দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৩
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
১৩
সেদিন আয়ন বাংলাদেশের টিকেট পেয়েছিল। যথারীতি বাংলাদেশেও এসেছিল। হুটহাট আয়নের আগমনে পরিবারের সবাই চমকেও ছিল অনেকটা। আনন্দিত, মুখরিত হয়ছিল পরিবার পরিজন। আয়নের বাংলাদেশে আসার একদিন পর আগমন ঘটেছিলো হেনা খানের ‘চৌধুরী মেনশনে। অথাৎ’ আয়নদের বাসায়। সেদিন মায়াকে সাথে আনেন নি তিনি। একা এসেছিল মায়াকে স্কুলে পাঠিয়ে। আয়নের সাথে নিজের গুরুত্বপূর্ণ কথা গুলো সারতেই, মূলত হেনা খানের এই আগমনটি ছিল। মায়াকে এই বিয়ের সম্পর্কে এখনো কেউ অবগত করাই নি। আগে আয়নকে রাজি করিয়ে তারপর নাহয় মায়াকে সবটা জানাবেন তিনি। এমনটা ছিলো হেনা খানের মূল ধারণা। সেদিন আয়নের সাথে কুশলাদি ও প্রথম পযার্য়ের ভালোবাসার সকল পর্ব চুকিয়ে, অবশেষে যখন হেনা খান বিনা বনিতায় ডাইনিং টেবিলের নিজের চাওয়াটুকু রেখেছিল? আয়নের কাছে! বলেছিল, হেনা খানের কথা অনুযায়ী আয়নকে এবার উনার চাওয়া পূরণ করতে। তখন আয়ন তীব্র ভয়ে আষ্টশ হয়ে ছিল। এই ভেবে! যদি হেনা খান উল্টাপাল্টা কিছু চাই তাঁর থেকে। চাওয়া হিসাবে, যদি বলে মায়ার বিয়েটা আয়ন নিজের দাঁড়িয়ে থেকে, ভাইয়ের ভূমিকা পালন করে দিয়ে দিতে। বড় ভাইয়ের মতো দোয়া করতে? তাহলে পারবে আয়ন সেই সবকিছু করতে? না সে পারবে না। নিজের পছন্দের মানুষকে কিভাবে অন্যের হাতে তুলে দিবে সে? কিছুতেই পারবে না এটা করতে সে। সেদিন আয়নকে চুপ করে থাকতে দেখে হেনা খান তীব্র ভরাট গলায় নিজের চাওয়াটা বলে ফেলেছিল। ‘যে তিনি চাই আয়ন মায়াকে বিয়ে করুক। আর এটাই উনার চাওয়া। আয়নের করা ওয়াদা অনুযায়ী এখন হেনা খানের চাওয়াটা রাখতে হবে তাঁকে। সেদিন আয়ন প্রচন্ড শকট হয়েছিল। পাথর মূর্তির ন্যায় শক্ত হয়ে টায় জায়গায় বসেছিল। মুখের খাবার গুলো গলায় আটকে ছিল বেশ সময়। হেনা খানের চাওয়াটা শুধু আয়নকে আবাক করেছিল তা নয়। হতবাক, বাকরুদ্ধ, বিস্মিত করেছিল অনেকটা।
আয়ন তখন এক আকাশ সমান চমকিয়ে ছিল। নিজের নানুমার মুখে মায়ার সাথে নিজের বিয়ে কথাটা শুনে। আবাক হয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল নিজের নানুমার মুখপানে। আয়নের বাবা, মা, ফিহা, হেনা খান, সবাই তীব্র চাপা উত্তেজনায় থমথমে মুখে তাকিয়ে ছিল আয়নের মুখের দিকে। উত্তরের আশায়। আয়ন সবাইকে নীরবে পযবেক্ষণ করে। মায়ার বিয়ে জন্য বরাদ্দকৃত পুরুষটি নিজেকে ভাবতেই বাকরুদ্ধ হয়েছিল সেদিন। আবাক হয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে যখন ফিহার দিকে তাকিয়ে ছিল, দেখেছিল বোনের চোখে মুখে দুষ্টমীর রেশ। ফিহা আয়নকে বোকা বানিয়ে গুল খাইয়েছিল সেটা বুঝতে বেশ একটা অসুবিধা হয়নি তাঁর। খানিকটা লজ্জাও পেয়েছিল সেদিন। হেনা খানের আবদার সেদিন ফেরায়নি আয়ন। ফেরানোর প্রশ্নই আসে না। পছন্দের মানুষকে কেউ ফেরায় না বরং সুযোগ সন্ধানে আগলিয়ে রাখে। আয়নের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছিলো। আয়ন নীরবে সম্মতি দিয়ে বলেছিল, হেনা খান যাহ ভালো বুঝে তাই করতে। আয়নের কথায় সেদিন এক আকাশ সমান তৃপ্তিতা ছেঁয়েছিল হেনা খানের চোখে মুখে। চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল সাথে সাথে। হয়তো হেনা খানের মায়াকে হারানোর বুঁজাটা মন মস্তিষ্ক থেকে অনেকটায় কমে গিয়েছিল সেদিন। রিদের সাথে মায়ার বিয়েটা বাতিল হওয়াতে প্রচন্ড টেনশনে ছিল তিনি। যদি মায়ার বাবা শফিকুল ইসলাম সত্যিটা জানতে পেরে মায়াকে জোর করে নিয়ে যায় উনার থেকে? সেই জন্য, তিনি আয়নের সাথে মায়ার দ্বিতীয় বিয়েটা যতদূর সম্ভব দিয়ে মায়াকে নিজের কাছে রাখতে চাই চিরতরে। একবার আয়নের সাথে মায়ার বিয়েটা হয়ে যাক। তারপর নাহয় মায়ার বাবাকে পরে যেভাবেই হোক বুঝানো যাবে। রাজি করানো যাবে এই বিয়েটাকে মেনে নিতে। তাছাড়া আয়ন অসম্ভব ভালো ছেলে। হিরার টুকরো ছেলে। মায়াকেও অসম্ভব ভালো রাখবে। মেয়ে ভালো থাকলে বাবা হিসাবে শফিক ও মেনে নিবে এই বিয়েটা। অবশেষে মায়াকে হারানোর ভয়টা থাকবে না আর হেনা খানের মনে। আয়নের সম্মতিটা ছিল হেনা খানের সবচেয়ে বড় তৃপ্তিতা। তিনি বুঝতে পারেননি আয়ন এত দ্রুত রাজি হয়ে যাবে। তাই সেদিন খুশিতে হেনা খান চেয়েছিলেন দুই একদিনের মধ্যেই কাজি ডেকে আয়ন আর মায়ার আগদাটা সেরে ফেলতে ঘরোয়া ভাবে। কিন্তু এতেও ঘোর আপত্তি জানিয়ে ছিল আয়ন। সে গম্ভীর মুখ বলেছিল….
—” নানুমা আমি এমন হুটহাট চুরি করে বিয়েটা করতে চাই না। আমি বিয়েটা করতে চাই সারা শহর জানিয়ে তারপর মায়াকে নিজের ঘরে তুলতে। ওর প্রাপ্য সম্মান দিয়ে, যেটা স্বামী হিসাবে আমার থেকে তোমার সোনামার অধিকার। আমি সম্মানের সহিত মায়াকে ঘরে তুলতে চাই। কোনো লুকোচুরিতে নয়।
আয়নের কথায় আপত্তি জানিয়ে ছিলো সেদিন হেনা খান বলেছিল…
—” এখানে লুকোচুরি নয় সময় নেওয়া হচ্ছে আয়ন। এখন শুধু বিয়েটা হয়ে থাকবে। মায়ার পড়াশোনাটা কমপ্লিট হওয়ার পর, আমরা তোদের বিয়ের অনুষ্ঠান করবো আয়ন। তোর কি মনে হয়? আমাদের সেই চিন্তা নেই। তাছাড়া আমি পরিস্থিতি বাধ্য হয়ে তাড়াহুড়ো করে তোদের বিয়েটা এখন দিতে চাচ্ছি। রিদের করা কাজের জন্য মায়াকে হারাতে হবে আমাদের। তাছাড়া মায়ার পরিবারকে সত্যিটা এখনো জানানো হয়নি। যদি একবার বিয়ে বাতিলের সত্যিটা সম্পর্কে অবগত হয়! তাহলে কি হবে সেটা নিশ্চিয় তোর অজানা কিছু নয়?
আয়ন চোখ তুলে তাকাই হেনা খানের দিকে। থমথমে পরিবেশের উত্তেজনাটা বুঝতে পেরে। হেনা খানকে আশ্বস্ত করে সন্তপর্ণের বলে উঠলো…
—” আমি বুঝতে পারছি নানুমা তোমার কথা গুলো। তবে এতটা বিশ্বাস রাখো, আমি কোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও তোমার সোনামাকে হারাতে দিব না। মায়া তোমার সাথেই থাকবে সবসময়। আর সেটার শিওররিটি আমি দিচ্ছে তোমাকে নানুমা। আর দ্বিতীয়ত্ব হচ্ছে, রিদ মায়ার জীবনে পাস্ট ছিল। যেটা ফেলে এসেছে মায়া অতীতে। আমি বর্তমান। তাই অতীত যেন বর্তমানে হাবি করতে না পারে সেই সবটাই লক্ষ থাকবে আমার। তোমরাও মায়ার সামনে বারবার রিদের প্রসঙ্গটা টানবে না। এতে করে মায়া ডিস্টার্ব হতে পারে। মায়া এখনো ছোট সবকিছু সামলিয়ে নেওয়ার সুযোগ দাও আগে। তারপর নাহয় বাকিটা দেখা যাবে নানুমা।
আয়নের প্রতিটা কথায় তীব্র অধিকার বোধ দেখেছিল সবাই সেদিন মায়ার প্রতি। সবাই বুঝতে পেরেছিল আয়নের মনে মায়ার প্রতি ভালোলাগা আছে। এতে করে হেনা খানও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। তিনি সবসময় চাইতেন মায়ার জন্য যেন রিদ এই অধিকার বোধটুকু দেখায়। মায়াকে নিজের বউ হিসাবে মেনে ন্যায়। কিন্তু রিদ করলো তাঁর উল্টোটা। ফিরিয়ে দিলো মায়াকে। তবে আয়ন নিসন্দেহে একজন সুদর্শন ভালো ছেলে। দায়িত্বশীল! ভালোবাসতে জানে। ভালো রাখতে জানে। সেই জন্য! তিনি মায়ার জন্য আয়নকে বেঁচে নিয়েছেন। এতে করে মায়াকেও সারাজীবন উনার চোখে সামনে রাখতে পারবে খান বাড়িতে। কিন্তু আয়নের এই মূহুর্তে বিয়ে না করাটা ছিল হেনা খানের বিদ্রুপের কারণ। তিনি আবারও শক্ত গলায় বলেছিল সেদিন…
—” তাহলে তুই কি এখন মায়াকে বিয়ে করতে চাসনা আয়ন?
হেনা খানের উৎসুক দৃষ্টিতে নিজের চোখ বুলিয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে আয়ন। খানিকটা সময় নিয়ে আবারও শান্ত গলায় বলেছিল…
–” নানুমা আমি তোমার কথা রেখেছি। তুমিও এখন আমার কথা গুলো রাখবে এমনটা আশা করছি আমি। তবে হ্যাঁ আমি বিয়েটা করতে চাই। তবে লুকোচুরি ভাবে নয়। মায়া এখনো ছোট। একটু বড় হোক তারপর বিয়েটা করে নিব। একেবারে জন্য। এখন তোমরা মায়াকে আংটি পরিয়ে রাখো আমার নামের। আমি কাল আংটি কিনে দিব তোমাদের। তারপর বিয়েটা আমি মায়ার এইচএসসি পরীক্ষার পর করবো। মায়ার বাকি পড়াশোনাটা বিয়ে পর পড়বে। আমি নিজের পড়াবো। কিন্তু তারপরও এই মূহুর্তে আমি মায়ার অবুঝতা সুযোগ নিতে চাই না নানুমা। এইচএসসি পরীক্ষার পর ওহ নিজের সম্মতিতেই আমাকে বিয়ে করবে। কোনো চাপে পড়ে নয়। আমি আমার স্ত্রী সম্মতি হতে চাই। কোনো রকম বুঁজা বাধ্যকতা নয়। দ্বিতীয়ত্ব! বাবা-মা হিসাবে মায়ার পরিবারেরও একটা চাওয়ার পাওয়া আছে মায়াকে ঘিরে। আমি সেটা স্বার্থপরের মতো নষ্ট করবো তা ঠিক হবে না নানুমা। তাই আমাদের বিয়েতে মায়ার পরিবারেরও সম্মতি থাকবে পরোক্ষভাবে। ওয়াদা করছি মায়ার সপরিবার হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের বিয়েটা দিবে তোমাদের পাশে দাঁড়িয়ে। এখন মায়ার পরিবারকে কিভাবে বুঝাতে হবে সেটা আমার উপর ছেড়ে দাও নানুমা। আই উইল বি ম্যানেজ! নিশ্চিন্তে থাকো তুমি। আমি আমার ওয়াদা রক্ষা করবো ইনশাআল্লাহ। তোমার সোনামাকে কোথাও হারাতে দিব না। এতটা বিশ্বাস রাখতে পার তুমি আমার উপর।
আয়নের কথায় এক বুক আশা জমে ছিল হেনা খানের বুকে। মনে কোথাও এক কোণে তীব্র বিশ্বাস বোধ জম্ম নিয়েছিল আয়নের কথায়। তাদের এতবছরের নষ্ট হয়ে যাওয়া সম্পর্কটা আবারও জোরা লাগবে আয়নে মাধ্যমে। তিনি আশারত হন আয়নের উপর। ছলছল চোখে অসহায় দৃষ্টি স্থির করেছিল আয়নের দিকে। আয়ন সবটা বুঝে। মায়ার পরিবারের সাথে খান বাড়ির সম্পর্কটা তেমন ভালো না সেটাও জানে। রিদ যে সম্পর্কটা নষ্ট ও বিছিন্ন করেছিল। এখন আয়ন সেটা দুহাতে গুছিয়ে নিবে সময়ে সাথে সাথে। সেই সবটাই এখন ঠিক করবে সেটা রিদ অতীতে বিগড়ে গেছে। তবে আজ আয়ন রিদকে মনে মনে অসংখ্য ধন্যবাদ দিতে মন চাইছে। রিদ সবকিছু নষ্ট না করলে হয়তো আয়নের জীবন কখনোই মায়া নামক অসুখটা আসতো না। মায়াবর্তীর রোগে তলিয়ে যেতে না গভীর ভাবে। আজ আয়ন তৃপ্ত। হুট করেই যেন জীবনের সব চাইতে বড় পাওয়ার তৃপ্তি পাচ্ছে সে। যেটা রিদের জন্য সম্ভব হয়েছে আজ। আয়ন আলতো হাসে। হেনা খান কিছু বলার উদিত হওয়ার আগেই সামনে থেকে মেহেরবান বলে উঠলো…
–” মা আমাদের মনে হয় আয়নের কথা গুলো শুনা উচিত। অযুক্তিযুক্ত কিছু মনে হচ্ছে না আয়নের কথায়। আমাদের সময় নেওয়াটা ঠিক হবে এই মূহুর্তে মা।
এতক্ষণ নীরব শ্রোতার মতো শ্রবণ করছিল ফিহা। আয়নের দেরি করে বিয়ে করাটা মোটেও যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি ফিহার। তাই মেহেরবানে কথার মাঝে ফোঁড়ন কেটে বলে উঠে…
—” ভাই এই মূহুর্তে বিয়েটা হলে থাকলে সমস্যা কোথায়? নিজের বউকে কি মানুষ দুইবার বিয়ে করে না? তুমিও মায়াকে দুইবার বিয়ে করবে। তারপরও এখন বিয়ে করতে নাহুচ করা যাবেনা। একদমই না। তাছাড়া মায়ার বাবা মা কি পালিয়ে যাচ্ছে কোথাও? তাদের কি অন্যভাবে মানানো যাবে আর?
ফিহা অবুঝতায় গরগর করে বলার কথা গুলোতে কর্ড়া দৃষ্টি ফেলে মেহেরবান। উপস্থিত বড়দের মাঝে ছোটদের কথা বলাটা অযাচিত অশোভন। তাছাড়া ফিহার সমাজ বুঝার বয়স এখনো হয়নি তাই কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক, সেটা দেখার জন্য পরিবারের বড়রা আছে কথা বলার জন্য। ফিহাকে কর্ড়া দৃষ্টি শাসিয়ে শক্ত গলায় বলেছিল মেহেরবান সেদিন…
—” দিন দিন ম্যানার্স ভুলে যাচ্ছো ফিহা। কতবার বলেছি বড়দের মাঝে আগ বাড়িয়ে কথা না বলতে। তারপরও বলো। তোমার ডিসিশনের বা মতামতের জন্য কেউ বসে নেই এখানে। বড়দের কথা হচ্ছে এখানে। তাই তুমি রুমে যাবে এই মূহুর্তে। যাও
–” কিন্তু মা ভাই ত….
–” বলেছি না তোমাকে যেতে ফিহা….
রাগে উঠে দাঁড়ায় ডাইনিং টেবিল ছেড়ে ফিহা। তিরতির মেজাজে আয়নের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো…
–” দেখে নিও ভাই! আজ তুমি পরিস্থিতিত দোহাই দিয়ে মায়াকে ফিরিয়ে দিচ্ছো। কাল ভাগ্য তোমাকে সেই পরিস্থিতির স্বীকার করে মায়ার থেকে তোমাকে দূরে করে দিবে। তোমার চাওয়াটা থাকবে অনেক কিছুই কিন্তু পাওয়াটা থাকবে শূন্য। দেখ নিও।
ফিহার পরপর কথায় মূহুর্তে চোখ রাঙ্গিয়ে ধমক স্বরে বলে উঠলো মেহেরবান….
–” ফিহা! যেতে বলছি তোমাকে আমি…
এক মূহুর্তেও না দাঁড়িয়ে রাগে ফিহা গটগট করে প্রস্হান করে নিজের রুমের দিকে। ফিহার যাওয়ার দিকে সবাই বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বুঝতে পারে ফিহা চাচ্ছে বিয়েটা এই মূহুর্তেই হোক। হয়তো বিয়ে নিয়ে আনন্দটা ছিল প্রহর। তাই এখন সেটা আয়নের জন্য মাটি করতে চাই না বলে এতটা উত্তেজিত ফিহা মাঝে। কিন্তু আয়নে হঠাৎ না করাতে মেনে নিতে পারেনি বলেই রাগটা প্রকাশ করে ফেলে সবার সামনে। ফিহার কথা গুলো সবার কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও, আয়নের বুকে গিয়ে সেটা তীরের মতো বিঁধে। আয়নের সারা শরীর ঝাঁকি দিয়ে কম্পন সৃষ্টি হয়। আয়নের বুক কেঁপে উঠে। একটা মূহুর্তে চিন্তা করে, মায়াকে এই মূহুর্তে বিয়েটা না করে কোনো ভুল করছে নাতো সে? হেনা খান ফিহার কথায় মনোযোগ হয়নি। বরং তিনি প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে ছলছল নয়নে প্রশ্ন করেছিল আয়নকে…
–” তুই পারবি? আমার অগোছালো সম্পর্ক গুলো গুছিয়ে দিতে? নিরাশ করবি নাতো আমাকে?
ফিহা যাওয়ার থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় নিজের নানুমা দিকে। বুকের ভিতর চাপা কষ্ট অনুভব হচ্ছে ফিাহর কথায়। অতি সন্তপর্ণে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে হেনা খানকে আশ্বস্ত করে বললো আয়ন….
–” পারবো। তুমি অতীতে যাহ হারিয়েছো সেই সব আমি ফিরে দিবে। বিশ্বাস রাখো।
–” আমি বিশ্বাস করি তোকে। তাঁর জন্যই আমার সোনামাকে তোর হাতে তুলে দিতে চাই। তাহলে আমরা কালই ঘরোয়া ভাবে অনুষ্ঠান করে তোদের দুজনের আংটিবদল করে ফেলি। ( খুশিতে চকচক করে)
আয়ন সম্মতি জানিয়ে বলেছিল সেদিন…
—” ঠিক আছে তোমরা যাহ ভালো মনে করো তাই করো নানুমা। আমার কোনো আপত্তি নেই তাতে। তবে সামনে মায়ার এসএসসি পরীক্ষা। তাই আপাতত ওর আমার সাথে এঙ্গেজমেন্টের বিষয়টা জানানোর দরকার নেই। মায়া এমনিতেই পড়া প্রতি উদাসীন। এঙ্গেজমেন্টের বিষয়টির জানলে হয়তো আরও উদাসীন হয়ে উঠবে পড়ার প্রতি। পরীক্ষার পর জানলে সমস্যা নেই। পরীক্ষার ক্ষতি হবে না। কাল আমরা সবাই যাব খান বাড়িতে। আমাদের এঙ্গেজমেন্টও হবে কাল। তবে আম্মু আমার হয়ে মায়াকে আংটি পড়াবে আমি নয়। আমি আশেপাশেই থাকবো তোমাদের। আর আপাতত কোনো অনুষ্ঠানেও করার দরকার নেই নানুমা। নর্মাল থাকুক সবকিছু মায়ার পরীক্ষা পযন্ত। বাকিটা আমি সামলে নিব।
আয়নের কথায় সেদিন সবাই চোখে মুখে তৃপ্তিতা ছেঁয়ে ছিল। মন ছুঁয়ে ছিল আয়নের প্রতিটা কথায়। তবে ফিাহ বেশ নারাজ হয়েছিল আয়নের দেরি করা বিয়ে নিয়ে। সেদিন হেনা খান আরও কিছুক্ষণ আয়নদের বাসায় থেকে খান বাড়িতে ফিরে এসেছিল মায়ার স্কুল ছুটি হওয়ার আগেই। পরদিন রোজকার মতোই মায়াকে স্কুলে পাঠায়। ফিহারা আসে দুপুর করে বাসায়। আরাফ খান বাড়িতেই ছিলেন। সবাইকে নিয়ে দুপুর লাঞ্চ করে আড্ডা জমায় বিকালে। ঘড়ি কাটা ৪ঃ২৫ এ যেতেই মালাকে নিয়ে বাসায় ঢুকে মায়া। ফিহা হুটহাট দৌড়ে মায়াকে জড়িয়ে ধরতেই চমকে উঠে আয়ন। অনেকটা দিনের তৃষ্ণা চোখ দুটো পড়ে মায়ার ক্লান্তির মাখা চেহারায়। চোখ দুটো স্থির হয় সেদিকে। মায়া ফিহাতে মন্ত। আশপাশ তেমন একটা খেয়াল নেই। আয়নের পরিবারের সবার সাথে মায়ার ভাবটাও ছিল বেশ। সেটা ঠিক আয়ন বুঝতে পেরেছিল।সেদিন সারাক্ষণ শুধু মায়াকে তৃষ্ণাকাতর চোখ বুলিয়ে ছিল আয়ন মায়ার উপর। রাতে মায়াকে আংটি পড়িয়ে ছিল আয়নের মা মেহেরবান। আংটিটি আয়ন নিজের টাকায় পছন্দ করে এনেছিল। ডায়মন্ড রিং। হোয়াইট গোল্ডের মধ্যে সাদা ছোট ডায়মন্ড পাথর ছিল। সিম্পল রিং এর মধ্যে। যাতে মায়া সবসময় পড়ে রাখতে পারে। কোনো সমস্যা না হয়। বিনা সাজসজ্জা, রোজকার কাপড় পরেই সেদিন মেহেরবানের হাতের আংটি পড়েছিল আয়নের নামে মায়া। বুঝতেও পারেনি সেদিন ওর আংটি বদল হয়েছিল। বুঝতে দেয়নি কেউ আয়নের কথায়। সেদিন কিছু মূহুর্তে ছবি তুলে ন্যায় ফিহা। ক্যামেরায় বন্দী করতে থাকে রোজকার মতোই মূহুর্ত গুলো ফিহা। হুট করেই ফিহা ভয়ানক টাইপের বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেয় আয়ন ও মায়ার মাঝে।
হুটহাট মায়াকে টেনে আয়নের পাশে বসাতেই চমকে উঠে দুজন। ফিহা এমন কাজে আয়ন প্রথমে চমকালেও পরে মুচকে হাসে। মায়াকে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগটা করে দেওয়ায় মনে মনে ধন্যবাদও জানায় বোনকে। গভীর দৃষ্টি ফেলে মায়ার ভয়াৎ চেহারায়। ফিহা নিজের ভাইয়ের মনে অবস্থা বুঝতে পেরে মুচকি হেঁসে ছবি তুলতে থাকে দুজনের একসাথে। মায়া ভয়ে মাথা নত করে বসে। বুঝতে পারেনি ফিহা হুটহাট এমন কিছু করে বসবে। আয়নের পাশে বসায় মায়া অস্থির কম ভয় কাজ করছে বেশি। তবে আয়নকে ভয় পাচ্ছে এমনটা নয়। ভয়টা ও অন্য জায়গায়। ভয়ে বারবার জড়সড় হয়ে উঠছে। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না মায়া। তাই আঁড়চোখে ভয়াৎ দৃষ্টিতে আয়নকে এক পলক দেখে মূহুর্তেই দৌড় লাগায় কিচেন রুমের দিকে, হেনা খানের উদ্দেশ্য। মায়ার হঠাৎ এমন কান্ডে মূহুর্তেই ভ্যাবাচ্যাকা খেলে যায় দুই ভাই বোন। একে অপরকে চাওয়াচাওয়ি করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মায়ার দৌড়ে চলে যাওয়ার দিকে। মায়ার দৌড়ানোর মধ্যে দিয়েই মনে মনে চক কষাকষি করে নিজের সাথে! আপন মনে বলে, তাঁর ছেলেদের পাশে ঘেঁষে নিষেধ। বসা নিষেধ! ছেলে মানুষ দেখা নিষেধ! সব ছেলে মানুষ গুলোও নিষেধ! সব, সব, সব সবকিছু নিষেধ। তাঁর রিদ ভাইয়া নিষেধ করে গেছে তাঁকে। সে মানবে তাঁর খারাপ ভাইয়ার কথা গুলো। কখনো পাশ ঘেঁষে না কোনো ছেলের। কখনোই না। তাই সে গত একবছর ধরে মনে প্রাণে মেনে এসেছে তার রিদ ভাইয়ার কথা। আজও মানবে। কখনোই বসবে না সে কোনো ছেলে পাশে। কখনোই না। নয়তো তার খারাপ ভাইয়া আরও খারাপ হয়ে যাবে। আবারও আঘাত করবে মায়াকে। মায়া বিশ্বাস করে যদি মায়া কোনো ছেলের আশপাশের ভিড়ে তোহ তাঁর রিদ ভাইয়া আবারও ফিরে আসবে মায়ার কাছে। শুধু মাত্র মায়াকে ছেলেদের সাথে মেশার জন্য শাস্তি দিতে ফিরে আসবে। ভয়ানক শাস্তি।
মায়ার ভয়াৎ চেহারা। ভয়ে হুটহাট দৌড়ে পালানো। সবকিছু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পযবেক্ষণ করেছিল আয়ন। মায়ার চেহারায় স্পষ্ট ভয় দেখেছিল আয়ন। কিছু নিয়ে তীব্র ভয় বিরাজ করছিল মায়ার চোখে মুখে। কিন্তু সেটা কি? তবে যে ভয়টা আয়নকে পাচ্ছিল না। সেই বিষয়েও আয়ন নিশ্চিত ছিল। কারণ আয়ন আজ পযন্ত মায়ার সাথে এমন কোনো আচরণ বা কথা বলেনি যেটার জন্য তাঁকে ভয় পাবে মায়া। তবে মায়ার অজানা ভয়ে কারণটাও ধরতে পারছে না আয়ন। ফিহা মায়ার পিছন ছুটতে নিলে আয়ন থামিয়ে দেয়। ইশারায় বুঝায় এখন না যেতে।
পিনপিন নিস্তব্ধতার মাঝে শব্দ তুলে টিকটিক করা ঘড়ি কাটাটা জানান দিচ্ছে রাতে গভীরতাটা কতটুকু। নিস্তব্ধ আবছা আলোয় রুমটিতে একা শুয়ে আছে মায়া। ঘুমের মধ্যে বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে সে। আবার হঠাৎ হঠাৎ ফুপিয়ে উঠছে কান্নায়। খানিকটা গোঙরানো শব্দও করছে অস্পষ্ট স্বরে। ঘুমের মধ্যেই ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে আছে। আরও খানিকটা সময় নিয়ে ছটফট করতেই, হঠাৎ করে ঘুমের মধ্যে ধুর ফুরিয়ে উঠে বসে মায়া। হাঁপাতে থাকে অস্থির বংগিতে। উত্তেজিত বংগিতে কর্ণার টেবিলের লাইট জ্বালায়। দ্রুততার সঙ্গে ভয়াৎ দৃষ্টি ফেলের নিজের রুমের চারপাশে। কাউকে খুঁজার চেষ্টা করে। চোখ যায় নিজের রুমের বন্ধ দরজার দিকে। দরজাটা ভিতর থেকে আটকে দেওয়া। তারমানে মায়া এতক্ষণ বাজে স্বপ্ন দেখছিল। তৃষ্ণায় গলা ফাটছে মায়ার। নিজের জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ন্যায় মূহুর্তেই। ভয়ে জবজব করে ডানহাতে উল্টো পিঠে কপালে, গলার বিন্দু বিন্দু ঘাম গুলো মুছে ন্যায়। আবারও হাত বাড়িয়ে কর্ণার টেবিল থেকে পানি গ্লাসটি নিয়ে টকটক করে সম্পূর্ণ গ্লাসটি শেষ করে। গ্লাসটি রেখে চোখ তুলে তাকায় দেয়াল ঘড়িটির দিকে। ২ঃ৫৬ মিনিট। গভীর রাত এখন। আবারও চমকায় মায়া। ভয়ে আষ্টশ হয়ে আসে। তারমানে মায়ার দেখা বাজে স্বপ্নটি সত্যি হতে চলেছে। হেনা খান বলে মধ্যে রাতে দেখা সব স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। তাহলে কি সত্যি? মায়ার খারাপ রিদ ভাইয়া আবারও মায়ার জীবনে আসতে চলেছে? মায়া ভয় বাড়ে। শরীরে মূহুর্তেই কম্পন সৃষ্টি হয় রিদের নামটি মাথায় আসতেই। আজ একবছর দশমাস ধরে রিদ খান বাড়িতে আসে না।
তবে মায়া রিদ নামক ব্যক্তিটি ভয়ে হঠাৎ হঠাৎই মধ্যে রাতে স্বপ্ন দেখে লাফিয়ে উঠে। তবে আজকে স্বপ্নটার মতো এতটা ভয়ানক স্বপ্ন ছিল না কোনো দিনের স্বপ্ন গুলো। আজকে স্বপ্নটা যেন হার কাঁপানো ছিল মায়ার জন্য। রিদের সেই ভয়ানক রাগী চেহারাটা আজ আবারও দেখেছে স্বপ্নে মায়া। রিদের অগ্নি মতো লাল লাল চোখ জোড়া দিয়ে মায়াকে ভস্ম করছিল। প্রচন্ড ভাবে রাগান্বিত ছিল মায়ার উপর। মায়ার অপরাধ মায়া আয়নের পাশ ঘেঁষে ছিল কাল। ঘুরতে গিয়েছিল মায়া রিদের কথা গুলো ভুলে আয়নের সাথে। আর সেটাকে সূত্র ধরেই মায়ার এই বাজে স্বপ্নটার আগমন। মায়ার ছোট মস্তিষ্কের রিদের শেষ হিংস্র চেহারাটা স্পষ্ট ছাপ ফেলে গেছে রিদ। যার সূত্র ধরে মায়ার মনে হয় সে কাল আয়নের সাথে ঘুরতে গিয়ে রিদের কথা অমান্য করছে। রিদের বলা কথা গুলো ভুলে গেছে। তাই মায়ার রিদ ভাইয়া স্বপ্নে এসে মায়াকে বারবার আঘাত করছিল। কথা গুলো অমান্য করায়।
রিদের আচরণ হিংস্র থেকে হিংস্রত ছিল সেই বর্ণনা। মুখে ছিল সেই একি বলি তার “না করেছিলাম না ছেলে মানুষের আশপাশ ঘেঁষতে। তারপরও কেন গেলি তুই আয়নের কাছে? আমার কথা এতো সহজে ভুলে গেলি তুই? আমাকে ভুলার অধিকার কে দিলো তোরে হ্যাঁ? আমি দিসি তোকে? না দিলে তুই আমার অবাধ্য হবি কেন? কেন ভুলতে যাবি তুই আমাকে?
কথা গুলো বলার সাথে সাথে আঘাতটা ছিল তীব্র। যার জন্য মায়া ভয়ে ঘুমের মধ্যেই গোঙানোর শব্দ করছিল রিদের থেকে বাঁচা জন্য। ঘুমের রেশটা হালকা হতেই ধুর ফুরিয়ে বসে মায়া। কথা গুলো ভেবেই মায়া আবারও জিহবা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মায়া। ফ্লোরের এক পাশে বিছানা করে কাঁতা মুড়িয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে মালা। রাতে মালা মায়ার রুমেই ঘুমায় সবসময় ফ্লোরে। মায়ার ঘুমের ঘোরে ভয় পাওয়াকে ঘিরে, মালা হেনা খানের আর্দেশে রাতে এই রুমে ঘুমায়। মায়া মালাকে এক পলক দেখে নিয়ে গুটি পায়ে গিয়ে দাঁড়ায় বারান্দায়। হাঁটু অবধি চুল গুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে শরীরে। ওড়নাটা বিছানার উপর পড়ে আছে বিদায় গায়ে জড়ানো হয়নি। উদাসিনী মায়া বারান্দার রেলিং পা উঠিয়ে বসে। উদাসীন দৃষ্টি স্থির করে বাগানের মধ্যে থাকা কাঁচের ছোট বাংলো ঘরটিতে। স্থির নয়নে তাকিয়ে থাকে কাঁচে বাংলোটির দিকে। খান বাড়ির চারপাশে বডিগার্ডরা জাগ্রত অবস্থায় দাঁড়িয়ে পাহারায় আছে। খান বাড়ির চারপাশে কর্ড়া আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। মায়া কান্না বাড়ে। প্রশস্ত রেলিং উপর দুই পা ভাঁজ করে বসে। হাঁটুতে মুখ গজিয়ে কিছুক্ষণ মন্ত হয়ে বসে থেকে হুট করেই ডুকরে কেঁদে উঠে ফুপিয়ে।
রিদ আজ এক বছর দশ মাস ধরে খান বাড়িতে পা রাখে না। আগে যাও বছরে একবার আসতো এখন তাও আসে না। কাউকে মাসের পর মাস কল করে না। মায়া লুকিয়ে হেনা খানকে রোজ কান্না করতে দেখে রিদের জন্য। প্রথম প্রথম বুঝতে না পারলেও আজকাল ঠিকই বুঝতে পারে মায়া। লুকিয়ে হেনা খানের মুখে শুনেছে রিদ দশ মাস সতেরো দিন ধরে কারও সাথে কোনো রুপ যোগাযোগ করছে না। কেন করছে না কেউ জানে না। রিদ কোথায় আছে? কেমন আছে? সেটা কেউ জানে না। রিদের খোঁজ করার অনেক চেষ্টা করছে কিন্তু কেউ কোনো খোজ খবর পাচ্ছে না। সবাই টেনশনে আছে রিদের কোনো বড় ক্ষতি হয়ে যায়নি তো? সেটা নিয়ে! কারণ এতটা সময় রিদ কখনোই কারও সাথে যোগাযোগ না করে থাকি নি। এবার থাকছে। রিদের বডিগার্ড আসিফের সাথেও বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেছে আয়ন। ফলাফল শূন্য। আসিফেরও তেমন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। রিদ অদৌ বেঁচে আছে কিনা সেটা নিয়েও টেনশনের তোলপাড় খান বাড়ির সদস্যের মধ্যে। আজকাল হেনা খান কান্নাকাটি কাটে সারাটাক্ষন। প্রত্যেকে নিরুপায় হয়ে আছে রিদের সামনে। কারও কিছু করার থাকছে না। তারপর আয়ন, আরাফ খান নিজেদের নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে কয়েকটি দেশের গভমেন্ট সরকার থেকে হেল্প নিয়েছে রিদকে তাদের দেশে খুঁজতে। সেই সবটায় কানে আসে মায়ার সবার অগোচরে। মায়া থেকে থেকে ফুপিয়ে উঠছে কান্নায়। রিদকে মায়া ভিষণ খারাপ জানে। তারপরও মায়া কখনো রিদের খারাপ হোক এমনটা চাই নি। রিদের লম্বা সময় নিয়ে নিখোঁজ হওয়াটা যেন মায়ার ছোট মস্তিষ্কের নাড়ান দিয়ে উঠে। আজকে স্বপ্নটা যদি সত্যি হয়? তবুও মায়া খুশি হবে। তারপরও রিদ ফিরে আসুক নিজের বাড়িতে। নিজের আপনজনদের মাঝে। মায়াকে আঘাত করলেও সে সয্য করে নিবে তারপরও নিজের পরিবারের ফিরে আসুক তাঁর রিদ ভাইয়া। আর এই একটি দোয়াটায় যেন রোজই করে মায়া। আজও তাই করছে। মায়া খুব করে চাইছে রিদ হেনা খানের কাছে ফিরে আসুক। মায়ার কান্নার বেগ বাড়ে। তাই এবার মাথা উঠিয়ে দুহাতে নিজের মুখ চেপে ধরে কান্নায়। দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে ফুপিয়ে উঠছে বারবার।
আয়নের সাথে মায়ার আজ দশ মাস হয়েছে এনগেজমেন্ট হয়েছে। এখনো মায়ার হাতে আয়নের নামের আংটিটি ঝলমল করছে। আয়ন কাজের সুবাদে লন্ডন গেলেও মাস খানিকটাকে ভিতর আবারও ফিরে আসে বাংলাদেশে। বর্তমানে বাংলাদেশের একটা হসপিটালের জয়েন হয়েছে সে। মায়াকে ছেড়ে থাকতে পারছে না বলেই এমনটা করা আয়নের। বিগত দশমাসে মায়ার সাথে আয়ন ফ্রি হওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু বরাবরই শূন্য। আয়ন আশপাশে আসলেই মায়া ভয়ে আতংকিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়ে পালায়। আয়নকে কোনো সুযোগই দিচ্ছে না মায়া। আয়ন অনেক প্রয়াশ চালয় মায়ার ভয়টা জানার জন্য। কিন্তু সে ব্যর্থ। কিছুতেই অবগত হতে পারেনি মায়ার ভয়টা সম্পর্কে। সেই জন্য আজ আয়ন এনিয়ে বিনিয়ে ফিহাসহ মায়াকে নিয়ে ঘুরছে বের হয়েছিল। সারাটাদিন ভালোই কেটেছিল আয়নের মায়ার সাথে। আনন্দে মায়ার ভয়টা কিছুটা কমে এসেছিল আজ। সহজ ভাবে নিয়েছিল আয়নকে মায়া। এতেই আয়ন বড্ড খুশি হয়েছিল। অল্প থেকে গল্প। এইভাবেই মায়া ধীরে ধীরে আয়নের সাথে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে এমনটা আশা রাখে আয়ন। সবই ঠিকঠাক ছিল কিন্তু রাতেই রিদকে নিয়ে ভয়ানক স্বপ্ন দেখে মায়া। রিদের আঘাত করা, হিংস্র বংগিতে কথা গুলো ছিল মায়ার জন্য মর্মান্ত। মায়া যেমন রিদকে নিয়ে ভয় পাচ্ছিল। ঠিক তেমন দোয়াও করছে যেন রিদ ফিরে আসে সবার মাঝে। রিদের প্রতি মায়ার অনূভুতিটা ছিল নিছক অমূল্যহীন অপছন্দনীয় ব্যক্তি। কিন্তু তারপর মায়ার প্রতিটা দোয়ায় ছিল রিদের নাম বরাবরই।
কান্নায় ব্যস্ত মায়ার হঠাৎই কানে কর্ণকহল হয় গাড়ির হর্ণের শব্দ। চমকে উঠে বিধস্ত মায়া আস্তে করে নিজের মুখ করে হাত সরিয়ে নিচে বাগানের দিকে তাকায়। সেখানটায় কিছুই দেখতে না পেরে, নিজের চোখ ঘুরিয়ে নিতেই বেখেয়ালি চোখ যায় খান বাড়ির গেইট ধরে আসা কালো মার্সিডিস গাড়িটির উপর। এলোমেলো মায়া টায় জায়গায় বসে থাকে। কৌতুহল চোখ দুটো স্থির করলো কালো মার্সিডিস গাড়ির উপর। গাড়িটি গেইট ধরে ঠিক মায়ার বরাবর সামনে কাঁচের ঘরটির সামনে থামে। মায়ার অশ্রু সিক্ত চোখ দুটোতে ভর করে এবার একরাশ কোতুহল। উপর থেকে স্থির নয়নে তাকিয়ে থাকে নিচে কালো গাড়িতে। গভীর রাতে কে খান বাড়িতে আসলো জানার জন্য এবার খানিকটা ঝুঁকে পড়ে মায়া। গাড়িটি থামতেই দুজন বডিগার্ড দৌড়ে আসে সেদিকে। গাড়ির পিছনের দরজা টান দিয়ে খোলার সাথে সাথেই বাগানের চারদিকে লাইট অফ হয়ে যায় মূহুর্তেই। মায়া চমকে উঠে। আহত হয় সাথে সাথে। কৌতহলী চোখ দুটোতে বিরক্তি ভর করে। এই ভেবে কারেন্ট চলে যাওয়ার আর সময় পেল না। সারা বছর একবারও দেখলো না খান বাড়ির কারেন্ট এক সেকেন্ডের জন্য গিয়েছে। অথচ আজ এতটা উত্তেজনার সময়ের মধ্যে দিয়েই কারেন্টটা চলে গেল? এখন মায়া কিভাবে দেখবে? মধ্যে রাতে কে আসলো খান বাড়িতে? একটু সুযোগ পেল না সেটার দেখার জন্য। মায়া বিরক্তি নিয়ে চারপাশে তাকাতেই মূহুর্তে আবারও চমকে উঠে। না খান বাড়ির কারেন্ট তো যায়নি। গেইটের সামনের লাইট গুলো তোহ জ্বলছে এখনো। মায়ার রুমের ডিম লাইট, ফ্যান জ্বলছে। তারমানে কারেন্ট যায়নি বরং কেউ ইচ্ছা করে কালো গাড়িটির আশেপাশে লাইট গুলো অফ করে দিয়েছে। বিষয় বোধগম্য হয় মায়া। লোকটি হয়তো সামনে আসতে চাইছে না তাই এমনটা করা তার। ইচ্ছাকৃত ভাবে নিজের চারপাশটা অন্ধকার বানিয়েছে। মায়ার কৌতূহলতা এবার গাঢ় থেকে তীব্র হয়। আকাশ বড় ডালার মতো চাঁদটা ঝলমল করছে। চারপাশের লাইট অফ থাকলেও চাঁদে আলোয় আলোকিত হয়ে আছে চারপাশটা। তাই মায়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। দুজন বডিগার্ড এগিয়ে এসে গাড়ির পিছনের দরজাটা খোলে দেয়। খানিকটা সময় নিয়ে সেখান থেকে বের হয় লম্বা চওড়া বলিষ্ঠবান একজন ব্যক্তি। মায়া কপাল কুঁচকে আসে। আরও খানিকটা ঝুঁকে পড়ে দেখার চেষ্টা করে। উপর থেকে চেহারাটা অস্পষ্ট। ছেলেটি পিছনে ঘুরে থাকায় তাঁর বলিষ্ঠ দেহের পিঠখানা দৃশ্যমান মায়ার চোখে। মায়ার মনোযোগ দিয়ে দেখার মধ্যে দিয়েই হঠাৎই ছেলেটি পিছন ঘুরে তাকায় মায়ার বারান্দা বরাবর। ছেলেটি ঘুরে তাকাতেই অপ্রদস্ত মায়া সাথে সাথে ভয়ে সিউরে উঠে। সাথে সাথে এলোমেলো অবস্থায় নড়েচড়ে বসে, সেদিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ছেলেটিকে চিনার চেষ্টা করে। কিন্তু সফলতা নয় ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। ছেলেটির মুখে কালো মাক্স পড়া। গায়ে ফর্মাল ড্রেস জড়ানো। দৃষ্টি তার মায়ার বারান্দায় স্থির করা। মায়ার হেলদোল নেই। ছেলেটির খানিকটা সময় মায়াকে দেখে নিয়ে সাথে সাথে প্রস্হান করে বাগানে অবস্থিত কাঁচের ঘরটির ভিতরে। ছেলেটি যেতেই চারপাশে আবারও আলোকিত হয়ে উঠে লাইটিং এ। মায়ার পুরো বিষয় মায়ার উপর দিয়ে যায়। হা করে তাকিয়ে থাকে কাঁচের ঘরটির দিকে। কে এসেছে এই মধ্যে রাতে? সেটা জানার তাড়নায় মায়ার ইচ্ছা জাগ্রত হয় নিচে গিয়ে দেখে আসবে এক পলক। লোকটি কে?
চলিত…
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৫
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২২
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৪