জলতরঙ্গেরপ্রেম
পর্ব সংখ্যা;১৬
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
–” কালো হওয়া কি পাপ আল্লাহ্? পাপ ই বোধ হয়। না হয় আমার কপালে এতো কষ্ট থাকতো না। পঁচিশ বছর হওয়ার পর ও অবিবাহিত বলে কথা শুনতে হতো না। এই সমাজের মানুষের কাছে বাহ্যিক রূপ ই সব। শুধু শুধু মানুষ মিথ্যে বলে। মন সুন্দর হলেই এই পৃথিবীতে ভালো থাকা যায় না। আপনি তো অন্তরজামী আল্লাহ্। আমাকে ক্ষমা করবেন। এই জীবন আমি আর রাখতে পারবো না। আত্মহত্যা মহাপাপ জেনে ও সেই পাপের সারথি হচ্ছি।”
কথা শেষ হতেই পাশের কলসি টা হাতের কাছে এনে রশির সাথে বেঁধে নিলো তরী। শক্ত করে শেষ গিঁট টা দিয়ে চোখ বন্ধ করলো সে। মূহুর্তে তিন্নির বাচ্চা মুখটা ভেসে উঠলো তার অক্ষিপল্লবে। গুলুমুলু, গোলগাল গাল দুটো। দেখলেই চুমু খেতে ইচ্ছে করে। পর পর আরো একটি প্রতিচ্ছবি ভাসলো সেখানে। তরী চোখ খুলে ফেললো। ভাবনা রেখে, কলসিটা পুকুরে ডুবিয়ে ধরলো। মিনিট না যেতেই কলসি ভর্তি হয়ে গেলো। হঠাৎ তার মনোযোগ ক্ষুণ্ণ হলো তরঙ্গের চিন্তিত কন্ঠের ডাকে।
–” তরী এই তরী? তরকারি জান, কই তুমি সোনা বউ?”
তরী ঘুরে পেছনে তাকালো। আশে পাশেই ছেলেটা আছে? সে দেখে ফেললে তো সব শেষ। এতোটা সাহস সঞ্চার করে ও সব চেষ্টা বিফলে যাবে। তড়িঘড়ি করে হাত চালালো তরী। রশিটা গলায় বেঁ*ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো পুকুরে। ততক্ষণে পুকুর ঘাটের ঢালাই করে বসার ব্যবস্থা করা সিঁড়ি গুলোর কাছে এসে তরঙ্গ দাঁড়িয়েছে। ঝাপসা অন্ধকারে এক নারী অবয়ব কে পুকুরে ঝাঁপ দিতে দেখে শরীর হিম হয়ে এলো তরঙ্গের। প্রতিটা লোম দাঁড়িয়ে পড়লো অজানা আতঙ্কে। মিনিটের মতো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সে। পর মুহূর্তে তরীর হাত – পা ছোড়াছুড়ি করতে দেখে দ্রুত লাফিয়ে শেষ সিঁড়ির আগের সিঁড়িতে এসে; পুকুরে ঝাঁপ দিলো সে। তরীকে ধরতেই তরঙ্গ ও ডুবে যেতে নিলো কলসির ভারে। পানি ভর্তি কলসিটা দু’জনকে নিচের দিকে টানতে শুরু করলো। তরঙ্গের হাতের বাঁধনে নিজেকে আবিষ্কার করতেই অবাক কন্ঠে তরী বললো;-
–” আ…আপনি এসেছেন কেন?”
তরীর এমন প্রশ্নে তরঙ্গের মেজাজ চড়ে বসলো। এক হাতে তরীর কোমর জড়িয়ে, অপর হাতে ভারসাম্য রক্ষা করলো।
–” আজব তো, আজ আমাদের বিয়ের প্রথম রাত। তাই বাসর সারতে এসেছি।”
ডুবতে ডুবতে শেষ ভরসা হিসেবে; তরঙ্গের পিঠ আগলে ধরলো তরী। উপরের দিকে মুখ তুলে শ্বাস টানলো সে। ইতিমধ্যে নাকে – মুখে পানি ঢুকে গেছে।
–” মানে?”
–” মানে আবার কি? বিয়ে হয়েছে তোর সাথে। বাসর কি রাকিবের সাথে সারতে যাবো? তুই যেহেতু বিয়ে করেই পুকুরে নেমে পড়েছিস। তাই আমি ও এসে পড়লাম। আর যাই বলিস, আমার সাথে থেকে থেকে ভালো বুদ্ধি হয়েছে তোর। ভবিষ্যতে আরো হবে। আমাদের বাচ্চা গুলো নিউটন কে ছাড়িয়ে যাবে।”
শ্বাস নিতে থামলো তরঙ্গ,
–” তো যা বলছিলাম। আমি যেহেতু ইউনিক, তাই আমার বাসর ও ইউনিক হওয়া উচিত। কেউ আজ পর্যন্ত পুকুরে বাসর করেনি। তুই আর আমিই প্রথম কাপল হবো। যারা পুকুরে ফার্স্ট নাইট স্টে করবে।”
হাবুডুবু খেতে খেতে তরীকে বুকে জড়িয়ে সিঁড়িতে উঠে এলো তরঙ্গ। তরী শরীর ছেড়ে দিয়েছে। তরঙ্গ তার হাঁটুর উপর তরীর মাথা রেখে গালের দু’পাশে ঘষতেই ধীরে ধীরে চেতনা ফিরলো তার। তরঙ্গের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে সোজা হয়ে বসলো সে। দু’হাতে চুলের পানি ঝেরে প্যান্ট উপরের দিকে টেনে নিলো সে।
–” আমাকে বাঁচালেন কেন?”
–” আম্মু আর চাচির কথায় মন খারাপ করেছিস? এই জন্যই আত্মহত্যা করতে এসেছিস? অথচ আমার কথা ন্যানো সেকেন্ডের জন্য ও ভাবলি না? এই তরঙ্গ কীভাবে বেঁচে থাকবে তোকে ছাড়া?”
মলিন হাসার চেষ্টা করলো তরঙ্গ। তার চোখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে।
–” অন্তত টেমার কথা ভাবতি তুই! তুই কেবল ওনাদের কথা গুলোই বড় করে দেখলি। যে তোর ভালো চায় না। তুই কেন তার কটু কথায় মন খারাপ করবি। সে কি তোর এই মন খারাপের খবর রাখছে? বরং , তোর কষ্টে বুক ফুলিয়ে হাসছে।”
নাক টানলো তরী।
–” এতো কটু কথা শোনার চেয়ে মৃত্যু ভালো তরঙ্গ। আপনি বুঝবেন না।”
–” আমি বুঝবো না? তোকে যখন কেউ কটু কথা বলে। আমার এখানে কষ্ট হয় তরী জান। ইচ্ছে করে তাকে খুন করি। কিন্তু কিছুই করতে পারি না। তাতে যদি তুই পুরোপুরি আমার থেকে দূরে চলে যাস। তখন আমি কি নিয়ে বাঁচবো?”
–” আপনার এই ভালোবাসা ই আমার জীবনে কাল হয়েছে তরঙ্গ। আপনি আমাকে না ভালোবাসলে আজ আমাকে এই দিন দেখতে হতো না।”
তরীর মিইয়ে আসা কথা গুলো ছুটে এসে তীরের মতো বিঁধলো তরঙ্গের বুকে। কান্নারা গলা চেপে ধরলো তার। কিন্তু পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই বলে। অশ্রুরা চোখ ফুঁড়ে বেরোতে পারলো না। আহত চোখে চাঁদের আলোয়, তাকিয়ে রইলো তরীর পানে।
–” এখন তুই কি চাইছিস?”
–” আমাকে মুক্তি দিন।”
–” সম্ভব না।”
–” তবে মরতে দিন।”
–” অন্য কিছু বল। এই দুটোর একটা ও সম্ভব না।”
নিজের ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারলো না তরী। অসহ্য হয়ে এলোমেলো হাতে তরঙ্গের বুকে থাপ্পড় – কিল বসাতে লাগলো। তরঙ্গ বারণ করলো না। নিজে এগিয়ে এসে তরী কে জড়িয়ে ধরলো প্রশস্ত বক্ষ বিভাজনে। তরী কপালের ভেজা চুল গুলো আরেক হাতে সরিয়ে কপালে চুমু খেলো সে।
–” তোর বয়স কিংবা গায়ের রঙ নিয়ে আমার কোনো আপসোস নেই তরী জান। তুই মানুষটাই আমার জন্য আর্শীবাদ সরূপ। যাকে দেখলেই আমার হৃদয়ে শান্তি শান্তি অনুভব হয়। সেখানে তোর গায়ের রঙ কালো হোক, বা চেহারা ঝলসে যাক। তাতে কি আমার ভালোবাসা তো তোর গায়ের রঙ দেখে তোকে হৃদয়ের রাণী করেনি।”
তরী নাক টানলো। সে তরঙ্গকে ধরেনি, তবে চুপ করে তার বুকে মাথা রেখে কথা গুলো শুনছে। কোনো কথা বলল না, শুধু শুনে গেল। তার মনে হলো, মায়ের পর আর কেউ তাকে এভাবে বুঝতে চায়নি। এত শান্ত ভাবে, এত কোমল ভাবে কেউ তার সাথে কথা বলেনি এতদিন সে যা পেয়েছে, তা শুধু লাঞ্ছনা আর অপমানই। তরীকে বুকে আগলে রাখার সময় বাড়ার সাথে সাথে। তরঙ্গের হৃদস্পন্দন অবাধ্য ভাবে ছুটতে শুরু করলো। ভেজা কাপড়ে ও তার গরম লাগতে শুরু করলো।
এই প্রথম তাদের এতোটা কাছে আসা। তরী অনুভূতি শূন্য থাকায় তার কাছে এটা বিশেষ কিছু নয়। কিন্তু তরঙ্গ তো হুঁশে আছে। তার জন্য আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার সমতুল্য এই সামান্য জড়িয়ে ধরাটা।
*****
নিজের জন্য বরাদ্দ করা ঘরটাতে নিজের সঙ্গে তরীকে ও নিয়ে এসেছে তরঙ্গ।
সে আর রিস্ক নিতে চাচ্ছে না তরীকে নিয়ে। বিয়ের পর দশ মিনিটের জন্য কাজিকে দিয়ে আসতে গিয়ে; আজ আর একটু হলে তরীকে হারিয়ে ফেলতো সে। তরীর কিছু হলে তার আর তিন্নির ই সব হারাবে। তাই মেয়েটাকে চোখে চোখে রাখার জন্য জোর করে নিয়ে এসেছে। রুমার দরজায় নক করতেই মেয়েটা দরজা খুলে দিলো। বড় ভাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রুমা হাসার চেষ্টা করলো।
–” কিছু লাগবে ভাইয়া?”
–” তরীর ব্যাগটা আর প্রয়োজনীয় যা যা আছে সব দে তো।”
ভাইয়ের কথার মানে বুঝলো না রুমা। সে হা করে তাকিয়ে রইলো।
–” আপু তো আমার সাথে ঘুমাবে। তাহলে জিনিসপত্র নিয়ে যাবে কেনো?”
–” ও আমার ঘরে থাকবে আজ।”
–” আচ্ছা, দাঁড়াও তুমি।”
কথা শেষ করে ঘরের ভেতরে চলে গেলো রুমা। তরীর সব জিনিস ব্যাগে ভরে তরঙ্গের হাতে তুলে দিলো। ঘরে ফিরে তরঙ্গ দেখলো তরী রুমে নেই। বারান্দার দরজায় উঁকি দিতেই দেখতে পেলো তাকে। ভেজা শরীরে আকাশের পানে চেয়ে তরী দাঁড়িয়ে। তরঙ্গ ডাকলো;-
–” তোর পোশাক এনেছি। পাল্টে আয়, ঠান্ডা লেগে যাবে।”
নির্জীব চোখে পেছনে দাঁড়ানো পুরুষটির দিকে তাকালো তরী। এক রাতেই তরঙ্গ কে কেমন দায়িত্ববান পুরুষ মনে হচ্ছে। তাতে অবশ্য তার কিছুই না। তরঙ্গ ব্যাগ খুলে তরীর পোশাক বের করলো। সেলোয়ার – কামিজ বের করে কিছুক্ষণ ভাবলো তরঙ্গ। চট করে নিজের ব্যাগটা তুলে নিলো সে। ব্যাগ হাতড়ে দুটো শপিং ব্যাগ বের করলো। এই শাড়ি গুলো ওইদিন সে এনেছিলো। কিন্তু তরী নিজের ব্যাগে নেয়নি। তা দেখে তরঙ্গ ই নিয়েছিলো। শপিং ব্যাগ থেকে শাড়ি গুলো বের করলো তরঙ্গ।
এখানে তিনটে শাড়ি আছে। একটা সরিষা রঙের, হলুদের সন্ধ্যার জন্য কিনেছিলো। অপরটা লাল বিয়ের দিনের জন্য। আর শেষটা হালকা গোলাপির মিশ্রণে রিসিপশনের জন্য। শাড়ি গুলো সুতির না, তবে রাতে পরে ঘুমানো যাবে। দু’কাপড় সে রেডিমেট কিনে এনেছিলো। তরী এসে দাঁড়িয়েছে তরঙ্গের থেকে দূরে। লাল রঙের শাড়িটা হাতে তুলে। তরঙ্গ অপ্রস্তুত কন্ঠে বললো;-
–” এই শাড়ি টা পরবি তরী জান? যদি তোর ইচ্ছে হয়। চাপ নেই।”
চলবে
( রি-চেক দেইনি। কোথাও ভুল হলে বলবেন। আর পর্ব ছোটো ছোটো বলে চিৎকার করিয়েন না। হাতের ফোস্কা নিয়ে এতোটাই লিখতে পেরেছি। নিজের হাতে খেতে ও পারছি না। আম্মু, আপু খাইয়ে দিচ্ছেন। এর পর ও গল্প পড়ে মন্তব্য না জানালে। আপনাদের আমার কিছুই বলার থাকবে না।)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১০
-
She is my Obsession পর্ব ৩০
-
She is my Obsession পর্ব ১৬
-
She is my Obsession পর্ব ২০
-
She is my Obsession পর্ব ১১
-
She is my Obsession পর্ব ৪
-
She is my Obsession পর্ব ২৬
-
She is my Obsession পর্ব ৯
-
She is my Obsession পর্ব ২
-
She is my Obsession পর্ব ২৩