অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৬৪)
সোফিয়া_সাফা
সবাই টেবিলে লাঞ্চ করতে বসে পড়লেও উদ্যান ধীরপায়ে কিচেনের দিকে চলে গেল। কিচেনে তখন ব্যস্ততা তুঙ্গে; ফুল তাড়াহুড়ো করে বাটিতে বাটিতে খাবার সাজাচ্ছে। উদ্যানকে হঠাত সামনে দেখে ফুলের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সে ব্যস্ত গলায় বলল, “আপনি গিয়ে বসুন, আমি এখনই টেবিলে খাবার দিচ্ছি।”
উদ্যান কোনো উত্তর না দিয়ে নিঃশব্দে ফুলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ঝুড়ি থেকে একটা টকটকে লাল স্ট্রবেরি তুলে নিয়ে আয়েশ করে কামড় দিল সে। তারপর নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, “Happy marriage anniversary”
ফুলের বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠলেও সে হাসি ম্লান হতে দিল না। মাথা নিচু করে ছোট করে বলল, “ধন্যবাদ।”
আবারও কাজে মনোযোগী হয়ে উঠল ফুল। উদ্যান তখন তার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। ফুলের পিঠ এসে উদ্যানের বুকে ঠেকল। উদ্যান একহাতে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল, “গুগল বলল, এই দিনে বউকে গিফট দিতে হয়। তো বল, তোর কী গিফট চাই।”
ফুল দুহাতে উদ্যানের হাতটা আঁকড়ে ধরে বলল, “আমি শুধু আপনাকে চাই। গিফট হিসেবে হোক বা জীবনের শেষ ইচ্ছে হিসেবে হোক।”
উদ্যান নিজের মুখটা ফুলের কাঁধের ওপর এলিয়ে দিল। নিচু গলায় বলল, “আমাকে তো বিগত দিনগুলোতে অগণিত বার পেয়ে গেছিস। তবুও এখনো মন ভরে নি?”
ফুলের গাল গরম হয়ে উঠল। “শুধু আপনার দেহ না, আমি আপনার মনও চেয়েছি।”
“যা নেই তা চেয়ে কী লাভ?”
ফুল ঘাড় ঘুরিয়ে তার পাথুরে চোখের দিকে তাকাল। উদ্যান উদাস গলায় বলল, “মন নেই। অন্য কিছু চা।”
ফুলের ভেতরটা গুমরে উঠল। একটু থেমে বলল, “আমি শেষ নিঃশ্বাস অবধি আপনার সাথে থাকতে চাই।”
উদ্যান এবার বিরক্ত হয়ে ফুলকে ছেড়ে দিল। সে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল, “তোর চাহিদা দেখছি অনেক বড়।”
ফুল ঘুরে দাঁড়িয়ে উদ্যানের চোখের মণি বরাবর চাইল। “নিয়ে যান না আমাকে নিজের সাথে! আমি আপনার সব কাজ করে দেবো, কখনো কোনো অভিযোগ করবো না। শুধু… শুধু আপনি অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকাবেন না।”
উদ্যান একটু ভাব নিয়ে বলল, “চাওয়াটা অনেক বড় বাট আমি তোকে একটা সুযোগ দিতে চাই। আগামী দুই মাস তোর পরীক্ষা নেবো। দুই মাস পরেও যদি তোর প্রতি আমার কোনো ইন্টারেস্ট থাকে তাহলে আমি নিয়ে যাবো তোকে।”
ফুলের মুখটা মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন মেঘের আড়াল থেকে সূর্য উঁকি দিয়েছে। সে অবিশ্বাস্য গলায় বলল, “আপনি সত্যি বলছেন?”
“হুম সত্যি বলছি। বাট আমার মনে হয় না দুই মাস পর আমাকে আকৃষ্ট করার মতো তোর মাঝে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে।”
ফুলের উজ্জ্বল মুখটা সঙ্গে সঙ্গেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। উদ্যানের এই অবমাননা তার অভ্যেসে পরিনত হয়েছে, তবুও বুকটা হু হু করে উঠল। সে নিজেকে শান্ত করে বলল, “তবুও আমি পুরোদমে চেষ্টা করে যাবো।”
“ওকে, বেস্ট অফ লাক।”
রাতের বেলা সোহম, লুহান আর মেলো মিলে ফুলের জন্য সারপ্রাইজ রাখল। দুজন মেইড গিয়ে ফুলকে টেরেসে আনতেই ফুল হতভম্ব হয়ে গেল। পুরোটা টেরেস ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। ফ্লোরেও ফুলের পাপড়ি বিছিয়ে পথ বানানো হয়েছে। সেই পথ ধরে ফুল হেঁটে গিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে কেক কাটল। তার মুখটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে আজ কতোটা খুশি।
কিছুক্ষণ পর সোহম এগিয়ে গিয়ে তাকে গিফট ধরিয়ে দিল। একটা নয় পুরো তিনটা, ফুল জিজ্ঞাসু দৃষ্টে তাকাতেই সে একগাল হেসে বলল, “এগুলো আমার, অনির আর অনিলার পক্ষ থেকে।”
লুহানও পিছিয়ে থাকল না। সেও তিনটা গিফট এগিয়ে দিয়ে বলল, “এখানে আমার, রিদম আর উর্বীরও আছে। উর্বী দিয়েছে তোমার বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে।”
এতোগুলো গিফট সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেল ফুল। মেইডরা সাহায্য করল সেগুলো নিতে। মেলো এগিয়ে এসে বলল, “যদিও তোমার সাথে আমার আরও আগেই দেখা হয়েছিল তবুও সবাই যখন দিচ্ছে তখন আমি কেন বাদ যাবো? এই নাও এটা আমার তরফ থেকে।”
“আমি কি এগুলো নিতে পারি মাস্টার?”
উদ্যান চুপচাপ বসে ছিল চেয়ারে। ফুলের জিজ্ঞাসায় মাথা নেড়ে নিতে বলল। তারপর নিজের আঙুলে থাকা ফুলের আংটিটায় হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করল, “তোর ছোটোবেলা থেকেই গিফট পাওয়ার ভাগ্য আছে। সবাই কেন যে তোকে নিয়ে এতো মাতামাতি করে বুঝিনা।”
ফুল মিষ্টি হেসে প্রত্যুত্তর করল, “গিফট তো আজ আপনিই প্রথমে দিলেন। মাতামাতি আপনিও কম করেন নি।”
উদ্যান অলস ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। ফুলকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় বলল, “দেরি যেন না হয়।”
এই ক্ষণিকের আনন্দটুকু বুকের এক কোণে জমিয়ে রেখে ফুল তৈরি হতে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর, ধীর পায়ে সে এগিয়ে গেল উদ্যানের রুমের দিকে।
উদ্যান তখন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল, ফোনের নীলচে আলো তার মুখে এক ধরণের কঠোরতা তৈরি করেছে। দরজা খুলে যাওয়ার যান্ত্রিক শব্দে সে রুমে ফিরে এসে দেখল; ফুল দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একগুচ্ছ প্রিমরোজ ফুল, আর লম্বা চুলগুলো আজ পরিপাটি করে বিনুনি করা। উদ্যান ফোনটা টেবিলে রেখে ত্রস্ত পায়ে ফুলের দিকে এগোতে লাগল; ফুল বিনা দ্বিধায় দৌড়ে এসে তাকে জাপ্টে ধরল। হাতের ফুলগুলো মেলে ধরে আবদারের সুরে বলল, “এই ফুলগুলো দিয়ে আমাকে সাজিয়ে দেবেন?”
উদ্যান তাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে শুকনো গলায় বলল, “আমি সাজাতে নয়, সাজ নষ্ট করতে লাইক করি।”
ফুল কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল৷ মিনমিনিয়ে বলল, “জানি, কিন্তু আজ একটু সাজিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন?”
“হোয়াট ডু ইউ মিন?”
ফুল একেবারে হালকা গলায় বলল, “সবসময় কি ওসব করা যায়?”
উদ্যান বুঝে গেল ব্যাপারটা।
“যখন ওসব করা না যায় তখন আমার কাছে আসার দরকার নেই।”
“তাহলে কি চলে যাবো?”
উদ্যান হুট করেই ফুলকে টেনে নিজের কোলে বসিয়ে দিল। তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “এসেই যখন পড়েছিস তখন যেতে হবেনা।”
ফুল আরাম পেল উদ্যানের কোলে বসে। সে হাতের ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে আপনমনেই জিজ্ঞেস করল, “এই ফুল সুন্দর, না আপনার বউফুল সুন্দর?”
উদ্যান প্রাণহীন কণ্ঠে বলল, “দুটোই অসুন্দর, একদম বিচ্ছিরি।”
ফুল গাল ফুলিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। “আপনার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করেনা আমার তবুও বেহায়া মনটাকে নিয়ে আর পারা গেল না।”
উদ্যানের ঠোঁটের বাঁক সামান্য প্রসারিত হলো। সে ফুলের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে একটা প্রিমরোজ নিয়ে তার কানের পেছনে গুঁজে দিল। তারপর বাঁকা হেসে বলল, “এখন আরও বাজে দেখাচ্ছে।”
ফুল রেগেমেগে কানের কাছ থেকে ফুলটা সরিয়ে নিতে চাইল; কিন্তু মাঝপথেই উদ্যান তার হাত চেপে ধরল। তারপর একে একে সবগুলো ফুল তার বিনুনির ভাঁজে গুঁজে দিতে লাগল। বিড়বিড় করে বলল, “আজ তোকে বাজেই দেখাক, নইলে নিজেকে কন্ট্রোলে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।”
ফুল মিছেমিছি কতোক্ষণ ছোটাছুটির চেষ্টা করে থেমে গেল। কিন্তু আচমকাই এক তীব্র যন্ত্রণায় তার শরীর বেঁকে এল। সে পেট চেপে ধরে অস্ফুট স্বরে গুঙিয়ে উঠতেই উদ্যান দ্রুত তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল।
“কী হয়েছে?”
ফুল ব্যাথাতুর কণ্ঠে বলল, “পেটব্যথা করছে।”
উদ্যান তাড়াহুড়ো করে তাকে শুইয়ে দিল। পেটের ওপর হাত রেখে বলল, “কোথায়?”
ফুল তার হাতটা সরিয়ে নাভির বাম পাশে টেনে নিয়ে এল।
“এখানে… খুব টান লাগছে।”
তার দেখিয়ে দেওয়া জায়গাটার দিকে তাকিয়ে উদ্যান শুকনো ঢোক গিলল। নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “সবসময়ই ব্যাথা করে? নাকি এখনই করছে?”
ফুল ঠোঁট কামড়ে ব্যাথা নিবারণের চেষ্টা করে বলল, “এইসব দিনগুলোতে করে, তাছাড়া খুব একটা টের পাইনা।”
উদ্যান হাত সরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসল। তারপর ডুবে গেল কোনো এক গভীর চিন্তায়। ফুল ব্যাথায় কুঁকড়ে গিয়ে উদ্যানের উরু আঁকড়ে ধরে কাঁদতে লাগল। উদ্যান কিছুক্ষণ নীরব থেকে তারপর উঠে গিয়ে ওয়াটার ব্যাগে করে গরম পানি নিয়ে এলো।
ফুল উঠে বসতে চাইলে উদ্যান বাধা দিল।
“কী লাগবে বল, আমি এনে দিচ্ছি।”
ফুল যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে বলল, “পেইন কিলার।”
উদ্যান সাবধানে গরম পানির ব্যাগটা ফুলের পেটের ওপর বসিয়ে দিয়ে বলল, “নিয়মিত পেইন কিলার খাওয়া ভালো নয়। আগে দেখ গরম পানিতে কমে কিনা।”
ফুলের কানে উদ্যানের কথা বিষের মতো লাগল। সে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ল, “আমাকে ছটফট করতে দেখতে আপনার খুব ভালো লাগছে, তাই না? সেই জন্যই চাইছেন না আমার ব্যাথা কমে যাক। আপনি খুব নির্দয়, আমাকে কাঁদাতে ভালোবাসেন। আমাকে অসহায় হয়ে পড়তে দেখতে আপনার খুব ভালো লাগে। ইউ আর আ হার্টলেস মনস্টার।”
উদ্যানের চোখ লাল হয়ে এলো। সে জিভ দিয়ে গালের ভেতরটা ঠেলে নিজের রাগ দমানোর চেষ্টা করল। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “হ্যাঁ, তুই ঠিকই বলেছিস। আমার এই গরম পানির ব্যাগটাও নিয়ে আসা উচিত হয়নি।”
এক ঝটকায় উদ্যান ওয়াটার ব্যাগটা তুলে ঘরের কোণে ছুড়ে মারল। তারপর রাগে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে সে হনহনিয়ে ক্লোজেটের দিকে চলে গেল। ফুল শুধু ঝাপসা চোখে তার চলে যাওয়ার পথের পানে তাকিয়ে রইল। তার বুক চেরা আর্তনাদ সারা ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো, “চলে যাচ্ছেন কেন? এনজয় করুন না এখানে বসে বসে।”
সকালবেলা যখন উদ্যান রুমে ফিরল, দেখল ফুল তার বিছানায় নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে। ধীরপায়ে সে এগিয়ে গেল। মেয়েটার ফ্যাকাশে মুখখানা দেখে বুঝতে পারল কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে গেছে। উদ্যান তার কাঁধ ধরে ঝাকি দিয়ে ডাকল, “এই ওঠ! নিজের রুমে গিয়ে ঘুমা।”
ফুল নিভু নিভু চোখে তাকাল। তার দৃষ্টিতে এক ধরণের শূন্যতা। সে কোনো কথা না বলে উঠে বসল। বিছানা ছেড়ে নামতে গেলেই উদ্যান আচমকা প্রশ্ন করল, “ব্যথাটা কি কমেছে?”
ফুল কোনো উত্তর দিল না। পেট চেপে ধরে ছোট ছোট পা ফেলে উদ্যানের রুম ত্যাগ করল।
বিছানার ওপর অযত্নে পড়ে থাকা প্রিমরোজ ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল উদ্যান। সেই সঙ্গে লক্ষ্য করল বিছানায় লেগে আছে জমাট বাঁধা র’ক্তের দাগ।
রুমে এসে ফুল ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে গিয়ে খেয়াল করল তার জামা নোংরা হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গেই ফুলের হাত চলে গেল মাথায়, “সর্বনাশ! ওনার বিছানায় লেগেছে কিনা কে জানে।”
ফুলের কান্না পেয়ে গেল, “বারবার এমন লজ্জায় কেন ফেলো খোদা?”
ফুল জামাকাপড় পালটে শাওয়ার নিল। এখন কিছুটা বেটার ফিল করছে সে। কিছুক্ষণ পর এক কাপ চা বানিয়ে সে আবার উদ্যানের দরজায় নক করল। দরজা খুলে যেতেই ফুল দেখল উদ্যান খাটের একপাশে শুয়ে আছে। হয়তো ঘুমানোর চেষ্টা করছিল লোকটা, ফুলের আগমনে তার কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেছে।
চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রেখে ফুল চোরা চোখে তাকাল খাটের দিকে। দাগগুলো নজরে আসতেই চোখ খিঁচে নিজেকেই গালি শুনিয়ে দিল। কাভার্ড থেকে নতুন বেডশিট বের করে সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আপনি কি দুই মিনিটের জন্য একটু উঠবেন? আমি চাদরটা বদলে দিতাম।”
উদ্যান বিনাবাক্যে উঠে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ফুলের প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
ফুল তাড়াহুড়ো করে বেডশিট চেইঞ্জ করে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল সেটা ধুয়ে দিতে। ফিরে এসে দেখল উদ্যান একদৃষ্টে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে। অতো ভাবনা চিন্তা না করে হাতের ভেজা বেডশিট ব্যালকনিতে শুকাতে দিয়ে এলো ফুল। ফিরে এসেও উদ্যানকে একভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে গেল সে। কৌতুহল বশত তার সামনে হাত নেড়ে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল। উদ্যানের মাঝে প্রতিক্রিয়া না দেখে সে মুখ টিপে হাসল, “জানেন আপনাকে দেখতে একদম কই মাছের মতো লাগছে।”
“হোয়াট!” আচমকা উদ্যানের জোরালো কণ্ঠ শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল ফুল।
“আপনি ঘুমান নি?”
“নো, কিছু একটা ভাবছিলাম। তুই কী বললি আমাকে?”
“কই… কিছু নাতো।”
উদ্যান সরু চোখে তাকাতেই ফুল এক ছুটে রুম ত্যাগ করল।
,
,
,
দেখতে দেখতেই কেটে গেল অনেক গুলো দিন। আর হাতে গোনা কিছুদিন পরেই উদ্যানের দেওয়া দুই মাস শেষ হয়ে যাবে।
এখন মাঝরাত, উদ্যান আর ফুল পাশাপাশি শুয়ে আছে। ঘর জুড়ে পিনপতন নিরবতা। সেই নিস্তব্ধতা চিড়ে দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ বিচরণ করছে। টিমটিমে লাইটের সবুজ আলোয় ফুল উদ্যানের বুকে আঁকিবুঁকি করছিল। উদ্যান চোখ বুজে থাকলেও তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বলে দিচ্ছে সে জেগে আছে।
“আমি লক্ষ্য করেছি, আমি যখন আপনার বুকে কিস করি তখন আপনার হার্টবিট ফাস্ট হয়ে যায়।”
উদ্যান চোখ না মেলেই নির্লিপ্ত সুরে উত্তর দিল, “জাস্ট ফিজিক্যাল রেসপন্স। স্টিমুলাস পেলে হার্টবিট বাড়ে, শরীর নিজের মতো রিঅ্যাক্ট করে।”
“আমি চেয়েছিলাম শারিরীক স্পর্শ ছাড়াও আপনার হার্টবিট ফাস্ট করে দিতে। যেমনটা আমি দূরে থেকেও আপনার কথা ভাবলেই আমার হার্টবিট ফাস্ট হয়ে যায়।”
“অপ্রয়োজনীয় কথা না ভেবে এটা ভাব সময় কিন্তু শেষের দিকে।”
“আমি তো নিজের মতো চেষ্টা করেই যাচ্ছি, বাকিটা আপনি জানেন।”
উদ্যান চুপ হয়ে গেল। ফুল সোজা হয়ে শুয়ে নরম গলায় বলল, “আপনার সাথে মেক্সিকো যাওয়ার সৌভাগ্য হয়তো হবেনা আমার। তবুও এই কয়েক দিন আপনার সাথে থাকতে পেরে ভালো লেগেছে। আচ্ছা আমার কথা কি আপনার মনে পড়বে?”
উদ্যান তবুও নিরুত্তর রইল। ফুল পাশ ফিরে প্রশ্ন করল, “একটা গান শুনবেন?”
উদ্যান ভ্রু উঁচিয়ে তাকাতেই ফুল মৃদু হেসে ফিসফিসিয়ে গাইল, “মানা কে হাম ইয়ার নেহি..
লো ত্যায় হ্যায় কে প্যায়ার নেহি..!”
ফুল আলতো হাতে উদ্যানের চোখ ঢেকে রেখে তার বুকে মাথা রেখে গাইল, “ফির ভি নাজরে না তুম মিলানা… দিল কা ঐতবার নেহি…!!
মানা কে হাম ইয়ার নেহি…..”
উদ্যান হঠাৎই শোয়া থেকে উঠে বসল। খাট থেকে নামতে যাবে তার আগের ফুল তার হাত আঁকড়ে ধরল। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে জানতে চাইল, “কোথায় যাচ্ছেন?”
উদ্যান তার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, “ওয়াশরুমে।”
উদ্যান কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দেখল ফুল চোখ বুজে আছে। সে একহাতে ওয়াটার বোতল তুলে নিয়ে পানি খেতে খেতে কাভার্ডের দিকে এগিয়ে গেল। সেখান থেকে সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিয়ে ব্যালকনির দিকে হাঁটা ধরল। তার গায়ে তখন একটা ব্যাগি প্যান্টস আর গ্রে রঙের শার্ট।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর উদ্যান যখন রুমে ফিরল, দেখল ফুল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে বেশ কয়েক মিনিট স্থির চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিঃশব্দে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে তার কপালে এক দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল। সেই আদরের পরশ একে একে গাল, নাক আর থুতনি ছুঁয়ে সবশেষে ঠোঁটে এসে থমকাল। অত্যন্ত সাবধানে তর্জনী দিয়ে ফুলের গালের ওপর অবিন্যস্ত হয়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল সে। গায়ের ওপর কমফোর্টারটা টেনে দিয়ে উদ্যান উঠে দাঁড়িয়ে ক্লোজেটের দিকে চলে গেল।
ঘড়ির কাঁটা তার আপন গতিতে এগিয়ে চলল। প্রায় পনেরো মিনিট পর ফুলের চোখের পাতা কেঁপে উঠল। সে আলতো করে চোখ মেলে তাকাল। উল্টো হাতে ঠোঁট মুছে বিড়বিড় করল, “সিগারেট খাইয়ে দিলো আমায়। কী তেতো রে বাবা!”
একগ্লাস পানি পুরোটা ঢকঢক করে খেয়ে লম্বা শ্বাস নিল ফুল। আস্তেধীরে পাজোড়া খাটের বাইরে নামিয়ে রাখতেই তার শরীর শিউরে উঠল। কোমরের নিচের অংশ মনে হচ্ছিল এতোক্ষণ প্যারালাইজড হয়ে ছিল; হঠাৎ নড়াচড়া করতেই তীব্র এক যন্ত্রণা হাড়ের ভেতর দিয়ে বয়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে সেই কষ্টটুকু গিলে নিল।
“দানব রে, প্রতিদিন এতো এনার্জি কোত্থেকে পায় কে জানে।”
ভেজা চুলগুলো হাতখোপায় বেঁধে নিয়ে ফুল উঠে দাঁড়াল। ওড়নাটা মাথায় জড়িয়ে নিয়ে সে কাঁপাকাঁপা পায়ে ক্লোজেটের দিকে এগোল। প্রায় দিনই ফুল লক্ষ্য করেছে উদ্যান মাঝরাতে উঠে ক্লোজেটে যায়। ফুল কয়েকবার তার পিছু পিছু গিয়েছিল কিন্তু ক্লোজেটে গিয়ে উদ্যান যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। ফুল দিনের বেলায় এসে চেক করেও দেখতে পারেনা কারণ তখন অ্যালেক্স ডিউটিতে থাকে। রাতের বেলা ফুলের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার পূর্বে উদ্যান অ্যালেক্সকে শাট ডাউন করে দেয়। তাই একমাত্র এই সময়টাতেই ফুল বিনা বাধায় যেখানে ইচ্ছা সেখানে যেতে পারে।
মিনিট খানেক উদ্যানকে হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজির পর ক্লান্ত হয়ে পড়ল ফুল।
“আজও ভ্যানিশ হয়ে গেছে? আমি পরিষ্কার দেখেছি উনি এদিকেই এসেছিলেন।”
একটা শেলফের সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়ল ফুল। মনে হয়না সে আজও খুঁজে পাবে উদ্যানকে। তার হয়তো রুমে ফিরে গিয়ে সত্যি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়া উচিত। ফুল উঠে দাঁড়িয়ে দেয়ালে ভর দিয়ে দিয়ে ফিরে আসতে চাইল তখনই একজায়গায় এসে সে থেমে দাঁড়াল। এই স্থানের দেয়াল কিছুটা নড়বড়ে লাগছে। ফুল একটা শুকনো ঢোক গিলে দেয়ালের দিকে তাকাতেই দেখল সেটা একটা গোপন দরজা। খুব নিখুঁত ভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। ফুল হয়তো বুঝতেই পারতো না যদি না দরজাটা ভিড়িয়ে রাখা থাকতো।
অজানা আশঙ্কায় ফুলের গলা শুকিয়ে এল। সে দরজাটা ঠেলে উঁকি দিতেই আধো আলোয় এক সুড়ঙ্গ উন্মোচিত হলো।
দেয়াল হাতড়ে হাতড়ে ফুল সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল। জায়গাটা কেমন যেন গা ছমছমে রহস্যময়তায় ঘিরে আছে। ফুলের মন বলছে ফিরে যেতে কিন্তু মস্তিষ্ক বলছে কৌতুহল মেটাতে। সে চাইলেও ফিরে যেতে পারবে না কারণ সে দেখতে চায় উদ্যান প্রায়শই কোথায় চলে যায়। কী এমন কাজ আছে তার এখানে?
আঁকাবাঁকা সিঁড়ির ধাপগুলো পেরিয়ে নিচে আসতেই এক ধরনের কটু গন্ধ তার নাকে ঝাপটা দিল। সেই সাথে হঠাৎ করে তাপমাত্রা যেন হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেল। অসহ্য ঠান্ডায় ফুল নিজেকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। এখানকার দেয়ালগুলো অদ্ভুত; দেখতে মাটির মতো হলেও আসলে সেগুলো সিমেন্টের তৈরি। ফুল যত এগোচ্ছে, তার বুকের ভেতরটা ততোই ভারি হয়ে আসছে।
জায়গাটা অকারণেই নিস্তব্ধতায় মোড়া। চারপাশটা অদ্ভুত সব পেইন্টিং আর শোপিস দিয়ে সাজানো। কিছু কিছু শোপিস দেখে ফুলের লোম খাড়া হয়ে গেল। সে ভয়ে ভয়ে উদ্যানকে ডাকতে যাবে তখনই পাশের দেয়ালের ওপর চোখ আটকে গেল। দেয়ালে লাগানো বিশাল বিশাল কাঁচের শো-কেস। প্রতিটি শো-কেসের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে একজন করে মানুষ। একদম স্থির, নিস্পন্দ। তাদের চোখগুলো খোলা অথচ মণিগুলো প্রাণহীন।
ফুল ঘোরের বশে টলতে টলতে এগিয়ে গেল সেদিকে। সামনে এসে দাঁড়াতেই তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল যেন। তিনটা শো-কেসের মধ্যে পুরুষ আর একটা শোকেসের মধ্যে একজন নারী; সেই নারীটি হলো ফ্লোরা। ফুলের চোখ ঝাপসা হয়ে এল। উদ্যান তাকে বলেছিল ফ্লোরা নিজের বাড়িতে চলে গেছে তাহলে এখানে কী করছে? সবচেয়ে বড় কথা তাকে এই শো-কেসের মধ্যে রাখা হয়েছে কেন? ফ্লোরাকে একভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফুলের শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল।
সে দৃষ্টি সরিয়ে বাকিদের দিকে তাকাতেই তার মনে হলো সে তাদেরকেও এর আগে দেখেছে। মস্তিষ্কের ওপর চাপ দিতেই ফুলের মানসপটে ভেসে উঠল সেইদিনের দৃশ্য যেদিন আবেশ আর সে কক্সবাজার বীচে খারাপ লোকেদের পাল্লায় পড়েছিল। তখন সে এই তিনজন লোকের কাছেই সাহায্য চেয়েছিল।
ফুল বেশিকিছু ভাবতে পারল না, আপাতত তাদের স্থির চাউনি দেখে তার কলিজা শুকিয়ে গেছে। আচ্ছা এই চারজনও কি উদ্যানের মতো চোখ খোলা রেখেই ঘুমাচ্ছে? ফুল আনমনেই পিছিয়ে গেল কয়েকপা। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে বড়ো বড়ো পা ফেলে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। ফ্লোরা এখানে কী করছে সেই জবাব উদ্যানকে দিতেই হবে। তবে কি ফ্লোরার সাথে সময় কাটাতেই উদ্যান রাত বিরাতে এখানে চলে আসে? না, আজ এর একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে সে।
সুবিস্তীর্ণ সেই ভূগর্ভস্থ হলরুমটা পেরিয়ে কয়েক কদম সামনে যেতেই ফুল দেখতে পেল; উদ্যান কোনো এক কাজে গভীর ভাবে মনোনিবেশ করে আছে। উদ্যান উল্টো দিকে ফিরে থাকায় ফুল ঠিকমতো বুঝতে পারল না সে ঠিক কী করছে। তবে পেছন থেকেই তার নজরে এল; উদ্যানের গায়ে নীল রঙের অ্যাপ্রন, মাথায় সার্জিক্যাল ক্যাপ এবং হাতে আঁটসাঁট সার্জিক্যাল গ্লাভস। পরিবেশটা অনেকটা অপারেশন থিয়েটারের মতো হলেও তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি শীতল।
ফুল অত্যন্ত সন্তর্পণে পা টিপে টিপে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই কোথা থেকে ‘তান’ বিদ্যুৎগতিতে বেরিয়ে এল এবং ফুলের দিকে তেড়ে গিয়ে বিকট শব্দে ঘেউঘেউ করে উঠল।
“আহ্!” গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল ফুল। তড়িৎবেগে উদ্যান ঘুরে তাকাল। দানবটার চেহারায় ছিটকে লেগে থাকা রক্তের তাজা দাগগুলো নজরে আসতেই ফুলের সমস্ত ইন্দ্রিয় স্তব্ধ হয়ে গেল।
সেই সাথে উদ্যানের সামনে থাকা টেবিলের ওপর শুইয়ে রাখা একটা লাশ চোখের সামনে উন্মোচিত হতেই নিঃশ্বাস আটকে এল তার। লাশটার মুখ থেকে চামড়া খুব নিখুঁতভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে।
একদিকে তানের চেঁচামেচি আরেকদিকে এমন বিভৎস দৃশ্য দেখে ফুলের পৃথিবী দুলে উঠল। মুখ চেপে ধরে কাঁপতে কাঁপতে আঙুল উঁচিয়ে সেই লাশের দিকে ইশারা করল সে। উদ্যান সঙ্গে সঙ্গে উল্টো ঘুরে চাদর টেনে লাশটার মুখটা ঢেকে দিল।
ফুলের চোখের অবিশ্বাস্য চাউনি দেখে উদ্যান একপা এগিয়ে যেতেই ফুল ঘাবড়ে গিয়ে পিছিয়ে গেল কয়েকপা। উদ্যান কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই যাবে কিন্তু তার আগেই ফুল উল্টো ঘুরে দৌড় লাগালো।
তাকে এভাবে রিয়্যাক্ট করতে দেখে বিমূঢ় হয়ে পড়ল উদ্যান। চটজলদি হাতের গ্লাভস, অ্যাপ্রন, মাথার ক্যাপ খুলে তার পিছু নিল।
তাড়াহুড়ো করে দৌড়াতে গিয়ে ফুল বেশ কয়েকবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে নিল তবুও কোনোমতে উদ্যানের রুম থেকে বেরিয়ে সে নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। যদিও সে জানে উদ্যান এই দরজা তুড়ি মেরেই খুলে ফেলতে পারবে। তবুও সে মরিয়া হয়ে ঘরের চেয়ার-টেবিল টেনে এনে দরজার সামনে পাহাড় তৈরি করল। ততক্ষণে উদ্যান দরজার ওপাশে এসে পৌঁছেছে।
ফুল বুঝতে পারল, সে বেশিক্ষণ উদ্যানকে আটকে রাখতে পারবে না। দিকবিদিকশূন্য হয়ে সে ওয়াশরুমে ঢুকে নিজেকে বন্দি করল। সে ভেবেছিল উদ্যান হয়তো এখানে ঢুকবে না, কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণ করে উদ্যান কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভেতরে ঢুকে পড়ল। ফুলের টলমলে চোখ আর রক্তশূন্য মুখ দেখে উদ্যানের কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়ল।
“এমন করছিস কেন?”
উদ্যানের প্রশ্নে ফুলের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
“কেন করছি বুঝতে পারছেন না? আপনি একজন খুনি! আমার স্বামী... আমার একমাত্র ভালোবাসার মানুষটা একজন খুনি?”
উদ্যান নির্দ্বিধায় ফুলের দিকে এগিয়ে গেল। ফুল দেয়ালের সাথে যতটা সম্ভব সিটিয়ে দাঁড়াল। উদ্যান তার এতটা কাছে চলে গেল যে তার গরম নিঃশ্বাস ফুলের কপালের ওপর আছড়ে পড়ছে। উদ্যান দেয়ালে একহাত ঠেকিয়ে ফুলকে আবদ্ধ করে ফেলে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, “তুই ভুল দেখেছিস তেমন কিছুই…”
ফুলের হৃৎপিণ্ড যেন পাঁজরের হাড় ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার বিধ্বস্ত দশা দেখে উদ্যান কথা থামিয়ে দিতে বাধ্য হলো। নিচু স্বরে শুধাল, “আর ইউ ওকে?”
ফুল হাপাতে হাপাতে বলল, “আমি ভুল দেখেছি? তাহলে সঠিক কোনটা উদ্যান? ওটা কোনো মানুষের লাশ ছিল না? আপনার চেহারায় লেগে থাকা এগুলো র’ক্ত নয়?”
উদ্যান চোখ বন্ধ করে নিল, “ডোন্ট ফা`ক উইথ মি বাই কলিং মি উদ্যান।”
ফুল আচমকাই উদ্যানের শার্টের কলার খামচে ধরল, “দ্যাটস মাই মিস্টেক, ইউ আর আ ক্রিমিনাল, ইউ আর আ মার্ডারার।”
উদ্যান প্রবল ক্ষিপ্রতায় ফুলের গাল দুটো চেপে ধরল, যাতে সে আর কথা বলতে না পারে।
“ইউ আর আ মিস্টেক, তুই কি আমাকে ক্রাইম বা মার্ডার করতে দেখেছিস? দেখিসনি। সো না জেনেশুনে চেঁচাবি না।”
কাঁদতে কাঁদতে ফুলের পুরো মুখশ্রী লালবর্ণ ধারণ করল। উদ্যান বুঝতে পারল ফুল একই সাথে রাগ, দুঃখ, কষ্ট সব অনুভব করছে। আচ্ছা তার তো ফুলকে এই অবস্থায় দেখে এনজয় করার কথা ছিল, তাই না? তাহলে, কী এমন হয়েছে যে সে এনজয় করতে পারছে না? হ্যাঁ, উদ্যান কোনো এক অজানা কারণে ফুলের এই বিধ্বস্ত রূপ উপভোগ করতে পারছে না। বরং ইচ্ছে করছে ফুলের সামনে সবটা এক্সপ্লেইন করতে।
উদ্যান ভড়কে গেল নিজেরই ভাবনায়। সে দ্রুত হাত বাড়িয়ে শাওয়ারের নবটা অন করে দিল। পানির সংস্পর্শে আসতেই ফুল সরে যেতে চাইল কিন্তু উদ্যান দুহাতে তাকে শাওয়ারের নিচেই স্থির করে রাখল। বিড়বিড়িয়ে বলল, “এবার যতখুশি কাঁদ।”
ভেজা শরীরে ফুলকে দেখে উদ্যানের ঘোর লেগে গেল। সে আচ্ছন্ন হয়ে ফুলের দিকে মুখ এগিয়ে নিতেই ফুল অকস্মাৎ তার হাতটা টেনে নিয়ে নিজের মাথার ওপর রাখল।
কান্নাভেজা স্বরে আর্তি জানিয়ে বলল, “বলুন… আমার কসম খেয়ে বলুন যে আপনি খুনি নন। আপনি কাউকে খুন করেননি।”
উদ্যান একমুহূর্ত থেমে বলল, “তুই সিওর, আমি তোর কসম খেয়ে মিথ্যা কথা বলবো না?”
“আমি সিওর নই, আমি জানি আপনি আমার মৃ’ত্যু কামনা করেন তবুও আমি শুধু বিশ্বাস করতে চাই আপনি খু’নি নন।”
“কেন বিশ্বাস করতে চাইছিস? নিজের জীবনের প্রতি কি একটুও মায়া নেই?”
“মায়া জীবনের প্রতি না থাকলেও ভালোবাসার প্রতি আছে। বিশ্বাস করতে চাইছি কারণ আমি আপনাকে ঘৃণা করতে চাই না।”
উদ্যান থমকে গেল, “আমি মার্ডার করেছি জানলে তুই ঘৃণা করবি আমায়; ভালোবাসবি না আর?”
“আমি জানিনা, কিন্তু ভয় হচ্ছে। আপনি কাউকে খু’ন করেছেন এটা আমি মেনে নিতে পারব না, বিশেষ করে নিরপরাধ কাউকে।”
উদ্যানের মনে হলো তার গলাটা হঠাৎ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ফুল তাকে ভালোবাসবে না; এই চিন্তাটা কেন জানি তার মস্তিষ্কে এক বিচিত্র অস্থিরতা তৈরি করল। সে দ্রুত যুক্তি টেনে নিজেকেই বোঝাল, ‘মেয়েটা তাকে ভালো না বাসলে সে তো প্রতিনিয়ত তাকে কষ্ট দিতে পারবে না। স্রেফ সেই কারণেই হয়তো তার খারাপ লাগছে।’
“কী হলো বলুন? আপনি কাউকে খু`ন করেননি তো?” ফুলের আকুতি আরও তীব্র হলো।
উদ্যান নিজের সমস্ত বিক্ষিপ্ত ভাবনা একদিকে সরিয়ে রেখে অন্য হাতে শাওয়ারটা অফ করে দিল। চারপাশটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সে গলা পরিষ্কার করে বলতে শুরু করল, “আসলে…”
“আপনি শুধু বলুন আপনি কাউকে খু’ন করেন নি। এটুকু বললেই হবে, বাকিটা আপনি বলতে চাইলে আমি তারপর শুনবো।”
ফুলের কণ্ঠস্বর সময়ের সাথে সাথে ক্ষীণ হয়ে আসতে শুরু করল। উদ্যান বুঝতে পারল ফুল কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। তার মাথা ঘোরাচ্ছে হয়তো। উদ্যান শক্ত করে ফুলের কোমর আঁকড়ে ধরল; যাতে ফুল নিচে পড়ে গিয়ে ব্যাথা না পায়।
“বলুন… প্লিজ বলুন।”
উদ্যান দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ঠোঁট নাড়ল।
“আমি কাউকে খু`ন…” বাকিটুকু আর বলতে পারল না সে।
ফুল অশ্রুসিক্ত নয়নে বাকিটুকু শোনার আশায় চেয়ে রইল। কিন্তু উদ্যান হঠাৎ করেই যেন এক অদৃশ্য দাহনে জ্বলে উঠল। সে এক ঝটকায় ফুলের মাথার ওপর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নেওয়া মাত্রই ফুল ঢলে পড়ল তার বুকের ওপর।
উদ্যান কিছুক্ষণ ফুলের নিথর দেহটা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর অতি সাবধানে তাকে পাজাকোলা করে রুমে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজের হাতেই পাল্টে দিল তার ভেজা কাপড়গুলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, উদ্যান ফুলের জ্ঞান ফেরানোর কোনো চেষ্টাই করল না। যেন সে চাইছেই না ফুল এখনই জেগে উঠুক। খাটের এক কোণে বসে উদ্যান নিজের হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝে উঠতে পারল না একটু আগেই তার সাথে ঠিক কী হলো। কেন সে ফুলের মাথায় হাত রেখে মিথ্যা কথা বলে দিতে পারল না?
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৬০০+
(১২ ঘন্টাতেই বোঝা গেল এই গল্পের পাঠকরা কতটা ডেঞ্জারাস। সাফাকে সাফার করানোর জন্য ধন্যবাদ! এই প্রথম সাফার করেও ভালো লাগলো আমার। ভালোবাসা নিবেন প্রিয় পাঠকগণ।)
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৫ (এর বর্ধিতাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৩