতিটি কর্মী ওকে চেনে। সবাই মাথা নিচু করে অভিবাদন জানাচ্ছে,

-গুড মর্নিং, মিস্টার রহমান।

শেহজাদ স্রেফ মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছে।

বিমানের দরজায় যখন ওরা পৌঁছাল, সামাইরার বুকটা তখন দুরুদুরু কাঁপতে শুরু করল। জীবনে প্রথমবার সে বিমানে উঠতে চলেছে।

ছোটবেলায় জানালার ভাঙ্গা গ্রিল ধরে কত দেখেছে, আকাশের বুকে রুপোলি রেখা টেনে উড়োজাহাজের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া। চোখের আড়াল হতেই বুকটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগত তার। মন খারাপ হয়ে যেত পরক্ষনেই। আজ সে নিজেই সেই রুপোলি ডানায় চড়তে চলেছে!

বিজনেস ক্লাসের কেবিনে ঢোকার পর সামাইরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ক্ষণিককাল। বিশাল চওড়া লেদার সিট, সামনে বড় স্ক্রিন, আর প্রতিটি যাত্রীর জন্য আলাদা ছোট একটি জগত বরাদ্দ!

সামাইরা জানালার ধারের সিটটায় বসল। চোখ রাখল রানওয়ের ওপর। শেহজাদ ওর পাশের সিটে আরাম করে বসল। সে সামাইরার চেহারার বিস্ময়টুকু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। সামাইরা যখন অবাক হয়ে প্রতিটি বোতাম আর স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছিল, শেহজাদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। ওর নার্সিসিস্টিক ইগো আজ দারুণভাবে তৃপ্ত। ও মনে মনে ভাবল,

-দেখো সামাইরা, দেখো! এই আকাশ ছোঁয়ার সুযোগ তোমাকে কে দিয়েছে? আমি দিয়েছি। শেহজাদ রহমান দিয়েছে। আমার টাকার জোরেই তুমি আজ এই বিলাসিতার স্বাদ পাচ্ছো। তোমার সেই টাইটানিকের আদর্শবাদী জ্যাক কি তোমাকে এভাবে মেঘের ওপর ওড়াতে পারত? কোনোদিন পারত না।

বিমানের ইঞ্জিন যখন সশব্দে গর্জে উঠল, সামাইরা সিটের হাতলটা শক্ত করে ধরল। ওর হাতের তালু ঘামতে লাগল। প্লেইনটা যখন রানওয়েতে চলতে শুরু করল, শেহজাদ আড়চোখে একবার সামাইরাকে দেখল। সামাইরা জানালার বাইরে তাকিয়ে নিজেকে সংযত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু ওর থরথর করে কাঁপা ঠোঁট বলে দিচ্ছে ও ভয়ে অস্থির।

-আর ইউ ওকে সামাইরা? ভয় লাগছে?

সহসা শেহজাদের গলায় এক ধরণের সহানুভূতির আভাস।

সামাইরা শক্ত হয়ে বসল। সে চায় না এই মানুষটার সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে। সে দাঁতে দাঁত চিপে বলল,

-আমি ঠিক আছি। ভয় পাবো কেন?

ঠিক তখনই প্লেইনটা টেক-অফের জন্য চূড়ান্ত গতি নিল। ইঞ্জিনের প্রচণ্ড গর্জন আর অভিকর্ষজ বলের চাপে সামাইরার মনে হলো ওর হৃদপিণ্ডটা বোধহয় গলার কাছে চলে এসেছে! প্লেইনটা যখন মাটি ছেড়ে শূন্যে ডানা মেলল, সামাইরার শরীর ভয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। ওর নিঃশ্বাস আটকে আসছে। ও অবচেতন মনেই যেন সিটের হাতল ছেড়ে পাশের কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে চাইল।

শেহজাদ ওর বাম হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ওর আঙুলগুলো সামাইরার ঘর্মাক্ত হাতের তালুর ওপর জেঁকে বসল। সামাইরা চমকে উঠে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চাইল।

-হাত ছাড়ুন! কী করছেন আপনি?
সামাইরা ফিসফিস করে ধমকে উঠল।

শেহজাদ ওর হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। ওর চোখের দৃষ্টি ভীষণ তীক্ষ্ণ। সে গম্ভীর স্বরে বলল,

-এসব ড্রামা বাদ দিয়ে শান্ত হয়ে বসো। আমি তোমায় স্পর্শ করলে এমন তিড়িং বিড়িং করো কেন? আমি কি আননোন কেউ?

সামাইরা তবুও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল। ঠিক তখনই বিমানটি মেঘের স্তরের ভেতর দিয়ে যেতে শুরু করায় প্রচণ্ড টার্বুলেন্স শুরু হলো। এবার আর সামাইরা নিজের জেদ দেখালো না। চুপচাপ হাত ধরে বসে রইল।

মিনিট দশেক পর টার্বুলেন্স কমল। সামাইরা যেন এই মুহুর্তের প্রতীক্ষায় মগ্ন ছিল। সে চট করে হাতটা সরিয়ে নিল এবং জানালার দিকে মুখ ফেরাল।

জানালার বাইরে তাকাতেই সামাইরার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। নিচে সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘের সমুদ্র। ওপরের আকাশটা গাঢ় নীল! যেন ওরা মেঘের সমুদ্রের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে!
সামাইরা ওর সব দুঃখ, রাগ আর ঘৃণা এক মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল। মধ্যবিত্ত জীবনের গণ্ডিবদ্ধ চিন্তা থেকে সে যেন এক বিশাল মহাজাগতিক ক্যানভাসে ঢুকে পড়েছে। সামাইরা ভাবতে লাগল, ওপর থেকে দেখলে পৃথিবীটাকে কত শান্ত বলে মনে হয়! অথচ মাটিতে পা ফেললেই কত বিভেদ, ঘৃণা, দুঃখ, কষ্ট!

এসব ভাবতে ভাবতেই অন্যমনস্ক সামাইরা কখন যেন ঘুমিয়ে গেলো!

★★★★★

দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের টার্মিনাল-৩ এ যখন ওরা পা রাখল, সামাইরা চারিপাশে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য যেন থমকে গেল।
দুপাশের সোনার দোকানগুলো থেকে ঝিকিমিকি আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আকাশচুম্বী কৃত্রিম পাম গাছ আর সারিবদ্ধ ডিউটি-ফ্রি শপ।

মধ্যবিত্ত জীবনের সাধারণ কেনাকাটার অভিজ্ঞতায় অভ্যস্ত সামাইরা। সে বুঝতে পারছিল না এখানে মানুষ কেনাকাটা করে নাকি প্রদর্শনী দেখে!

অপরদিকে শেহজাদ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটছে। ওর জন্য এই পরিবেশ বোধহয় ডাল-ভাতের মতো। তবে সে জানে সামাইরা ঘোরের মধ্যে আছে।
আর সামাইরার এই ঘোরটাই শেহজাদের ভালোলাগছে।

সে রোদচশমার ফাঁক দিয়ে আড়চোখে সামাইরাকে দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে।

-মুখটা বন্ধ করো সামাইরা। মাছি ঢুকবে।

শেহজাদের গলার স্বরে এক চিলতে শ্লেষ।

একথা শুনে সামাইরা সম্বিত ফিরে পেল। ও নিজের বিস্ময়টুকু আড়াল করার চেষ্টা করে বলল,

-আমি শুধু দেখছিলাম মানুষ কত অপচয় করতে পারে।

-একে অপচয় বলে না, আভিজাত্য বলে। আর এই আভিজাত্য ভোগ করার ভাগ্য সবার থাকে না।

সামাইরা একথার কোনো উত্তর দিল না। ক্ষণিককাল হাঁটার পর ওরা একটা কফি শপে গিয়ে বসল। চারদিকে বিভিন্ন দেশের মানুষের আনাগোনা।

শেহজাদ দুটো ব্ল্যাক কফি অর্ডার করল। সামাইরা কফির কাপে চুমুক দিয়ে জানালার ওপারে রানওয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

শেহজাদের মন অবশ্য কফিতে নেই। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে এক দৃষ্টিতে সামাইরার পানে তাকিয়ে রইল। সামাইরা অস্বস্তি অনুভব করতে লাগল। এই অস্বস্তি এড়াতে সে বারবার কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে, জানালা দিয়ে বাইরের বিমান দেখছে, ওড়না ঠিক করছে। তবুও শেহজাদের দৃষ্টি সরছে না।

এক সময় সামাইরা আর চুপ করে বসে থাকতে পারল না। বিরক্ত হয়ে বলল,

-এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? কোনো সমস্যা?

শেহজাদ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে রাখল। সে আগের মতোই একভাবে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় প্রশ্ন করল,

-তুমি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারছো না কেন সামাইরা? বারবার চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছো যে?

সামাইরা চোখমুখ শক্ত করে বলল,

-কোথায়? আমি তো স্বাভাবিকই আছি!

শেহজাদ এবার টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে সামাইরার দিকে ঝুঁকল। চোখের মণি দুটো স্থির করে খুব ধীর লয়ে বলল,

-মানুষ সাধারণত দুটি সময় অন্য কারো চোখের দিকে তাকাতে পারে না, সামাইরা। এক, যখন সে কাউকে তীব্র ঘৃণা করে আর তাকে দেখতে চায় না। আর দুই, যখন সে কারোর প্রেমে পড়ে কিন্তু মানতে চায় না।
ঘৃণা তোমার সাথে যাচ্ছে না। তার চেয়েও তীব্র কোনো অনুভূতি আমি তোমার চোখের কোণে দেখতে পাচ্ছি। তাহলে কি দ্বিতীয় কারণটাই সত্যি?

সামাইরা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। শেহজাদের এই মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ সে আশা করেনি। তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে শব্দ করে হেসে উঠল।

-আপনার আত্মবিশ্বাস দেখে আমি অবাক হচ্ছি, মিস্টার রহমান! প্রেমে পড়তে ক্ষতি নেই। কিন্তু আপনার প্রেমে পড়ব আমি? কখনো না। আমি আপনাকে প্রতি মুহূর্তে ঘৃণা করি।

শেহজাদ চোখের পলক ফেলল না। তার দৃষ্টি আরও গাঢ় হলো। সে গম্ভীরমুখে বলল,

-মিথ্যে বলছো সামাইরা। তুমি আসলে আমাকে ঘৃণা করার নাটক করছ। নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে আড়াল করছো।

সামাইরা কফির শেষ চুমুকটা দিয়ে অবজ্ঞার সাথে বলল,

-যত্তসব আজগুবি ফিলোসফি! এসব কথা আপনার প্রেমিকার ওপর ট্রাই করবেন, প্লিজ। আমার মগজ চিবিয়ে খাবেন না দয়া করে।

সামাইরা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু সে অনুভব করতে পারল, শেহজাদ এখনো একইভাবে তাকিয়ে আছে।

ট্রানজিটের সময় শেষ হয়ে এলো। পরবর্তী ফ্লাইটের ঘোষণা হতেই শেহজাদ উঠে দাঁড়াল। সে সামাইরার জন্য অপেক্ষা করল না। একাই হাঁটতে শুরু করল।

গল্প নিয়ে আপনার মতামত জানাবেন❤️

(চলবে…)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply