Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ ২৬ এর প্রথমাংশ


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

২৬ এর প্রথমাংশ

স্বচ্ছ কাচের জানালা ভেদ করে সকালের আলো মুখে পড়তেই ঘুম ভাঙে মেহেরুন্নেসার। কপাল কুচকে আসে চোখে সূর্যের আলো পড়ার দরুন। ধীরে ধীরে চোখ জোড়া খুলে। কাত হয়ে শুয়ে থাকায় প্রথমেই চোখ যায় বিছানার পাশের জায়গা টায়। বাইজিদ নেই। চারিদিকে চোখ বুলায় কক্ষের। বেলা হয়ে গেছে হুশ হতেই ধড়ফড়িয়ে উঠতে যায়। ইশশশ রে নামাজ কাযা হয়ে গেছে। কিন্তু শরীর তাকে সায় দিলো না। বাহু তে ভর করে উঠতে গেলে ফের পরে গেলো বিছানায়। সর্বশরীরে সুচ ফোঁটার মতো ব্যাথা। ঘাড় নাড়াতে পারছে না ব্যাথায়। হাত পায়ের তালু গুলো যেন অবশ হয়ে আছে।

নিজের দিকে খেয়াল হতে দেখলো কেবল একটা কাঁথায় জড়িয়ে আছে সে। সম্ভ্রম টুকু টেনে টুনে নিজেকে ভালো করে ঢেকে নিলো। কিন্তু বাইজিদ কে কক্ষে দেখা যাচ্ছে না। এত সকালে কোথায় গেল লোকটা? কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইলো মেহেরুন্নেসা। শরীরের ব্যথাটা এত বেশি যে, উঠে দাঁড়ানোর সাহস ই হচ্ছে না
কক্ষের এক কোণে তার পোশাক গুছিয়ে রাখা। নিশ্চয়ই বাইজিদই রেখে গেছে। মেহেরুন্নেসা চারদিকে একবার তাকিয়ে ধীরে ধীরে কাঁথাটা সরালো। সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগতেই শিউরে উঠলো সে। তারপর খুব সাবধানে বিছানা থেকে নামলো।
পা মাটিতে ছোঁয়াতেই মুখ কুঁচকে গেলো।
“উফ…”
তবু দাঁতে দাঁত চেপে আলনা থেকে পোশাক নামালো। ধীরে ধীরে পরে নিলো। ওড়নাটা কাঁধে নিতে গিয়েও হাত কেঁপে উঠলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারা দেখে মুখ ফিরিয়ে নিলো সে। ঘাড়ের কাছে, কাঁধের ওপর, গলার পাশে লালচে দাগ।
“হায় আল্লাহ…”
ওড়নাটা আরও ভালো করে টেনে নিলো সে।
ঠিক তখনই দরজায় মৃদু টোকা পড়লো।
মেহেরুন্নেসা চমকে উঠলো।
“ভেতরে আসুন”
আস্তে বললো সে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো রত্নপ্রভা। আজ তাকে খুব উজ্জ্বল লাগছে। হালকা নীল কাপড়, খোলা চুল, ঠোঁটে চিরচেনা হাসি। কিন্তু মেহেরুন্নেসাকে দেখেই তার চোখ সরু হয়ে উঠলো উঠলো।
“ওমা, তোমাকে এমন লাগছে কেন মেহের?”
মেহেরুন্নেসা তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে ফেললো।
“ না আসলে….”
রত্নপ্রভা ধীরে ধীরে ভেতরে এসে জানালার পাশে দাঁড়ালো। তারপর হেসে বললো
“চলো, তোমায় একটা জায়গা দেখাই।”
“কোথায়?”
“মহলের দুই মিনারের মাঝখান দিয়ে যে স্বচ্ছ নদীটা বয়ে গেছে, সেখানে। সকালের রোদে জায়গাটা খুব সুন্দর লাগে। তোমায় সেখানে গোসল করিয়ে আনবো।”
মেহেরুন্নেসা একটু ইতস্তত করলো।
“এখন?”
“হ্যাঁ, এখনই। সারাদিন কক্ষে বসে থাকলে আরও বেশি ক্লান্ত লাগবে। অনেক দিন হলো সেখানে গোসল করিনি। চলো, সুনেহেরাও যাচ্ছে।”

মেহেরুন্নেসা মিনমিনে গলায় বলল
“শাহজাদার অনুমতি নিই নি। উনি যদি….”
প্রভা মেহেরুন্নেসার দিকে এগিয়ে এসে বলল
“আরে কিচ্ছু বলবে না ভাইজান। ওদিকে পুরুষ প্রবেশ নিষিদ্ধ”
সে আর কিছু বললো না। ধীরে ধীরে রত্নপ্রভার সঙ্গে বেরিয়ে এলো। করিডোর পেরিয়ে, লম্বা বারান্দা ধরে হাঁটছে দুজনে। দূরে দুই মিনারের মাঝখান দিয়ে সত্যিই চিকচিক করছে নদীর পানি। সকালের আলো পড়ে যেন রুপার মতো ঝলমল করছে। কিন্তু মেহেরুন্নেসার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। সে খুব আস্তে আস্তে পা ফেলছে। মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছে। আবার হাঁটছে।
তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটা পদক্ষেপে শরীরের ভেতরটা কেঁপে উঠছে।
রত্নপ্রভা কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। তারপর ঘুরে তাকালো। মেহেরুন্নেসা তখন ধীরে ধীরে, প্রায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। রত্নপ্রভা এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো। তারপর তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠলো।
বুঝলো বাইজিদের উগ্র আদরের ফল মেহেরুন্নেসা এখন ভোগ করছে। কিন্তু সে কিছু বললো না। শুধু আরও কাছে এসে নিচু গলায় মজা করে বললো
“ধরবো?”
মেহেরুন্নেসা সঙ্গে সঙ্গে চমকে তাকালো। রত্নপ্রভা বোকা সাজার ভান করে গম্ভীর মুখে বললো
“না মানে, একা হাঁটতে পারবে? নাকি তোমার শাহজাদা তোমাকে এমন অবস্থায় রেখে গেছে যে এখন আমাকে ধরাধরি করে নিয়ে যেতে হবে?”
“আপা!”
মেহেরুন্নেসা একেবারে মাথা নিচু করে ফেললো।
রত্নপ্রভা হেসে উঠলো।
“আচ্ছা আচ্ছা, আর বলবো না। চলো।”
তবু সে আলতো করে মেহেরুন্নেসার হাত ধরে ফেললো।
“ধীরে হাঁটো। পড়ে যেও না।”
দুইজন ধীরে ধীরে এগিয়ে চললো নদীর দিকে। সামনে ঝলমলে পানি, চারপাশে ফুলের গন্ধ, আর সকালের বাতাসে অদ্ভুত এক শান্তি। কিন্তু মেহেরুন্নেসার মস্তিস্ক জুড়ে এখনো গতরাতের চিন্তা। সকালের প্রথম সূর্যের আলো গাছের ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে নদীর জলে এসে পড়েছে। চারদিক যেন সবুজ আর সোনালি আলোয় ভেসে আছে। নদীর জল অস্বাভাবিক স্বচ্ছ। নিচে পাথর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। হালকা নীলচে সবুজ জলের উপর সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে। নদীর একপাশ ঘিরে বিশাল বিশাল পুরোনো গাছ, তাদের বাঁকা ডালপালা এত নিচু হয়ে নেমে এসেছে যেন পুরো জায়গাটাকে আড়াল করে রেখেছে বাইরের দুনিয়া থেকে।

নদীর ডানপাশে সাদা পাথরের তৈরি পুরোনো সিঁড়ি নেমে গেছে জলের ভেতর। সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা উঁচু স্তম্ভ। স্তম্ভগুলোর মাথায় সোনালি কারুকাজ, চারপাশে ছোট ছোট গোলাপি ফুল ফুটে আছে। এই জায়গাটা মহলের নারীদের জন্য। এখানে পুরুষদের আসা সম্পূর্ণ নিষেধ। তাই এদিকটায় সবাই নির্ভয়ে আসে।
সিঁড়ির মাঝামাঝি ধাপে পাশাপাশি বসে আছে মেহেরুন্নেসা আর রত্নপ্রভা। দুজনের হিজাব সিঁড়ির এক কোণে ভাঁজ করে রাখা। চুল খোলা। রত্নপ্রভার চুল সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসেছে, আর মেহেরুন্নেসার ঘণ কালো চুল পিঠ জুড়ে লেগে আছে। তাদের পায়ের কাছে নদীর ঠান্ডা জল এসে ধীরে ধীরে আছড়ে পড়ছে।
রত্নপ্রভা দুহাতে জল তুলে মুখে ছিটাচ্ছে। অথচ মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে বসে আছে। তার দৃষ্টি নদীর জলের দিকে, কিন্তু সে যেন কিছুই দেখছে না।
বারবার গত রাতের কথা মনে পড়ছে তার।
বাইজিদকে সে যেদিন থেকে চিনেছে, সেদিন থেকে মানুষটাকে তার মনে হয়েছে অদ্ভুত কোমল। মেহেরুন্নেসার হাত ধরার সময়ও যে মানুষটা এমনভাবে ধরে যেন সে কাঁচের তৈরি, যে তার চুলে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে কথা বলে, যে সামান্য আঁচড় লাগলেও ব্যথা পায় সেই মানুষটাই গত রাতে কেমন বদলে গিয়েছিল।
তার চোখদুটো ছিল অদ্ভুত। যেন সে ঠিক সামনে তাকিয়ে থাকলেও কিছুই দেখছে না। মুখে কোনো স্বাভাবিকতা ছিল না। মেহেরুন্নেসার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের মধ্যেই নেই। কোনো অজানা রাগ, ভয় বা দুঃস্বপ্ন তাকে গ্রাস করে ফেলেছে।

গত রাতের সেই আচরণে মেহেরুন্নেসা এখনো কেঁপে উঠছে। সে বুঝতেই পারছে না, যে মানুষটা তাকে এত যত্ন করে, সে কীভাবে এমন হয়ে উঠলো। মনে হচ্ছিল বাইজিদ যেন তাকে নয়, অন্য কাউকে দেখছে। অথবা কোনো পুরোনো স্মৃতির মধ্যে হারিয়ে গেছে। মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে নিজের বাহু জড়িয়ে ধরলো। ঠান্ডা সকালের বাতাসেও তার শরীর গরম লাগছে। বুকের ভেতর কেমন ভার হয়ে আছে।
রত্নপ্রভা তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো,
“ কী হয়েছে? এত চুপ করে আছিস কেন? মেহের, গোমরা মুখি কেথাকার সর তো এখান থেকে”
মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু স্বরে বললো,
“আপা, একজন মানুষ হঠাৎ করেই অন্য মানুষ হয়ে যেতে পারে?
রত্নপ্রভা অবাক হয়ে তাকালো তার দিকে। নদীর জলে তখনও সূর্যের আলো চিকচিক করছে, অথচ মেহেরুন্নেসার মুখে যেন সমস্ত আলো নিভে গেছে। প্রভা ঢোক গিলে বলল
“কি হয়েছে বলোতো”

মেহেরুন্নেসা কিছু বলতে যাবে তার আগেই ঝপ করে পানিতে ভারি কিছু পড়লো। দুজনেই চমকে উঠলো। রত্নপ্রভা বুকে হাত দিয়ে তাকাতেই দেখলো, ডুব দিয়ে উঠলো সুনেহেরা। ওদের দুজন কে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে খিলখিল করে হেসে উঠলো। রত্নপ্রভা রেগে বলল
“বড় হচ্ছিস সুনেরা। এমন লম্ফঝম্প করার আগে দু’বার ভাববি। কাল খুব গুরুতর ভাবে আহত হয়ে ফিরলি। আর আজই তোর বাঁদরামো শুরু হয়ে গেলো। সেরে উঠেছিস তুই পুরোপুরি? বজ্জাত মেয়ে কোথাকার”

পানিতে ভিজে সুনেহেরার সোনালি চুল গুলো রক্তজবার ন্যায় লালচে লাগছে। সিড়ি দিয়ে অল্প উপরে উঠে এসে হাঁটু পানিতে সিড়ির ওপর বসলো।
“এই তোমরা গোসল করতে এসেছো নাকি ঘাটে বসে শোক পালন করছো?”

প্রভা মেহেরুন্নেসা কে বলল
“নামো মেহের”

মেহেরুন্নেসা মুখ বেজার করেই বলল
“একটা ঘটি হলে ভালো হতো”

সুনেহেরা ঝপ করে উঠে দাড়ালো পানি থেকে।
“ঘটি দিয়ে কি হবে? এসো তিনজনে সাঁতার কাটি। ও আপা বলো না ভাবি কে”

প্রভা কপাল চাপড়ে বলল
“আমি তো ভুলেই গেছিলাম মেহের যে সাঁতার কাটতে পারে না। ও তো কখনো বাড়ি থেকে বের হয়নি। আর নদী ওদের বাড়ি থেকে বেশ দূরে। পাশের পুকুর ছিলো, তবে আব্বা ওকে কখনো যেতে দিত না”

একজন দাসী কে ডাকতেই সে পিতলের একটা ছোট ঘাগড়ি দিয়ে গেলো। সিঁড়ি তে বসে বসে ঘাগড়ি ভরে পানি তুলে গায়ে ঢালতে লাগলো মেহেরুন্নেসা। প্রভা চন্দনের সাবান পাতলা রেশমি কাপরে লাগিয়ে মেহেরুন্নেসার গায়ে মাখিয়ে দিলো। চন্দনের সুন্দর ঘ্রাণ মেহেরুন্নেসার বড্ড ভালো লাগলো। ফ্যানা হাতে লাগিয়ে নাকের কাছে এনে শুঁকে বলল
“এটা কি আপা? কি সুন্দর ঘ্রাণ”

সুনেহেরা বলল
“এটা হচ্ছে সাবান। ইংরেজি তে এটাকে বলে সোপ অথবা বার। মধ্যপ্রাচ্যের বণিক দের থেকে আনিয়েছে ভাইজান। ওদের দেশের মানুষ এগুলো ব্যাবহার করে”

জমিদার মহলে এসে বহু জিনিস এর সাথে পরিচিত হয়েছে মেহেরুন্নেসা। প্রভা পাতলা কাপড় টায় ফের সাবান লাগিয়ে মেহেরুন্নেসা কে বলল
“চুল সরাও, ঘাড়ের দিকটায় লাগিয়ে দিই”

মেহেরুন্নেসা কে ছোঁয়ার সময় প্রভার মনে হয় এ এক তুলোর পুতুল। কাপড় ঘষা দেওয়া জায়গা গুলো লালচে হয়ে ওঠে। সবশেষে চুল গোলাপ জলে ধুয়ে তারপর গায়ে পানি ঢালতে বলল। প্রভা পানিতে নেমে গেলো। সুনেহেরার সাথে সাঁতার কাটলো। অনেক টা সময় নিয়ে তারা গোসল করছে। এদ দাসী দৌড়ে এসে খবর দিলো
“ছোট বেগম, শাহাজাদা মহলে ফিরেছেন। আপনার খোঁজ করছেন।”

বাইজিদ এর আসার সংবাদে মেহেরুন্নেসার বক্ষপিঞ্জর ভরে উঠলো অভিমানে। চোখ জোড়া টলমল করছে। গতরাতে একটা বারও তার কথা ভাবেনি সে। কতটা কষ্ট দিয়েছে। অভিমানে গাল ফুলিয়ে বসে রইলো। সে যথেষ্ট বুঝদার, স্বামী রাজ্যের দ্বায়িত্ব পালন করে ফিরেছে তার কাছে যাওয়া উচিত। কি লাগবে না লাগবে তার দেখভাল করা তো তার ধর্মের আইন। কিন্তু স্ত্রীর অভিমান ভাঙানোও তো স্বামীর কর্তব্য। দাসী আকুল চোখে তাকিয়ে আছে তার উত্তরের অপেক্ষায়। মেহেরুন্নেসা বিষন্ন গলায় বলল
“গিয়ে বলো আমি ব্যাস্ত। যেতে পারবো না এখন”

প্রভা উঠতে উঠতে বলল
“যাও মেহের। ভাইজান রেগে যাবে”

“যাক রেগে”
কথাটা মুখ ভার করেই বলল মেহেরুন্নেসা। প্রভা বুঝলো তাদের মধ্যে কোনো মনোমালিন্য চলে।
“দেখো তুমি না গেলে কিন্তু ভাইজান পরে আমাকে বকবে। কারণ আমি তোমায় এখানে নিয়ে এসেছি। যাও মেহের, যাওওও”

মেহেরুন্নেসা গোমরা মুখে বলল
“পোষাক তো আনিনি। ভেজা গায়েই যাবো নাকি?”

“আমি আনাচ্ছি পোষাক”

প্রভা উঠে গেলে সুনেহেরাও উঠলো পিছুপিছু। মেহেরুন্নেসা একা একা বসে রইলো পানিতে ডোবা সিঁড়িটাতে। বেশ কিছুটা সময় যাওয়ার পরেও তার পোষাক এলো না। মেহেরুন্নেসা উঠে যাবে এমন সময় দেখলো ঘাটের সিঁড়ির অপরপ্রান্তে গাছের ডালপালা পরে আছে যেখানে, সেখানে কোনো সুরঙ্গের মতো। আরো ভালো করে খেয়াল করলো সে। বাতাসে ডাল পালা নড়ে উঠলে একটু একটু দেখা যায় সুড়ঙ্গের মুখ। মেহেরুন্নেসার কপাল কুচকে আসে। ঘাটের পাড়ে এমন গোপন সুড়ঙ্গ পথ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? গিয়ে দেখতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। সিড়ি ডিঙিয়ে অপর পাশে যেতে উদ্যত হলেই পিছন থেকে শোনা যায় বাইজিদ এর গম্ভীর গলা।
“নূর!”

চমকে ওঠে মেহেরুন্নেসা। পিছনে ফিরতেই দেখে বাইজিদ চোয়াল শক্ত করে এদিকেই তাকিয়ে আছে। বাইজিদ কে দেখা মাত্রই মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে ফেলল। বাইজিদ চোখ সরু করে বলল
“আজকাল খুব জেদি হয়ে যাচ্ছো”

মেহেরুন্নেসা জবাব দিলো না। বাইজিদ এগিয়ে এসে বলল
“ভেজা শরীরে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছো কেন? ঠান্ডা লাগাবে?”

তাতেও জবাব দিলো না মেহেরুন্নেসা। এখন এসেছে দরদ দেখাতে। বাইজিদ কোমরে হাত দিয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে ফোস করে শ্বাস ছাড়লো।
“যাবে?! আমি কিন্তু ভীষণ ক্লান্ত”

মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করেই বলল
“যাচ্ছি। আপনি যান”
“আমার সাথে চলো”

“আপনি…..”

“আমার সাথে যেতে বলছি না?”
বাইজিদ এর ধমকে কেপে উঠলো মেহেরুন্নেসা। অভিমানের পাল্লাটা আরো ভারি হলো খানিকটা। ঠোঁট ভেঙে কান্না আসছে। কোনো রকমে তা আটকালো। ছোট ছোট পায়ে বাইজিদ এর আগে আগে হাঁটতে লাগলো। কষ্ট হলেও একটুও হাঁটা থামালো না। সোজা কক্ষে গিয়ে পোষাক নিয়ে চলে গেলো গোসল খানায়। পোষাক পাল্টে চুল মুছতে মুছতে বের হলো। বাইজিদ বড় কাঠের টেবিল টাতে কিছু নথি নিয়ে বসেছে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু ভাবছে। মেহেরুন্নেসার দিকে না তাকিয়েই বলল
“নাশতা প্রস্তুত আছে। খেয়ে নাও। তারপর তোমার সাথে দরকারি কথা আছে আমার”

মেহেরুন্নেসা ভাবনায় পরে যায়। না জানি কি বলবে বাইজিদ। গুটি গুটি পায়ে টেবিলে গিয়ে বসে। অল্প একটু খেয়েই উঠে যায়। মেহেরুন্নেসার খাওয়া শেষ দেখে বাইজিদ উঠে গিয়ে আরাম কেদারায় বসলো। মেহেরুন্নেসা কে চোখ দিয়ে ইশারা করলো এগিয়ে আসতে। মেহের এগিয়ে যেতেই বলল
“বসো”

একটাই আরাম কেদারা কক্ষে। আশেপাশে অন্য কোনো চেয়ার ও নেই। সোফা টেনে আনবে নাকি সে? কপাল কুচকায় সে। বাইজিদ চোখ বন্ধ রেখেই বলল
“কোলে বসো”

বাইজিদ তখনো চোখ বন্ধ করে মাথাটা কেদারার পিঠে ঠেকিয়ে রেখেছে। মুখটা ক্লান্ত। চোখের নিচে কালচে ছাপ। গত রাতের ক্ষতগুলোর জন্য হয়তো এখনো ব্যথা করছে। তবু তার কণ্ঠে সেই চিরচেনা আদেশের সুর।
“কি হলো বসো।”
মেহেরুন্নেসার গাল লাল হয়ে উঠলো। এতক্ষণকার অভিমান, রাগ, ভয় সব মিলেমিশে বুকের ভেতর কেমন জট পাকিয়ে আছে। সে ধীরে ধীরে বললো,
“ আমি… এখানে দাঁড়িয়েই শুনছি।”
বাইজিদ এবার চোখ খুললো। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর নিচু গলায় বললো,
“নূর, আমার ধৈর্য আজ খুব কম।”
মেহেরুন্নেসা আর কথা বললো না। ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে এসে খুব সাবধানে কেদারার হাতলে বসতে যাবে, ঠিক তখনই বাইজিদ তার কবজি ধরে এক টানে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। চমকে উঠে মেহেরুন্নেসা তার বুকের উপর হাত রেখে সামলে নিল নিজেকে। বাইজিদের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটলো। কিন্তু সেই হাসিটাও ক্লান্ত।
“এত দূরে সরতে চাচ্ছো কেন?
মেহেরুন্নেসা মুখ ফিরিয়ে নিল। বাইজিদ খুব আস্তে বললো,
“আমার দিকে তাকাও।”
সে তাকালো না। বাইজিদ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,
“সকালবেলা ঘাটে কার অনুমতি নিয়ে গেছিলে?”
মেহেরুন্নেসা থমকে গেল। তার চোখ অনিচ্ছায় বড় হয়ে উঠলো।
“ মিথ্যে বলো না।”
বাইজিদের গলা শান্ত, কিন্তু ভয়ংকর ঠান্ডা। মেহেরুন্নেসা এবার মাথা নিচু করলো। কিছু বললো না। বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। তার আঙুলগুলো কেদারার হাতলে ধীরে ধীরে ঠুকতে লাগলো।
“তোমাকে কতবার বলেছি, যেখানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, সেখানে যাবে না।”
“কেন?”
আচমকাই বলে উঠলো মেহেরুন্নেসা। গলায় অভিমান জমে আছে।
“সবকিছু আমার কাছে লুকিয়ে রাখবেন কেন? আমি কি এতই পর?”
বাইজিদ থেমে গেল।
মেহেরুন্নেসার চোখে এবার জল এসে গেছে।
“গত রাতেও আপনি… আপনি কেমন ছিলেন জানেন? আমার খুব ভয় করছিল। মনে হচ্ছিল আপনি আপনি ছিলেন না। আজ সকালে আবার আমাকে ধমকাচ্ছেন। আমি কী করেছি?”
শেষ কথাটা বলতে বলতেই তার গলা কেঁপে গেল।
কিছুক্ষণ কক্ষে সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে এলো।
তারপর বাইজিদ ধীরে ধীরে হাত তুলে মেহেরুন্নেসার ভেজা চুলের গোছা কানের পেছনে সরিয়ে দিল।
“ নূর… গত রাতের জন্য আমি দুঃখিত।”
মেহেরুন্নেসা হতভম্ব হয়ে তাকালো। এই মানুষটা কখনো ক্ষমা চায় না। বাইজিদ নিচু গলায় বললো,
“আমি তোমাকে ভয় পাইয়ে দিতে চাইনি। আমার… মাথা ঠিক ছিল না।”
সে কথাটা বলেই চোখ সরিয়ে নিল। যেন নিজের দুর্বলতা দেখাতে চাইছে না।
“তোমাকে একটা কথা বলি শোনো”
তার গলা হঠাৎ আবার শক্ত হয়ে উঠলো।
“আমার রাগের সময় কখনো ছলনার আশ্রয় নিবে না। তোমার প্রতি আমি এমনিতেই দুর্বল। যেখানে তোমার ঠোঁটের ভাজ আমার সিদ্ধান্ত নড়িয়ে দিতে সক্ষম। সেখানে আমার ক্রোধের চরম পর্যায়ে তুমি নিজেকে অর্ধনগ্ন করে ধরা দিলে আমার কাছে। আমি বেহুঁশ হয়ে পড়লাম তখন”

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো বাইজিদ
“ ওদিকে তুমি আর কখনো যাবে না।”
“কেন?”
“কারণ আমি মানা করছি।”
“এই উত্তর আমি চাই না।”
বাইজিদ এবার তার দিকে তাকালো। চোখদুটো অদ্ভুত অন্ধকার। মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে বললো,
“আমি অরণ্য শাহ্‌ এর সম্পর্কে জানতে চাই।”
কথাটা শুনেই বাইজিদের শরীর শক্ত হয়ে গেল। তার আঙুলগুলো মেহেরুন্নেসার কোমরের উপর থেকে সরে গেল ধীরে ধীরে। কয়েক মুহূর্ত সে কোনো কথা বললো না।
কক্ষে হঠাৎ অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। বাইরে কোথাও একটা পাখি ডাকলো। তারপর আবার সব চুপ।
বাইজিদ খুব ধীরে মুখ তুললো।
“ এই নাম তুমি কোথায় শুনেছো?”
মেহেরুন্নেসা গলা শুকিয়ে আসলেও চোখ নামালো না।
“শুধু শুনিনি। ছবিও দেখেছি”
বাইজিদের মুখের রঙ বদলে গেল। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো। মেহেরুন্নেসা প্রায় কেদারা থেকে পড়ে যাচ্ছিল। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল।
বাইজিদ কয়েক পা হেঁটে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। পিঠটা তার শক্ত হয়ে আছে। দুহাত মুঠো করে রেখেছে।
মেহেরুন্নেসা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
“উনি কে?”

বাইজিদ আচমকা ঘুরে দাঁড়ালো। তার চোখদুটো লালচে, মুখে এমন এক তীব্রতা যা দেখে মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো।
“সবকিছু জানার প্রয়োজন নেই, নূর!”
মেহেরুন্নেসা চুপ করে গেল। কিন্তু আজ তার ভেতরেও যেন একরকম জেদ জন্মেছে।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“প্রয়োজন আছে। কারণ এই মহলে সবাই কোনো না কোনো বিষয়ে রহস্য জমিয়ে আছে। এমনকি আপনিও, আপনিও কথা লুকান। বড় বেগম লুকান। এই মহলের প্রতিটা দেয়াল যেন কোনো কথা চেপে বসে আছে। আর সেই সব কথার মাঝে বারবার একটা নামই ফিরে আসে। অরণ্য শাহ্‌। আর একটা জায়গা উত্তরের প্রাসাদ। কি হচ্ছে টা কি জমিদার মহলে?”

বাইজিদ স্থির হয়ে গেল।
অনেকক্ষণ পরে সে খুব নিচু গলায় বললো,
“অরণ্য শাহ্‌ আমার ভাই ছিল।”
মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
বাইজিদ জানালার দিকে তাকিয়েই বললো,
“নিজের ভাই। আমার ছোট্ট ভাইটা। সবাই ভাবত সে বখাটে, অকর্মা, নেশাগ্রস্ত। সবাই তাকে তাচ্ছিল্য করতো। আব্বাজান, আম্মিজান, পুরো মহল… সবাই।
তার ঠোঁটে অদ্ভুত এক তিক্ত হাসি ফুটলো।
“কেবল আমি ছিলাম শুধু তার ছায়া।”
মেহেরুন্নেসা চুপচাপ শুনছে।
“অরণ্য খুব সুন্দর ছিল। অতিরিক্ত সুন্দর । সে কারো কষ্ট দেখতে পারতো না। কারো উপর রাগ করতে পারতো না। এই মহলের জন্য সে ঠিক ছিল না।”
বাইজিদের গলা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে।
“ তারপর একদিন সে হারিয়ে গেল।”
“হারিয়ে গেল মানে?”
“হারিয়ে গেল না। হত্যা করা হলো। তার নিজের পিতা তাকে মৃত্যুদন্ড দিল”
শেষ কথাটা বলেই বাইজিদ ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো। মেহেরুন্নেসার শরীর ঠান্ডা হয়ে এলো।
তার মাথায় এলো প্রভার কথা।
“আচ্ছা আপা তো তাকে ভালোবাসতো। তাহলে আমার ভাইজান এর সাথে….”
ঠিক তখনই বাইরে করিডোরে কারো দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। পরের মুহূর্তেই দরজায় জোরে ধাক্কা পড়লো।
“ শাহজাদা! শাহজাদা! বড় বেগম সাহেবা এখনই আপনাকে ডাকছেন!”
বাইজিদ চোখ খুললো। তার মুখ মুহূর্তেই আবার পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেল। বড় বেগমের নামটা তার কানে বিষের মত ঠেকলো। মেহেরুন্নেসা এগিয়ে আসতেই বাইজিদ বলল
“কোষ থেকে আমার তলোয়ার টা দাও। বহু পুরনো ক্ষততে আজ আবার খোঁচা পড়েছে”

গত পর্বে কিন্তু ৩k পূরণ হয়নি। তবুও গল্প দিলাম আজ। এটায় না হলে কাল সত্যিই দিব না। সারাদিন কারেন্ট থাকে না, গোটা এলাকায় বিদ্যুৎ এর কাজ চলছে। কত কষ্ট করে এত গুলো শব্দ রোজ রোজ লিখি 🙂। তোমরা বার বার আমায় আশাহত করো। 🙃
ইনশাআল্লাহ আগামী পর্বে অনেক কিছু ক্লিয়ার হবে। গল্প হারিয়ে না ফেলো তার জন্য ফলো করে রাখতে পারো পেইজ টা। কেমন হইছে বলিও।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply