Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ৪১+৪২


কাজরী পর্ব ৪১+৪২

সাবিকুননাহারনিপা

আল্পনা সপ্তাহ খানেকের বেশী সময় ধরে চৌধুরী প্যালেসে অবস্থান করছে। কাজরী ও’কে বাসায় পাঠায় নি। অবশ্য এক দিক থেকে সেটা ভালোই হয়েছে। এখানে থাকার কারণে অস্বস্তি একটু কম হচ্ছে। আল্পনা আজ কাজরীকে একা পেল। এই কদিন কথা বলার মতো সুযোগ খুঁজলেও পায় নি। দুপুরের দিকে কাজরী এলো ওর কাছে।

“এখন কেমন আছ? শরীর ঠিক আছে? “

“আমি ঠিক আছি কাজরী?”

“তোমার কিছু লাগবে? “

“আমার তোমাকে কিছু প্রশ্ন করার আছে কাজরী। “

কাজরীর ভ্রু কুঞ্চিত হয়।

“কী প্রশ্ন?”

“আচ্ছা মা বাবার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটে তখন তো আমি ছোট ছিলাম। আমার তো কিছু মনেও নেই। সেই ঘটনার প্রভাব কী আমার উপর পড়েছিল?”

“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

“ছোটবেলার স্মৃতি আমি মনে করে দেখলাম। এখন যেমন আছি, ভয় আতঙ্কের মধ্যে থাকা। তখনও আমি তেমন ই ছিলাম। “

“তোমার মায়ের অসুস্থতার প্রভাব তোমার উপর পড়েছিল আল্পনা। এটা স্বাভাবিক। আমার উপরও পড়েছে কিন্তু আমি সেটা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি কিন্তু তুমি পারো নি। “

আল্পনা ভাবছে। কাজরী আবার বলল,

“আমরা স্বাভাবিক পরিবেশে বড় হই নি আল্পনা। বাবাকে কাছে পেয়েছিলাম কম। মা সবসময় অসুস্থ থাকতেন। আমরা আতঙ্কিত থাকতাম কখন তার অসুস্থতা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যায়। তার অসুখ যখন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যেত তখন তিনি নিজের মধ্যে থাকতেন না। অস্বাভাবিক আচরণ করতেন। তবুও তুমি তার যথেষ্ট এটেনশন পেয়েছ। তিনি যতক্ষন ভালো থাকতেন তোমার সঙ্গে খুব সহজ থাকতেন, আদর করতেন। আমি সেটা পাই নি। বরং তোমার চেয়ে বেশী মেন্টাল স্ট্রেস আমার ছিলো। “

কাজরীর কথা মিথ্যে নয়। আল্পনা একমত এই ব্যাপারে। কাজরী প্রশ্ন করলো,

“হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? “

আল্পনার কিছু বিষয়ে খটকা আছে। সেগুলো বলতে চাইলেও ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে পারবে না। তাই হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,

“এমনিই। সাইকিয়াট্রিস্ট এর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রশ্নগুলো মনে হলো। আমার মনে হলো আমি আসলে জন্ম থেকেই এমন। এজন্য সবসময় আমাকে কঠিন কিছু ফেস করতে দেয়া হয় নি। “

“শোনা আল্পনা, আমাদের শৈশবে আনন্দের চেয়ে বিষাদ বেশী ছিলো। যেটা এক্ষুনি বললাম। প্রাচুর্য থাকলেও বাবা, মায়ের সঠিক কেয়ার আমরা পাই নি। প্রচন্ড নেগেটিভিটির মধ্যে আমরা বেড়ে উঠেছি। তুমি যেমন তোমার প্রবলেম গুলো বুঝতে পারছ তেমনি আমিও পারছি। তোমার মা’কে আমি যতদিন আমার মা জানতাম ততদিন পর্যন্ত তার দেয়া ট্রমাটিক আচরণ আমার জন্য প্যাথেটিক ছিলো, প্রচন্ড পেইনফুল ছিলো। যখন আমি রিয়ালাইজ করলাম যে তিনি আমার মা নন তখন কিছুটা সহজ হয়েছিলাম। তার মানে এই নয় আমি যে ট্রমা ফেস করেছি সেটার প্রভাব পড়েনি। যথেষ্ট পড়েছে। আমিও সাইকিয়াট্রিস্ট এর আন্ডারে ছিলাম, ডিপ্রেশন, এংজাইটি আমারও ছিলো। কিছু কাটিয়ে উঠতে পেরেছি, কিছু বয়ে বেড়াচ্ছি। “

“বুঝতে পারছি কাজরী। “

“আর কোনো প্রশ্ন আছে? “

“না।”

কাজরী আল্পনার হাত ধরে বলল,

“তুমি বিশ্রাম করো। ওভারথিংক কম করবে, স্ট্রেস রিলিফ হবে। আর বাবা সুস্থ হয়ে যাবেন ডোন্ট ওরি। “

আল্পনা হাসলো। কাজরী এতো নরম গলায় ওর সঙ্গে অনেকদিন পর কথা বলল। আল্পনা কাজরীর জন্য এতো গভীরভাবে ভালোবাসা ফিল করে অথচ ও করে না এই ব্যাপারটা দু:খজনক। আল্পনা মানতেও চায় না যে কাজরী ওর বোন নয়। বাবাও বোধহয় মানেন না। তিনি তো ও’কে আল্পনার চেয়েও বেশী ভালোবাসেন। কাজরীই নিজেকে সবার থেকে আলাদা ভাবে, পর ভাবে।

কাজরী মন্যুজান খাতুনের সঙ্গে দেখা করতে গেল। অনেকদিন তার সঙ্গে সরাসরি দেখা কথাবার্তা হয় নি। মন্যুজান খাতুন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তিনি কাজরীকে আখতারউজ্জামান এর ব্যাপারে প্রশ্ন করলেন। কেমন আছে, কী অবস্থা এইসব প্রশ্ন। কিন্তু ভালো আছে শুনে তেমন উচ্ছ্বসিত হলেন না। আফসোস করে বললেন, আখতারউজ্জামান কে তিনি ছেলের মতো ট্রিট করেছেন অথচ কতো ক্ষতিই না করছেন তিনি। কাজরী মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলো,

“আপনার কোন ছেলের ক্ষতি করেছেন বাবা?”

মন্যুজান খাতুন ক্ষেপে উঠে বললেন,

“তোমার তো বাপ না, তাইলে বাপ কেন ডাকো তারে? বাপ ডাকবা না। “

“উনি আমার জন্য যা করেছেন তাতে ওনাকে আমার মাথায় করা রাখা প্রয়োজন ছিলো দাদী। আপনারা তো আমাকে অস্বীকার করেছিলেন। “

বৃদ্ধা উদাস গলায় বলেন,

“তোমার মায়েরও দোষ কিছু কম ছিলো না। “

কাজরী হাসে। এই মহিলা প্রথমে ও’কে ভয় পেতেন। এরপর স্নেহের চোখে দেখতে শুরু করেছিলেন। যত সময় যাচ্ছে ততো তার আসল রুপ খসে পড়ছে। কাজরী তার সামনে খুব নরম থাকে বলে তিনি কাজরীর সঙ্গে প্রায় ই স্বভাবসুলভ রুক্ষ আচরণ করে ফেলেন । কাজরী সেটা উপভোগ করে। উনি চান শিরিনকে কাজরী বিরক্ত করুক। উনি যেটা পারছেন না সেটা কাজরী করুক। প্যালেসের এই ঘরে বসে উনি ভীষণ আনন্দ পান যখন শোনেন ছেলেমেয়েদের সঙ্গে শিরিনের টানাপোড়েন চলছে। অথচ কখনো পরিষ্কার করে বলেনও না শিরিনের অ*পরাধ কতোটুকু গুরুতর। কাজরী হঠাৎ প্রশ্ন করে,

“আপনি আপনার বড় ছেলেকে তেমন পছন্দ করতেন না তাই না?”

