ডিজায়ার_আনলিশড
✍️ সাবিলা সাবি
পর্ব-৪১ (প্রথমাংশ)
মেক্সিকোর ভিলা এস্পেরেন্জার বিশাল হলরুম আজ উন্মুক্ত। চারদিকে ঝাড়বাতির রোশনাই আর মেক্সিকোর নামী-দামী অভিজাত অতিথিদের পদচারণায় ভিলা এস্পেরেন্জা এক অভিজাত রূপ ধারণ করেছে। ডেকোরেশনে ল্যাভেন্ডার আর সাদা গোলাপের সমারোহ, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে হালকা মিউজিক। মার্কো রেয়েস চৌধুরীর আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার ‘গ্লোবাল লিটারারি অ্যাওয়ার্ড’ প্রাপ্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই গ্র্যান্ড পার্টিতে উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু এই জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবের উজ্জ্বল আলোর নিচে এক গাঢ় অন্ধকার বিঁধে আছে।
সকাল থেকেই মেক্সিকোর প্রতিটি নিউজ চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে স্ক্রল হচ্ছে এক চাঞ্চল্যকর খবর: “মেক্সিকোর প্রতাপশালী বিজনেস টাইকুন সায়েম চৌধুরীর ছোট ভাই সাইফ চৌধুরীর একমাত্র কন্যা লুসিয়া চৌধুরী সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত।” নিউজ পোর্টালগুলোতে বড় বড় করে লেখা হয়েছে যে, গতরাতে অতিরিক্ত মদ্যপান করে ক্লাব থেকে বেরিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে এক বিশাল ওক গাছের সাথে ধাক্কা খেয়েছেন এই তরুণী।
ভিলা এস্পেরেন্জার অন্দরমহলে এক থমথমে অস্বস্তি। সায়েম চৌধুরী অর্থাৎ জাভিয়ানের বাবা গম্ভীর মুখে সোফায় বসে আছেন। বাড়ির সম্মান এখন তলানিতে, চারদিকে কানাঘুষা চলছে—কিন্তু আভিজাত্যের খাতিরে পার্টির আয়োজন বাতিল করা সম্ভব হয়নি। আমন্ত্রিত অতিথিরা আসছেন, কেউ কেউ শোক প্রকাশ করছেন আবার কেউ বাঁকা চোখে তাকিয়ে লুসিয়ার চরিত্র নিয়ে কথা বলছেন।
সাইফ চৌধুরী শুধু একবার বিরক্তিভরা গলায় বললেন, “বংশের মুখটা ওই উরনচণ্ডী মেয়েটা পুড়িয়ে ছাড়ল। আজ সারা মেক্সিকো জানছে চৌধুরী বাড়ির মেয়ে মদ্যপ অবস্থায় অ্যাক্সিডেন্ট করেছে।”
হাসপাতালে লুসিয়া তখনো আইসিইউ-তে অচেতন। সকালে সায়েম চৌধুরী, সাইফ চৌধুরীসহ বাড়ির প্রায় সবাই একবার করে হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে এসেছেন। তবে বাড়িতে পার্টির আয়োজন সামাল দিতে আর মেহমানদের সামনে সম্মান বজায় রাখতে একে একে সবাই ভিলায় ফিরে এসেছেন। জাভিয়ান আর তান্বী দীর্ঘক্ষণ হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষা করছিল। লুসিয়ার কপালে ব্যান্ডেজ আর নাকে অক্সিজেন মাস্ক দেখে তান্বীর চোখের জল বাঁধ মানছিল না। জাভিয়ান পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, ওর চোখের মণি দুটো তখন আগুনের মতো লাল।
অবশেষে পরিবারের চাপে আর পার্টির তদারকি করতে জাভিয়ান ও তান্বীও বিকেলের দিকে ভিলা এস্পেরেন্জায় ফিরে আসতে বাধ্য হলো। জাভিয়ান যাওয়ার সময় নার্সদের কড়া নির্দেশ দিয়ে এসেছে যেন লুসিয়ার কেবিনের আশেপাশে কেউ না ঘেঁষে।
কিন্তু জাভিয়ান আর তান্বী হাসপাতাল ত্যাগ করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাসপাতালের পার্কিংয়ে একটা কালো রঙের এসইউভি এসে থামল। নিউজ দেখেই এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল দুর্ধর্ষ মেইলস্ট্রোম। সে জানত, এই মুহূর্তে লুসিয়া একদম একা এবং অরক্ষিত।
মেইলস্ট্রোম তার হ্যাটটা একটু নিচু করে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হেঁটে এল। ওর ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক হাসি। জাভিয়ানের অনুপস্থিতিটাই ছিল ওর মূল লক্ষ্য।
মেক্সিকোর সিটি সেন্ট্রাল হাসপাতালের সেই নিস্তব্ধ আইসিইউ কেবিন। বিকেলের নিস্তেজ আলো জানলার পর্দা ভেদ করে ভেতরে এসে পড়েছে। মনিটরের একঘেয়ে ‘বিপ বিপ’ শব্দের মাঝে হঠাৎ লুসিয়ার আঙুলগুলো সামান্য কেঁপে উঠল। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার অন্ধকার কাটিয়ে সে যখন চোখ মেলল, ওর ঝাপসা দৃষ্টির সামনে সাদা সিলিং আর ওষুধের কটু গন্ধ ভেসে এল।
লুসিয়া যন্ত্রণায় কপাল কুঁচকে পাশে তাকাতেই দেখল—বেডের পাশের চেয়ারে কেউ একজন বসে আছে। আবছা অবয়বটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতেই লুসিয়া শিউরে উঠল। সামনে বসে আছে স্বয়ং মেইলস্ট্রোম। ওর সেই চিরচেনা রহস্যময় আর শীতল চাউনি লুসিয়ার দিকে স্থির।
“জেগে উঠলে তবে? চৌধুরী বাড়ির রাজকন্যা তো দেখছি সবাইকেই ভয় পাইয়ে দিয়েছিলো,” মেইলস্ট্রোম খুব নিচু আর গম্ভীর স্বরে বলল।
লুসিয়া অক্সিজেন মাস্কের নিচ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল, “আপনি… আপনি এখানে কেন?”
ঔমেইলস্ট্রোম একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে ওর দিকে ঝুঁকে এল। “নিউজ দেখলাম তুমি নাকি মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি নিয়ে মরতে বসেছিলে। কী এমন হলো লুসিয়া?”
লুসিয়া যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। ওর মস্তিষ্কের কোণায় তখন ফারহানের সেই কাল্পনিক অবয়ব আর অ্যাকসিডেন্টর স্মৃতিগুলো আছড়ে পড়ছে। সে খুব ধীর আর ভাঙা গলায় বলল, “সবই ফারহানের জন্য… আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। আমি ওর কাছে যেতে চেয়েছিলাম… কিন্তু ভাগ্য আমাকে এখানে এনে দাঁড় করাল।”
ফারহানের নামটা শোনামাত্রই মেইলস্ট্রোমের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। ওর চোখের মণি দুটো রাগে জ্বলে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সে লুসিয়ার গলার অক্সিজেন টিউবটা ছিঁড়ে ফেলবে। কিন্তু মেইলস্ট্রোম নিজেকে সংবরণ করল। সে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিয়ে গলার স্বর স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল— “নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোটা তোমার সাজে না লুসিয়া। যা-ই হোক, বাইরে এক বিশেষ মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। তোমার অ্যাক্সিডেন্টের খবর শুনে ‘মম’ তোমাকে দেখতে এসেছেন। আমি কি তাকে ভেতরে আসতে বলব?”
‘মম’ শব্দটা শোনামাত্রই লুসিয়ার রক্তহীন ফ্যাকাশে মুখটা মুহূর্তেই ঘৃণা আর ক্রোধে কঠিন হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় অক্সিজেন মাস্কটা হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়েও চিৎকার করে বলে উঠল—
“নো ওয়ে! আমি ওই মহিলার মুখ দেখতে চাই না। খবরদার, তাকে আমার কেবিনের আশেপাশেও আসতে দেবেন না। সে আমার আর মার্কো ভাইয়ার জন্য অনেক আগেই মরে গেছে। সে শুধু আপনার মা… আমাদের কেউ না!”
মেইলস্ট্রোম কিছু বলতে চাইল, কিন্তু লুসিয়া ওকে থামিয়ে দিয়ে হাহাকার ভরা গলায় বলতে লাগল— “আমি আপনাকে মনে-প্রাণে আমার বড় ভাই ভাবলেও, তাকে কোনোদিন মা বলে ডাকতে পারব না। দরকার নেই আমার কাছে তার মায়া দেখানোর। এই পৃথিবীতে তার একটাই সন্তান, আর সেটা হলেন আপনি। আমি আর আমার ভাই মার্কো—আমরা তার কেউ নই। আমরা অনাথ হয়ে থেকেছি, অনাথ হয়েই মরব। তাকে বাইরে থেকেই চলে যেতে বলুন!”
লুসিয়ার উত্তেজিত কথাগুলোর মাঝে মনিটরের হৃদস্পন্দনের হার হু হু করে বাড়তে লাগল। মেইলস্ট্রোম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে জানত যে লুসিয়ার ভেতরে এই অভিমানের আগুন কতটা গভীর। ওদিকে হাসপাতালের দরজার ওপারে এক মাঝবয়সী নারী চোখের জল মুছে দাঁড়িয়ে আছেন, যিনি একসময় এদের সবাইকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন—আর আজ এক নিষিদ্ধ মা হয়ে ফিরে এসেছেন নিজের সন্তানকে দেখার আশায়।
মেইলস্ট্রোম আইসিইউ-এর ভারী দরজাটা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখল করিডোরের এক কোণে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ইসাবেলা। দীর্ঘ কয়েক বছরের ব্যবধান আর বিচ্ছেদের ছাপ তাঁর চেহারায় স্পষ্ট। মেইলস্ট্রোমকে দেখে তিনি এগিয়ে এলেন, কিন্তু তাঁর চোখেমুখে কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু এক বিষণ্ণ প্রশান্তি।
মেইলস্ট্রোম কিছু বলার আগেই ইসাবেলা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে তুললেন। তিনি খুব ধীর আর শান্ত গলায় বললেন— “লুসিয়া ভেতরে ঢুকতে মানা করেছে, তাই না? ওর এই অভিমানটা খুব স্বাভাবিক। দীর্ঘ বছর ধরে ওকে আর মার্কোকে শুধু দূর থেকেই দেখে এসেছি, আদর করার বদলে আড়াল থেকে লক্ষ্য রাখাই ছিল আমার নিয়তি। বাকি জীবনটাও না হয় এভাবেই দূর থেকে দেখে কাটিয়ে দেব, তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই।”
ইসাবেলার কণ্ঠে কোনো ক্ষোভ নেই, তিনি নিজের ভাগ্যের সাথে আপস করে নিয়েছেন বহু আগেই। তিনি চশমার আড়াল থেকে চোখের জলটুকু মুছে নিলেন। মেইলস্ট্রোম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে জানত তার মা একসময় যে পরিস্থিতির শিকার হয়ে এদের ছেড়েছিলেন, তার মাসুল আজও তাঁকে প্রতি মুহূর্তে দিতে হচ্ছে।
ইসাবেলা আবার বলতে শুরু করলেন, “মার্কোর আজ কত বড় একটা দিন, অথচ আমি সেখানে যেতে পারব না। ওর ওই কাঁচের ট্রফিটার চেয়ে ওর মায়ের একটা আলিঙ্গন হয়তো অনেক দামী ছিল, কিন্তু আমি সেই অধিকারটুকুও হারিয়েছি। লুসিয়াকে বলো, ও যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। আমার ছায়া ওকে আর বিরক্ত করবে না।”
মেইলস্ট্রোম এবার গম্ভীর গলায় উত্তর দিল— “লুসিয়া এখন অনেক বেশি উত্তেজিত। ওর কন্ডিশন এখনো স্টেবল না। তুমি বরং এখন চলে যাও। বাড়ির ওই পার্টিতে মার্কো হয়তো তোমাকে খুঁজবে না, কিন্তু তোমার উপস্থিতি ওখানে একটা প্রলয় ঘটিয়ে দিতে পারে। তুমি জানো সাইফ চৌধুরী তোমাকে দেখলে কী করতে পারে!”
ইসাবেলা মাথা উঁচু করে করিডোর দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে এক বুক হাহাকারের ভার নিয়ে এগোচ্ছে। হাসপাতালের সাদা দেয়ালগুলো সাক্ষী হয়ে থাকল এক অভিশপ্ত মাতৃত্বের, যেখানে জন্মদাত্রী মা হয়েও নিজের সন্তানের শিয়রে বসার অনুমতিটুকু তাঁর মেলেনি।
এদিকে মেইলস্ট্রোম দাঁড়িয়ে দেখল তার মা লিফটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ওদিকে ভিলা এস্পেরেন্জায় আলোকসজ্জা আর মদের ফোয়ারা হয়তো মার্কোর সাফল্যকে উদযাপন করছে, কিন্তু হাসপাতালের এই নিস্তব্ধতায় আজ এক মা তার সন্তানদের থেকে চিরতরে বিযুক্ত হওয়ার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন।ও
.
.
.
ভিলা এস্পেরেন্জার প্রতিটি কোণ এখন আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে। বিশালাকার ঝাড়বাতিগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অভিজাত অতিথিদের হাতে দামী মদের গ্লাস, চারদিকে উচ্চস্বরে হাসাহাসি আর মিউজিকের মূর্ছনা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এটি বিশ্বের সুখীতম কোনো এক রাজপ্রাসাদ। মার্কো রেয়েস চৌধুরীর আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই গ্র্যান্ড পার্টিতে উপচে পড়া ভিড়। সায়েম চৌধুরী আর সাইফ চৌধুরী অতিথিদের সাথে খোশগল্পে মেতে আছেন, যেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু এই কৃত্রিম হাসির আড়ালে তান্বী এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। ওর পরনের সেই দামী কাঞ্জিভরম শাড়িটা এখন ওর কাছে লোহার বর্মের মতো ভারী মনে হচ্ছে। সবার মুখে হাসি থাকলেও তান্বীর মনটা পড়ে আছে সেই সাদা ধবধবে হাসপাতালের আইসিইউ বেডে, যেখানে লুসিয়া যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
তান্বী ড্রিঙ্কসের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে থাকা আভিজাত্যবান মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে একরাশ ঘৃণা অনুভব করল। সে বিড়বিড় করে নিজেকেই বলল— “বড়লোকেরা বোধহয় সত্যিই এমনই হয়! তাদের বাড়ির মেয়েটা হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, অথচ এরা এখানে মদের ফোয়ারা ছুটিয়ে পার্টি করছে! সবার চোখেমুখে কী অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা!”
তান্বীর চোখে জল চলে এল। সে তার নিজের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা ভাবল। তার যদি সামান্য সর্দি-জ্বরও হতো, তবে তার মা-বাবা দুশ্চিন্তায় সারা রাত জেগে থাকতেন। আর এখানে লুচি আপুর কপালে ব্যান্ডেজ, নাকে অক্সিজেন মাস্ক—অথচ তার আপন চাচা-বাবারা এখানে আভিজাত্যের মুখোশ পরে দিব্যি হাসাহাসি করছেন। সম্মানের দোহাই দিয়ে একটা জীবনকে এভাবে একা ফেলে রাখা যায়, সেটা তান্বীর কল্পনারও বাইরে ছিল।
সে দেখল জাভিয়ানও একপাশে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে এক ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলছে। যদিও জাভিয়ানের চোখেমুখে একটা অস্থিরতা ছিল, কিন্তু সেও এই প্রোটোকলের বাইরে যেতে পারছে না। তান্বী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল— “এই রাজপ্রাসাদের দেয়ালগুলো যতটা সুন্দর, তার চেয়েও বেশি পাথরের মতো শক্ত আর শীতল। এখানে মানুষের আবেগের চেয়ে আভিজাত্যের দাম অনেক বেশি।”
পার্টির ঝলমলে আলো এখন তান্বীর কাছে বিষাক্ত মনে হতে শুরু করেছে। সে ভাবল, যদি সে পারত তবে এই মুহূর্তেই সব ছেড়ে দৌড়ে হাসপাতালে চলে যেত লুচি আপুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। কিন্তু এই মেক্সিকান চৌধুরী সাম্রাজ্যের অদ্ভূত সব নিয়ম তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
ঝাড়বাতির সোনালী আভা ঠিকরে পড়ছে দামী পাথরের মেঝেতে। মেক্সিকোর অভিজাত রমণীরা ডলচে অ্যান্ড গাব্বানা কিংবা গুচির লেটেস্ট কালেকশনের গাউন পরে ভিড় জমিয়েছেন। এমনকি জাভিয়ানের মা-ও আজ একটি নেভি ব্লু ভেলভেট গাউনে অপূর্ব সুন্দরী হয়ে উঠেছেন। তিনি তাঁর বান্ধবীদের সাথে আড্ডায় মেতেছেন, হাতে দামী ওয়াইনের গ্লাস—মাঝেমধ্যেই হাসিতে ফেটে পড়ছেন তাঁরা।
কিন্তু এই ওয়েস্টার্ন আভিজাত্যের ভিড়ে তান্বী আজ সম্পূর্ণ আলাদা। ওর পরনের শাড়িটা যেন এই মেক্সিকান প্রাসাদে এক টুকরো বাংলাদেশ। কপালে ছোট একটা টিপ আর হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। ওর এই স্নিগ্ধ আর বনেদি সাজ সবার নজর কাড়ছে।
তান্বী এক কোণায় দাঁড়িয়ে যখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ঠিক তখনই মাঝবয়সী এক সুঠামদেহী মেক্সিকান ভদ্রলোক ওর দিকে এগিয়ে এলেন। লোকটির চোখে এক অদ্ভুত শিকারি চাউনি, যা তান্বীর অস্বস্তিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।
“এক্সকিউজ মি, বিউটিফুল লেডি!” লোকটা তান্বীর একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। “পুরো পার্টিতে সবাই যখন এক ছাঁচে গড়া, তখন আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক প্রাচীন কবিতার পাতা থেকে উঠে এসেছেন। বিশেষ করে আপনার এই এক ঢাল কালো লম্বা চুল… মাই গড! আই হ্যাভ নেভার সিন সামথিং সো সিল্কি অ্যান্ড লং।”
তান্বী ভদ্রতার খাতিরে ঠোঁটে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল, “ধন্যবাদ।”
লোকটা থামল না, সে তান্বীর ব্যক্তিগত পরিসর লঙ্ঘন করে আরও এক ধাপ এগিয়ে এল। ওয়েটারের ট্রে থেকে দুটো শ্যাম্পেন গ্লাস তুলে নিয়ে একটা তান্বীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “লেটস চিয়ার্স! মার্কোর সাকসেস আর আপনার এই জাদুকরী চুলের জন্য এক পেগ তো হতেই পারে। ড্রিঙ্কসটা ট্রাই করে দেখুন, ইটস ভেরি স্পেশাল।”
তান্বী খুব শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় উত্তর দিল, “ধন্যবাদ, কিন্তু আমি ড্রিঙ্কস করি না। আই অ্যাম ফাইন উইথ ওয়াটার।”
লোকটা অবাক হওয়ার ভান করল। “কাম অন! ভিলা এস্পেরেন্জায় এসে ড্রিঙ্কস করবেন না, এটা তো হতেই পারে না। জাস্ট ওয়ান সিপ…” লোকটা নাছোড়বান্দা হয়ে তান্বীর হাতের খুব কাছে গ্লাসটা নিয়ে এল।
দূর থেকে এক ব্যবসায়ীর সাথে কথা বললেও জাভিয়ানের তীক্ষ্ণ নজর ছিল ঠিক তান্বীর ওপর। লোকটার তান্বীর চুলের প্রশংসা করা আর জোর করে ড্রিঙ্কস অফার করার প্রতিটি দৃশ্য জাভিয়ানের চোখে আগুনের ফুলকি ছুটিয়ে দিল। ওর হাতের গ্লাসটা ও এতটাই জোরে চেপে ধরল যে আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে এল।জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কপালে রাগের একটা শিরা দপদপ করছে। সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। গ্লাসটা পাশের টেবিলে দড়াম করে রেখে সে গটগট করে তান্বীর দিকে এগিয়ে এল। ওর প্রতিটি পদক্ষেপে এক ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতা। জাভিয়ান যখন তান্বীর পেছনে এসে দাঁড়াল, তখন ওর শরীরের উত্তাপ তান্বী স্পষ্ট অনুভব করতে পারল। জাভিয়ানের সেই শীতল আর রুদ্রমূর্তি দেখে সামনের লোকটার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
জাভিয়ান আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। বাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় এগিয়ে এসে সে লোকটার কলার মুচড়ে ধরল। লোকটার হাতের শ্যাম্পেন গ্লাসটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। পুরো হলরুমের মিউজিক যেন এক নিমেষে থেমে গেল, সবার উৎসুক আর আতঙ্কিত দৃষ্টি এখন জাভিয়ানের দিকে।
জাভিয়ানের লোকটাকে নিজের দিকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে একদম মুখের সামনে নিয়ে এল। ওর কণ্ঠস্বর থেকে যেন আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে—”গেট আউট! জাস্ট গেট আউট ফ্রম হিয়ার!” জাভিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল। “হাউ ডেয়ার ইউ! আমার ওয়াইফকে বিরক্ত করার অধিকার তোকে কে দিয়েছে? ওর চুলের দিকে তাকানোর সাহস হয় কী করে তোর?”
লোকটা ভয়ে তোতলামি শুরু করল, “আই… আই অ্যাম সরি ,আমি তো শুধু একটা ড্রিঙ্কস অফার করছিলাম…”
“চুপ!” জাভিয়ান ওর কলারটা আরও শক্ত করে ধরল। “এখনই আমার চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যা, নাহলে কথা দিচ্ছি—পরের মুহূর্তেই তোকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব অথবা গু/লি করে খুলি উড়িয়ে দেব! আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিবি না।”
জাভিয়ানের সেই মেজাজ দেখে লোকটা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। টলমল পায়ে ভিড় ঠেলে প্রায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। হলরুমের নিস্তব্ধতা তখন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। সায়েম চৌধুরী আর বাকিরা দূর থেকে দৃশ্যটা দেখলেও জাভিয়ানের এই রুদ্রমূর্তির সামনে আসার সাহস পেলেন না।
তান্বী ভয়ে আর আড়ষ্টতায় জাভিয়ানের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। ওর শরীর কাঁপছে। জাভিয়ান এক ঝটকায় তান্বীকে নিজের দিকে টেনে নিল। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস তখনো দ্রুত বইছে। সে তান্বীর কানে কানে ফিসফিস করে বলল—”তোমাকে হাজার বার বলেছি জিন্নীয়া, তোমার এই রূপ আর এই অবাধ্য লম্বা চুলগুলো শুধু আমার দেখার জন্য। অন্য কেউ এগুলোর দিকে তাকালে আমার মস্তিস্ক ঠিক থাকে না। চলো এখান থেকে, এই নোংরা ভিড়ে তোমার আর এক মুহূর্তও থাকার দরকার নেই।”
হলরুমের সেই নিস্তব্ধতা পাথরের মতো ভারী হয়ে জমে গিয়েছিল। জাভিয়ানের রুদ্রমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আভিজাত্যবান অতিথিরা তখনো বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছেন। জাভিয়ান কারো দিকে ভ্রুক্ষেপ করল না। সে এক ঝটকায় তান্বীর কোমরে হাত দিয়ে ওকে পাঁজাকোলা করে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে তুলে নিল।
তান্বী অপ্রস্তুত হয়ে জাভিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল। ওর মুখটা এখন লজ্জায় জাভিয়ানের শক্ত বুকের সাথে মিশে আছে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় জাভিয়ান একবার ঘাড় ঘুরিয়ে নিচের জমায়েতের দিকে তাকাল। ওর চোখে তখনো সেই তীক্ষ্ণ আর আধিপত্য বিস্তারকারী দৃষ্টি।
জাভিয়ান গম্ভীর অথচ উপহাস মেশানো এক হাসিতে চিৎকার করে বলে উঠল— “আপনারা সবাই থমকে আছেন কেন? এটা একটা সাকসেস পার্টি! মিউজিকটা আবার চালু করো। ইনজয় করুন আপনারা, জাস্ট ক্যারি অন!”
জাভিয়ানের এই বজ্রকণ্ঠের ঘোষণায় ডিজে তড়িঘড়ি করে আবার মিউজিক প্লে করল। আমন্ত্রিত অতিথিরা যান্ত্রিকভাবে আবার নিজেদের মাঝে কথা বলা শুরু করলেও সবার আলোচনার কেন্দ্রে এখন শুধুই জাভিয়ান আর তান্বী।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার প্রতিটি ধাপে জাভিয়ানের বলিষ্ঠ হাতের বাঁধন তান্বীর কোমরে আরও শক্ত হচ্ছিল। তান্বী অস্ফুট স্বরে বলল, “জাভিয়ান… নামিয়ে দিন না। সবাই তাকিয়ে আছে, কী ভাবছে ওরা!”
জাভিয়ান কোনো উত্তর দিল না।জাভিয়ান করিডোরের মাঝামাঝি আসতেই তান্বীকে পা থেকে নামিয়ে দিল। ওপর থেকে নিচের হলরুমটা একদম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে; এখনো অতিথিরা একে অপরের সাথে ফিসফিস করছে আর আড়চোখে ওপরের দিকে তাকাচ্ছে। তান্বী লজ্জায় আর রাগে একদম লাল হয়ে গেছে। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে ফুঁসে উঠে বলল—”আপনার কি নূন্যতম কোনো লজ্জা নেই জাভিয়ান? এভাবে সবার সামনে কোলে তুলে নিয়ে আসলেন? নিচতলার মানুষগুলো আমাদের নিয়ে কী ভাবছে একবার ভেবে দেখেছেন?”
জাভিয়ানের মাথা থেকে রাগের ভূত তখনো নামেনি। সে কোনো উত্তর না দিয়ে এক ঝটকায় তান্বীর দুই হাত ধরে ওকে করিডোরের দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। ওর বলিষ্ঠ শরীরের চাপে তান্বী দেয়ালে পিষ্ট হয়ে গেল। জাভিয়ানের চোখ দুটো এখন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে।”লজ্জা? লজ্জা আমার না, তোমার হওয়া উচিত তান্বী!” জাভিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল। “ওই লোকটা তোমার এত কাছে এসে তোমার চুলের প্রশংসা করছিল, আর তুমি তার সাথে হেসে হেসে কথা বলছিলে কেন? ও তোমাকে বিরক্ত করছে বুঝতে পেরেও তুমি কেন ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলে? অন্য কোনো পুরুষের মুখে নিজের রূপের প্রশংসা শুনতে খুব ভালো লাগছিল, তাই না?”
তান্বী অবাক হয়ে জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। সে অস্ফুট স্বরে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে বলল, “আপনি ভুল বুঝছেন! উনি এ বাড়ির গেস্ট, মার্কো ভাইয়ার প্রোগ্রামে এসেছেন। আমি শুধু ভদ্রতার খাতিরে…”
“ভদ্রতা মাই ফুট!” জাভিয়ান গর্জে উঠল। “আমার জিনিসের ওপর অন্য কেউ নজর দিলে আমি কোনো ভদ্রতা চিনি না। তোমাকে আমি হাজার বার বলেছি এই রূপ, এই শরীর আর এই এক ঢাল চুল—সবকিছুর ওপর শুধু আমার একার অধিকার।”
কথাটা শেষ করেই জাভিয়ান পশুর মতো ক্ষিপ্রতায় তান্বীর ফর্সা গলার এক পাশে নিজের মুখ ডুবিয়ে দিল। কোনো ভূমিকা ছাড়াই সে সেখানে এক গভীর আর যন্ত্রণাদায়ক কামড় বসাল। তান্বী ব্যথায় আর তীব্র শিহরণে ‘আহ্’ করে আর্তনাদ করে উঠল। ওর দুই হাত দিয়ে সে জাভিয়ানের শার্ট খামচে ধরল।
জাভিয়ান থামল না; সেই কামড়ের ওপর নিজের তপ্ত ঠোঁট চেপে ধরে সে ধরা গলায় বলল, “এটা তোমার অবাধ্যতার শাস্তি জিন্নীয়া।”
তান্বী শিউরে উঠে বলল, “জাভিয়ান… এখানে কেউ দেখে ফেলবে… প্লিজ রুমে চলুন।”
জাভিয়ানের চোখে তখন এক উন্মাদনা মেশানো নেশা। সে তান্বীর শাড়ির আঁচলের কিছুটা অংশ সরিয়ে দিয়ে ওর উন্মুক্ত কোমরে নিজের হাত শক্ত করে বসিয়ে দিল। ও নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল— “তোমাকে শাস্তি দিতে রুমে যাওয়ার ধৈর্য আমার নেই।।”
তান্বী সর্বশক্তি দিয়ে জাভিয়ানের লোহার মতো শক্ত হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল। ওর দুহাত দিয়ে সে জাভিয়ানের চওড়া বুকে ধাক্কা দিচ্ছিল, কিন্তু জাভিয়ান আজ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। ওর গলার খাঁজে জাভিয়ানের তপ্ত নিশ্বাস আর বারবার বসিয়ে দেওয়া সেই যন্ত্রণাদায়ক কামড়গুলো তান্বীর সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছিল।
জাভিয়ানও একগুঁয়েমি নিয়ে তান্বীর ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেই যাচ্ছিল। ওর একটাই জেদ—কেন তান্বী অন্য পুরুষের প্রশংসায় নীরব ছিল। তান্বী এবার ধরা গলায় আর্তনাদ করে উঠল, “ছাড়ুন জাভিয়ান! আপনি আমাকে ব্যথা দিচ্ছেন… প্লিজ থামুন!”
কিন্তু জাভিয়ান থামল না। সে তান্বীর সিল্কি চুলগুলো মুঠো করে ধরে ওর মাথাটা পেছন দিকে হেলিয়ে দিল, যাতে ওর গলার প্রতিটি ইঞ্চি উন্মুক্ত থাকে।জাভিয়ানের এই রুদ্রমূর্তি আর পৈশাচিক অধিকারবোধ দেখে তান্বী এবার সত্যিই ভেঙে পড়ল। ওর চোখের কোণ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল জাভিয়ানের হাতে।
তান্বী ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, “আপনি কি আমাকে মানুষ মনে করেন না? আমি কি আপনার কোনো খেলনা যে যখন খুশি যেভাবে খুশি ব্যবহার করবেন? আপনি নিষ্ঠুর জাভিয়ান… আপনি খুব নিষ্ঠুর!”
তান্বীর সেই কান্নার শব্দ আর গলার কান্নার কম্পন জাভিয়ানের কানে পৌঁছাতেই সে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। ওর তপ্ত ঠোঁটগুলো তান্বীর গলার চামড়া থেকে সরে এল। জাভিয়ান দেখল, তান্বীর ফর্সা গলার এক পাশে কামড়ের গাঢ় লাল দাগ বসে গেছে, আর ওর দুচোখ বেয়ে অবিরল অশ্রু ঝরছে।
জাভিয়ানের ভেতরের সেই পশুর মতো ক্রোধটা মুহূর্তেই ধপ করে নিভে গেল। সে ধীরে ধীরে তান্বীর হাতের ওপর থেকে নিজের কবজির বাঁধন আলগা করল। করিডোরের সেই কোণটায় কেবল তান্বীর ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
জাভিয়ান অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। সে নিজের হাতের দিকে তাকাল, যে হাত দিয়ে একটু আগে সে তার প্রিয়তমাকে যন্ত্রণায় পিষ্ট করছিল। জাভিয়ানের গলার স্বর এবার একদম খাদে নেমে এল, “জিন্নীয়া… আই… আই অ্যাম সরি। আমি আসলে সহ্য করতে পারছিলাম না।”
তান্বী দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে কোনোমতে নিজের শাড়ির আঁচলটা টেনে গলার সেই লাল দাগটা ঢাকার চেষ্টা করল। সে কান্নাসিক্ত চোখে জাভিয়ানের দিকে একবার তাকাল—সেই চাউনিতে আজ ভালোবাসার চেয়ে অভিমান আর আতঙ্কই বেশি ছিল। কোনো কথা না বলে তান্বী এক দৌড়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
জাভিয়ান একা করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল। নিচে তখনো মার্কোর অ্যাওয়ার্ডের মিউজিক বাজছে, কিন্তু জাভিয়ানের কাছে মনে হলো সেই মিউজিক এই মুহূর্তে তাকে বিদ্রূপ করছে। সে জানত, আজ সে অধিকারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
.
.
.
পরেরদিন বাংলাদেশের ধানমন্ডিতে তখন ভোর। ফারহান ল্যাপটপের সামনে বসে নিউজ পোর্টালগুলো স্ক্রল করছিল। হঠাৎ একটা হেডিং দেখে ওর হাতের আঙুলগুলো স্থির হয়ে গেল। “মেক্সিকান বিজনেস টাইকুন সায়েম চৌধুরীর ভাইঝির ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা, অবস্থা আশঙ্কাজনক।” সঙ্গে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া সেই বিলাসবহুল গাড়িটার ছবি।
ফারহানের বুকের ভেতরটা মনে হলো কেউ নিংড়ে ধরল। ওর চোখ ঝাপসা হয়ে এল। ফারহানের হূৎপিণ্ডটা ধক করে উঠল।ঠিক তখনই ওর সেই ঘরের দরজাটা এক প্রচণ্ড লাথিতে ভেঙে চৌচির হয়ে গেল।
ভেতরে ঢুকল এক মূর্তিমান আতঙ্ক। কালো লম্বা ওভারকোট, চোখে সেই হিমশীতল চাউনি—স্বয়ং মেইলস্ট্রোম। সে যে তার প্রাইভেট জেটে করে এত দ্রুত বাংলাদেশে পৌঁছে যাবে, সেটা কল্পনার বাইরে ছিল।
মেইলস্ট্রোম এক ঝটকায় ফারহানের শার্টের কলার মুচড়ে ধরে ওকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।
“আমার বোন তোকে ভালোবাসে বলে তুই আজও বেঁচে আছিস ফারহান,” মেইলস্ট্রোম দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল। “নাহলে কথা দিচ্ছি, এই মুহূর্তেই তোকে কয়েকশ টুকরো করে আমি বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দিতাম। শুধু লুসিয়ার ওই মুখটার কথা ভেবে আমি তোকে এখনো শ্বাস নিতে দিচ্ছি।”
ফারহান প্রথমে থতমত খেয়ে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। সে মেইলস্ট্রোমের হাতের কবজিটা শক্ত করে ধরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। ওর চোখে এখন কোনো ভয় নেই, বরং এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। “কলারটা ছাড়ুন!” ফারহান শান্ত অথচ কঠোর গলায় বলল। “আপনি ভাবছেন আপনাকে দেখে আমি ভয়ে কুঁকড়ে যাব? আমি আপনাকে বিন্দুমাত্র ভয় পাই না।”
মেইলস্ট্রোম এবার পৈশাচিক হাসল। ওর চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। সে ফারহানের মুখের আরও কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “সাহস তো কম না! আমি নিজেই অবাক হচ্ছি যে আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার পরও তুই এখনো বেঁচে আছিস।মেক্সিকোতে আমার ছায়া পড়লে মানুষ থরথর করে কাঁপে, আর তুই আমাকে চ্যালেঞ্জ করছিস?”
মেইলস্ট্রোম এবার রিভলভারের নলটা ফারহানের কপালে ঠেকালো, কিন্তু ফারহানের চোখে ভয়ের লেশমাত্র নেই। সে দাঁতে দাঁত চেপে মেইলস্ট্রোমের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি নিজের বোনের জন্য দরদ দেখাচ্ছেন, অথচ তান্বীর জীবনটা যে বিষিয়ে তুলছেন সেটা কি একবারও ভেবে দেখেছেন? ও আমারও বোন। কেন ওর পিছু ছাড়ছেন না? ওকে শান্তিতে থাকতে দিন!”
মেইলস্ট্রোম এবার এক পৈশাচিক হাসি হাসল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে রিভলভারটা সরিয়ে নিয়ে ফারহানের কলারটা আরও সজোরে ঝাকুনি দিয়ে বলল, “কাকে কৈফিয়ত দেব আমি? তোকে? তোর মতো একটা ছেলের কাছে আমার কাজের জবাবদিহি করতে আমি রাজি নই। তান্বী কার কাছে থাকবে আর কার জীবন নষ্ট হবে সেটা আমরা বুঝে নেবে।”
মেইলস্ট্রোম ফারহানকে এক ঝটকায় দেয়াল থেকে সরিয়ে নিয়ে দরজার দিকে ইশারা করল। ওর কণ্ঠস্বর এখন হাড়হিম করা শীতল— “অনেক বকবক করেছিস। এবার আসল কাজ কর। আমার বোন মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে তোর নাম বিড়বিড় করছে। তুই মেক্সিকো যাবি কি না সেটা আমি তোকে জিজ্ঞেস করছি না, আমি তোকে তুলে নিয়ে যেতে এসেছি। চল আমার সাথে! আমার প্রাইভেট জেট নিচেই রেডি আছে। এখনই আমার বোনের কাছে যাবি তুই।”
ফারহান স্থির হয়ে কিছুক্ষণ মেইলস্ট্রোমের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে, এই মুহূর্তে মেক্সিকো যাওয়া মানেই আগুনের মুখে ঝাঁপ দেওয়া, কিন্তু লুসিয়ার সেই রক্তাক্ত মুখটা কল্পনা করতেই ওর ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। ফারহান গম্ভীর গলায় বলল, “আমি যাব। আপনাকে ভয় পেয়ে নয়, লুসিয়ার জন্য যাব। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনি জোর করে নিয়ে যেতে পারেন, কিন্তু মানুষের মনকে জোর করে কেনা যায় না।”
মেইলস্ট্রোম তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, “ওসব বড় বড় কথা প্রাইভেট জেটে গিয়ে বলিস। এখন হাঁট!”
