Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৮.১


শেষপাতায়সূচনা [৪৮.১]

সাদিয়াসুলতানামনি

—”পাঁচ বছর আগে আজকের দিনেই, ভোরের দিকে পেটে কেমন চিনচিনে ব্যথা নিয়ে আমার ঘুম ভাঙে। আমার হেল্থ ইস্যুর কারণে ব্যথাটাকে হেলায়ফেলায় নিতে পারছিলাম না, আবার সিরিয়াসলিও নিতে পারছিলাম না। কারণ মাতৃত্ব গ্রহণের তখন মাত্র আমি আটমাসে পা দিয়েছে কিছুদিন হলো। দুই রুমের ফ্ল্যাটে একা আমি একটু পরপরই ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। হয়ত আশা করছিলাম, কেউ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অভয় দিয়ে বলবে, “ভয় পেও না পূর্ণতা। কিচ্ছু হবে না।” কিন্তু না। সেদিন কেউ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়নি। শোনায়নি দু’টো অভয় বাণী।”

কথাগুলো বলতে বলতেই হঠাৎই পূর্ণতা হেসে দেয়। জাওয়াদসহ উপস্থিত সকলের চোখ আস্তে আস্তে সিক্ত হতে শুরু করে।

—”সকাল আটটা না বাজতেই পেটের ব্যথা আরো বেড়ে যায়। একা মানুষ আমি, কোন কিছু হয়ে মরে পড়ে থাকলেও খোঁজ নেওয়ার কেউ ছিলো না আমার। টনি ওর ব্যক্তিগত কাজে আউট অফ টাউন ছিলো তখন। ব্যথা আরো বাড়ার আগেই আমি এম্বুল্যান্স ও নওশাদ ভাইয়া উভয়কেই কল করি। নওশাদ ভাইয়া ইমার্জেন্সিতে ফেঁসে গিয়েছিল বলে আমায় পিকআপ করতে আসতে পারেনি বাসায়। আমি একাই এম্বুল্যান্স করে হসপিটালে চলে যাই। তখন পর্যন্ত আমার মাথায় ডেলিভারি বা এই সংক্রান্ত কোন ভাবনা আসেনি।

হসপিটাল যাওয়ার পর সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমার ব্যথা আরো বাড়তে শুরু করে। আমাকে আধা ঘন্টা চেক-আপ করার পর ডাক্তার জানায় আমার ছোট তাজ আর মায়ের উদরে থাকতে চাইছে না, এই ভয়ংকর ও নিষ্ঠুরতায় ছেয়ে থাকা দুনিয়ায় আসার জন্য তোরজোড় লাগিয়ে দিয়েছে। পরবর্তী সময়টুকু আমার প্রায় অচেতন অবস্থাতেই কেটেছে।

আটমাসের শুরুতেই প্রি-ম্যাচিউর অবস্থায় আজকের এই দুনিয়ায় আমায় দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা অসহনীয় ব্যথায় তড়পিয়ে জন্ম নেয় আমার সন্তান, আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ, আমার তাজ।”

কথাগুলোতে বলতে বলতে পূর্ণতার খেয়ালই করেনি তার চোখের কোলে নোনাপানি জমা হয়েছে। অপেক্ষা শুধু গড়িয়ে পড়ার। সকলে ইতিমধ্যে নিজেদের অশ্রু ঝরাতে শুরু করেছে। তারা শুধু একটা কথাই ভাবছে, সম্পূর্ণ একা একটা মেয়ে ভিনদেশে গিয়ে কি করে এত কষ্ট সয়ে নিজের সন্তান জন্ম দিয়েছে। এজন্যই বোধহয় বলা হয়, মায়েরা পারে না এমন কোন কাজ নেই।

—”যেহেতু প্রি-ম্যাচিউর ছিল তাজওয়াদ। তাই ওকে একটা লম্বা হয় পর্যন্ত রিস্কে থাকতে হয়েছে। সেই সাথে আমাকেও। দুই মা-ছেলে পাল্লা দিয়ে আইসিইউ আর এনআইসিইউ তে ছিলাম। আমি আইসিইউ তে ছিলাম পাঁচ রাত চারদিন। আর তাজওয়াদ সাতদিন। রক্ত স্বল্পতা, ব্রেনের প্রবলেমসহ আরো এত এত অসুখে আমায় পেয়ে নিয়েছিল ডাক্তাররা শুধু উপরওয়ালার কাছে প্রে করছিল যাতে, উনি আমার সদ্যজাত সন্তানের জন্য হলেও আমাকে বাচিয়ে দেয়।

