দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬৮
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
(কার্টেসী বা কপি করা নিষেধ। শেয়ারিং ছাড়া)
৬৮
রাত দশ-টা। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি চলছে। শীতের প্রভাব পড়েছে বেশি। বেশ ঠান্ডাময় পরিবেশটা। রাতে বেলায় এসি ফ্যান সবকিছু বন্ধ করে ঘুমাতে হয়। হয়তো আশুগঞ্জের তুলনায় ঢাকা শহরে ঠান্ডা প্রভাব একটু কমই। সন্ধ্যা হলে ঢাকায় তেমন একটা কুয়াশা দেখা যায় না এই নভেম্বর মাসে। কিন্তু আশুগঞ্জ সন্ধ্যা পর পরই ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পরে সবকিছুই। বেশ ঠান্ডা পরিবেশ এখানে। ফিহা খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে শূন্য আকাশে দিকে তাকিয়ে আছে। ঘন কুয়াশায় ঢাকা চারপাশটা তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। তবে ঘন কুয়াশাময় রাস্তায় মাঝে মাঝে ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলোয় দেখা যায়। ফিহা শীতের হালকা কেঁপে কেঁপে উঠছে ঠান্ডা বাতাসে। তারপরও বারান্দায় থেকে সরছে না। ঠায় জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। মোট কথা ফিহার পরিবেশটা ভালোই লাগছে। গায়ের সুতির শাড়িটা টেনে পিঠ ঘুরে সামনে টানলো। চাদরে মতো করে গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। মনের মধ্যে হাজারো গুমোট অভিমান তার। সেই অভিমান অভিযোগে তার থেকে ভালোবাসার মানুষটিকেও দূরে সরিয়ে রেখেছে সে। তাকে বাঁধ্য করেছে দূরে সরিয়ে রাখতে। ফিহা তো এমন কিছু চাইনি তাহলে কেন এমন হলো। সে-তো সুন্দর একটা সংসার সাজাতে চেয়েছিল ভালোবাসার মানুষটাকে নিয়ে। কত রাত জেগে একে অপরের সাথে গল্প করেছে সুন্দর সংসার সাজাতে চেয়ে। ফিহা কতো শত বার এই বারান্দা, এই রুম, দেখেছে আরিফের ফোনে ভিডিও কলে কথা বলার সময়। তখন ফিহার খুব করে চাইতো এই রুমে আরিফের সাথে তার বউ হয়ে থাকতে। আজ ফিহা আরিফের বউ। অথচ মনের মধ্যে সুখের অনূভুতির চেয়ে বিষাদের কিছু অনূভুতিতেই গুমরে মরছে সে। আরিফ ওকে কষ্ট দিয়েছে। ভিষণ বাড়াবাড়ি রকমের কষ্ট দিয়েছে ফিহার মার সাথে মিলে। অথচ ফিহা এই দু’টো মানুষকে ভালোবাসতো বেশ। কিন্তু তাঁরা কেউ ফিহার ভালোবাসার মূল্য দেয়নি। একা গুমরে গুমরে মরতে ছেড়ে দিয়েছিল তাকে। সে কতো কেঁদেছিল, কতো শত আকুতি মিনতি করেছিল তার মা ও আরিফের কাছে ভালোবাসা জন্য। শেষ পযন্ত আরিফকেও বলেছিল ফিহাকে তার কাছে নিয়ে যেতে। আর নিজের মাকে বলেছিল আরিফকে মেনে নিতে। কিন্তু কেউ ফিহার কথা মেনে নেইনি।
আজ যদি ফিহা মরে যেত তাহলে কি হতো? আজ ফিহার জায়গায় অন্য কেউ আসতো আরিফের বউ হয়ে এই বাড়িতে। তখন ফিহা অস্তিত্ব বিলুপ্ত থাকতো এই দুনিয়ায় মাটি থেকে। সে চির জাহান্নামী হয়ে থাকতো। এ কাল, ঐ কাল, কোনো কালই ফিহার হতো না। শূন্যে থাকতো ফিহা। তাও শুধু এই ভালোবাসার মানুষ গুলোর জন্য। তাহলে আজ কেন ফিহা তাদের ক্ষমা করবে? ফিহা গুরুত্ব তো তাদের জীবনের কখনোই ছিল না। তাহলে আজ ফিহা কেন তাদের কষ্ট বুঝতে চাইবে। তারা কি বুঝতে চেয়েছিল তার কান্না, তার কষ্ট গুলোকে। মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে চিন্তা করে গুমোট নিশ্বাস ফেলল ফিহা। আরিফ বাড়িতে আছে গত দুইদিন হলো। অথচ এখনো ফিহা আরিফের সাথে স্বাভাবিক কথাটুকু বলছে সে। রুমের বাহিরে স্বাভাবিক স্বামী স্ত্রী হিসাবে চলাফেরা তাদের। কিন্তু রুমের ভিতরে সম্পর্কের মান-অভিমান উত্তাপ নিশ্বাস। আরিফ বেশ কয়েক বার ফিহার সাথে কথা বলতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি। মূলত ফিহাই সুযোগ দেয়নি। আগামীতে দিবে বলে মনেও হয়না।
রুমের দরজা খট করে বন্ধ হওয়ার শব্দেও ফিহার নড়াচড়া দেখা গেল না। ঠায় জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো। আরিফ হাতের খাবারের প্যাকেট গুলো সাথে ফ্রেশ পানির বোতলটাও ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখল। কপাল কুঁচকে রুমের চারপাশে তাকিয়ে ফিহাকে খুঁজার চেষ্টা করলো। আশেপাশে কোথাও দেখতে না পেয়ে হালকা উঁকি মেরে বারান্দায় তাকিয়ে বুঝতে পারলো ফিহা সেখানেই আছে। আরিফ সেদিকে বিশেষ একটা মনোযোগ হলো না। গায়ের অনেকটা ধুলো-ময়লা লেগে আছে। সারাদিন ব্যস্ত ছিল মায়ার বিয়ের কার্ড বিলিন করতে গিয়ে। বাইকে করে এখান থেকে সেখানে, অনেক জায়গায় যেতে হয়েছে তাকে। ডেকোরেশন লোক, বিয়ে ভেন্যু, সবকিছু ঠিক করতে করতে মাত্রই বাসা ফিরা হলো তার। হাতে এখনো অনেক কাজ বাকি। অল্প দিন বাকি বিয়ে নিশ্বাস ফেলার সুযোগ পযন্ত নেই তার। সেখানে ফিহার সাথে তার মনমালিন্যতা যেন আরও বিষন্নতা বাড়াচ্ছে। তাদের বিয়ের একমাসের বেশি সময় হলো। অথচ এখনো পযন্ত ঠিক করে দুটো কথাই বলতে পারছে না সে তার বউয়ের সাথে। কাছাকাছি আসা তো দূরের কথা। তবে আজ আরিফ সব প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। বউয়ের সাথে নরম গলায় নয় গরম গলায় কথা বলবে আজ। সবকিছু হিসাব সমানে সামনে কষবে। এই মেয়ের ভিমরত্তি বের করবে সে। কত চিৎকার আর চেচামেচি করতে পারে সেও দেখবে। কথা গুলো ভাবতে ভাবতে আরিফ জিন্সের পকেটে থেকে বাইকের চাবি, ফোন বের করে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখল। অন্য পকেট হাতড়ে তালা চাবি বের করে একিই জায়গায় রাখল। শার্টের পরপর সবগুলো বোতাম খুলে টেনে গায়ের থেকে শার্ট খুলে ময়লা কাপড়ের ঝুড়িতে রাখল। সকালে বুয়া এসে ধুয়ে দিবে তাই। প্যান্টের বেল্ট খুলে রেখে কবার্ট থেকে টাওয়াল, টাউজার নিল গোসলের জন্য। যেতে যেতে উঁকি মেরে ফিহাকে আরও একবার দেখে নিয়ে চলে গেল ওয়াশরুম। হঠাৎ কিছু মনে হতেই কয়েক সেকেন্ডর মধ্যে আরিফ পুনরায় ওয়াশরুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে তালা চাবি নিয়ে দরজা লক করলো। তারপর স্বস্তির মনে, চাবি নিয়ে ফের গেল ওয়াশরুমে গোসল করতে। আপাতত ফিহা যাতে তার অনুপস্থিতে রুম থেকে চলে যেতে না পারে, সেই জন্য দরজা লক করা তার। লম্বা শাওয়ার শেষ করে বের হলো আরিফ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা মাথা হাল্কা পাতলা মুছে নিজেকে ফিটফাট করলো। লম্বা-চওড়া তাগড়া যুবক সে। সৌন্দর্যের কমতি নেই। মূলত আরিফের পরিবারের সবাই ফর্সা সুন্দর। অনেকটা বংশগত ভাবেই এমন ফর্সা তারা। আরিফের বংশে কালো নেই কেউ। সেজন্য সবার ধারণা তারা সবাই বংশগত ফর্সা। তবে মায়া আর আরিফ হলুদ ফর্সা বাকিরা সবাই সাদা ফর্সা। পারিবারিক ভাবে কিছু কিছু দিক থেকে মিলও আছে একে অপরের সাথে। এই জন্য তাদের যে-কেউ দেখে বলে দিতে পারবে তারা সবাই ভাইবোন। আরিফ হাতের সাদা টাওয়াল টা পাশে রাখল। হলুদ ফর্সা গায়ে লাল টি-শার্টের সাথে কালো টাউজারটি বেশ মানিয়েছে আরিফের প্রশস্ত শরীরে। আরিফ আরও একবার আয়নায় নিজেকে দেখে ফিটফাট করে নিয়ে বারান্দায় দিকে এগিয়ে গেল। ফিহা পিছনে দাঁড়িয়ে গলা কেশে নিজের উপস্থিত জানান দিল। ফিহা ভাবান্তর না দেখে আরিফ এবার ঘনিষ্ঠ হতে চাইল ফিহাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু পারলো না ফিহার তৎক্ষনাৎ রিয়েকশন দেখে। কমড়ে মধ্যে আরিফের হালকা স্পর্শ পেয়ে ফিহা লাফিয়ে উঠে দূরে সরে গিয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বলল…
—” তোমাকে না বলেছি আমাকে ছুঁয়া তোমার জন্য নিষেধ। তাহলে কেন বার বার ছুঁয়ার চেষ্টা করো আমাকে? নিষেধ মানে বুঝ না তুমি?
আরিফ কথাটা গায়ে মাখলো না। বরং অন্ধকারময় বারান্দায় ফিহা দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল…
—” একিই ডায়লগ তুমি বিগত একমাস যাবৎ আমাকে শোনাচ্ছ! আমি এসব শুনতে শুনতে বিরক্ত। আর ভালো লাগছে না এই কপি পেস্ট করা ডায়লগ। ট্রাই টু সাম্থিং নিউ বেইব।
ফিহা ক্ষুব্ধ চোখে আবছা আলোয় তাকালো আরিফের দিকে। আরিফের খেয়ালিপনা কথা সহ্য না করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল রুমে। আপাতত সে এই রুমেই থাকতে চাচ্ছে না। কিন্তু দরজার সামনে গিয়ে বুঝতে পারলো আরিফ ভিতর থেকে দরজাটি তালা মেরে রেখেছে। ফিহা বার কয়েক তালা টেনে রাগান্বিত চোখে পিছন ঘুরে আরিফের দিকে তাকাল। আরিফ বুকে হাত বেঁধে বারান্দার দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। ফিহা রাগে কটমট করে বলল…
—” ভালোই ভালোই দরজার তালা খুলে দাও বলছি। নয়তো আমি চিৎকার করে বাসার সবাইকে জড়ো করবো বলে দিলাম।
ফিহা হুমকিতে ভাবান্তর হলো না আরিফের। সে হেলেদুলে গিয়ে বিছানায় বসে বলল…
—” তোমার ইচ্ছা। চিৎকার করতে মন চাইলে করো চিৎকার। আমি আজকে বাঁধা দিব না তোমাকে। বরং চুপচাপ বসে বসে দেখবো কেমন। চিৎকার ঠিকঠাক ভাবে করতে না পারলে আমার কাছে আসো। তোমার চিৎকার করার কারণ দেয়। তবে আমার এডভান্স মানো। এখনই চিৎকার করে এনার্জি নষ্ট করো না বউ। আজ কিন্তু তোমার এনার্জির প্রয়োজন হবে। আমি কিন্তু ফুল মুডে আছি। দেখ-না, বাসর করার জন্য বউয়ের জায়গায় আমি একদম সেজেগুজে বিছানায় বসে আছি তোমার অপেক্ষায়। আসলে জীবনের প্রথমবার বিয়ে করেছি তো, তাই বাসররাত সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই! এজন্য একটু এক্সাইটেড হয়ে আছি বাসর রাত পালন করার জন্য।
ফিহার রাগী চোখে আরিফের দিকে তাকাতেই চোখ আটকায় সেদিকে। সদ্য গোসল করা স্নিগ্ধ সুন্দরতম পুরুষ আরিফ। আরিফের এই সুন্দর মায়াময় চেহারায় তো, ফিহা কিশোরী বয়সের মজে ছিল তার প্রেমে। ধীরে ধীরে সেই প্রেম, গভীর থেকে গভীর হয় আরিফের মনোমুগ্ধকর ব্যবহারে সাথে সাথে। একটা সময় ফিহা সম্পূর্ণভাবে মজে যায় আরিফের প্রেমে। আজও তাই আছে। কিন্তু অভিমানে চাপা। ফিহার মাথায় আসে না আরিফ আর মায়া কার মতো হয়েছে। এই বাড়ির কারও সাথে তাদের বিশেষ একটা মিল নেই। আরিফের যা ও ৩০% মিল আছে মায়ার তো তাও নেই। এরা ভাই বোন আসলে কার মতো এতটা সুন্দর হয়ে জন্মালো। ফিহার শশুর-শাশুড়ী তো ভুলেও না। তাহলে? আসলে এদের সুন্দর বলতে ভুল হবে। সুন্দর হওয়া এক ব্যাপার আর কিউট হওয়া আরেক ব্যাপার। সুন্দর তো ফিহাও। কিন্তু আরিফ আর মায়ার মতো এতটা কিউট নয়। আরিফ মায়ার দিকে তাকালে চোখ সেখানেই আটকায়। আরিফের তো যেমন তেমন বয়স হয়েছে, ফর্সা গালে চাপ দাঁড়িও আছে, ছেলে মানুষ। কিন্তু মায়া? সেতো কিশোরী বয়সের সদ্য বেরে উঠা কিউট কুমারী। আরিফকে দেখে যদি ফিহার এতটা মন ছটফট করে, অস্থির লাগে। তাহলে মায়াকে দেখে রিদ ভাইয়ের কেমন লাগে? নিশ্চয়ই অস্থির অস্থির লাগে? ছুঁয়ে দিতে মন চাই। ফিহার নিজের তো মায়াকে দেখলে সারাক্ষণ গাল টানতে মন চাই কিউটনেসে। সেখানে রিদ ভাই তো পুরুষ মানুষ তাও আবার মায়ার স্বামী। নিশ্চয়ই ফিহার মতো গুমরে ছটফট করে ভালোবাসার মানুষকে ছুঁয়ে দেখার জন্য। নাকি ফিহার থেকে আরও বেশি ছটফট করে ভালোবাসার মানুষকে কাছে পাওয়ার জন্য? রিদ ভাই গম্ভীর মানুষ বুঝা দায় তার মনের অবস্থাটা। তাছাড়া এরা ভাই-বোন মিলে কি, তাদের ভাই বোনকে শান্তিতে থাকতে দিবে না এই জীবনের? তারা কিছু না করেও প্রতিবার কেন তাদের সবকিছু সহ্য করতে হয়। কিছু না করেও ফিহা আর রিদ দুজনই শাস্তি পাচ্ছে। কিন্তু আর না! রিদ ভাই মায়াকে ক্ষমা করলেও ফিহা জীবনে কখনোও আরিফকে ক্ষমা করবে না তার ভুলের জন্য। আর না আরিফের মন ভুলানো কিউট চেহারায় মজবে। সেও আরিফকে একিই পরিস্থিতি নিয়ে যাবে! যে পরিস্থিতিটা ফিহা সহ্য করতে হয়েছে আরিফের জন্য। ভালোবাসার মানুষ বলে কোনো ছাড় সে দিবে না। ফিহা জোরপূর্বক আরিফ থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে পাশে রেখে শক্ত গলায় বলল….
—” আরিফ তুমি দরজা খুলবে নাকি আমি সত্যি সত্যি জোরে জোরে চিৎকার করে বাবা-মাকে ডাকবো কোনটা?
আরিফ হেয়ালি করে বলল…
—” বিন্দাস ডাকো। তোমার ইচ্ছা।
—” বাবা-মা এই রুমে আসলে তোমার ইজ্জত কই যাবে জানো তো? আমি তাদের বলবো তুমি আমার পিরিয়ডের সময়ও জোড়াজুড়ি করছো তখন কি হবে ভাবে?
—” কি আর হবে। তারা ভাববে ছেলে তাদের ভিষণ সিরিয়াল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাড়াতে। দ্রুত নাতি-নাতনির মুখ দেখবে বলে এই জন্য তারা আমাকে দুয়া দিয়ে যাবে।
আরিফের নির্বিঘ্ন ভঙ্গি দেখে সন্দেহের বশে কপাল কুঁচকায় ফিহা। আশ্চর্য! ইজ্জত সম্মান চিন্তিত ছেলেটা আজ এতটা নির্লজ্জ মতো আরচণের করছে কেন? কথাই কথাই বাসর। ফিহা সন্দেহ বাড়ে। কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠে…
—” আজ তোমার সম্মানের ভয় নেই কেন?
আরিফ লিপিপ্ত উত্তরে বলল…
—” বউয়ের সাথে ইজ্জতের চিন্তা করলে আমার বংশধর বাড়বে? এই জীবনে আমি বাবা হতে পারবো?
তাছাড়া আজ বউয়ের সাথে বাসর করবো বলে তার জন্য পূর্ব প্ল্যানিং করেই এসেছি এখানে। আপাতত বাড়িতে আমি আর আমার সুন্দরী বউ ছাড়া অন্য কেউ নেই। পুরো বাড়ি খালি। বাবা-মাকে আমি মুক্তার শশুর বাড়িতে পাঠিয়েছি মায়ার বিয়ের দাওয়াত দিতে। আজ রাতটা তারা সেখানে থেকে সকালে আসবে। জুই, মায়া তো প্রথম থেকেই ঢাকায় আছে। কাজের মহিলাকে আমি আজকে ছুটিতে পাঠিয়েছি। সকালের আগে আসবে না। আমাদের দুজনের রাতের খাবারটা পযন্ত আমি রেস্টুরেন্ট থেকে কিনে নিয়ে এসেছি। যাদে তোমার রুম থেকে বের হওয়ার অপশন না থাকে। এবার তুমি শুধু চিৎকার না, আরও কিছু করলেও কেউ আসবে না আমাদের মাঝে। তবে তুমি এতটা শিওর থাকো আজকে বাসর পালন করেই আমি দম নিবে তার আগে না।
আরিফের সহজ সরল স্বীকারোক্তিতে বরফ হয়ে যায় ফিহা। গাঢ় অনূভুতিতে হীম শীতল কেঁপে উঠে পিঠের শির ধারা। ফিহা শক্ত থাকা মনোবল যেন মূহুর্তেই মিইয়ে গেল আরিফের ভয়ে। শুকনো ঢুক গিলে এদিকে সেদিকে তাকাল পালানোর জন্য। মূলত ফিহা বুঝতে পারছে আরিফের সাথে গলা বাড়িয়ে লাভ নেই। বাড়িতে মানুষজন নেই তাঁকে সাহায্য করার জন্য। কিন্তু ফিহাও এতো সহজে আরিফের হাতে ধরা দিবে না। তাই সে হুট করে দৌড়ে পালতে চাই ওয়াশরুমের ভিতর। আজ রাতটা সে ওয়াশরুমের ভিতর কাটাবে লক হয়ে। সকালে সবাই বাড়িতে আসলে তারপর নাহয় সেও বের হবে তার আগে না। ফিহার হঠাৎ দৌড় দেখে এক মূহুর্তে জন্য চমকে উঠে আরিফ। কোনো কিছু না ভেবেই সেও দৌড় দিল সেদিকে। আপাতত তার এতো প্ল্যানিং ফিহার জন্য বিফলে যেতে পারে না। সফল তাকে হতেই হবে। পুরুষ মানুষ বলে কথা। ফিহা ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করতে চাইলে আরিফ বাঁধা সৃষ্টি করে হাত দিয়ে তৎক্ষনাৎ। ফিহাকে দরজা লাগাতে না দিয়ে ঢেলে শক্তি প্রয়োগ করে ওয়াশরুমের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে সে। ফিহা আরিফের পুরুষ ওয়ালি শক্তি সাথে উঠতে না পেয়ে ভয়ে সিঁটিয়ে যায় ওয়াশরুমের দেয়ালের সাথে। আরিফ বাঁকা হাসলো। ফিহাকে ঝাপটে ধরে কোলে তুলে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো। ফিহা আরিফের কোলে ছটফট করলো ছাড়া পাওয়ার জন্য। হাত দিয়ে বেশ কয়েক বার আঘাত করেও বসল আরিফকে। কিন্তু আসিফ তারপরও ছাড়লো না ফিহাকে। ফিহা শক্ত গলায় চেচিয়ে বলল..
—” আরিফ ছাড়ু! আমি তোমার সাথে কোথাও যাব না। তুমি এবার বেশি বেশি করছো বলে দিলাম। আমি কিন্তু সকালে সবার কাছে তোমার নামে বিচার দিব এই অসভ্যতা জন্য। ছাড়ু বলছি।
আরিফ ফিহাকে বিছানার উপর ছুড়ে ফেলে রসিয়ে রসিয়ে বলে…
—” দিও বিচার। আগে আমি অসভ্যতামী করে নেয় তারপর দিও কেমন। তুমি বিচার দিবে যে, রাতে আমার স্বামী আমাকে একটু বেশিই আদুর করেছিল, তারজন্য আমি পাগল বউ আপনাদের কাছে আমার ভালো স্বামীর নামে বিচার দিচ্ছি। আপনার আমার স্বামীর বিচার করুন সে কেন আমার মতো পাগল বউকে এতো আদুর করলো। তার বিচার করুন আপনার সবাই। এভাবে বলবে কেমন। তারপর নাহয় আমিও তোমার হয়ে স্বাক্ষী দিব সবার কাছে। কি বলো।
ফিহা আরিফকে এমন চঞ্চল স্বভাবে দেখে ঘাবড়ে উঠে। বিছানা বসে ভয়ে শুকনো ঢুক গিলে পিছিয়ে যেতে চাইলে আরিফ পুনরায় ফিহার পা ধরে টেনে বিছানা ফেলে উপরে উঠে যায়। ফিহার দু-পায়ের উপর বসে টেনে নিজের গায়ের শার্ট খুলে ফ্লোরে ফেলে দিয়ে, তৎক্ষনাৎ ঝুঁকে পড়ল ফিহার মুখের উপর। নিজের বলিষ্ঠ হাতে ফিহার হাত দুটো বিছানায় চেপে ধরে মুখোমুখি হতেই, ফিহা গোঙ্গাল। ভয়ে ছটফট করে কিছু বলতে চাইল।
—” আরিফ তুমি আ…
ফিহাকে শেষ করতে দিল না আরিফ। ফিহা কানের কাছে মুখ ডুবিয়ে বলে উঠে…
—” ইতিহাস স্বাক্ষী দুনিয়ার কোনো পুরুষই তার বউয়ের কাছে সভ্য ছিল না। সভ্য জাতির সন্তান হয়না। তাই আমিও চরম লেবেলের অসভ্য জাতিতে পরি ফিহু। আমার একটা দুইটা না অনেক গুলো বাচ্চা লাগবে। তাহলে বুঝতে পারছো আমাকে কোন লেবেলের অসভ্য হতে হবে তোমার সাথে।
আরিফের বলিষ্ঠ দেহের নিচে ছটফট করলো ফিহা। নিজেকে আরিফে থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই ফিহার গালের সাথে নিজের গাল ঘষে অন্তত গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠে আরিফ…
—” কেমন এমন করছো ফিহু? গত কয়েকটা মাস তোমার জন্য দিন রাত ছটফট করেছি আমি। সেটা কি কম ছিল না। এখন তোমার আমাকে আরও কষ্ট দিতে হবে। আমার কি মানসিক শান্তির প্রয়োজন হয়না ফিহু। ছেলে বলে কি আমাদের দূর্বল লাগে না নিজেকে। কষ্ট হয়না। তোমার মায়ের কাছে রোজ ফোন করতাম তোমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে। কিন্তু তিনি রাজি হতেন না। উল্টো আমাকে হুমকি দিতেন। বলতেন আমি তোমার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি তোমাকে তেজ্য করবে পরিবার থেকে। জীবনের তোমার মুখও দেখতে চাইবে না। এই জন্য আমি তোমার ফোন ধরতাম না। তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসতাম না। কারণ আমি জানতাম যদি তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসতাম তাহলে তুমি সুখী হয়েও হতে পারতে না। পরিবারের জন্য মন উদাস থাকতো। খারাপ লাগতো। সবসময় কান্নাও করতে। তোমার সুখের জন্যই তোমাকে আমি সময় দিচ্ছিলাম। কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকেই বিয়ে করতাম না। যদি তুমি বিয়ে করে নিতে তাহলে জীবনের একটা সময় গিয়ে হয়তো পরিবারের দায়ে পড়ে বিয়ে করতাম। কিন্তু ততক্ষণ বিয়ে করতাম না যতক্ষণ না পযন্ত সিঙ্গেল থাকতে। তবে আমার বিশ্বাস ছিল তুমি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবে না। সেই বিশ্বাস নিয়েই আমি তোমার মায়ের শর্ত অনুযায়ী কাজ করছিলাম। তোমাকে সুন্দর ভবিষ্যত দেওয়ার জন্য রাত দিন এক করে পরিশ্রম করতে চাইছিলাম। হয়তো বছর তিনেক পরে আবারও তোমার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতাম। কিন্তু বিশ্বাস করো। তোমার হঠাৎ সুইসাইডের বিষয়টি শুনে আমিও মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করেছিলাম। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর পাগল হয়ে গেছিলাম তুমি বিহীন। আই লাভ ইউ ফিহু। তোমাকে ছাড়া সত্যিই জগৎ সংসার করা দায়। বিয়ের পর গত একটা মাস আমি ছটফট করেছি তোমার একটু সানিধ্য পাওয়ার জন্য। তুমি কথা বলতে না। আমার ফোন তুলতে না। বাসায় আসার পরও তোমার থেকে দূরে থাকাটা আমাকে কষ্ট দিচ্ছিল ফিহু। তোমার অভিযোগ ঠিক আছে! কিন্তু আমার দিকটাও তো দেখতে হবে তোমার। সবচেয়ে বড় চাপে ছিলাম আমি। একদিকে বাবা হসপিটালে অন্য দিকে মায়াকে নিয়ে আমাদের পারিবারিক ঝামেলা খান বাড়ির সাথে। সেখানে নতুন করে আমার সম্পর্কের কথাটা সবাইকে জানানো মানেই ছিল আরও চাপ বাড়ানো। সবকিছু দিক থেকে আমিও বেশ হিমসিমে ছিলাম। তোমাকে বিষয়টা বুঝাতে চাইছিলাম কিন্তু তুমি আমার কথাটা শুনতে পযন্ত রাজি নও। তাই আজ বাঁধ্য হয়ে এই জোড়াজুড়ি পথ অবলম্বন করতে হলো আমাকে। তার জন্য আই এম ভেরি সরি ফিহু। বাট! তারপরও আজকে তোমাকে ছাড়তে পারবো না। অকারণে অভিযোগও মানতে পারবো না। আমার ভালোবাসা চাই মানে চাই-ই।
আরিফের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে ফিহা অনুভব করলো আরিফের তীব্র ঠোঁটের ছুঁয়া নিজের গলার মধ্যে। স্পর্শের গভীরতা বাড়তেই ফিহা গোঙ্গাল। আরিফকে আর বাঁধা দিল না। আরিফ বাঁধা না পেয়ে গলা থেকে মুখ উঠিয়ে ঠোঁটের কাছে যেতে যেতে সে ডান হাত বাড়িয়ে রুমের লাইট বন্ধ করে দেয় খাটের কোণার দেয়ালের সুইচ চেপে। দুজনের নিশ্বাসের ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ভেসে গেল ঘন কুয়াশার চাদরে।
~~
বিয়ের কাজের ঝামেলায় বাহির ফিরতে ফিরতে রাতে এগারোটা বেজে গেল আয়নের। রিদ তখনো বাসায় ফিরেনি। আয়ন আরাফ খানকে সঙ্গে নিয়ে সবেমাত্র বাসায় ঢুকলো। অনেকটা ক্লান্ত সবাই। আসিফ রিদের সাথেই বাহিরে। আয়ন এই মূহুর্তে খান বাড়িতে ফিরত না শুধু জুইকে এক পলক দেখের জন্য পুনরায় খান বাড়িতে ফিরা তাঁর। হেনা খানের দেওয়া শরবতটা খেল এক চুমুক। গ্লাসটা ট্রে-তে রেখে চারপাশে সূক্ষ্ম নজর বুলাল। ড্রয়িং রুমে আশেপাশে কোথাও জুইকে দেখতে পেল না সে। আয়ন ভ্রুর কুঁচকে হাতের ঘড়িতে সময়টা দেখে নিল। ঘড়ি কাটা এগারোটা ছুঁয়ে যেতে দেখে ভাবল হয়তো জুই ঘুমিয়ে পড়েছে। আয়ন উঠে দাঁড়াল। যেহেতু জুই ঘুমিয়ে পড়েছে তাই আর খুঁজ করলো না। বাসায় ফিরে যেতে চাইল, হেনা খান আরাফ খান থেকে বিদায় নিয়ে। হেনা খান খেয়ে যেতে বলল আয়নকে। আয়ন রাজি হলো না। সে বলল, তার গোসল করা প্রয়োজন। গায়ে ময়লা। ফ্রেশ হয়ে তারপর খাওয়া-দাওয়া। খান বাড়ির থেকে বের হয়ে আয়ন নিজের গাড়ি নিয়ে ছুটলো চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্য। পনেরো মিনিটের রাস্তাটি, দ্রুত গাড়ির চালিয়ে পৌছাল দশ মিনিটে নির্জন রাস্তা পেয়ে আয়ন। গাড়ির পাকিং করে বের হলো। ক্লান্তি রেশ টেনে গায়ের কোট খুলে ভাঁজ করে হাতে উপর রাখল। চারপাশে ঠান্ডা পড়েছে বেশ। কিন্তু তার তেমন একটা ঠান্ডা লাগছে না। বরং ভালোই লাগছে। বাড়ির মেইন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিংবেলের সুইচবোর্ড চাপল আয়ন। প্রথমে কাউকে দরজা খুলতে না দেখায় পুনরায় চাপলো। এই সময়ে বাসায় তেমন কেউ ঘুমানোর কথা না। কিন্তু দরজা খুলতে দেরি করছে কেন বুঝতে পারছে না আয়ন। আয়নের চিন্তা ভাবনার মাঝেই খট করে কেউ দরজা খুলে দিল। আয়ন ক্লান্তিতায় ব্যক্তিটিকে না দেখেই পাশ কাটিয়ে ভিতরে ঢুকল। দুই কদম এগিয়ে যেতেই হঠাৎ থেমে যায় তার পা জোড়া। কপাল সূক্ষ্ম ভাঁজ ফেলে পুনরায় পিছন ঘুরে তাকাল। পাশের দাড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটিকে দেখে যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠল সে। কালো শাড়ি পরিহিত মিষ্টি মেয়েকে দেখে হার্টবিট মিস হলো। সে-কি আসলেই সত্যি দেখছে নাকি মিথ্যা। আয়ন শকট হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে তাকল জুইয়ের দিকে। বিষন্নতা কারণে যেন কথা বের হচ্ছে না গলা দিয়ে। আয়ন অপদস্তক চোখে জুইকে উপর থেকে নিচ অবধি দেখে নিল। আয়নের মনে হচ্ছে সে বিয়ে করে সংসার করছে। আর রাত জেগে আদর্শ বউ তার জন্য অপেক্ষা করছিল। সত্যি কি তাই? আয়ন বিয়ে করেছে ঠিক আছে কিন্তু জুই আসবে কোথাও থেকে? সেতো খান বাড়িতে তাহলে? আয়ন জাগ্রত অবস্থায় কি ভ্রম দেখছে জুইকে নিয়ে! কিন্তু কিভাবে সম্ভব এটা? আয়নের পলকহীন দৃষ্টিতে অপদস্তক হচ্ছে জুই। হাসফাস করে নত মস্তিষ্কের দাঁড়ালো। আড়চোখে একবার আয়নের দিকে তো অন্যবার সোফায় বসে থাকা মেহেরবানে দিকে তাকাচ্ছে। এই মূহুর্তে প্রচন্ড অস্তিত্বে পরে গেল জুই। মেহেরবান হয়তো জুইয়ের অস্তিত্বের বিষয়টি বুঝতে পারছেন তাই সোফা থেকে অনেকটা আদের্শ সুরে তিনি ডেকে উঠল আয়নকে। আয়ন চমকে পিছন ঘুরে নিজের মায়ের দিকে তাকাতেই তিনি বলে…
—” রুমে যাও আয়ন। ফ্রেশ হয়ে আসো। ডিনারের জন্য অপেক্ষা করছে সবাই। যাও!
আয়ন মায়ের কথায় সায় জানালো। জুইকে তার ভ্রমই মনে হলো। কারণ মেহেরবান তো জুইকে কিছু বলছে না। তারমানে সে একাই জুইকে দেখছে। আয়ন যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে আবারও একবার জুইকে দেখে নিল। শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে ধীরেসুস্থে নিচে নামল আয়ন। গায়ে ধূসর রঙ্গের টি-শার্ট পড়েছে টাউজার দিয়ে। আয়ন সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নেমে চারপাশে কাউকে দেখল না। জুইকেও না। আয়ন নিজের ভ্রম মনে করে গিয়ে বসল নাহিদ চৌধুরী অপর পাশের ডাইনিংয়ে। বাবার সাথে টুকটাক বিজনেস সম্পর্কে কথাও বলছিল সে। যেহেতু নিজের বাবাকে বিজনেসের দিক থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে তাই। তাছাড়া পারিবারিক ঝামেলায় আপাতত সে হসপিটাল থেকে একসপ্তাহ জন্য লিভ নিয়েছে। সকল ঝামেলা মিটিয়ে তারপর পুনরায় ডিউটিতে ফিরবে। তাদের কথার মধ্যেই মেহেরবান সার্ভেন্ট দিয়ে একে একে খাবার টেবিলের উপর রাখল। জুই মেহেরবানের পিছনে দাঁড়িয়ে রইলো ইতস্তত ভঙ্গিতে। মূলত জুইকে মেহেরবান খান বাড়ির থেকে আসার সময় সাথে করে নিয়ে এসেছিল এখানে। আর এখানে এসেই শাড়িটা তিনিই দিয়েছেন জুইকে পড়ার জন্য। সন্ধ্যা থেকে এই পযন্ত মেহেরবান জুইকে নিজের সাথে সাথে রাখছেন সবকিছুতে। যেন তিনি জুইকে সংসারিক দিক বুঝাচ্ছেন এমনটা। জুই বিষয়টি বুঝতে পেরেও কিছু বলল না। তারও খারাপ লাগছে না বিষয় গুলো। বরং ভালোই লাগছে। আয়ন তখনো দেখলো না জুইকে। মেহেরবান নাহিদ চৌধুরী পাশের চেয়ারটা টেনে বসল। জুইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেহেরবান গম্ভীর মুখে বলল…
—” দাঁড়িয়ে আছো কেন? যাও আয়নের পাশের চেয়ারটা গিয়ে বসো।
বাবার সাথে কথা বলার মনোযোগ ভাঙ্গে আয়নের। চমকে উঠে জুঁইয়ের দিকে তাকায়। তারমানে সে সত্যি জুইকে দেখেছিল তখন। জুই আয়নের ভ্রম ছিল না। আয়ন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জুইয়ের দিকে তাকাতেই জুই হাসফাস করে ধীরপায়ে হেঁটে এসে বসল আয়নের পাশের চেয়ারটা। আয়ন তখনো তাকিয়ে ছিল জুইয়ের দিকে। নিজের বিষন্নতা কাটিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসল আয়ন। তবে সে আর ঘুরে জুইয়ের দিকে তাকাল না অনেকটা সময়। নিজের মতো করেই খেল। তবে মাঝেমধ্যে আয়ন ইচ্ছাকৃত ভাবেই এটা সেটা চাইল জুইয়ের কাছে দেওয়ার জন্য। জুই জড়তার হাতে আয়নে এগিয়ে বাড়িয়ে দেয় তরকারির বাটি। খাওয়া-দাওয়া আলোচনা চলছি সবার মাঝে জুই বাদে। আয়ন নিজের বাবা-মা সাথে টুকটাক কথা বলছে আর খাচ্ছে। জুই জড়াতার সহিত অল্প কিছু খেয়ে উঠে যেতে নিলে হঠাৎ করে তার শাড়ির কুঁচিতে টান পড়ায় পুনরায় ধুপ করে চেয়ারে বসে পড়ে। চেয়ারের শব্দের আলোচনা ছেড়ে প্রত্যেকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল জুইয়ের দিকে। লজ্জায় মিইয়ে গেল জুই। হাসফাস করতে বুঝতে পারলো তার শাড়ির কুঁচি খুলে গেছে ইতিমধ্যে। জুই আঁতকে উঠল। কিসের সাথে বেজে শাড়ির কুঁচি খুলে গেল তাও বুঝতে পারছে না। অসহায় জুই চোখ তুলে তাকাতেই তীক্ষ্ণ কন্ঠে প্রশ্নের সম্মোহীন হলো মেহেরবানের…
—” কোনো সমস্যা হচ্ছে তোমার?
জুই মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানাতেই মেহেরবান জুইয়ের খালি প্লেটের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকায়।
—” কি ব্যাপার খালি প্লেট নিয়ে বসে আছো কেন? খাবার নাও। আয়ন তুমি ওর পাশে বসে থেকেও মেয়েটাকে খাবার তুলে দিচ্ছো না কেন?
আয়ন কিছু না বলে গাদা গাদা খাবার তুলে দেয় জুইয়ের প্লেটে। অসহায় জুই আরও ফ্যাসাদে পরে গেল পরিস্থিতির চাপে। এতো খাবার সে কিভাবে খাবে? সেতো এখান থেকে উঠতে চাইছিল ব্যস। উল্টো সে-ই ঝামেলায় পরে গেল। যদি এই মূহুর্তে জুই নিজের বাড়িতে থাকতো তাহলে শত খুঁজে তাকে এই মূহুর্তে জাগ্রত অবস্থায় কখনোই পাওয়া যেত না। কখন ঘুমিয়ে পরতো। তাছাড়া জুই নিজের বাড়িতে যতটা রাজনীতি করে ফ্রী হয়ে চলে এখানে তার ছিটাফোঁটাও পারছে না। সারাক্ষণ জড়তা আর ভয় ভয় হয়ে চলতে হচ্ছে। এই বুঝি মেহেরবান নারাজ হয়ে যাবে তার উপর। তারপর আবার জুইয়ের এতো সর্তক থাকার পর এখন কেমন করে শাড়ি খুলে গেল। এমন বাজে পরিস্থিতির শিকার জুইয়ের গলা ভরে কান্না আসছে। এই বুঝি শশুর বাড়ি হয়। বউদের অকারণে বুঝি সারাক্ষণ মনের মধ্যে ভয় ভয় কাজ করে কেউ খারাপ ভাববে বা মন্দ বলবে এটা নিয়ে। জুইয়ের তো ভিষণ ভয় করছে। অথচ মেহেরবান বা অন্য কেউ তাকে কিছুই বলেনি। তারপরও মেহেরবানের শক্ত গম্ভীর মুখটা দেখলেই জুইয়ের মনে একরাশ ভয় কাজ করে শুধু। জুই প্লেট হাত দিয়ে ঢুক গিয়ে নিজেকে সংযম করার চেষ্টা করলো। আড়চোখে সবাইকে দেখল। প্রত্যেকে যার যার খাবার মনোযোগ সহকারে খাচ্ছে। জুই স্বস্তির মনোভাবে হালকা ঝুঁকে টেবিলের নিচে তাকাল। আসলে কিসের সাথে আটকে তার শাড়ির কুঁচি খুলে গেল সেটা দেখতে। জুই টেবিলের নিচে উকি দিতেই চোখে পড়লো আয়ন তার কুচিতে সম্পূর্ণ পা দিয়ে বসে আছে। তাই আয়নের জন্য যে তার কুচি গুলো খুলে গেল সেটাও ঠিক বুঝতে পারলো জুই। কিন্তু জুই এতটা বুঝতে পারলো না আয়ন কাজ ইচ্ছাকৃত করলো! না ভুলবশত। জুই সোজা হয়ে বসল মাথা নিচু করে। বাম হাতে শাড়ির কুঁচি গুলো টানলো আয়নের পা শাড়ি থেকে সরাতে। কিন্তু পারলো না৷ আয়ন কোনো মতেই পা সরাচ্ছে না তার শাড়ির উপর থেকে। অসহায় জুই এবার খানিকটা বিরক্তি হলো। সে ঠিক বুঝতে পারছে আয়ন ইচ্ছাকৃত ভাবেই তখন তার শাড়ির কুঁচিতে পা রেখেছি যাতে জুই খাবার টেবিল ছেড়ে উঠতে না পারে। কিন্তু কেন? জুইকে খাবার টেবিলে আটকে রেখে লাভ কি ডাক্তার সাহেবের। জুই খানিকটা চেপে গেল আয়নের দিকে। বাম হাতে নিজের শাড়ি টেনে ফিসফিস করে আয়নকে বলল…
—” ছাড়ুন।
আয়ন এমন একটা ভাব ধরলো যেন এই মূহুর্তে জুই কি বলেছে সে আসলে বুঝতেই পারছে না। আর না বুঝার মতো করে কপাল কুঁচকে তাকায় জুইয়ের দিকে। ফিসফিসিয়ে একটু করে বলল…
—” কি
—” আমার শাড়ি।
—” মানে?
—” আমার শাড়ি আপনার পায়ের নিচে। প্লিজ ছাড়ুন।
—” আজব! তাহলে আমাকে বলছেন কেন?
—” মানে? আপনাকে বলবো নাতো কাকে বলবো? আজব তো, আপনিই তো আমার শাড়িতে পা দিয়ে আছেন। ছাড়ুন প্লিজ।
—” উহুম! আমি হাত দিয়ে ধরছি আপনার শাড়ি? ধরি নাই। ধরেছে আমার পা। তাই আপনার যা বলার আমার পা-কে বলুন আমাকে নয়। আমি ভিষণ ব্যস্ত জুই। দেখছেন না খাবার খাচ্ছি।
অসহায় জুই পুনরায় বলল…
—” প্লিজ ছাড়ুন। আমি উঠব।
আয়ন ছাড়ল না। আর না জুইকেও কোথাও যেতে দিল। বরং আয়ন সবার চলে যাওয়ার অপেক্ষা করলো। একে একে সবাই চলে গেল খাবার শেষ করে। আয়ন এবার নিজের আসলে ফমে ফিরে আসল। জুইয়ের চেয়ার টেনে তৎক্ষনাৎ নিজের চেয়ারের সাথে মিশিয়ে নিয়ে ভ্রুর নাচিয়ে বলল…
—” আজ মনে হচ্ছে আমি সত্যিই বিয়ে করেছি জুই। আপনাকে নিজের বাসায়, পরিবারের সবার সাথে দেখে কেমন একটা বউ বউ ফিল পাচ্ছে আমার। কি করি তো বলুন? চলুন না আমরা রুমে যায়। বাসরটা সেরে ফেলি। বাহিরের ঠান্ডা পড়ছে তাই সাথে বউ থাকলে শীতটা হালাল হয়ে যাবে।
(রিদের কাহিনি নেক্সট পার্টে পাবেন)
.
চলিত…..
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬৬
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৬
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ৪৩
-
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা গল্পের লিংক
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬১
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩৫
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ৪৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৪
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৫৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৮০