মেইলস্ট্রোমের বডিগার্ডরা মুহূর্তেই ফারহানকে ঘিরে ধরল। ধানমন্ডির সেই নিস্তব্ধ ভোরে ফারহানকে একরকম জোর করেই তুলে নিয়ে জেটে তোলা হলো। গন্তব্য—মেক্সিকো।
মেইলস্ট্রোমের প্রাইভেট জেট যখন আকাশের বুক চিরে মেক্সিকোর দিকে উড়ছিল, ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় ২০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রার জানান দিচ্ছে। ফারহান জানালার বাইরে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে, ওর মনের ভেতর এক অস্থির ঝড়। ওদিকে মেইলস্ট্রোম ল্যাপটপে কোনো এক জরুরি ফাইলে চোখ রাখলেও ওর অবয়বে এক রহস্যময় প্রশান্তি।
ফারহান নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করল, “লুসিয়া কেমন আছে? আমরা কি সরাসরি হাসপাতালে যাচ্ছি?”
মেইলস্ট্রোম চোখ না তুলেই শীতল গলায় উত্তর দিল, “না। লুসিয়ার কন্ডিশন এখন স্টেবল। ডাক্তাররা ওকে আজই রিলিজ করে দেবেন। আমি তোকে এখন আমার পার্সোনাল ভিলাতে নিয়ে যাব। আগে আমার বোন আগে একটু ধাতস্থ হলে তারপর তোকে ওর সামনে নিয়ে যাব। তার আগে আমার চোখের সামনেই থাকবি তুই।”
দীর্ঘ যাত্রা শেষে ফারহানকে নিজের সুরক্ষিত ভিলাতে আটকে রেখে মেইলস্ট্রোম যখন ড্রয়িংরুমে এসে বসল, তখন সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন ইসাবেলা। তিনি কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেইলস্ট্রোমের প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছিল।
ইসাবেলা কফির কাপটা নামিয়ে রেখে খুব ধীরলয়ে বললেন, “আমি একটা জিনিস গত কয়েকদিন ধরে ভাবছি। তুমি এত সহজে চুপচাপ আছো কীভাবে? কোর্টে নিজের কেসটা যেভাবে সলভ করলে, সেটা তো তোমার বাঁ হাতের কাজ ছিল। কিন্তু আমাকে যেটা অবাক করছে সেটা হলো তান্বী।”
মেইলস্ট্রোম কোনো উত্তর দিল না, শুধু একটা সিগারেট ধরাল। ইসাবেলা উঠে এসে ওর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “তান্বীকে তুমি এত সহজে এমিলিওর সাথে সংসার করতে দিচ্ছো—এটা ভাবতে আমার অবাক লাগছে। আমি তো আমার ছেলেকে চিনি! যে মেইলস্ট্রোম নিজের জিনিস কারো সাথে শেয়ার করে না, সে আজ এত শান্ত কেন? ভেতরে ভেতরে কী ছক কষছো তুমি?”
মেইলস্ট্রোম ধোঁওয়া ছেড়ে ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক আর রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলল। ও শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলল— “পারমানেন্ট কিছু পেতে হলে পারমানেন্ট ব্যবস্থাপনাই করতে হয়, মম। একটু পেশেন্ট হও। আমি কোনো কাঁচা কাজ করি না, আর মেইলস্ট্রোম যখন চাল চালবে, তখন সেটা হবে নিখুঁত। জাভিয়ান ভাবছে ও জিতে গেছে, কিন্তু ও জানে না যে ও একটা বালির প্রাসাদে দাঁড়িয়ে আছে।”
ইসাবেলা কফির কাপটা সরিয়ে রেখে মেইলস্ট্রোমের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর মাতৃত্বের সহজাত শঙ্কাটা এবার প্রকাশ পেয়ে গেল। তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “তুমি যা খুশি কর মেইলস্ট্রোম, কিন্তু এমিলিওর যেন বড় কোনো ক্ষতি না হয়। ও জেদি হতে পারে, ভুল করতে পারে, কিন্তু ও তো তোমার রক্ত! দয়া করে ওর ওপর কোনো চরম আঘাত করো না।”
মেইলস্ট্রোম হাতের সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে পিষে এক পৈশাচিক ঠান্ডা হাসল। তাঁর চোখের মণি দুটো যেন মুহূর্তেই বরফের মতো শীতল হয়ে গেল। সে নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল— “সেটার গ্যারান্টি আমি দিতে পারছি না মম। কারণ জাভিয়ানের হৃদস্পন্দন এখন তান্বী। আর আমি যদি তান্বীকে সেখান থেকে ছিঁড়ে নিয়ে আসি, তবে জাভিয়ানের হৃদস্পন্দন থেমে গেলে আমার কী করার আছে বলো?”
মেইলস্ট্রোম উঠে দাঁড়িয়ে ঘর জুড়ে পায়চারি করতে শুরু করল। তাঁর ওভারকোটের নিচে লুকানো ক্রোধটা এখন স্পষ্ট ফুটে উঠছে। সে আবার বলতে শুরু করল, “আর একটা কথা মম, জাভিয়ানের প্রতি তোমার এই অহেতুক দরদ দেখানোটা আমার মোটেও পছন্দ নয়।”
ইসাবেলা আর্তনাদ করে বললেন, “মেইলস্ট্রোম, তুমি বুঝতে পারছো না! জাভিয়ানকে ধ্বংস করা মানে তান্বীকেও ধ্বংস করা। তুমি কি সত্যিই সেটা চাও?”
মেইলস্ট্রোম দরজার দিকে এগোতে এগোতে ঘাড় ঘুরিয়ে শেষবারের মতো তাকাল। “আমি তান্বীকে চাই মম, সেটা যে কোনো মূল্যেই হোক। জাভিয়ান যদি মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে আমার হাত এক মুহূর্তের জন্য কাঁপবে না। কাঁচা কাজ মেইলস্ট্রোম করে না, আর এবার যা হবে তা পারমানেন্ট হবে।”
মেইলস্ট্রোম গটগট করে বেরিয়ে গেল ফারহানের ঘরের দিকে। ওদিকে ইসাবেলা ড্রয়িংরুমের সেই শূন্যতায় দাঁড়িয়ে নিজের ছেলেদের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কথা ভেবে শিউরে উঠলেন। তিনি জানেন, মেইলস্ট্রোম যখন কারো ওপর নজর দেয়, তখন তার রেহাই পাওয়া অসম্ভব।
.
.
দুপুরে হাসপাতালের করিডোরে ফারহান যখন লুসিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তার চোখেমুখে ছিল গভীর অনুশোচনা। সে ভেবেছিল লুসিয়াকে অন্তত একবার ‘সরি’ বলবে। কিন্তু লুসিয়া তাকে দেখার পর যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারল না। তার চোখে এখন আর সেই আগের ভালোবাসা বা আকুতি নেই, সেখানে জমাট বেঁধে আছে এক পাহাড় সমান ঘৃণা আর অবজ্ঞা।
ফারহান কিছু একটা বলতে চেয়ে ঠোঁট নাড়াতেই লুসিয়া সজোরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। সে ফারহানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে হুইলচেয়ার থেকে মেইলস্ট্রোমের বডিগার্ডদের সাহায্যে উঠে দাঁড়াল। ফারহানকে এক মুহূর্তের জন্যও গুরুত্ব না দিয়ে সে টলমলে পায়ে হেঁটে গিয়ে মেইলস্ট্রোমের সেই কালো এসইউভি গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়ির জানালার কালো কাঁচটা তুলে দিয়ে সে বুঝিয়ে দিল, ফারহানের অস্তিত্ব তার কাছে এখন গুরুত্বহীন।
মেইলস্ট্রোম এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট টানছিল। সে ধীরপায়ে ফারহানের কাছে এগিয়ে এল। ওর ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি। সে ফারহানের কাঁধে হাত রেখে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল—”আমার বোন যেহেতু তোর সাথে কথা বলতে চাইছে না, তাহলে আর এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কী লাভ? যা এবার, নিজের দেশে ফিরে যা। বাংলাদেশে তোর জন্য একটা টিকিট আমি এখনই বুক করে দিচ্ছি।”
মেইলস্ট্রোম আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে গাড়িতে উঠে বসল এবং সজোরে দরজা লাগিয়ে দিল। ধুলো উড়িয়ে গাড়িটা হাসপাতালের চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ফারহান মাঝরাস্তায় একা দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ, রাগে আর অপমানে সে হিরহির করছে।মেক্সিকোর এই তপ্ত রোদেও তার শরীর কাঁপছে।
ফারহান নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ফিরে এলো। পার্কিংয়ে বাইকটা স্ট্যান্ড করানো দেখেই ওপরে উঠে এল, তখন ওর প্রতিটি পদক্ষেপে এক অদ্ভুত শূন্যতা ছিলো। মেক্সিকোর এই ফ্ল্যাটটায় একটা প্রশান্তি ছিলো, কিন্তু আজকে সব বিষাদে ভরে উঠেছে।
রুমে ঢুকে ফারহান কোনো লাইট জ্বালল না। জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে অন্ধকারেই সোফার ওপর ধপ করে বসে পড়ল। বাইরে মেক্সিকো সিটির সুর্যের আলো ঝলমল করছে, কিন্তু ফারহানের মনের ভেতরে তখন এক বিচারসভা চলছে।ওর চোখে বারবার লুসিয়ার সেই অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টি আর মেইলস্ট্রোমের সেই তাচ্ছিল্যের হাসিটা বাজছিল। ফারহানের হৃদপিণ্ডটা ভারি হয়ে এল। সে দুই হাতে নিজের চুলগুলো খামচে ধরল। তার মাথায় সেই দিনের স্মৃতিটা বারবার ফিরে আসছে, যেদিন সে লুসিয়াকে চূড়ান্ত অপমান করেছিল।
সে মনে মনে ভাবতে লাগল— “সেদিন কি লুসিয়াকে কথাগুলো একটু বেশিই কড়া বলে ফেলেছিলাম? ওর জেদ বা পাগলামি হয়তো আমাকে বিরক্ত করছিল, কিন্তু তাই বলে ওকে ওভাবে বলাটা কি ঠিক হয়েছিল? মেয়েটা তো শুধু আমাকে একটু ভালোবাসতে চেয়েছিল। আজ হাসপাতালের সেই ফ্যাকাশে মুখ আর ব্যান্ডেজ লাগানো কপালটা কিছুতেই ভুলতে পারছি না।”
ফারহান উঠে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়াল। সে বিড়বিড় করে বলল— “ও কি সত্যিই আমাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে? নাকি আমার ওপর ওর এই ঘৃণাটাই আসলে ওর লুকানো ভালোবাসা?”
ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। মেক্সিকোর ঠান্ডা বাতাস ওর চোখেমুখে আছড়ে পড়ছে। ফারহান মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো যেভাবেই হোক লুসিয়ার অভিমান ভাঙাবেই।
.
.
মেক্সিকোর এই বিশাল ভিলাতে লুসিয়ার আগমনটা ছিল একদম নিরব। ড্রয়িংরুমে সায়েম চৌধুরী আর সাইফ চৌধুরী সোফায় বসে বিজনেস নিয়ে আলোচনা করছেন, যেন কিছুই হয়নি। মার্কো এক কোণায় বসে নিস্পৃহভাবে তার ল্যাপটপে কী যেন লিখছে। তাদের চোখেমুখে কোনো বাড়তি উদ্বেগ নেই, বরং একটা যান্ত্রিক স্বাভাবিকতা।
লুসিয়া যখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হলরুমে ঢুকল, ঠিক তখনই তান্বী ওপর থেকে প্রায় দৌড়ে নিচে নেমে এল। লুসিয়াকে দেখামাত্রই তান্বীর চোখের কোণ নোনা জলে ভিজে উঠল। সে দ্রুত লুসিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ওর বরফশীতল হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
“লুচি আপা! আপনি ঠিক আছন তো? কতটা ভয় পেয়েছিলাম জানেন?” তান্বীর গলার স্বর আবেগে কাঁপছে। সে পরম মমতায় লুসিয়ার কপালে লেগে থাকা ব্যান্ডেজের চারপাশটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল। “প্রতিটি মুহূর্ত আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি আপনার জন্য। এই দুদিন আমি এক ফোঁটা ঘুমাতে পারিনি।”
লুসিয়া স্থির চোখে তান্বীর দিকে তাকিয়ে রইল। এই বাড়িতে ওর নিজের রক্ত বলতে বাবা, কাকা আর বড় ভাই মার্কো। অথচ তাদের কাউকেই দেখল না একবার উঠে এসে ওর খবর নিতে। বড়জোর সায়েম চৌধুরী এক নজর তাকিয়ে বললেন, “ওহ, তুমি ফিরেছো? টেক রেস্ট।” ব্যস, ওটুকুই। তাদের কাছে একটা এক্সিডেন্ট বা হাসপাতালের বেড—সবই যেন প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনা।
লুসিয়ার হৃদপিণ্ডটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে দেখল, এই বাড়িতে তান্বীই একমাত্র মেয়ে যে এ পরিবারের বাইরের মানুষ, অথচ এই মেয়েটার চোখের জল আর উৎকণ্ঠা কতটা অকৃত্রিম! তান্বীর এই ভালোবাসার সামনে লুসিয়ার মনে হলো, আভিজাত্যের এই দেয়ালগুলো আসলে কতটা শূন্য আর প্রাণহীন।
লুসিয়া ম্লান হেসে তান্বীর হাতটা একটু শক্ত করে ধরল। ওর মনে মনে এক অদ্ভুত উপলব্ধি হলো— “যাদের নিজের ভাবতাম, তারা আসলে একেকটা চলন্ত রোবট। আর যাকে আমি শুধু ভাইয়ার স্ত্রী হিসেবে দেখতাম, সেই মেয়েটাই আজ আমার জন্য প্রাণ কাঁদাচ্ছে।”
তান্বী তখনো ব্যস্ত লুসিয়াকে নিয়ে। “চলুন, আমি আপনাকে আপনার রুমে নিয়ে যাই। আমি নিজ হাতে আপনার প্রিয় স্যুপ বানিয়ে রেখেছি। আপনাকে আজ অনেক কিছু খেতে হবে।”
লুসিয়া কিছু বলল না, শুধু তান্বীর স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই প্রথম তার মনে হলো, মেইলস্ট্রোম আর জাভিয়ানের এই ভয়াবহ জেদ আর ইগোর লড়াইয়ের মাঝে তান্বী নামের এই মেয়েটা আসলে এক টুকরো প্রশান্তি, যাকে এই চৌধুরী বংশের নিষ্ঠুরতা এখনো স্পর্শ করতে পারেনি।
.
.
সন্ধার পর পরেই লুসিয়া তৈরি হতে শুরু করলো। সে যেন আজ আগুনের সাথে খেলছে। শরীরের ব্যান্ডেজ আর হাড়কাঁপানো দুর্বলতাকে তোয়াক্কা না করে সে সেই উঁচু হিল জুতোটা পায়ে গলিয়ে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ফ্যাকাসে মুখটার দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে বলল, “ফারহানকে আমি বুঝিয়ে দেব, ও আমাকে দুর্বল ভাবার সাহস যেন আর না করে। লুসিয়া চৌধুরী ধ্বংস হতে জানে, কিন্তু হার মানতে জানে না।”
সন্ধার পরেই ক্লাবে ঢোকার সাথে সাথেই চড়া মিউজিক আর নিয়ন আলো ওকে স্বাগত জানাল। ক্লাবের চড়া মিউজিক আর ধোঁয়ার মাঝে লুসিয়া যখন তাসের টেবিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ওর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল যন্ত্রণাদায়ক। ওর বাম পা-টা মারাত্মকভাবে জখম, প্রতিবার পা ফেলতেই যেন হাড়ের ভেতর বিদ্যুতের মতো যন্ত্রণা খেলে যাচ্ছে। সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে, কিন্তু ওর জেদ এতটাই বেশি যে সেই অবস্থাতেই সরু পেন্সিল হিলটা পড়ে এসেছে। ব্যথায় ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, কিন্তু ঠোঁটের কোণের সেই উদ্ধত হাসিটা সে এক মুহূর্তের জন্যও মলিন হতে দিচ্ছে না। সে বন্ধুদের সাথে তাসের টেবিলে গিয়ে বসল।
মার্তা ওকে দেখে প্রায় চিৎকার করে উঠল, “লুসিয়া! তুই এখানে? তোর তো এখন হাসপাতালের বেডে থাকার কথা! পাগল হয়েছিস নাকি?”
লুসিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “হসপিটাল থেকে আগেই রিলিজ হয়েছিল তবে বাড়ির ওই প্রাণহীন আভিজাত্যের চেয়ে এই ক্লাবের ধোঁয়া আর মিউজিক অনেক ভালো মার্তা। ওখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।”
লুসিয়া দেরি না করে ওর বন্ধুদের সাথে তাস খেলা শুরু করলো। সে হাসাহাসি করছে, বন্ধুদের সাথে গেইমে মেতে উঠেছে—যেন কিছুই হয়নি। ঠিক সেই মুহূর্তেই মার্তার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। মার্তা স্ক্রিন দেখে অবাক হয়ে বলল, “লুসিয়া, ফারহান কি মেক্সিকোতে?”
লুসিয়া তাসের কার্ড থেকে চোখ না তুলেই শান্ত গলায় বলল, “তুই কীভাবে জানলি?”
মার্তা উত্তেজিত হয়ে বলল, “আরে, ও আমাকে মেসেজ করেছে! বারবার জিজ্ঞেস করছে তুই কোথায় আছিস।”
লুসিয়া এবার বাঁকা হাসল। ওর চোখে তখন প্রতিশোধের নেশা। সে মার্তাকে বলল, “ওকে বল, লুসিয়া ক্লাবে অচেনা সব ছেলেদের সাথে খুব ইনজয় করছে আর ঘেঁষাঘেঁষি করে নাচছে। তবে খবরদার, ওকে আমার লোকেশনটা দিবি না। ওকে ওর মতো জ্বলতে দে।”
মার্তা ফারহানকে মেসেজ পাঠাল: “লুসিয়া এখন ক্লাবে ওর বন্ধুদের সাথে আছে, ও বেশ ভালোই সময় কাটাচ্ছে।”
ফারহান ওপাশ থেকে প্রায় সাথে সাথেই রিপ্লাই দিল, “কোন ক্লাবে আছে ও? প্লিজ মার্তা, আমাকে লোকেশনটা দাও। আমি ওর সাথে একবার কথা বলতে চাই।”
মার্তা প্রথমে না করতে চাইলেও ফারহান যখন বার বার রিকোয়েস্ট করতে লাগল এবং লুসিয়ার শরীরের অবস্থার কথা ভেবে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করল, তখন মার্তা আর স্থির থাকতে পারল না। সে ফারহানকে ক্লাবের লোকেশনটা পাঠিয়ে দিল।
চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই ক্লাবের এন্ট্রান্সের কাছে একটা পরিচিত অবয়ব দেখা গেল। ফারহান! ওর পরনে একটা কালো শার্ট, চুলগুলো উশকোখুশকো, আর চোখেমুখে এক চরম অস্থিরতা। সে ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকেই দেখল লুসিয়া তাসের টেবিলে বসে এক বিদেশি মেয়ের কাঁধে প্রায় হেলান দিয়ে হাসাহাসি করছে।আর অপর প্রান্তে আরো কিছু মেক্সিকান যুবক। লুসিয়ার পায়ের সেই প্লাস্টার আর ব্যান্ডেজ করা অংশটা হিলের সাথে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে।ফারহান যখন দেখল লুসিয়া খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলার মতো অবস্থায় থেকেও অন্য ছেলে মেয়েদের সাথে গলাগলি করছে, ওর মাথার রগ দপদপ করে উঠল। সে দ্রুতপায়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।
ফারহানের উপস্থিতি টের পেয়েও লুসিয়া ওর দিকে তাকাল না। সে পাশের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আরও শব্দ করে হেসে উঠে বলল, “ইউ নো, মেক্সিকান ছেলেরা সত্যিই জানে কীভাবে একটা মেয়েকে স্পেশাল ফিল করাতে হয়। অকৃতজ্ঞ বাঙালিদের মতো তারা ইগনোর করতে শেখে না!”
কথাটা তীরের মতো ফারহানের বুকে বিঁধল। ফারহান এক ঝটকায় তাসের টেবিলের মাঝখানে হাত দিয়ে সজোরে চাপ দিল। মিউজিকের আওয়াজ ছাপিয়ে ওর গম্ভীর গলা গর্জে উঠল—”অনেক হয়েছে লুসিয়া! এবার নাটক বন্ধ করো। এই অবস্থায় এই হিল জুতো পড়ে ক্লাবে আসার মানে কী? তুমি কি নিজেকে মেরে ফেলতে চাও?”
লুসিয়া এবার ধীরলয়ে মুখ তুলে ফারহানের দিকে তাকাল। ওর চোখে এখন শুধু বরফশীতল ঘৃণা। সে শান্ত গলায় বলল, “আপনি কে মিস্টার ফারহান? আমার জীবন নিয়ে কথা বলার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ক্লাবে আসি আর মরতে যাই—তাতে আপনার মতো একজন ‘ভদ্রলোকের’ কী আসে যায়?”
চলবে……..
নোট: যারা বলতেছো কাহিনী এক জায়গায় আটকে আছে। আসলে মাফিয়া রিলেটেড গল্প গুলো একটু ধিরে সুস্থ এগোয় কারন এখানে পরিবেশ চরিত্র আবেগ সবকিছুরই পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ননা দিতে হয়।এসব গল্প তাড়াহুড়ো হয়না। তাই গল্প এভাবেই আগাবে আর হঠাৎ করেই মোড় নিবে আর তখন এমনভাবে মোড় নিবে যে কল্পনা করতে পারা যাবেনা। আর গল্পে যতো বেশি চরিত্রে ততোই কাহিনী একটু স্লো হয়ে। সবার চরিত্রটাই কম বেশি রাখতে হয়।
Share On:
TAGS: ডিজায়ার আনলিশড, সাবিলা সাবি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৯
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৬
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৩
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২১
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১১
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩০
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৫
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৬