Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪৮


অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়

লেখিকাসুমিচৌধুরী

পর্ব ৪৮

অনেক কষ্টে সেই উন্মত্ত ভিড় ঠেলে ঈশান শুভ্রকে ক্লাবের বাইরে নিয়ে এল। বাইরের রাতের হিমেল হাওয়া শুভ্রের তপ্ত শরীরে লাগলেও তার ভেতরের আগুন নেভাতে পারল না। শুভ্র এখন পুরোপুরি ভারসাম্যহীন। তার পা চলছে না। মাথাটা ঈশানের কাঁধে ঝুলে পড়েছে। সে বিরামহীনভাবে বিড়বিড় করে চলেছে।

“ঈশান আমার রিদিকে এনে দাও। ও কোথায় লুকিয়ে আছে? ওকে বের হতে বলো। আমি কথা দিচ্ছি আমি আর কখনো যাবো না ওকে ছেড়ে। একটা সেকেন্ডের জন্যও ওকে আমি চোখের আড়াল করবো না। শুধু ওকে একটু আসতে বলো আমি শান্তিতে একটা নিশ্বাস নিতে পারছি না। প্রতিটা নিশ্বাস বিষ হয়ে আমার ফুসফুস পুড়িয়ে দিচ্ছে”

হাঁটতে হাঁটতে শুভ্র আর পারল না। রাস্তার ধারের একটা নির্জন ল্যাম্পপোস্টের নিচে ধপ করে বসে পড়ল সে। ঈশানও ক্লান্ত হয়ে তার পাশে বসল। রাতের শহরটা এখন নিস্তব্ধ। শুধু দূরে দু-একটা গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঈশান আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব শান্ত গলায় বলল।

“বস আপনার মনে আছে একটা রাতের কথা? ঠিক এমন ঘোর অন্ধকারের রাতে রিদি আপনাকে যেতে দিবে না বলে পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল। শুধু তাই নয় একদম ছোট বাচ্চাদের মতো আপনার শার্টের কোণা টেনে ধরেছিল আপনাকে আটকে রাখার জন্য। মনে পড়ে কি সেই রাত আপনার?”

ঈশানের কথাগুলো যেন শুভ্রের অবশ হয়ে যাওয়া মস্তিষ্কে বৈদ্যতিক শকের মতো লাগল। মুহূর্তেই তার মনের পর্দায় ভেসে উঠল সেই রাতের স্মৃতি যেদিন রিদির সাথে তার শেষ দেখা হয়েছিল। শুভ্র চোখ বন্ধ করতেই দেখতে পেল রিদি তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে। দুই চোখে টলমল করছে জল। মেয়েটা নিজের সবটুকু আকুতি ঢেলে দিয়ে শুভ্রের শার্টের হাতা খামচে ধরেছিল। কান ধরে উঠবস করছিল যেন শুভ্র তাকে ছেড়ে না যায়। রিদির সেই মায়াভরা আর্তনাদ যেন আজও বাতাসে ভাসছে।

“আমাকে ছেড়ে যাবেন না শুভ্র ভাই। প্লিজ যাবেন না”

এতক্ষণ নেশা আর ডার্কনেসের ঘোরে শুভ্র নিজেকে একরকম পাথরের মতো শক্ত করে রেখেছিল। কিন্তু সেই স্মৃতি মনে পড়তেই তার ভেতরের বাঁধ ভেঙে গেল। বুকের ভেতরের চিনচিনে ব্যথাটা এখন এক অসহ্য যন্ত্রণায় রূপ নিয়েছে। শুভ্র আর বসে থাকতে পারল না। সে রাস্তার মাঝখানেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার মাথাটা মাটির দিকে নুয়ে এল। দুহাত দিয়ে নিজের বুকটা খামচে ধরল সে যেন হৃদপিণ্ডটা ছিঁড়ে বের করে আনতে চায়। পাগলের মতো শুভ্র অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল।

“আই এম সরি রিদি মাফ করে দে এই কাপুরুষটাকে। একটা বার ফিরে আয় প্লিজ জান জাস্ট একটা বার”

ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুভ্রের কাঁধে হাত দিয়ে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত গলায় বলল।
“শান্ত হোন বস। সবকিছু ভুলে নতুন করে সবকিছু শুরু করেন। রিদি এখন অন্য কারো। তাই রিদিকে মনে না রাখাই আপনার জন্য ভালো”

কথাটা যেন শুভ্রের বুকে জ্যান্ত তলোয়ার চালিয়ে দিল। শুভ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক আর্তনাদ করে উঠল। যে শব্দে রাতের বুক চিরে যেন হাহাকার বেরিয়ে এল।

“নাহহহহহহহহহহহহ। রিদি অন্য কারো হতে পারে না। ও আমার। ও শুধু আমার শুধুই আমার”

বলতে বলতে শুভ্রর সেই পাথরের মতো কঠিন অহংকার তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল। সে হঠাৎ একদম অবুঝ শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। ঈশান নিজের জায়গায় জমে বরফ হয়ে গেল। তার মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। জীবনে এই প্রথম সে ওই লৌহমানব শুভ্রকে এভাবে ভেঙে চুরমার হতে দেখছে। যে শুভ্রর এক রক্তচক্ষুর ইশারায় পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড থমকে যেত সে আজ ধুলোবালি মাখা রাস্তার পিচে মিশে যাচ্ছে। ঈশান কিছু বলার আগেই শুভ্র এক ঝটকায় পিচের ওপর বসে পড়ে জানোয়ারের মতো ঈশানের পা দুটো আঁকড়ে ধরল। তার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসছে। প্রতিটি নিশ্বাস যেন তার ফুসফুস ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে।

“ঈশান প্লিজ আমার রিদিকে এনে দাও। আমি জানি তোমরা সবাই মিলে আমার কলিজাটা জ্যান্ত ছিঁড়ে কোথাও লুকিয়ে রেখেছ। ওকে এনে দাও ঈশান আমার ভিষণ কষ্ট হচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। আমি যদি জানতাম ওই পাগলিটা আমার সামান্য রাগের জন্য এভাবে পর হয়ে যাবে তবে খোদার কসম আমি কখনো ওকে ছেড়ে যেতাম না। ও তো আমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারতো না তবে এখন কীভাবে আছে? ওর কি একবারও এই অধমটার কথা মনে পড়ছে না? ও কি আমার জন্য কাঁদছে না?”

ঈশান ঘাবড়ে গিয়ে শুভ্রকে তোলার চেষ্টা করল। তার নিজের ভেতরটাও যেন দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে এই দৃশ্য দেখে। সে অপরাধীর মতো তাকিয়ে ধরা গলায় বলল।

“আরে বস কী করছেন আপনি? আমার পা ধরছেন কেন? উঠুন বস। আর কি বললেন যে ও আপনাকে ছাড়া কীভাবে আছে বস মানুষ সবসময় একরকম থাকে না। পাথরকেও মারতে মারতে কিন্তু ভেঙে যায়। হয়তো রিদি তার নতুন জীবনের সাথে মানিয়ে নিয়েছে। হয়তো তার হাসবেন্ডের সাথে সে অনেক ভালো আছে। তাই আর আপনার খোঁজ”

“আহহহহহ” শুভ্র এক হিংস্র নেকড়ের মতো গর্জে উঠল। সে ঈশানের কলারটা সজোরে খামচে ধরে তাকে একদম নিজের চোখের মণির সামনে টেনে আনল। শুভ্রর চোখ দিয়ে তখন জল নয় যেন উত্তপ্ত লাভা ঝরছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে পৈশাচিক গলায় বলল।

“আবার হাসবেন্ড? ঈশানের বাচ্চা তোকে আমি জ্যান্ত কবর দিয়ে দেবো যদি রিদির পাশে আর কারো নাম উচ্চারণ করিস। রিদি আমার। বলছি না ও শুধু আমার। আমি যতক্ষণ এই পৃথিবীতে নিশ্বাস নিচ্ছি ততক্ষণ রিদি অন্য কারো হতে পারে না। আমি আকাশ-পাতাল এক করে ফেলবো। দরকার হলে পুরো পৃথিবী জ্বালিয়ে ছারখার করে দেবো। তবুও রিদিকে অন্য কারো হতে দেবো না। ও আমার শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকায় মিশে আছে। আর সেই রক্তে অন্য কেউ ভাগ বসাবে তা আমি বেঁচে থাকতে অসম্ভব”

ঈশান একটা শুকনো ও করুণ হাসি দিয়ে শুভ্রের দিকে তাকাল। তার গলায় এখন আর ভয় নেই। আছে শুধু গভীর এক আফসোস। সে খুব শান্ত গলায় বলল।

“বস অযথা আমার ওপর মাথা গরম করবেন না। সত্যিটা হচ্ছে এই জেদ রাগ আর ইগোর জন্যই আজ রিদিকে হারিয়েছেন আপনি। আপনার এই ডার্ক রূপটাই ওকে আপনার থেকে যোজন যোজন দূরে ঠেলে দিয়েছে”

“ঈশাআআআআন”

শুভ্রর গলার স্বরটা দাঁতে দাঁত চেপে বের হলো। যেন এখনই সে ঈশানকে ছিঁড়ে ফেলবে। কিন্তু তার শরীর আর সায় দিচ্ছে না।

ঈশান তটস্থ হয়ে হাতজোড় করে বলল।
“সরি বস আর কিছু বলবো না। চলুন এখন বাসায় যাবেন। নিজের শরীরের কী অবস্থা করেছেন একবার দেখুন। এই বিধ্বস্ত অবস্থায় আপনার একটু রেস্ট নেওয়া খুব দরকার। এভাবে রাস্তায় পড়ে থাকলে চলবে না”

শুভ্রর রাগটা যেন এক মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। তার চোখের সেই খুনে দৃষ্টির বদলে এখন এক করুণ অসহায়ত্ব ফুটে উঠল। সে নেশার ঘোরে আর যন্ত্রণায় আধবোঁজা চোখে ঈশানের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল।

“হ্যাঁ চলো বাড়ি যাই। বাড়ি গিয়ে আব্বুকে বলবো আমার রিদিকে এনে দিতে। আব্বু তো আমার সব কথা শোনে তাই না? আমি জানি আব্বু ঠিকই পারবে আমার রিদিকে খুঁজে বের করতে। আব্বুকে গিয়ে হাত জোড় করে বলবো তিনি যেন তার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য হলেও ওই পাগলিটাকে ফিরিয়ে আনে। আব্বু পারবে আমি জানি আব্বু পারবে”

শুভ্র টলতে টলতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। ঈশান তাকে শক্ত করে ধরে পাজাাকোলা করে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগল। শুভ্রর মাথাটা ঈশানের কাঁধে ঝুলে পড়ল। আর সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।

“আব্বু ঠিকই আমার রিদিকে এনে দেবে ও ছাড়া আমি যে মরে যাবো রে ঈশান আমি যে সত্যি মরে যাবো”

ঈশান শুভ্রকে আগলে ধরে বাড়িতে ড্রয়িং রুমে নিয়ে এল। সেখানে এক গুমোট নীরবতা। সোফায় সোহান চৌধুরী সাহেরা চৌধুরী আর শুভ্রা বসে ছিল। কিন্তু কারো মুখে এক বিন্দু হাসি নেই। সবার মুখ শুকনো। চোখের নিচে কালচে ছোপ যেন শুভ্রের সাথে সাথে পুরো বাড়িটাই শোকে পাথর হয়ে গেছে। হঠাৎ শুভ্রকে এই বিধ্বস্ত অবস্থায় বাড়িতে ঢুকতে দেখে সাহেরা চৌধুরী হাহাকার করে দৌড়ে এলেন। তিনি শুভ্রের ফ্যাকাশে গালে হাত দিয়ে কান্নামাখা গলায় বললেন।

“একি তোর এই অবস্থা কেন বাবা?”

শুভ্র টলতে টলতে মায়ের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে বিষাদময় হাসি দিয়ে বলল।

“সব তোমার বউমার জন্য মা তোমার ওই পাগলি বউটা তোমার ছেলেকে অনেক কষ্ট দিচ্ছে। দেখো আমি ঠিকমতো নিশ্বাসও নিতে পারছি না”

সাহেরা চৌধুরী আঁচলে চোখ মুছে বললেন।
“পাগলামি থামা বাবা কি অবস্থা করেছিস নিজের একবার আয়নায় দেখেছিস?”

শুভ্র মায়ের হাতটা জড়িয়ে ধরে আকুতি করল।
“রিদিকে এনে দাও মা শুধু একবার ওকে আমার সামনে এনে দাঁড় করাও। আমি কথা দিচ্ছি আমি একদম ভালো হয়ে যাবো। আর কখনো ওকে ছেড়ে কোথাও যাবো না কখনো না”

কথাটা বলেই শুভ্রর নজর গেল সোহান চৌধুরীর দিকে। তিনি গম্ভীর মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে আছেন। যেন শুভ্রর এই করুণ দশা তার চোখে পড়ছে না অথবা তিনি দেখতে চাইছেন না। শুভ্র ঈশানের কাঁধ থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিল। টলমল পায়ে শরীরের সবটুকু ভারসাম্যহীনতা নিয়ে সে গিয়ে সোহান চৌধুরীর ঠিক সামনে দাঁড়াল।

সোহান চৌধুরী ছেলের দিকে না তাকিয়েই কঠোর গলায় বললেন।

“কী হয়েছে এভাবে যমের মতো আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোর এই নেশাখোর চেহারা দেখার রুচি আমার নেই”

কথাটা বলতই শুভ্র ধপ করে সোহান চৌধুরীর পায়ের কাছে বসে পড়ল। তার কোনো হুঁশ নেই। কোনো দাপট নেই সে যেন এক মুহূর্তেই সেই ছোট্ট শুভ্র হয়ে গেছে যে কোনো খেলনার জন্য বাবার কাছে বায়না ধরে। সে শক্ত করে বাবার পা দুটো জড়িয়ে ধরল। যেন এই পা দুটোই তার শেষ আশ্রয়। শুভ্র ডুকরে কেঁদে উঠে বলল।

“আব্বু আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে আব্বু। আমি এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি পাচ্ছি না। ভেতরটা অনবরত দাউ দাউ করে জ্বলছে। আমার বুকটা ফেটে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। আমাকে একটু শান্তি ভিক্ষা দিবেন আব্বু? আমার রিদিকে এনে দেন। আমি জানি আমি বিশ্বাস করি আমার রিদিকে একমাত্র আপনিই ফিরিয়ে আনতে পারবেন। প্লিজ আব্বু আপনার এই মরে যাওয়া ছেলেটাকে বাঁচান ওকে এনে দেন”

সোহান চৌধুরী পাথরের মূর্তির মতো একদম চুপচাপ বসে রইলেন। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলেও তিনি শুভ্রর দিকে তাকালেন না। শুভ্র বাবার নিরবতা দেখে আরও ব্যাকুল হয়ে উঠল। সে পাগলের মতো বাবার পায়ের ওপর নিজের মুখ ঘষতে ঘষতে আর্তনাদ করে আবার বলল।

“আমি না পাগলিটাকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি আব্বু। আমার জেদ আর এই পোড়া রাগের আগুনে ওকে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছি। হয়তো আমার ওপর ওই পাগলিটার ভীষণ অভিমান হয়েছে। তাই তো ও এভাবে আমার কাছ থেকে লুকিয়ে থেকে আমাকে শাস্তি দিচ্ছে। আমি তো জানতাম না ও এত বেশি অভিমানী। এইভাবে অভিমান করে আমার নিশ্বাসটুকু কেড়ে নিয়ে লুকিয়ে থাকবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি”

শুভ্রর গলার স্বর কান্নায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। সে হিক্কা তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল।

“আজ আমি আপনার কাছে হাতজোড় করে স্বীকার করছি আব্বু আপনার এই পাথরের মতো জেদি ছেলেটার অস্তিত্বের প্রতিটি সুতোয় জড়িয়ে আছে ওই পাগলিটা। আপনার ছেলের প্রতিটা নিশ্বাসের স্পন্দনে শুধু ওর নাম শোনা যায়। দেহটা আমার হলেও আমার প্রাণটা তো সেই কবেই ওর কাছে জমা দিয়ে দিয়েছি। প্রাণ ছাড়া কি কোনো মানুষ বাঁচতে পারে আব্বু? আমি তো নিশ্বাস নিতে পারছি না”

শুভ্র এবার নিজের বুকটা খামচে ধরে বাবার দিকে করুণ চোখে তাকাল।

“এনে দেন না ওকে? আই প্রমিস এই জীবনে আমি আপনার কাছে আর কোনোদিন কিচ্ছু চাইবো না। আপনি যা বলবেন আমি তাই শুনবো। শুধু একবার ওকে আমার সামনে এনে দাঁড় করান। ওর সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে একবার মাফ চাইতে দেন আব্বু। ও ছাড়া আমার এই জীবনটা এক অভিশপ্ত মরুভূমি ওকে ফিরিয়ে দিন আব্বু আমার আর কিচ্ছু চাই না শুধু ওকে আমায় দিয়ে দিন”

সোহান চৌধুরী এবার কঠোর গলায় বললেন।
“অন্যের বউকে কেন তোকে এনে দিতে হবে? রিদি এখন তোর কেউ না। বিয়ে করবি বল আমি কাল থেকেই পাত্রী দেখা শুরু করি।”

বাবার মুখে অন্যের বউ শব্দটা শুনে শুভ্রর শরীরের রক্ত যেন মুহূর্তেই হিম হয়ে গেল। সে টলমল চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বলল।

“পাত্রী নয় আব্বু যদি কিছু করতেই হয় তবে মেরে আমাকে দাফনই দিয়ে দেন। রিদি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের নাম আমার পাশে বসানোর চেয়ে কবরের মাটি অনেক বেশি শান্তির হবে”

সোহান চৌধুরী এবারও কোনো দয়া দেখালেন না। পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রইলেন। শুভ্র এবার অবুঝ শিশুর মতো ফুঁপিয়ে উঠে বলল।

“আব্বু আমি নিশ্বাসটা শান্তিতে নিতে পারছি না। সারাটা ক্ষণ কলিজার ভেতরটা যেন কেউ ধারালো করাত দিয়ে কাটছে। আমার ওকে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। প্লিজ আব্বু ওকে একটা বার এনে দিবেন? কিচ্ছু বলবো না ওকে শুধু একটু দূর থেকে দেখে আমার চোখের এই তৃষ্ণা মেটাবো। একবার ওকে দেখলেই হয়তো আমার এই দহন একটু কমবে”

সোহান চৌধুরী এবার ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বললেন।
“কেন তুই না বলে পাতাল থেকে হলেও ওকে খুঁজে বের করবি? তবে এখন কেন এভাবে ভেঙে পড়ছিস? বের কর ওকে নিজের দাপটে”

বাবার এই তিরস্কারে শুভ্র যেন আরও কুঁকড়ে গেল। সে দুই হাতে নিজের মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল।

“এমন কোনো জায়গা নেই আব্বু যেখানে আমি ওকে খুঁজিনি। পুরো শহর প্রতিটা গলি প্রতিটি পরিচিত মুখ সব জায়গায় দেখা শেষ। কোথাও নেই ও। পেলাম না আমি ওকে। হেরে গেছি আব্বু আপনার এই জেদি ছেলেটা আজ ওর ভালোবাসার কাছে পুরোপুরি হেরে গেছে। তাই তো আপনার পায়ের কাছে পড়ে আছি। আমার রিদিকে এনে দেন আব্বু নাহলে কসম আমি সত্যি মরে যাবো”

শুভ্রর এমন করুণ আর্তি এমন হাহাকার দেখে পাষাণ হৃদয়েও জল আসার কথা। সাহেরা চৌধুরী আর শুভ্রা তখন কান্নায় ভেঙে পড়েছে। কিন্তু সোহান চৌধুরী যেন আজ নিষ্ঠুরতার চরম সীমায় পৌঁছে গেছেন। তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে শুভ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে হিমশীতল কণ্ঠে বললেন।

“মরে যা তুই”

বাবার মুখে এই চরম কথা শুনে সাধারণ কোনো ছেলে হলে হয়তো বুক ফেটে যেত। কিন্তু শুভ্রের মাঝে কোনো ভাবান্তর হলো না। তার কষ্টের সীমা ছাড়িয়ে সে এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে মৃত্যুও তার কাছে তুচ্ছ। সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল।

“আব্বু মরে গেলে কি শান্তি পাওয়া যায়? অশান্তিগুলো কি দেহের সাথে দাফন হয়ে যায়?”

ছেলের মুখে মৃত্যুর এমন সহজ স্বীকারোক্তি শুনে সাহেরা চৌধুরী কলিজা ফাটানো চিৎকার দিয়ে উঠলেন। তিনি ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন।

“চুপ কর শুভ্র। দোহাই লাগে তোর এসব কী অলক্ষুণে কথা বলছিস? নিজের মা বেঁচে থাকতে এসব কথা বলতে তোর একটুও বুক কাঁপছে না?”

শুভ্র মায়ের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে টলমল পায়ে উঠে দাঁড়াল। তার বাবার দিকে একবার শেষবারের মতো ম্লান দৃষ্টিতে তাকাল। সে চোখে না ছিল কোনো অভিযোগ না ছিল কোনো রাগ। তারপর আর কোনো শব্দ না করে হেলতে দুলতে সিঁড়ি দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। খট করে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা পুরো বাড়িতে এক অশুভ স্তব্ধতা বয়ে আনল।

সাহেরা চৌধুরী রাগে আর শোকে সোহান চৌধুরীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
“এইটা আপনি কী বললেন? ছেলেটা আমার এমনিই মেয়েটাকে না পেয়ে পাগল হয়ে আছে তার ওপর আপনি রাগের মাথায় নিজের সন্তানকে মরে যেতে বললেন? আপনার কি একটুও মায়া নেই?”

সোহান চৌধুরী সোফায় হেলান দিয়ে কঠোর স্বরে বললেন।
“বলেছি তো কী হয়েছে? মরে যাবে। যে ছেলে ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে এতগুলো দিন বাইরে থাকতে পারে সেই ছেলে আবার ভালোবাসার জন্য মরে যাবে এটাও আমার বিশ্বাস করতে হবে। দিস ইজ অল ড্রামা”

ঈশান আর সহ্য করতে পারল না। সে কয়েক কদম এগিয়ে এসে বিনীত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।
“আঙ্কেল আমার মনে হচ্ছে এবার একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না। বস সত্যিই খুব খারাপ অবস্থায় আছে”

সোহান চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে ঈশানের দিকে তাকালেন।
“তুমি চুপ থাকো ঈশান। তোমার কথা শুনে কি এখন আমার চলতে হবে? অনেক রাত হয়েছে এবার নিজের বাড়ি ফিরে যাও”

ঈশান আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই বুঝে মাথা নিচু করে বাসা থেকে বেরিয়ে এল। তার বুকের ভেতরটা কু ডাকছে। শুভ্রের সেই শান্ত হাসিটা কিছুতেই মাথা থেকে যাচ্ছে না। গেট দিয়ে বের হতেই পেছন থেকে মায়াভরা এক চিলতে কণ্ঠ ডাকল।

“ঈশান ভাইয়া”

ঈশান থেমে গেল। ঘুরে তাকিয়ে দেখল শুভ্রা দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেও জল। শুভ্রা কাছে এসে নিচু স্বরে বলল।
“আব্বুর কথায় রাগ করবেন না প্লিজ। আব্বুর মেজাজ গরম হলে একটু খিটমিটে হয়ে যায় ঠিক ভাইয়ার মতো”

ঈশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
“আরে না রাগ কেন করবো? আঙ্কেল রেগে আছেন সেটা আমি জানি। যে বাবা নিজের ছেলেকে রাগের মাথায় মরে যেতে বলতে পারেন সেখানে আমি তো বাইরের লোক। আমাকে কী বলবেন তাতে আমার কিছু যায় আসে না”

শুভ্রা একটু অবাক হয়ে বলল।
“এইভাবে কেন বলছেন? আমার আব্বু বুঝি আপনার বাবার মতো না?”

ঈশান একটু ম্লান হেসে বলল।
“আমি কখন বললাম তোমার আব্বু আমার বাবার মতো না? আমি আঙ্কেলকে যথেষ্ট সম্মান করি”

শুভ্রা এবার মাথা নিচু করে আঁচল দিয়ে চোখ মুছল। তারপর খুব ধরা গলায় বলল।
“হুম বুঝেছি। কিন্তু আমার না খুব ভয় করছে”

ঈশান ভ্রু কুঁচকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ থাকলেও সে সেটা শুভ্রার সামনে প্রকাশ করতে চাইল না। সে হালকা চালে জিজ্ঞেস করল।

“কেন? হঠাৎ এমন ভয় পাচ্ছ কেন?”

শুভ্রা ভয়ে ভয়ে দোতলার ওই বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বলল।
“ভাইয়া যদি সত্যি সত্যি নিজের কোনো ক্ষতি করে বসে?”

ঈশান এবার বাঁকা এক চিলতে হাসি দিল। পরিস্থিতিটা একটু হালকা করার জন্য সে কৌতুকের ছলে বলল।

“আরে করলে করতে দাও না হয় লায়লি-মজনুর মতো অমর প্রেম হয়ে থাকবে। পরে তোমাদের এই চৌধুরী বাড়িতেও লায়লি-মজনুর প্রেমের মেলা বসবে। আর সেই মেলাতে আমি তোমাকে স্পেশাল দেখে একটা প্যাঁ পু বাঁশি কিনে দিবো তুমি সেটা বাজিয়ে সারা বাড়ি বলে বেড়াবে এ্যাঁ লায়লি মজনুর মেলা”

শুভ্রার বিষণ্ণ মুখে মুহূর্তেই হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে খিলখিল করে হেসে উঠে বলল।
“আপনিও না ঈশান ভাইয়া। এই বিপদের মধ্যেও আপনার মশকরা থামে না”

ঈশানও হাসল তবে সেই হাসির পেছনে এক অজানা আশঙ্কা লুকিয়ে রাখল। সে শুভ্রার মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলল।

“যাও অনেক রাত হয়েছে রুমে চলে যাও। আমি আসছি। সব ঠিক হয়ে যাবে”

রানিং…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply