Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৫৯


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

(কার্টেসী বা কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ। শেয়ারিং ছাড়া)
৫৯
খান বাড়িতে বিয়ের আমেজ পড়েছে সকাল থেকে। ফিহার বিয়ে। হৈ-হুল্লোড় তুমুল হুলুস্থুল পরিবেশ চারপাশে। খান বাড়িতে এক্সট্রা মানুষের আনাগোনা বেশ। সকল থেকেই তোড়জোড় করে ব্যস্ত হাত চালাচ্ছে ডেকোরেশনের লোকজন। ফিহার হলুদের স্টেজ পড়েছে খান বাড়ির ছাঁদের বিশাল এরিয়া নিয়ে। তবে খান বাড়ির গেইট ধরে প্রশস্ত রাস্তাও বাদ যায়নি ভারি ফুলের ও কর্ড়া লাইটিংয়ের ডেকোরেশন করা থেকে। হাই সোসাইটির রুচিশীল ডেকোরেশনের আমেজ পড়েছে চারপাশে। গোল্ডেন ডেকোরেশনের সমাহার। ইতিমধ্যে খান বাড়িতে মায়ার বন্ধমহলও উপস্থিত হয়ে গেছে ফিহার বিয়ের দাওয়াত পেয়ে। টিয়া-ছায়া মায়ার অসুস্থতার জন্য খানিকটা হতাশ হলেও এখন বেশ হৈ-হুল্লোড়েই আছে মায়াকে নিয়ে। তবে ফিহার বিয়ের দাওয়াত পেল আরও কয়েকজন বাড়তি সদস্যরা। রাতুল, রাফি, নুহাশ, নাদিম মায়ার কলেজর সিনিয়র ভাইরাও এসেছে খান বাড়িতে। তাদের আরাফ খান ডাকল বিয়েতে। খান বাড়ির আত্মীয়ধররাও ধীরে ধীরে উপস্থিত হচ্ছে। হেনা খান, মেহেরবান, শাহেবা, নাহিদ চৌধুরী, আরাফ খান প্রত্যেকে তোড়জোড় করে সার্ভেন্ড দিয়ে মেহমানদারি করছে একনিষ্ঠ ভাবে। তুমুল ব্যস্ততার মধ্যেও হেনা খান, আরাফ খান মায়ার খবর নিতে ভুললেন না। কিছুক্ষণ পরপর ফিহার রুমে গিয়ে অসুস্থ মায়ার খবর নিচ্ছেন। ফিহা নিজের রূপচর্চায় ব্যস্ত। তার সাথে শাহেবা দুই কন্যা নিহা, মালিহা ও ব্যস্ত। মায়া অসুস্থতা জন্য চুপচাপ বসে রইল ফিহার রুমে। নিবিড় চোখে শুধু পযবেক্ষণ করলো সবাইকে। মায়ার শারীরিক অসুস্থতা থেকে মানসিক অসুস্থতা ভোগছে বেশ। বিষন্ন ভগ্নহৃদয়ে মুখ খুললো না একটু। বরং শান্ত শিষ্ট রইলো। মায়ার সারাটা দিন গেলো ঘর কোণে বসে বসে। না কারও সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বললো! আর না কোনো কিছুতে আগ্রহ দেখালো। কেমন একটা নিস্তব্ধতা পার করলো সারাটি দিন সে। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো সন্ধ্যা অনুষ্ঠান নিয়ে। বাড়ির সকল আত্মীয় মেয়ে-ছেলে উভয় পক্ষ তোড়জোড় দেখিয়ে রেডি হচ্ছে রাতের হলুদের ফাংশনের জন্য। মেয়েরা প্রত্যেকে পার্লারে গেলেও ফিহাকে খান বাড়িতেই রাখা হয় রেডি করানোর জন্য। কারণ পার্লারের মেয়েদের বাড়িতে ডাকা হয়েছে ফিহাকে সাজানোর জন্য। ইতিমধ্যে বিউটিশিয়ানরা ব্যস্ত হাত চালিয়ে সাজাচ্ছিলও ফিহাকে। আর সেই সবটার নীরব দর্শন ছিল মায়া। বিনা শব্দের চুপচাপ বসে বসে দেখছিল সবটা। আজ সারাদিন সে ফিহা রুমেই ছিল। বের হয়নি। রিদ কোথায় আছে তাও জানে না। কাল রাতে পর রিদ আর আসেনি মায়ার রুমে। মায়াও আগ বাড়িয়ে খবর নিতে যায় নি রিদের। মেহুর খবরটাও জানে না মায়া। তবে মায়ার ধারণা দু’জন একসাথে আছে। কারণ মেহু বাসা থেকে যাওয়ার আগে মায়াকে শুনিয়ে তার মাকে বলে গিয়েছিল ‘ আজকে নাকি সারাদিন সে রিদের সাথে থাকবে। সন্ধ্যাও নাকি একসঙ্গে বাসায় ফিরবে অফিস থেকে। মায়া সবাটা শুনেও হুম হ্যাঁ কোনো রুপ প্রতিক্রিয়া জানালো না। বরং চুপচাপ থাকলো। প্রয়োজন মনে করেনি তাই প্রতিক্রিয়া জানানোর সে। অসুস্থ মায়ার হঠাৎ ধ্যান ভাঙ্গলো ফিহার ডাকে। মায়া চোখ তুলে তাকাতেই ফিহা জানালো মায়াকে দ্রুত রেডি হয়ে নিতে। নড়লো না মায়া। বরং স্থির বসে থেকে আস্তে করে জানালো’ একটু পর রেডি হয়ে নিবে!

রাত আটটা। ইতিমধ্যে অনেকের সাজগোজের পর্ব টা শেষ হয়ে গেছে। সবার যার যার মতো করে হৈ হুল্লোড় ভাবে উঠা নামা করছে ছাঁদ থেকে নিচ! নিচ থেকে ছাঁদ। কোলাহলময় পরিবেশে সফট মিউজিকের গান চলছে। চারপাশে মেহমানদের আগমনে রমনা রুমনি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সেই আমেজের সাথে পাল্লা দিয়ে মেয়েরা সবাই গায়ের লাল পাড়ের হলুদ শাড়ি জড়িয়েছে। ছেলেরা পড়লো হলুদ পাঞ্জাবি, সাদা প্যান্ট দিয়ে। ছেলে-মেয়ে উভয় পক্ষে সম্ভব মিল রাখলো। তবে ফিহার গায়ে কনে হিসাবে জড়ালো মুসলিম তাতের সাদা জামদানী। গায়ের অর্নামেন্টও সাদা পরিহিত। ভিন্নতা মাঝে মায়াকে দেখা গেল। হেনা খানের আদেশে মায়াও ভিন্ন রকম শাড়ি পড়লো। তিনি মায়াকে নিজের পছন্দ করে আনা শাড়ি গুলোর মধ্যে একটা পড়ালো। জামদানী শাড়িই! তবে রঙটা ভিন্ন! কলা পাতা রঙ্গা মুসলিম তাতের পাতলা জামদানী শাড়ি। হলুদ ফর্সা মসৃণ গায়ে কলা পাতা রঙটা যেন একটু বেশি ঝলঝল করছে মায়ার গায়ে। দ্বিগুণ কালো চুলগুলো পিঠে উপর ছাড়া। দু-হাত ভর্তি কলা পাতা রঙ্গা রেশমি চুড়ি পড়া রিদের দেওয়া চুড়ি গুলোর সাথে। গলায়ও রিদের দেওয়া রকেটটি ঝুলানো। কানের ঝুমকো, কপালের টিকলিটা সবকিছুি কলাপাতা রঙ্গা অর্নামেন্টের। চোখেমুখে রয়েছে হাল্কা পাতলা সাজগোছ। ডাগর ডাগর আঁখি ভরতি কাজল টানা। পাতলা ঠোঁটে গাঢ় গোলাপি লিপস্টিক। সবকিছুতেই বিষাদময় ভাব কাটানোর চেষ্টায় একটু সহজ হয়ে আসলো সবার সাথে। বেশ না। একটু হলো। ভাইয়ের বিয়ে বলে কথা। অথযা মন খারাপে পার করতে চাইল না বলেই মায়া টুকটাক কথা বলছে সবাই সাথে। তবে বেশ কোলাতে পারছে না শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক বিষন্নতার চাপে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ হঠাৎ চুপ হয়ে যাচ্ছে মনের চাপা আর্তনাদে। চঞ্চল, চাঞ্চল্যকর, হাস্যমুখ মানুষ গুলো যদি হঠাৎ করেই চুপ হয়ে যায় তাহলে সকলে টেনশনে কারণ হয়ে দাড়ায়। সেই মানুষটা দৃষ্টিতে ভিড়ে যায় সহজে। কি হয়েছে? কি হয়েছে ভেবে। মায়ার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হলো। বাড়ি সবার একিই কথা মায়া কেন এতটা নিশ্চুপ গুমোট হয়ে আছে। কি হয়েছে তার? একি প্রশ্ন করে করে বিষন্ন মায়াকে আরও উদাসীন করে তুলছে সবাই। তবে হেনা খান সবাইকে চিন্তিত মুখে জানায় মায়ার শারীরিক অসুস্থতার কথা । মায়ার জ্বর। তাই সে শান্তশিষ্ট। সবার এতো এতো জড়ো প্রশ্নেও মায়া শান্ত থাকলো। রেডি হয়েও বসে থাকলো ফিহার রুমে। ফিহার সাথে। সময় পার হতে হতে রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটার ঘরে যেতেই, মায়ার পরিবার থেকে মায়ার কাজিন সদস্যরা হাজির হলো ফিহার হলুদ ছুঁয়ার বাটি নিয়ে। প্রাইভেট কার করে ছেলে-মেয়ে একদল সদস্য হাজির হলো খান বাড়িতে। তাদের মুখ্য সদস্য ছিল জুই। গায়ে তারও মুসলিম তাতের জামদানী শাড়ি জড়ানো। টুকটুকে লাল শাড়ি। শাড়িটি উপহার হিসেবে সেদিন মেহেরবান দিয়েছিল জুইকে। শাড়ি আঁচল ছেড়ে হাতের ভাঁজে নেওয়া তার। দুধে আলতা ফর্সা হাত দুটোতে ভরতি কাঁচের লাল চুড়ি। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। দুচোখ ভরতি কাজল টানা। কমড়ের নিচ অবধি কালো চুল গুলো ছেড়ে দিলো পিঠে উপর। সাথে কানে দুল, কপালে টিকলিটা সহ সেও সবকিছু লাল অর্নামেন্টেরই পড়লো। দু-হাতে হলুদের ঢালা সাজিয়ে জুই সবাইকে নিয়ে হাজির হলো খান বাড়িতে। হেনা খান, মেহেরবান বাকি সবার সাথে নম্রতার সহিত কৌশল বিনিময় করে গেল উপরে ফিহার রুমে। যাওয়ার পূবে জুইয়ের হাতের হলুদের ঢালাটি হেনা খানের কাছে রেখে গেল। জুইয়ের সাথে আগত বাকি সবাইকে হেনা খান মেহমানদারি করতে লাগলো নিচে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে। জুই হাসিমুখে ফিহা রুমে গিয়েই জানতে পারলো মায়ার অসুস্থতার কথা। অস্থিরতায় মায়াকে কোমল হাতে আদুর করলো সে বড় বোনের মতো। মায়াও জুইয়ের সঙ্গে পেয়ে কিছুটা সহজ হয়ে আসলো নিজের মাঝে। জুঁই, মায়া ছায়া-টিয়া সবাই মিলে ফিহাকে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটালো একত্রে রুমের ভিতর । সময়ের মধ্যস্থে জুই একবার ভিডিও কল করে নিলো আরিফের কথা অনুযায়ী। জুই আরিফকে ভিডিও কল মিলিয়ে ঠাস করে ফোন গুঁজে দিল ফিহার হাতে। কনে সাজে ফিহা হঠাৎই থমথমে খেয়ে গেলো জুইয়ের কান্ডে। চমকানো ভঙ্গিতে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ফিহার চোখে পড়লো আরিফের গভীর চোখের দৃষ্টি। নিঃশব্দে দুজনে চোখাচোখি হয়ে গেল ইতিমধ্যে। বর বেশে আরিফকে সাদা পাঞ্জাবিতে দেখে অসাধারণ লাগলো ফিহার চোখে। চোখ মন দু’টোই জোড়ালো একে অপরের একটু ঝলকে। ফিহা কিছু বলতে গিয়েও বললো না। বরং নিশ্চুপ থেকে মান-অভিমানে ঠাস করে কল কেটে দিল তৎক্ষনাৎ। নিজেদের মাঝে মনমালিন্য লুকিয়ে ফিহা হাসি মুখে জুইয়ের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিতে দিতে বললো ‘ সে একটু নিজের বাড়িতে যেতে চাই। তার কিছু পার্সোনাল জিনিসপত্র চৌধুরী বাড়িতে রয়ে গেছে। ফিহার রুমের লকারে রাখা। চাবিটা ফিহার কাছে। সে ছাড়া অন্য কাউকে চাবি দেওয়া যাবে না। তাছাড়া এই মূহুর্তে না গেলে হয়তো কাল বিয়ের চাপে যাওয়া সময় পাবে না ফিহা। জুই ফিহার কথায় সম্মতি দিলেও বিপত্তি ঘটে ফিহাকে নিয়ে ঐ বাড়িতে যাবে কে? মায়া অসুস্থ! সে যেতে পারবে না। জুইয়ের যাওয়ার সম্ভব না। কারণ তার কখনো ঐ বাড়িতে যাওয়া হয়নি। তাছাড়া আয়নের সাথেও তার একটা সম্পর্ক আছে। যেটা এখনো শেষ হয়নি। সেই সম্পর্কের রেশ টেনেই সে যেতে চাই না ঐ বাড়িতে। কক্ষনো না। তাহলে এখন ফিহা সাথে যাবে কে?
~~
সম্পূর্ণ কনে সাজে নিজের বাড়ির দরজা সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফিহা। তার পিছনেই কাচুমাচুম ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে জুঁই। সে আসতে চাইনি। মেহেরবানের কর্ড়া আদেশে এক প্রকার বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে তাকে। আজকাল মেহেরবানের আচরণ ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না জুই। এই শক্ত তো এই নরম। তাছাড়া এই বাড়ির সাথে তার সম্পর্কে দুটো। ফিহা জুইয়ের ভাবি হলে। জুইও সম্পর্কে ফিহার ভাবি হয়। হক সেটা ছিঁড়া সুতার বাঁধনে মতো। তারপরও একটা সম্পর্ক রয়েছে এই বাড়ির সাথে তার। সেই সূত্রে আজ প্রথম পা রাখলো জুঁই এই বাড়িতে। বাড়িটিও অসম্ভব সুন্দর। ডুপ্লেক্স! বাড়ির বাহিরের ডিজাইন বলে দিচ্ছে তারা কতটা রুচিসম্মত। জুই খানিকটা অস্তিত্ব ফিল করলো নিজের মধ্যে। তাই চেপে গিয়ে ঠিক বরাবর হয়ে দাড়ালো ফিহার পিছনে। ফিহা নির্ভীক। তার সম্পূর্ণ মনোযোগ দরজা কলিংবেল চাপার উপর। প্রচন্ড বিরক্ত সে। সে জানে বাড়িতে কেউ নেই আয়ন ছাড়া। বাড়ির সকল সার্ভেন্ড ও খান বাড়িতেই রয়েছে ফিহার বিয়ে উপলক্ষে। কিন্তু এখন প্রায় নয়টা ছুঁই ছুঁই। এতো সময় অবধি আয়ন বাড়িতে কি করছে? সে ধারণা নেই ফিহার। তবে বড্ড বিরক্ত ও রাগান্বিত নিজের ভাইয়ের উপর। ফিহা বিয়ে বলে কথা অথচ তার নিজের ভাই-ই দেরি করছে তার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে। মেয়েদের মতো সময় নিচ্ছে। ফিহা বিরক্ত হাতে বেশ জোরে জোরে আরও কয়েক বার কলিংবল চাপতেই দরজা খুলে দেয় আয়ন। সেও বেশ বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলতে চোখে পড়লো ফিহার কনে সাজের মুখটা। আয়ন খানিকটা চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে ড্রয়িংরুমের দেয়াল ঘড়িটা দেখে নিলো। এই সময়ে ফিহাকে মোটেও আশা করেনি সে। সেটা তার ভাবমূর্তি দেখেই প্রকাশ পাচ্ছে।আয়ন হতভম্ব মুখ খুললো ফিহাকে কিছু বলতে…

—” তুই এই সময়ে নিজের বিয়ের স্টেজ ছেড়ে এখানে কেন ফিহু?

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তা ব্লক করে আয়ন প্রশ্নটা করলো ফিহাকে। ফিহা বিরক্তি সূচক দৃষ্টির মেলে নারাজগী প্রকাশ করলো আয়নের উপর। কথায় তেজ দেখিয়ে বললো…

—” ভাই সরো সামনে থেকে। তোমার সাথে আমার কোনো কথা নেই। বাড়িতে বসে বসে বোনের খবর নিতে আসবা না একদম। আমি আমার কাজে এসেছি এখানে! দেখি সরো রাস্তা দাও আমাদের। এই জুই আয় তো আমার সাথে।
চমকিত গলায় তৎক্ষনাৎ বলে ফেললো আয়ন…
—” জুই এসেছে?

আয়ন চমকালো! বিষন্ন গলা প্রশ্ন করলো ফিহাকে। কিন্তু উত্তর পাওয়ার আগেই চোখ গেল ফিহার পিছনে জড়সড় হয়ে দাড়িয়ে থাকা লাল টুকটুকে মেয়েটির দিকে। আয়নের কুঁচকানো কপালের ভাঁজ সাথে সাথে শীতল হয়ে গেল জুইকে লাল শাড়িতে দেখে। জায়গায় স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকলো থমকানো ভঙ্গিতে। সদ্য গোসল করে এসেছিল সে। গায়ে ছাই রঙ্গা টি-শার্টটি এখনো অর্ধ ভেজা। চুলের পানি ও ঠিকঠাক মুছতে পারেনি ফিহার লাগাতার কলিংবেলের চাপার কারণে। কোনো রকম গায়ে কাপড় জড়িয়ে নিচে নেমে এসেছে সেটা আয়নকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে। সবে মাত্র হসপিটাল থেকে ফিরেছিল সে। গোসলটা শেষ করেই সে এক্ষুনি বের হয়ে যেতে খান বাড়ির উদ্দেশ্য কিন্তু তার আগেই আগমন ঘটলো ফিহার জুইকে নিয়ে। আয়নের বিস্ফোরিত চোখ দুটো জুইয়ের দিকেই স্থির করা। ইতস্তত জুই কাচুমাচুম ভঙ্গিতে দরজা ধরে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে আড়চোখে তাকালো আয়নের দিকে। সাথে সাথে চোখ মিলল আয়নের স্থির দৃষ্টির সাথে। হাসফাস করে তৎক্ষনাৎ নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিলো জুঁই। ইতস্তত ভঙ্গিতে চৌধুরী বাড়িতে সে প্রথম পা রাখলো আয়নের মুখ দর্শনের মাধ্যমে। জুই ফিহাকে অনুসরণ করে ধীরস্থে ভাবে ফিহার রুম অবধি যেতে যেতে হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই পুনরায় চোখাচোখি হলো আয়নের অদ্ভুত দৃষ্টির সাথে। এবারও জুঁই নিজের দৃষ্টি সরিয়ে দ্রুত পদে হাটলো ফিহা রুমের দিকে। পিছনে ঘুরলো না আর। সামনেই হাটলো। তবে পিছনে পাঁচ আয়ন ততক্ষণ তাকিয়ে রইলো যতক্ষণ জুইকে দেখা যায়। আজ কি হুট করেই আয়নের দৃষ্টি বদলালো জুই প্রতি। সচ্ছ ভালো লাগা কি আয়নের চোখে দেখে গেলো জুইকে নিয়ে? আজ কি একটু বেশি সুন্দর লাগছে না জুইকে আয়নের চোখে? নাকি জুই এমনিতেই এতো সুন্দর ছিল শুধু আয়নের চোখে পড়ে নি কখনো? হয়তো তাই! তবে এতোদিন সে দেখেনি বলে যে আজও দেখবে না। সেটাও না। অবশ্যই দেখবে আয়ন। যেহেতু তার দৃষ্টি বদলিয়েছে তাহলে মন বদলাতে কতক্ষণ। আয়নের চোখ যেহেতু বেহায়া হয়ে গেছে। তাহলে তার মনও বেহায়া হয়ে যাবে এতটা নিশ্চিত সে। আয়ন পরিপাটি হতে দ্রুত পদে রুমে গেল।
গায়ের টি-শার্ট টাউজার ছেড়ে জুইয়ের সাথে মিল রেখে মেহেরুন রঙ্গা পাঞ্জাবি পড়লো সাদা প্যান্ট দিয়ে। চুল গিলো সেট করে, কালো ঘড়ি পড়ে নিল বামহাতে। তাড়াহুড়ো করে পুনরায় এসে বসলো ড্রয়িংরুমের সোফার উপর। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ফিহার রুমের দিকে তাকালো। দুজনকে বের হতে না দেখে খানিকটা কপাল কুঁচকালো। তারপরও কিছু না বলে ধৈর্য নিয়ে বসে থাকলো একসঙ্গে খান বাড়িতে যাবে বলে। আয়নের অপেক্ষার দশ মিনিট পর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো ফিহা আর জই। আয়ন ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। জুঁই ফিহার পিছন পিছন হাঁটছে আস্তে ধীরস্হে। হাতে ছোটখাটো এক শপিং ব্যাগ রয়েছে। হয়তো ফিহার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছানো এতে। ফিহা আয়নকে রেডি হয়ে সোফায় বসে থাকতে দেখে নিজের রাগটা কমে এলো। ভাইয়ের প্রতি রাগ না দেখিয়ে মিষ্টি হাসলো। শত হলেও তার একমাত্র ভাই বলে কথা। রাগ করে কি থাকা যায়? তাছাড়া আয়নের খান বাড়িতে না যাওয়ার কারণটা সবার জানা। তাই অথযা ভাইকে প্রেসার ক্রিয়েট করাটা ঠিক না বলেই মনে করলো সে। ফিহা বেশ হাসি মুখে আয়নকে তাড়া দিলো বের হওয়ার জন্য। কিন্তু আয়ন নড়লো না। স্হির হয়ে বসে রইলো। ফিহা পুনরায় তাড়া দিলো। কিন্তু এতেও আয়নের নড়চড় দেখতে না পেয়ে খানিকটা কপাল কুঁচকালো ফিহা। তাড়া দিয়ে বলল…
—” কি হয়েছে ভাই? চলো! বসে আছো কেন? দেরি হচ্ছে তো আমাদের।
আয়ন কথাটি শুনেও যেন শুনলো না। স্থির বসে থেকে ত্যাড়ামি করে বলল..
—” শাড়ি পড়ে গেলে আমি যাব না।
ফিহার মাথায় যেন ছোটখাটো বজ্রপাত হলো আয়নের কথায়। তার বিয়েতে সেই-ই শাড়ি পড়তে পারবে না। এটা কোনো কথা। অযুক্তিক অবিশ্বাস্য শুনালো না ফিহার কাছে আয়নের কথাটি।

—” ভাই তোমার মাথা ঠিক আছে? আজকে আমার হলুদের ফাংশন! আর আমিই যদি শাড়ি না পড়ি, তাহলে শাড়ি পড়বে কে শুনি?
আগের নেয় একিই ভঙ্গিতে বলে উঠে আয়ন…
—” আমি জানি না! তোরা শাড়ি পড়ে গেলে আমি যাব না। বিচ্ছিরি বিদঘুটে লাগছে দেখতে। শাড়ি চেঞ্জ করলে যাব নয়তো যাব না।

আয়ন যে কাকে শাড়ি চেঞ্জ করতে বলছে সেটাই বুঝলো না ফিহা। অজ্ঞাত ফিহা আয়নের কথায় কাদু কাদু হলো তৎক্ষনাৎ। নিজের দিকে তাকিয়ে এবার সত্যি সত্যি কান্না আসলো তার। আরিফ পছন্দ করে কিনে দিয়েছে তাকে এই শাড়িটি। হলুদের অনুষ্ঠানে পড়ার জন্য। এতো সুন্দর করে সাজলো। সবাই সুন্দর, সুন্দরও বললো ফিহাকে। অথচ আয়ন বলছে বিচ্ছিরি, বিদঘুটে লাগছে।

—” ভাই! আমি কিন্তু এখন কেঁদে দিব! তুমি আমাকে শাড়ি খুলতে বলছো? আমার বিয়ে আর আমি শাড়ি পড়বো না এটা হয় বলো? এই শাড়িটি আরিফ আমাকে পছন্দ করে কিনে দিয়েছে! এখন যদি এটা খুলে ফেলি তাহলে আরিফ কষ্ট পাবে ভাই। বুঝার চেষ্টা করো! আমি কনে হয়ে যদি শাড়ি না পড়ি তাহলে বিষয়টি খারাপ দেখাবে ভাই।

আয়নের মূলত ফিহাকে নয় জুঁইকে শাড়ি চেঞ্জ করানোটা ছিল মূল উদ্দেশ্য। এবার ফিহার করুণ কন্ঠের কথা গুলোর শুনে সে খানিকটা নরম হয়ে আসার ভাব করলো। বুঝালো ফিহার কথা তার মনে ধরেছে। ফিহা কনে যেহেতু তাই আপাতত তার শাড়ি চেঞ্জ না করলেও চলবে। আয়ন আড়চোখে জুঁইয়ের কুঁচকালো দৃষ্টি দেখে নিয়ে ফিহাকে বললো…

—” তাহলে তুই ছাড়া বাকিদের বল শাড়ি চেঞ্জ করতে। তাহলে আমি যাব নয়তো যাব না।

—” ভাই আমি ছাড়া এখানে আর কে আছে শাড়ি পড়া! যে চেঞ্জ করবে!.. জুই তো বাসায় থেকে শাড়ি পড়ে এসেছে এখানে। তাহলে জুইয়ের চেঞ্জ করা কি ঠিক হবে ভাই? জুই! বোন আমার, তুই শাড়ি চেঞ্জ করে আমার একটা ড্রেস পড়ে নিবি প্লিজ!…

এতক্ষণ যাবত জুই চুপ থাকলেও এবার আর থাকলো না। ফিহার কথার প্রচন্ড প্রতিক্রিয়া জানালো জোরেশোরে। নাহুচ সুরে বলে উঠলো তৎক্ষনাৎ..

—” এ্যাঁহ! আমি মোটেও শাড়ি চেঞ্জ করতে পারবো না ফিহা আপু। তোমার ভাই গেলে যাবে! না গেলে নাই। শুভ ভাই বলেছে আমাকে নাকি এই শাড়িতে ভিষণ সুন্দর লাগছে। তাই এই শাড়ি খুলা যাবে না। আম….

জুইয়ের কথা শেষ হবার আগেই তেজ দেখিয়ে দাঁড়িয়ে গেল আয়ন। শক্ত গলায় বললো…
—” আমি যাব না কোথাও।
আয়ন ঘুরে সামনের দিকে হাঁটতে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো ফিহা। কাদু কাদু ভঙ্গিতে আয়নের যাওয়ার দিকে তাকালো। আয়নের মুড বুঝার চেষ্টা করতেই ফিহার কানে শুনা গেল জুইয়ের পুনরায় তাড়া দেওয়া কথা গুলো। ফিহা ঘাড় ঘুরিয়ে জুঁইয়ের দিকে তাকাতেই জুঁই তাড়া দিয়ে বললো…

—” ফিহা আপু ছাড়ো তো! তোমার ভাইয়ের যাওয়া দরকার নাই। চলো আমরা একাই চলে যায়। শুভ ভাইয়া অপেক্ষা করছে আমার জন্য। চলো! চলো!

জুইয়ের কথায় আয়ন আর গেল না কোথাও। উল্টো হেঁটে পুনরায় ধুপ করে এসে জায়গায় বসে পড়লো। এই মেয়ে যে সোজা কথা মেয়ে না। সেটা আরও আগেই বুঝতে পেরেছিল আয়ন। তবে আয়নও সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। একটু ত্যাড়ামী তো সেও করতে জানে। আয়নকে পুনরায় সোফা বসতে দেখে হতবাক হলো ফিহা। সে কিছু বলবে তার আগেই আয়ন গম্ভীর মুখে জানালো ” সে এই মূহুর্তে কফি খাবে। তাকে কফি করে দিতে।

আয়নের কথায় ফিহা পড়লো বিপাকে। একবার নিজের দিকে তাকালো সে। শাড়ি সাথে ভারি ভারি অর্নামেন্ট জড়ালো ফিহার গায়ে কনে হিসাবে। মুখেও ভারি মেকাপের সাজ। এসব নিয়ে কিচেন যাওয়া মানেই সবকিছু নষ্ট করে দেওয়া। ফিহা করুণ চোখে আয়নের দিকে তাকালো। গলায় কান্না জড়ালো ভাব টেনে বললো…

—” ভাই তোমার কি আজই সবকিছু খেতে আর বলতে ইচ্ছা করছে? আমার গায়ে এতো ভারি ভারি অর্নামেন্ট নিয়ে কিভাবে তোমার জন্য কফি বানাবো বলো?
—” আমি কি জানি? আমার কফি না পেলে, আমি কোথায় যাব না।

ফিহার হতাশ দৃষ্টি আয়নের দিকে তাক করলো। সে এতটা বুঝতে পারছে না যে, আজ হঠাৎ করে আয়নের কিহল? আর কেনই বা এতটা ত্যাড়ামী করছে। সেতো এমন না। তাহলে হলো কি তার। অসহায় ফিহা নিজের করুন দৃষ্টি আয়নের উপর থেকে সরিয়ে তাকাল জুইয়ের কুঁচকানো দৃষ্টির উপর। জুইকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পরখ করে নিল একবার। না জুইয়ের গায়ে তেমন কোনো ভারি অর্নামেন্ট নেই। তারমানে জুই আয়নের জন্য কফি বানাতে অসুবিধা হবে না।
ফিহা অনেকটা করুন গলায় অনুরোধ করলো জুইকে আয়নের জন্য কফির বানাতে। জুই প্রথমে নাহুচ করতে গিয়েও করতে পারলো না। ফিহার অসহায় ফেসটা দেখে। জুই অনেকটা বাধ্য হয়েই হাটলো ফিহার দেখানো কিচেন রুমের দিকে কফি বানাতে। এই অসভ্য ডাক্তার সবসময় জুইকে কাজ করানোর ধান্দায় থাকে। কই! জুই আজ তাদের বাড়িতে প্রথম আসলো, তাকে একটু হাতির দারি বা যত্ন-টত্ন করবে তা না! উল্টো জুইকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে। ভদ্রতা বলতেও জানা নেই এই অভদ্র লোকের। অসভ্য ডাক্তার কি আর ভদ্রতা জানে নাকি? বাড়িতে আসা মেহমানকেও আপ্যায়ন করতে জানেনা। ছেহ!
~~

জুই কিচেন রুমে ঢুকে যথারীতি বিস্মিত হলো। খুবই বড় ও সুন্দর, সচ্ছ একটি কিচেন রুম। প্রতিটি জিনিসপত্র যেন নিজ হাতে সাজানো গোছানো। হয়তো মেহেরবানের হাতের ছুঁয়ায় সবকিছু এতটা পরিপাটি। জুই গোল গোল চোখে চারপাশটা একটু পরখ করে নিল। ছেড়ে রাখা শাড়ির আঁচলটা কাঁধে উপর তুলে পাকা গিন্নিদের মতো কমড়ে গুঁজে দিতে দিতে সামনে আগালো। জামদানী পাতলা শাড়ি তার একটু আগুন লাগলেই পুড়ে যাওয়ার সম্ভবনা বেশি। তাই সর্তকতা অবলম্বন করেই কমড়ে শাড়ি আঁচল গুজে নিল। গ্যাস জ্বালিয়ে। পাতিল বসালো। ট্যাপ ছেড়ে পাতিলে পানি ঢালতেই আয়নের প্রবেশ ঘটলো কিচেন রুমে। জুই ট্যাপ থেকে পানি নিয়ে ঘুরতেই ভারি খেলো আয়নের বুকের সাথে। অসাবধানতায় জুইয়ের হাতের পাতিলটি তৎক্ষনাৎ পড়ে গেল বেসিংয়ের মধ্যে। চমকানো ভঙ্গিতে জুঁই উপরে তাকাতেই চোখে পড়লো আয়নের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। জুঁই কপাল কুঁচকায়। ভ্রুর নাচিয়ে ইশারায় করে কি হয়েছে? আয়ন জুঁইয়ের ইশারা বুঝেও না বুঝার ভান ধরে বলে..

—” কিছু হয়নি জুই! আপনি কফি বানান।
—” তাহলে সামনে থেকে সরুন। আমাকে ঠিকঠাক কাজ করতে দিন।
—” সামনে থেকে সরতে পারবো না। আমার এখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে মন চাচ্ছে। আপনি বরং আমার পাশ কেটে কেটে কাজ করুন জুঁই।

জুই বিস্মিত হলো আয়নের কথায়। এটা কোনো কথা। এতবড় কিচেন রুম রেখ তার গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর কোনো মানে হয়?জুইয়ের কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে না। আজব! জুই বিরক্ত বোধ করলো আয়নের কান্ডে তারপরও সে মুখ ফুটে আয়নকে কিছু বললো না। বরং ট্যাপ থেকে পানি নিয়ে আয়নকে ঘুরে গিয়ে গ্যাসে বসালো। বাকি জিনিসপত্র ও আয়নকে পাশ কাটিয়ে নিচ্ছে ড্রয়ার থেকে। সবকিছু সামনেই ছিল তাই। আয়ন স্থির দাঁড়িয়ে জুইকে দেখছে। দুজনই পাশাপাশি গা ঘেঁষে দাঁড়ানো। জুই পুনরায় আয়নকে পাশ কাটিয়ে কফির মগ নিল রেখ থেকে। আয়নের পাশাপাশি দাঁড়াতেই জুঁইয়ের কানে শুনা গেল আয়নের খাপছাড়া কথা…

—-” জুই আপনি আজকে গোসল করেছিলেন?
জুই চমকে উঠে আয়নের দিকে তাকিয়ে বলল…
—” মানে?
—” ওয়েট! আমিই চেক করছি!
কথাটা বলতে বলতে হুট করেই আয়ন ঝুকে পড়লো জুঁই দিকে। হাত দিয়ে জুঁইয়ের কাঁধ থেকে চুল গুলো সরিয়ে সেখানটায় নিজের নাক ছুঁয়ালো আলতো করে। আয়ন নিশ্বাস টানলো। জুই কেঁপে উঠলো। আয়নের হঠাৎ বেগতিক ছুঁয়ায় তীব্র কম্পন সৃষ্টি হলো জুইয়ের সমস্ত সত্তা কাপিয়ে। আকস্মিক ঘটনায় জুইয়ের হাত থেকে কফির খালি মগটিও পড়ে গেল ফ্লোরে। ধ্যান ভাঙ্গলো আয়নের। স্বাভাবিক বংগিতে পুনরায় সোজা হয়ে দাড়ালো জুইয়ের সামনে। জুইয়ের স্তব্ধতা চোখ দুটো অপেক্ষা করে বলে উঠলো…

—” নাহ! মনে হচ্ছে আজকে গোসল করেছেন। যাক আজ অন্তত একটা ভালো কাজ করেছেন আপনি। আসলে আমি খুব চিন্তায় থাকি আপনার গোসল করা নিয়ে জুঁই। এজন্য সিওর হয়ে নিলাম আপনি সত্যিই গোসল করেছেন কিনা। এবার বলুন তো! সত্যিই গোসল করেছেন নাকি পারফিউম মেখে চলে এসেছেন। কোনটা? সত্যি বলবেন! আমি কিন্তু টেনশনে আছি। দেখা গেলো আপনি গোসল না করে করে শরীর ময়লা ময়লা করে ফেললেন। তখন তো আবার আমাকেই ভুক্তভোগী হতে হবে তাই না। এজন্য বলছি রোজ রোজ গোসল করবেন। নিজের যত্নও নিবেন অন্যের সম্পদ মনে করে কেমন।

হতবিহ্বল জুই হতবাক দৃষ্টি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো আয়নের দিকে। এই অসভ্য ডাক্তার যে অসভ্য কথায় ওস্তাদ সেটা জুঁই আরও আগেই বুঝতে পেরেছিল। প্রত্যেক বার তার গোসল নিয়ে খুঁটা দেয়। রোজ রোজ সাবান শ্যাম্পু করে গোসল করেও জুইকে এই অসহ্য লোকের কাছে গোসলের খুঁটা শুনতে হয়। জুঁই চোখ মুখ কুঁচকে কিছু বলবে তার আগেই আয়ন পুনরায় বলে…

—” আরে জুই আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আমার কফি করে দিন দ্রুত!
ইতস্তত জড়ানো গলায় মিনমিন স্বরে বলল জুঁই…
—” আপনি বাহিরে যান প্লিজ! আমি আপনার জন্য কফি ড্রয়িংরুমে নিয়ে আসছি। প্লিজ আপনি যান!

জুইয়ের কথায় পাত্তা দিল না আয়ন। বরং জুঁইয়ের পাশে কিচেনের খালি জায়গায় লাফিয়ে উঠে বসলো সে। হাত বাড়িয়ে ফলের ঝুড়ি থেকে আপল নিয়ে সেখানটায় কামড় বসাতে বসাতে বললো…

—” আমি গেলে হবে না তো জুঁই! আমাকে এখানেই থাকতে হবে। আসলে আমার আপনার সাথে বেশ গুরুত্বপূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ কথা-বার্তা বলার আছে। যেটা না বললেই নয়। আজকাল আমি বেশ চিন্তার আছি। আপনাকে ছাড়া সমাধান পাচ্ছি না। আসলে আপনার একটু হেল্প চাই আমার। কি করবেন তো হেল্প আমাকে জুই?

আয়নের কথায় নড়েচড়ে দাঁড়ালো জুঁই। আয়নের হেল্প চাওয়ার বিষয়টি যথারীতি বিশ্বাস্য যোগ্য মনে হচ্ছে না জুইয়ের। তীব্র অবিশ্বাস্য নিয়ে বলল জুই…

—” আমার সাহায্যের প্রয়োজন তাও আপানার?
সত্যি?
জুইয়ের কথায় বেশ সিরিয়াস মুড নিয়ে বলল আয়ন…

—” হ্যা! আপনার সাহায্যেরই তো দরকার আমার জুঁই। আসলে জুই আপনি যে, আমাকে আপনার দেনমোহরের বিশ লাখ টাকা দিলে গিফট না টিপ হিসাবে! বউ নিয়ে হানিমুন-টানিমুন করার জন্য। সেই আইডিয়াটা বেশ দারুণ লেগেছে আমার।। তাই ভাবলাম! নাহ এবার সত্যি! সত্যি! বিয়ে, বউ, হানিমুন করা দরকার আমার। বয়স হচ্ছে ভেবে আপনার বিশ লাখ টাকা দিয়ে ভালো সুন্দর একটা হানিমুন প্যাকেজ নিলাম। ভাবলাম না এবাট হানিমুনটা করেই ফেলি! যেহেতু টিপ পেয়েছি বিশ লাখ টাকা। সেটা বিফলে দেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু সমস্যা হলো, হানিমুন প্যাকেজে এন্ট্রিতে বউয়ের নাম লিখতে গিয়ে মনে হলো! আরে আমার তো বউই নাই। হানিমুনে যাবো কিভাবে? আপনি জানেন জুই! বউ নাই ভেবেই আমি ভিষণ দুঃখ পেয়েছিলাম। তারপর কতো করে নিজের জন্য একটা বউ খুঁজলাম? কিন্তু আপসোস পেলাম কই? একটা মেয়েও আমাকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। আবার যারা রাজি হচ্ছে তাদের নাকি আপনার বিশ লাখ টাকার হানিমুন প্যাকেজের হবে না। সেই জন্য আমাকেও রিজেক্ট করলো সবাই। বউ ছাড়া এবার কষ্টের রাত গুলো পাড় হচ্ছে না জুই। তাই আমার জন্য বউ খুঁজার দায়িত্বটা আপনাকে দিতে চাই। আপনি একটা ভালো মেয়ে খুঁজে দিবেন। যার আপনার দেওয়া বিশ লাখ টাকার হানিমুন প্যাকেজে পুষবে তেমন একটা মেয়ে খুঁজবে কেমন।

আয়নের দীর্ঘ কথায় লজ্জা চোখ মুখ গুঁজে গেল জুইয়ের। দাঁড়িয়ে থাকাটা যেন অসম্ভব হলো আয়নের নির্লজ্জ খাপছাড়া কথায়। বউ ছাড়া রাত পাড় হচ্ছে না তার? কি অসভ্য কথাবার্তা। আয়নকে নিজের লজ্জিত মুখটা দেখাতে চাই না বলে জুই পাশে ঘুরে দাঁড়ালো। গলায় খানিকটা তেজ টানার চেষ্টা করে বললো..

—” আমি কেন আপনার জন্য মেয়ে খুঁজতে যাব? আমি পারব না।

আয়ন হাত বাড়িয়ে তৎক্ষনাৎ টানলো জুইকে নিজের দিকে। জুই চমকালো! ভড়কালো, হকচকিয়ে গেল আয়নের হঠাৎ হাত ধরে কাছে টানায়। দুজনই মুখোমুখি। জুই লজ্জা চোখ মুখ গুঁজে যেতেই আয়ন ভারি কন্ঠে বলল…

—” পারব না বললে তো হচ্ছে না জুই। হানিমুনের আইডিয়া আর টাকা দুটোই কিন্তু আপনি দিয়েছেন আমাকে। এবার আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে আমার জন্য মেয়ে খুঁজাটা। আরে বেশি কিছু খুঁজতে হবে না মেয়ে মধ্যে। আমার সিম্পল মেয়েই পছন্দ। যেমন ধরেন! কোনো আদর্শ বাবার জেদ্দি মেয়ে-টেয়ে হলে তো আরও ভালো হয় জুঁই। আসলে আমি শান্তশিষ্ট ছেলে তো! তাই আমার বউটা যদি একটু জেদ্দি-টেদ্দি হয়। তাহলে জীবনটা কাটবে রসিকতায়। তারপর আমি হলাম কালো মানুষ। তাই বউটা যেন একটু বেশিই সাদা-টাদা হয় আপনার মতো আরকি। নয়তো আমার বাচ্চা-কাচ্চা আবার কালোও হতে পারে বাবার মতোন। সেইফটি হিসাবে সুন্দরী বউ লাগবে জুই। তবে বউয়ের বেশি হাইট না হলেও চলবে। এই যেমন ধরেন আপনার মতো লম্বা হলেও চলবে। আসলে আমি লম্বা মানুষ তো তাই বউ একটু ছোটই পছন্দ। আরেকটা জিনিস জুই, মেয়েটা যেন কেশবর্তী হয়। যার লম্বা চুল থাকবে কমড়ে নিচ অবধি এমন। তারপর মেয়েটার গলার বাম দিকে আর কমড়ের ডানদিকে একটা করে তিলও থাকতে হবে কিন্তু। এরপর আমাকে একদিন ভিষণ চমকে দিতে হবে। যেমন ধরেন, হঠাৎ দরজা খুলে দেখলাম, দরজার সামনে লাল টুকটুকে আমার বউ হাজির। তারপর আমি যেন স্বামী স্বামী ফিল নিয়ে বউয়ের সাথে কিচেনে বসে থাকি, এমন মেয়ে খুঁজবেন আমার জন্য জুই। কেমন! আসলে মেয়ে কিন্তু আমার এমনই লাগবে। দেখিয়েন তো জুই খুঁজ করে এমন মেয়ে আপনার চারপাশে আছে কিনা? বিয়ে করব আরকি।

আয়নের কথা আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না জুইয়ের। আয়নের দীর্ঘ কথায় যে ডাইরেক ইনডাইরেক্টলি জুইকে উদ্দেশ্য করেছে সেটা বেশ ভালোই বুঝতে পারলো জুই। প্রচন্ড লজ্জায় নুইয়ে যেতে জুইয়ের হঠাৎ মাথায় আসলো আয়নের বলা কমড়ের ডান পাশে তিল থাকতে হবে। জুইয়ের কামড়ে ডানপাশে তিল আছে। সেটা আয়নের জানার কথা না। ধর ফরিয়ে জুই নিজের লজ্জা কথা ভুলে কমড়ের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলো। শাড়ির আঁচল কমড়ে গজিয়ে দেয়ার ফলে জুইয়ের কমড়ে ডানপাশ সম্পূর্ণ উম্মুক্ত হয়ে আছে। চোখের সামনে তিলটাও দৃশ্যমান হয়ে আছে। হতভম্ব জুই তড়িঘড়ি করে শাড়ির আঁচল ছেড়ে দিয়ে আয়নের দিকে তাকাতেই চোখে পড়লো আয়নের ঠোঁট কামড়ানো দুষ্ট হাসি। দুঃখ কষ্টে লজ্জায় জুইয়ের ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদা উপক্রম হলো। জীবনে কখনো এতটা লজ্জা জনক পরিস্থিতির স্বীকার হয়নি সে। জুই দৌড়ে বের হয়ে যেতে নিলেই হাত টেনে ধরলো আয়ন। পুনরায় জুইকে টেনে নিজের কাছে আনতে লজ্জায় জুই নেতিয়ে পড়লো আয়নের বুকে। আয়ন ঠোঁট প্রসারিত করে দুষ্ট হেসে দু’হাতে জুইকে জড়িয়ে নিতে নিতে পুনরায় বলে…

—“জুই আমার কিন্তু এবার সত্যি বউ লাগবে। রাতে ঘুমাতে পারি না সমস্যা হয়। বউটা না হলেই নয়। বউ থাকলে রাতে জড়াজড়ি করে ঘুমাতে পারব সেই চিন্তায় চিন্তায় আমি বিছানায় ছটফট করি। আপনি শুধু মেয়ে খুজে রাখবেন জুই! দরকার হলে বউকে আমি বাসার থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসব তার আদর্শ বাবা রাজি-টাজি না হলে। তারপরও আমার কিন্তু সত্যি সত্যি বউ লাগবে জুই। আজকাল আপনিও ঠিকঠাক গোসল করছেন না। আমার কিন্তু দায়িত্বে পড়ছে আপনার রোজ রোজ গোসল করাটা নিশ্চিত করতে। একটা মানুষ এই ভাবে ময়লা ময়লা হয়ে আমার সামনে ঘুরবে সেটাতো আর মেনে নেওয়া যায় না। তাই না! আমি কিন্তু আপনার সকাল সকাল গোসল করার বিষয়টি লক্ষ রাখবো কেমন। সারারাত কারণ দিব, সকালে গোসল করাবো। সচেতন নাগরিকের ভূমিকা পালন করবো।

আয়নের পরপর খাপছাড়া কথায় এবার শব্দ করে কেঁদে উঠে জুঁই। লজ্জা সে আয়নের সামনে থেকে হেটে যাবে কিভাবে সেই চিন্তায় কেঁদে উঠে আয়নের বক্ষতলে। জুইয়ের হঠাৎ কান্নায় শব্দ করে হেঁসে উঠে আয়ন। তার দু’হাতের বাঁধন আরও দৃঢ় করতেই জুইয়ের কান্নাও জড়ালো হলো।
~~
রিদ আসলো সাড়ে নয়টার দিকে বাসায়। অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে আছে সে আজ। বিয়ে বাড়ির মানুষের ভিড় ডিঙ্গিয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই রিদের পিছন পিছন মেহু ও ঢুকলো খান বাড়িতে। রিদ পিছন ঘুরে দেখিনি মেহুকে। যেহেতু চারপাশে মানুষের প্রচন্ড আনাগোনা বেশি। তাই কে কোথায় থেকে আসলো, সেটা নিশ্চয়ই রিদের দেখার বিষয় নয়। রিদ সামনে দিকে হেঁটে যেতে যেতে চারপাশে গম্ভীর চোখ বুলাতেই মায়া হেনা খানের পিছনে লুকিয়ে যায়। রিদের চোখে সামনে পড়লো না। রিদ পুনরায় চারপাশে সূক্ষ্ম চোখ বুলালো মায়ার খুঁজে অনুসন্ধান করে। বিয়ে বাড়ি যেহেতু তাহলে অবশ্যই তার বউটাও আশেপাশে কোথাও থাকার কথা। মায়া হেনা খানের আঁচল ধরে পিছনে লুকিয়ে থাকলো। ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ রিদ ড্রয়িংরুমে দিয়ে না গেল। মায়া তখন দেখেছে মেহুকে রিদের পিছন পিছন বাসায় আসতে। নিশ্চয়ই দুজন একসাথে ছিল সারাদিন। কই মায়া যে সারাদিন অসুস্থ ছিল। না খেয়ে ছিল। সেই খবর কি রিদ নিয়েছে একবারও। নেই নি! তাহলে মায়া কেন বেহায়ামি করে রিদের সামনে যাবে। না সে কারও সামনে যাবে না। বরং মায়া নিজেকে আড়াল করেই রাখবে রিদের থেকে। সবাই ভালো আছে যার যার মতো করে। তাহলে মায়া কেন একটা দুঃখে থাকবে। মায়াও সুখী মানুষ। ভালো থাকার অধিকার তারও আছে। মায়া কারও কাছে যাবে না। রিদের কাছে তো ভুলেও যাবে না।
.

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply