কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭২
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
ইউশা বাকরুদ্ধ,স্তব্ধ!
কানদুটো পুড়ে ছাই হলো। এক চোট অবিশ্বাসে দুলল ওর ধরণীতল। টলমল চোখজোড়া নিস্পন্দ হয়ে পড়ল ভীষণ বিহ্বলতার তোড়ে। কেবল ফ্যালফ্যাল করে অয়নের পাথুরে মুখটায় চেয়ে রইল সে। অয়নের বুকের কাছে লেগে থাকা আঙুল,মৃদূ ছোঁয়ায় ধরে রাখা ওর শার্ট থেকে ইউশার হাতটা খসে পড়ল অমনি। মেয়েটার এই চোখের কাঁপুনি, কিংবা ছলকানি শরীরের? হিসেব নিকেষ ছাড়াই যেন বুঝে ফেলল অয়ন। মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে শূন্যে ঝুলে রইল সে। বিমূঢ় গলায় অস্পষ্ট আওড়াল,
“ বাসিস!”
ইউশার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়। জিভ কাঁপে। দুনিয়া সুদ্ধ যেন ভস্ম হয় মাটির নিচে। কেবল অবিশ্বাস্য প্রশ্ন নিয়ে ও চেয়ে রইল তখনো। হ্যাঁ-না কিচ্ছু বলতে পারল না। অস্থির চাউনি ফেলে খুঁজে গেল উত্তর,
অয়ন ভাই জানলো কী করে এসব?
জবাবটা অবশ্য এলো না। বাইরের প্রকৃতিকে তপ্ত করা সরব রোদটার বিপরীতে নীরব রইল সব কিছু। আচমকা দুটো পেশিবহুল হাত বাঘের মতো তেড়ে এসে ইউশার পেলব বাহু চেপে ধরল। খুব শক্তি খাটিয়ে খিচে ধরল অয়ন। ভয়ে-আতঙ্কে ইউশার বুক কেঁপে উঠল। যার তোড় বাড়ল অয়নের ক্ষুব্ধ চোখে চেয়ে। ভীষণ রাগে ঠোঁট কাঁপছে মানুষটার। সারা মুখে আগ্নেয়গিরির অস্থিরতা লেগে। অধৈর্য গলায় ধমকাল,
“ চুপ করে আছিস কেন? কথা নেই তোর মুখে? চোরের মতো ভালোবাসতে পারলে স্বীকার করতে পারিস না?”
ইউশার মাথায় সমুদ্র আছড়ে পড়েছে। চোখ ফেটে সেই স্রোত গড়িয়ে গড়িয়ে ভিজে যাচ্ছে গাল। কথাগুলো কণ্ঠস্বরে বেজে বেজে গেল,
“ তো-তোমাকে,তোমাকে ক-কে বলল এস-এসব?”
“ তুই আমার কথার জবাব দে, ভালোবাসিস আমায়? হ্যাঁ বা না?”
ইউশা দিশাহারা,দিকশূন্য! শীর্ণ শরীরে ভূমিকম্প নেমেছে! কী বলবে,কী উত্তর দেবে? প্রসঙ্গ কাটানোর শেষ চেষ্টা করতে বলল,
“ এগুলো পুরোনো কথা অয়ন ভাই,ওসব জেনে কী করবে তুমি?”
অয়ন গর্জে বলল,
“ হ্যাঁ বা না…”
ওই চিৎকারে আরেক দফা আঁতকে উঠল মেয়েটা। বুকখানা ছ্যাৎ করে কাঁপল ভীষণ শব্দে। পরপর গলার ভাঁজে চিবুক নুইয়ে নিলো ইউশা। অপরাধীর মতো, ওপর নিচে নাড়ল একবার। পল্লব ছুঁয়ে টুপ করে এক ফোঁটা জল গালে ফেলার মধ্যে দিয়ে বোঝাল, “ হ্যাঁ!”
অয়ন থমকে যায়। থমকে যায় ওর চাউনিরাও। সেকেন্ড কয়েক অমন নিস্তব্ধ হয়ে মেয়েটার মুখখানায় চেয়ে রইল সে। পরপর আস্তেধীরে ওর শরীর হতে হাত দুটো নেমে এলো। ইউশা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বলল,
“ অয়ন,অয়ন ভাই আমি কখনো…”
কথা কেড়ে নিলো অয়ন। প্রশ্ন ছুড়ল শান্ত গলায়,
“ কবে থেকে বাসিস?”
“ হ্যাঁ?”
“ কতদিন ধরে?”
ইউশা চোখ নামিয়ে নিতেই, গলার জোর বাড়াল অয়ন,
“ আমি জানতে চাই ইউশা। কবে থেকে ভালোবাসিস? কতদিন?”
“ পা-পাঁচ বছর!”
অয়নের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল । হতবিহ্বল হয়ে বলল,
“ পাঁচ বছর? পাঁচ ধরে আমাকে ভালবেসেও বলিসনি?”
ইউশা নিচে চেয়ে রইল,মেঝের বুকে আলগা হয়ে আসা পায়ের পাতার ওপর। বিব্রতবোধ, অস্বস্তিবোধে পায়ের জমি খসে যাচ্ছে যেন। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও নেই। ভয় লাগছে,চিন্তা হচ্ছে! অয়ন ভাই এখন এই ভালোবাসার কী মানে দাঁড় করবে? আবার যদি ভেবে বসে,ওর জন্যে তুশি বিয়ে করেনি! কিংবা ও কোনো কারসাজি করেছে এর পেছনে!
ঠিক তক্ষুণি কাউচে ধপ করে বসে পড়ল অয়ন। চেহারায় এক প্রস্থ বিধ্বস্তের ছাপ তার! ইউশার আতঙ্ক যেন লাগাম ছুঁয়ে গেল। চমকে ডাকল,
“ অ-অয়ন ভাই!”
অয়ন সাড়া দিলো না। হাঁটুর ওপর মুখ ঝুঁকিয়ে মেঝেতে চেয়ে রইল সে।
ইউশার শ্বাস উঠে এলো গলায়। হড়বড়িয়ে বলল,
“ অয়ন ভাই,আমাকে ভুল বুঝো না। আমি চাইনি তুমি কষ্ট পাও। তুমি যেদিন থেকে তুশিকে ভালোবাসার কথা আমাকে জানিয়েছিলে আমিতো সেদিন থেকেই তোমার থেকে দূরে, দূরে থাকতে চেয়েছি। আমি, আমি কখনো চাইওনি এসব তুমি জানো। আমি চেয়েছিলাম তুমি আর তুশি ভালো থাকো,তোমাদের সংসার হোক। বিশ্বাস করো,আমার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। আমি জানতাম না তুশি পালিয়ে যাবে। আমাকে একটু বিশ্বাস করো অয়ন ভাই। আমি শুধু…”
অয়ন চ্যাঁচিয়ে উঠল ক্রুদ্ধ স্বরে,
“ চুপ!”
দু কাঁধ ছলকে উঠল ইউশার। কথা থেমে যাওয়ার সঙ্গে ঠোঁটদুটোও ঠকঠক করল এক চোট। অয়ন এক হাত দিয়ে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় নিজের সারামুখ ঘষল। এলোমেলো লাগল ওকে দেখতে। যেন কিছু হারিয়ে গেছে! খুব দামি কিছু। কিংবা প্রিয় কোনো জিনিস জোর করে ছিনিয়ে নিয়েছে কেউ।
সেই চিহ্নটা ঠিকড়ে এলো কণ্ঠ হতে। কেমন হাহুতাশ করে উঠল অয়ন,
“ একটা বাচ্চা মেয়ে, যে আমার চোখের সামনেই একটু একটু করে বড়ো হয়েছে, সেই মেয়েটা পাঁচ বছর ধরে আমাকে ভালোবাসে আর আমি টেরও পেলাম না?
আমি এত নির্বোধ! এতটা? এতটা ব্রেইনলেস আমি?”
তুরন্ত ছুটে এসে হুড়মুড় করে ফ্লোরে ওর পায়ের কাছে বসে পড়ল ইউশা। কিছু বলতে নিলো দম টেনে,অয়ন আটকে দেয়। কেমন করে বলে,
“ তুই আমাকে আগে কেন বলিসনি ইউশা? কেন লুকিয়ে রেখেছিলি? তাহলে হয়ত আমার জীবনের এত বড়ো ব্লান্ডারটা ঘটতো না।
তুই আমাকে ভালোবাসিস জানলে আমি কোনোদিনও তোর বোনের দিকে হাত বাড়াতে যেতাম না। এখন এই ভুল আমি কী দিয়ে মুছব? কী দিয়ে আটকাব নিজেকে?
আমি এখন তোকে কোথায় রাখব,ইউশা? আমার বুকে আর জায়গা নেই। এখানে সব নিঃস্ব হয়ে গেছে।”
ইউশার চোখ ভরে গেল ফের। ঠোঁট টিপে নিতে চেয়েও পারল না। চিবুক নুইয়ে ফুঁপিয়ে উঠল ও। অয়ন গাঢ়-মোলায়েম স্বরে এক ফালি আক্ষেপ নিয়ে বলল,
“ আমি তোকে কোনোদিনও ভালোবাসতে পারব না!”
এইবার ঝরঝর করে কেঁদেই ফেলল মেয়েটা।
“ বাসতে হবে না অয়ন ভাই! হবে না বাসতে। আমি তোমাকে ভালোবাসি মানে,বিনিময়ে তোমাকেও ভালোবাসতে হবে না। তুমি শুধু থেকে যাও অয়ন ভাই,যেও না! এই বাড়ি ছেড়ে আমাদের ছেড়ে কোত্থাও যেও না তুমি।”
“ থেকে যাব? এত কিছুর পরেও বলছিস এই কথা! তোর খারাপ লাগবে না? কষ্ট হবে না? যখন আমাকে চোখের সামনে দেখবি,মনে হবে না,এই মানুষটা তোর এক তরফা প্রেম। যে তোর নিজের বোনের জন্যে এত পাগলামি করল, তাকে দেখে রাগ হবে না তোর?”
“ রাগ!
তোমার ওপর?”
ইউশা ঠোঁটের কোণ টেনে ওই ভেজা চোখেই হাসল একটু। অয়ন মূক বনে যায়। চেয়ে থাকে অবাক হয়ে।
ইউশা নিজেই বলল,
“ মানুষ সব থেকে বেশি ভালোবাসে নিজেকে। নিজের অস্তিত্বকে। আমার কাছে তুমিই আমি। নিজের ওপর কীভাবে রাগ করব তাহলে?”
অয়ন চুপ করে রইল থম ধরা মুখে। ইউশা কাতর চোখে বলল,
“ বলো না অয়ন ভাই,বলো না তুমি যাবে না!”
ও মুখ শক্ত করে বলল,
“ না ইউশা, আমাকে যেতেই হবে। এসব জানার পরে,আমি এখানে থাকব? আমি তোর সাথে চোখে চোখ মেলাব কী করে?
ইম্পসিবল!”
ও উঠতে নিলেই ধড়ফড় করে ইউশা হাঁটু চেপে ধরল। উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল,
“ না অয়ন ভাই, না তুমি যাবে না।”
“ ইউশা, আমি থাকাতে তোর আদৌ কোনো লাভ আছে? যেখানে আমার কাছে তোকে দেয়ার মতো কিচ্ছু নেই!”
“ লাভ! লাভের কথা বলছো? আমি যে তোমাকে একটুখানি দেখলেই বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি এটা লাভ নয় অয়ন ভাই? তোমাকে একটু ছুঁতে পারলে,এক দণ্ড তোমার কথা শুনলেই তো আমি জগত ভুলে যাই। ভালো না বাসলে,অন্তত দূরে গিয়ে আমার জীবনটা কেড়ে নিও না। তুমি চলে গেলে আমি তো বেঁচে থেকেও মরে যাব,অয়ন ভাই। যদি বাঁচতে দিতে না চাও বলে দাও,
আমাকে মারবে তুমি?”
অয়ন নির্বাক,বিপন্ন। স্থির চোখে বলল,
“ তুই সৈয়দ বাড়ির মেয়ে হলি কী করে,ইউশা? এখানে কেউ কারো জন্যে এক ইঞ্চি মাটিও ছাড়ে না,সেখানে তুই এত উদার হলি কী করে?”
“ হয়ত তোমায় ভালোবেসে!”
অয়নের শব্দভাণ্ডার শূন্য হয়ে পড়ে! দ্বিতীয় বার উত্তর দিতে পারল না।
ইউশা ব্যাকুল হয়ে বলল,
“ কী,বললে না তো! বলো,বাড়ি ছেড়ে তুমি যাবে না তো অয়ন ভাই,বলো না!”
অয়ন নিরুত্তর। অমন করেই বসে রইল,চেয়ে রইল কিছু সময়। তারপর হাঁটুর ওপর থেকে ইউশার হাতটা ঝট করে সরিয়ে দিলো হঠাৎ। উঠে দাঁড়াল,টু শব্দ না করেই টলমলে পা ফেলে বেরিয়ে গেল বাইরে। নিভৃত্তে ভেঙে পড়ল ইউশা। চোখদুটো কাঁপল ডরের তোপে। এর মানে অয়ন ভাই কথা রাখবে না? যাবেই যাবে?
মেয়েটা হাল ছাড়ল না। অয়ন ভাই শোনো,
বলতে বলতেই পিছু পিছু ছুটল। তবে অতক্ষণে অয়ন সিঁড়িতে নেমে গেছে। ইউশার সব বিষাদ তলিয়ে গেল কোনো নিকষ কালো গুহায়। আশা-প্রত্যাশা ডুবে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে,ওইখানেই মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে গেল মেয়েটা!
বাড়িতে সাইফুল-শওকত নেই। কাজে বেরিয়েছেন। শওকত রিটায়ারমেন্টের পর ব্যবসা খুলেছিলেন,লাভে উঠতেই সাইফুল ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে যোগ হয়েছেন সেখানে। অয়ন বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই তারাও বের হয়ে যান। তবে,ও ফেরার খবর গিয়েছে বাড়ি থেকে। পথেই দু ভাই!
বসার ঘরে তখন অপেক্ষায় সকলে। সার্থ কাউকে ওপরে যেতে দিচ্ছে না। তনিমা অধৈর্য হয়ে পড়লেন শেষে । ছেলে নাকি এসেছে,তাহলে নিচে নামছে না কেন? প্রতীক্ষার দাবদাহে হাঁসফাঁস করে উঠলেন রমনী। বললেন,
“ আর কতক্ষণ বসে থাকব? অয়ন ইউশার ঘরে কী করছে? কী কথা বলছে ওরা? কোনো সমস্যা কিনা বলবি তো। ও ফিরে এলো, তাহলে আমার সাথে দেখা করল না কেন? কী হলো,কোনো সমস্যা কিনা কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”
রেহণূমা বললেন,
“ আমিও না। চিন্তা হচ্ছে এবার। হ্যাঁ রে সার্থ যাই না, আটকাচ্ছিস কেন? নাহলে বল,মিন্তুকে পাঠাই ডেকে আনুক।”
সার্থ বলল,
“ কারণ আছে বলেই তো যেতে বারণ করলাম। এতক্ষণ বসে থাকতে পারলে যখন, আরো পারবে। চলে আসবে,সময় দাও!”
জয়নব তো জানেন কিছুটা। প্রৌঢ়া আন্দাজ করলেন হয়ত। নাতীর সাথ দিতে বললেন,
“ তোমরা এত অধৈর্য হয়ো না তো বউমা! দেখি,অয়ন ভাই নিজেই আসুক।”
মিন্তু চ্যাঁচাল তক্ষুণি,
“ ওই তো অয়ন ভাই।”
সবাই এক ঝটকায় ফিরল সেদিকে। অয়ন নিচে এসে দাঁড়াতেই তনিমা কাছে ছুটে গেলেন। উদ্বীগ্ন হয়ে বললেন,
“ অয়ন, অয়ন কী হলো বাবা? শরীর টরির খারাপ? ফিরে এলি যে! বল না,শরীর খারাপ তোর?”
অয়ন উত্তর দিলো ছোট শব্দে,
“ নাহ।”
তনিমা আরো ব্যগ্র হয়ে পড়লেন,দুহাতে ছেলের দুইবাহু ধরে বললেন,
“ তাহলে নিশ্চয়ই মাকে ছেড়ে যেতে পারিসনি, তাই তো? কী দরকার তোর যাওয়ার! আমি তো বলছিই বাবা,থেকে যা। আমার কাছেই থাকবি তো বাবা? আর যাচ্ছিস না তো, বল না আর যাবি না তো? ওসব ফেলোশীপ-টিপ আমার লাগবে না। অত ডিগ্রী,টাকা আমার কোনো উচ্চ ডিগ্রী কিচ্ছুর দরকার নেই। তুই আমার বুকের কাছে থাক! সায়নটা নেই, অন্তত শেষ অবধি তোদের দুইভাইকে কাছে নিয়ে বাঁচতে চাই। বল না যাবি না তো?”
অয়ন সময় নিলো। অনেকটা সময়! শেষে
ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ যাব না।”
সঙ্গে সঙ্গে বসার ঘরের বিষণ্ণ তিঁমির তলিয়ে একটা সূর্য বসল যেন। তনিমা আদরে আহ্লাদে জড়িয়ে ধরলেন ওকে। মিন্তু হইহই করে উঠল। হাসি ফুটল বাকিদের মুখে। এমনকি সার্থ নিটোল ঠোঁটও সরল দুইদিকে।
শুধু অয়ন মাকে জড়িয়ে ধরেই আড়চোখ তুলে ফিরে চাইল দোতলায়। ইউশার ভেজা,স্যাঁতসেঁতে মুখটা জোছনায় ভরে গেছে। রেলিংয়ে থাকা দুহাতের মুঠো শক্ত করে,চাঁদের মতো খুশি নিয়ে কৃতজ্ঞতায় হাসল মেয়েটা নিজেও।
অয়ন নজর ফিরিয়ে আনল। মাকে বুকে রেখেই চুমু খেল মাথায়। বলল,
“ আমি যাব না। যাই হয়ে যাক যাব না কোথাও।”
তনিমা আনন্দে কেঁদে ফেললেন। জয়নব আলহামদুলিল্লাহ পড়লেন বিড়বিড় করে।
হাসিমাখা মুখগুলোর মাঝে কেবল ভ্রু কুঁচকে একবার মেয়েকে, আরেকবার অয়নকে দেখলেন রেহণূমা।
প্রশ্ন একটা তার মনে খচখচ করছে বেশ – অয়ন এতক্ষণ কী করছিল ওর রুমে? কী এমন কথা বলছিল ওরা? পরপর রেহণূমার মনে হলো,তুশিকে বিয়ে করার জন্যে ইউশা যে কসম-টসম দিয়েছিল সেসব নিয়েই হয়ত। সার্থ যে বলল এয়ারপোর্টে ও গেছিল, অয়ন কে বোধ হয় ওই জানিয়েছে সবটা। সেইজন্যেই হয়ত সোজা ইউশার ঘরে গিয়ে ওর সাথে রাগারাগি করেছে অয়ন। কিংবা সত্যিটা জানার পর বুঝতে পেরেছে তুশির তেমন দোষ নেই। এজন্যেই যাবে না বলছে! রেহণুমা স্বস্তির শ্বাস নিলেন জায়ের উজ্জ্বল মুখটায় চেয়ে। অয়ন আজ চলে গেলে আপার সাথে তিনি আর চোখ মেলাতে পারতেন না। যাক,যা হলো ভালোই হলো।
এদিকে তুশির বুক থেকেও বোঝার বিশাল পাথর নেমে গেছে। নিশ্চিন্ত সে। এক দিকে ইউশার কষ্টও ঘুচলো,আবার বড়ো মায়েরও।
কিন্তু এই বাড়ির মানুষগুলো এত সরল কেন? এই যে অয়ন বাড়িতে এসেই একদম সটান গিয়ে ইউশার ঘরে ঢুকল, ডানে বামে কোথাও চাইল না,এ নিয়ে কেউ একটু খারাপও ভাবল না? সন্দেহও করল না?
আর মা,মা যখন জানবে ইউশা আসলে অয়নকে ভাইয়ের চোখে দেখে না, বিস্ময়ে মা অজ্ঞান হয়ে যাবে না? তখনো কি ওকেই চড় মারবে?
বলবে তোর জন্যেই হয়েছে এসব! তুশি মরণ শ্বাস ঝাড়ল। ওর ভাবনার মাঝেই আচমকা পিছু ঘুরে সরাসরি চাইল অয়ন।
সোজাসাপটা চোখাচোখিতে বিব্রতবোধে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল তুশি। পরপরই অয়নকে এগিয়ে আসতে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।
সার্থ এতক্ষণ সোফায় গা এলিয়ে আরামসে বসেছিল। হুট করে অয়নকে তুশির দিকে ইউটার্ন নিতে দেখেই,চট করে মেরুদণ্ড সোজা করে বসল ও। অয়ন এসে থামল মুখোমুখি, তুশি অমনি চোখ নামিয়ে নিলো।
অয়ন সবার মাঝেই বলল,
“ থ্যাংক্স তুশি! অনেক ধন্যবাদ তোমাকে!”
তুশি মুখ তুলল আবার। কণ্ঠে বিস্ময়,
“ আ-আমি কী করলাম?”
অয়নের ঠোঁটের কোণে নীরস হাসি,
“ তোমার জন্যেই তো সব হলো। তোমার চিঠির জন্যে। চিঠিটা না পেলে হয়ত কিছু বুঝতেই পারতাম না। আমার আর তোমার ওপর কোনো রাগ নেই!”
তুশির ভ্রু দুটো কপালে চলে গেল।
সব উত্তর মিলল সাথে সাথে। এত কিছুর মাঝে ও তো চিঠির কথা ভুলেই গিয়েছিল। দুশ্চিন্তায় ডুবন্ত মুখটায় খুশি এসে বসতেই, অমনি সব দাঁত বের করে হাসল ও। স্ফূর্ত হয়ে বলল,
“ আপনি চিঠিটা পেয়েছেন?”
অয়ন আর তাকাল না। ঝট করে নজর ফিরিয়ে নিলো। তুশির হাসি ওর সহ্য হয় না। এই হাসি দেখেই তো ও খুব জঘন্য ভাবে ফেঁসেছিল একদিন। শুধু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝিয়ে চট করে পিছু ফিরে ঘরের দিকে রওনা করল ও।
তুশি দুগাল ভরে হাসলেও, বাকিরা কেউ কিছু বোঝেনি। তনিমা এখানে নেই। অয়ন থাকছে শুনেই রান্নাঘরে ছুটেছেন ওর পছন্দের রান্না করবেন বলে। ছেলেটা নিশ্চয়ই দুপুরে খায়নি।
জয়নব একবার শুধালেন,
“ কীসের চিঠি বলোতো?”
তুশি বলল,
“ আছে দিদুন সিগেরেট ওটা।”
মিন্তু কপাল চাপড়ে বলল,
“ তুশিপু,সিক্রেট।”
“ হ্যাঁ হ্যাঁ ওটাই।”
সার্থ কাঠ হয়ে বসে আছে তখন। পুরোনো ঝামেলা মিটলেও নতুন ঝামেলায় ও সহজ হতে পারল না। শুধু তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে চেয়ে দু পল দেখল তুশির হাসিটা। আচমকা উঠে এসেই সবার মধ্যে তুশির হাত খপ করে ধরে টেনে নিয়ে চলল ওপরে। মেয়েটা ভড়কায় কিছু। হকচকায় বাকিরাও। রেহণূমা বললেন,
“ কী হলো,সার্থ,শোন!”
জয়নব চোখের ইশারায় শান্ত হতে বোঝালে, থামলেন তিনি। তুশি নিজেও গাইগুই করেনি। শুধু সার্থর দাপুটে পায়ের সঙ্গে তাল মেলাতে
হোচট খেতে খেতে এগোলো।
মিন্তু এক টুকরো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ সবাই বক্তব্য শেষ করে ঘরে চলে যাচ্ছে,আর দরজা আটকে দিচ্ছে। আমার বউও নেই দরজাও নেই।”
সার্থ ভেতরে এসেও তুশির হাত ছাড়ল না। ধরল একদম পালিয়ে যাওয়া আসামীর মতো। দরজার হূক লাগিয়ে ফিরতেই, ও বলল,
“ এখন আবার আপনার কী হলো? ওরকম সবার মধ্যে দিয়ে টেনে আনলেন কেন?”
সার্থ জবাব না দিয়ে পালটা প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কীসের চিঠির কথা বলছিল,অয়ন?”
“ কেন, আমার লেখা চিঠি।”
সার্থ আরো অস্থির হয়ে বলল,
“ তোমার চিঠি মানে? তোমার চিঠি ও কোথায় পেয়েছে?”
“ আমি দিয়েছিলাম।”
“ হোয়ায়ায়াট? তুমি অয়নকে চিঠ-চিঠি লিখেছ? কী লিখেছ চিঠিতে?”
তুশি তাজ্জব হয়ে বলল,
“ আপনি এরকম করছেন কেন? আমি তো ওই…”
“ চিঠিতে কী লিখেছ সেটা আগে শুনব।”
তুশি দেখল সার্থ উত্তেজিত হচ্ছে। মজা পেলো ও। কাল থেকে ওর সাথে ভাব নেয়া হচ্ছিল না? বেশি করে ক্ষ্যাপাবে এখন। দুষ্টুমি করে বলল,
“ চিঠি তো বিয়ের আগে দিয়েছিলাম। একটু আধটু ভালোবাসার কথা…”
সার্থ দুই কাঁধ চেপে টেনে নিলো কাছে। মৃদূ স্বরে হুঙ্কার দিয়ে বলল,
“ তুশি! এসব নিয়ে মজা করো না। আমার দমবন্ধ লাগে।”
তুশি অল্প কেঁপে উঠলেও আজ ভয় পেলো না। বরং স্বীয় নিশ্চল নয়ন সার্থর তেজি চোখটায় ফেলে শুধাল,
“ কেন? আমি ওনাকে চিঠি লিখতে পারি না?”
“ না, তুমি আমার স্ত্রী,Each and every single detail of you,just belongs to me!”
তুশি নাক কুঁচকে বলল,
“ বাংলায় কথা বললে কী হয় আপনার? আমি পারি না দেখেই এত কঠিন কঠিন শব্দ বলেন তাই না? নাকি এটা গালি? আচ্ছা, আবার ওই ওইদিনের মতো আবার কিছু… “
এই সাবলীলতায় সার্থ সাথ দিয়ে পারল না। মরিয়া হয়ে বাহু ঝাঁকাল,
“ চিঠিতে অয়নকে কী লিখেছ, ডাফার?”
“ উফ বাবা,আপনি এরকম করছেন কেন?
আমি পালিয়ে যাচ্ছিলাম বলে ক্ষমা চেয়ে চিঠি লিখেছিলাম। আশ্চর্য মানুষ!”
সার্থ ওষ্ঠাগতপ্রাণ জায়গায় ফিরল যেন। এতক্ষণে বাহু ছাড়ল তুশির। বুক টেনে শ্বাস ফেলে বলল,
“ ওহ!”
তুশি আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ আমি না আপনাকে দেখে অবাক হয়ে যাই,এইত কালকেও ভাই চলে যাচ্ছিল বলে মুখটাকে বাংলার পাঁচ করে ফেলেছিলেন! অথচ ভেতর ভেতর তাকে এত হিংসে?”
“ এটাকে হিংসে বলে না।”
বলতে বলতে সার্থ পাশ কাটাল। বেড সাইড টেবিলের কাছে গিয়ে ঘড়ি,ফোন রাখার মধ্যেই এগিয়ে এলো তুশি।
“ অবশ্যই হিংসে বলে। একটা চিঠি নিয়ে যেভাবে আমাকে টেনে নিয়ে এসেছেন,এটাকে হিংসেই বলে। ছেলেদেরও এত্ত হিংসে থাকে?
আপনি তো শুধু বিটকেল না,হিংসুটেও। এমনিও আপনি অনেক অহংকারী! সব খারাপ গুণ আ….”
তুশির বকবক করার মাঝেই,আচমকা ওর কোমরের দুইপাশ ধরে উঁচুতে তুলে টেবিলের ওপর এক ঝটকায় বসিয়ে দিলো সার্থ। চমকে-থমকে নিঃশেষ হলো মেয়েটা। গোল গোল চোখে চাইল ওর দিকে। সার্থ মুহূর্তে ঝুঁকে যায় ওর কপালের ওপর। ঘাড়ে এক হাত রেখে মাথা উঁচুতে টেনে আনে। হিঁসহিঁসিয়ে বলে,
“ হ্যাঁ আমি হিংসুটে। তোমার ক্ষেত্রে তোমার পাশে অয়ন তো দূর,নিজেকে ছাড়া আমি কাউকে মানতে পারি না। রাতে যে বালিশটাকে তুমি বুকে চেপে ঘুমাও,সেটাকেও না।”
তুশি আহাম্মকের মতো চেয়ে রইল। সার্থর কণ্ঠ নামল একটু। নিঃসংকোচে বলল,
“ অয়ন আমার ভাই,
ওকে আমি সব দেবো। প্রয়োজনে নিজের শরীর কেটে মাংস দিয়ে দেবো। তাও শুধু আর শুধু তোমায় দেবো না তুশি!”
তুশির হৃদয় ভিজে গেল এক টুকরো সুখের তাড়নায়। অপলক চেয়ে রইল কাছাকাছি ঝুঁকে থাকা শক্ত চিবুকের পানে। মুখ ফস্কে বেরিয়ে এলো,
“ ক-কেন?”
সার্থ ঘাড় থেকে হাতটা সরিয়ে আনল। দায়সারা বলল,
“ এমনি।”
তুশির মেজাজ চটে গেল। গণগণ করল মাথার কোষ। এক হাত বুকে রেখে ঠেলে কাছ থেকে সরিয়ে দিলো ওকে। সার্থ সরেও গেল আজ। তুশি ধুপ করে নিচে নেমে তেজি পায়ে হাঁটা ধরল বাইরে। সার্থ ভ্রু কুঁচকে ডাকল,
“ কোথায় যাচ্ছ? অ্যাই চোর!”
তুশি উত্তর না দিয়ে অবজ্ঞা করবে ভেবেছিল,কিন্তু ও তো আর অভদ্র নয়। দাঁড়িয়ে গেল তাই। থমথম করে বলল,
“ দাদির কাছে। আজকে ওখানেই থাকব,রাতে ওখানেই ঘুমাবো। একদম গিয়ে দরজা ধাক্কাধাক্কি করবেন না,নিউজদার।”
সার্থ চেহারা গুটিয়ে বলল,
” নিউজদার! “
পরমূহুর্তেই নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“ নো নিড! তোমার ইচ্ছে, তুমি কোথায় ঘুমোবে। আমার তাতে কী?”
তুশি কটমটিয়ে উঠল। মুখ ঝামটার সাথে সাথে চুলের ঝাপটা ঘুরিয়ে বলল,
“ ওকে, গো টু হেল!”
সার্থ অল্পস্বল্প তব্দা খায়। এক ভ্রু তুলে বলে,
“ আচ্ছা? ইংরেজি বলা হচ্ছে?”
“ তো কি, ইংরেজি আপনি একা জানেন? আমিও শিখছি। যাতে উল্টোপাল্টা বলে কেউ আমাকে দিয়ে আর কোনো আজেবাজে কাজ করিয়ে নিতে না পারে!”
“ ফ্রেশ হই, হেল-এ যাওয়ার মজা তোমাকে আমি পরে বোঝাব। এমন হেল-এ নেব, কেঁদে কেঁদে ছাড়া পেতে চাইবে।”
তুশি কোমরে হাত দিয়ে বলল,
“ কী করবেন হ্যাঁ?”
সার্থ এক আঙুল দিয়ে থুতনি চুলকে বিড়বিড় করল
“ বাড়ি খালি হোক,বুঝবে!”
তুশি শুনতে না পেয়ে কপাল কুঁচকে ফেলল। দুটো চোখ দুই দিকে ঘুরিয়ে ভাবল,
বিটকেলটা আবার আমার বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র করছে কী? কোনোভাবে সেদিনের মতো কিছু করিয়ে নেবে না তো?
ভাবতেই আইঢাই করে উল্টোঘুরে ছুট লাগাল ও। পালিয়ে গেল জোরালো পায়ে! সেই সাথে পণ করল ,মরে গেলেও আপাতত কিছু দিন ও সার্থর রুমে আসবে না, ঘিষবে না ওর ধারেকাছে। কিন্তু ভবিতব্য যে ভিন্ন কিছু, জানতোই না বেচারি!
চলবে…
আগামী পর্বে চমক আছে…🤌
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৭
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭২.১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৪
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৫