Golpo romantic golpo প্রণয়ে গুনগুন

প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩৫


প্রণয়ে_গুনগুন

পর্ব_৩৫

মুন্নিআক্তারপ্রিয়া


ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। আকাশটা হালকা নীলচে, তার মাঝে একটু গোলাপি রঙের ছোঁয়া। একটা নতুন দিনের শুরু হচ্ছে। কিন্তু প্রণয়ের কাছে যেন সব কিছুর শেষ। যেন সব কিছুর অন্ত, ইতি আজ নীরবে, নিশ্চুপে কোলাহলবিহীন এই এয়ারপোর্টেই ঘটবে।

এয়ারপোর্টের সামনে হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে। চারপাশে অল্প কিছু মানুষ। কেউ ব্যস্ত, কেউ প্রিয়জনের অপেক্ষায়। কিন্তু তাদের ভিড়ের মাঝেও প্রণয় আর গুনগুন যেন আলাদা একটা জগতে দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশব্দ, ভারী, আর অদ্ভুতভাবে থেমে থাকা সময়ের মধ্যে দুজনের ভেতরই প্রচণ্ড রকম হাহাকার, চোখ আর্দ্র, ঠোঁটে মেকি হাসি। দুজনেই দুঃখ লুকানোর আপ্রাণ প্রয়াস চালাচ্ছে। ঠোঁটের এক টুকরো মিথ্যে হাসি কি আর হৃদয়ের বেদনা লুকোতে পারে? হাসি যদি দুঃখ এড়িয়ে যাওয়ার একটি পন্থা হয়, তাহলে চোখ দুঃখ প্রকাশের অন্যতম পন্থা। আর যাই হোক, চোখের ভাষা লুকানো যায় না কখনো।

গুনগুন একটা হালকা আকাশি রঙের ওড়না জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের মুঠোতে শক্ত করে আটকে রাখা ওড়নার এক কোণা। ঠোঁট কামড়ে ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। চোখদুটো র’ক্তবর্ণ ধারণ করেছে। রাতভর ঠিকমতো ঘুম হয়নি। এক হাতে শক্ত করে ধরা পাসপোর্ট আর টিকিট। টিকেটটি জাপানে যাওয়ার কিন্তু এটাই তার নতুন জীবনের একটি দরজা।

প্রণয় কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। কিন্তু কাছে এসেও কিছু বলতে পারছে না। হাজার কথা গলায় আটকে আছে। শেষ পর্যন্ত গলার স্বর পরিষ্কার করে নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“সবকিছু ঠিক আছে তো? চেক করে নিয়েছ?”

গুনগুন হালকা হাসল। সেই পরিচিত দুঃখ লুকানোর হাসিটা। প্রণয়ের বুকে মোচড় দিচ্ছে গুনগুনের ঠোঁটের এই হাসিটা দেখে। গুনগুন বুকভরা শ্বাস নিয়ে বলল,

“কোন সবকিছুর কথা বলছেন?”

“কাগজপত্র, টিকিট…”

“হ্যাঁ। সব ঠিক আছে। কিন্তু তবুও কেন মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই! আমরা ঠিক নেই!”

প্রণয় হাসার চেষ্টা করল। গুনগুনের হাত ধরে বলল,

“সব ঠিক আছে, গুনগুন। তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছ।”

“আমার বুক ভারী হয়ে আসছে।”

“নার্ভাস ফিল করছ?”

“জানিনা।”

“কিচ্ছু হবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে। প্লেনে উঠলেই দেখবে সব একদম স্বাভাবিক।”

ছোট্ট এক টুকরো নীরবতা নেমে এলো দুজনের মাঝে। অথচ দুজনেই খুব ভালো করে জানে যে এই ‘সব ঠিক’ কথাটা আসলে কতটা মিথ্যে। কোনো কিছুই স্পষ্টভাবে আসলে ঠিক হয় না। আমরা কেবল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানিয়ে নিই।

লাউডস্পিকারে ঘোষণা ভেসে এলো, বোর্ডিং শুরু হয়ে গেছে। গুনগুনের আঙুলগুলো একটু কেঁপে উঠল। হাতের সঙ্গে পা-ও কাঁপছে। ওসমান গণি এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। তার চোখদুটো ভেজা। কাঁদছেন তিনি। গুনগুন ভেজা চোখে তাকিয়ে আছে। ওসমান গণি বললেন,

“সাবধানে যাস, মা। আর আমার ওপর কোনো অভিমান জমিয়ে রাখিস না। মাফ করে দিস।”

শিহাব গুনগুনকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে। গুনগুনও ছোট্ট ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। কুলসুম গুনগুনের কাঁধে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করার পর বিপ্লব বলল,

“যাওয়ার সময় এত কান্নাকাটি কোরো না তো। পরে কিন্তু মাথাব্যথা করবে। লম্বা জার্নি করতে হবে এটা ভুলে গেলে তো চলবে না। তাছাড়া তুমি কি সারাজীবনের জন্য চলে যাচ্ছ? কখনো কি দেশে আসবে না?”

গুনগুন জবাব দিতে পারছে না। কাঁদছে সে। বিপ্লবও এবার স্নেহের হাত গুনগুনের মাথায় রেখে বলল,

“কাঁদে না বাচ্চা। সুস্থ ও ভালোমতো জাপানে পৌঁছাও।”

মাসুদের ভীষণ দুঃখ হচ্ছে। তার শত্রু চলে যাচ্ছে অথচ সে কষ্ট পাচ্ছে। ওর যদি এতটা খারাপ লেগে থাকে তাহলে প্রণয়ের কতটা কষ্ট হচ্ছে? গুনগুনের কতটা কষ্ট হচ্ছে? মাসুদ ধরে আসা কণ্ঠে গুনগুনকে বলল,

“কখনো অজান্তে কষ্ট দিয়া থাকলে আমারে মাফ কইরা দিও।”

গুনগুন দুহাতে চোখের পানি মুছে বিপ্লব, কুলসুম ও মাসুদের উদ্দেশে বলল,

“যতদিন প্রণয় দেশে আছে, ততদিন ওকে দেখে রাইখেন আপনারা।”

“তুমি চিন্তা কোরো না। আমরা আছি ওর সাথে।” তিনজনেই আশ্বস্ত করল গুনগুনকে।

প্রণয় একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। গুনগুন এগিয়ে গেল। বাঁধনহারা কষ্ট এই মুহূর্তে তাকে ঘিরে ধরেছে। খুব আকস্মিক ঝড় যেমন হয়, তেমনই ঝড়ের মতো প্রণয়ের বুকে আছড়ে পড়ল গুনগুন। শক্ত করে প্রণয়ের পিঠ খামচে ধরে বলল,

“আমি যদি না যাই, খুব বেশি ক্ষতি হবে?”

প্রণয়ের দুচোখে পানি। কিন্তু ঠোঁটে হাসি। সে গুনগুনকে বুকে আঁকড়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

“ক্ষতি হবে তো।”

“কী ক্ষতি হবে?”

“সারাজীবন আমি নিজের কাছে অপরাধী হয়ে থাকব। আমার মনে হবে, আমি তোমার আর তোমার স্বপ্নের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছি। আমার জন্যই তুমি তোমার স্বপ্নের এত কাছাকাছি এসেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। আমি তো এমন কিছু চাই না, গুনগুন। আমি তো চাই, আমার বউটা তার ছোটোখাটো সব স্বপ্ন পূরণ করুক। আমাকে সাথে নিয়ে।”

গুনগুন নিরুত্তর। বুকে পাথর চাপা দিয়ে প্রণয় বলল,

“অপেক্ষা কষ্টের হয়। আমি পারি না অপেক্ষা করতে। কিন্তু সেই কষ্টমিশ্রিত অপেক্ষার বিনিময়ে যখন তোমাকে পাব তখন সেই অপেক্ষা হবে আমার জন্য সুমিষ্ট। যেই অপেক্ষা আমায় তোমাকে পেতে সাহায্য করবে, তোমার স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করবে সেই অপেক্ষা আমি জনম জনম ধরে করতে পারব।”

“আমি আপনাকে ছাড়া কীভাবে থাকব? আপনি আমাকে ছাড়া কীভাবে থাকবেন?”

“দূরে চলে যাওয়া মানেই কি আলাদা হওয়া গুনগুন? আমাদের এই দূরত্ব হবে আমাদের আবার এক হওয়ার লড়াই, সংগ্রাম। তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি এটুকু সংগ্রাম করতে পারব না?”

“আমার জন্য আর কত স্যাক্রিফাইজ করবেন?”

“যতটা স্যাক্রিফাইজ করলে তোমায় সুখে রাখতে পারব। তাছাড়া ত্যাগ কি শুধুই আমার একার? এইযে না চিনে, না জেনে রাস্তার বখাটে একটা ছেলেকে তোমার সুন্দর জীবনটা উৎসর্গ করলে, এবং তোমাকে সারাজীবনের জন্য দলিল করে দিলে, অনিশ্চয়তা আছে জেনেও বিয়ে করলে, আমাকে দুহাতে সামলালে; এটা কি স্যাক্রিফাইজ নয়?”

গুনগুন মাথা তুলে তাকাল প্রণয়ের দিকে। প্রণয় গুনগুনের চোখের পানি ও গালে লেপ্টে থাকা পানিটুকু সুন্দর করে মুছে দিল। দুই হাতের আঁজলায় গুনগুনের ছোট্ট পুতুলের মতো গোলগাল মুখটা ধরে বলল,

“আমি আসব খুব শীঘ্রই তোমার কাছে। আমাদের এখনো একসাথে অনেক কিছু করা বাকি, গুনগুন। আমাদের এখনো অনেক প্রণয় বাকি। প্রণয়টুকু না হয় দুজনে একসাথে জাপানের বুকে ফুটে থাকা চেরি ব্লোসমের সাথে পূরণ করব। ততদিন আমার জন্য অপেক্ষা করবে তো?”

গুনগুন কান্নায় ভেজা চোখে তাকিয়ে থেকে মাথা উপর-নিচ করল। প্রণয় আলতো করে গুনগুনের কপালে চুমু খেয়ে আবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে তার গুনগুন তাকে রেখে অতল গহ্বরে। সে পাগলের মতো গুনগুনের পুরো মুখে অজস্র কিছু চুমু খেয়ে ফের শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখল।

কিছুক্ষণ পর বিপ্লব এগিয়ে এসে বলল,

“গুনগুন, তোমার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।”

গুনগুন প্রণয়কে ছাড়ছে না দেখে, প্রণয় নিজেই এবার গুনগুনকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“যাও।”

“আরেকটু!”

“ফ্লাইট মিস করবে।”

“তাও ভালো। দূর থেকে তো আর আপনাকে মিস করতে হবে না।”

“আমি তো চাই তুমি আমায় মিস করো।”

গুনগুন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। প্রণয় বলল,

“দূরে গেলেই না বুঝতে পারব আমার বউটা আমাকে কতটুকু ভালোবাসে! আমার অনুপস্থিতি তাকে কতটা পো’ড়া’য় আমিও একটু দেখতে চাই।”

“আমার চেয়েও যে আপনি বেশি পু’ড়’বে’ন, তার বেলায় কী হবে?”

“অপেক্ষার অবসান হবে। করবে না অপেক্ষা?”

গুনগুন মৃদু মাথা নাড়ল। প্রণয় হালকা হেসে ফেলল তখন। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই। দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বলল,

“আমার লক্ষ্মী বউ, যাও এখন।”

গুনগুন শক্ত করে প্রণয়ের হাত ধরে রেখেছে। প্রণয় একটু একটু করে হাত আলগা করে বলল,

“যাও।”

হাত পুরোপুরি ছাড়ার পর গুনগুনের পুরো দুনিয়াটা যেন ফাঁকা লাগছিল। প্রণয় চোখের ইশারায় ফের বলল,

“যাও প্লিজ!”

আজকের প্রণয় যেন একদম অন্যরকম। সবসময় কাছে রেখে দিতে চাওয়া প্রণয় আজ কতটা অকপটে গুনগুনকে চলে যেতে বলছে। গুনগুন অবশ্য এটাও খুব ভালো করেই জানে যে, প্রণয় নিজেকে যতটা শক্ত দেখাতে চাইছে, ঠিক ততটাই ভেঙেচুরে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে। গুনগুনও প্রণয়কে ভাঙতে চাইল না আর। টলমল ঝাপসা দৃষ্টি মিলে এবার সে এক পা, এক পা করে পিছিয়ে গেল। লাগেজ নিয়ে যাওয়ার সময় শেষবারের মতো গুনগুন একবার চারপাশে তাকাল। তারপর প্রণয়ের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিটা ছিল ভালোবাসার, আফসোস আর অজস্র না বলা কথার মিশ্রণ।
তারপর সে ঘুরে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে, এক পা এক পা করে, সে ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগল।

প্রণয় সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। না সে গুনগুনকে ডাকল, আর না ওকে থামাল। শুধু অশ্রুসিক্ত নয়নে ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখল তার গুনগুন, তার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষটা, তার ভালোবাসা একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। একেবারে অন্য একটা দেশে, অন্য একটা জীবনে।

বাইরে ভোরের আলো তখন একটু একটু করে বাড়ছে। অথচ প্রণয়ের ভেতরে তখনও গভীর রাত। তমসাচ্ছন্ন রাত্রি। প্রণয়ের বুকের ভেতর অন্তহীন দহন, ভেতরের রুহ্-টা যেন চিৎকার কাঁদছে আর বলছে,

“তুমি বিহীন এই দেশে আমি শ্বাস নিতে পারছি না, গুনগুন। আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, বুক ভার হয়ে আসছে। আমি পারছি না, আমার কলিজা ছিঁ’ড়ে যাচ্ছে, হৃদয়ে র’ক্তক্ষরণ হচ্ছে। তুমি ছাড়া আমি কীভাবে থাকব?”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply