জাহানারা পর্ব ৮১
জান্নাত_মুন
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
চোখের সামনে বিছানায় বি’ধস্ত অবস্থায় পড়ে আছে আমার মায়ের পেটের আরেক সন্তান। আমার বোন। আমার আদরের একমাত্র ছোট বোন। মস্তিষ্ক খেই হারিয়ে পড়ল। হাত-পা যেন দেহ থেকে খসে পড়ছে। কিন্তু বাইরের সকলের এদিকে আসার আওয়াজ শুনে বিভ্রম কাটে। ছুটে গেলাম আমি। এক টানে বিছানার চাদর দিয়ে ঢেকে দিলাম জুইয়ের ক্ষ’তবিক্ষ’ত অনাবৃত ছোট্ট দেহখানা।
সকলে এক এক করে ভেতরে প্রবেশ করতে গিয়ে দরজার কাছে এসে বরফের মতো জমে যেতে লাগল। জুইয়ের সাথে হওয়া এই বীভৎস অন্যায়ের আঁচ পেয়ে জিতু ভাইয়া জীবনে প্রথমবার ভেঙে পড়লেন। তার পাহাড়সম দৃঢ় মনোবল মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে গেল। দেহের ভারসাম্য সামলাতে না পেরে তিনি যখন লুটিয়ে পড়ছিলেন, ঠিক তখনই ইফান তাকে ধরে ফেলল।
মাহিন উন্মাদের মতো ভেতরে ঢুকে এল। কিন্তু বিছানার দিকে নজর পড়তেই তার গতিশীল দেহ আর সমগ্র অস্তিত্ব যেন এক নিমেষে থমকে দাঁড়াল। হাত থেকে অবহেলায় খসে পড়ল ধরে থাকা মা’রণা’স্ত্রটি। মীরা চরম অসহায় চোখে তার ভাইয়ের দিকে তাকাল—যে মানুষটা পাথরের মতো শক্ত ছিল, তার চোখ আজ জলে টইটম্বুর। মাহিন যখন টলমল পায়ে জুইয়ের দিকে এগিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই বাইরে থেকে পাগলের মতো ছুটে এল আবির। আবিরের আচমকা ধাক্কায় মাহিন পুনরায় নিজের ভারসাম্য হারিয়ে একপাশে সরে যেতে বাধ্য হলো। মুহূর্তের মধ্যে আবির এসে জুইয়ের নিস্তেজ দেহখানা নিজের বুকে ঝাপটে ধরল। মাহিন কেবল এক বুক অপরাধবোধ আর সীমাহীন অসহায়ত্ব নিয়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটির বিবর্ণ ও ক্ষ’তবি’ক্ষত চেহারার দিকে।
সাহসী সিআইডি অফিসার হিসেবে খ্যাত সেই লৌহমানব আবির আহমেদ আজ সবার সামনে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। আমার চোখের সামনে পুরো দৃশ্যটা কোনো এক বীভৎস দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। আমি পাথরের মতো জমে আছি। মস্তিষ্ক এই কঠিন সত্যটুকু গ্রহণ করতে চাইছে না। অবিশ্বাসের ঘোরে আমি চারপাশটা একবার দেখে নিলাম, চোখ দুটো হন্যে হয়ে কাউকে খুঁজছে। পরক্ষণেই আমার নজরে পড়ল সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটি।
আমি অত্যন্ত কাতর আর দিশেহারা চোখে ইফানের দিকে তাকালাম। কিন্তু ইফানের চেহারা একদম নিস্তেজ, অনুভূতিহীন। আমার আশেপাশে আসলে কী ঘটছে, আমি তার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। আবির আমার কাছ থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে চাদরে মোড়া সেই নিস্পন্দ দেহটাকে কোলে তুলে নিল এবং নিমিষেই কক্ষ ত্যাগ করল।
বাঁধ ভাঙল মাহিনের চোখের অশ্রুর। ব্যথাতুর, ক্লান্ত এবং অসহনীয় তীব্র দহন নিয়ে সে কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে নিজের প্রেমকে অন্য কারোর বুকে নিথর হয়ে চলে যেতে দেখল।
সিআইডি অফিসার আরমান শেখ জিতুর নির্দেশে পুরো ঢাকা শহরে কারফিউ জারি হয়েছে। রাস্তায় সকল গাড়ি দাঁড়া করে পুরোদমে চলছে তল্লাশি। অপরদিকে শতাধিক কালো গাড়ি সকল হাইওয়ে সহ ছোট-বড় রাস্তা আটকে দিয়েছে। এসকল মাফিয়া বসের পাওয়ার।
ঢাকা হাইওয়ে দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটছে কালো মার্সিডিজটি। ড্রাইভিং করছে স্বয়ং মাফিয়া বস। কানে তার ব্লুটুথ। গম্ভীর এবং শক্ত চোয়াল। চোখে এক রাশ ক্রোধ। সেই ক্রোধের তাড়নায় সূর্যের মতো ঝলমল করছে তাঁর ধূসর বাদামী নেত্রপল্লব। কারো বা কাদের সাথে কথা বলছে আর গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত চালাচ্ছে।
ইফান কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে ফ্রন্ট মিররে দৃষ্টি স্থির করছে। তাঁর পাশের সিটে বসে আছি আমি। ক্লান্তিতে চোখ দুটো বুজে সিটে গা হেলিয়ে দিয়েছি। এই মূহুর্তে ভীষণ শান্ত দেখাচ্ছে আমাকে। যেন উচাটন সমুদ্রের প্রবল ঢেউগুলো হঠাৎই স্থির হয়ে গেছে। আমি যখন একদম চুপচাপ হয়ে যাই তখন ইফানের চোখে আমার চেহারা আরও সিন্ধ আর পবিত্র লাগে৷ কিন্তু ইফান খুব ভালো করে জানে তাঁর বুলবুলিকে। এই মূহুর্তেও সে আঁচ করতে পারছে কি হতে চলেছে। সে যাই হয়ে যাক, কিছু আসে যায় না তাঁর। কিন্তু তাঁর বুলবুলির একটু উদাসীনতা দেখলেই তাঁর মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে যায়৷ সেখানে এত বড় এক ধাক্কা! চোয়াল শক্ত হয়ে আসল ইফানের। সে দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বলল,
–“আই’ল কিল দ্যাট বাস্টার্ড টুডে। ওকে বাঁচিয়ে রাখা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। বাট ডোন্ট ওরি, আইম হিয়ার।”
শেষ কথাটা অনেকটা নরম কন্ঠে বলল। আমার মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা দিল না। ইফান আমার উরুতে হাত রেখে আদুরে কণ্ঠে ডেকে উঠল,“জারা।”
আমি কোনো রুপ প্রত্যুত্তর করলাম না। ইফান ড্রাইভিং এ মনযোগ দিল। কিছুক্ষণ গাড়ির ভেতর নৈঃশব্দ বিরাজ করল। অতঃপর সেই নিরবতা ভেঙে ইফানের কর্ণপাত হলো আমার হিমশীতল কন্ঠধ্বনি,
–“আর কতক্ষণ?”
ইফান আমার দিকে তাকাল। একইভাবে সীটে গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে আছি। ইফান বলল,“আশেপাশেই আছে। এত সহজে পালিয়ে কোথায় যাবে!”
আমি আর কোনো বাক্য বিনিময় করলাম না। ইফান তার শীতল হাতটি আমার গালে রাখল। অতঃপর ভেসে এলো তার হাস্কি স্বর,
–“ফ্রম নাউ অন, আই’ল ক্লিন আপ অল দ্য মেস অ্যারাউন্ড ইউ ফরএভার।”
এবার আমি চোখ মেললাম। শান্ত চোখে ইফানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ইফান আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমার গালে আলতো হাত বুলিয়ে এলোমেলো চুল গুলো কানে গুঁজে দিল। আমি ফের চোখ বন্ধ করে স্থির হয়ে গেলাম।
পঙ্কজ গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে গিয়েও ফিরে আসতে বাধ্য হলো। কারণ সব জায়গাই পুলিশ ঘেরাও করেছে। তাই দ্রুত গতিতে গাড়ি ঘুরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছে। পঙ্কজের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সে আগে থেকেই প্ল্যানিং করে রেখেছিল প্রাইভেট জেটে করে দেশ ছাড়বে। আর কয়েক বছরের মধ্যে বিডি মুখো হবে না। কিন্তু মাঝখানে ফারিয়া চলে আসায় সব কিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। পঙ্কজের চেহারায় মাত্রাতিরিক্ত চিন্তার ছাপ ভেসে উঠেছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। একবার ইফানের হাতে ধরা পড়লে যে তার অবস্থা কি হবে, সেই আন্দাজ ভালো করেই আছে।
পঙ্কজ উত্তরার বাইরে যাওয়ার সময়টুকু পেল না। তার লোক তাঁকে খবর দিয়েছে ইফান এবং ইফানের লোকজন এদিকে আসছে। অপরদিকে সিআইডি। তাই গা ঢাকা দেওয়ার জন্য ফের দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। এখানে তাঁর একটি ফ্ল্যাট আছে। কেউ জানে না বলে পঙ্কজের মনে হলো এটাই নিরাপদ।
পঙ্কজের গাড়ি বেসমেন্ট পার্কিং এ আসতেই দ্রুত ব্রেক কষল। চারপাশ তিমিরে ঢাকা। পঙ্কজ আসতেই তাঁর গাড়ির হেডলাইটের আলোয় সামনের জায়গাটা মূহুর্তেই আলোকিত করে হয়ে গেল। আর সেই সাথে দৃশ্যমান হলো সামনের মানবের অবয়ব। একটি কালো কুচকুচে মার্সিডিজের সামনে চেয়ারে কেউ ঝুঁকে বসে ধূমপান করছে। তাই সিগারেটের ধোঁয়ায় সেই মানবের অবয়ব স্পষ্ট নয়। চেয়ারের পাশেই অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে শতাধিক কালো কুচকুচে পোশাকধারী দানবাকৃতির গার্ড। বিস্ময়ে চেহারার র’ক্ত সরে গেল পঙ্কজের। অস্ফুটে আওড়াল,
–“ইফান!”
পঙ্কজ দ্রুত গাড়ি পিছিয়ে নিতে চাইলেও পারল না। কারণ তাঁর গাড়ির পিছনে আরকটি গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। চারপাশ গার্ডস ঘিরে আছে। ইফান ঠোঁটে ধরে রাখা সিগারেট ধীরেসুস্থে শেষ করল। তারপর সিগারেটের শেষাংশ ফেলে পায়ের কালো কুচকুচে বুটের নিচে পিষে ফেলল। ইফান স্বভাবত বাম ভ্রুর নিচে হালকা চুলকাল। অতঃপর আচানক চোখ সামনের দিকে স্থির করল। ইফানের র’ক্তাভ ক্রো’ধিত চোখ দুটোর সাথে পঙ্কজের ঘোলাটে নিদ্রাহীন লালচে দৃষ্টির মিলন ঘটল। মূহুর্তেই নিরবে পঙ্কজের সারা দেহে ভয়ে শিহরণ বয়ে গেল। পঙ্কজ দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। গাড়ি থেকে নামতে নামতে হেয়ালির কণ্ঠে বলল,
–“হেই ব্রো, হোয়াটস আপ!”
পঙ্কজের কথায় ইফানের চেহারার ভাবমূর্তি এক বিন্দুও পাল্টাল না। পঙ্কজ হেসে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,“হোয়াই আর ইউ শোয়িং ইয়োর মাফিয়া পাওয়ার লাইক দিস হিয়ার? ডিড সামথিং হ্যাপন?…”
আর কিছু বলার আগেই আচমকা পঙ্কজের মুখে কিছু একটা আঁচড়ে পড়ল। আকষ্মিকতায় ভরকে গিয়ে পঙ্কজের পা মূহুর্তেই থেমে গেল। আপনা-আপনি তার হাত মুখে চলে গেল। পঙ্কজ চেহারা শক্ত করে নিচে দৃষ্টি রাখতেই লক্ষ্য করল একটি মেয়েলি জুতা পড়ে আছে। কুঁচকানো ভ্রু তৎক্ষনাৎ সোজা হয়ে গেল পঙ্কজের। সে ঝটপট ফের সামনের দিকে দৃষ্টি ঘুরাতে নিলেই পুনরায় তার মুখে দূর থেকে কিছু এসে আঁচড়ে পড়ল। সাদা চামড়া পর পর আঘাতে তৎক্ষনাৎ লাল হয়ে উঠল। পঙ্কজ পুনরায় ফ্লোরে একই মেয়েলি জুতা লক্ষ্য করল।
–“বি”চ..”
অস্ফুটে উচ্চারণ করে সামনের দিকে রাগান্বিত অক্ষিযুগল নিক্ষেপ করতেই গাড়ির কাছে আমাকে লক্ষ্য করল। আমার ক্রো’ধিত সুক্ষ্ম দৃষ্টি আর আমাকে উপর নিচ এক নজরে পর্যবেক্ষণ করে নিল। আমার কোমরে শাড়ির আঁচল পেচিয়ে গুঁজে রাখা। আমার একাত্ম ক্রোধিত অগ্নিগিরি সম দৃষ্টি দেখে মূহুর্তেই পঙ্কজ নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে মন ভোলানো হাসি দিয়ে বলে উঠল,
–“আরে এ তো দেখছি আগুন সুন্দরী, আমার জানের চেয়েও প্রিয় ভাবিজান…”
–“থা’পড়ে তোর হেডা লাল করে দিব খা*নকির পুত।”
বাক্য সম্পূর্ণ করার ফুরসত পেল না পঙ্কজ। তার আগেই এক অ’শ্রাব্য বাক্য আওড়ে ঝরের গতিতে গিয়ে আমার পায়ের জুতা মেঝে থেকে তুলে পঙ্কজকে পিটতে লাগলাম। আকষ্মিকতায় ভরকে গেল ইফান। কতবার আদর করে বুঝিয়ে গাড়িতে বসিয়ে রেখে এসেছিল, যা করার সে করবে। অসুস্থ দুর্বল শরীর নিয়ে আমি যেন গাড়ি থেকে না নামি। কিন্তু এত বুঝানোর পরও অবাধ্য হওয়ায় চোয়ালের পেশি দ্বিগুণ শক্ত হয়ে আসল তার। সে এগিয়ে আমার কাছে আসবে তার আগেই কর্ণপাত হয় আমার অ”শ্রাব্য ভাষায় গা’লিগা’লাজ,
–“কু”ত্তার বাচ্চা, মাদারচো*! তোর এত বড় কলিজা আমার বোনের গায়ে হাত দিয়েছিস! আজ তোর কলিজা ধর থেকে ছিঁড়ে পাল্লায় মাপবো।”
ইফানের উপস্থিতিতে চাইলেও পঙ্কজ আমার গায়ে হাত তুলার সাহস পাচ্ছে না। তাই আমার হাতের উত্তমধ্যম খেয়ে লাফাতে লাফাতে চেঁচিয়ে বলতে লাগল,
–“হেই, হোয়াটস গোয়িং অন? ব্রো, সেইভ মি ফ্রম ইয়োর ওয়াইফ!”
ইফানের মস্তিষ্ক রাগে খেই হারিয়ে ফেটে পড়ার উপদ্রপ। ইফান ব্যাক সাইডে প্যান্টে গুঁজে রাখা রিভলবার হাতে নিয়ে লোড করে এগিয়ে আসবে তক্ষুনি পুনরায় আমার গর্জন শুনে হতবিহ্বল হয়ে থমকে দাঁড়াল,
–“ইফান্না কি করবে, ন’ডির পুত? আজ তোর সা’উয়া দে আমি আ’ইক্কাও’য়ালা বাঁশ ঢুকায়াম।”
আমি হাতের জোর আরও বাড়ালাম। পঙ্কজ ব্য’থায় কুঁকড়ে উঠে পুনরায় ইফানের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে চেঁচাতে থাকে,
–“ব্রো, সেইভ মি ফ্রম দিস ক্রেইজি উম্যান! হোয়াট ডিড আই ডু?”
পঙ্কজের গলার আওয়াজ যতবার আমার মস্তিষ্কে ঢুকছে ততবারই রা’গ মাথায় সপ্তমে চড়ে বসছে। আমি তেতে গর্জে উঠে বললাম,
–“তুই কি করছস জানস না? এই বা’’ইনচোদ হালা চুতমারানি তর কলি পু’ইড়া আজ দাগ দেম। তর সাউয়া কা’ইটা গাছের উপরে ঝুলাইয়া পুরো বিশ্বরে দেখায়াম।”
আরও এলোপাতাড়ি জুতা পিটানো সহ পঙ্কজের মেইন পয়েন্টে লা’থি মা’রতে লাগলাম। ইফান তাঁর বউকে যথেষ্ট ভালো চেনে। এর আগেও আমাকে রাগে ফেটে পড়ে মা”রামা’রি করতে দেখেছে। তবে আজকে আমার এই রুদ্রচণ্ডী রুপ কখনো দেখেনি। ইফান স্বাভাবত বাম ভ্রুর নিচে আলতো করে চুলকাতে লাগল। পরক্ষণেই মাথা ঝেরে নিজের আসল স্বত্তায় ফিরে এল। এগিয়ে এসে আমার বাহু ধরে আটকাতে আটকাতে বলল,
–“জারা আমি দেখছি ওকে…”
ইফানের কোনো বাক্যই আমার কর্ণপাত হচ্ছে না। ইফান আমাকে জোর করে পঙ্কজের থেকে সরিয়ে আনতে চায়ছে। আমাকে ঝাপটে ধরেও সরাতে পারছে না। ওর বাহুবন্ধনে থেকেও একবার পঙ্কজের মেইন পয়েন্টে লাথি দিচ্ছি তো পঙ্কজের চুলগুলো টেনে ছিড়ে ফেলতে চাইছি। ধ’স্তাধ’স্তির মধ্যে ইফান তার পায়ের আ’ঘাতে পুনরায় আ’ঘাত পাচ্ছে। সহ্যের সীমা অতিক্রম হতেই ঝাপটে ধরে আমাকে কোলে তুলে, পঙ্কজের থেকে দূরে নিয়ে আসতে লাগল। এবার ইফানের উপর ক্ষেপে গর্জে উঠলাম,
–“গো’লামের পুত ছাড় আমায়। আজ আমি এই বাই”নচো”দকে কা”ইট্টা টুকরা টুকরা করবাম।”
ইফান ধমকে উঠল,“বান্দির বাচ্চা এবার কিন্তু আমার হাতে মা’র খাবি।”
ইফানের বাক্য শেষ হতে না হতেই বাতাসের বেগে হঠাৎ ভুম ভুম আওয়াজ তুলে মীরার বাইক এসে থামল। ইফান মীরাকে আদেশ দিয়ে বলল,
–“ইউ হ্যান্ডল হার। পঙ্কজের সাথে বুঝাপড়া আমি করছি।”
–“তুমি কি বুঝাপড়া করবে? আজ এই কু’ত্তার বাচ্চারে আমি নিজ হাতে খু’ন করব…”
আমি ক্রো’ধে চিৎকার চেচামেচি করতে লাগলাম। রাগের তোড়ে লাল চোখদুটো পানিতে চিকচিক করতে লাগল। মনে হচ্ছে চোখের কোণ বেয়ে এই বুঝি তপ্ত লাভা গড়িয়ে পড়বে। মীরা আমাকে জোর করে গাড়িতে নিয়ে বসাল। ইফান আমার দিক সামলে পুনরায় তার ব্লা’ডিবিস্ট অনুভূতিহীন স্বত্তায় ফিরে আসল। ঘুরে তাকাল পঙ্কজের পানে। পঙ্কজের সারা চেহারা ক্ষ’তবি’ক্ষত হয়ে গেছে। সে বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁটের র’ক্ত মুছতে মুছতে গোঙাল। ইফান কিছুটা খুঁড়িয়ে খু্ঁড়িয়ে হেঁটে পঙ্কজের সামনে গিয়ে সটান হয়ে দাঁড়াল। পঙ্কজ ইফানকে লক্ষ্য করে অভিযোগের সুরে বলল,
–“ওহ্ ইয়ার, ইয়োর ওয়াইফ হ্যাজ লস্ট হার মাইন্ড। শি নিডস ট্রিটমেন্ট। অ্যাডমিট হার টু আ মেন্টাল হসপিটা..”
বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারল না পঙ্কজ। এর আগেই তাঁর গালে বলিষ্ঠ হাতের শক্ত চপেটাঘাত পড়ল। থা’প্পড়টি এতটাই জোরে ছিল যে পঙ্কজের র’ক্ত বমি ছিটকে পড়ল আশেপাশে। তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ইফান এগিয়ে গেল পঙ্কজের নিকট। পঙ্কজের মাথা ঝিম ধরে গেল। কয়েক মূহুর্ত একদম তব্দা মে’রে সেখানেই পড়ে রইল। সংবিৎ ফিরে পেতেই ক্রু’দ্ধ নয়নে ইফানের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
–“হোয়াট দ্য হেল ইজ গোয়িং অন?”
ইফান তৎক্ষনাৎ পা চেপে ধরল পঙ্কজের চোয়ালে। ক্রো’ধে তাড়নায় চেহারায় এসে হানা দিল এক দান’বীয় হিং’স্রতা। চোয়াল শক্ত করে এক আঙুলের ইশারায় তাঁর পায়ের দিকে দেখাল। অতঃপর দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বলল,
–“আওয়াজ নিচে।”
ইফানের হিমশীতল হুশিয়ারি কণ্ঠস্বর শুনে জমে গেল পঙ্কজ। তার মতো ধূর্ত লোক মাথা গরম করে না কখনো। তাঁরা খেলে মাথা ঠান্ডা করে। পঙ্কজ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। মন ভোলানো হাসি দিয়ে বলে উঠল,
–“আরে ভাই যদি কারণ না বলিস, কি করে বুঝব কি হয়েছে?”
ইফান এক দৃষ্টিতে ক্রু’দ্ধ নয়নে পঙ্কজের পানে চেয়ে রইল। কোনো প্রকার উত্তর করল না। বরং করার প্রয়োজন মনে করল না। পঙ্কজ ফের হেসে বলল,
–“আরে বাপ কি করেছি আমি, বল আমায়?”
–“কি করেছিস জানিস না?”
পঙ্কজ মাথার এলোমেলো চুলগুলোতে ব্যাক ব্রাশ করে নিল। সে জানে ইফানের সামনে মিথ্যা বললে এর ফল আরও খারাপ হবে। তাই বলে দেওয়ায় বুদ্ধিমানের কাজ মনে করল। সে ইফানের সন্নিকটে এসে ফিসফিস করে বলল,“তোমার সুন্দরী শা’লির জন্য কি আমার পেয়ারের ভাবিজান খ্যাপে গেছে?”
ইফান তৎক্ষনাৎ উত্তর করল না। বরং দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজের রা’গ দমিয়ে রাখল পঙ্কজের মুখে সবটা শুনার জন্য। পঙ্কজ ঘাড় কাথ করে গাড়ির দিকে তাকাল। আমি হিং’স্র প্রাণীর মতো তাকিয়ে আছি তার দিকে, গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে। আমাকে এখনো মীরা ঝাপটে ধরে আছে। সাথে গাড়িতেও লক করে দিয়েছে। পঙ্কজ আমার দিক থেকে দ্রুত দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঢোক গিলল। ইফানের রাগ পালাক্রমে বেড়ে চলছে। পঙ্কজ ফের ইফানকে ফিসফিস করে বলতে লাগল,
–“তোমার বউ এতো রে’গে আছে কেন? মনে হচ্ছে আমাকে খেয়ে ফেলবে! তোমার বউয়ের সাথে তো কিছু করিনি…”
পঙ্কজ বাক্য শেষ করার আগেই ইফান হাত তুলতে যাবে তক্ষুনি পঙ্কজ হেলে দাঁড়িয়ে ঝটপট বলে উঠল,“তোমার কথা ভেবে। তুমি বলেছিলে তোমার বউয়ের দিকে নজর না দিতে। আমি তোমার কথা শুনেছি। এই প্রথমবার তোমার জন্য আমার শিকার হাতের নাগালে পেয়েও ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু তোমার শা’লিকে শিকার করা যাবে না, সেই কথা তো আমাদের মধ্যে হয় নি!”
ইফানের রাগ ক্রমশ নিজের কন্ট্রোলের বাইরে চলে যাচ্ছে। পঙ্কজ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ফের বলে উঠল,“তুমি না করলে এবারও শিকার ছেড়ে দিতাম। কিন্তু তুমি তো কিছুই বলনি। ইশশ আগে যদি জানতাম তোমার এত বিউটিফুল শা’লি আছে তাহলে…”
বাক্য সম্পূর্ণ না করেই ঢোক গিলল পঙ্কজ। থেমে বলে উঠল,“অনেক জুসি জিনিস মাই…”
–“পালা।”
ইফানের থেকে ভেসে আসল শীতল কণ্ঠস্বর। পঙ্কজ ইফানের থেকে এহেন কথা প্রত্যাশা করে নি। খানিকটা ভরকে গেল। সে ঠোঁটে হাসি রেখে শুধাল,
–“আর ইয়্যু শিউর ব্রো?”
–“রান।”
ফের ইফানের শীতল গলা ভেসে আসল। না চাইতেও চাঁদ হাতে পাওয়ায় খুশিতে নেচে উঠল পঙ্কজের মন। খুশি মুখে বলে উঠল,
–“ওকে ওকে। থ্যাংক ইউ সো মাচ ব্রো। লাভ ইউ, উম্মা!”
ঠোঁট গোল করে ইফানকে চুমু দেখিয়ে পঙ্কজ দ্রুত পায়ে বেসমেন্ট থেকে চলে যেতে লাগল। হঠাৎই অত্যধিক আলো চোখেমুখে আচড়ে পড়ল পঙ্কজের। পা তৎক্ষনাৎ থেমে গেল তার। উচ্চস্বরে গাড়ির হর্ণের আওয়াজ শুনে চোখ তুলতেই দেখে একটা কালো গাড়ি ধেয়ে আসছে। ভেতরে বসে আছে গ্যাংস্টার মাহিন চৌধুরী। তার ক্রুদ্ধ নয়ন জোড়ার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু পঙ্কজ। পঙ্কজ পিছু পা হাঁটল। চেহারায় আতং’কের ছাপ ভেসে উঠল সহসা। অস্বাভাবিক ভাবে কপাল বেয়ে ঘাম ছুটছে। পঙ্কজ পিছন ফিরে পালাতে যাবে তক্ষুনি আরেকটি গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠল। ড্রাইভিং সিটে বসে আছি আমি। আমার পাশে আয়েশ ভঙ্গিমায় সিগারেট ফুঁকছে ইফান। ইফানের ভঙ্গিমা এমন, যেন তাঁর সামনে কি হচ্ছে না হচ্ছে তাতে তার কিছু আসে যায় না।
পঙ্কজ দিশেহারা হয়ে পড়ল। পালানোর জন্য পুনরায় সামনের দিকে ঘুরতে না ঘুরতেই মাহিনের গাড়ি সজোরে ধাক্কা মা’রল। পঙ্কজ ছিটকে গিয়ে অনেকটা দূরে পড়ল। তাঁর চিৎকারে কেঁপে উঠল পুরো বেজমেন্ট। পঙ্কজ আহত হয়ে র’ক্ত ঝরছে তার মাথা দিয়ে। কোনো মতে সে দাঁড়াতেই আমি স্পিডে তার উপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে বেজমেন্ট থেকে বেরিয়ে পড়লাম। পুনরায় পঙ্কজের চিৎকারে পুরো বেজমেন্ট কম্পিত হলো৷ দেয়ালে আ’ঘাত পেয়ে বেশ কয়েকবার প্রতিধ্বনিত হলো। আশেপাশে র’ক্ত ছিটকে পড়ল। তারপর আর চিৎকার করার ফুরসতটুকু পেল না পঙ্কজ। দেহ নেতিয়ে গেছে, গলা কা’টা মুরগির মতো গোঙাতে গোঙাতে শুধু কম্পিত হচ্ছে তাঁর দেহ। অতঃপর পুনরায় নিজের সকল আ’ক্রোশ নিয়ে পঙ্কজের দেহের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে গেল মাহিন। এতক্ষণে পঙ্কজের প্রাণ পাখি দেহ থেকে উড়াল দিল। উপস্থিত গাড়িগুলোও একের পর এক পঙ্কজের থেঁ’তলে যাওয়া ভাংচুর দেহের উপর দিয়ে চলে গেল। ফ্লোরের সাথে মিশে গেল তার দেহ। অতঃপর পুরো বেজমেন্ট নৈঃশব্দে ছেয়ে গেল। অন্ধকারে মেঝের সাথে মিশে রইল পঙ্কজের বি’ধস্ত দেহাবশেষ।
আমাকে কোলে বসিয়ে নিজে ড্রাইভিং করছে ইফান। আমি ক্লান্ত হয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরে চোখ দুটো বুঁজেছি। মধ্যরাত, নিস্তব্ধ রাস্তা। হাওয়ার বেগের সাথে তাল মিলিয়ে ইফানের মার্সিডিজটি হাইওয়েতে উঠেতেই গাড়ির গতি আরও বাড়ল। সমান তালে তাল মিলিয়ে আমাদের গাড়ির পাশেই মীরা বাইক নিয়ে ছুটছে এবং পিছনে ইফানের গার্ডদের বিশ থেকে পঁচিশটির মতো গাড়ি বসকে অনুসরণ করছে।
হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে সিআইডি টিমের গাড়ি। ভেতরে সকলেই উপস্থিত। তাঁরা হা করে তাকিয়ে দেখছে ছুটতে থাকা এতগুলো গাড়িকে। অফিসার কবির অতর্কিত হয়ে বলে উঠল,
–“স্যার আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি!”
জিতু ভাইয়ার স্থির দৃষ্টি হাইওয়ের চলন্ত গাড়িগুলোতে। মূহুর্তেই সকলের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল সারিবদ্ধ গাড়িগুলো। কিন্তু জিতু ভাইয়া দৃষ্টি সরাল না। তাঁর এই বিষন্ন চেহারা দেখে হিমনের মন কেঁদে উঠল। তাদের বস সবসময় স্টেট কাট মানুষ। নিয়মনীতিতে বরাবরই কঠোর। কিন্তু আজ সেই গম্ভীর মানুষটার চেহারায় অসহায়ত্বের ছাপ। কবির বসের উদাসীনতা দেখে নিজে থেকেই বলে উঠল,
–“স্যার গাড়িগুলোর টায়ারে লাল র’ক্তের মতো কিছু একটা দেখেছি।”
হিমন আশ্চর্য হলো। সে এই বিষয় খেয়াল করে নি। জিতু ভাইয়ার মধ্যে সারা শব্দ কিংবা কোনো ভাবান্তর নেই। কবির বলে উঠল,“স্যার ঐ মাফিয়া কিছু করে ফেলল না তো পঙ্কজের?”
জিতু ভাইয়া হিমশীতল কণ্ঠে বলে উঠল,“এসআই রাকিবকে কল করে বলে দাও দ্রুত এখানে চলে আসতে৷ আর দুজন মিলে দিনের আলো ফুটার আগেই সঠিক সব প্রমাণ লোপাট করে দিবে। কি হলো, কেন হলো, কিছু যে হয়েছে তাঁর যেন কোনো অস্তিত্ব না থাকে। কেউ যেন ঘুনাক্ষরেও কিচ্ছু জানতে না পারে। আপাতত তুমি আর রাকিব সব সামলাও, পরে আমি লা’শ গুম করার ব্যস্থা করছি।”
–“স্যার!”
অবিশ্বাস্য কণ্ঠে কবির আওড়ালো৷ জিতু ভাইয়া ব্যথাতুর হেসে বলল,“সব জায়গায় নীতি খাটে না অফিসার কবির। আমরা আইনের লোক, বাস্তবতা ভালো করেই জানি… হিমন সিটি হসপিটালের দিকে গাড়ি ঘুরাও।”
সিটি হসপিটাল। ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে রাত সাড়ে তিনটায় এসে থেমেছে। কেবিনের দরজার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে অরনা, কণা এবং ফরেনসিক ডক্টর সুমি। তাদের চেহারায় বিষাদের ছায়া। সকলের ব্যথাতুর চাহনি কেবিনের ভেতর। চড়ুই পাখির মতো চঞ্চল মেয়েটা আজ এই বি’ধস্ত অবস্থায় হাসপাতাল বেডে নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে আছে। বেডের সাথেই টোল নিয়ে বসে আসে আবির। গুমরে কাঁদতে কাঁদতে চোখ দু’টো লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। জুইয়ের চেহারার পানে তাকাতেই বুক কেঁপে উঠছে আবিরের। জুইয়ের মুখের গভীর আঁ’চড়গুলোতে অন-টাইম লাগানো। মুখে অক্সিজেন মাস্ক। হাতে ক্যানুলা, এখনো সেলাইন চলছে।
আবির জুইয়ের চেহারার পানে অনেকটা সময় তাকিয়ে রইল। কেবিনের ভেতর বিরাজ করল নৈঃশব্দ। অতঃপর কাঁপা কাঁপা হাতে জুইয়ের ছোট্ট হাতখানা নিজের দু’হাতের মধ্যে নিয়ে মাথা ঠেকাল আবির। তারপর সকল নৈঃশব্দ ভেদ করে সারা রুমে ভেসে বেড়াল আবিরের ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ। আবির তরল গলায় বলতে লাগল,
–“তোমার মনে আছে জুই ফুল, আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ এর কথা? তখন তুমি উমম, এই ক্লাস ফোর কি ফাইবে পড়। তখন আমি সবে সিআইডিতে জয়েন করেছি। একটা দরকারী কাজে আমাকে টিম লিডার জিতু স্যারের বাড়িতে আসতে হয়েছিল। আমি বাইক চালিয়ে আসছিলাম, হঠাৎ আমার মাথায় শক্ত কিছু একটা পড়ে। এক মূহুর্তের জন্য মাথাটা ঘুরে উঠে। আমি তৎক্ষনাৎ গাড়ি থামিয়ে দেই। নিচে তাকাতেই দেখি একটা বড় সাইজের জাম্বুরা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। চোখ তুলতেই দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা বাচ্চা ছেলে-মেয়ে দৌড়ে পালাল। কপাল কুঁচকে আসে আমার। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে উপরে তাকাতেই দেখি বাদরের মতো গাছের ডালে ঝুলে আছে একটা শর্টপ্যান্ট আর একটা ঢিলেঢালা বড়দের গঞ্জি পরহিত পিচ্চি মেয়ে। আঁতকে উঠেছিলাম আমি। সহসা গাড়ি থেকে নেমে উচ্চ স্বরে চেঁচাতে আরম্ভ করলাম,
“এই মেয়ে এই পড়ে যাবে তো!”
মেয়েটা তৎক্ষনাৎ ছ্যাৎ করে উঠল। চাপা স্বরে হুমকি দিয়ে বলল,“এই বেঠা এই চুপ চুপ।”
কিন্তু আমি চুপ হলাম না। বরং আরও উচ্চ স্বরে বলে উঠলাম,“এই পিচ্চি, গাছ থেকে পড়ে হাত পা ভাঙবে। আর এক্ষুনি তো দিয়েছিলে আমার মাথা ফাটিয়ে।”
পুনরায় রে’গে গেল মেয়েটা। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠল,“ঐ বেঠা পিচ্চি বলবেন না। এক্কেবারে মে’রে নাক ফাটিয়ে দিব।”
আমি অবাক হলাম মেয়েটির এই দুঃসাহস দেখে। তবে কিছু বলে উঠতে পারলাম না। তার আগেই একজন মহিলার কণ্ঠে কানে আসে,“ঐ কোনডারে গাছে উঠছস? খাড়া হাচুনটা লয়া আইতাছি।”
আঁতকে উঠল মেয়েটি। তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তখন আমি ধরে নামতে সাহায্য করলাম। মেয়েটা নামতেই ঝাঁকড়া চুলগুলো তার চোখমুখ ডেকে দিল। মেয়েটা এসবে পরোয়া না করে জাম্বুরা হাতে তুলে পালাতে যাবে তক্ষুনি আমি হাত ধরে ফেললাম। ইতোমধ্যে হৈচৈ করে কয়েকজন উপস্থিত হলো। একজন বয়স্ক মহিলাও হাতে ঝাঁটা নিয়ে উপস্থিত হলো। তিনি গর্জে উঠলেন,
“চোর আজকা ধইরালছি।”
মহিলাটি এগিয়ে আসতেই বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন,“এই তুই শেখ বাড়ির ব্রিটিশ মাইয়াডা না। দেখছ নি হগ্গলে, ঐদিন বিছার লয়া গেছিলাম দেইখা শেখ বারির মেজো মাইয়াটার কি চোপা কি চোপা! আজকে তো হাতে নাতে ধরে ফালাইছি।”
আমি বাচ্চা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম ভয়ে জড়সড় হয়ে গেছে। মহিলাটা ধরতে নিলেই চেচিয়ে উঠল, “ও নানি গো আমি কিছু করসি না। আমি রাস্তা দিয়া যাইতেছিলাম। পরে দেহি এই বেডা জাম্বুরা পাইড়া গাড়িত তুলতাছে। আমি চিক্কুর দিছি বইলা আমারে মা’রার লাইগা হাত ধইরা লাইছে। এই দেখ।”
সকলে তাকিয়ে দেখল সত্যিই আমি তোমার হাত ধরে আছি। মহিলাটি আমার দিকে তেড়ে আসতে নিলে আমি তোমার উপর দোষ চাপিয়ে দিলাম। কারণ তোমার হাতে জাম্বুরা। তারপর শুরু হলো আমাদের তর্কাতর্কি। আমি শুধু অবাক হচ্ছিলাম একটা বাচ্চা মেয়ে এতো চালাক হয় কি করে। অবশেষে সকলে আমাদের দুই জনকেই চোর বানিয়ে দিল। আমাদের দিকে এগিয়ে আসলেই দুজন পালালাম। অতঃপর শেখ বাড়ির সামনে এসে হাঁপাতে লাগলাম। আমি সোজা হয়ে দাঁড়ানোর আগেই তুমি আমার পশ্চাতে থাপ্পড় মেরে দৌড়ে পালাতে লাগলে। মাঝ পথে থেমে পিছনে আমার দিকে তাকিয়ে কারাতে দেখিয়ে মুখ ভেঙচি দিয়ে পুনরায় চলে গেলে। তোমাকে দেখতে একদম পিচ্চি মাস্তান লাগছিল। আমি হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেদিন আমার তোমার প্রতি অনেক রা’গও হয়েছিল বটে। কিন্তু আজ এসকল কথা মনে করলেই আনমনে হাসি। মূলত সেই ঘটনা জন্যই তুমি সেদিন থেকেই আমাকে অপছন্দ কর। আর তোমাকে বিরক্ত করতে আমার অনেক ভালো লাগে। তাই তো পিচ্চি বলে রা’গাই।”
এই পর্যায়ে থামল আবির। আনমনে ছেলেটার ঠোঁটে সুখের হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সেই হাসি মিলিয়ে চোখ দুটো ঝলঝল করে উঠল। মাথা উপরে তুলল আবির। ধরে রাখা জুইয়ের হাতে চুমু খেয়ে ভেজা কণ্ঠে পুনরায় বলতে লাগল,
–“জানো জুই ফুল, তোমাকে বিরক্ত করতে করতে এক সময় এক বাচ্চা মেয়ের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম আমি। আমার মা ছাড়া দুনিয়ায় কেউ নেই। গার্মেন্টসে কাজ করে একা আমার মা আমাকে মানুষ করেছে। আমি যখন চাকরি পেলাম তখন আমার মা নতুন করে বাঁচতে শিখেছে। তিনি যখন আমাকে বিয়ের কথা বলে চাপ দিত, তখন আমি তোমার কথা বলে দেই। একেই তো তুমি এক বাচ্চা মেয়ে, তার উপর বড় ঘরের মেয়ে। আম্মা সেদিন আমাকে বলেছিল,“এত বড় ঘরের মেয়েকে কি আর আমাদের মতো গরিব ঘরে দিবে?”
আমি মাথা নিচু করে ফেলেছিলাম। আম্মা আমার মাথায় হাত দিয়ে বলে উঠেন,“যেমন মেয়ে পছন্দ করলা আব্বা তেমন তো যোগ্যতা লাগব।”
এর পর থেকে আমি কঠোর পরিশ্রম করতে লাগলাম। আমি খুব হিসাব করে চলতাম। আমার আম্মাও নিজের হাত খরচ থেকে টাকা জমাতে লাগলেন। ধীরে ধীরে আমার বাড়ি গাড়ি হলো। তুমি জান জুই ফুল, আম্মা না তোমার জন্য টাকা জমিয়ে অনেক কিছু করেছে। নিজের হাতে তোমার জন্য গয়না বানিয়ে রেখেছে। তোমার জন্য আলমারি ভর্তি শাড়ি কিনে তুলে রেখেছে। তোমাকে বড় ঘরে তুলবে বলে আমাকে দিয়ে নিজে পছন্দ করে আলাদা একটা ফ্ল্যাট কিনিয়েছে। বেলকনিতে উনার বউমাকে বসিয়ে মাথায় তেল দিয়ে দিবে বলে সুন্দর করে দুটো টোল পেতে রেখেছে। তুমি কি কি পছন্দ কর আমার থেকে জেনে সব করে রেখেছে। আমার আম্মা এখন বয়সের ভারে ভেঙে পড়েছে। প্রতিদিন আমি বাসায় গিয়ে দেখি ছেলের বউয়ের জন্য নিজ হাতে গড়া জিনিসগুলোর যত্ন নিচ্ছেন। সেই সাথে জিনিসের পরিমাণও বাড়ছে। তিনি তোমার অপেক্ষায় আছেন, কবে তুমি আমার বউ হয়ে ঘরে উঠবে।”
বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যায় আবির। কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ঢোক গিলে। অতঃপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠে,“আমি তোমায় অনেক ভালোবাসি জুই ফুল। অনেক ভালোবাসি। আর আমার ভালোবাসা দিয়ে তোমার সব কষ্ট ভুলিয়ে দিব।
কিচ্ছু হয়নি তোমার। ফুল মাত্রই তো ঝরে পড়া। তুমিও তো আমার ফুল। একবার না হয় ঝরে গেলে। আবার নতুন রুপে, নতুন প্রাণে ফুটবে তুমি। আমার বাগিচায় ফুটবে। কথা দিচ্ছি, এবার আমার ফুলকে আমি আর ঝরতে দিব না। মালি হয়ে সারাজীবন তোমার যত্ন নিয়ে আগলে রাখব।….”
আবিরের কথাগুলো শুনে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন মানবীর চোখ দুটো ঝলঝল করতে লাগল। কণার তো চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরেই পড়ল। সত্যিই কি সব ঠিক হবে? হয় তো ক্ষত সেড়ে যাবে। কিন্তু মনের ক্ষত? জুইয়ের সেই ক্ষত কি সাড়বে? হয়তো-বা না।
–“কি অবস্থা বোনুর?”
অরনারা পিছনে ফিরতেই জিতু ভাইয়াকে দেখতে পেল। পিছন থেকে ফরেনসিক ডক্টর আব্দুল কালামের গলা ভেসে এলো,
–“এসেছ তোমরা?”
আমি শুনেও সেদিকে তাকালাম না। ইফানকে চেয়ারে বসিয়ে ওর প্যান্ট উপরে তুলতেই দেখলাম পায়ের ক্ষত পুনরায় তাজা হয়েছে। বেন্ডেজটি লালছে হয়ে গেছে। আবদুল কালামের নজর তৎক্ষনাৎ সেখানে আটকাল। দ্রুত এসে শুধালেন,
–“এখানে ইনজুরি কিভাবে হলো?”
আহত মানুষটির দিকে তাকাতেই চোখ প্রসারিত হয়ে গেল কালামের। আশ্চর্য হয়ে জিতু ভাইয়ার দিকে তাকালেন। জিতু ভাইয়ার মধ্যে কোনো হেলদোল নেই। কালাম শুকনো কেশে একজন নার্সকে ডেকে বললেন বেন্ডেজ করে দিতে। এতক্ষণে ইফান আমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে কালামের দিকে বিরক্ত মিশ্রিত চেহারায় তাকিয়ে বলে উঠল,
–“নো নিড।”
ইনান নিজ দায়িত্বে পুনরায় বেন্ডেজ করে দিতে লাগল। আমি ইফানের পাশের সিটে বসে পড়লাম। আমার সাহস হচ্ছে না জুইয়ের কেবিনে ঢোকার। এমনকি জিতু ভাইয়াও একই জায়গায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। শুধু ব্যথাতুর দৃষ্টি কেবিনে। ডক্টর আব্দুল কালাম শুকনো কেশে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলেন। জিতু ভাইয়া তাকাতেই ইতস্তত হয়ে বললেন,
–“একটা খবর আছে।”
পাশ থেকে মীরা জিজ্ঞেস করল,“হোয়াট্স নিউজ?”
কালাম বলতে কিছুটা সংকোচ বোধ করছেন৷ এতক্ষণে আসল খবর কানে না আসায় আমি দৃষ্টি ঘুরিয়ে সেদিকে তাকালাম। কালাম সুমিকে বলে উঠলেন,
–“সুমি বলে দাও।”
অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল সুমি। অন্য সময় তাদের দু’জনকে কখনোই এমন আচরণ করতে দেখা যায় না। বিশেষ করে ডক্টর কালামকে। উনি ভীষণ কঠোর মানুষ, একদম জিতু ভাইয়ার মতো। সুমি নিজেকে প্রস্তুত করে বলে উঠল,
–“স্যার জুইয়ের মেডিকেল টেস্ট হয়েছে। এবং রিপোর্টও হাতে পেয়ে গেছি।”
জিতু ভাইয়া শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ডক্টর সুমি ফের বলে উঠল….
চলবে,,,,,
সবাই রেসস্পন্স করবেন প্লিজ। বেশি বেশি কমেন্ট করে দিয়েন। আইডির রিচ নেই একদম। পোস্ট সকলের সামনে পৌঁছায় না।🥲
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা গল্পের লিংক
-
জাহানারা পর্ব ৫৫+৫৬
-
জাহানারা পর্ব ৩৯+৪০
-
জাহানারা পর্ব ৬৯
-
জাহানারা পর্ব ৮০
-
জাহানারা পর্ব ৪৭
-
জাহানারা পর্ব ৪১+৪২
-
জাহানারা পর্ব ৯
-
জাহানারা পর্ব ৬১+৬২
-
জাহানারা পর্ব ২৫+২৬