Golpo romantic golpo প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা

প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪৬


প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা //৪৬//

ফারজানারহমানসেতু

নেওয়াজ বাড়ির ছাদে রাতটা যেন একটু অন্যরকম। নীচে এখনো গানের শব্দ ভেসে আসছে… ঢোলের তালে তালে হাসির শব্দ, খুনসুটি… কিন্তু ছাদের এই কোণায়,শুধু দুজন মানুষ আর তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ।

রোজা এখনও তূর্জানের বুকে মুখ গুজে দিয়ে আছে। তূর্জানের আঙুলগুলো আলতো করে রোজার চুলে ঘুরছে।কিছুক্ষণ চুপ থেকে রোজা বলল,“আপনি আগের মতো নেই…”

তূর্জান ভ্রু তুলল,“ কেন? আগে কেমন ছিলাম?”

“আগে, একটু বেশি পাগল ছিলেন।”

তূর্জান হেসে ফেলল,“ পাগল মনে হয় তোর ?”

রোজা মাথা নাড়ল,“না… এখন বেশি বিপজ্জনক মনে হয় ।”

“কেন?”

রোজা চোখ তুলে তাকাল,“আগে আপনি ভালোবাসতেন, আর এখন আমার সুখের অসুখ হয়ে হৃদপিন্ডে গেঁথে গেছেন।”

তূর্জান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ করে রোজার কপালে ঠোকা দিল,“এইসব ডায়লগ কোথা থেকে শিখিস?”

রোজা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,“ কার থেকে শিখবো? আপনার কাছ থেকেই শিখেছি !”

“ওহ! তাহলে ছাত্রী ভালো আছে । অল্পতেই বিদ্যা অর্জন করতে জানে।”

“স্যারও খারাপ না…”

দুজনেই হেসে উঠল। হঠাৎই তূর্জান রোজাকে দোলনায় শুইয়ে দিল,রোজার মুখের উপর নিজের মুখ নিয়ে যেতেও রোজা চোখমুখ কুচকে নিল। ঠোঁট তিরতির করে কাপছে অজানা আশঙ্কায়। তূর্জানের তপ্ত নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে রোজার চোখেমুখে। হঠাৎ তূর্জান উঠে বসল,

“কাউকে নিজের দূর্বলতা দেখালে সে ওই দূর্বলতাকে হাতিয়ার বানিয়ে আরও দূর্বল করে দেয়। আর যে দূর্বলতা প্রকাশ করে সে কখনো তার কাঙ্খিত জিনিস পায়না “

তাই নিজেকে সেল্ফ কন্টোলে রাখাই ভালো। তূর্জানের কোনো বার্তা না পেয়ে রোজা চোখ খুলে তাকাতেই দেখল। তূর্জান পাশে বসে ফোন স্কল করছে। রোজা নিজের শাড়ি ঠিক করে বসল। তূর্জানের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছে এতক্ষন সে স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল। ফোন রেখে আকাশ পানে চেয়ে শুয়ে পড়ল। আনমনে রোজার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আজকের আকাশ টা একটু বেশি সুন্দর।”

রোজা আকাশ পানে তাকিয়ে বলল,

“কোথায়, আমার তো মনে হচ্ছে না। আকাশ তো আগের মতোই আছে।”

তূর্জান রোজার দিকে তাকিয়ে বলল,“আমার এখান থেকে তো সুন্দর মনে হচ্ছে।

বলতেই রোজা তূর্জানের পাশে শুয়ে পড়ল। এতক্ষনে তূর্জান যা চাচ্ছিলো তাই হলো, তার অর্ধাঙ্গিনী না চাইতেও তার পাশে শুয়েছে। তবে তূর্জান নেওয়াজ তো তূর্জান নেওয়াজই কোনো কিছু মুখ ফুটে বলবে না। তবে ছলে বলে কলা কৌশলে তা ঠিক করে নেবে।

রোজা বলল,“আমি ভেবেছিলাম আপনি পাগল, এখন দেখছি চোখেও সমস্যা। এখন আপনাকে পাবনার পাগলা গারদে সত্যি সত্যিই পাঠাতে হবে। সাথে চোখের ভালো ডক্টরের কাছে নিতে হবে।“

“কেন?”

