নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
রাত তিনটা বেজে ছাব্বিশ। নাসীরদের বাড়ি এখন ঘুমন্তপুরির সমান। বসত ভরতি লোকজন। সৈয়দ পরিবারের সকলেই তো আজ রয়ে গেছেন এখানে। ঝড়-বৃষ্টি থেমেছে আনুমানিক রাত দুটোর দিকে, তাই আর তাদের ফিরে যাওয়া হয়নি। ঘুমোনোর বেলায়
ইউশার সীট পড়েছে আইরিনের কামরায়। এ নিয়ে অবশ্য আইরিনের অসুবিধে কিছু নেই। তুশির সাথে সম্পর্ক আদায়-কাচকলায় হলেও ইউশার সাথে শুরু থেকেই ভালো।
ঘরের দরজা এখন বন্ধ। কোথাও কোনো আলো নেই। বৃষ্টি না থাকলেও রাস্তায় তখনো চপচপ করছে ড্রেনের জল। বরফের মতো ঠান্ডা বাতাস বইছে বাইরে। আইরিন ঘুমোচ্ছে। সারা ঘরে ওর ভারি নিঃশ্বাসের আওয়াজ। কিন্তু ঘুম নেই ইউশার। এমন নিকষ কালো ভুতুড়ে রাতেও চুপ করে জানলার পাশে বসে আছে সে। অন্যমনস্ক, উদাস নয়ন জোড়া থাই গ্লাস ভেদ করে পড়ে আছে বাইরে।
ইউশা ভাবনায় বুঁদ। কী ভাবছিল? হয়ত ওর প্রিয় অয়ন ভাইয়ের কথাই। কিন্তু সেই ভাবনায় যে শুধুই বিষাদ। এখানে কোনো আনন্দ নেই,তৃপ্তি নেই। কেবল আর কেবল বুক ভরা বিদঘুটে বিরহ ছাড়া। দেখতে দেখতে ইউশার চোখ ফেটে গাল ছুঁয়ে একটা তপ্ত ধারা নেমে গেল গলায়। ইউশা মোছার ব্যস্ততা দেখাল না। বরং মাথা ঠেকাল বন্ধ জানলার সাথে।
জীবনের নাম যদি আফসোস হয়,
আফসোসের আরেক নাম ভালোবাসা! এখানে
সব চেয়ে আশ্চর্যরকম আফসোস হচ্ছে, কেন ভালোবাসলাম? কাকে ভালোবাসলাম? কীভাবে বাসলাম? আর এরপরের আফসোস, এখন ভুলব কী করে? আবার নিজেকে আগের মতো করব কী করে? নিজের এই ব্যর্থ প্রেমে দগ্ধ হৃদয়টাকে সাড়াব কী করে?
ইউশা মরণ শ্বাস ফেলল। আজ অয়ন যেভাবে বেরিয়ে গেল,একবারও ফিরল না, তাকাল না,কথাও বলল না,তাতেই যেন পরিষ্কার বোঝা যায় মানুষটা ওকে অবজ্ঞার যমুনায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। আর কোনোদিন ওদের সম্পর্ক আগের মতো হবে না। এর চেয়ে অয়ন ভাই এসব না জানলেই ভালো হতো! এখন ইউশা নিজের মনের রাশ টানবে কী করে? একবার ভেঙে গুড়িয়ে গেলে ওঠা যত কঠিন, পরেরবার ভেঙে গেলে উঠে আসা ততটাই অসম্ভব জীবনে। একজন আমাকে নিজের অজান্তেই ভালোবাসে না, এই কথা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু সে সব জেনেশুনেও আমাকে ভালোবাসলো না, এটা মানা তো দূর, ভাবতে গেলেও অবজ্ঞার প্রহারে শরীর ছিন্ন হয়ে যায়।
রাতের নিস্তব্ধ বাতাস ছুঁয়ে ফোনে হঠাৎ ক্রিং করে শব্দ বেজে উঠল। ইউশার ধ্যান ছুটল সহসা। তাকাল পাশ ফিরে। টেবিলে রাখা ফোনটার স্ক্রিন জ্বলছে। ওপরে ভেসে আছে ম্যাসেজ,
“ ghumoshni?”
ইউশা কিছুক্ষণ থমকে চেয়ে রইল ওই লেখার দিকে। পরপর ধড়ফড় করে হাতে তুলল ফোনটা। অয়ন ভাই ম্যাসেজ পাঠিয়েছে? অয়ন ভাই! প্রথম দফায় ওর যেন বিশ্বাসই হলো না। কেন হলো না? হয়ত এখন সম্পর্কটা এমন দোলাচল অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে বলে! ইউশা ব্যস্ত হাতে কিছু লিখে পাঠাইতে চেয়েছিল। জিজ্ঞেস করতে চাইল মানুষটার ব্যাপারে। কিন্তু হাতের আঙুল গুলো সঙ্গ দিতে নারাজ। উত্তালতায় ঠকঠক করে কাঁপছিল ওরা। ওইভাবেই কী থেকে কোথায় লেগে কল চলে গেল। ইউশা জিভ কাটে, ত্রস্ত লাইন কাটতে চেয়েও পারল না,পূর্বেই রিসিভ করল অয়ন।
ট্রেনের ঝকঝক শব্দের সঙ্গে তার শান্ত স্বর ছুটে এলো সাথে,
“ বল,ইউশা!”
ইউশা চোখ বুজে নেয়। কান থেকে নামিয়ে এনে বুকের সাথে চেপে ধরে ফোনটা। শ্বাস টানে দু পল। আবার কানে ধরে শুধায়,
“ অ-অয়ন ভাই, এখনো ট্রেনে তুমি?”
“ হ্যাঁ। সকালে পৌঁছাবো।”
ইউশা মৃদূ কণ্ঠে বলল,
“ তুমি কী করে বুঝলে আমি ঘুমোইনি?”
“ জানি না। মনে হচ্ছিল!”
ইউশার একটু সুখ লাগল এতে। অয়ন ভাই আন্দাজ করছেন ওকে নিয়ে? যাক,তাহলে অন্তত একবার হলেও ভাবছিল ওকে। জিজ্ঞেস করল,
“ কবে ফিরবে তুমি?”
“ পরশু।”
তারপর এক ছটা নীরবতা। ইউশা জিভে ঠোঁট ভেজায়। কী বলবে বুঝতে পারে না। অয়ন ভাইও তো বলছে না কিছু। শেষমেশ ডাকল আবার,
“ অয়ন ভাই।”
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো,
“ বল।”
“ তুমি কি আমার ওপর রেগে আছো?”
“ কেন?”
“ না মানে… কাল থেকে কথা বলছিলে না।”
“ বুঝতে পারছিলাম না কী বলব!”
“ সত্যি? রাগ করে থাকলে বলতে পারো।”
অয়ন হাসল বোধ হয়,বলল,
“ রাগের কী আছে? কাউকে ভালোবাসা কি অপরাধ?”
“ আমি ভেবেছি, তুমি বোধ হয় সব জানার পর…”
অয়ন কথা কেড়ে নিলো,
“ আমি অমন নই। অমন হতেও চাই না। প্রত্যেকটা মানুষের একটা মন আছে,মনের নিজস্বতা আছে। সেই মনের সিদ্ধান্ত আছে। কিন্তু এমন মন নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলোই আবার অন্যের মন বুঝতে চায় না। অন্যের বেলায় সবাই কেমন বিচারক হয়ে ওঠে। ওরা ঠিক করে দিতে চায়,আমরা কাকে ভালোবাসব,কাকে বাসব না। ওরা বলবে, প্রশ্ন তুলবে, বিচার করবে, ও কেন অমুককে ভালোবাসলো? কেন তমুককে ভালোবাসল না? আসলে এই ধরণের কথা যারা বলে, হয় ওরা কখনো ভালোবাসেনি,নাহয় ওরা ভালোবাসতেই জানে না। ভালোবাসা নিজের ইচ্ছেতে হয় না। আমি চাইলেই যেমন যে কাউকে ভালোবাসতে পারব না,তেমনই আমাকে কেউ ভালোবাসুক সেটা আটকাতেও পারব না। ভালোবাসা অনুভূতির খেলা, ব্যস হয়ে যায়! যেমন আমার হয়েছিল তুশির প্রতি, আর তোর হলো আমার প্রতি!”
ইউশার চোখ টলমল করে উঠল। অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল এই পাশে। তার কণ্ঠ ঠান্ডা, সাবলীল। অথচ যেন বিশদ বেদনা মিশে। হঠাৎ বলল,
“ ইন্সটায় আইরিনের ছবি দেখলাম। বিয়েতে তো সবার যাওয়ার কথা,তাহলে তুশি আর ভাইয়া নেই কেন?”
ইউশা জানতো এই প্রশ্নটা ও শুনবে। উত্তর দিলো বিলম্বহীন,
“ ভাইয়া ব্যস্ত ছিল! বলেছিল দেরি হবে। তুশিও ভাইয়াকে ছাড়া আসতে চায়নি বলে ওকে রেখে এসেছিলাম। কিন্তু আমরা যখন রাস্তায়, তখনই বৃষ্টি শুরু হলো। তাই বৃষ্টির মধ্যে ওরা আর আসতে পারেনি।”
“ পারেনি বলতে? তোরা কি বাড়ি ফিরিসনি?”
“ না। আমরা সবাই আইরিন আপুদের এখানে।”
অয়নের কণ্ঠ নিস্তেজ হয়ে এলো,
“ ওরা তাহলে বাড়িতে একা?”
“ হুম।”
ওপাশে আবারো থমথমে নীরবতা নামল! অয়নের মুখে ঘুটঘুটে অন্ধকারটা কী বুঝে ফেলল
ইউশা? কেমন রয়ে সয়ে শুধাল,
“ তোমার খারাপ লাগছে, অয়ন ভাই?”
“ কেন?”
“ তুশির কথা ভেবে?”
“ যদি বলি হ্যাঁ, কষ্ট পাবি না?”
“ না।”
“ কেন পাবি না?”
ইউশা কাষ্ঠ হেসে বলল,
“ একই জায়গায় বারবার ক্ষত হলে জায়গাটা পচে যায়। পচা জায়গায় কি নতুন করে রক্ত ঝড়ে বলো?”
অয়নের চোখমুখ থমকে গেল। ঢোক গিলে বলল,
“ আমি না জেনেই তোকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছিলাম?”
“ নাহ!”
“ ইউশা?”
“ হু!”
“ কেন আগে বলিসনি?”
ইউশার কণ্ঠ ধরে এলো,
“ বল-বললে কী হতো?”
“ হয়ত তোকেই ভালোবাসতাম!”
ইউশার বুকে কামড় পড়ল। ফুঁপিয়ে ওঠা কান্নার তোড় আটকাতে মুখ চেপে ধরল সে। অয়ন ঐ কান্না শুনতে পারল না। হাঁসফাঁস করে লাইন কেটে দিলো। ব্যস্ত হাতে ট্রেনের জানলা টেনে তুলল ওপরে। কিছুক্ষণ শ্বাস নিলো মুক্ত হাওয়ায়। ট্রেন যাচ্ছে কোনো জঙ্গল পেড়িয়ে। অন্ধকারে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু অয়ন কীভাবে যেন দেখছিল, ইউশা কাঁদছে। যে হাহাকারে জর্জরিত হয়ে মরে গেছে ও, তাতে এখন নতুন করে মরছে মেয়েটাও।
ভোরের আলো এখনো ফোটেনি। আযান দিয়েছে মাত্র। সব নিশ্চুপ! সার্থর ঘুমটা ছুটে গেল তখনই। চোখ মেলে চাইল ও। সোজাসুজি মাথার ওপর ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানটা দেখে একবার তাকাল চারিপাশে। একটা নিত্যনৈমিত্তিক সকাল নিয়ে তো আর অত মাথা ঘামানোর কিছু নেই। সার্থ উঠে বসতে গেল,চমকে উঠল তখনই। মেঝেতে পড়ে থাকা কাপড়গুলো দেখে চোখ গুটিয়ে গেল অল্প। চকিতে পাশ ফিরল সার্থ। তুশি মরার মতো পড়ে আছে। ফর্সা গায়ে একটা সুতা অবধি নেই। সার্থর মাথা ফাঁকা হয়ে যায়। তাড়াহুড়ো করে কম্বল দিয়ে ঢেকে দেয় ওকে। কপাল কুঁচকে চোখের পাতা ঝাপটানোর পরপরই ঠোঁট কামড়ে হাসল ছেলেটা। বুঝতে পারল, কাল কত কী ঘটে গেছে। ঘাড় ডলতে ডলতে হাসিটা বাড়ল সার্থর। হঠাৎ সতর্ক চোখে চাইল তুশির দিকে। কোনো ভাবে মেয়েটাকে জোর করেনি তো? সম্মতিতে হয়েছিল এসব?
সার্থর চিন্তা হলো। যদি জোর করে,চোরটা যা ত্যারা! ও জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে
এগিয়ে এলো একটু। তুশির কানের কাছে ঠোঁট নামিয়ে আস্তে করে ডাকল,
“ তুশিইই?”
মেয়েটা জবাব দিলো না। নড়লও না একটু। পড়ে রইল নিথরের মতো। সার্থর ভ্রুক্রুটি প্রগাঢ় হয়। বুক শুকিয়ে গেল এবার। ফার্স্ট ইন্টিমেসিতে মেয়েদের অনেক কমপ্লিকেশন হয় না? তেমন কিছু হলো কী? ও উদ্বীগ্ন হয়ে ডাকল,
“ তুশি,এই? তুশি, এই মেয়ে?”
তুশি এবারেও জবাব দেয় না। বিছানায় মিশে থাকে। সার্থর চোখমুখ বসে গেল,বিশ্রামহীন ডাকল,
“ তুশি শুনছো? এই তুশি?”
অনেকক্ষণ পর উত্তর এলো।
খুব আস্তে বলল,
“ হুউউউউ!”
“ তুমি, তুমি ঠিক আছো?”
তন্দ্রায় জবুথবু তুশি বিরক্ত হলো। চোখ বুজেই কপাল কুঁচকে চ সূচক শব্দ করে বলল,
“ আরে, ঘুমোচ্ছি আমি। এত ডাকছেন কেন?”
সার্থ নির্বোধ বনে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। ধমকে বলল,
“ ওঠো,অ্যাই চোর!”
সহসা আঁতকে চাইল তুশি।
ভড়কে বলল,
“ কী,কী হয়েছে?”
সার্থ নাক ফুলিয়ে বলল,
“ এভাবে কেউ ঘুমায়? সাড়া দিচ্ছিলে না কেন?” তুশি সঙ্গে সঙ্গে নজর সরিয়ে নিলো। মুখটা ছেঁয়ে গেল লজ্জার তোড়ে। মিনমিন করে বলল,“ রাতভর অত্যাচার করেছেন। ঘুমিয়েছি আমি?”
সার্থর গোছানো কপাল ছড়িয়ে গেল দুপাশে। দুষ্টু হেসে ভ্রু নাঁচাল,
“ আচ্ছা? কী করেছি?”
তুশি লজ্জায় তাকাতে পারছিল না। এদিক-ওদিক চেয়ে চেয়ে বলল,
“ আমি জানি না।”
“ তাহলে কে জানে?”
“ আপনি জানেন।”
“ আমার কিছু মনে নেই। কী হয়েছিল?”
“ কী হবে?”
“ কিছু হয়নি? তাহলে গায়ে এসব দাগ কীসের? দেখি!”
সার্থ চাঁদর টানতে গেলে খামচে নিজের মুঠোয় ধরে রাখল তুশি। আর্তনাদ করল মিহি স্বরে,
“ কী করছেন?”
“ তাহলে বলো, কী হয়েছিল রাতে?”
“ আপনার, আপনার জ্বর হয়েছিল।”
“ তারপর?”
“ আমি জানি না।”
তুশির ছটফটে চেহারা,অস্থির-কুণ্ঠিত চাউনি দেখে, গালের ভেতর জিভ ঠেলে হাসল মানুষটা। নিজেই বলল,
“ আমার সত্যিই কিছু মনে নেই।”
“ ভা-ভালো হয়েছে।”
“ হয়নি। প্রথম বার বউয়ের এত কাছাকাছি গিয়েছি, ভুলে যাওয়াটা কেমন না?”
তুশি অতীষ্ঠ চোখে চাইল,
“ তো এখন?”
সার্থ চোখেমুখে প্রদীপ্ত কামনা।
মাদকতায় কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“ তো এখন,আরেকবার?”
বিকট চোখে চাইল তুশি। আঁতকে মাথা নাড়ল দুপাশে।
“ না না, আমার ভালো লাগছে না। শরীরটা…”
সার্থ তো কথা শোনার মানুষ নয়, শুনলোও না। বরং ওই পাতলা চাঁদর সরিয়ে নিজের বলিষ্ঠ শরীর তুশির উষ্ণতায় গলিয়ে দিলো নিমিষে। তুরন্ত কথা থেমে গেল মেয়েটার। নিঃশ্বাস গলায় বেঁধে যাওয়ার মতো হতভম্ব চোখে চাইল তুশি। তক্ষুনি ওর নাকের ডগায় নাক ঘষল সার্থ। ঠোঁটের নরম ত্বকে দানবীয় এক কামড়ের মাঝে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ আ’ম গোয়িং টু ডিসট্রয় ইউ এগেইন, বেইব!”
এখন সকাল সাড়ে দশটা বাজে। একট লম্বা শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়েছে সার্থ। বেরিয়ে এসে দেখল পা থেকে মাথা অবধি কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে তুশি। এবার আর মেয়েটাকে বিরক্ত করতে চাইল না । ধকল একটু বেশিই গিয়েছে বোধ হয়! সার্থ
সোজা বাইরে এলো। নিচে নেমে দেখল আসমা রুটি বেলছে। মুখটা শুকনো। ও দরজায় দাঁড়াতেই তাকাল মেয়েটা। অমনি উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ ভাইজান, আপনে আইছেন?”
সার্থ কিছু থতমত খেয়ে বলল,
“ কী হয়েছে?”
“ ভাইজান,খালাম্মায় আইলেই হুজুর ডাইক্কা আইনেন। এই বাড়ির অবস্তা কিন্তু ভালা না। আমি সকালে আইয়া দেহি সারাবাড়ি থালাবাডি পইরা রইছে। আবার গোশতো বাইর করা। এইডি জ্বীনের কাম না কন? বদজ্বীনেই তো কাচা গোশতো খায়।”
সার্থ ভ্রুয়ের মাঝখানে দুই আঙুল ডলতে ডলতে বিড়বিড় করল,
“ এই মেয়ে এখন জ্বীন থেকে মুভ অন করতে পারেনি?”
তারপর একটু চুপ থেকে বলল,
“ শোনো এক কাজ করো, এক গ্লাস গরম দুধ আর দুটো ডিম সেদ্ধ আমার ঘরে দিয়ে যাও।”
ফের যেতে নিয়েও বলল,
“ না থাক, হয়ে গেলে ডেকো। আমি এসে নিয়ে যাব।”
“ আইচ্ছা। তয় ভাইজান জ্বীনের ব্যাপারডা?”
সার্থ এর উত্তর দিলো না। সিঁড়িতে উঠে গেল৷ আসমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ কতাডা গায়ে লাগাইল না। লাগাইব ক্যা? জ্বীন তো আমারেই আগে খাইব। আমারে খাইলে তাগো কী? আমি আবিয়াতো মাইয়া,আমার উপ্রেই তো নজর দিবো। হের উপ্রে দিয়া তো কিছু যাইব না। হেরে দেখলে উল্টায় জ্বীনে ডরাইব। যত জ্বালা আমাগো!”
সার্থ যেতে যেতে সাইফুলকে কল দিয়েছে। কখন আসবে জানতে! সাইফুল বললেন, সবে নাস্তা খেতে বসবেন সকলে। এরপর তৈরি হয়ে বের হতে যতটা সময়। কথা শেষ হলো অল্পে। ঘরে ঢুকল সার্থ। দেখল তুশি এখনো ওই একইরকম পড়ে আছে খাটে। কম্বলও নড়েনি এক চুল। বাইরে ঠান্ডা, এসিও চলছে। শীত করছে ভেবে তাপমাত্রা একটু বাড়িয়ে দিলো ও। কাছে গিয়ে বসল এরপর। মোলায়েম স্বরে ডাকল,
“ তুশিইইই?”
তুশি জবাব দিলো নিগূঢ় গলায়,
“ জ-জিইই?”
কণ্ঠস্বর কেমন যেন লাগল সার্থর। চট করে সরিয়ে আনল কাঁথাটা। গালে হাত রাখতেই দেখল পুড়ে যাচ্ছে শরীর।
“ ও গড,তোমার তো জ্বর এসছে।”
তুশি অবসন্ন চোখ মেলে চেয়ে থাকে। সার্থ ছটফটিয়ে বলল,
“ এনি আদার্স কমপ্লিকেশান?”
“ হু?”
“ আর কোনো সমস্যা হচ্ছে? চোখমুখ এমন লাগছে কেন?”
“ পেটে খুব ব্যথা করছে। সারা শরীর ব্যথা। নড়তে পারছি না।”
বলতে বলতে গুঙিয়ে উঠল মেয়েটা। সার্থর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা হলো।
আরো বেশি উদ্বেল হয়ে বলল,
“ এত খারাপ অবস্থা, তো আমাকে বলবে না? আটকাবে না তখন?”
“ বলতে তো চাইলাম,আপনি শুনলেন কই? কিছু বলার আগেই আমার দফারফা হয়ে গেল!”
সার্থ উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ফোন হাতে তুলল,
“ আমি ডাক্তার ডাকছি।”
তুশি ব্যস্ত গলায় বলল,
“ না না। মাথা খারাপ? ডাক্তার এলে আসমা কী ভাববে? আর বাড়ির সবাইও যে কোনো সময় চলে আসবে, তখন শুনবে না এসব? ডাকবেন না, অনুরোধ!”
“ তাই বলে তো রিস্ক নেয়া যাবে না।”
“ এসব কথা আগে মনে ছিল না আপনার? আমার শুকনো মুখটা দেখেও মায়া করলেন না। রাতে অত ঝড়, সকালে বন্যা…জীবনের ওপর দিয়ে সুনামি তো যাবেই।”
সার্থ চুপ করে কপাল কুঁচকে ভাবছিল কী করবে! ভালোবাসার ডোজ ওভার হওয়ায় মেয়ে অসুস্থ, বিষয়টা জানাজানি হলে খুবই ঝামেলা। যদিও ওর কিছু হবে না। কিন্তু লজ্জায় পড়বে তুশি। শেষে বলল,
“ আচ্ছা,তাহলে হসপিটালে যাই?”
তুশি মাথা নাড়ল,যাবে না।
“ তুশি তোমাকে এভাবে ফেলে রাখা যাবে না। আমি পারব না সেটা। এমন কোনো হসপিটালে যাই, যেখানে আমাদের কেউ চেনে না। তাহলে হবে?”
তুশি চোখ নাড়িয়ে ভাবল একটু। রাজি হলো শেষে। সার্থ দরজা চাপিয়ে ফিরে এলো। দু-বাহুতে তুলল ওই চাঁদরে প্যাঁচানো শরীরটা। তুশি একটু ককিয়ে উঠতেই খারাপ লাগল ওর। আদরে আহ্লাদে চুইয়ে পড়ল গলার স্বর,
বলল,
“ ঠিক হয়ে যাবে বাবু! আম এক্সট্রিমলি সরি। আমার আরেকটু কন্ট্রোল রাখা উচিত ছিল।”
উবার ডাকা হয়েছে। সার্থ তুশিকে নিয়ে গাড়িতে বসতেই,হায়হায় করে ছুটে এলো আসমা । জিজ্ঞেস করল হন্তদন্ত ভঙ্গিতে,
“ ভাইজান আপনেরা কই যান, আফার কী হইছে? নাস্তা খাইবেন না?”
“ কিছু হয়নি।”
“ তাইলে আফাই কোতাইতেছে ক্যা?”
“ মাথা ব্যথা করছে।”
“ আল্লাহ এত্ত ব্যাতা? কত ব্যাতা না জানি করে আফার,নাইলে এইরহমের কোতায় মাইনষে?”
“ তুমি যাও এখন।”
আসমা কাচুমাচু করে একবার বাড়ির দিকে দেখল। উশখুশিয়ে বলল
“ ভাইজানরা কহন আইবেন?”
“ কেন?”
“ জ্বীনে যদি আমারে কিছু করে?”
সার্থ বিরক্ত শ্বাস ফেলল।
“ কিছু করবে না। আব্বাস আছে,আর দারোয়ানও আছে। তোমার তো ফোনও আছে? সমস্যা হলে কল করবে। আর তাছাড়া একটু পরেই সবাই চলে আসবে বাড়িতে।”
“ তাইলে ভাই…”
বাকিটা আর বলতে পারল না বেচারি,সার্থ ব্যস্ত হাতে ড্রাইভারের সীটে টোকা দিতেই গাড়িতে টান দিলেন তিনি। আসমা এবারেও মন খারাপ করল। ঠোঁট ফুলিয়ে ফিরে গেল ভেতরে।
উত্তরা থেকে বেশ দূরের হাসপাতাল এটা। তুশি মেয়ে ডাক্তার ছাড়া দেখাবেই না। গাইনি ছিলেন না এখানে। কল দিয়ে আনতে হলো। ওপিডি চেইক আপের জন্যে ভেতরে নিয়ে যেতেই,কল বাজল সার্থর। সাইফুলের ফোন। রিসিভ করতেই বললেন,
“ তোরা কোথায় রে সার্থ?
আসমা বলল তুশির নাকি অনেক মাথাব্যথা।”
“ ওই আরকি!”
“ কখন ফিরবি? ওষুধ খেয়েছে ও?”
“ হু? হুউউ। আমি ওকে নিয়ে একটু দূরে যাচ্ছি , কাল ফিরব। এসে কথা হবে? রাখি।”
সার্থ ফোন রেখে বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল। মানুষ বিয়ে করে, বাসর করে কেউ টেরও পায় না। আর ওকে ডিরেক্ট হাসপাতালে আসতে হলো!
তক্ষুনি ছুটতে ছুটতে হাজির হলো জামিল। অদূর থেকে দেখল সার্থ কপালের ঘাম মুছছে। পায়ের গতি আরো বাড়িয়ে দৌড়ে এসে দাঁড়াল পাশে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“ সার্থ,
এখানে ডাকলি কেন? সব কি ঠিক আছে? তুশি,তুশি ঠিক আছে তো?”
“ হু।”
“ হু? তাহলে হস্পিটাল কেন ভাই?”
“ উম, জ্বর এসেছে একটু।”
জামিল কিছু বলার আগেই পেছনের দরজা থেকে নারী চিকিৎসক বেরিয়ে এলেন। শুধালেন চোখের চশমা ঠেলে,
“ পেশেন্টের হাজবেন্ড কে?”
ঘুরে চাইল সার্থ,
“ আমি!”
“ আরে আপনি, আপনি এএসপি সার্থ আবরার না?
রেপিস্ট রোহান কেসে যে…”
“ হ্যাঁ।”
“ উনি তাহলে আপনার স্ত্রী? আচ্ছা,
একটু এদিকে আসুন।”
সার্থ এক বার জামিলের দিক চেয়ে, এগোলো। ভদ্রমহিলা ওকে কেবিনে নিয়ে গেলেন। বসতে বললেও সার্থ বসল না। উনিই বললেন,
” এটা কি ওনার ফার্স্ট টাইম? নাকি এর আগেও অসুস্থ হয়েছে? আপনার স্ত্রী তো লজ্জায় কিছু বলছেই না। যাই জিজ্ঞেস করছি বলছে আপনার থেকে শুনতে।”
সার্থ মেঝেতে চেয়ে ঠোঁট কামড়াল। জামিলের সামনেই কথাটা তুলতে হলো এর? ভদ্রমহিলা ফের শুধালেন,
“ মেয়ের তো বয়স কম মনে হচ্ছে।”
“টুয়েন্টি প্লাস!”
“ আচ্ছা। কিন্তু তবুও আপনার আরেকটু সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল অফিসার। ফার্স্ট টাইম এত ডেস্পারেট না হওয়াই উচিত। তাও কপাল ভালো ব্লিডিং হয়নি। যাক গে,আমি ওষুধ লিখে দিচ্ছি। সাথে তলপেটে গরম পানির শেকটা কন্টিনিউ করবেন। আর হ্যাঁ, মাস্ট এন্ড মাস্ট গ্যাপ রাখবেন দু একদিন।”
সার্থর চোখ আশেপাশে। ওইভাবেই জিজ্ঞেস করল,
“ ও এখন ঠিক আছে?”
“ জ্বর আছে। বাকি ব্যথার জন্যে তো মেডিসিন দিলামই। পাশাপাশি আপনিও খেয়াল রাখবেন।”
সার্থ বেরিয়ে এলো। অস্বস্তিতে চুরমার হয়ে গেল সে। দু আঙুলে কপাল চুলকাতে চুলকাতে এদিক-ওদিক দেখছিল ও। জামিল বাইরে দাঁড়িয়ে, যে চালাক,ঠিক বুঝে যাবে ও জানে। তবে এখনো ওর সাড়াশব্দ না পেয়ে তাকাল আড়চোখে। ঠোঁটে হাত দিয়ে মিটিমিটি হাসতে হাসতে পাশে এসে দাঁড়াল জামিল।
সার্থ পুরু স্বরে বলল,
“ হাসার কী আছে?”
“ তুশির জ্বর হয়েছে তাই না? জ্বর হলে কথা বলতে আলাদা ডাকলো কেন?”
“ তুই হাসি থামা!”
জামিল চেষ্টা করছিল, কিন্তু পারল না। হুহা করে হেসে উঠল। ওর কাঁধ চাপড়ে বলল,
“ আম প্রাউড অফ ইউ মাই শের। প্রথম রাতে বিড়াল মারতে হয় বলে ডিরেক্ট হসপিটালে?”
সার্থ প্রসঙ্গ কাটাতে বলল,
“ তোর ফ্ল্যাটের চাবিটা দে।”
“ ফ্ল্যাটের? কেন,বাড়ি যাবি না?”
সার্থ রেগেমেগে বলল,
“ গিয়ে কী দেখাব সবাইকে? যখন জিজ্ঞেস করবে ওর কী হয়েছে কী বলব? আমি বেশি এগ্রেসিভ হয়ে যাওয়ায় নিতে পারেনি?”
জামিল ফের শব্দ করে হেসেও, দু আঙুলে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সার্থ ফুঁসল কপাল কুঁচকে।
“ চাবি দিবি? নাকি হোটেলে উঠব?”
“ মাইর চিনিস?
এক কাজ কর, ফ্ল্যাট ছাড়। বহুদূর ভাই। তোরা আমার বাসায় চল। ছোটো মামা ব্যাচেলর ট্যুর দিতে গিয়েছে। আর নানু তো বয়স্ক মানুষ! ওনাকে নিয়ে প্যারা নেই।”
“ শিয়র?”
“ হান্ড্রেড পার্সেন্ট। ”
তুশির একটা স্যালাইন শেষ করে রওনা দিতে হয়েছে। জামিল গাড়ি চালাচ্ছিল। তুশিকে কোলে শুইয়ে পেছনে বসেছে সার্থ । মেয়েটা ঘুমোচ্ছে এখন! চোখেমুখে কী ক্লান্তি! যেন কত রাত ঘুমায় না। সার্থ ঘুমন্ত মেয়েটার পানে তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকে। হাত বোলায় চুলে। জামিল হঠাৎ বলল,
“ তুশির জন্যে খুব মায়া হচ্ছে।”
“ কী ব্যাপারে?”
“ এমন ফুলের মতো মেয়েটা,শেষে এক জলদস্যুর হাতে পড়ল?”
“ এখন যদি পেছন থেকে তোর গলা চেপে ধরি, কেমন হবে?”
“ খুব খারাপ।”
“ তাহলে চুপ করে গাড়ি চালা।”
জামিলদের বাসা ফাঁকাই প্রায়। বড়ো মামা মামি কিছু দিন আগেই অস্ট্রেলিয়া গেলেন। ছোটো মামা তো ব্যাচেলর ট্যুর নিয়ে ব্যস্ত। নানু বুড়ো মানুষ সারাদিন নামাজ তসবিহ নিয়ে থাকেন। এই সময়েও কামরায় ছিলেন তিনি। জামিল সোজা ওদের নিয়ে একটা শোবার ঘরে ঢুকল। বলল,
“ তোরা এখানে থাক। নানু বের হলে আমি ওনাকে যা বলার বলব।”
গুরুতর চোখে চাইল সার্থ,,
“ কী বলবি?”
“ আরে ভাই ওসব বলব না,রিল্যাক্স!”
সার্থ তুশিকে বিছানায় শোয়াল।
ও বলল,
“ তাহলে আমি বের হই। নাস্তা দিতে বলি। খাসনি তো মনে হয়।”
“ তুশি উঠুক।”
“ আচ্ছা,আপাতত কফি দিতে বলি।”
জামিল বেরিয়ে যেতেই চোখ মেলে চাইল তুশি। মিনমিনিয়ে বলল,
“ ইস,জামিল ভাই কী ভাবলেন?”
সার্থ দরজা থেকে নজর ফেরাল। অবাক হয়ে বলল
“ তুমি জেগে ছিলে?”
“ হুউ।”
“ ব্যথা কমেছে?”
“ উহু।”
সার্থ ওর গায়ে,কপালে হাত ছোঁয়াল আরেকবার। জ্বর নামছে। তুশি খেয়াল করল স্বামীর আলোহীন চেহারা। বলল,
“ আপনার আবার কী হলো?”
“ বেশি বেশি হয়ে গেছিল তাই না?”
তুশির শুষ্ক মুখশ্রী কুণ্ঠায় নুইয়ে গেল অমনি। ঠোঁট টিপে চিবুক নামিয়ে বলল,
“ মোটেই না।”
সার্থ ভ্রু নাঁচায়,
“ মোটেই না?”
“ উহু।”
“ আচ্ছা?
দরজাটা তাহলে বন্ধ করে আসি।”
ও উঠতে নিলেই তুরন্ত হাত টেনে ধরল তুশি। মেয়ের চোখ ভরতি আতঙ্ক দেখে, নিঃশব্দে হেসে ফেলল সার্থ। কাছে বসল, ঝুঁকে গিয়ে নিজের চওড়া বুকের সাথে প্যাঁচিয়ে ধরল শরীরটা। স্বামীর বুকে আজ প্রশান্তি নিয়ে মাথা রাখল তুশি। মিশে রইল, মন ভরে শ্বাস নিলো শুধু। এই নিঃশ্বাসে আর দুরুত্ব নেই। বরং শান্তি ছিল, স্বস্তি ছিল, ছিল কাছে আসার মৌসুমে দুজনের হারিয়ে যাওয়ার গল্প!
চলবে…
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৯(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ ক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ খ
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬০.১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭২.১