অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৩৯
চৌধুরী বাড়ির সকলেই বেশ হইচই করে রওনা হয়েছে গ্রামের মাঠের বৈশাখী মেলায় যাওয়ার জন্য। এই গ্রামে প্রতি বছরই পহেলা বৈশাখে বড় করে মেলা বসে, আর তাতে মেতে ওঠে আবালবৃদ্ধবনিতা। বাড়ির বড়রা সবাই গাড়িতে করে গেছেন, কিন্তু ছোটরা ঠিক করেছে মেলা পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে মজা করে যাবে। শুভ্রা, রিদি, মিহি, পাখি আর আরও অনেক মেয়ে সবার সামনে হেঁটে চলেছে। আর তাদের ঠিক পেছন পেছন আসছে শুভ্র, ঈশান, তূর্য, রিফাত আর ইমন। শুভ্রা, রিদি, মিহি আর পাখি চারজনেই গল্পে মগ্ন, হাসাহাসি আর কথা বলতে বলতে গলা যেন ভাঙার জো।
মেলার খুব কাছাকাছি আসতেই ঘটে এক অপ্রীতিকর ঘটনা। একদল জাউরা আর বখাটে ছেলে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। রিদিদের দেখতেই ওমনি তারা অসভ্যভাবে শিস বাজাতে শুরু করে, একদম রিদিদের দিকে তাকিয়ে। ঘটনাটা শুভ্রর চোখ এড়ায় না, মুহূর্তেই ওর মাথায় রক্ত চড়ে যায়। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে শুভ্র রাস্তার ওপরেই পায়ের জুতো খুলে ওই ছেলেটার দিকে ছুটে যায়। ছেলেটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুভ্র ওর শার্টের কলার ধরে জুতো দিয়ে এক নাগাড়ে মারতে শুরু করে। শুভ্রর যেন নিঃশ্বাস নেওয়ারও ফুসরত নেই। মারতে মারতে ও দাঁতে দাঁত চেপে বলে।
“হালা খাকির পো‘লা বাইনচু*দ! রাস্তা ঘাটে মেয়ে দেখলেই শিস দিতে ইচ্ছে করে?”
সেখানে উপস্থিত সবাই একদম থমকে যায়। শুভ্রা, রিদি, মিহি আর পাখি ভয়ে আর বিষ্ময়ে পাথর হয়ে যায়। রাস্তা দিয়ে যাওয়া অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে পড়ে, অবাক হয়ে দেখে একটা হ্যান্ডসাম শহরের ছেলে গ্রামের একটা ছেলেকে জুতো দিয়ে মারছে! তূর্য ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে আর শুভ্রকে থামানোর চেষ্টা করতে করতে বলে।
“শুভ্র, ছেড়ে দে! এরা এমনই। ঝামেলা করিস না।”
কিন্তু শুভ্র মার থামায় না, তূর্যকে জবাব দেয়।
“ওর কলিজা না ছিঁড়ে আমি ছাড়ব না!”
বাকি বখাটে ছেলেগুলো শুভ্রের সেই চণ্ডাল রূপ দেখে কাছে এগিয়ে আসার সাহসই পেল না, ভয়ে সব দূরে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে। এদিকে শুভ্রকে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না মারতে মারতে ও বখাটে ছেলেটাকে রাস্তার ওপর এক প্রকার ধুলোয় মিশিয়ে ফেলেছে। রীতিমতো রাস্তার মাঝখানে দুজনে গড়াগড়ি খাচ্ছে। শুভ্রের এমন বিধ্বংসী রাগ দেখে গ্রামের মানুষ থেকে শুরু করে পথচারীরা পর্যন্ত থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। এমনকি যে গ্রামের মেয়েরা মেলায় যাচ্ছিল, তারাও দাঁড়িয়ে অবাক চোখে এই দৃশ্য দেখছে। কেউ কেউ লুকিয়ে মোবাইলে ভিডিও করছে, কেউ বা আবার এই রাগী হ্যান্ডসাম ছেলেটার রূপ দেখে এর মধ্যেই ক্রাশ খেয়ে বসে আছে। অনেকে তো ছবি তুলতে তুলতে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছে।
শেষে অনেক কষ্টে ঈশান আর রিফাত দুজনে মিলে টেনেটুনে শুভ্রকে থামাল। শুভ্রের ফর্সা কপাল ঘামে একদম ভিজে একাকার, চোখ দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে আছে। কপালের রগগুলো রাগে ফুলে উঠেছে, আর ও বড় বড় নিশ্বাস ফেলছে। ক্ষোভে শুভ্রের বুকটা কামারের হাপরের মতো উঠানামা করছে।
ঈশান শুভ্রর কাঁধে হাত দিয়ে শান্ত করার সুরে বলল।
“বস আপনি শান্ত হোন, রাস্তার মধ্যে এইভাবে ঝামেলা করাটা ঠিক হবে না”
ঈশানের কথা শেষ হতে না হতেই চারপাশে জমে থাকা মানুষের ভিড় থেকে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। গ্রামের অনেক বয়স্ক আর সাধারণ মানুষরা সমস্বরে বলতে শুরু করল।
“একদম ঠিক কাজ হইছে বাবা! এই ছেলেটার যন্ত্রণায় গ্রামের কোনো মেয়ে শান্তিতে পথ চলতে পারে না। রাস্তাঘাটে মেয়ে দেখলেই কুৎসিত ইশারা করে, শিস দেয়। আজ একদম উচিত শিক্ষা হইছে। এই হারামিটাকে তো আরও মারা উচিত ছিল!”
সবাই জোরে জোরে বলা শুরু করছে একদম ঠিক হয়েছে, সাথে মেলায় যাওয়া গ্রামের মেয়েরাও সায় দিল। ঈশান, তুর্য, রিফাত অনেক বুঝিয়ে শুভ্রকে শান্ত করে আবার মেলার দিকে হাঁটা দিল। রিদির তো বুকের ভেতর ড্রাম বাজছে, কি ভয়াবহ রাগ শুভ্রের আল্লাহ! এই রাগী হিটলার নাকি তার হবু জামাই? তারে যদি একবার ভুলেও এইভাবে মারে, সে তো নির্ঘাত শেষ। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই তারা মেলার ভেতর চলে আসল। চারদিকে ভাজা পোড়া খাবারের গন্ধে ম ম করছে, হাজারো দোকানে মেলা একদম জমজমাট।
রিদি আর শুভ্রা তো মেলায় ঢুকেই এক দৌড়ে একটা কসমেটিকসের দোকানে চলে আসল। মিহি আর পাখি গেল অন্য দোকানে, তাদের পিছনে পাহারা দিতে গেল তুর্য আর রিফাত। এদিকে রিদি আর শুভ্রার পিছনে যমদূতের মতো ঈশান আর শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে। রিদি তো দোকানে ঢুকেই প্রথমেই এক জোড়া সুন্দর মাথার টিকলি পছন্দ করে ফেলল। সে দোকানের আয়নার সামনে দাঁড়াল টিকলিটা পরে দেখার জন্য। খুব যত্ন করে টিকলিটা কপালে বসানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু আয়নাটা একটু উঁচুতে হওয়ায় সে কিছুতেই ঠিকঠাক পরতে পারছে না। ওর মনে হচ্ছে একবার লাফ দিয়ে পরে ফেলি, কিন্তু চারপাশে এত মানুষ দেখে সেই সাহস পাচ্ছে না। এভাবে কিছুক্ষণ দস্তাদস্তি করার পর হঠাৎ রিদি অনুভব করল কেউ একজন ওকে দুই বগলে ধরে শূন্যে তুলে ধরেছে! রিদি চরম অবাক হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে শুভ্র। শুভ্র নির্বিকার মুখে বলল।
“তাড়াতাড়ি দেখ, তোর এই ভুটকি শরীরকে আমি বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারব না।”
রিদি শুভ্রের কথা কানেই তুলল না, কোনো উত্তর না দিয়ে আয়না দেখে চটপট সুন্দর করে টিকলিটা পরে ফেলল। কাজ শেষ হতেই শুভ্র ওকে নিচে নামিয়ে দিল। রিদি এবার শুভ্রের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আহ্লাদী গলায় বলল।
“কেমন লাগছে? সুন্দর লাগছে না আমায়?”
শুভ্র এক পলক নির্লিপ্ত চোখে তাকাল। তারপর দেখল টিকলিটা একটু ত্যাড়া হয়ে আছে, ও হাত বাড়িয়ে খুব যত্ন করে টিকলিটা সোজা করে দিল। ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে বলল।
“খারাপ লাগছে না, ভালোই লাগছে।”
রিদি সাথে সাথে গাল ফুলিয়ে অভিমানে বলল।
“তার মানে কি খুব বেশি ভালো লাগছে না?”
শুভ্র স্বাভাবিক গলায় বলল।
“আমার কাছে তোকে ন্যাচারালই বেশি ভালো লাগে। এসব আজগুবি জিনিসপত্র পরলে আমার বিরক্ত লাগে।”
রিদি মুহূর্তের মধ্যে রাগে আগুন হয়ে গেল। সে ঝট করে মাথা থেকে টিকলিটা খুলে আগের জায়গায় ছুড়ে মারতে মারতে বলল।
“ধুর! নেবোই না!”
বলেই রিদি গাল ফুলিয়ে অভিমানে গটগট করে অন্য পাশের একটা দোকানে চলে গেল। শুভ্র আড়ালে একটু আলতো হাসল; রিদির এই বাচ্চাদের মতো রাগ ওর বেশ লাগে। ও নিঃশব্দে রিদির ফেলে রাখা সেই টিকলি জোড়া কিনে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল, যেন খুব মূল্যবান কোনো সম্পদ। তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশানের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল।
“ঈশান, তুমি শুভ্রার পিছে থাকো। আমি রিদির পিছে যাচ্ছি।”
ঈশান ত্যাড়া করে ভ্রু নাচিয়ে সায় দিল। শুভ্র সরাসরি গিয়ে রিদির ঠিক পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়াল; রিদি তখন মুখ ভার করে হাতের একগাদা ব্রেসলেট ওলটপালট করে দেখছে।
এদিকে শুভ্রা পড়েছে মহাবিপদে। কাঁচের চুড়ি পছন্দ করতে গিয়ে ও হিমশিম খাচ্ছে, কোনোটাতেই মন ভরছে না। হঠাৎ দোকানের এক কোণে এক জোড়া আকাশী রঙের রেশমি চুড়ির দিকে ওর চোখ আটকে গেল। ও তড়িঘড়ি করে চুড়িগুলো হাতে পরে হাতটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। ঠিক তখনই পেছন থেকে এক জোরালো কণ্ঠ ভেসে এল।
“হুম, খুব সুন্দর লাগছে।”
শুভ্রা চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল ঈশান দাঁড়িয়ে। ও নিজের হাতটা ঈশানের চোখের সামনে নাচিয়ে উৎসুক হয়ে বলল।
“সত্যি ঈশান ভাইয়া? ভালো লাগছে তো?”
ঈশান নির্লিপ্তভাবে বলল।
“হুম।”
শুভ্রা এবার আর কোনো রাখঢাক না রেখে সরাসরি আবদার করে বসল।
“তাহলে এটা আমাকে কিনে দেন?”
ঈশান একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমতা আমতা করে বলল।
“আমি?”
শুভ্রা ঠোঁট উল্টে অসহায় ভঙ্গিতে বলল।
“হ্যাঁ, ভাইয়া তো আমাকে ফেলে ওদিকে চলে গেল, আর আমার কাছে তো এখন টাকা নাই।”
ঈশান কিছুক্ষণ পাথর হয়ে শুভ্রার মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঈশানকে এভাবে নিশ্চুপ থাকতে দেখে শুভ্রা ভাবল লোকটা হয়তো তাকে কিনে দেবে না। ওর মনটা মুহূর্তেই দমে গেল। ও চুপচাপ চুড়িগুলো খুলে সুন্দর করে তাকে রেখে দিয়ে উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করল।
ঈশানের ঘোর যখন কাটল, ও দেখল শুভ্রা অনেক দূর চলে গেছে। ও তড়িঘড়ি করে চুড়িগুলো কিনে নিয়ে শুভ্রার পেছনে পাগলের মতো ছুটল। এদিকে শুভ্রা অভিমানে মুখ কালো করে মেলার ভিড় ঠেলে যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই হাঁটছে। পেছন থেকে ঈশান বারবার “শুভ্রা… শুভ্রা…” বলে গলা ফাটিয়ে ডাকছে, কিন্তু অভিমানী শুভ্রা একবারও পেছনে তাকাচ্ছে না। ঈশান অনেক কষ্টে ভিড় ঠেলে দৌড়ে শুভ্রার সামনে গিয়ে পথ আগলে দাঁড়াল। তারপর একটু মেকি রাগ দেখিয়ে বলল।
“কখন থেকে ডাকছি, কানে কি তুলা দিয়েছ? শুনতে পাও না?”
শুভ্রা ওর দিকে একবার অবহেলার চোখে তাকিয়ে কোনো জবাব দিল না। ও পাশ কাটিয়ে আবার গটগট করে হাঁটা দিল। শুভ্রার এই অবহেলা দেখে ঈশানের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।ঈশান শুভ্রার ঠিক পেছনে পেছনে হাঁটতে হাঁটতে একটু ত্যাড়া সুরে বলল।
“এইযে মহারানী, আমার কাছে কিন্তু এত রাগ মোটেও পছন্দ না।”
শুভ্রা তবুও কোনো উত্তর দিল না। গাল দুটো বেলুনের মতো ফুলিয়ে নিজের মেজাজে গটগট করে সামনের দিকে যেতে লাগল। মেলার ভিড় কাটিয়ে একটু ফাঁকা মতো জায়গায় আসতেই ঈশান এক লাফে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পকেট থেকে চুড়ির প্যাকেটটা বের করে শুভ্রার চোখের সামনে ধরে বলল।
“এই নেন আপনার চুড়ি। এখন দয়া করে রাগটা ভাঙুন তো!”
আকাশী রঙের চুড়িগুলো দেখে শুভ্রার চোখের কোণে খুশির ঝিলিক খেলে গেলেও পরক্ষণেই আবার মুখটা শক্ত করে ফেলল। ও জেদ দেখিয়ে ঈশানের হাতে চুড়িগুলো ঠেলে দিয়ে বলল।
“লাগবে না! রেখে আসেন যেখানে ছিল!”
ঈশান এবার সত্যি বেশ বিরক্ত হলো। কিছুক্ষণ আগে এই চুড়িগুলোর জন্য মেয়েটা প্রায় কেঁদেই দিচ্ছিল, আর এখন কেনার পর বলছে লাগবে না! ঈশান এবার আর কোনো কথা না বাড়িয়ে বেশ সাহসের সাথে শুভ্রার নরম হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। শুভ্রা চমকে গিয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই ঈশান আরও শক্ত করে ধরল। তারপর এক হাতে চুড়ির প্যাকেট ছিঁড়ে একটা একটা করে রেশমি চুড়ি শুভ্রার হাতে পরিয়ে দিতে দিতে গম্ভীর কিন্তু মায়াবী স্বরে বলল।
“এই নাও, পরিয়ে দিয়েছি। এখন তুমি এগুলো ভেঙে ফেলবে নাকি, ফেলে দিবে নাকি ফেরত দিয়ে আসবে সেটা তোমার ইচ্ছে। কিন্তু দয়া করে এইভাবে রাগ করে থেকো না।”
ঈশানের তপ্ত হাতের স্পর্শ আর ওর চোখের ওই স্থির চাউনিতে শুভ্রা একদম থমকে গেল। ওর সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। ও আর নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল না, বরং স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঈশান যখন পরম মমতায় ওর ফর্সা হাতে আকাশী চুড়িগুলো পরাচ্ছিল, শুভ্রার মনে হলো ওর সব অভিমান যেন ওই রেশমি সুতোর টানে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে। মেলার হাজারো শোরগোলের মাঝেও শুভ্রা শুধু ঈশানের নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। চুড়িগুলো পরা শেষ হলে শুভ্রা মাথা নিচু করে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল, ওর ঠোঁটের কোণে তখন অজানাই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
এদিকে রিদি রাগ করে একবার ওই দোকানে, আবার অন্য দোকানে হুটহাট করে যাচ্ছে। আর তার ঠিক পিছে পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে ছায়ার মতো শুভ্র হেঁটে বেড়াচ্ছে। এক পলকের জন্যও ও রিদির পিছু ছাড়ছে না। রিদিও আসলে ইচ্ছে করেই এমনটা করছে; শুভ্রকে এভাবে মেলাজুড়ে নাকে খত দিয়ে ঘুরাতে ওর ভীষণ ভালো লাগছে। এক সময় শুভ্র সত্যিই বিরক্ত হয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল।
“কিছু কিনলে কিন, না কিনলে চল এখান থেকে।”
রিদি ঠোঁট বাঁকিয়ে অবহেলার সুরে বলল।
“নিজেও তো পারেন কিছু কিনে দিতে, নাকি কিপ্টামি করবেন? ওহ হো, ভুলেই তো গিয়েছিলাম আপনি তো একটা কিপ্টুস!”
শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে রাগে ফেটে পড়ে বলল।
“ফালতু কথা একদম বলবি না, থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিবো! কি নিবি বল, আমি কিনে দিচ্ছি।”
রিদি একটুও না দমে ফিক করে হেসে দিয়ে বলল।
“দাঁত কিনে দেন! কারণ আপনি এ পর্যন্ত ‘থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিবো’ বলতে বলতে আমার সব দাঁত ফেলে দিয়েছেন। এখন নতুন করে দাঁতই কিনে দেন।”
শুভ্রের মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ভাঁজ ফুটে উঠল। ও মনে মনে ভাবছে, এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা গেল না! এদিকে শুভ্রের এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে রিদি মনে মনে বেশ মজা নিচ্ছে। শুভ্র একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল।
“ফাজলামি বাদ দিয়ে কি নিবি তাড়াতাড়ি নে!”
রিদি এবার একটু ভাব নিয়ে একটা চুড়ির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শুভ্র ওর পেছনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, যেন ওর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। রিদি আড়চোখে শুভ্রকে একবার দেখে নিয়ে মনে মনে হাসল আজ এই হিটলারকে ও মেলা ঘুরিয়েই ছাড়বে! মেলার ভিড় আর হইচইয়ের মাঝে ওদের এই খুনসুটি যেন এক অন্যরকম মাত্রা যোগ করল। শুভ্রর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলেও রিদির দিক থেকে সে চোখ সরাচ্ছে না, যেন এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করলেই রিদি কোনো নতুন ঝামেলা পাকিয়ে বসবে।
মেলার ভিড় আর শোরগোলের মাঝেই হঠাৎ শুভ্রের ফোনে একটা কল এল। স্ক্রিনে অফিসের ম্যানেজারের নামটা ভেসে উঠতেই শুভ্রের বিরক্তির সীমা রইল না। ও কপালে ভাঁজ ফেলে তড়িঘড়ি করে ফোনটা পকেটে ভরলো। পরক্ষণেই কোনো কথা না বলে রিদির হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুভ্র তাকে টানতে টানতে ভিড় ঠেলে রাবেয়া, এহসান, ইমন আর সাহেরা চৌধুরীর কাছে নিয়ে গেল। মুরুব্বিদের কাছে রিদিকে এক প্রকার সোপর্দ করে দিয়ে শুভ্র তপ্ত চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল।
“শোন, অফিস থেকে জরুরি কল আসছে। কথা বলার জন্য আমাকে একটু দূরে যেতে হবে। তুই আম্মু আর ফুপিদের সাথেই থাকবি। খবরদার! এখান থেকে যদি এক পা নড়িস, তবে তোর পা একদম গুঁড়ো করে ফেলবো।”
কথাটা বলেই রিদির কোনো উত্তরের তোয়াক্কা না করে শুভ্র ঝড়ের বেগে মেলার ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে গেল। রিদি একদম অসহায় আর করুণ চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল। ওর আম্মু আর মামিরা তখন মহাব্যস্ত থালা-বাসন আর হাঁড়ি-পাতিলের দোকানের দরদাম নিয়ে। রিদি মনে মনে গালি দিল। “ধুত্তোর! আসলাম মেলায় ঘুরতে, মজার মজার খাবার খেতে আর এখন আমাকে পাহারা দিতে হচ্ছে এই আলুমিনিয়ামের হাড়ি-পাতিল?” ওর মনটা মুহূর্তেই তিতা হয়ে গেল।
মন খারাপ করে রিদি যখন চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে নখ খুঁটছিল, ঠিক তখনই পাশ থেকে এক চেনা কণ্ঠ ভেসে এল।
“আরে রিদি না?”
রিদি মুখ তুলে তাকাতেই দেখল সামনে রাসেল দাঁড়িয়ে। রাসেল রিদিকে আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে মুগ্ধ স্বরে বলে উঠল।
“ওয়াও! শাড়ি পরেছো? তোমাকে তো আজ দারুণ মায়াবী লাগছে রিদি!”
রাসেলকে এই মেলায় দেখে রিদি বেশ অবাক হলো। ও হালকা একটু ম্লান হেসে সৌজন্যের খাতিরে বলল।
“থ্যাংক ইউ ভাইয়া। আপনি এখানে?”
রাসেল হেসে উত্তর দিল।
“অবাক হচ্ছো তো? আসলে প্রতিবারই আমি এই মেলায় আসি। কিন্তু এবার এসে যে হুট করে তোমার দেখা পেয়ে যাব, সেটা ভাবতেও পারিনি। তা তুমি মেলায় না ঘুরে মরা মানুষের মতো এখানে একলা দাঁড়িয়ে আছো কেন? বাকিরা কই? শুভ্রা, মিহি, পাখি— ওরা সব কোথায়?”
রিদি এক মুহূর্তের জন্য শুভ্রের দেওয়া সেই রক্তচক্ষু আর হাড়গোড় গুঁড়ো করার হুমকির কথা ভাবল। তারপর মুখটা আরও ভার করে নিচু স্বরে বলল।
“ওরা যে কোন দিকে ঘুরতে গেছে, আমি নিজেও জানি না।”
রাসেল বেশ উৎসাহী গলায় বলল।
“ওহ আচ্ছা! একলা দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই, চলো আমি তোমাকে পুরো মেলাটা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি।”
রিদি আঁতকে উঠে সাথে সাথে আমতা আমতা করে বলল।
“না না ভাইয়া, আমি ঠিক আছি। আমার ঘুরতে হবে না, আমি এখানেই থাকি।”
কিন্তু রাসেল যেন শোনার মতো ছেলেই না। সে রিদির কোনো ওজর-আপত্তি বা দ্বিধার তোয়াক্কা না করেই ওর হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। হাতের শক্ত মুঠোয় রিদিকে এক প্রকার হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলল।
“আরে চলো তো! মেলায় এসে এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে আছে নাকি?”
রিদি এবার সত্যি ঘাবড়ে গেল। শুভ্রের সেই রক্তচক্ষু আর “পা গুঁড়ো করে দেওয়ার” হুমকিটা ওর চোখের সামনে সিনেমার মতো ভাসছে। ও ছটফট করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল।
“না না ভাইয়া, আমি যাবো না। হাত ছাড়েন প্লিজ! আম্মু আমাকে কোথাও যেতে দিবে না।”
রাসেল এবার মোক্ষম চাল চালল। সে সরাসরি রাবেয়া এহসানের দিকে তাকিয়ে বেশ বিনয়ের সাথে বলল।
“খালা, রিদি তো এখানে একলা মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ওকে একটু মেলাটা ঘুরিয়ে নিয়ে আসি? বেশিক্ষণ লাগবে না, কথা দিচ্ছি একটু পরেই ফেরত দিয়ে যাব।”
রাবেয়া এহসান তখন হাঁড়ি-পাতিলের দরদামে মগ্ন। তিনি রাসেলের দিকে একবার তাকিয়ে আশ্বস্ত হয়ে বললেন।
“আচ্ছা বাবা নিয়ে যা। তবে সাবধানে , মেলায় যা বখাটে ছেলেদের ভিড়, দেখিস আবার কোনো অঘটন না ঘটে।”
মায়ের কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে রিদি এবার একদম কুঁকড়ে গেল। ও আবারও “না… যাবো না” বলে রাসেলের শক্ত মুঠো থেকে হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু রাসেলের গায়ের জোরের কাছে ও পেরে উঠল না। রাসেল এক প্রকার জোর করেই ওকে ভিড়ের গহীনে টেনে নিয়ে রওনা দিল। রিদি শুধু মনে মনে দোয়া পড়তে লাগল শুভ্র যেন এই দৃশ্য কোনোভাবেই দেখে না ফেলে। দেখলেই মেলায় আজ হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটে যাবে!
চারপাশে মেলার তীব্র হট্টগোল, ধুলোবালি আর মানুষের ঠেলাঠেলি। তার মাঝে রিদি অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাসেলের সাথে সামনের দিকে এগোতে লাগল। রাসেলের শক্ত হাতের ধরায় রিদির কবজিটা লাল হয়ে উঠছে, কিন্তু রাসেলের সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। সে রিদিকে নিয়ে মেলার জাঁকজমকপূর্ণ অংশটার দিকে ভিড় ঠেলে অদৃশ্য হয়ে গেল।
শুভ্র মেলা থেকে খানিকটা দূরে, একটা বড় বটগাছের নিচে নিরিবিলি ছায়াঘেরা জায়গায় এসে দাঁড়াল। মেলার হট্টগোল এখান থেকে বেশ অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ও গম্ভীর মুখে পকেট থেকে ফোন বের করে ম্যানেজার কে কল দিল। শুভ্রের গলার স্বরে এক মুহূর্তেই অফিসের বসের সেই রাশভারী ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠল। কয়েক সেকেন্ড মধ্যে রিসিভ হলো।ম্যানেজার ওপাশ থেকে বেশ বিনয়ের সাথে সালাম দিয়ে বলল।
“আসসালামু আলাইকুম স্যার। ডিস্টার্ব করার জন্য দুঃখিত, তবে একটা জরুরি খবর ছিল।”
শুভ্র একদম নির্লিপ্ত গলায় বলল।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। কাজের কথা বলুন।”
ম্যানেজার হাসিমুখে বলল।
“স্যার, সব পেপারস রেডি। খুশির খবর হলো অফিসের ওই বড় ডিলটা ফাইনাল হয়ে গেছে। ওরা আমাদের প্রস্তাবে রাজি।”
শুভ্রের মুখে কোনো বাড়তি উচ্ছ্বাস নেই, একদম পেশাদার ভঙ্গিতে বলল।
“দ্যাটস গুড। তাহলে নেক্সট প্রসেস কী?”
ম্যানেজার এবার একটু ইতস্তত করে বলল।
“স্যার, এই প্রজেক্টের কন্ট্রাক্ট সাইন করার জন্য আপনাকে একবার সশরীরে দেশের বাইরে যেতে হবে। ওরা আপনার উপস্থিতি চাচ্ছে।”
শুভ্র ভ্রু কুঁচকে একটু গম্ভীর হয়ে জানতে চাইল।
“লোকেশন কোথায়?”
ম্যানেজার উত্তর দিল।
“বস, কুয়েত যেতে হবে আপনাকে। ওরা সব অ্যারেঞ্জমেন্ট করে রাখছে।”
শুভ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতিটা চিন্তা করল। তারপর শান্ত গলায় বলল।
“ঠিক আছে। সব পেপারস রেডি রাখো, আমি ফিরে এসে চেক করে ডেট জানাবো।
কথা শেষ করে শুভ্রের মুখে চরম বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবল “এই ব্যবসা যত বেশি লাভজনক, ঠিক ততটাই যন্ত্রণার। ডিল ফাইনাল করার জন্য কথায় কথায় দেশের বাইরে যেতে হয়, জাস্ট বিরক্তিকর!” শুভ্র পেছনের বটগাছের গুঁড়িতে পিঠ ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। নিজের বিরক্তিটা সামাল দিতে বুড়ো আঙুল দিয়ে কপালের একপাশ হালকা করে চুলকিয়ে নিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা পকেটে ভরে ও আবার মেলার হট্টগোলের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
মেলার ভিড় ঠেলে শুভ্র সরাসরি রাবেয়া এহসানদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতেই ওর চোয়াল শক্ত হয়ে এল, চোখের দৃষ্টি ধারালো হয়ে উঠল। রিদিকে ঠিক যেখানে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিল, সেখানে রিদি নেই! শুভ্র চারপাশটা একবার তীক্ষ্ণ চোখে দেখে নিল, কিন্তু মেলার এই উপচে পড়া ভিড়ে রিদির কোনো চিহ্নই খুঁজে পেল না।
শুভ্র গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে রাবেয়া এহসানের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল।
“ফুপি, রিদি কই?”
রাবেয়া এহসান তখনো দোকানের একটা মাটির পাত্র হাতে নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। শুভ্রের প্রশ্ন শুনে তিনি মুখ তুলে চশমাটা ঠিক করে নিয়ে উত্তর দিলেন।
“এসেছিস বাবা? আসলে তুই যাওয়ার পর মেয়েটা মন খারাপ করে একলা দাঁড়িয়ে ছিল তো। পরে হঠাৎ রাসেল আসল। রাসেলই ওকে একটু মেলা ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য নিয়ে গেল।”
শুনে শুভ্রের পুরো শরীর যেন মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। রাসেলের নামটা শুনতেই ওর হাতের মুঠি পাকিয়ে এল। রিদি যে ওর কথা অমান্য করে রাসেলের সাথে গেছে, এটা ভেবেই ওর মেজাজ একদম তুঙ্গে চড়ে গেল। শুভ্র আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না, কোনো কথা না বলে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ও ভিড়ের দিকে পা বাড়াল রিদি আর রাসেলকে খুঁজে বের করার জন্য। আজ যে একটা বড়সড় ঝামেলা হবে, তা ওর গম্ভীর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৫
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৫
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৪