“কোথায় আকাশ আজকে বেশি সুন্দর? “

“আমার “আকাশপ্রিয়া’কে তো আজ বেশিই সুন্দর লাগছে। “

“আপনার আকাশ, বলেই হেসে আবার বলল,

“আমি সাধে বলি আপনার বউয়ের কপালে দুঃখ আছে। “

বলেই জিভ কামড়ে ধরল, মনে মনে আওড়াল, “সরি আমিই তো আপনার বউ, ওই একই হলো এতদিন ভাবতাম আপনার বউ মানে আমি পাগল বুড়া জামাই পাবো। এখন দেখছি কানা জামাই ও পেয়ে গেছি। “

“তুই আবার বিরবির শুরু করেছিস?”

“ তো কি করবো? আপনি একটা পাগল। চোখে সমস্যা। আমি পাগলের সংসার করবো না। না মানে না!”

বলতেই তূর্জান রোজার গ্ৰিবাদেশে কামড় বসালো। রোজা চোখমুখ খিচে নিল। দুহাতে ঠেলে দিতে চেয়ে বলল, “ অসভ্য লোক। এভাবে রাক্ষসের মতো কামড়ে দিচ্ছেন কেন? “

তূর্জান ছেড়ে দিয়ে বললো, “ কি যেন বলছিলি? “

“ ভুলে গেছি। “

“ আর কখনো বলবি? “

“ পাগল না-কি? আমি আমার হাজবেন্ডকে কেন ছাড়বো? আর ছাড়া কথাটা কোথায় ব্যবহার করা হয় আমি তাই জানি না। এটা কি একটা ওয়ার্ড? সরুন তো, জ্বলে যাচ্ছে। রাক্ষস একটা।”

তূর্জান আলতো করে চুমু একে দিল কা’ম’ড় দেওয়া জায়গাটাতে। রোজা একটু ছাড়া পেতেই তূর্জানের গ্ৰিবাদেশে কা’ম’ড়ে দৌড় দিল। তূর্জান মিটিমিটি হেসে আওড়াল, “ এখনো ছোটবেলার মতোই পাগলী আছিস। শোধ ভালো করেই নিতে জানিস। তবে শোধ নিতে গিয়ে ট্যাগ তো অন্য কিছুর বসিয়ে দিয়ে গেলি। “


নীচে তখন আয়োজন শুরু হয়েছে। তুবাকে গোসল করানো শেষ। নতুন হলুদ শাড়িতে স্নিগ্ধ লাগছে মেয়েটাকে। নতুন সাজে সেজেছে আজ।রাফেজের ডাকে রাফিয়া আসছি বলে তুবাকে রেডি করে বললো নিচে আসতে।

ওদিকে রাফেজ নিজের পাঞ্জাবী কোথায় রেখেছে খুজে পাচ্ছে না। রাফিয়া রুমে যেতেই অবাক, রুমের সাথে একপ্রকার যুদ্ধ সেরেছে মনে হচ্ছে। রাফিয়াকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাফেজ ভ্রু কুচকে বলল, “ ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন? “

“ তুমি যুদ্ধ করেছো রুমে ? “

“ মানে? “

রাফিয়ার আর কি বলার? এখন সব গোছাতেই দিন শেষ। ধুর ভালো লাগে না। একটা মানুষ অগোছালো হয় কেমন করে?

“ কিছু না। কি জন্য ডাকছিলে?”

“ তোমাকে দেখার জন্য!”

“ এ্যাহ! আমাকে দেখার জন্য? না খাটানোর জন্য? কোনটা? “

“ বউ আমার কষ্ট বোঝে না। সারাদিন কাজ কাজ করো, হাজবেন্ড না থাকলেও তো তোমার কিছু যায়, আসবে না। “

“ কি জন্য ডেকেছিলে? “

“ পাঞ্জাবী খুজে পাচ্ছি না। “

“ তোমার গায়ে কি? “

“ পাঞ্জাবী। “

“ খুজে পাচ্ছো না কি? “

“ বউ। “ বলেই এগিয়ে এসে রাফিয়াকে আবদ্ধ করলো, নিজের বাহুডোরে। রাফিয়া রাফেজের চেয়ে উচ্চতায় কম হওয়ার দরুন উচু হয়ে তাকাতে হলো। রাফেজও সরাসরি তাকালো রাফিয়ার চোখে। বিষন্নতায় ছেয়ে আছে, অথচ কোলাহলে পূর্ণ ওই দুচোখ।

রাফেজ নিচু হয়ে আলতো করে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল, “ মেয়ে মানুষকে ওতটাও শক্ত হওয়া উচিত না বুঝলে। যতটা হলে তার ভিতরে ভেঙেচুরে গেলেও কেউ বুঝবে না। “

“ তুমি আমাকে দুর্বল হতে বলছো? “

“ উহু, শুধু একটু নিজের কষ্ট শেয়ার করে স্বস্তিতে থাকতে বলছি। “

রাফিয়া এবার নিজেকে ছাড়াতে ব্যাস্ত হলো। তার কাছে দুর্বল মানে কিছু নেই। তবে চোখের পানি যে তা বলছে না। বাধ ভেঙে গড়িয়ে পড়তে চায়ছে। রাফেজ দুহাতে রাফিয়ার মুখ আগলে নিয়ে বলল, “ রাফিয়া, আমি এখনো তোমার আপন হতে পারিনি, তাই তো? “

রাফিয়া এবার কান্নার বাধ ছুটে গেল। আর নিজেকে সামলাতে পারছে না। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেল প্রিয় পুরুষের বক্ষে। ফুফিয়ে উঠে বলল, “ আমি আর সত্যিই নিজেকে সামলাতে পারছি না। বিশ্বাস করো, হাপিয়ে গেছি। আমি বাবা-মায়ের স্মৃতি ভুলতে পারিনি, আর না রোজার ওই অতীত। ওইটুকু বোন আমার কত কষ্ট সহ্য করলো। জানো, আমি দেখেছি, এই কয়দিন ওর স্মৃতি ফেরার পর, লুকিয়ে কান্না করতে। জানো ও না আমার থেকেও ভীষণ লুকান্তর। কাউকে কিচ্ছু বুঝতে দেয় না। হাসিখুশি থাকে। কিন্তু আমি তো ওর বোন, আমি ঠিকই ওর কষ্ট বুঝতে পারছি।

“ জানো রাফিয়া, আমার দেখা সেরা নারী তুমি। “

রাফিয়া এবার সরু চোখে তাকালো। রাফেজ আলতো হাতে চোখের পানি মুছিয়ে দিতেই কর্ণগোচর হলো, “ পাপা, মাম্মা কাদছে কেন? তুমি মাম্মাকে মেরেছো? “

ছেলের কথা শুনে রাফেজ ফ্যালফ্যাল করে তাকালো। দুষ্ট ছেলে বাবা মায়ের প্রাইভেসি বোঝে না। রাফিয়া ছুটতে চাইলেও রাফেজ ছাড়লো না। আরাজ দৌড়ে মায়ের কাছে গিয়ে বলল, “ মাম্মা, পাপাকে আবার বিদেশ পাঠিয়ে দিবো। পচা পাপা না থাকলেও তুমি কান্না করো, আসলেও তোমাকে বকে, কান্না করায়। “

রাফিয়া চোখ বড় বড় করে তাকালো ছেলের পানে। ছেলে তার সত্যিই মুখপাতলা। পেটে কিচ্ছু থাকে না। রাফেজ রাফিয়াকে ছেড়ে দিতেই দূরে সরে দাড়াল। ছেলেকে এবার কোলে তুলে নিয়ে বলল, “ তোমার মাম্মা কান্না করে? “

“ হুমম তো। মাম্মা যখন কষ্ট পায়, তখন কান্না করে। তোমার জন্য, পিপির জন্য, ওহ সরি খালামনির জন্য। “

রাফেজ তাকাতেই রাফিয়া চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালো। রাফেজ আরাজকে চোখ বন্ধ করতে বললো। আরাজ দুহাতে চোখ ঢেকে নিতেই, রাফেজ রাফিয়ার কাছে গিয়ে হয়তো কপালে ঠোঁট ছোয়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। তখনি রোজা রুমে ঢুকে গেল। দুহাতে চোখ ঢেকে অন্ধের মতো করে বলল, “ সরি, সরি, আমি কিছু দেখিনি। “

রাফিয়া রাফেজের বাহুতে আস্তে থাপ্পড় দিয়ে দূরে সরে দাড়াল। রাফেজ রোজার দিকে তাকিয়ে বলল, “ তোমার টাইমসেন্স বড্ডো খারাপ শালিকা। অন্তত যা হওয়ার ছিল, তা দেখে কথা বলতে। “

মানে কি? রোজা রুমে চলে এসেছে, আবার দেখে ফেলছে, তাতেও সমস্যা নেই। কথা বলেছে জন্য সমস্যা। রোজা এবার চোখ থেকে হাত সরিয়ে হেসে বলল, “ পরের বার থেকে দেখে তারপর বলবো। বড় বাবা তোমাকে ডাকছে দুলাভাই । “

“ কেন? “

“ জানিনা। তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে। “

আরাজকে কোলে নিয়েই রাফেজ চলে গেল। রাফেজ যেতেই রোজা দৌড়ে রাফিয়াকে জড়িয়ে ধরল। রাফিয়াকে নির্বিকার হয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে রোজা গালে একটা চুমু দিয়ে দিলো। রাফিয়া তাও চুপ। ছোট বেলায় যখন রোজা ভুল করতো, আর রাফিয়া অভিমান করতো, তখন রোজা বোনের চুল এলোমেলো করে দিয়ে আরো রাগিয়ে দিত।

কিন্তু এখন তো বড়, আর এতোদিন পর কিভাবে বোনের রাগ ভাঙাবে কে জানে? নিশ্চই রাফিয়াকে আগে জানায়নি জন্য অভিমান করেছে। রোজা আস্তে করে গালে কামড়ে দিল। নাহ রাফিয়া তাও রাগ করছে না। যতক্ষণ রাফিয়া রাগ না করে ততক্ষন রাফিয়ার অভিমান যাবে না।

রোজা এবার কান ধরে নরম শুরে বলল, “ সরি, আর কখনো এমন করবো না। “

“(….)”

“ আপু তুই, এখন বড় জায়ের মতো ব্যবহার করছিস কেন? একটু বোনের মতো থাক না। মিস করছি তো আমি, আমার সেই ছোটবেলার আপুকে। “

“ (….)”

“ দুলাভাই তো কিছুই করেনি। তাহলে এমন বোবা হয়ে গেলি কেন? না কি..?

রাফিয়া আস্তে করে রোজার পিঠে কিল বসিয়ে দিল। অভিমানী সূরে বললো, “ আমি কে তোর? আমার কাছে কি চাই? “

“ তুই আমার মায়ের পরের যে ব্যক্তি থাকে, সে। আমার আপনজন। আমার আপু। “

“ হয়েছে, আর ঢং করতে হবে না। “

“আচ্ছা ভালো,নিচে ডেকেছে তোকে। তাড়াতাড়ি আয়। “

বলেই ওপর গালে ঠোঁট ছুইয়ে যেতে যেতে বলল, “ দুলাভাইয়ের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করলাম।
ওহ হ্যাঁ কি বললি একটু আগে,আমার কি চাই,আপাতত কিছু চাই না। তবে একটা মেয়ে বাবুর মুখ থেকে খালামনি শুনতে ইচ্ছে করছে।”

“ তোর শাড়ি থেকে তূর্জান ভাইয়ার পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছি। “

কেউ কাউকে ছাড় দিলো না। রোজা নিজের প্রতিপক্ষের উত্তরে চুপসে গেল। ওই লোককে এমন পারফিউম ইউস করতে হবে কেন? যে কাছে গেলেই ওই পারফিউমের গন্ধ এমনভাবে রোজার গায়ে আটকে যায়।


ঘড়ির কাটা প্রায় নয়টার ঘরে। নেওয়াজ বাড়ির সকল বড় সদস্য তাদের রিচুয়াল শেষ করে ফেলেছে। গার্ডেন থেকে এখন সবাই ছাদে চলে এসেছে।

তুবা এতক্ষন আরিয়ানের সাথে কথা বলেছে।ইশ কি মারাত্মক সুন্দর লাগছিলো আরিয়ানকে, ফর্সা গায়ে হলুদ যেন চিপকে লেগে অস্বাভাবিক সুন্দর দেখাচ্ছিলো। কিন্তু ঠোঁটকাটা পুরুষ যা নয় তাই বলে তুবাকে লজ্জা দিয়ে গেছে।

নূর এগিয়ে এসে তুবাকে কিছু বলতেই ধপাস করে পিঠে মারল। এদিকে বেচারা সমুদ্র বউকে জীবনে উচু করে কথা পর্যন্ত বলেনি, এতদিনে। তার বউকে এভাবে মেরে দিলো ধুপধাপ। মানে হাজবেন্ডের চেয়ে বান্ধবীদের অধিকার বেশি? “

মিরান বললো, “ তুবা আম্মুরা তো তাদের সব রিচুয়াল করে ফেলেছে। এবার আমরা শুরু করি আমাদের রিচুয়াল। “

তুবা মিরানকে উদ্দেশ্য করে বলল,“প্রথমে ভাইয়ারা আর -ভাবিরা আসুক!”

মিরান সাথে সাথে মনে মনে বলল,“হ্যাঁ, আজকের স্টার কাপল,তূর্জান, রোজা! রাফেজ, রাফিয়া। তুবা, আরিয়ান। নূর, সমুদ্র।আর আমি বেচারা এখনো ওই নারীর মনই পেলাম না।”

মুখে বললো, “ তা তোর ভাবিরা আর ভাইয়ারা কোথায় গেছে? “

“ নিচে আছে। চলে আসবে। “

“ আসলেই ভালো, কাপল সব একসাথে রয়েছে। আর আমার কপাল। “

তুবা মিরানকে বললো, “ মিরান ভাই, এদিকে আসো। “

“ মারবি না কি? “

“ হোপপপপ, এদিকে এসো। একটা বুদ্ধি দিই। “

মিরান এগিয়ে আসতেই তুবা কানে কানে ফিসফিস করলো। মিরান তুবার মাথায় গাট্টা মেরে বললো, “ ইউ আর জিনিয়াস তুবু। আরিয়ান জাস্ট বুদ্ধির হাড়ি পেয়েছে। “

তুবা ঠিক বুঝলো না। প্রশংসা না অপমান ছিলো।
ওদিকে মিরান অনন্যার পাশে গিয়ে দাড়াল।
দুজনের মাঝে অদ্ভুত নীরবতা।মিরান বলল,
“ হেই মিস ধাক্কাধাক্কি, তুমি এখনো রাগ করে আছো?”

অনন্যা তাকাল না,বলল,“না।”

“মিথ্যে বলো না।”

“ বললেই আপনার কি? “

আমারই তো সব। বলতে গিয়েও বললো না। বললো, “ ছাদের কোনে বসে আছো কেন? “

“ এমনি, কোলাহল ভালো লাগছে না। “

“ তুমি চাইলে রেস্ট নিতে পারো? “

“ থ্যাংকস, বাট আ’ম নট ইন্টারেস্ট। “

আর কি? এই মেয়ে তো গুনে গুনে কথা বলে। কি অসহ্য? মিরান আর কিন্তু বললো না। যদিও তুবার আইডিয়া দেখা যাক কাজে দেয় কি না? তূর্জান ছাদে এসেছে খানিকক্ষণ। ফোনে ব্যাস্ত আছে। রাফেজ আসবে না এইসবে বলে দিয়েছে।

রোজা আর রাফিয়া আসতেই নূর এগিয়ে গেলো। রাফিয়া তুবার কাছে গেল। রোজার নাক টেনে বলল, “ হেই মিসেস নেওয়াজ। দিনদিন সুন্দরী হচ্ছিস, রহস্য কি? “

“ ধ্যাৎ রহস্য টহস্য কিছু না।”

“ কিন্তু তুই যার নামে ভার্সিটিতে এতকথা বললি প্রথম দিন , তার প্রেমেই পড়ে গেলি। ইটস নট ফেয়ার!”

“ তখন কি জানতাম না-কি, উনিই আমার রাজ্যের রাজা হবেন। আর হবেন কি? আমাদের তো আরো দশবছর আগেই বিয়ে হয়ে গেছিলো। “

“ এ্যাহহ!”

“ হ্যাঁ। এবার ওদিকে চল।“

“ এইইই দাড়া। “

“ আবার কি? “

নূর চুল আলগোছে সরিয়ে দিয়ে বললো, “ তোর ঘাড়ে কিসের দাগ? “

“ কি বলিস তুই? আমার ঘাড়ে দাগ আসবে কি করে? আর এই আবছা আলোয় তুই দাগ দেখছিস কিভাবে?“ বলেই হাত দিলো ঘাড়ে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল তূর্জান নেওয়াজের কথা। অসভ্য লোক!

রোজাকে চুপ থাকতে দেখে নূর বললো, “ আচ্ছা এত কি ভাবছিস? বললেই তো হয়, কিছু কামড়ে দিয়েছে। তোর মনে নেই, এর আগে কি পোকা কামড়ে দিয়েছিলো? “

সত্যিই তো রোজাকে এর আগে পোকা কামড়ে দিয়েছিলো। কিন্তু এটা তো পোকার কাজ নয়, তাও যে যা বোঝে। রোজা মাথা নাড়ালো।দুজনে তারপর খুচরো গল্প মেতে উঠলো। তূর্জান এতক্ষনে খেয়াল করলো, রোজা শাড়ি পাল্টে তূর্জানের দেওয়া একটা শাড়ি পড়ে এসেছে। মনেহয় শাওয়ার নিয়েছে।চুল কোমড়ের নিচ অব্দি ছড়িয়ে আছে। এখন শাওয়ার নেওয়ার কি আছে আজব? ঠান্ডা লাগলে তখন? ভাবনার মাঝেই মিরান এনাউসমেন্ট করলো “এই! একটা গেম খেলবো!”

নূর সাথে সাথে,“কি গেম ভাইয়া ?”

“Arm Wrestling! একদিকে ছেলেরা অন্যদিকে মেয়েরা। যার গ্ৰুপ হেরে যাবে তাকে একটা গান গাইতে হবে। তবে রুলস অনুযায়ী দুই গ্ৰুপ থেকে একজন একজন করে যাবে।”

চারদিকে আবার উৎসাহ,“ইয়েসসস!”

ছেলেরা একে একে হাত লাগাচ্ছে। সমুদ্র আর নূর প্রথমে গেল। একেবারে সিরিয়াস হয়ে গেছে নূর মনে হচ্ছে । কি আর করার বউয়ের মন রাখতে হাতে হাত দিতেই সমুদ্র জিতিয়ে দিল।
ফলস্বরূপ গান গাইতে হলো।

ঠিক তখনই মিরান চোখ টিপে তুবার দিকে তাকিয়ে বলল,“এবার স্পেশাল ম্যাচ! তূর্জান ভাইয়া বনাম রোজা!”

“ওওওও!”চারদিক গর্জে উঠল।

তূর্জান আগেই বলে দিয়েছিলো, এসব উদ্ভট খেলায় ও নেই। তাতে কি? জনতাকে উস্কে দিলে, প্রতিপক্ষের আর কিছুই করতে হয় না। যা করার জনগনই করে দেয়। তূর্জানের ক্ষেত্রেও তাই হলো। তাই পকেটে ফোন রেখে অগত্যা এসে বসল সামনের চেয়ারে। রোজা তূর্জান কে বসতে দেখে সাথে সাথে বলল,“না না! আমি পারবো না!”

তূর্জান ঠোঁটের কোণে হাসি এনে বলল,“ভয় পাচ্ছিস?”

রোজা চোখ কুঁচকে,“আমি?আর ভয়?”

“ওকে দেখা যাবে।”

দুজন মুখোমুখি বসলো। রোজা হাত রাখতেই তূর্জান তার হাতটা ধরল গরম, শক্ত, আর দৃঢ়।
রোজার বুক ধক করে উঠল একবার।

মিরান বলল,“৩… ২… ১… স্টার্ট!”

শুরুতেই রোজা জোরে চাপ দিল,কিন্তু তূর্জান একটুও নড়লো না।বরং একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,“এইটুকু জোরে আমাকে হারাবি?”

রোজা দাঁত চেপে বলল,“দেখবেন!”

তূর্জান ইচ্ছে করেই একটু চাপ বাড়াল,রোজার হাত ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগল।সবাই চিৎকার করছে,“তূর্জান ভাই জিতবে!”

রোজার চোখে জেদ চেপে গেল।বলল,“না… আমি হারবো না!”

তূর্জান হালকা হেসে আবার বলল,“ যা তোকে জিতিয়ে দিবো, কিন্তু হারলে আমাকে কি দিবি?”

রোজা এক ঝলক তাকাল,“আপনি আগে জিতেন!”

“ডিল?”

“ডিল!”

কিছু সেকেন্ড টানটান লড়াই…তারপর হঠাৎ, তূর্জানের হাত একটু ঢিলে হয়ে গেল। রোজা সুযোগটা নিয়ে জোরে চাপ দিলধাপ! তূর্জানের হাত টেবিলে লেগে গেল।

“রোজা জিতেছে!!!” চারদিকে চিৎকার, হাততালি দিচ্ছে উপস্থিত মেয়েরা!রোজা হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে দাঁড়াল,“দেখলেন? আমি জিতেছি!”

তূর্জান ধীরে হাত ঘষতে ঘষতে বলল,
“হুম।”

তার চোখে সেই চেনা দুষ্টু হাসি। রোজা ভ্রু কুঁচকে তূবললর্জানের সামনে এসে বলল,,“আপনি ইচ্ছে করে হারলেন, তাই না?”

তূর্জান একটু ঝুঁকে কানের কাছে বলল,“সবার সামনে বলবো?”

রোজার গাল লাল হয়ে গেল,“মানে…?”

“মানে, বউ আমাকে ঘুষ দিতে চেয়ে জিতেছে ।”

রোজা ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখল,” সে যেভাবেই জিতি না কেন? জিতেছি তো আমি।”

“ তো..?

“তাহলে আমার জেতার প্রাইজ?”

তূর্জান চোখে চোখ রেখে বলল,” ডিল হয়েছে তোকে জিতিয়ে দিলে, আমি যা চাইবো তাই পাবো। তাহলে তুই কি পাবি? “

“ কিছু না। পরে বুঝে নিবো। এখন হেরে যাওয়ার সেলিব্রেশন করুন, ঝটপট গান গেয়ে ফেলুন। “

তাই হলো। রুলস হিসেবে মিরান তূর্জানের হাতে গিটার তুলে দিল। তূর্জান আগে গিটার বাজাতো, এখন ওতোটা পারফেক্টলি না হলেও, পুরোনো অভ্যাস এখনো আছে। গিটারে সূর তুলে গেয়ে উঠলো,

“ মেঘের খামে
আজ তোমার নামে,
উড়ো চিঠি পাঠিয়ে দিলাম..।
পড়ে নিও তুমি,
মিলিয়ে নিও, খুব যতনে তা লিখেছিলাম..!
‘মেঘের খামে
আজ তোমার নামে,
উড়ো চিঠি পাঠিয়ে দিলাম..।
পড়ে নিও তুমি,
মিলিয়ে নিও, খুব যতনে তা লিখেছিলাম..!
ওও চাই পেতে আরো মন,
পেয়েও এতো কাছে..!
বলতে চেয়ে মনে হয়,
বলতে তবুও দেয়না হৃদয়,
কতটা তোমায় ভালোবাসি..!”

গানটা শেষ হতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো ছাদটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।কেউ হাততালি দিতে ভুলে গেল, কেউ হাসতে ভুলে গেল,যেন সবাই একসাথে কোনো অদৃশ্য অনুভূতির ভেতর ঢুকে গেছে। তূর্জান যে এতো সুন্দর গায়তে পারে তা কারোর বোধগম্য নয়। রকস্টারের মতো কণ্ঠ যেন একদম পাকাপোক্ত।

তারপর হঠাৎ—
“ওওওওওও!!!”
চারদিক কেঁপে উঠল হাততালি আর চিৎকারে।

নূর দুই হাত তুলে রোজার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এইটা গান ছিলো না বুঝলি! ঐইটা সরাসরি লাভ লেটার ছিলো!”

মিরান গিটারটা তূর্জানের হাত থেকে নিয়ে বলল,
“ভাইয়া, তুমি তো গেম হেরে না,আমাদের হারিয়ে দিলে! তোমার কণ্ঠ কিন্তু আগের থেকেও সুন্দর হয়ে গেছে।”

তুবা ঠোঁট কামড়ে রোজার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল,“এইসব গানের পরও যদি কেউ বলে,‘কিছু না’, তাহলে আমি মানি না!”

সবাই আবার হেসে উঠল।রোজা একদম চুপ।
তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করছে।
তূর্জানের গলার প্রতিটা শব্দ যেন এখনও কানে বাজছে।আর লাস্ট কথাটা, উফফফ!
“কতটা তোমায় ভালোবাসি…”

ওই লাইনটা যেন সরাসরি তার ভেতরে গিয়ে বসেছে। তূর্জান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। চোখ একবারও সরাল না রোজার দিক থেকে।চারপাশে এত মানুষ… তবুও সেই দৃষ্টি—একদম একান্ত, একদম নিজের।

রোজা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ধীরে ধীরে সরে গেল ভিড় থেকে। সবাই ক্লান্ত হয়ে গেছে। যার যার মতো নিচে নেমে গেল। রোজা যেহেতু এখানে থেকে আগেই চলে গেছে, তূর্জান ভাবল রোজা রুমে চলে গেছে। কিন্তু থমকালো ছাদের কর্ণারে নিজের প্রিয় রমণী কে দেখে।

রোজা ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে।
যেখানে আলো একটু কম, আর বাতাসটা একটু বেশি লাগে।কিছুক্ষণ পরে পেছনে কারও উপস্থিতি টের পেল।“এভাবে পালিয়ে আসলি কেন? আমি ওতটাও খারাপ গাইনি।”

রোজা তাকাল না,ওভাবে থেকেই উত্তর দিল,“পালাইনি…”

“তাহলে?”

“শুনছিলাম…”

“কি?”

“আপনার গান…”
“ আর? “
“ পরে বলবো। “ বলতেই তূর্জান রোজাকে কোলে তুলে নিলো। ছাদের কর্ণিশে দাড়িয়ে বলল, “ আর ধৈর্য ধরতে পারছি না। “

“ আমি বলবো না। “

“ ফেলে দিবো কিন্তু? “

“ ওকে, ফেলুন।” তারপর তূর্জানের বুকে মুখ গুজে বলল,” দেখুন আমি এভাবে মরতেও রাজি।”

তূর্জান বুঝল, এই মেয়ে দুর্বলতা বুঝে গেছে। তাই আলগোছে নামিয়ে দিয়ে রোজাকে রুমে আসতে বলে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে হাটা ধরল। তূর্জান যেতেই রোজা হেসে ফেলল। বিরবির করলো,

“তুমি যদি পথ হও… আমি তোমার ছায়া,
চোখ বুজলেই তুমি… আমার সব মায়া।
তুমি যদি হারাও… ভেঙে যাবো আমি,
তুমি ছাড়া এই জীবন… অসম্পূর্ণ আমি।”

তবে রোজা আবার পিছনে ফিরতেই অনুভব করলো, শূন্যে ভেসে আছে। কে এভাবে শূন্যে তুলল। তবে মস্তিস্ক বলে দিলো, তীব্র পারফিউমের ঘ্রানের কথা।সিঁড়ির প্রতিটা ধাপে ধাপে রাতটা যেন আরো গভীর হয়ে উঠছে,রোজা তূর্জানের বাহুতে ভাসছে,আর তার বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুতভাবে কাঁপছে,

তূর্জান ঝুঁকে কানে কানে বলল,

“তুই যদি নিঃশ্বাস হস,
আমি তোর বুকের ভেতরকার নীরবতা,
তুই যদি স্বপ্ন হস,
আমি তোর না-বলা প্রতিটা ব্যাকুলতা…”

রোজা চোখ বন্ধ করল,ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি রেখে বলল,

“তুমি যদি রাত হও,
আমি তোমার জোনাকির আলো,
হারিয়ে গেলেও খুঁজে নেবো—
তোমার পথেই আমার ভালো…”

তূর্জান থামল এক পলক,চোখ রেখে দিল রোজার চোখে। মনে হলো, সময়টাও যেন দাঁড়িয়ে আছে তাদের দুজনকে ঘিরে,সে ধীরে বলল,

“তুই যদি আকাশ হস,
আমি তোর মেঘের ভেলা,
ঝড় এলেও ছাড়বো না—
ধরে রাখবো সারাবেলা…”
আমার হৃদয় গহীনের আকাশপ্রিয়া..!

রোজা আলতো করে মাথা রাখল তার বুকে,
হৃদস্পন্দন শুনতে শুনতে ফিসফিস করে উঠল,

“তুমি যদি সুর হও,
আমি তোমার গানের কথা,
নৈঃশব্দ গোধূলিতেও বাজবে—
আমাদের ভালোবাসার ব্যথা…”

ইনশাআল্লাহ চলমান….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply