নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩২ এর প্রথমাংশ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
মহলের ভেতর তখনও চাপা উত্তেজনা ঘুরপাক খাচ্ছে। কেউ কারও দিকে ঠিকমতো তাকাতেও সাহস পাচ্ছে না। সেই ভারী নীরবতার মাঝেই হঠাৎ বাইজিদের কণ্ঠ গর্জে উঠল
“কি হলে? বন্দি করো এই মহিলা কে।”
মুহূর্তেই চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়ে যায়। মারজান যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না। বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে ওঠে।
“শাহজাদা! আমি তো….”
কথা শেষ করার আগেই রক্ষীরা এগিয়ে এসে তাকে ঘিরে ফেলে। বাইজিদের চোখ তখন কঠিন, নির্দয়।
“কেউ আমার স্ত্রীর সম্মান নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দেবে,এটা সহ্য করবো? কখনোই না। সে যেই হোক”
রক্ষীরা মারজানের হাত চেপে ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। তার মুখে প্রতিবাদের শব্দ থাকলেও সেই শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় করিডোরের অন্ধকারে। মারজান চলে যেতেই যেন পরিবেশটা আরও ভারী হয়ে ওঠে।
ঠিক তখনই, ভিড়ের পেছন থেকে একজন রক্ষী সাহস করে সামনে এগিয়ে আসে। তার মুখে দ্বিধা, চোখে স্পষ্ট ভয়।
“শাহজাদা”
বাইজিদ ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায়।
“বলো।”
রক্ষী একবার চারপাশে তাকিয়ে গলা শুকিয়ে ফেলে। তারপর কাঁপা কণ্ঠে বলে
“নারী বন্দী উম্মে মিরান… এবং আমাদের ছোট বেগম মেহেরুন্নেসা নূরকে সেই কক্ষে পাওয়া গেছে”
সে একটু থামে। যেন পরের কথাগুলো বলতে ভয় পাচ্ছে।
“যে কক্ষে পশ্চিমা পদ্ধতিতে প্রজাদের জন্য সার উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে।”
মুহূর্তেই চারপাশে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু রক্ষীর কথা এখানেই থামে না
“আপনার জারি করা নিষেধাজ্ঞা ছিল। কেউ যদি সেই কক্ষে প্রবেশ করে বা করার চেষ্টাও করে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।”
শেষ কথাগুলো যেন বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ে মহলের বুকের উপর। বাইজিদ স্থির হয়ে যায়। তার চোখ ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসার দিকে ঘুরে যায়। এক মুহূর্তে যেন তার মস্তিষ্কে সবকিছু ঝড়ের মতো ঘুরে ওঠে। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে আসে।
এদিকে মেহেরুন্নেসা দাঁড়িয়ে আছে আগের মতোই সোজা হয়ে। কিছু বুঝতে পারছে না সে। একটা কক্ষে যাওয়া নিয়ে এত বড় শাস্তি ঘোষণা করার মানুষ নিশ্চয়ই শাহজাদা নয়।
লোকটি ফের বলে
“শাহজাদার এমনটা বলার কারণ হচ্ছে সেই কক্ষ ভর্তি বিভিন্ন ধরনের দামী, অমূল্য এবং দুষ্প্রাপ্য সব রাসায়নিক তরল। যার এক ফোঁটার দাম বহুত এবং তার ভুল ব্যাবহারে প্রাণনাশ হতে পারে।”
মেহেরুন্নেসার পায়ের তলার মাটি সরে গেলো কথাটা শুনে। কই গোটা কক্ষে এমন তো কিছু দেখেনি সে। তবে কয়েকটা অদ্ভুত শিশি চোখে পড়েছিলো। সে বাইজিদ এর কাছে আকুতি করে
“বিশ্বাস করুন, বিশ্বাস করুন আমি কোনো মতলবে ঐ কক্ষে যাইনি। আমি তো এও জানতাম না ও সব রাসায়নিক তরল কাকে বলে বা কি হয়। আমাকে মিরান ডেকে নিয়ে গেছিল এই বলে যে….”
বাকের শাহ তাকে কথা শেষ করতে দিল না। থামিয়ে দিল তার আগেই। বাইজিদের চোখ ধীরে ধীরে ভিজে উঠতে থাকে। সে তাকিয়ে থাকে, শুধু তাকিয়েই থাকে তার স্ত্রীর দিকে।
এই সেই নারী যাকে সে অসম্ভব ভালোবাসে। যার জন্য সে নিজের সবকিছু ত্যাগ করতে পারে।
কিন্তু আজ তার নিজের দেওয়া আইন তার সামনে দাঁড়িয়ে গেছে শত্রু হয়ে।
একদিকে তার রাজধর্ম আরেকদিকে তার ভালোবাসা। বাইজিদের দৃষ্টি ছলছল করা চোখে স্থির হয়ে আছে মেহেরুন্নেসার উপর।
আর সেই দৃষ্টিতে স্পষ্ট সে বিচারক নয় এই মুহূর্তে
সে কেবল এক অসহায় মানুষ। যে বুঝতে পারছে না কীভাবে নিজের ভালোবাসার মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেবে। মহলের ভারী নীরবতা হঠাৎ ভেঙে যায় সমস্বরে ওঠা দাবিতে
“আমরা এর সঠিক বিচার চাই!”
“ন্যায় বিচার চাই!”
নারী-পুরুষ সবার কণ্ঠ যেন একসাথে গর্জে ওঠে। কেউ আর ফিসফাস করছে না, সরাসরি বিচার দাবি করছে। শব্দগুলো দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে যেন আরও তীব্র হয়ে উঠছে। বাইজিদ ধীরে ধীরে হাত তোলে। একটা ছোট্ট ইশারা।
আর আশ্চর্যজনকভাবে, মুহূর্তের মধ্যেই সব শব্দ থেমে যায়। মহল আবার নিস্তব্ধ।
দূরের উঁচু আসনে বসে থাকা বাকের শাহ্ এতক্ষণ নীরবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তার চোখে কোনো আবেগ নেই শুধু কঠিন, স্থির দৃষ্টি। তিনি যেন এই মুহূর্তটাকেই অপেক্ষা করছিলেন।
তিনি ধীরে ধীরে মুখ খোলেন
“আমি দেখতে চাই, শাহজাদা তুমি কেমন সঠিক বিচার করো।”
তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতর লুকিয়ে আছে এক ভয়ানক চাপ।
“এটাই তোমার পরীক্ষা। ভবিষ্যতে এর থেকেও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে তোমায়। বিচারে প্রিয়জন বলে কিছু থাকবে না। এটাই নীতি।”
কথাগুলো যেন ছুরির মতো কেটে যায় বাইজিদের ভেতরে। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ছে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নেয়। চোখ খুলে সামনে তাকায়। তার চোখমুখ তখন কঠোর, পাথরের মতো।
সে আর শুধু স্বামী নয়, সে একজন শাসক।
ভারি কন্ঠে বলল
“শুধু ভালবাসি বলে মৃত্যু দন্ড দিলাম না। তবে তোমাকে এই মহল ত্যাগ করতে হবে”
শেষ কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠ সামান্য কেঁপে ওঠে। মহলের সবাই স্তব্ধ। এই রায় কেউ কল্পনাও করেনি। এটা শাস্তি, আবার শাস্তি নয়ও।
এটা যেন ভালোবাসা আর কর্তব্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষের ভাঙা সিদ্ধান্ত।
মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখে জল জমলেও তা গড়িয়ে পড়ে না। সে শুধু তাকিয়ে থাকে বাইজিদের দিকে এক দীর্ঘ, গভীর দৃষ্টি।
আর সেই দৃষ্টিতে স্পষ্ট আজ তারা দু’জনই হেরে গেল। মেহেরুন্নেসার চোখ বড় হয়ে উঠল, ঠোঁট কাঁপতে লাগল। সে যেন ঠিক বিশ্বাসই করতে পারছিল না এই কথাটা তারই প্রিয় মানুষটি বলেছে।
“না…!”
খুব ক্ষীণ একটা শব্দ বেরিয়ে এলো তার ঠোঁট থেকে।
পরের মুহূর্তেই সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। প্রায় ছুটে গিয়ে বাইজিদের সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। দু’হাত জোড় করে ধরে ফেলল তার পায়ের কাছে।
“শাহজাদা…!”
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। চোখের জল একের পর এক গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে।
“আমাকে… আমাকে মহল থেকে তাড়িয়ে দেবেন না…”
সে মাথা নিচু করে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
“আপনি চাইলে আমাকে কালকুঠুরিতে নিক্ষেপ করুন। কারাগারে বন্দি করে রাখুন। যত কষ্টের শাস্তি আছে সব দিন…”
কথাগুলো বলতে বলতে সে আরও জোরে পা আঁকড়ে ধরে।
“তবুও আমাকে আপনার থেকে দূরে পাঠাবেন না, শাহজাদা আমি পারবো না… আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারবো না…”
তার কণ্ঠে কোনো অভিনয় নেই। শুধু অসহায় একটা সত্যি। মহলের সবাই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। এই দৃশ্যের সামনে যেন কারও কিছু বলার সাহস নেই।
মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করেই কাঁদছে। তার কাঁধ কাঁপছে, হাত দুটো শক্ত করে ধরে আছে বাইজিদের পা যেন ছেড়ে দিলে সবকিছু হারিয়ে ফেলবে।
“আপনি বলছেন আমি দোষী… আমি সব মেনে নিচ্ছি”
সে কাঁদতে কাঁদতেই বলে
“কিন্তু… আমাকে আপনার কাছ থেকে দূরে করবেন না…”
বাইজিদ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার দৃষ্টি নিচে, মেহেরুন্নেসার উপর। তার চোখে আবারও জল জমে, কিন্তু সে নড়ে না। এই মুহূর্তে সে জানে
একটা সিদ্ধান্ত বদলালে সে হয়তো স্বামী হয়ে উঠবে কিন্তু শাসক হিসেবে সে ভেঙে পড়বে।
মহলের ভেতর তখন এমন এক নীরবতা নেমে এসেছে, যেন সবাই শ্বাস আটকে আছে। চারপাশে এত মানুষ, অথচ কারও কণ্ঠ নেই শুধু অপেক্ষা।
এই অবস্থাতেই বাইজিদ আবার সামনে এগিয়ে এল। তার চোখে স্পষ্ট জেদ সে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবে মেহেরুন্নেসাকে বাঁচাতে।
দৃঢ় কণ্ঠে বলল
“শুধু ধারণা দিয়ে কাউকে দোষী করা যায় না। তোমাদের কাছে কি কোনো প্রমাণ আছে?”
তার কণ্ঠে রাজকীয় কঠোরতা থাকলেও ভেতরে ভেতরে সে স্পষ্ট সময় নিচ্ছে যেন কোনোভাবে পরিস্থিতিটা পাল্টানো যায়।
গবেষণাগারের লোকগুলো এবার একটু সরে দাঁড়ায়। তখনই সামনে আসে সেই অদ্ভুত মানুষটা।
লোকটার মুখ কাপড়ে শক্ত করে বাঁধা। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ, ঠান্ডা। দুই হাতে পুরু, অদ্ভুত ধরনের মোজা যেন সরাসরি কিছু স্পর্শ করাও বিপজ্জনক।
সে ধীরে, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের সাথে সামনে এসে দাঁড়ায়।
“শাহজাদা”
সে মাথা নিচু করে বলে
“এই তরলগুলো সাধারণ কিছু নয়। এগুলো এমন রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি যা শরীরে অদৃশ্য চিহ্ন রেখে যায়।”
সে তার হাতে ধরা ছোট পাত্রটা একটু ওপরে তোলে, যেন সবাই ভালো করে দেখতে পায়।
“যদি কেউ ওই তরল স্পর্শ করে থাকে, তাহলে সেই চিহ্ন বাইরে থেকে দেখা যাবে না। কিন্তু”
সে একটু থামে, যেন কথাটার গুরুত্ব বোঝাতে চায়
“এই বিশেষ পরীক্ষণ তরল তাদের হাতে ঢাললে, সেই অদৃশ্য চিহ্ন সক্রিয় হয়ে উঠবে।”
চারপাশে কেউ নড়ছে না। লোকটা এবার আরও স্পষ্ট করে বলে
“তাদের হাত সবুজাভ হয়ে উঠবে। এটা কোনো অনুমান নয়, এটা প্রমাণ।”
এই ব্যাখ্যা শোনার পর মহলের মানুষের মুখে ভয়ের ছাপ আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। এখন আর এটা শুধু অভিযোগ না এটা যেন সত্য বের করার সরাসরি উপায়। বাইজিদ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ একবার মেহেরুন্নেসার দিকে যায়।
মেহেরুন্নেসা স্থির। সে জানে এই মুহূর্তে তার কিছু বলার নেই। সবকিছু এখন এই পরীক্ষার উপর নির্ভর করছে। কিন্তু মেহেরুন্নেসা আত্মবিশ্বাসী। কারণ সে এমন কিছু করেনি তাই সে নির্দোষ প্রমাণিত হবে।
ঠিক তখনই, উঁচু আসন থেকে বাকের শাহ্ ধীরে ধীরে বলে ওঠেন
“যথেষ্ট শোনা হয়েছে।”
বাকের শাহ্-এর আদেশ যেন শেষ পেরেকের মতো ঠুকে দিল পরিস্থিতির উপর।
“পরীক্ষা শুরু করো।”
শব্দগুলো ধীর, কিন্তু এতটাই ভারী যে কারও আর কিছু বলার সাহস রইল না।
রক্ষীরা এগিয়ে এল। তাদের পদধ্বনি মহলের নীরবতায় আরও স্পষ্ট শোনাতে লাগল ঠক… ঠক… ঠক…
প্রতিটা শব্দ যেন সময়কে আরও ধীরে টেনে নিচ্ছে।
মেহেরুন্নেসার সামনে এসে তারা থেমে গেল।
একজন রক্ষী সাবধানে তার দুই হাত সামনে এগিয়ে ধরতে বলল।
মেহেরুন্নেসা এক মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে তাকাল সোজা বাইজিদের দিকে।
যেন সে সবকিছু মেনে নিয়েছে।নধীরে ধীরে সে নিজের হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে দিল।
তার আঙুলগুলো সামান্য কাঁপছিল ভয়ে নয়, বরং এই অজানা পরিণতির ভারে।
বাইজিদের বুকটা আবারও কেঁপে উঠল।
সে এক পা এগোতে চাইল কিন্তু থেমে গেল।
তার মুঠো শক্ত হয়ে উঠেছে, চোয়াল শক্ত সে নিজেকে আটকে রাখছে। ওই মুহূর্তে সে শুধু একজন শাসক। কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা চিৎকার করে উঠছে।
এদিকে সেই মুখ ঢাকা লোকটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
তার হাতে ধরা ছোট পাত্রটা এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভেতরের তরলটা হালকা অস্বাভাবিক রঙের না পুরো স্বচ্ছ, না পুরো ঘোলা।
তারপর খুব ধীরে পাত্রটা কাত করল।
মহলের প্রতিটা চোখ এখন সেই এক ফোঁটা তরলের দিকে। প্রথম ফোঁটাটা পড়ে মেহেরুন্নেসার হাতের তালুতে। ফোঁটা পড়ার শব্দ শোনা যায় না।
আরেক ফোঁটা…
তারপর আরেকটা…
তরলটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল তার হাতের ওপর। কয়েকটা মুহূর্ত কেটে গেল। কিছুই হলো না। মহলের ভেতর চাপা গুঞ্জন শুরু হতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই… একটা হালকা পরিবর্তন দেখা গেল। মেহেরুন্নেসার আঙুলের ডগায় যেন খুব সূক্ষ্ম সবুজাভ আভা ফুটে উঠল। প্রথমে এতটাই ক্ষীণ যে বোঝা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই রঙটা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সবুজাভ আভা একটু একটু করে গাঢ় হতে থাকল।
কেউ একজন হঠাৎ দম বন্ধ করা কণ্ঠে বলে উঠল
“দেখো…!”
মুহূর্তেই চারপাশে চাপা শোরগোল।নসবাই এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। তার হাত… সত্যিই সবুজাভ হয়ে উঠছে। বাইজিদের মুখের রঙ বদলে গেল।
তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল তারপর সেই বিস্ময় ধীরে ধীরে ভেঙে গিয়ে জায়গা নিলো এক অদ্ভুত শূন্যতা।
সে তাকিয়ে আছে তার ভালোবাসার মানুষটার দিকে যার হাত এখন সেই নিষ্ঠুর প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেহেরুন্নেসা নিচের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতের দিকে চেয়ে থাকে।
একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে তার চোখ থেকে।
কিন্তু সে কিছু বলে না।নকারণ এই মুহূর্তেবকথার আর কোনো মূল্য নেই। সত্য… নিজের রঙে প্রকাশ পেয়ে গেছে। মেহেরুন্নেসার হাতের সেই সবুজাভ আভা ধীরে ধীরে গাঢ় হতে থাকতেই
মহলের ভেতর জমে থাকা সব সন্দেহ যেন এক মুহূর্তে সত্য হয়ে উঠল।
বাইজিদ স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের ভেতর প্রথমে ছিল বিস্ময়… তারপর ধীরে ধীরে সেই বিস্ময় বদলে গেল অন্য কিছুর মধ্যে।
চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল কিন্তু সেটা ভালোবাসার আলো না, বরং ভাঙা বিশ্বাসের আগুন। মনে হচ্ছিল, ভেতরে ভেতরে সে নিজেকেই প্রশ্ন করছে এতদিন যাকে নিঃশর্ত বিশ্বাস করেছে সে-ই কি শেষ পর্যন্ত এমন বিশ্বাসঘাতকতা করল?
তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
মুখের পেশিগুলো টানটান।
ধীরে ধীরে সে মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল এবার তার ভেতরে আর কোনো দ্বিধা নেই।
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল না… বরং অস্বাভাবিকভাবে স্থির, ঠান্ডা
“ঘাতকতা করলে মেহের?”
কথাটা যেন ছুরি হয়ে এসে বিঁধল। মেহেরুন্নেসা মাথা তুলে তাকাল। তার চোখ ভিজে, কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না। এই শব্দগুলোই যেন তার সমস্ত শক্তি কেড়ে নিল। বাইজিদ আর তার দিকে তাকাল না।
শুধু মুখ ঘুরিয়ে কঠোর স্বরে বলল
“দ্রুত নিজের পোশাক গুছিয়ে নাও।”
এক মুহূর্ত থেমে, আরও স্পষ্ট করে উচ্চারণ করল
“এই মুহূর্তেই মহল ছেড়ে চলে যাবে।”
কোনো চিৎকার নেই, কোনো রাগের বিস্ফোরণ নেই কিন্তু তার কণ্ঠের সেই ঠান্ডা সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বেশি নির্মম। মেহেরুন্নেসার চারপাশে যেন সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল। সে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু পা যেন নড়ছে না। এই সেই মানুষ যে একটু আগেই বলেছিল ভালোবাসে।
আর এখন একই মানুষ তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করছে। মহলের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
কেউ কথা বলছে না।
একটা বিশ্বাস।নীরবে ভেঙে পড়ে আছে সবার সামনে। সবার সামনে সিদ্ধান্তটা ঘোষণা হতেই মহলের ভেতর যেন এক অদৃশ্য ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল। সিমরান ভিড়ের মাঝেই দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে থেকে তার মুখ গম্ভীর, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত তৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ছে। এতক্ষণ সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দোয়া করছিল । তার একটাই চাওয়া ছিল, মেহেরুন্নেসা যেন এই মহল থেকে বিদায় নেয়।
আজ সেই চাওয়াটা সত্যি হতে চলেছে।
সে মাথা নিচু করে রাখলেও ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম একটা হাসি খেলে যায়।
মনে মনে বলে
“শেষ পর্যন্ত আল্লাহ আমার কথা শুনলেন…”
তার চোখ একবার মেহেরুন্নেসার দিকে যায়।
এই সেই নারী, যাকে এতদিন সহ্য করতে পারেনি। আজ তাকে ভেঙে পড়তে দেখেও তার মনে কোনো দয়া জাগে না বরং এক ধরনের স্বস্তি।
অন্যদিকে, মহলের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে প্রভা।
সে একদম চুপ। কারও সাথে কথা বলছে না, কারও দিকে তাকাচ্ছেও না। কিন্তু তার চোখে একটা অদ্ভুত শূন্যতা। এই দৃশ্যটা তার কাছে নতুন না। আট বছর আগে ঠিক এভাবেই সে দাঁড়িয়ে ছিল একই রকম ভিড়, একই রকম অভিযোগ, আর একটা ভুল বোঝাবুঝি। সেদিনও একটা সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল।নএকটা সংসার, যা খুব সুন্দর হতে পারত সেটাও শেষ হয়ে গিয়েছিল অন্যের চালে, অন্যের কথায়।
প্রভা চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে।
সেই পুরোনো দিনের কান্না, সেই বিচ্ছেদের শব্দ সব আবার যেন কানে ভেসে ওঠে। আজ আবার একই ঘটনা ঘটছে। সে ধীরে ধীরে চোখ খুলে সামনে তাকায়, বাইজিদ দাঁড়িয়ে, মুখ শক্ত।
আর মেহেরুন্নেসা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া একটা মানুষ।
প্রভার বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে সে খুব নিচু স্বরে নিজেকেই বলে
“আবারও একই ভুল হচ্ছে। এই ভুলের কারণে একটা সুন্দর দম্পতি চলে গিয়েছিল। আমার বড় বোন চলে গেছিল।”
কিন্তু এই ভিড়ের মধ্যে তার সেই কথাটা কেউ শোনে না। মহলে তখন সবাই ব্যস্ত বিচার নিয়ে, দোষ-অভিযোগ নিয়ে। কিন্তু কেউ খেয়াল করছে না এই বিচারটা সত্যি কিনা।
নাকি আবারও কোনো ভুল বোঝাবুঝির উপর দাঁড়িয়ে একটা সম্পর্ক শেষ হয়ে যাচ্ছে। রায় ঘোষণা হওয়ার পর কিছুক্ষণ কেউ নড়ল না। যেন সবাই এখনও বুঝে উঠতে পারছে না এইমাত্র যা ঘটল, সেটা সত্যি কিনা।
তারপর ধীরে ধীরে বাকের শাহ্ উঠে দাঁড়ালেন। চারপাশে একবার তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন
“বিচার শেষ। সবাই যে যার কাজে ফিরে যাও।”
তার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যাতে আর কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ রইল না।
লোকজন ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করল। কেউ চাপা স্বরে কথা বলছে, কেউ আবার একেবারেই চুপ।
বাকের শাহ্ একবার বাইজিদের দিকে তাকালেন। তার চোখে সন্তুষ্টির ছাপ স্পষ্ট।
“প্রিয়জন বলে দয়া দেখাওনি, এটাই যোগ্য শাসকের লক্ষণ। তুমি সঠিক বিচার করেছ।”
কথাগুলো বলে তিনি আর কিছু না বলে সরে গেলেন। মহল ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে এলো।
এদিকে মেহেরুন্নেসা একবারও পেছনে না তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করল। তার পা ভারী, কিন্তু থামেনি। সে জানে এখন তার কাজ একটাই, চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া। নিজের কক্ষে ঢুকে দরজাটা আস্তে করে বন্ধ ভিড়িয়ে দিল। ভেতরে ঢুকেই সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে তাকাল এই ঘর, এই দেয়াল, এই সবকিছু… কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে। তারপর ধীরে ধীরে কাপড় গুছাতে শুরু করল।
হাত কাঁপছে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে তবুও থামছে না।
এদিকে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল বাইজিদ। সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। যেন নিজের ভেতরের ঝড়টা সামলাতে চাইছে। তারপর হঠাৎ কি মনে করে হাঁটা শুরু করল কক্ষের দিকে।
তার পদক্ষেপ দ্রুত নয়, কিন্তু থামছেও না।
ঠিক তখনই সিঁড়ির মুখে পৌঁছাতেই কেউ হঠাৎ তার হাত চেপে ধরল।
বাইজিদ চমকে তাকাল।
প্রভা। সে কিছু না বলে তাকে টেনে নিয়ে গেল পাশের আড়ালে একটা নির্জন জায়গায়, যেখানে অন্য কারও চোখ পড়ে না। প্রভার শ্বাস দ্রুত চলছে, চোখে অদ্ভুত এক তাড়াহুড়ো আর দুশ্চিন্তা। সে শক্ত করে বাইজিদের হাত ধরে বলল
“ভাইজান তুমি যা করলে এটা ঠিক হয়নি।”
তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু স্পষ্ট।
“আমি আগে দেখেছি ঠিক এভাবেই একটা ভুল বিচার একটা সুন্দর সম্পর্ক শেষ করে দেয়।”
সে এক মুহূর্ত থামে, চোখে জমে ওঠা কষ্ট লুকানোর চেষ্টা করে।
“সবকিছু যেমন দেখা যাচ্ছে তেমন নাও হতে পারে, ভাইজান। তুমি মেহেরকে কি করে অবিশ্বাস করতে পারো।”
বাইজিদ কথা বলে না চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। চন্দ্র প্রভা তার বাহু ধরে ঝাকিয়ে বলে
“সব কি ভুলে বসেছো তুমি? মারজান কি কি করেছ তোমাদের। সাথে সব ভুলে বসেছো? সব অপরাধীদের এখনো শাস্তি দেওয়া হয়নি ভাইজান। রত্নার খুনিরা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা তাদের এখনো মারতে পারিনি। তারই মধ্যে তুমি আর অঘটন ঘটিও না। মেহেরকে এখান থেকে তাড়িয়ে দিও না। মহলের বাইরে গেলে ওর বিপদ হতে পারে। এসব যে মারজানের চাল সেটা কি তুমি বুঝতে পারছ না?”
বাইজিদ থমথমে মুখে বলল
“মেরুন্নেসার উচিত ছিল আমাকে ভরসা করা। একজন বন্দির কথা মত সে নাচতে নাচতে ওখানে কেন চলে গেল? সে অবশ্যই অপরাধ করেছে এবং শাস্তিও সে পাবে। আমার সাথে দূরত্ব বাড়ানোর চেয়ে বড় শাস্তি তার কাছে আর কিছুই হতে পারে না। এটা আমি জানি তাই, জেনে বুঝে শাস্তি দিচ্ছি। যেতে দাও ওকে। শাস্তি না পেলেও শক্ত হবে না। ওকে প্রচুর শক্ত হতে হবে আমার চেয়েও বেশি”
চন্দ্রপ্রভা চোখের কোনায় আশা পানি টুকু মুছল
“আচ্ছা ভাইজান, মেয়েরা কোমলমতি স্ত্রী হয়ে স্বামীর আদরে থেকে যেতে পারে না? তাদের কেন যোদ্ধা হতে হয়? কেন অস্ত্র তুলে নিতে হয় হাতে? যোদ্ধা জীবন মোটেও সুখেরনা, সংগ্রাম করে বাঁচতে হয়। অমন পুতুলের মত মেয়েটাকে নিজের বাহুডোরে সারা জীবন পাখির ছানার মতো রাখতে পারতে না?”
একজন প্রহরী দ্রুত খবর নিয়ে আসে
“শাহজাদা গাড়ি প্রস্তুত। আপনি বেগমকে আসতে বলুন”
পরবর্তী পর্ব পেতে পেইজে ফলো দিয়ে রাখুন। কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন আর অবশ্যই ৩k পূরণ হওয়া চাই 💟
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৮
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৪ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪০ এর শেষাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৯ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২০