উপরওয়ালার সেবার আমার উপর একটু বেশিই মায়া হলো। বাঁচার সুযোগ দিলো আমায় আমার সন্তানের জন্য। প্রথমবার যখন আমি ওকে আমার বুকে পেলাম, মনে হলো আমার সব দুঃখ, কষ্ট, ব্যথা সবকিছু কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে। মাতৃত্ব যেমন ভয়ংকর, তেমনই সুন্দর।”

পূর্ণতা এই পর্যায়ে একটু বিরতি নেয়। আজ বহুদিন পর অনেকগুলো কথা একসাথে বলায় সে একটু হাঁপিয়ে উঠেছে।

— “আমাকে এই ভয়ংকর সুন্দর অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য, প্রতিবছর ওর জন্মদিনের আগেরদিন আমি তাজওয়াদকে জিজ্ঞেস করি, ওর আমার থেকে কি চাই। ও ওর আবদার জানানোর পর আমি সেই আবদার পূরণ করার ব্যবস্থা করি আমি। সে আমার যত কষ্টই হোক না কেন। কিন্তু এবার ও আমার কাছে এমন কিছু চেয়ে যেটা আমি হয়ত ওকে এনে দিতে পারব, কিন্তু এর পরিবর্তে আমারও ওর থেকে কিছু চাই।”

সকলে এই পর্যায়ে পূর্ণতার কথা শুনে কিছুটা অবাক হয়। ছেলের বার্থডে গিফটের বদলে রিটার্ন গিফট চাইছে পূর্ণতা।

পূর্ণতা তাজওয়াদের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে।তারপর বলল–

—”মনে আছে, কাল কি চেয়েছিলে আমার থেকে?”

তাজওয়াদ নিজের ব্রেনে একটু প্রেশার দিয়ে কালকের কথা মনে করাটা চেষ্টা করে। কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই তার মনে পড়ে যায়, সে কাল তার মায়ের কাছে গিফট হিসেবে কি চেয়েছিল। সে ভদ্র বাচ্চার মতো বলে–

—”হুম মাম্মা।”

—”গুড। আমি তোমার উইশ পূরণ করার ব্যবস্থা করেছি।”

কথাটা শুনে তাজওয়াদের খুশিতে চোখজোড়া জ্বল জ্বল করে ওঠে। সে তো মাম্মার কাছে চেয়েছিল, তার পাপাকে এনে দিতে। তাহলে কি তার মাম্মা তার পাপাকে এনে দিবে? তাজওয়াদ খুশিতে গদগদ হয়ে বলে–

—”মাম্মা তুমি আমাল পা…..”

—”হ্যাঁ, এনেছি। কিন্তু তোমাকে একটা প্রমিজ করতে হবে।”

—”কি প্রমিজ মাম্মা? “

—”প্রমিজটা হলো, মাম্মা যা বলবো তা শুনতে হবে। মাম্মার সাথে জেদ করা যাবে না। এর অন্যথায় হলে, তোমাকে কিন্তু আমি কানাডা রেখে আসবো। একদম একাই রেখে আসবো, তোমার সাথে আমিও যাবো না বলে দিলাম।”

মায়ের এমন কঠিন শর্ত শুনে তাজওয়াদ মনে মনে একটু ভয়ই পায় বটে। কিন্তু সে নিজের প্রতি প্রচুর কনফিডেন্ট। মাম্মার কথা না শোনার মতো বাচ্চাই না সে। তাই সে প্রমিজ দিতেও এত ভাবাভাবি করে না।

—”ওকে মাম্মা। আই প্রমিজ, আমি তোমাল চব কতা শুনবো।”

পূর্ণতা ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে–

—”তোমরা সবাই সাক্ষী, তাজওয়াদ বলেছে আমি ওর উইশ পূরণ করলে ও আমার সব কথা শুনবে।”

সবাই কিছুটা বিভ্রান্তি নিয়ে পূর্ণতার কথায় সম্মতি দেয়। তারা বুঝতে পারছে না, তাজওয়াদ গিফট হিসেবে কি এমন চেয়েছে যার কারণে পূর্ণতা এমন শর্ত রাখছে।

—”এবার তোমরাও শুনো, ছেলে আমার নিজের জন্মদিন উপলক্ষে কি চেয়েছে আমার থেকে? ও নিজের পাপাকে চেয়েছে গিফটে।”

পূর্ণতা শান্ত গলায় কথাটি সকলের সামনে পেশ করলেও সকলে বিস্ময়ে পলক ফেলতে ভুলে যায়। তারা কখনো কল্পনাও করেনি তাজওয়াদ এমন একটি গিফট চাইবে নিজের জন্মদিন উপলক্ষে, তাও পূর্ণতার থেকে। সকলে এটা ভেবে আরো অবাক হচ্ছে যে, পূর্ণতা নাকি তাজওয়াদের এই উইশও পূরণ করবে। সত্যিই কি তাই? তার মানে, সে কি জাওয়াদকে মাফ করে দিবে? উপস্থিত সকলের মন ও মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ বেগে প্রশ্নটা ছুটে চলেছে। কিন্তু এর উত্তর শুধুমাত্র সামনে দাঁড়ানো অতিব সুন্দরী রমণীটিই জানে।

সকলের কৌতূহল, উত্তেজনা ও জল্পনা-কল্পনাকে বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে না দিয়ে পূর্ণতা বলল–

—”তাজওয়াদের পাপা এদিকে আসুন।”

পূর্ণতার আহবানে জাওয়াদ সাথে সাথে সাড়া দেয় না। তার সবকিছু কেমন একটা স্বপ্নের মতো লাগছে। অসম্ভব সুন্দর স্বপ্ন, যেটা সে রোজই দেখে। জাওয়াদ হা করে নিজের পূর্বের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকে। সকলে একবার জাওয়াদের দিকে, আরেকবার পূর্ণতার দিকে, আরেকবার তাজওয়াদের দিকে তাকাচ্ছে। সবাই অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যখন প্রথমবারের মতো তাজওয়াদ জানবে তার বাবা কে? প্রথমবারের মতো আলিঙ্গন করবে নিজের পিতাকে। পিতার উষ্ণ বুকের সাথে মিশেয়ে দিবে নিজের ছোট দেহখানা।

জাওয়াদ আসছে না দেখে পূর্ণতা নিজেই তাজওয়াদের হাত ধরে তার সামনে এসে উপস্থিত হয়। তারপর একবার জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা নিরেট গলায় বলে–

—”অনেক সময় সন্তানের সুখের জন্য মায়েদেরকে নিজেদের কান্নার কারণের সাথেই সন্ধি করে নিতে হয়।”

পূর্ণতা তাজওয়াদকে কোলে তুলে নিয়ে জাওয়াদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে–

—”নিন ছেলেকে কোলে নিন।”

তাজওয়াদ তার মায়ের কথা ও কাজে কিছুটা পাজেলড। সে বুঝতে পারছে না, তার মাম্মা তাকে ভালো আঙ্কেলের কাছে নিয়ে আসলো কেন? সে তো ভালো আঙ্কেলের কোলে রোজই চড়ে। মাম্মা তো বলেছিল, সে তার পাপাকে এনে দিবে। কিন্তু কোথায় তার পাপা?

তাজওয়াদ আদোও গলায় মা’কে জিজ্ঞেস করে–

—”মাম্মা, আমাল পাপা কুতায়? এতা তো ভালো আঙ্কেল।”

—”উনিই তোমার পাপা হয়, সোনা। তোমার ভালো আঙ্কেলই তোমার পাপা।”

তাজওয়াদ হা হয়ে যায় মায়ের কথা শুনে। কি বলছে তার মা এসব? তার ভালো আঙ্কেল তার পাপা হয়? কিভাবে? তাজওয়াদের কেন জানি বিশ্বাস হতে চায় না, ভালো আঙ্কেলই তার পাপা।

সে একবার জাওয়াদের দিকে তাকায়। অশ্রুতে ভিজে চপচপে হয়ে গিয়েছে জাওয়াদের গাল ততক্ষণে। সে মনের বিভ্রান্তি দূর করতে জাওয়াদকে জিজ্ঞেস করে–

—”তুমি আমাল পাপা হও?”

জাওয়াদ চোখ-মুখ খিঁচে নিয়ে কঠিন ভাবে কান্না সংবরণ করে ভাঙা গলায় বলে–

—”হুম।”

তার সম্মতি পেয়ে তাজওয়াদের মনে অভিমানের কালো মেঘ জমতে থাকে। সে গাল ফুলিয়ে বলে–

—”তাহলে এতদিন বললে না কেন, তুমিই আমাল পাপা?”

—”বলার পারমিশন ছিলো না সোনা। বললে, তোমার মাম্মা আমাকে পানিশমেন্ট দিত।”

তাজওয়াদ এবার ঘাড় ঘুরিয়ে ভ্রু কুঁচকে মায়ের দিকে তাকায়। কপালে ভাজ নিয়ে মাকে প্রশ্ন করে–

—”মাম্মা, পাপা সত্যি বলছে?”

—”হুম।”

মায়ের থেকে পাপার কথার সত্যতা পেয়ে তাজওয়াদ আর অভিমান করে থাকতে পারে না তার উপর। সে তো চিনে নিজের মাকে। সে এবার আবদারের গলায় বলে–

—”পাপাল কাছে যাই মাম্মা?”

—”যাও।”

খুবই সংগোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে পূর্ণতা তাজওয়াদকে এগিয়ে দেয় জাওয়াদের দিকে। তাজওয়াদ গাল ভর্তি হাসি নিয়ে জাওয়াদের কোলে চড়েই বলতে থাকে–

—”পাপা, আমাল পাপা।”

জাওয়াদ ছেলেকে কোলে নিয়ে বাঁধনভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ে। কাউকে তোয়াক্কা না করে, কোন লোকলজ্জার ভয় না পেয়ে ছেলেকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে সে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে একসময় হাঁটু গেঁড়ে নিচে বসে পড়ে ছেলেকে বুকের সাথে জড়িয়ে রেখেই। তাজওয়াদ খানিক পরপর তাকে “পাপা” বলে ডেকে উঠছে, সেই সাথে জাওয়াদের কান্নারাও নিজেদের সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করতে থাকে।

অনেকটা সময় নিয়ে জাওয়াদ নিজেকে শান্ত করে। অতিরিক্ত কান্নার কারণে তার চোখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে। সে তাজওয়াদের কাঁধ থেকে মুখ তুলতেই তাজওয়াদ নিজের ছোট ছোট হাত দিয়ে জাওয়াদের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে–

—”পাপা, তুমি কি চুতো বাচ্চা হয়ে গেলে? এত কান্না তো তাজও কলেনি ককনো।”

তাজওয়াদের কথা শুনে সবাই একচোট হেঁসে নেয়। জাওয়াদ ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পূর্ণতাকে আশেপাশে খুঁজে, কিন্তু তাকে পায় না কোথাও। সে বুঝতে পারে ম্যাডাম তাদের বাপ-ছেলের মিলন দেখে নিজেও শক্ত থাকতে পারবে না বলে ভেগেছে এখান থেকে। ব্যাপার না, বউয়ের সাথে তার অতিগোপণীয় আলাপ-আলোচনা রয়েছে। সেটার জন্য তাদেরকে একটা জনমানবহীন চিপা লাগবে।


পাপাকে পেয়ে তো তাজওয়াদ মনে হয় আসমানে চাঁদ হাতে পেয়ে গিয়েছে। জাওয়াদের সাথে তার সম্পর্কটা আগে থেকেই ছিল একটু বেশিই স্বচ্ছল, প্রাণবন্ত, মাখোমাখো টাইপ। রক্তের টান তো, বহু দূরত্বের পরও সেই টান ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি। আর এখন তো তাজওয়াদ জানতেই পেরে গিয়েছে তার ভালো আঙ্কেলই তার পাপা।

আজ একবারের জন্যও তাজওয়াদ নওশাদের কাছে আসেনি। সে তার পাপাকে পেয়ে বাবাইকে ভুলেই গিয়েছে একপ্রকার। নওশাদ তাদের থেকে কিছুটা দূরে দাড়িয়ে বাবা-ছেলের আনন্দ দেখছে। তার চোখে-মুখে কিছুটা বিষাদের উপস্থিতি থাকলেও মন থেকে সে তাজওয়াদের জন্য খুশি।

হঠাৎই নওশাদ নিজের পাশে কারো উপস্থিতি টের পেলে বাম দিকে ফিরে চোখের কোণে জমা হওয়া অশ্রুটুকু মুছে নেয় চটজলদি করে।

—”কাঁদছিলে?”

—”কই না তো। কাঁদব কেনো? বরং আমি আজ ভীষণ খুশি। আমার চ্যাম্প তার পাপাকে ফিরে পেয়েছে। ওর বাঁধনভাঙা খুশিতে আমিও খুশি।”

—”কিন্তু আমি তো তোমার চোখে অশ্রুর উপস্থিত পেলাম।”

বুকে হাত গুঁজে নিয়ে নিরেট গলায় জিজ্ঞেস করে পূর্ণতা। পূর্ণতার কথা শুনে নওশাদ হেঁসে দেয়। সে দুই আঙুল দিয়ে পূর্ণতার কপালে একটা টোকা দিয়ে বলে–

—”সব অশ্রু কি দুঃখের কারণে ঝরে?
কিছু অশ্রু কিন্তু সুখেতেও আসে।”

পূর্ণতা নিজের কপাল ডলতে ডলতে ব্যঙ্গ করে বলে–

—”কবি কবি ভাব, কিন্তু অনেক কিছুরই অভাব। তোমাকে দিয়ে এসব কবিতা, ছন্দ, উপন্যাস হবে না। বৃথা চেষ্টা করো না তো।”

—”আলবাদ হবে, একশ চৌদ্দবার হবে। না হলে হওয়াবো। আমাকে দিয়ে হবে না তো কাকে দিয়ে হবে?”

—”তোমার মতো মিঙ্গেল মানুষদের দিয়ে হবে না। আগে দু’চারটা ছ্যাকা খেয়ে ব্যাকা হও, তারপর নাহয় আবারও ট্রাই করো।”

কথাটা শেষ করার পর তাদের দু’জনের মাঝে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নীরবতা বিরাজ করে। তারপর দু’জন একসাথেই উচ্চস্বরে হেঁসে ওঠে।

দূর থেকে পূর্ণতাকে নওশাদের সাথে হাস্যরত অবস্থায় দেখতে পায় জাওয়াদের ঘুমন্ত হিংসুটে সত্তাটা জেগে ওঠে। সে ছেলের সাথে খেলা থামিয়ে দিয়ে তাজওয়াদকে বলে–

—”আব্বুসোনা, অনেক খেলাধুলা হয়েছে। চলো ডিনার করবে।”

—”পাপা আত্তু পল।”

আবদারের সুরে বলে তাজওয়াদ। জাওয়াদ তার আবদার সরাসরি নাকচ করে না। বরং ছেলেকে কাধের উপর বসিয়ে বলে–

—”আচ্ছা চলো ট্রেন ট্রেন খেলতে খেলতে যাই। রাত নয়টা গামী ট্রেনটি ডিনার টেবিলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এই মুহূর্তে ডাইনিং রুম ছেড়ে রওনা হয়েছে। যাত্রীরা সবাই নিজেদের যাত্রা উপভোগ করুন, ধন্যবাদ।”

তাজওয়াদ নতুন গেইম পেয়ে খুশিতে বাক-বাকুম হয়ে যায়। সে দুই হাত দিয়ে জাওয়াদের চুল খামচে ধরে কাঁধেই বসে নিজের যাত্রা উপভোগ করতে থাকে।

পূর্ণতা ও নওশাদের কথায় ব্যাগড়া দিতে উপস্থিত হয় তারা বাপ-ছেলে। জাওয়াদ ট্রেনের মতো করেই হেলেদুলে হাঁটতে হাঁটতে এসে উপস্থিত হয় একদম তাদের দু’জনের মাঝে। বলতে গেলে নওশাদ ও পূর্ণতার মাঝে দেওয়াল হয়ে দাঁড়ায়।

হুট করে জাওয়াদকে নিজেদের মাঝে এমন দেওয়ালের মতো করে দাঁড়াতে দেখে নওশাদ আর পূর্ণতা দু’জনই থতমত খেয়ে যায়। জাওয়াদ পূর্ণতাকে উদ্দেশ্য করে বলে–

—”আমাদের খেতে দাও। আমাদের খিদে পেয়েছে।”

পূর্ণতা নিজেকে সামলে বলে–

—”ডাইনিংয়ে গিয়ে বসুন, দিচ্ছি। “

—”এখনই দাও, বেশি ক্ষুধা পেয়েছে।”

জেদী গলায় বলে জাওয়াদ। সে কিছুতেই আর এক সেকেন্ডের জন্যও পূর্ণতাকে নওশাদের সাথে ছাড়তে নারাজ। পূর্ণতা জাওয়াদের এমন জেদীপনায় বিরক্ত হয়ে থপথপ করে বড় বড় পা ফেলে সেখান থেকে চলে যায়। জাওয়াদও তার পেছন পেছন যাওয়ার জন্য পা বাড়াবে তখনই তাজওয়াদ জাওয়াদের কাঁধে বসে থেকেই বলে–

—”বাবাই আসো, মজা মজা কাবো তো আমলা। আসো আসো।”

—”আসছি বাবা। তুমি যাও।”

স্মিত হেঁসে নওশাদ বলে। জাওয়াদ ছেলেকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ভুজুংভাজুং বলতে বলতে তাকে সেখান থেকে নিয়ে যায়।

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]

শব্দসংখ্যা~১৮৬০

চলবে?

[আজকের পর্বটা অনেকের কাছে ভালো লাগবে, তো অনেকের কাছে লাগবে না। যাদের কাছে ভালো লাগবে না, তাদের কাছে আমি অগ্রিম সরি চেয়ে নিচ্ছি। আর তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাইছি, স্বামী জাওয়াদ হয়ত ব্যর্থ কিছুক্ষেত্রে। কি বাবা জাওয়াদকে অনায়াসেই দশে দশ দেওয়া যায়। তাই না?

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply