প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪৫
ফারজানারহমানসেতু
আজ তিনদিন বাদে তূর্জান হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। সবকিছু স্বাভাবিক হলেও তূর্জান রোজার সাথে খুব কম কথা বলছে। রোজাও বিষয়টা ঘাটেনি। কারণ টা যে তার জানা। তূর্জান ঘুমানোর পর কেবিন থেকে চলে এসেছিলো। তাই এমন অভিমান পুষছে।
নেওয়াজ বাড়ি আজ যেন অন্যরকম। একদিকে আতঙ্ক কেটে গেছে… অন্যদিকে নতুন সত্য সামনে এসেছে। ড্রইংরুমে রাতের ডিনার শেষে সবাই বসে।তাজারুল নেওয়াজ গম্ভীর মুখে বললেন,“মিরান কোথায়?”
ঠিক তখনই মিরান ঢুকল।চোখে ক্লান্তি… কিন্তু মুখে দৃঢ়তা।
“আমি এখানে।”
তাজারুলের কণ্ঠ শক্ত করে বলল,“সব সত্য বলো। “
“ বড় বাবা তুমি তো সবই জানো, তুমিই বলো। “
“ নিজের কথাটা নিজেই সবাইকে বলো।”
মিরান একবার রোজার দিকে তাকাল।রোজা চুপচাপ বসে আছে।তারপর বলতে শুরু করল,
“রেজাউল মির্জার মৃত্যুর ঘটনা… এটা দুর্ঘটনা ছিল না। ওটা প্ল্যানড মার্ডার ছিল।আমি অনেকদিন ধরেই ইনভেস্টিগেশন করছিলাম। কিন্তু কাউকে বলিনি—কারণ বিষয়টা খুব সেনসিটিভ ছিল।”
সবাই স্তব্ধ। তানিয়া মুখে হাত দিলেন। মোস্তফা
নেওয়াজ কড়া গলায় বললেন, “আমাদের কাছেও না?”
“তোমাদের নিরাপত্তার জন্যই বলিনি, তবে বড় বাবা সব জানতো।”
রাফিয়া এবার বলল, “তাই বলে একদম চুপ? আমার বাবার ঘটনা একবার আমাকে বলতে পারতে ভাইয়া।”
মিরান দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “আজকে যেটা হলো,ওটা প্রমাণ করে আমি ঠিক ছিলাম। ওরা তোমার আর রোজার পিছনে ছিল, কিন্তু এখন তোমরা মুক্ত, আশা করছি আর বিপদ আসবে না।”
সবাই একসাথে রোজার দিকে তাকাল।রোজা ধীরে মাথা নিচু করল। রোজার সামনে এভাবে বলা, ঠিক হচ্ছে কি? রোজার দিকে তাকাতেই মিরান বলল, “ বনু এবার বলে দে!
তারপর খুব আস্তে বলল রোজা, “আমার… সব মনে পড়ে গেছে।”
“ কবে? “
উৎসুক জনতার ন্যায় সবাই একসাথে বলে ফেলল। রোজা ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তূর্জানের দিকে তাকালো। তার মধ্যে কোনো ভাবাবেগ নেই। থাকবে কি করে? যেদিন শুনেছে, রোজার স্মৃতি ফিরেছে, অসভ্য লোক সেইদিনই বিয়ে করে নিয়েছে। সেইদিন ডক্টরের কাছে যাওয়ার তিনদিন আগে জেনেছিলো। কিন্তু তিনদিন কেন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি? এইটা ভাববার বিষয়। তবে উত্তর দিল, “ সতেরো দিন আগে। “
এক মুহূর্তে পুরো ঘর নিস্তব্ধ।তুবা চমকে উঠল, “কি বললি তুই? আমাদের জানাসনি কেন?”
রোজার চোখ ভিজে উঠেছে।মিরান বলল, “ আমি বনুকে বলতে নিষেধ করেছিলাম। “
মোস্তফা নেওয়াজ এতক্ষন নিশ্চুপ দর্শক হলেও এবার বলল, “ কে কে জানতো? “
“ বড় বাবা, ভাইয়া, আর আমি। “
মোস্তফা নেওয়াজ আর কথা বললেন না।তিনি উঠে রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন।
তার শক্তি ফুরিয়েছে মনে হচ্ছে। তবে সত্যিই তার যে মেয়ের মুখে বাবা ডাক শোনার দিন ফুরিয়েছে। সে কি এতোই তুচ্ছ যে তাকে এই সত্য ঘটনা জানানো হয়নি। তার মূল্য ফুরিয়েছে। তবে তার ভাবনাকে পিছনে হটিয়ে রোজা আকড়ে ধরল, এতদিন আগলে রাখা বাবা নামক মানুষটাকে।
কোনো রকম ডেকে উঠলো, “ বাবা, বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে এখনো অনেক ভালোবাসি। না জানানোর জন্য সরি! কিন্তু বিশ্বাস করো, এই কয়দিন আমার একটু ভালোও কাটেনি।ইচ্ছে করছিলো, দৌড়ে গিয়ে আগে তোমাকে জানাই, ভাইয়া নিষেধ করেছে। আমি মেয়ে হয়ে কি তোমার ক্ষতি চাইতে পারি। যদি ওই লোকগুলো আবার…
একটু থেমে আবার বলল, “আমি আগের সবকিছু মনে করতে পারি… আব্বু… আগুন… সেই রাত…ওরা যদি তোমাকে..”
আর কথা বলতে পারলো না। হেচকি উঠে গেছে। ছেলে মানুষ যে অনুভূতি প্রকাশে বড্ডো কাচা, তাই মোস্তফা নেওয়াজের ওমন ভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে তানিয়া দৌড়ে এসে রোজাকে জড়িয়ে ধরলেন।“আম্মু…, ভয় নেট। আছি তো আমরা। কিছু হবে না।”
রাফিয়া এসে রোজার মাথায় হাত রাখল, “এবার তোকে আর কেউ ছুঁতে পারবে না বোন ।আছি তো আমরা। “
“ আপু সরি। “
“ কোনো ব্যাপার না। এবার তো জেনেছি। তুই ঠিক আছিস এটাই অনেক। “
রোজা ফুফিয়ে উঠল। তাজারুল নেওয়াজ গভীরভাবে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে মোস্তফা নেওয়াজকে দিক শূন্য হয়ে দাড়িবললেনয়ে থাকতে দেখে কাধে হাত রেখে বললেন,,“আল্লাহর রহমত… তুমি এখন ঠিক আছো।”
মিরান মৃদু হাসল,হাসি আটকে গেলো মোস্তফা নেওয়াজের চোখে চোখ পরতে। নত মস্তিস্কে বাবার সামনে দাড়িয়ে বলল, “ সরি বাবা! আমার কাজের কথা তোমাকে আগেই জানানো উচিত ছিলো। “
শক্তপোক্ত মোস্তফা নেওয়াজ আজ খোলস ছেড়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল। নোনাজল গড়ালো, “ সরি তো আমার বলার কথা, তুই কেন বলছিস? তোকে কত বসে থাকার খোটা দিয়েছি। অথচ আজ জানতে পারলাম আমার ছেলে বড় কাজ করে। লজ্জিত আমি, বাবা হিসেবে সত্যিই লজ্জিত। “
একেএকে সকলের মান অভিমান, দুঃখ সব যেন শেষ হচ্ছে। রোজাকে ঘিরে রেখেছে সবাই। রাহেলা নেওয়াজ তো মহা খুশি। রেহেনা নেওয়াজ যে এখনো মা হিসাবে আছে, এটাতে আত্মহারা সে। তুবা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ বলল, “ আজ ননদ বলে, কেউ আমায় মনে রাখলো না। হাইরে কষ্ট! আমি কি এতটাই ছোট যে আমাকে চোখে পড়ছে না? “
রোজা এগিয়ে এসে জড়িয়ে নিল তুবাকে। এতকিছুর মাঝেও তূর্জান নির্বিকার। কোনো অনুভূতি যেন কাজ করছে না। হঠাৎ উঠে যেতে নিলে, তাজারুল নেওয়াজ বলল, “ তুবার বিয়ের ব্যাপারে কথা ছিলো? “
“ হুম, বলো!”
“ বিয়ে পিছিয়ে দিতে চাইছি। তোমার হাত ঠিক না হওয়া পর্যন্ত। “
“ দরকার নেই। ইনভাইট করা শেষ।আর পরশু গায়ে হলুদ,এখন বিয়ে পিছাতে গেলে প্রবলেম হবে। অহেতুক কথা উঠবে। তাছাড়া আমি ঠিক আছি। বিয়ে যে ডেটে ফিক্সড করা হয়েছে, ওই ডেটেই হবে। “
বলেই পা বাড়ালো,তাজারুল নেওয়াজ আবার পিছু ডেকে বলল, “ এভাবে যাই যাই করছো কেন? আরেকটা কথা বলার আছে। তোমার আর রোজার বিয়ের ব্যাপারে। ওই একই দিনে তোমাদের বিয়েটাও নিয়ম অনুসারে হবে।“
“ যা খুশি করো। “
বলেই হাটা ধরল। রাহেলা নেওয়াজ তো ছেড়ে দেওয়ার মানুষ না। তিনি সুযোগ পেয়ে বললেন, “ কপাল, কপাল। এইবার দিয়ে তিনবার বিয়ে করবি! মানুষ তিনবার কবুল বলে, তুই নয়বার বলবি। “
তূর্জান কথা বাড়ালো না। নিজের রুমে চলে গেলো। যে যার রুমে গেল। রাহেলা নেওয়াজ রোজাকে তার রুমে থাকতে বলল। বিয়ের আগে এই দুইদিন তার সাথেই থাকবে রোজা। তুবা নিজের সাথে রাখতে চাইলে তিনি বলে দিলেন, “ তোরে বিশ্বাস করবো আমি? ভাইয়া এসে বলবে, দরজা খোল। তুই দরজা খুলে, সাথে রোজাকে দিয়ে দিবি। “
বলেই তিনি রোজাকে একবারও তূর্জানের রুমেও যেতে দিলো না। ওষুধ খেয়েছে কি না, তাও জানে না। রোজা একবার যেতে চাইলো, তবে রাহেলা নেওয়াজ বলল, তূর্জান ওষুধ খেয়ে নিবে, চিন্তা না করতে । রোজা তো ওষুধ মাত্র বাহানা করছিলো, তূর্জানের মুখোমুখি হওয়াটা জরুরি। কেন এতো অভিমান জমলো? তবে তা আর জানা হলো না।
রাত অনেকটাই নেমে এসেছে।প্রায় মধ্যেরাত বলা চলে।নেওয়াজ বাড়ি আবার শান্ত—দিনের আবেগ, কান্না, সত্য প্রকাশ—সবকিছু যেন ক্লান্ত হয়ে থেমে গেছে।
রাহেলা নেওয়াজের রুমে রোজা চুপচাপ শুয়ে আছে।লাইট অফ, শুধু হালকা নাইট ল্যাম্প জ্বলছে।
রাহেলা নেওয়াজ পাশেই শুয়ে, ইতোমধ্যে আধা ঘুমে।কিন্তু রোজার চোখে ঘুম নেই।
মাথায় ঘুরছে একটাই প্রশ্ন,“তূর্জান কেন এমন করছে?”
আজ তিনদিন পর বাড়ি ফিরেও… একটাও ঠিকঠাক কথা না। না কোনো খোঁজ… না কোনো স্পর্শ…এই কি সেই মানুষ?রোজা চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল।
হঠাৎ,খট… খট… আওয়াজ পেয়ে চোখমুখ কুচকে পরে রইলো রোজা। রাহেলা নেওয়াজ বিরক্ত হয়ে বললেন, “এই রাত দুপুরে আবার কে?”
বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলতেই দেখে ,তূর্জান দাঁড়িয়ে আছে, একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে।
রাহেলা ভ্রু কুঁচকে বললেন, “কি হয়েছে?”
তূর্জান খুব গম্ভীর মুখে বলল,“ওষুধ খেতে ভুলে গেছি।”
“এইটা বলার জন্য এখন এতো রাতে এখানে আসছিস?”
“হ্যাঁ।”
“ ওদিকে কি উকি দিচ্ছিস,রোজা তোকে দিয়ে আসতো?”
“তুমি তো ওকে পাঠাওনি।”
রাহেলা একটু থমকালেন। তারপর বললেন, “ নিজের ওষুধ নিজে গিয়ে খা। এতো রাতে বিরক্ত করিস না। “
“ নিজে নিয়ে খেতে পারলে তোমাকে বলতাম। “
“ বিয়ে করেছিস, দুদিন পর বাচ্চার বাবা হবি! এখনো নিজের ওষুধ নিজে নিয়ে খেতে পারিস না। ঠিক আছে, দাঁড়া, আমি এনে দিচ্ছি।”
“না, তুমি বসো। আমি নিজেই নিয়ে যাচ্ছি।”
রাহেলা নেওয়াজ হয়তো কথা বুঝলেন না। তাই বললেন,“ওষুধ কোথায় জানিস?”
“জানি না… তাই তো তুমি দিবা।”
রাহেলা বিরক্ত হয়ে বললেন, “উফফ, থাক! আমি এনে দিচ্ছি।”
বলেই তিনি রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। রাহেলা বের হতেই তূর্জান রুমে ঢুকে দরজা আস্তে করে বন্ধ করে দিল। লক করে দিতেই রাহেলা নেওয়াজ বলল, “ কি রে রুম লক করলি কেন? “
তার চোখ কুঁচকে গেল। আবার বলল,“তুই এতো রাতে কি শুরু করছিস?”
তূর্জান একদম স্বাভাবিকভাবে বলল,“ওষুধ খেতে এসে ঘুম পেয়ে গেছে।”
“তোর রুম নাই? রুমে গিয়ে ঘুমা।”
“আছে… কিন্তু আমার বউ এখানে।”
রাহেলা হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন বন্ধ দরজার দিকে ।“এই দুইদিন তোকে ওর ওখানে,থাকতে দিবো না বলেছি? তাই আমার রুমে নিয়ে আসা।”
তূর্জান হালকা হেসে বলল,“তুমি বলেছো… আমি তো মানিনি।”
রাহেলা বিরক্ত হয়ে বললেন, “ অসভ্য! ঠিক আছে, থাক! কিন্তু কোনো বাড়াবাড়ি করলে,”
তূর্জান সাথে সাথে বলল, “কিছুই করবো না।”
“ আমি থাকবো কোথায়?
“আজকের মতো সোজা আমার রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পরো গ্ৰানি।আজকের জন্য রুম এক্সচেঞ্জ করলাম।“
“ তোর ওই পচা পারফিউমের গন্ধে আমার ঘুম আসবে না। “
আর কোনো উত্তর এলো না। রাহেলা নেওয়াজ এবার বুঝল, তাকে বোকা বানিয়েছে। আর কি করার ঘুম চোখে তুবার দরজায় কড়া নাড়ল।
**
তূর্জান ধীরে ধীরে বিছানার দিকে তাকাল।রোজা একদম স্থির হয়ে শুয়ে আছে।
চোখ বন্ধ।ঘুমের ভান।তূর্জানের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।“ঘুমাচ্ছিস না-কি… অভিনয় করছিস?”
কোনো উত্তর নেই। তূর্জান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসল।তারপর খুব আস্তে শুয়ে পড়ল রোজার পাশে। রোজার বুক ধড়ফড় করছে, কিন্তু সে নড়ছে না।
তূর্জান সিলিং এর দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইল।
কয়েক সেকেন্ড,তারপর খুব আস্তে বলল,
“এভাবে চলে যাস কেন?”
রোজার চোখ কেঁপে উঠল, তবুও চুপ হয়ে আছে ।
“আমি ঘুমিয়ে ছিলাম… তাই বলে কি থাকবি না?”
তার কণ্ঠে কষ্ট স্পষ্ট।
“তুই আমার কাছ থেকে গেলে… আমার ঘুম না ভাঙলেও … আমার ভেতরটা ভেঙে যায়।”
রোজার চোখের কোণে পানি জমে উঠল।আর থাকতে পারল না। এতো ভালোবাসা রাখবে কই?
হঠাৎ ঘুরে তার দিকে মুখ করল। নিজের মুখ নিয়ে তূর্জানের বুকের উপর রাখলো,
“তাহলে আপনি কথা বলেননি কেন?”
তূর্জান থমকে গেল কিয়ৎক্ষণ, চোখে চোখ পড়ল দুজনের।রোজা কাঁপা গলায় বলল,“তিনদিন… একবারও জিজ্ঞেস করেননি আমি কেমন আছি।”
“তুই জিজ্ঞেস করেছিস?”
“আমি… ভয় পেয়েছিলাম।”
“কিসের ভয়?”
“আপনি রাগ করেছেন হয়তো।”
তূর্জান গভীরভাবে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে বলল,“ প্রিয় ব্যক্তির উপর রাগ না… কষ্ট পেয়েছি।”
“আমি তো ভেবেছিলাম… আপনি বুঝবেন। ”
“সবকিছু বুঝি… কিন্তু তুই না থাকলে বুঝে কি লাভ?”
একটু থেমে তারপর খুব নিচু গলায় বলল,“ ওভাবে পালিয়ে এলি কেন ?”
“আমি, ভেবেছিলাম আপনি ঘুমাচ্ছেন।”
“ দেখছিলাম।”
“ কি? “
“ আমার বউয়ের পাগলামি, ছন্নছাড়া বউ হাজবেন্ডের ঘুমের সুযোগে যে বুকে মুখ লুকাতে পারে, তা জানা ছিল না! কিন্তু চলে যাওয়াটা পছন্দ হয়নি। শরীর থেকে আত্মা চলে যাওয়ার মতো কষ্ট হচ্ছিলো।”
এই কথাটা শুনে রোজার বুক ভেঙে গেল যেন।
রোজা আরেকটু ধীরে ধীরে একটু এগিয়ে এলো।
“সরি…”
তূর্জান কিছু বলল না।চুপ করে রইল।রোজা আরও কাছে এসে তার বুকের কাছে মুখ গুঁজে, দুহাতে আলিঙ্গন করে বলল“আমি আর কোথাও যাবো না… প্রমিস।”
নেওয়াজ বাড়ি আজ যেন আলোর রাজ্য। চারদিকে ঝলমলে ফেয়ারি লাইট, গাঁদা আর রজনীগন্ধার মালা দিয়ে সাজানো পুরো বাগান । মাঝখানে সুন্দর করে প্যান্ডেল করা হয়েছে,হলুদের আসর বসবে সেখানে।
আজ তুবার গায়ে হলুদ।সাথে রোজা আর তূর্জানের।বাড়ির প্রতিটা কোণায় আনন্দের শব্দ,হাসি, খুনসুটি, গানের সুর।
রাফিয়া, রেহেনা, আর বাকি মেয়েরা একসাথে ব্যস্ত সাজসজ্জায়। কেউ ফুল সাজাচ্ছে, কেউ প্লেট গোছাচ্ছে, কেউ আবার রোজা,তুবাকে নিয়ে বসে হাসাহাসি করছে। তাজারুল নেওয়াজ আর, মোস্তফা নেওয়াজ অতিথি আপ্যায়নে ব্যাস্ত।
তুবা বসে আছে মাঝখানে, হলুদ শাড়িতে একদম ঝলমলে। চোখে-মুখে লজ্জা, কিন্তু ঠোঁটে হাসি থামছে না।রাফিয়া খোঁচা দিলো,“এইভাবে হাসিস না তো!”
তুবা মুচকি হেসে বলল,“কেন?”
“এখনই যদি এত হাসিস, বিয়ের দিন কি করবি?”
সবাই হেসে উঠল।এদিকে রোজা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।হালকা হলুদ-সোনালি শাড়ি, চুলে গাঁদা ফুলের গাজরা, কপালে ছোট্ট টিপ।নিজেকে দেখে একবার থেমে গেল। মনে হলো—জীবনটা আবার নতুন করে শুরু হয়েছে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে কণ্ঠ,“এইটা কি আমার বউ, নাকি অন্য কেউ? ”
রোজা আয়নায় তাকিয়েই বুঝে গেল,তূর্জান। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, দেখতে মাশা-আল্লাহ লাগছে। নজর না লাগে? লাগলেও কি? তার হাজবেন্ডের সেইদিন বলা কথাগুলো তো শুনেছে। বাবার সম্পত্তির ভাগ দেবে, তাও নিজের না।
মুখটা লাল হয়ে গেল তার।“আপনি এখানে কেন?”
তূর্জান দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, “ রুম আমার, বউ আমার! বউকে দেখতে আসছি। কোনো সমস্যা?”
“বাইরে সবাই আছে…”
“তাইতো এসেছি,ভিড়ের আগে একটু একা সময় নিতে।”
রোজা কিছু বলার আগেই তূর্জান কাছে এগিয়ে এল।
খুব আস্তে করে বলল,“আজকে তোকে দেখলে, মনে হচ্ছে আবার নতুন করে প্রেমে পড়ছি। এসব জাদুটোনা না করলেও পারতি!”
রোজার বুক কেঁপে উঠল। আস্তে করে বলল,“আপনি সবসময় এমন বলেন কেন?”
“ তুই সবসময় এমনই লাগিস কেন?”
রোজা চোখ নামিয়ে ফেলল।তূর্জান হালকা করে তার কানের পাশে গাঁদা ফুলটা ঠিক করে দিল।
“চলো বউ , সবাই অপেক্ষা করছে।”
গায়ে হলুদের আসরে ঢাক, ঢোল, আর গানের তালে পুরো বাড়ি জমে উঠেছে।কেউ গাইছে, কেউ নাচছে।
তুবাকে বসানো হয়েছে মাঝখানে।পাশে রোজাকে বসতে বললেও ঘোর আপত্তি তূর্জানের। ওভাবে গায়ে হলুদ নাকি তার বউয়ের দরকার নেই ।
এক এক করে সবাই হলুদ মাখাতে আসছে।
তানিয়া নেওয়াজ প্রথমে দুই মেয়ের কপালে হলুদ লাগালেন।চোখ ভিজে উঠল তার।
“আমার মেয়েটা বড় হয়ে গেল…”
তুবা মায়ের হাত ধরে বলল, “আমি কোথাও যাচ্ছি না আম্মু…”
সবাই আবেগে ভেসে গেল যেন । একেএকে সবাই হলুদ লাগিয়ে দিয়ে যেতে লাগলো।রোজা আর তূর্জান,রোজা প্লেটে হলুদ নিয়ে এগিয়ে গেল তুবার দিকে।
হাসতে হাসতে বলল, “দেখিস, আজকে তোকে এমন হলুদ মাখাবো,বিয়ের দিনেও উঠবে না!”
তুবা বলল, “আগে নিজেকে সামলাবেন, ভাবি!”
রোজা লজ্জা পেল।তূর্জান পাশ থেকে রোজার কানে ফিসফিস করে বলল, “ওকে, তোকে সামলানোর দায়িত্ব নাহয় আমি নি…”
রোজা চোখ বড় করে তাকাল, “আপনি চুপ থাকবেন?”
তূর্জান দুষ্টু হেসে বলল, “চুপ করেই তো আছি।”
চারপাশে আনন্দ,মিরান এসে তুবাকে খুচিয়ে বলল, “এইখানে তো সিনেমা চলছে রে তুবু বুড়ি!”
তুবা হেসে বলল, “তুমি চুপ কর, তোমার বিয়ে হলে বুঝবা তখন, তাছাড়া অনন্যা আপু ওই পাশে আছে। “
**
হঠাৎ রাফিয়া বলল, “একটা নিয়ম করি চলো,যারা হলুদ মাখাবে, তাদেরও হলুদ মাখানো হবে! কিন্তু কেউ ইচ্ছে করে নিজের গালে হলুদ লাগাবে না। যেই যাকে হলুদ লাগাক, তাকে যে যত পেরেসানি দিতে পারে।”
সাথে সাথে কয়েকজন বলে উঠল, “ঠিক আছে !”
এরপর যা হওয়ার তাই হলো, রোজা তূর্জানের গালে একচাপ হলুদ লাগিয়ে ছুটে চললো!
তূর্জান হাসতে হাসতে বলল, “এবার তোকে বাঁচাবে কে?”
রোজা পালাতে ছুটে গেল, দোতলায়। তূর্জানই বা কম কিসে? রোজার পিছু নিয়ে সেও দোতলায় পৌঁছে গেছে। রোজা এদিকে ওদিকে ছুটছে, আর তাকে ধরার প্রয়াসে তূর্জান ছুটছে। একছুটে ছাদে চলে গেল। অবশেষে হার মেনে ছাদে রাখা দোলনায় ধপাস করে বসে পড়ল। তূর্জানও বসে পড়লো। তারপর কি ভেবে আকাশের পানে চেয়ে শুয়ে পড়ল।
হাপিয়ে গেছে দুজন। রোজা আবার পালানোর ধান্দায় পা বাড়াতেই তূর্জান হাত ধরে টেনে আনল। হেচকা টানে টাল সামলাতে না পেরে ঠাই হলো তূর্জানের বুকে।
“কোথায় যাবি?”
রোজার গালে লজ্জায় লাল আভা বিদ্যমান। তূর্জান নিজের মুখে লেগে থাকা হলুদ নিয়ে খুব আলতো করে রোজার গালে ছুইয়ে দিল।
তারপর ফিসফিস করে বলল,“এইটা আমার পক্ষ থেকে… আজীবনের রঙ।”
রোজা এতক্ষনে খেয়াল করলো হাতের কথা। ভ্রু কুচকে বললো, “ আপনার হাত এভাবে রেখেছেন কেন? হ্যান্ডব্যাগ কই? “
“ ঘরে আছে। “
“ আপনি বড্ডো বেপরোয়া। “
“ গুছিয়ে দিবেন!”
“ আমি নিজেই তো ছন্নছাড়া!”
এবার তূর্জান রোজার কপালে আলতো ঠোঁট ছুইয়ে বললো, “ আপনার ছন্নছাড়া, বেপরোয়া জীবটাকে নাহয় আজীবন আমিই গুছিয়ে রাখবো। বিনিময়ে আমার আত্মার সাথে জুড়ে থাকবেন। মাই পার্সোনাল সুইটনেস রোজ। “
ইনশাআল্লাহ চলমান….
আবল-তাবল হয়েছে। নিজের মনের সম্পূর্ণ কথা আজ শেষ করতে পারিনি, লেখায়। আমার অতিপ্রিয় মাথাব্যাথা আমার জীবনের সঙ্গী। সবাই ছেড়ে গেলেও, ওনি একদিনের জন্য ও যেতে চায় না। তাই নাম দিয়েছি, অতিপ্রিয় মাথাব্যাথা।
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩৫
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৯
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩৮
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৮
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪৪
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৫
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩০