নুসাইবা_ইভানা
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৯
কিছু মানুষকে চাইলেও ভোলা যায় না। সময়ে-অসময়ে তাদের স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে হৃদয়ে। ভুলে গেলে ভালো থাকা যায় জানি, কিন্তু ভালো থাকা সবার কপালে থাকে না।
নীলাঞ্জনা নিজের চোখের কোণে জমে ওঠা জলটুকু গড়িয়ে পড়ার আগেই হাতের উল্টো পিঠে মুছে নিল। অন্তর সেই কখন থেকে উল্টোপাল্টা বলে যাচ্ছে। নীলাঞ্জনা অন্তরের কাঁধে হাত রেখে বলে, “তোমার ভালোবাসার সঙ্গী না হতে পারি, তোমার দুঃখের সঙ্গী হতে দাও। কী হয়েছে আমাকে বলো। গত চার-পাঁচ দিন ধরে ঠিকমতো খাচ্ছ না, কারো সাথে কথা বলছো না, একা একা মনমরা হয়ে পড়ে থাকছো। জাহিনের জন্য কষ্ট হচ্ছে?”
“জাহিনকে আমি খুন করে ফেলেছি, আমি খুনি। তুমি কি সারাজীবন একটা খুনির সাথে এক ঘরে বসবাস করতে পারবে?”
“কী বলছো এসব? জাহিন তো পালানোর সময় ট্রেন এক্সিডেন্ট করেছে, তুমি তো নিজেই সবটা বলেছ পুলিশের কাছে। ডাক্তারের রিপোর্টসহ আরও সব প্রমাণও আছে।”
“সব সত্যির মধ্যে সবচেয়ে বড় সত্যি হলো—আমি জাহিনের খুনি। ও আমার তুষীকে যেভাবে হত্যা করেছিল, আমিও নিজের অজান্তেই জাহিনকে একইভাবে হত্যা করেছি। শেষবার শুধু ওর ছেলেটার মুখ দেখতে চেয়েছিল, আমি সেটাও পারলাম না।”
“আমি বুঝতে পারছি না তুমি কী বলতে চাইছ।”
“তুমি কেন, পৃথিবীর কেউ বুঝবে না। আমি বাকিটা জীবন কী করে সাফার করব?”
“আমি আর নেহাল তোমার পাশে আছি। সব সময় তোমাকে আগলে রাখব। সময়ের সাথে সাথে দুঃখ সহ্য করার ধৈর্য চলে আসে। দুঃখ পেতে পেতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যায়। তখন আর দুঃখ মানুষকে দুঃখী করতে পারে না।”
অন্তর নীলাঞ্জনাকে জড়িয়ে ধরল। অন্তরের এই মুহূর্তে বিশ্বস্ত একটা বক্ষের প্রয়োজন ছিল, যে বক্ষ তাকে পরম যত্নে আগলে নেবে।
🌿
জাহিনের মৃত্যুর ষষ্ঠ দিন চলছে। চৌধুরী বাড়ি থেকে শোকের ছায়া এখনো কাটেনি। মেহনুর নিজেকে একদম গুটিয়ে নিয়েছে। বাসার কারো সাথে তেমন কথা বলে না। মিতা বেগম অসুস্থ। নাজিম চৌধুরীও ভেঙে পড়েছেন। যাকে এতগুলো দিন মৃত ভেবেছিলেন, সেই ছেলেটার ওমন ভয়ংকর চেহারা দেখতে হলো। কতটা কষ্ট পেয়ে দুনিয়া ছাড়তে হলো তাকে!
নাজিম চৌধুরী চোখের পানি মুছে বলেন, “জাহিন বাবা, তোকে জানানো হলো না তোর বাবা তোকে কতটা ভালোবাসে। আমার শাসনের আড়ালে থাকা ভালোবাসা কোনোদিন প্রকাশ করতে পারলাম না। তোর সব ভুল ক্ষমা করে আল্লাহ তায়ালা তোকে জান্নাত নসিব করুক।”
মিতা বেগম নাজিম চৌধুরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, “কেঁদো না তুমি। তোমার হার্টের সমস্যা, এত ভেঙে পড়লে অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
নাজিম চৌধুরী নিজের হাত বাড়িয়ে মিতা বেগমের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলেন, “নিজে কাঁদছ, অথচ আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছ?”
দুজনেই চুপ হয়ে গেলেন। কোনো কথা না বলে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
🌿
নয়না জাহিনের ডায়েরির লেখাগুলো ভুলতে পারছে না। জিয়ান নয়নার কোলের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। “তুমি এত কী ভাবছ বলতো?”
“আমি তোমাদের পরিবারের জন্য অশুভ, তাই না?”
জিয়ান উঠে বসল। নয়নার গালে নিজের দুহাত রেখে বলল, “এসব কী বলছ বাটার মাশরুম? দেখো, আমরা কেউ জানি না ভবিষ্যতে কী হবে, কে বেঁচে থাকবে আর কে মারা যাবে। তাই এসব কিছুতেই আমাদের হাত নেই। এই যে আমাদের একসাথে হওয়া, এটা কি কোনোদিন কল্পনা করেছিলে? আমি কি কোনোদিন কল্পনা করেছিলাম তুমি হবে আমার অর্ধাঙ্গিনী? আমি তোমার সাথে কত অন্যায় করেছি যা ক্ষমার অযোগ্য, তবুও তোমার ভালোবাসা আমার করা ভুলগুলোকে মাড়িয়ে আমাকে আগলে নিয়েছে। আমরা যা পরিকল্পনা করি, জীবন সেভাবে চলে না। জীবন চলে জীবনের নিজস্ব গতিতে। মাঝখানে কিছু মানুষের ভুলের মাশুল দিতে দিতে অনেকগুলো মানুষকে সাফার করতে হয়। মানুষ সব সময় ভুলটা সহজে বুঝে নেয়। জাহিন ছোটবেলা থেকে জেদি ছিল। বাবা ওকে শাসন বেশি করত, কিন্তু তার মানে তো এটা নয় যে বাবা জাহিনকে কম ভালোবাসত? সব সময় জাহিন নিজের মনমানি করে গেছে। আম্মু সব সময় জাহিনের অন্যায়গুলো প্রশ্রয় দিয়েছে। মানুষ বলে না—কচু গাছ কাটতে কাটতেই মানুষ ডাকাত হয়? তাই ছোট ছোট ভুল ধরিয়ে দিয়ে শাসন করা উচিত ছিল। একটা সময় পর জাহিন বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরপরের কাহিনি তো তোমার জানা। জাহিন অনেক অন্যায় করেছে। প্রত্যেক মানুষকে তার কর্মফল ভোগ করতে হয়, হোক সেটা দুনিয়ায় অথবা পরকালে।”
“কিন্তু তুষী যদি ভুলটা না করত? জাহিন ভাই হয়তো সত্যি আমাকে অনেক ভালোবাসত। ভালোবাসার মানুষকে অন্যের হতে দেখার মতো যন্ত্রণা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। জাহিন ভাইয়ের অনুভূতি বা তার অবস্থা আমরা কেউ বোঝার চেষ্টা করিনি। হয়তো তার সাথে বসে কেউ যদি তার মনের কথাগুলো শুনত, তাহলে এত কিছু হতো না। দেখো, সব সমস্যার মূলে কিন্তু আমিই।”
জিয়ান নয়নাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে বলল, “নিজেকে দোষ দেওয়া বন্ধ করো। এখানে তোমার কোনো হাত নেই। তুমি যদি জাহিনের সাথে রিলেশন করতে বা জাহিনকে ঠকিয়ে আমাকে বিয়ে করতে, তাহলে তোমার দোষ হতো।”
নয়না জিয়ানের শার্ট খামচে ধরে বলে, “সব ঠিক হতে হতে কেন আবার এলোমেলো হয়ে গেল? কেন আমার জীবনে সুখ আসতে আসতে থমকে যায়?”
“কারণ এরপর সুখ সব দুঃখকে পেছনে ফেলে একদম সব সময়ের জন্য তোমাকে আলিঙ্গন করবে। দুঃখ আছে বলেই তো সুখের এত মূল্য।”
জিয়ান নয়নার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে বলে, “তোমার মনটা হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো নরম। আমি তোমার এই নরম মনে কত আঘাত করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
নয়না জিয়ানের ঠোঁটে হারিয়ে যেতে যেতে বলল, “ভালোবাসায় ক্ষমা বলে কোনো শব্দ নেই। ভালোবাসা শুধু ভালোবাসার বিনিময়ে সব ভুলচুক মিটিয়ে নেয়।”
ধীরে ধীরে সব দুঃখ উপেক্ষা করে দুজনে দুজনের মধ্যে হারিয়ে যেতে লাগল।
মেহনুর জারিফের দিকে তাকিয়ে আছে। জারিফ ঘুমিয়ে আছে। মেহনুর জারিফের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে, “তুই আমার সন্তান, তোর জন্য আমিই যথেষ্ট। তোর বাবা কোনোদিন আমাকে ভালোবাসেনি। সে একজনকে ভালোবেসে সব ভালোবাসা ফুরিয়ে ফেলেছিল। আমার কী মনে হয় জানিস? তুই আমার জীবনে এসেছিস আমার বেঁচে থাকার উৎস হয়ে। তোর বাবার স্পর্শে কখনো ভালোবাসা ছিল না। সেই স্পর্শে সব সময় ছিল দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শারীরিক চাহিদা। সে কোনোদিন আমাকে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দেয়নি, তাই তার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ বা অভিমান নেই। তবে কিছুটা আক্ষেপ আছে—সে কেন এভাবে আমার সামনে থেকে চলে গেল? শত হোক আমার স্বামী ছিল তো। খারাপ হোক ভালো হোক, তার মৃত্যু আমার জন্য বড্ড পীড়াদায়ক। মনে হচ্ছে মানুষটা যেতে যেতে ওই আধখোলা চোখ দিয়ে আমাকে যেন কিছু বলতে চাইছিল। অথচ কোনোদিন সে কথা আর জানা হবে না।”
নিজের সাথে কথা শেষ করে মেহনুর জারিফের কপালে চুমু দিল।
🌿
জাহানারা বেগম এশার নামাজ শেষ করে বেডের ওপর বসলেন। মাহবুব তালুকদার শুয়ে ছিলেন। তিনি মৃদু কণ্ঠে বললেন, “তোমরা কি কোনোদিন আমাকে ক্ষমা করবে না? আমি তো নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছি। বলো কীভাবে বললে বা কী করলে তোমরা আমাকে ক্ষমা করবে?”
“তোমার ক্ষমা কি আমার ছেলের শৈশব-কৈশোর ফিরিয়ে দেবে? তুমি জন্মদাতা পিতা হয়ে নিজের ছেলেকে কী করে এতিমখানায় ফেলে রাখলে! একজন মাকে কী করে তার সন্তানের মৃত্যুর মিথ্যে সংবাদ শোনালে? সমাজ আর তোমার নামের মর্যাদা সন্তানের কষ্টের চেয়েও বেশি মাহবুব? অথচ মেয়েমানুষ নিজের সন্তান আর স্বামীর জন্য সব ছাড়তে পারে, সব বিসর্জন দিতে পারে। এখন ক্ষমা না চেয়ে তোমার বংশের নাম আর সমাজ নিয়ে ভালো থাকো মাহবুব। আমি আমার নাফীকে মানে অনিকেতকে বলতে পারব না তোমার মতো মানুষকে ক্ষমা করতে। মানুষ কি এতটা মহান হতে পারে মাহবুব? একবার কল্পনা করো তো, কত মানুষ আমার ছেলেটাকে এতিম বলে অবহেলা করেছে, অসম্মান করেছে। তুমি শুধু ওই সময়গুলো বদলে দাও, তাহলেই হবে। ক্ষমা চাইতে হবে না।”
চলবে
বিঃদ্র দুঃখী গতকাল রাতে দেয়ার কথা ছিলো কিন্তু আমি সময় করে লিখে শেষ করতে পারিনি৷ একমদ শেষ প্রান্তে চলে এসেছে কাহিনি। কারো কোন কনফিউশান থাকলে জনাবেন৷ হ্যাপি রিডিং 🥰
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী, অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ১৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব পর্ব ৩৬( সম্পূর্ণ)
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২২+২৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১০