মন্যুজান খাতুন ঝাজালো গলায় বলেন,

“এসব কথা কে শিখাইছে? মায়ের কাছে সব সন্তান ই সমান। তোমার শাশুড়ীর মতো পি*শাচ না আমি। এসব কানে নিবা না। “

এরপর ব্যস্ত হয়ে পড়েন পান, সুপুরির বাটায়। কাজরী মনে মনে হাসে। সিন্দুকে পাওয়া মায়ের চিঠির কিছু শব্দ ও উদ্ধার করতে পেরেছে বহু কষ্টে। বুকভাঙা অভিমান নিয়ে ওর মা সেই চিঠি লিখেছিলেন শাশুড়ীকে। পুরো চিঠি বুঝতে পারলে কাজরীর জন্য অনেক কিছু ক্লিয়ার হতো। তবে যেটুকু হয়েছে তাতে এটা স্পষ্ট যে কোমল কোমল করে ওনার যে মরাকান্না সেটা ভালো সাজার অভিনয়ের একটা অংশ। কোমলের পরিনতির জন্য শিরিন তেমন দায়ী না থাকলেও উনি সব দোষ শিরিনের উপর চাপাতে ব্যস্ত। শিরিন চৌধুরী কোমলকে অপছন্দ করতেন এই সুযোগের সদ্ব্যাবহার করছেন মহিলা।


শিরিন নিশানকে নিয়ে চিন্তায় চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন রীতিমতো। তিনি আসলে অনামিকাকে যেতে বলে ভুল করেছেন। ছেলের মানসিক অবস্থা দেখে আর কিছু ভাবে নি। তাছাড়া অনামিকার পরিবারের সামনে এমন সিনক্রিয়েট করলো যে শিরিনকে বাধ্য হয়ে বলতে হলো চলে যেতে। এখন মনে হচ্ছে বিয়ে দিয়ে ও’কে দেশের বাইরে জোর করে পাঠালে ভালো হতো। নতুন বউ পেয়ে শ*য়তানি করার সুযোগ পেত না।

ইশান এখনো এই ব্যাপারে কিছু বলছে না। গতকালই রোদেলা, আশফাক, আইরিন কে রাজশাহী পাঠালো। আজকালের মধ্যেই কিছু একটা ঘটবে। নিশানকে লা*ত্থি মেরে প্যালেস থেকে বের করে দিলেও শিরিন অবাক হবে না।


“কাজরী তুমি ঠিক আছ এখন?”

কাজরী স্মিত হেসে বলল,

“পুরোপুরি চিন্তামুক্ত হতে পারছি না ইশান। বাবা যদি একটু কথা বলতে পারতেন….

ইশান কাজরীকে জড়িয়ে ধরলো একহাতে। কে বা কারা আখতারউজ্জামান কে মে*রে ফেলতে চায় এটা যে ওর চিন্তার কারণ সেটা বুঝতে পারছে ইশান। কাজরী হয়তো ভয়ও পাচ্ছে। আখতারউজ্জামান যদি না থাকে তাহলে কাজরী পুরোপুরি একা হয়ে যাবে। আল্পনা থাকলেও সে কখনো কাজরীর ভরসার জায়গা, শক্তির উৎস হতে পারবে না। তারচেয়েও বড় ভয়টা সম্ভবত পাচ্ছে নিজের জীবনের সঙ্গে জুয়া খেলে। কাজরী এতোদিনে সন্ধান পেয়েছে যে পাথুরে হৃদয়েও কলি প্রস্ফুটিত হয়ে ফুলের জন্ম নিতে পারে। যখন সেটা অনুভব করলো তখনই আটকে গেল সংকট এর অদ্ভুত বলয়ে। একদিকে সকলের জন্য তীব্র ঘৃনা, অন্যদিকে ইশানের জন্য জন্ম নেয়া ভালোবাসার নরম অনুভূতি। ইশান ও’কে একটা কথা বলেছিল, লাভ মেকস লাইফ বিউটিফুল। কথাটা শুনে কাজরীর মন আদ্র হয়। ও যদি একটা স্বাভাবিক পরিবেশে জন্ম নিতো। নিজের পাস্ট সম্পর্কে না জানতো তাহলে চমৎকার একটা জীবন হতো। সোলমেটের সঙ্গেই কাটিয়ে দিতো গোটা একটা জীবন। ইশানকে ও ভরসা করতে পারে। ওর ক্ষতি হবে এমন কিছু ইশান কখনোই করবে না। তবুও সংকোচ থেকে যায়।

ইশান আলতো করে কাজরীর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কাজরী কাঁধে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। ইশান বলল,

“আমি আজ নিশানের সঙ্গে কথা বলব। কিছু সত্য উন্মোচিত হবে আজ। “

কাজরী জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো। ইশান আবারও বলল,

“যদি লো ফিল করো তবে আজ আমাদের কনভার্সেশনে থেকো না। “

“নিশান ই বাবাকে?”

কাজরী চোখে স্পষ্ট ঘৃনা ও ক্রোধ। ইশান হতাশ গলায় বলল,

“এই ব্যাপারে আমি এখনো শিওর না। তবে তুমি রিলেটেড অনেক কিছুই ও করেছে যেগুলো করার কথা ছিলো না।”

“কী করেছে ও? “

ইশান জবাব দেয় না। কাজরী বুঝতে পারে এখন প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়া যাবে না।

“আমি থাকব ইশান। আমি জানতে চাই যে ঠিক কী ক্ষতি ও আমার করেছে। “

“এজ ইউর উইশ। “


দর্শনা জবে ঢুকে এই প্রথম কাজের সুযোগ পেল। কয়েক মাস শুধু বসে বসে স্যালারি গুনেছে। ইশান ও’কে যে কাজগুলো দিয়েছে সেগুলো ঠিক কাজের মধ্যে পড়ে না। কিছুদিন শিরিন চৌধুরীর সঙ্গে থেকেছেন। ওনার সঙ্গে স্যালুনে, ক্লাবে গেছেন। কার সঙ্গে দেখা করেছেন, কতক্ষন সময় সেখানে ছিলেন সেগুলোর আপডেট জানিয়েছে মেইল করে। এতোটুকু কাজের জন্য বড় অংকের স্যালারি নেবার সময় মনটা একটু খচখচ করেছে। পরে ভাবলো যে এরা টাকার কুমির। এদের যেহেতু গায়ে লাগছে না, ও কেন এই বিষয় নিয়ে ভাবছে।

কিছুদিন কাজরীর সঙ্গেও ছিলো। ইশান যেভাবে কাজরীকে সিক্রেট প্রজেক্ট হিসেবে বলেছিল, তাতে ভেবেছিল কী না কী করতে হবে। কিন্তু কাজরী দর্শনার ইন্টারফেয়ার পছন্দ করে নি। ইশানও তাই আর ও’কে কাজরীকে দেখার কথা বলে নি। ইশান পরবর্তীতে ওর কাজ চেঞ্জ করে দেয়। এরপর নিশান! উফ! এই লোকটা ও’কে খুব ভুগিয়েছে। পাক্কা শয়তা*নী মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

দর্শনার মাথা ঘুরে যায়। যখন খবর পেল নিশান কেরানীগঞ্জ এর এক সাইকোপ্যাথ কিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। ওর কাজ ছিলো নিশানের কল ট্র‍্যাক করে কনভার্সেশন রেকর্ড করা। কো*পা মোসাদ্দেক নামের লোকটার সঙ্গে কথাবার্তা শুনে রীতিমতো ভিরমি খাচ্ছিলো। নিশান বেশ চালাক। রেগুলার ফোন থেকে কথা বলে নি। আরও একটা ডিভাইস ইউজ করেছে। সেই ডিভাইস থেকে কথা বলেছে ইশানের এক্স গার্লফ্রেন্ড এর সঙ্গেও। ইশান কী করবে কে জানে! বড়লোকদের ব্যাপারই আলাদা। ভাইয়ের সব কুকীর্তি জেনেও দেখা যাবে ফ্যামিলি গেট টুগেদারে হাসিমুখে ফটোসেশান করছে। জন্মদিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। কী লাইফ এদের! নিজেদের মধ্যে ঝামেলা অশান্তি থাকা স্বত্তেও পাবলিকদের জন্য অভিনয় চালিয়ে যেতে হয়।


ইশান প্যালেসের ড্রইংরুমে বসলো। ওর হাতে ম্যাকবুক। শিরিন বসে আছেন কপালে হাত দিয়ে। নিশান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে আছে। আজকে যে নাটকের প্রধান চরিত্র ও সেটা জানে। তবে ও ঠিক করে রেখেছে যে যা প্রশ্ন আসবে সেগুলো আত্মবিশ্বাস এর সঙ্গে অস্বীকার করবে। শিরিন চৌধুরী ও ইশান দুজনের জন্যই ইমেজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারা নিশানের সঙ্গে খুব বেশী রূঢ় হতে পারবেন না।

আল্পনা যখন সিড়ি বেয়ে নামছে তখন শিরিনের ভ্রু কুঞ্চিত হয়। কাজরী প্রশ্ন করে,

“আল্পনা কেন আসছে এখন?”

ইশান নির্লিপ্ত গলায় বলে,

“আমি বলেছি তাই। “

“কেন?”

আল্পনা তখন এসে গেছে। ইশান এশনার পাশে বসার জায়গা দেখিয়ে বলল,

“প্লিজ সিট। “

আল্পনা বসলো। ইশান আল্পনাকে প্রশ্ন করলো,

“তুমি কেমন আছ আল্পনা? “

আল্পনা মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলো যে ঠিক আছে। ও নিজেও বুঝতে পারছে না যে কেন ও’কে ডাকা হয়েছে।

“আমি তোমাকে একটা ব্যাপার শেয়ার করতে চাই, রিসেন্টলি আমি ডিস্কভার করেছি যে আমার বড় ভাই…. সরি আমার স্টেপ ব্রাদার লাভস ইউ ভেরি মাচ। “

নিশান চকিতে ফিরে তাকায়। শিরিন চৌধুরী বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছেন। কাজরী বিস্মিত ও হতভম্ব। এশনা ঝট করে নিশানের দিকে তাকালো। নিশান মেরুদণ্ড টানটান করে বসে আছে।

“একটু বুঝিয়ে বলি। তোমার যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তাকে এই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে নিশান। পঞ্চাশ লাখ টাকা খরচ করে কিলার হায়ার করেছে কেন আল্পনা? দেখো আমার ভাই পিওর জেন্টলম্যান! একাডেমিক রেজাল্ট দুর্দান্ত, এওয়ার্ড, গোল্ড মেডেল সবকিছু আছে ওর নামে। আখতারউজ্জামান এর মতো অর্ডিনারী মানুষের সঙ্গে তার শত্রুতা! নেভার! দ্যাট মিনস হি লাভস ইউ। হি ইজ ইওর সিক্রেট লাভার। “

আল্পনা তাকালো নিশানের দিকে। হতভম্ব মুখে বসে আছে। শিরিন শ্বাসকষ্ট অনুভব করলেন। কাজরী উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“এসব কী হচ্ছে? “

ইশান গমগমে গলায় বলল,

“বসো তুমি। আমার কথা শেষ হয় নি। “

“খুনের জন্য প্রভোক করা আর খুন করা তো এক বিষয় না। তবুও ও’কে খু*নী হিসেবে ধরা যায়। বাট হি রিয়েলি লাভস ইউ। “

আল্পনাকে বিভ্রান্ত দেখালো। ও নিশানের দিকে অদ্ভুত চোখে তাকালো। এখনো পর্যন্ত ওদের কখনো স্বাভাবিক কনভার্সেশন হয় নি। যতবার এই প্যালেসে এসেছে ও কখনোই নিশানকে নোটিস করেনি। লাস্টবার ও ভালো করে নিশানকে পার্টিতে দেখেছিল কারণ তখন ওর কানে নিশানের জন্ম বৃত্তান্ত এসেছিল।

নিশানের সঙ্গে চোখাচোখি হলো আল্পনার। নিশানও ওর মতো একই রকম বিস্মিত ও হতভম্ব। এশনা জিজ্ঞেস করলো,

“ভাইয়া এক্সপ্লেইন করো তো পুরো বিষয়টা। আমি আসলে কিছু বুঝতে পারছি না। “

ইশান আল্পনাকে বলল,

“আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না তাই তো? একচুয়েলি নিশান হলো সিক্রেট লাভার। আর সিক্রেট লাভারদের কাজ কী? দূর থেকে ভালোবাসা। “

কাজরী অধৈর্য্য গলায় বলল,

“ইশান প্লিজ হেয়ালি কোরো না। “

ইশান কঠিন গলায় বলল,

“এযাবৎ আল্পনার সঙ্গে যা যা ঘটেছে সবকিছুর মূলে আছে নিশান। আল্পনার বিয়ে ভাঙা, এছাড়া আরও ঘটনা আছে। নিশান বলুক বাকীসব। “

নিশান জমে গেছে পুরোপুরি। এভাবে ওর সব কুকীর্তি সামনে আসবে সেটা ভাবনায়ও ছিলো না। ইশান ঠান্ডা স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি বলবে নাকি বাকীটুকুও আমিই বলব?”

নিশান কাজরীর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। কাজরীর চোখে প্রচন্ড ঘৃনা বিরাজমান। ইশান বলে,

“বেশ আমিই বলি তাহলে, তুমি আমার সন্দেহের লিস্টে কবে আসলে সেই থেকে শুরু করি। আমাদের রিসিপশনের দিন আল্পনা নিখোঁজ হলো। কাজরী দোষারোপ করলো মা’কে। কাজরী মাত্র একদিনের মধ্যে এসে শিরিন চৌধুরীর চোখে চোখ রেখে এতোবড় এলিগেশন আনলো স্বাভাবিক ভাবে মাম্মাজ বয়ের রেগে যাবার কথা। আমি নিশানকে চিনি, ও এক্সপ্রেশন লুকোতে জানেনা। ঠিক যে মুহুর্তে আমি কাজরীর পক্ষ নিয়ে মায়ের কাছে কৈফিয়ত চাইলাম ও আমাকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। দুটো বাক্য তখন আমাকে ও বলেছিল। কিন্তু সেটা রেগে নয়, বরং খানিকটা ভয় ছিলো কথা বলার ভঙ্গিতে।

শিরিন তাকিয়ে আছেন। স্পষ্ট মনে আছে সেদিনের ঘটনা। ইশান আবারও বলল,

“আমি ব্যাপারটা মাথা থেকে সরাতে পারিনি। আল্পনার সঙ্গে কথা বলে ওর চালাকি ধরতে পারার পর মনে হলো কাজরী জড়িত। পুরো নাটকটা কাজরী সাজিয়েছে। আর কাজরীকে সেই সময় সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। আমি সেইদিনের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করলাম। ঘন্টার পর ঘন্টা খরচ করে ফুটেজ দেখেছি। যেহেতু আমার সন্দেহ কাজরীর উপর তাই ও’কেই বেশী ফলো করেছি। কাজরীর মধ্যে অস্বাভাবিকতা কিছু নেই, হতেই পারে তুখোড় অভিনেত্রী। তবুও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এর মধ্যে কিছুটা অসংগতি থাকবেই।

কাজরীকে সন্দেহ করার ব্যাপার টা মাথা থেকে বের করে বাকী সদস্যদের লক্ষ্য করলাম। মা আর নিশান। সন্দেহের লিস্টে এবার নিশানকে রাখলাম আগে। ও ধূর্ত হলেও বুদ্ধিমান না। ঠিক যে সময় আল্পনা কাজরীর সঙ্গে কথা বলছিল তখন ও তীক্ষ্ণ নজরে দেখছিল। আল্পনা ঠিক যেখানে যেখানে গেছে নিশানকেও সেখানে পাওয়া গেছে কোনো না কোনো বাহানায়। হোক সেটা গেস্ট ওয়েলকাম করা, ড্রিংক পিক করা।

আল্পনা যখন একা অপেক্ষা করছিল সেই সময় নিশান ফোনটা বের করে কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্ক্রিনে কিছু একটা করছিল।

ওই পার্টিতে এন্ট্রি নিতে হলে সবার হাতে গেস্ট কার্ড থাকা প্রয়োজন ছিলো। ওটা যদি প্যালেস থেকে না দেয়া হয় তাহলে অন্যভাবে কালেক্ট করা সম্ভব নয়।

“এখন বলো নিশান কেন আল্পনাকে দুর্জয়ের হাতে তুলে দিয়েছিলে? কী সমস্যা তোমার? “

আল্পনার চোখ রক্তবর্ন। দুর্জয় নামটা ওর জীবনে শুধু ভুল নয় একটা আক্ষেপের নামও। আল্পনা নিজেকে কতো ধীক্কার জানিয়েছে দুর্জয়ের ট্রাপে পা দেয়ার জন্য।

শিরিন মাথানিচু করে আছেন। তার চোখে প্রবল অবিশ্বাস আর ঘৃনার অশ্রুজল।

শিরিন উঠে দাঁড়িয়ে ভাঙা গলায় বললেন,

“ও’কে তুমি যা শাস্তি দেবার দাও। প্যালেস থেকে বের করে দিলেও আমি কিছু বলব না ইশান। আমি আর থাকতে পারছি না। ও যদি বলে যে এগুলো তোমার বাবা করিয়েছেন তাহলেও ক্ষমা পাবার যোগ্য নয়। কারণ এতোদিনেও ও সেটা কনফেস করে নি। “

নিশান চোখ বন্ধ করে ফেলল। ওয়াজেদ চৌধুরী যাকে ও বাবা বলে জানতো। তিনি ছিলেন ওর আইডল। নিশান সারাজীবন ওনার মতো হতে চেয়েছেন, হ্যাঁ ঠিক ওনার মতো। তার ক্লোজ হবার কারণে ও দেখেছিল কিভাবে তিনি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিস্থিতি হ্যান্ডেল করেন। আখতারউজ্জামান এই প্যালেসের মিটিং রুমে মিস্টার চৌধুরীকে আল্পনার বিয়ের কার্ড দেবার সময় শান্ত গলায় শাসিয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এরপর আর আমার কোনো পিছুটান থাকবে না। এমন কিছু সত্যি লোকের সামনে আসবে যেটা আপনার জন্য মঙ্গলজনক নয়।

নিশান দেখেছে বাবা মুষড়ে পড়েছেন। দাদার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে গভীর চিন্তায় মগ্ন। নিশানের হৃদয় ব্যথিত হয়। ওর আইডল, ওর প্রিয় মানুষ বাবা। ও যার জন্য অবসেসড। যার ইশারা ছাড়া ও কিছু করে না তাকে বিচলিত হতে দেখে প্ল্যান বানায়। তখন ও ভেবেছিল কাজরীর বিয়েটা ওর সঙ্গে দিতে চান না বলেই বাবা এতো বিচলিত। আর কিছু ভাবে নি, কাজরীকে স্টক করে সোশ্যাল মিডিয়ায়। লোক দিয়ে খবর নেয় ওর সম্পর্কে। কোথায় থাকতো সেখানকার লাইফস্টাইল কেমন। দুর্জয়ের সঙ্গে সেভাবেই পরিচয়।

এরপর ঘটনার মোড় বদলে যায়। কাজরী বউ হয়ে আসে ইশানের। একটা বিষয় ও’কে ভীষণ ভাবায় সেটা হলো পারিবারিক ডায়মন্ড রিংটা। যেটা কাজরীর হাতে ওঠে। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে কাজরী প্যালেসের বিশেষ কেউ হতে যাচ্ছে এবং সেই কারণে ইশানকেও যথেষ্ট এটেনশন দেয়া হবে ভবিষ্যতে। এরপর যা ঘটেছে সেখানে নিশান মাথা ঘামায় নি। দুর্জয়ের পরিকল্পনার পার্ট হিসেবে কাজ করেছে।

কোপা মোসাদ্দেক কে দিয়ে আল্পনার হবু বরকে মেরে ওয়াজেদ চৌধুরীর প্রতিপক্ষ আখতারউজ্জামান কে ঘায়েল করাই ওর উদ্দেশ্য ছিলো। ও ভেবেছিল বাবা যখন জানতে পারবে তখন ওর বিচক্ষনতায় মুগ্ধ হয়ে সাবাশি দিবেন। কিন্তু তিনি ও’কে সরাসরি বলেছিলেন,

“চৌধুরী সাম্রাজ্য আমি অনেক কষ্ট আর যত্ন করে গড়েছি। অনেক ইমোশন, অনেক ত্যাগ আছে এই সাম্রাজ্যের জন্য। ইশান অনেক কিছুতে পিছিয়ে থাকলেও একটা বিষয়ে তোমার চেয়ে এগিয়ে। সেটা হলো ওর চিন্তা করার ক্ষমতা। যেটা আয়ত্ত করা সম্ভব না। স্বভাবে, জিনে থাকা দরকার। তোমার নেই। “

তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে নিশানের নেয়া স্টেপ তার জন্য মঙ্গলজনক হয় নি।

নিশান দূর্বল গলায় বলল,

“আমি স্বীকার করছি। হ্যাঁ ওসব আমি করেছি কিন্তু…. ওই সময় আমি… আমার মনে হয়েছিল….

নিশান আমতা আমতা করে কথাগুলো বলছিল। ঠিক গুছিয়ে বলতে পারছিল না। হঠাৎ ই ভারী কিছু আঘাত করলো ওর কপালে। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো। কাজরীর সামনে ভারী ফুলদানীটা ছিলো। যেটা নিশানের উদ্দেশ্যে ছুড়ে মেরেছে এই মাত্র।

চলবে…….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply