নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৩১
নাসিরাবাদে থমকে থাকা আয়োজন আর অপমানের ভার নিয়ে অবশেষে সবাই ফিরলো সাহাবাদে। প্রাসাদের ফটক পেরোনোর আগেই শুনতে পেলো অরণ্যের কুকীর্তি। কিন্তু চোখে দেখা আর কানে শোনা এক নয়। ভেতরে ঢুকেই শুরু হলো তদন্ত। কক্ষটি ঘিরে রাখা হলো। প্রহরী, দাসী যেই সেই রাতে দায়িত্বে ছিল, একে একে ডেকে আনা হলো। বাকের শাহ্ কঠিন মুখে বসে আছেন। পাশে বাইজিদ। চোখে জমাট নীরবতা, কিন্তু ভেতরে কি চলছে তা বোঝা যাচ্ছে না।
একজন প্রহরী কাঁপা গলায় বললো,
“আমরা দেখেছি শাহজাদা অরণ্যকে।
সে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিল। আর সে আমিরা কে টেনে হিচড়ে কক্ষে নিয়ে গেছিলো।”
মারজান ক্রুর হাসলো। এরা তারই চামচা এবং তারই শেখানো বুলি আওড়াচ্ছে। আরেকজন বললো,
“আমিরা কে নিয়ে কক্ষের দিকেই গিয়েছিল সে।
তারপর অনেকক্ষণ দরজা বন্ধ ছিল”
কথাগুলো থেমে থেমে বেরোচ্ছে। বাকের শাহ্ বিচক্ষণ মানুষ। গমগমে গলায় বলল
“ কি আশ্চর্য, সে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় একজন যুবতীকে জোরপূর্বক টেনে হিঁচড়ে কক্ষে নিয়ে যাচ্ছিল। আর তোমরা তাকে আটকাওনি?”
মারজান চোখ ইশারা দিতেই একজন বলা শুরু করলো
“হুজুর, গিয়েছিলাম আটকাতে। কিন্তু সে আমাদের আঘাত করেছে”
একজনকে আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় হাজিরও করলো। সবটা ছিলো মারজান এর চাল। বাইজিদ এর মধ্যে থেকে বলল
“কেউ সরাসরি কিছু দেখেনি। ঘটনা অনেক কিছুই হতে পারে”
একজন দাসী কেঁদে কেঁদে বলল
“সে কক্ষের দরজা বন্ধ করার পর আমরা সকলেই দরজার সামনে দাড়িয়ে ছিলাম। আমরা শুনেছি আমিরার চিৎকার। নিজেকে বাচাতে সে উন্মাদের মত চেঁচিয়েছে”
মারজান আরো জোরে শব্দ করে কেঁদে উঠলো। দাসী টি বলল
“শাহজাদা দরজা খুলল পরে যখন ঢুকি,
তখন… এই অবস্থা…”
শব্দটা শেষ করতে পারলো না সে। ঘরের ভেতর ভারী নীরবতা। বাকের শাহ্ চোখ বন্ধ করলেন এক মুহূর্ত। তারপর ধীরে বললেন,
“অরণ্যকে নিয়ে আসো।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই টেনে-হিঁচড়ে আনা হলো অরণ্যকে। তার অবস্থা শোচনীয়। চোখ লাল, মুখ ক্লান্ত, শরীর এখনো ভারী। নেশার ঘোর পুরো কাটেনি। সে চারপাশে তাকালো। কিছুই যেন পরিষ্কার বুঝতে পারছে না।
“কি হয়েছে…?”
তার কণ্ঠ শুকনো। কেউ উত্তর দিল না। শুধু তাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো সবার সামনে।
তারপর বাকের শাহ্ গম্ভীর গলায় ঘোষণা করলেন,
“সব জবানবন্দি, সব পরিস্থিতি… একটাই দিকে ইঙ্গিত করছে।”
তিনি চোখ তুললেন।
“অরণ্য, তুমি আজও নেশাগ্রস্ত ছিলে। আর সেই অবস্থায়… তুমি আমিরার সর্বনাশ করেছো। ধিক্কার তোমায়। এই মহলে আজ অবদি কোনো অনৈতিক কাজ হয়নি। তুমি এই মহল কে কলুষিত করেছো। সম্মানহানি করেছো গোটা জমিদার পরিবারের”
অরণ্য যেন কিছুই বুঝতে পারছে না।
“না…!”
সে মাথা নাড়লো।
“আমি… আমি কিছু করিনি…”
তার কণ্ঠ ভেঙে গেল। কিন্তু কেউ শুনলো না। কারণ প্রমাণ, পরিস্থিতি, সাক্ষ্য সব তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে।ববাকের শাহ্ চোখ নামিয়ে বললেন,
“তাকে অন্ধকার কুঠুরিতে নিক্ষেপ করা হোক।”
এক মুহূর্তে দুই প্রহরী এগিয়ে এলো। অরণ্য ছটফট করতে লাগলো।
“আমি করিনি! বিশ্বাস করুন! আমি….”
তার কণ্ঠ করিডোর জুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। কিন্তু সেই চিৎকার ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল। মহলের গভীর, অন্ধকার এক কুঠুরি সেখানে ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো তাকে।
দরজা বন্ধ। লোহার শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো।
আর বাইরে সবাই যেন নিশ্চুপ হয়ে গেল।
একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে।
কিন্তু। সত্যিটা এখনো বন্দি রয়ে গেল অন্ধকারের আড়ালে। বাইজিদ এর মুখ বন্ধ করে দিল সব সাক্ষী রা। এতগুলো মানুষের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা তো আর একজনের দ্বারা বদলায় না। তবে বাকের শাহ্ যদি বাইজিদ কে পূর্বের ঘটনাটা জানাতো, বাইজিদ সাবধান করে রাখতো অরণ্যকে। আমিরার লাশ পাঠিয়ে দেওয়া হলো তার পিতৃগৃহে। সাথে কিছু জমিদারি খাজানা।
এতকিছু হয়ে গেছে তাও রত্নার ঘরের দরজা খোলার অনুমতি দেয় নি বাকের শাহ। খাবার নিয়ে যাওয়া দাসীদের থেকে ঘটনা শুনে সে দিনরাত এক করে কাঁদে কক্ষেই। খাবার দাবার খায় না। চেহারা কেমন জীর্ণ শীর্ণ হয়ে উঠেছে কয়দিনে।
অন্ধকার কুঠুরিতে দিন-রাতের হিসাব থাকে না।
তবুও সময় থেমে থাকে না। এইভাবেই কেটে গেল প্রায় পনেরোটি দিন। একই অন্ধকার, একই স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, একই নিঃসঙ্গতা। যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেই হারিয়ে যায়।
বাকের শাহ্-এর কড়া নির্দেশ কেউ দেখা করতে পারবে না অরণ্যের সাথে। একজন মানুষ, একা, সম্পূর্ণ একা। নিজের নির্দোষতার আর্তনাদ নিয়েই পড়ে রইলো সেই কুঠুরিতে।
এদিকে মহলের অবস্থা শোচনীয়। অরণ্যের পিতা-মাতা দুজনেই যেন বেঁচে থেকেও মৃতপ্রায়।
আমিনা বেগম সারাদিন কেঁদে কেঁদে অচেতন হয়ে পড়েন, জাবের শাহ্ নিঃশব্দে বসে থাকেন।
চোখের সামনে ভেঙে পড়ছে সবকিছু, অথচ কিছুই করতে পারছেন না। পুরো মহল জুড়ে নেমে এসেছে এক গভীর শোক। কারো মুখে হাসি নেই,
কথাবার্তা কমে গেছে, দরবারও যেন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই শোক, এই ভাঙনেও মারজান খান্ত হলো না। গোটা পরিবারের এই বেহাল দশায়ও তার হাড় জুড়ালো না।
তার চোখে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। বরং এই অবস্থাতেও তার মনে নতুন খেলা। একদিন সে গোপনে ডেকে পাঠালো এক বিশ্বস্ত প্রহরীকে।
নিচু গলায় বললো
“একটা খবর পৌঁছে দিতে হবে অরণ্যের কাছে।”
প্রহরী দ্বিধায় পড়ে গেল।
“কি খবর, বেগম?”
মারজানের ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি ফুটে উঠলো। দুটো স্বর্ণ মুদ্রা প্রহরীর হাতে গুজে বললেন
“বলবে… রত্নপ্রভার বিয়ে ঠিক হয়েছে। খুব শিগগিরই কাবিন পড়বে।”
প্রহরী চমকে তাকালো। কিন্তু সেই দৃষ্টি এক মুহূর্তেই নিচু হয়ে গেল। আদেশ অমান্য করার সাহস তার নেই। সেই রাতেই অন্ধকার কুঠরির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। লোহার দরজার ওপাশে বসে আছে অরণ্য।
নিশ্চুপ।
প্রহরী ধীরে বললো
“শুনেছেন… শাহজাদী রত্নপ্রভার বিয়ে ঠিক হয়েছে। খুব শিগগিরই কাবিন হবে”
ভেতরটা কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ। তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এলো এক কর্কশ কণ্ঠ
“জিভ টেনে ছিড়ে ফেলবো জানোয়ার”
কিন্তু সেই কণ্ঠে আগের দৃঢ়তা নেই। প্রহরী আর কিছু বললো না। চলে গেলো।
পনেরো দিনের নিঃসঙ্গতা তাকে ভেঙে দিয়েছে,
আর এই একটুকরো খবর শেষ ভরসাটুকুও কাঁপিয়ে দিল। সে মাথা নিচু করে বসে পড়লো।
ধীরে ধীরে তার আঙুলগুলো মুঠো হয়ে এলো। নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো। অন্ধকার কুঠুরির ভেতর আরও গভীর হয়ে উঠলো অন্ধকার।
খবরটা শোনার পর থেকেই ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগলো অরণ্য। একদিনে নয়, দিন পেরোতে পেরোতে। মুহূর্তে মুহূর্তে সে যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলতে লাগলো।
কখনো হঠাৎ করেই নিজের চুল মুঠো করে টানতে শুরু করে। যেন ভেতরের আগুনটা উপড়ে ফেলতে চায়।
কখনো নিঃশব্দে বসে থাকে, হঠাৎই উঠে গিয়ে পাথরের দেয়ালে হাত তুলে আঘাত করতে থাকে।
একবার, দু’বার, বারবার।
কখনো আবার চুপচাপ বসে নিজের সাথেই কথা বলে
“না… রত্না এমন করতে পারে না…”
“সব মিথ্যা…”
“আমি ফিরবো… আমি বলবো তাকে…”
তার কণ্ঠ কখনো ফিসফিস, কখনো ভাঙা,বকখনো আবার একদম অচেনা।
আবার কখনো হঠাৎ করেই সে চিৎকার করে ওঠে।বকোনো কারণ ছাড়াই।
একটা দীর্ঘ, ভাঙা, বিভৎস চিৎকার। যেন তার বুকের ভেতর জমে থাকা সব যন্ত্রণা একসাথে বেরিয়ে আসছে।
প্রহরীরা প্রথম প্রথম ভয় পেত। পরে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেল। কারণ এটা প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ালো। অরণ্য আর আগের সেই মানুষটা নেই। একাই হাসে, আবার চেঁচায়, কখনো বাচ্চাদের মত কাঁদে। আবার দেওয়ালে নিজের হাতেই আঘাত করে। সে যেন একটা ছায়া অন্ধকারে বন্দি, নিজের মধ্যেই হারিয়ে যাওয়া।
কিন্তু এই সবকিছু মহলের ভেতরে পৌঁছাতে পারলো না। মারজানের কঠোর নির্দেশ।
কারাগারের বাইরে একটাও খবর যাবে না।
যে প্রহরী মুখ খুলবে তার পরিণতিও হবে ভয়ংকর। তাই সবাই চুপ। সবাই নিশ্চুপ। মহলের লোকজন ভাবে
অরণ্য নিশ্চয়ই শাস্তি ভোগ করছে, নিঃশব্দে, নিশ্চলভাবে। কিন্তু বাস্তবে অন্ধকার কুঠুরির ভেতর একজন মানুষ ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে,
পাগলামির নারায় দাঁড়িয়ে। আর তার সেই ভাঙনের শব্দ দেয়ালের ভেতরেই বন্দি হয়ে থাকছে।
তারপর এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। দিনভর নিজেকে আটকে রেখেছিল রত্নপ্রভা।
কিন্তু রাত নামতেই আর পারলো না। দাসীকে হাত করে খুলিয়ে নিলো দরজা। মহলের সব নিয়ম, সব ভয়, সব বাধা এক নিমেষে তুচ্ছ হয়ে গেল তার কাছে। প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই ছুটে গেল সে
অন্ধকার কুঠুরির দিকে। যেখানে বন্দি তার প্রেম।
যেখানে ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে অরণ্য। কারাগারের পথটা নির্জন, শীতল, ভয়ংকর।
দেয়ালের ছায়া যেন লম্বা হয়ে তাকে গিলে ফেলতে চাইছে।
তবুও থামলো না সে।
প্রেমের টান তাকে টেনে নিয়ে এলো সোজা সেই লোহার গারদের সামনে। ভেতরে বসে আছে অরণ্য। চেনা যায় না প্রায়। সেই সুদর্শন চেহারা খানা বড্ড মলিন। চুল এলোমেলো, মুখ শুকনো, চোখ দৃষ্টি হারানো। কিন্তু সেই চোখই হঠাৎ থেমে গেল রত্নপ্রভার ওপর। মুহূর্তটা যেন থেমে গেল।
রত্নপ্রভার বুক কেঁপে উঠলো।
“অরণ্য”
তার কণ্ঠ ভেঙে এলো। অরণ্য প্রথমে কিছুই বললো না। ধীরে ধীরে উঠে এলো গারদের কাছে।
দুজনের মাঝে শুধু ঠান্ডা লোহার শিক। রত্নপ্রভা হাত বাড়ালো। কাঁপা হাতে স্পর্শ করলো অরণ্যের গাল শিকের ফাঁক গলে। সেই স্পর্শ এক মুহূর্তেই ভেঙে দিল অরণ্যকে।
সে হঠাৎই চোখ বন্ধ করে ফেললো। তারপর কেঁদে উঠলো। একদম ছোট বাচ্চার মতো।
অসংযত, অসহায় কান্না।
“রত্না বিশ্বাস করো। আমি…আমি করিনি। রত্না, কিচ্ছু করিনি আমি”
কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে।
“আমি কিছু করিনি… বিশ্বাস করো…”
রত্নপ্রভার চোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।
সে আরও কাছে সরে এলো।
“আমি জানি… আমি জানি তুমি কিছু করো নি। এমন জঘন্য কাজ আমার অরণ্য করতেই পারে না”
তার কণ্ঠ কাঁপছে। অরণ্য দুহাতে ধরে ফেললো সেই লোহার শিক। যেন সেটাকেই ভেঙে ফেলতে চায়।
“আমাকে নিয়ে চলো এখান থেকে… আমি থাকতে পারছি না”
তার চোখে আতঙ্ক, অসহায়তা। রত্নপ্রভা কাঁদতে কাঁদতেই মাথা নাড়লো।
“আমি কি করে মুক্ত করবো তোমায়? আমার যে আর সহ্য হচ্ছে না তোমার এই হাল”
দুজনেই চুপ হয়ে গেল কিছুক্ষণ। শুধু কান্নার শব্দ।
লোহার শিকের দুই পাশে দাঁড়িয়ে দুজন মানুষ, অথচ কত দূরে। রত্নপ্রভা ধীরে বললো
“আমি আবার আসবো, তুমি নিজের খেয়াল রাখবে…..”
কাঁদতে কাঁদতে যেন কথা বলতে পারছে না প্রভা। কান্না জড়ানো গলায় বলল
“একদম পাগলামো করবে না। তোমায় বের করতে না পারলে আমিও বন্দি হবো কারাগারে”
অরণ্য হকচকিয়ে তাকালো।
“তুমি যেও না। তোমাকে ওরা দূরে বিয়ে দিয়ে দিনে”
রত্নপ্রভা কিছু বললো না। শুধু হাতটা আরও শক্ত করে রাখলো তার গালে। কারাগারের অন্ধকারে
সেই রাতটা হয়ে রইলো তাদের শেষ মিলনের সাক্ষী। প্রহরী রা চলে আসবে ভেবে প্রভা চলে গেলো। পিছনে অরণ্য হাউমাউ কাঁদতে লাগলো বাচ্চাদের মতো করে। আহহ ভালোবাসার কি টান। ওমন শক্তপোক্ত বেপরোয়া পুরুষটাও গগনবিদারী কান্নায় ফেটে পড়েছে। প্রভা হেঁটে গেলো কাঁদতে কাঁদতে। পিছনে এখনো অরণ্যর কান্নার শব্দ পাওয়া যায়।
সাহাবাদের অন্দরমহলে যখন নিঃশব্দে জমে উঠছে বিষাদ, ঠিক তখনই নাসিরাবাদ থেকে এলো এক ভয়াবহ সংবাদ। খবরটা যেন ঝড়ের মতো আছড়ে পড়লো পুরো মহলে।
বিয়ে ভেঙে যাওয়ার অপমান সহ্য করতে না পেরে
আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে বড় শাহজাদি রুবায়েত ফারনাজ।
কথাটা ছড়িয়ে পড়তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারদিক।
কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না, আবার কেউ ফিসফিস করে বলছে এটা অবধারিতই ছিল।
একটা রাজ্যের শাহজাদি বিয়ের আসর থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে। এই অপমান এই লাঞ্ছনা। সে বয়ে নিয়ে বাঁচা কি সম্ভব?
নাসিরাবাদে শোক নেমে এলো,
কিন্তু সেই শোক খুব দ্রুত রূপ নিল ক্রোধে।
শেরহাম পাটোয়ারীর প্রাসাদে শুরু হলো উত্তেজনা। দরবারে একের পর এক উচ্চারণ হতে লাগলো প্রতিশোধ। অপমানের জবাব। সাহাবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। খবর আসতে লাগলো
সেনারা প্রস্তুত হচ্ছে, অস্ত্রাগারে তৎপরতা বাড়ছে,
ঘোড়ার আস্তাবলে অস্থিরতা।
যেকোনো মুহূর্তে শুরু হয়ে যেতে পারে যুদ্ধ।
সাহাবাদে সেই খবর পৌঁছাতেই আরও ভারী হয়ে উঠলো পরিবেশ। একদিকে অরণ্যের ঘটনা,
অন্যদিকে সম্ভাব্য যুদ্ধ। পুরো রাজ্য যেন ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়ে। বাকের শাহ্ গভীর চিন্তায় নিমগ্ন, দরবারে চাপা উত্তেজনা। ঠিক সেই সময়
অপ্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে এলো ছোট শাহজাদি চন্দ্রপ্রভা।
মিরান এতক্ষণ ধরে থেমে থেমে সব কথা বলছিল। সেই দালানের ভেতর নিঃশব্দে বসে শুনছিল মেহেরুন্নেসাবপ্রতিটা কথা যেন তার বুকের ভেতর পাথরের মতো বসে যাচ্ছিল। অরণ্য আর রত্নার প্রেম পরিণতি শুনে তার চোখ জোড়া ভিজে উঠলো অশ্রু তে। সবকিছু মিলিয়ে যেন এক ভয়ংকর জট খুলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
ঠিক তখনই দরজায় হঠাৎ করে খটখট শব্দ।
দুজনেই চমকে উঠলো। মিরান ভ্রু কুঁচকে তাকালো দরজার দিকে। তার চোখে মুহূর্তেই সতর্কতা নেমে এলো। সে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
মনে মনে ভাবলো আবার কি সেই লোকটা? কিন্তু
এবার শব্দটা ভিন্ন। আরও জোরে ধাক্কা পড়লো।
মিরান দ্রুত দেয়াল থেকে তরবারিটা নামিয়ে নিল।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
মেহেরুন্নেসার বুক ধড়ফড় করছে।
দরজার খিল খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন প্রহরী।
মহলের পোশাক পরা। কিন্তু তাদের চোখের দৃষ্টি
স্বাভাবিক নয়। মিরানের চোখ সরু হয়ে এলো।
মুহূর্তেই বুঝে গেল এরা কেবল সাধারণ প্রহরী না। এরা জমিদারদের নিজস্ব লোক।
সে খুব নিচু স্বরে বললো
“কি মতলব?”
কথা শেষ হতেই প্রহরীদের একজন সামনে এগিয়ে এলো। ঠোঁটে হালকা ব্যঙ্গের হাসি।
“অনেক রাত হয়েছে, বেগম। চলুন… মহলে ফিরতে হবে।”
মিরান সটান দাঁড়িয়ে রইলো। তার দৃষ্টি কঠিন।
“কিসের অধিকার নিয়ে?”
প্রহরী এবার গলা উঁচু করলো
“আদেশ আছে। দুজনকেই বন্দি করতে হবে।”
মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে গেল। মেহেরুন্নেসা এক পা পিছিয়ে এলো। মিরান তরবারি শক্ত করে ধরলো। কিন্তু সংখ্যা অনেক।
চারদিক থেকে ঘিরে ফেললো তারা। একজন হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো
“ধরো! দুজনকেই বাঁধো!”
মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লো প্রহরীরা। মিরান প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলো, কিন্তু চারদিক থেকে চেপে ধরলো তারা। তার হাত শক্ত করে মুচড়ে পেছনে বাঁধা হলো। মেহেরুন্নেসাও ছাড় পেল না। তার কাঁপা হাত দুটো টেনে বেঁধে ফেললো একজন।
“ছাড়ুন! কি করছেন আপনারা!”
তার কণ্ঠে আতঙ্ক। কিন্তু কেউ শুনলো না।
মিরান দাঁত চেপে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে আগুন। কিন্তু এই মুহূর্তে কিছু করার উপায় নেই।
দুজনকে টেনে বাইরে নিয়ে আসা হলো।
অন্ধকার দালান ছেড়ে ফিরে সেই মহলের দিকে। যেখানে অপেক্ষা করছে আরও বড় কোনো ঝড়।
বাণিজ্যিক যাত্রার পথে ডাকাতদের আকস্মিক আক্রমণে পরিস্থিতি পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে যায়। অনেক কষ্টে, প্রাণ বাঁচিয়ে বাইজিদ ও তার সৈন্যদল মহলে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। কিন্তু ফিরে এসেই তার মনে প্রথম যে চিন্তাটা আসে তা হলো মেহেরুন্নেসা কোথায়?
ঘোড়া থেকে নেমেই বাইজিদ দ্রুত চারপাশে চোখ বুলাতে থাকে। অস্থির কণ্ঠে দাসীদের ডাকতে থাকে
“মেহেরুন্নেসা কোথায়? সে কোথায় গেল?”
কিন্তু কেউই স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারে না। মুহূর্তের মধ্যে তার উদ্বেগ রাগে পরিণত হয়। মহলের ভেতর যেন এক অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক সেই সময়, মহলের প্রধান ফটকের দিক থেকে কিছু রক্ষী এগিয়ে আসে। তাদের সঙ্গে দু’জনকে দেখা যায় হাত বাঁধা অবস্থায় দুজন পুরুষ কে। একজন হলো মেহেরুন্নেসা, আর আরেকজন মিরান।
দৃশ্যটি দেখে মুহূর্তেই বাইজিদের পদক্ষেপ থমকে যায়। তার চোখে বিস্ময়, রাগ আর অবিশ্বাস একসাথে জমে ওঠে। এদিকে রক্ষীরা কোনো কথা না বলেই তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন পুরো ঘটনা তাদের চোখেই পরিষ্কার।
এই সময় মারজান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে। তার মুখে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি আর অহংকারের হাসি।
সে বাইজিদের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বলে ওঠে
“দেখো শাহজাদা… দেখো নিজের চোখে। তোমার স্ত্রী রাতভর মহলের বাইরে এক বন্দী নারীর সঙ্গে সময় কাটিয়েছে।”
একটু থেমে সে রক্ষীদের দিকে ইশারা করে যোগ করে
“আর প্রহরীরা নিজেরাই দেখেছে এরা পরপুরুষের সঙ্গে, সন্দেহজনক অবস্থায় বাইরে ছিল।”
মারজানের এই কথাগুলো যেন পুরো মহলে বজ্রপাতের মতো নেমে আসে। চারপাশে মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে আসে। বাইজিদের মুখ শক্ত হয়ে যায়, তার চোখ ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসার দিকে স্থির হয়ে থাকে। যেন সে সত্যটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে, নাকি বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, তা বোঝা যায় না। বাইরের নীরবতা ভেঙে বাইজিদের কণ্ঠ আবারও ভারী হয়ে ওঠে।
“তার হাতের বাঁধন খুলে দাও।”
কথাটা এতটা শান্ত ছিল যে প্রথমে কেউ বুঝতেই পারেনি তিনি আদেশ দিচ্ছেন নাকি নিজেকেই থামাচ্ছেন। কিন্তু পরক্ষণেই রক্ষীরা দ্রুত এগিয়ে এসে মেহেরুন্নেসার হাতের বাঁধন খুলে দেয়।
দড়ি খুলে যেতেই মেহেরুন্নেসা একটু নড়েচড়ে দাঁড়ায়। কবজির জায়গায় লাল দাগ বসে গেছে, কিন্তু তার চোখে কোনো দুর্বলতা নেই। সে একবারও বাইজিদের দিকে তাকায় না। বরং ধীরে ধীরে দৃষ্টি সরিয়ে সরাসরি মারজানের দিকে তাকায়।
মারজান তখনো সেই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতেই দাঁড়িয়ে আছে, যেন সে নিশ্চিত এই মুহূর্তে সবকিছু তার পরিকল্পনা অনুযায়ীই এগোচ্ছে।
কিন্তু মেহেরুন্নেসার চোখে সে যে দৃষ্টি দেখে, তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো ভয় নয়, কোনো দ্বিধা নয় শুধু গভীর ঘৃণা। এক দীর্ঘ, স্থির দৃষ্টি, যেন সে মানুষটার ভেতরের পুরো মিথ্যাচারকে এক নজরে দেখে ফেলেছে।
মারজান কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মেহেরুন্নেসা চোখ ফিরিয়ে নেয়। তার মুখে এক বিন্দু প্রতিক্রিয়াও থাকে না, শুধু ঠান্ডা নীরবতা।
এই সময় মহলের দাস-দাসীরা একে একে সামনে এগিয়ে আসে। তাদের চোখে ভয়, উত্তেজনা আর এক ধরনের সুযোগ নেওয়ার তাড়না স্পষ্ট।
একজন দাসী কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠে
“শাহজাদা… আমরা নিজের চোখে কিছু না দেখলেও… এত বড় কথা উঠেছে… এটা তো শাস্তির বিষয়।”
আরেকজন যোগ করে
“মহলের মান-সম্মান নষ্ট হয়েছে। এর বিচার হওয়া উচিত।”
কথাগুলো একে একে জমে গিয়ে যেন মেহেরুন্নেসার চারপাশে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। সবাই মিলে যেন আগেই তাকে অপরাধী ঘোষণা করে ফেলেছে।
মেহেরুন্নেসা তখনো নীরব। মাথা নিচু করে নেই, বরং সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একদম স্থির।
শেষে সে ধীরে ধীরে বাইজিদের দিকে তাকায়। তার চোখে কোনো অনুনয় নেই, নেই কোনো ভয়ও।
শান্ত, স্পষ্ট কণ্ঠে সে বলে ওঠে
“শাহজাদা… যদি আপনি বিশ্বাস করেন আমি এমন কোনো অন্যায় করেছি যার শাস্তি প্রাপ্য, তাহলে আমি মাথা পেতে নেব।”
এক মুহূর্ত থেমে যায় সে। তারপর আরও ধীর, কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলে
“কিন্তু যদি সত্য না জেনে শাস্তি দেওয়া হয় আমি তা থেকেও পালাব না।”
তার এই কথার পর মহলের ভেতর আবার নীরবতা নেমে আসে। বাইরে থেকে দৃশ্যটা যতই বিশৃঙ্খল মনে হোক, এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভারী হয়ে ওঠে বাইজিদের চোখ। কারণ তিনি প্রিয় স্ত্রীর থেকে এমন টা আশা করেন নি। দরাজ গলায় বলল
“কার এতবড় দুঃসাহস? আমার স্ত্রীর চরিত্র সম্পর্কে কথা বলে? প্রমাণ পরে হবে আগে আমি তার গর্দান নেব। বলো কে দেখেছো তাকে পরপুরুষ এর সাথে?”
প্রহরী দের আত্না শুকিয়ে গেলো বাইজিদ এর গর্জনে। কেউ আর কথা বলে না। বাইজিদ কর্কশ গলায় ফের বলল
“যারা যারা মুখে এ কথা উচ্চারণ করেছে, তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করো। সবার আগে ওই মহিলা কে।”
বাইজিদ এর আঙুল ওঠে মারজান এর দিকে।
আজ পাঠিকারা কাঁদবে 💔 পর্বটা লিখতে গিয়ে নিজেরই কেমন বিষন্ন ঠেকলো। অরণ্য আর রত্নার প্রেমের পরিণতি লিখতে গিয়ে নিজের চোখেই পানি চলে আসলো 🙃
গল্পটা হারিয়ে না ফেলতে পেইজটি ফলো করে রাখুন। আর অবশ্যই ৩k পূরণ হওয়া চাই।
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৯
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২১ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪০ এর শেষাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৯ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৩৮ এর শেষাংশ