লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৪২
দেখতে দেখতে দিনটা যেন এক অদ্ভুত বিষণ্নতায় গড়িয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেই তুর্য আর রিফাত চলে গেল। শুভ্র ওদের সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসে সোজা নিজের রুমে ঢুকে পড়েছে। ঘরের আবহাওয়া এখন গুমোট, ভারী। শুভ্র এক মনে আলমারি থেকে কাপড়চোপড় বের করে ট্রাভেল ব্যাগে গুছিয়ে রাখতে লাগল। ওর প্রতিটি নড়াচড়া যান্ত্রিক, চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের হাড়হিম করা শূন্যতা।
সহসা ঈশান রুমে ঢুকল। শুভ্রের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল।
“বস, সব রেডি। এইমাত্র ম্যানেজারের সাথে কথা হলো, কোনো সমস্যা হবে না।”
শুভ্র একটা শার্ট ভাজ করতে করতে নির্বিকারভাবে জবাব দিল।
“গুড।”
ঈশান কয়েক মুহূর্ত শুভ্রর শান্ত কিন্তু বিধ্বংসী চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল। সাহস সঞ্চয় করে মিনমিনে গলায় জিজ্ঞেস করল।
“বস, আপনার কি ফিরতে খুব দেরি হবে?”
শুভ্র হাত থামাল না। শার্টের হাতা দুটো নিখুঁতভাবে ভাঁজ করতে করতে শীতল গলায় বলল।
“মন যেদিন বলবে চলে আয়, সেদিনই ফিরব। তার আগে না।”
ঈশান বুঝতে পারছে ভেতরে ভেতরে কোনো প্রলয় চলছে। ও দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খুব নিচু স্বরে সুধাল।
“বস, রিদির সাথে কি আপনার কিছু হয়েছে? মেয়েটা একদম চুপসে আছে।”
রিদির নামটা কানে যেতেই শুভ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। হাতের মুঠোয় থাকা কাপড়টা সজোরে চিপে ধরল ও। চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল এক চিলতে ক্রোধ আর চরম অবজ্ঞা। দাঁতে দাঁত পিষে গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল।
“আমি এই বিষয়ে একটা শব্দও বলতে চাইছি না ঈশান। গেট আউট!”
ঠিক সেই মুহূর্তে ধীর পায়ে রুমে ঢুকল রিদি। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শুভ্র আর ঈশানের প্রতিটি শব্দ সে স্পষ্ট শুনেছে। সারাটা দিন এক ভয়াবহ যন্ত্রণায় কেটেছে ওর, কিন্তু এখন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। রিদিকে বিধ্বস্ত অবস্থায় ঘরে ঢুকতে দেখে ঈশান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ও মৃদু স্বরে শুধাল।
“আরে রিদি! কিছু বলবে?”
রিদি কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু মাথা নিচু করে খুব ধীরে ‘হ্যাঁ’ সূচক সায় দিল। ঈশান বিচক্ষণ ছেলে, ও পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে শুভ্রর দিকে একবার তাকিয়ে বলল।
“ঠিক আছে, তোমরা কথা বলো। আমি বাইরে যাচ্ছি।”
ঈশান ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই এক অসহ্য নিস্তব্ধতা রুমটাকে গ্রাস করে নিল। শুভ্রর মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই। ও যেন রিদির অস্তিত্বই টের পাচ্ছে না। ও আগের মতোই যান্ত্রিক হাতে কাপড়গুলো ব্যাগে ভরতে থাকল। রিদি কয়েক পা এগিয়ে এল শুভ্রর দিকে। ওর বুকের ভেতরটা আজ এক উন্মাতাল সমুদ্রের মতো উত্তাল, হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। সে অস্ফুট স্বরে কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল।
“আপনি কি সত্যি চলে যাবেন শুভ্র ভাই?”
শুভ্রর হাত দুটো মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ওর বুক চিরে। ও ধীরগতিতে ঘাড় ঘুরিয়ে রিদির দিকে তাকাল। শুভ্রর সেই চোখের দৃষ্টি আজ অদ্ভুত রকমের শীতল, যেন কোনো এক অচেনা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে সামনে। ও রিদির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত রুক্ষ আর নির্দয় গলায় বলল।
“কিছু বলার থাকলে সরাসরি বল, আর না হলে এখন এখান থেকে যা। এসব ফালতু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো মুড বা সময় কোনোটিই আমার নেই।”
শুভ্রর এই বিষাক্ত কথাগুলো শুনে রিদির মনে হলো কেউ ওর গলার কাছে সজোরে চেপে ধরেছে। কথা বলার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলছে ও। শুভ্র আবার কাজে মন দিল, যেন রিদি একটা জড় পদার্থ ছাড়া আর কিছুই নয়।
রিদির চোখের বাঁধ ভেঙে অশ্রু নোনা জলের ধারা হয়ে গাল বেয়ে নামছে। সে কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় বলল।
“এমন কেন করছেন শুভ্র ভাই? কেন আমাকে এভাবে তিলে তিলে মে’রে ফেলছেন?”
শুভ্র হাতের কাপড়টা সজোরে ব্যাগের ভেতর গুঁজে দিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সে রিদির দিকে না তাকিয়েই খুব নিস্পৃহভাবে বলল।
“জানি না। এভাবে তোকে ইগনোর করতে আমার ভালো লাগছে। এখন যাবি তুই এখান থেকে।”
রিদি এবার ঝড়ের বেগে শুভ্রর একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার দুচোখে তখন অভিমান আর যন্ত্রণার আগুন। সে চিৎকার করে বলে উঠল।
“কী করেছি আমি? কাল আপনাকে একটা থাপ্পড় মেরেছিলাম, এটাই কি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল? এই সামান্য কারণে আপনি আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন?”
বলেই রিদি শুভ্রর একটা শক্ত হাত নিজের দুহাতে জড়িয়ে ধরল। সে শুভ্রর হাতটা টেনে নিজের গালে ছোঁয়াল। করুণ স্বরে মিনতি করে বলল।
“ঠিক আছে, আপনি আমাকে থাপ্পড় মারেন। একটা না, আপনার যতটা খুশি ততটা থাপ্পড় মারেন। যত রাগ আছে সব আমার ওপর মিটিয়ে নেন। কিন্তু প্লিজ, এইভাবে আমাকে এড়িয়ে চলবেন না। আই জাস্ট কান্ট বিয়ার দিস পেইন শুভ্র ভাই! আমি সহ্য করতে পারছি না।”
শুভ্রর শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরা রাগে রি রি করে উঠল। চোরের মায়ের বড় গলা! মুহূর্তের মধ্যে সে রিদিকে হেঁচকা টানে দেয়ালের সাথে সজোরে চেপে ধরল। শুভ্রর হাতের আঙুলগুলো রিদির বাহুতে দেবে বসেছে। সে রিদির মুখের একদম কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে হিসহিসিয়ে বলল।
“থাপ্পড় দিতে বলিস? শোন রিদি, থাপ্পড় যদি দেওয়ার থাকতো তবে ওই মেলাতেই তোকে চড় কষাতে পারতাম। আর কী বললি? আমার এড়িয়ে চলা তুই সহ্য করতে পারছিস না? কেন রে? খুব কষ্ট হচ্ছে তোর? কতটুকু কষ্ট? আমার তো মনে হয় না তোর বিন্দুমাত্র কষ্ট হচ্ছে। বরং তোর তো এখন অনেক খুশি হওয়ার কথা। আই অ্যাম গিভিং ইউ স্পেস রিদি। আমি তো তোকে আর কারো থেকে দূরে থাকতে বলছি না, কারো সাথে কথা বলতে নিষেধ করছি না। তোকে একদম তোর মতো স্বাধীন করে ছেড়ে দিয়েছি। খুশি হোসনি তুই?”
শুভ্রর প্রতিটি শব্দ তপ্ত আগুনের গোলার মতো রিদির কানে এসে আছড়ে পড়ছে। লজ্জায় আর অভিমানে রিদির মাথাটা নিচু হয়ে এল। টপটপ করে লোনা জল গড়িয়ে মেঝেতে পড়ছে তার। রিদির চোখের ওই অসহায় পানি দেখে শুভ্রর পাথরের মতো শক্ত মনটা যেন নিমিষেই খানিকটা নরম হয়ে এল। সে রিদির বাহুর ওপর থেকে হাতের বাঁধন কিছুটা আলগা করে দিল। শুভ্র এবার খুব নিচু কিন্তু ভাঙা গলায় বলল।
“সবসময় কি তুই এই শক্ত শুভ্রকেই দেখিস রিদি? কখনো কি আমার ভেতরটা বোঝার চেষ্টা করিস না? আই অ্যাম অলসো আ হিউম্যান বিয়িং রিদি। আমিও রক্তে মাংসে গড়া এক সাধারণ মানুষ। আমার ভেতরেও অনুভূতি আছে, আমার ভেতরেও অভিমান আর রাগ আছে। ইউ হার্ট মি সো ব্যাডলি রিদি, আই এম টোটালি ব্রোকেন ইনসাইড। অথচ তুই কি না বলছিস আমি কেন এমন করছি!”
শুভ্রর কন্ঠস্বরে আজ এক বুক হাহাকার মিশে আছে। রিদি ঝাপসা চোখে শুভ্রর দিকে তাকালো।রিদি আবারও কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দগুলো তার গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে গেল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় শুধু এটুকুই আওড়াল।
“বিশ্বাস করুন আমি কাল ইচ্ছে করে…”
শুভ্রর তপ্ত নিশ্বাস রিদির কপালে আছড়ে পড়ল। সে রিদিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে কর্কশ গলায় থামিয়ে দিল। শুভ্রর চোখের মণি দুটো যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। সে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে বলল।
“তোকে যেতে হবে কেন রিদি? তোর কি নিজের কোনো পার্সোনালিটি নেই? তোর কি নূন্যতম আত্মবোধ নেই? তুই যদি নিজে থেকে না যেতে চাইতিস, তবে এই পৃথিবীর কারো সাধ্য ছিল না তোকে এক কদম নড়ানোর। মন যেখানে সায় দেয় না, সেখানে কি জোর করে মন বসানো যায়? যায় না রিদি। সো স্টপ দিস ড্রামা!”
রিদির মাথাটা লজ্জায় আবারও নিচু হয়ে এল। মেঝের কার্পেটের দিকে তাকিয়ে সে নিজের নখ দিয়ে আঙুল খুঁটতে লাগল। শুভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে নিজেকে কিছুটা সংযত করার চেষ্টা করল, কিন্তু তার চোয়ালের হাড়গুলো এখনো রাগে কাঁপছে। সে রিদির চিবুকটা হেঁচকা টানে উঁচিয়ে ধরল। রিদির চোখের মণি বরাবর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে ধীর আর ভারী গলায় বলল।
“শোন রিদি, তুই নারী। আর এই সোসাইটিতে নারীদের সবসময় ছেলেদের থেকে নিচু চোখেই দেখা হয়। সামান্য একটু ভুল করলে মেয়েদের চরিত্র নিয়ে দশ গুণ বেশি কাটাছেঁড়া হয়। আমি একবার না, বারবার দেখেছি রাসেল তোর হাত ধরছে। কেন ও তোর শরীরে টাচ করবে? তুই কি একটা শব্দও বলতে পারিস না? কথা বলবে ঠিক আছে, কিন্তু কথায় কথায় কেন গায়ে হাত দেবে?”
শুভ্রর কথার প্রতিটি অক্ষর রিদির কানে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধছে। শুভ্র তার হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে রিদির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল।
“রিদি, আজ আমাকে বলতে হচ্ছে একটা নারীর যদি নূন্যতম সেলফ রেসপেক্ট থাকে, তবে তার শরীরে অন্য কারো টাচ সে মোটেও সহ্য করে না। রিলেশন যাই হোক না কেন, হি হ্যাজ নো রাইট টু টাচ ইউ! কিন্তু তুই কী করেছিস? যতবার ও তোর হাত ধরেছে, তুই বিরক্ত হয়েছিস ঠিকই কিন্তু কোনো হার্ড প্রটেস্ট করিসনি। কেন রে? একটা সপাটে চড় কষাতে পারিসনি ওই জানোয়ারটার গালে? থাপ্পড় দিয়ে একটা বার বলতে পারিসনি যে তোর এসব সস্তা ইয়ার্কি একদম ভালো লাগে না? ইউ অ্যার সো উইক রিদি! অথচ তুই আমাকে থাপ্পড় মারতে ঠিকই হাত চালিয়েছিলি। হাউ আইরনিক!”
রিদি ডুকরে কেঁদে উঠল। শুভ্রর এই লজিক্যাল আর তীক্ষ্ণ কথাগুলোর সামনে দাঁড়ানোর মতো কোনো শক্তিই তার অবশিষ্ট নেই। তার মনে হলো সে শুভ্রর চোখে এক নিমিষেই অনেক নিচে নেমে গেছে।শুভ্রর ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। রিদির অশ্রুসিক্ত মুখটা তার সমস্ত কাঠিন্য টলিয়ে দিচ্ছে মুহূর্তেই। নিজেকে কোনোমতে সংযত করে শুভ্র দুই হাতে রিদির কাঁধ চেপে ধরল। খুব নিচু কিন্তু গভীর গলায় বলল।
“কাঁদছিস কেন? নিজেকে দুর্বল মনে করে? শোন রিদি, আমার চোখে নারী কখনো দুর্বল নয়। আর আমার স্ত্রী হয়ে তুই তো একেবারেই না। নারী যদি হতে হয় তবে তেজস্বী নারীর মতোই হবি। কেউ শরীরে টাচ করলে সেখানে পাথরের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবি না। চুপ থাকলে মানুষ আরও মাথায় চড়ে বসে জানিস তো? তুই চুপ ছিলি বলেই রাসেল ওই খানকির পোলা হালা তোর শরীরে টাচ করার সাহস পেয়েছে। যদি তুই একটা বার রুখে দাঁড়াতি, তবে শরীরে টাচ তো দূরের কথা তোর আশেপাশে আসতেও সে লজ্জায় কুঁকড়ে যেত, যদি সে ভালো ফ্যামিলির কোনো ভদ্র ছেলে হতো।”
শুভ্র এবার রিদির ওপর থেকে হাতের বাঁধন আলগা করে দিল। সে উল্টো দিকে ঘুরে কয়েক পা এগিয়ে গেল। তার কণ্ঠস্বরে এখন আক্ষেপ আর তাচ্ছিল্য মেশানো। সে দেয়ালে এক হাত রেখে শান্ত গলায় বলল।
“ভাবতেও অবাক লাগে রিদি! আমি জাস্ট বলেছি পরপুরুষের ছোঁয়া পেতে তোর ভালো লাগে, অমনি তুই আমার গালে সপাটে হাত চালিয়ে দিলি? অথচ একটা বার ভাবলি না আমি তোর হাজব্যান্ড! তোর ভালো-মন্দের সবটুকু অধিকার আমার আছে। একটা ছেলে বারবার তোর শরীরে টাচ করবে আর আমি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব? নো রিদি, নো! ইট’স জাস্ট ইম্পসিবল। আমার জিনিসে কেউ টাচ করলে আমি স্রেফ খুন করে ফেলব তাকে।”
শুভ্র থামল। কোমরে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘ আর তপ্ত নিশ্বাস ফেলল সে। রিদি তখনো অপরাধীর মতো নিচু হয়ে ডুকরে কাঁদছে। ওর ফোঁপানোর শব্দে রুমের বাতাস ভারি হয়ে আসছে। শুভ্র ঘাড় বাঁকিয়ে রিদির দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত বিষাদ মাখা। সে ফের বলল।
“আর কারো কথা জানি না রিদি, বাট আমি না খুব হিংসুটে একটা ছেলে। সহ্য করতে পারি না, জ্বলে যায় আমার সব। বুকটা একদম আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে যখন দেখি অন্য কেউ তোকে স্পর্শ করছে। তবে সেই জ্বালাপোড়া শুধু আগুন হয়েই থাকে না, কোথাও যেন আষাঢ়-শ্রাবণের মেঘের মতো বন্যা হয়ে সব কিছু ডুবিয়ে দিয়ে যায়। আর সেই ডুবন্ত জিনিস চিরতরে হারানোর যন্ত্রণার মতো তীব্র এক ব্যথা অনুভূত হয় হৃদপিণ্ডে।”
রিদি যেন নতুন এক মোহের ঘোরে তলিয়ে গেল। সে নতুন করে এই পুরুষটির প্রেমে পড়ল। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি যুক্তি যেন একজন নিপুণ শিক্ষক তার ছাত্রীকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন; ঠিক তেমন প্রগাঢ় মমতা আর কঠোর শাসন মিলেমিশে আছে সেখানে। রিদি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বুকের ভেতর জমানো সবটুকু হাহাকার নিয়ে সে দৌড়ে গিয়ে শুভ্রর পা জড়িয়ে ধরে ফ্লোরে বসে পড়ল। ডুকরে কেঁদে উঠে সে বলল।
“আমার ভুল হয়ে গেছে শুভ্র ভাই! আমি সব বুঝতে পেরেছি। প্লিজ আপনি আমাকে মাফ করে দিন। আই অ্যাম রিয়েলি সরি!”
শুভ্রর ভেতরের কাঠিন্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে চাইছে। রিদির এই আকুলতা তার হৃদপিণ্ড নিংড়ে দিচ্ছে। সে প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ছে, কিন্তু এই মুহূর্তে নমনীয়তা দেখালে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। কাল তাকে যেতেই হবে, আর রিদির এই অবস্থা দেখলে সে এক কদমও নড়তে পারবে না। তাকে কঠোর হতেই হবে। নিজের পা রিদির হাতের শক্ত বাঁধন থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে সে দাঁতে দাঁত পিষে রুক্ষ গলায় বলল।
“পা ছাড় রিদি! ভালো লাগছে না আমার। যা এখান থেকে।”
রিদি বাঁধন আরও শক্ত করল। শুভ্রর পায়ের ওপর মাথা ঠেকিয়ে সে ধরা গলায় বলল।
“ছাড়ব না! ততক্ষণ ছাড়ব না যতক্ষণ না আপনি আমাকে মাফ করছেন। আপনি এভাবে চলে যেতে পারেন না শুভ্র ভাই। আই উইল ডাই!”
শুভ্রর কপাল কুঁচকে এল। সে ঘাড় ম্যাসাজ করে নিজের চরম অস্থিরতা আড়াল করার চেষ্টা করল। চোয়াল শক্ত করে আগের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি কর্কশ স্বরে সে বলে উঠল।
“রিদি, আমার কিন্তু এবার সত্যিই মেজাজ খারাপ হচ্ছে। পা ছাড় বলছি! ডোন্ট মেক আ সিন।”
রিদি এবার একদম অবুঝ বাচ্চার মতো শুভ্রর পা আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। কান্নার তোড়ে তার হেঁচকি উঠছে। সে জেদি স্বরে বলে উঠল।
“ছাড়ব না, কিছুতেই ছাড়ব না! কী করবেন আপনি? মারবেন? মারেন আমাকে, আমি আপনার হাতের মার খেতেও রাজি আছি। কিন্তু প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাবেন না!”
শুভ্র অন্যদিকে তাকিয়ে নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল। তার বুকের ভেতরটা এক প্রচণ্ড দহনে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। সে অনেক কষ্টে নিজের অবাধ্য অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করল। কয়েক মুহূর্ত পর তার গলার সুর একদম শান্ত হয়ে এল। সে ঘাড় নিচু করে রিদির দিকে তাকালো। তার চোখে এখন এক অদ্ভুত মাদকতা আর নেশাতুর চাহনি। সে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল।
“সুইটহার্ট, আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবা?”
শুভ্রর মুখে হঠাৎ এমন আদুরে ‘সুইটহার্ট’ সম্বোধন শুনে রিদি যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার কান্নার বেগ থমকে গেল মুহূর্তেই। সে বড় বড় চোখ করে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে রইল। শুভ্র পুনরায় একই ভঙ্গিতে নেশাল গলায় বলল।
“ধরো না সোনা, খুব ইচ্ছে করছে তোমাকে জড়িয়ে ধরতে।
রিদি পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেছে। তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল।
“ক-কী বলছেন এসব আপনি?”
শুভ্র মৃদু মাথা নাড়ল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা তপ্ত আর বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে রিদির কপালে জমে থাকা ঘামটুকু মুছে দিয়ে মোহময় স্বরে বলল।
“হুম Xan’s… একটু ধরো না সোনা। জাস্ট একবার ধরো।”
শুভ্রর এই হঠাৎ বদলে যাওয়া রূপ দেখে রিদির সারা শরীর অপার্থিব এক শিহরণে কেঁপে উঠল। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে উঠে দাঁড়াল। শুভ্র তখন দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করে এক মায়াবী আমন্ত্রণ সাজিয়ে রেখেছে। রিদি আর কিছু না ভেবে, পৃথিবীর সমস্ত সুখ ওই দুই বাহুর মাঝে খুঁজে পাওয়ার আশায় শুভ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করল। সে অনুভব করল শুভ্রর তপ্ত নিশ্বাস তার কপালে আছড়ে পড়ছে। শুভ্র অতি সন্তর্পণে রিদির কপালে একটি গভীর চুমু খেল। সেই স্পর্শে এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে দাঁড়াল।
কিন্তু সেই সুখের মুহূর্ত স্থায়ী হলো না এক পলকের জন্যও। মুহূর্তের মধ্যে শুভ্রর অবয়ব বদলে গেল। তার চোখের সেই মায়া নিমিষেই বিষাক্ত হাড়হিম করা অন্ধকারে রূপ নিল। শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে চরম আক্রোশে রিদিকে এক ঝটকায় নিজের কাঁধে তুলে নিল। ঘটনার আকস্মিকতায় রিদি পাথর হয়ে গেল কিছু বুঝে ওঠার বা আর্তনাদ করার সুযোগটুকুও সে পেল না। শুভ্রর দেহের কঠিন পেশিগুলো তখন পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। সে দ্রুত পায়ে হেঁটে রিদিকে রুমের বাইরে নিয়ে এল এবং দরজার সামনে সজোরে দাঁড় করিয়ে দিল।
রিদি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মস্তিষ্ক তখনো শুভ্রর সেই চুমুর ঘোরে আচ্ছন্ন। সে কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই শুভ্র চরম নির্দয়ভাবে দরজাটা রিদির মুখের ওপর ‘ঠাস’ করে লাগিয়ে দিল। বন্ধ দরজার সেই কর্কশ শব্দে রিদির হৃদপিণ্ডটা যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। করিডোরের নিস্তব্ধতায় সেই শব্দ এক বিভীষিকার মতো প্রতিধ্বনিত হলো। রিদি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে বন্ধ কাঠের কপাটের দিকে তাকিয়ে রইল।
রাত শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটতে তখনও অনেকটা বাকি। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে আচ্ছন্ন। শুভ্র আর ঈশান ফজরের আজানের আগেই সব প্রস্তুতি শেষ করে নিল। বাড়ির সবার সাথে সংক্ষেপে বিদায় পর্ব সেরে তারা বেরিয়ে পড়ল সদর দরজার দিকে। হাতে একদম সময় নেই, ছয়টায় ফ্লাইট—তার অনেক আগেই এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে হবে। গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় শুভ্রর পা দুটো মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার সেই অশান্ত চোখ দুটো অবচেতনেই কাউকে খুঁজছিল, কিন্তু আশেপাশে কেবল শূন্যতা আর জমাট বাঁধা কুয়াশা।
শুভ্রর অস্থিরতা ঈশানের চোখ এড়ালো না। সে খুব নিচু স্বরে শুধাল।
“রিদিকে খুঁজছেন?”
শুভ্র কোনো উত্তর দিল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। নিজের দুর্বলতাকে এক ঝটকায় ঝেড়ে ফেলে সে গুমোট গলায় কেবল বলল।
“চলো।”
গাড়ি স্টার্ট দিল ঈশান। নির্জন গ্রামের মেঠো পথ ধরে গাড়িটি দ্রুতগতিতে এগোতে লাগল। দুইপাশে গাছের সারিগুলো অন্ধকারের বুক চিরে যেন বিভীষিকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ হেডলাইটের আলোয় শুভ্রর চোখ আটকে গেল রাস্তার ঠিক মাঝখানে। একটু দূরেই আবছা অন্ধকারে একটি মানবমূর্তি পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ঈশান কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুভ্র চিৎকার করে উঠল, “ব্রেক মারো!”
গাড়িটা টায়ার ঘষটে বিকট শব্দ করে রিদির ঠিক হাতখানেক সামনে এসে থেমে গেল। এই মাঝরাতে নির্জন রাস্তায় রিদিকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঈশান যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। শুভ্র তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে রিদির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে তখন রাজ্যের দুশ্চিন্তা আর বিষাক্ত রাগ। সে রিদির বাহু শক্ত করে চেপে ধরে চেঁচিয়ে বলল।
“এখানে কী করছিস তুই এত রাতে?”
রিদি এক চুলও নড়ল না। তার দৃষ্টি এখন হাড়হিম করা স্থির। সে খুব শান্ত কিন্তু জেদি গলায় উত্তর দিল।
“আপনাকে যেতে দেব না, তাই দাঁড়িয়ে আছি।”
শুভ্রর রাগে শরীর কাঁপছে। সে রিদিকে একপাশে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে রুক্ষ গলায় বলল।
“ফালতু কথা একদম বলবি না রিদি। যা, এখনই বাড়ি যা!”
রিদি এক পা-ও নড়ল না। সে শুভ্রর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অটল স্বরে বলল।
“যাব না। আমি যাওয়ার জন্য আসিনি শুভ্র ভাই। আমি খুব ভালো করে জানি আপনি একবার গেলে সহজে আর ফিরে আসবেন না। তাই আমি আপনাকে আজ কোনোভাবেই যেতে দেব না। যেদিন আমাকে সাথে নিয়ে যেতে পারবেন, সেদিনই আপনি এই শহর ছাড়বেন। তার আগে এক কদমও এগোতে দেব না আপনাকে।”
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৯(সমাপ্ত)
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৮