Golpo romantic golpo দ্যা ব্ল্যাক মার্ক

দ্যা ব্ল্যাক মার্ক পর্ব ৬


দ্যাব্ল্যাকমার্ক

লেখনীতেআশুও_নিশু

পর্বসংখ্যা_৬

নিহান লিভিংরুমে বসে ল্যাপটপে গভীর মনোযোগে কিছু কাজ করছিল। ঠিক তখনই নিশান ঘরে ঢুকে সোফায় বসল। চারপাশে একবার তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
—“দেখ, তুই সত্যি করে বল, তুই কি মেয়েটাকে পছন্দ করিস?”
নিহান ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।
—“কেন? ওকে নিয়ে তোমার কী সমস্যা?”
নিশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে বলল,
—“আমার কোনো সমস্যা নেই। তুই তো জানিস, নারী মানেই সর্বনাশা… নারী মানেই ছলনাময়ী। তাই জেনেশুনে তুই এই পথে হাঁটছিস—ব্যাপারটা বুঝলাম না, নিহান।”
নিহান অন্যদিকে তাকিয়ে হালকা বাঁকা হাসল। তারপর ধীর স্বরে বলল,
—“আমি যা করছি, আর সামনে যা করব—সব বুঝেশুনেই করব।”
এ কথা বলে সে উঠে দাঁড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে গেল তুবার রুমে।
তুবা তখন বিছানার এক কোণায় বসে ছিল। নিহান গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—“কাল থেকে তুমি ভার্সিটিতে যাবে।”
কথাটা শুনে তুবার মনে হলো যেন মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে। সে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
—“না না, আমি কোথাও যাব না।”
নিহান অবাক হলো। সে জানত মেয়েরা পড়াশোনা করতে চায়—আর এই মেয়েটা কিনা যেতে চাইছে না! সে নরম গলায় বলল,
—“আমি তোমাকে আদেশ করেছি, জিজ্ঞেস করিনি।”
তুবা মনে মনে হিসেব কষতে লাগল—বাড়িতে থাকলে রান্না করতে হবে, আর ভার্সিটিতে গেলে বেঁচে যাবে। রাতে বলবে পড়া আছে, রান্না করা যাবে না। নিজের বুদ্ধিতে সে মৃদু হাসল। তারপর মুখ গম্ভীর করে বলল,
—“আচ্ছা।”
নিহান আবার বিস্মিত হলো। কিছুক্ষণ আগেও যেতে চাইছিল না, এখন আবার রাজি! বিষয়টা বুঝতে না পেরে সে কঠোর স্বরে বলল,
—“কাল আমার সঙ্গে ভার্সিটিতে যাবে। পরের দিন থেকে ড্রাইভার দিয়ে আসবে। আর বেশি কথা বললে গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসিয়ে দেব। স্টুপিড।”
এই বলে সে বেরিয়ে গেল।
নিহান চলে যেতেই তুবা ভেংচি কেটে ফিসফিস করে বলল,
—“শালা বজ্জাতের হাড্ডি, তোর উপর ঠাডা পড়বেই।”


নাহিয়ান আজ অদ্ভুত এক বিষণ্নতায় ভুগছে। সাধারণত এমন অনুভূতি তাকে ছুঁতে পারে না, কিন্তু আজ মনটা ভার হয়ে আছে। অজান্তেই পা তাকে টেনে নিয়ে এল পুরান ঢাকার কবরস্থানে।
একটি কবরের সামনে এসে থামল সে। পাথরের ফলকে লেখা—
❝নাহিদা এহসান চৌধুরী❞
নাহিয়ান ধীরে ঝুঁকে হাত বুলিয়ে দিল নামটার ওপর। চোখ থেকে আচমকা এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে কবরের পাশে বসে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল—
❝আম্মি… আমাকে কেন ছেড়ে গেলে? জানো, তোমার সেই ছোট্ট ছেলেটা কত বড় হয়ে গেছে? সে এখন আর আগের মতো মন খারাপ করে না, কান্নাও করে না। নিজের হাতে ভাত খায়। আম্মি, তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি… খুব। কেউ তো তোমার মতো করে আমাকে ভাত খাইয়ে দেয় না। আম্মি, একটু ভাত খাইয়ে দাও না… একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দাও না। তোমাকে কতদিন দেখি না, আম্মি—একটু কথা বলো না…❞
কিছুক্ষণ পর সে চোখ মুছে নিয়ে ফিসফিস করল,
—“আম্মি, আবার আসব তোমার কাছে। ভাইয়ারা সবাই ভালো আছে, টেনশন করো না।”
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল—নিহান কল করছে।
—“হ্যালো ভাইয়া।”
—“কোথায় তুই?”
—“এই তো, আসতেছি।”
—“গলা এমন শোনাচ্ছে কেন, নাহি? কান্না করছিস?”
নাহিয়ান কেশে নিয়ে বলল,
—“না… না।”
ওপাশ থেকে নিহানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,
—“তাড়াতাড়ি বাসায় আয়। আমি জানি তুই কাঁদছিস।”
কল কেটে নাহিয়ান আবার একবার কবরের দিকে তাকাল।
—“আম্মি, আসি। ভালো থেকো।”
তারপর ধীর পায়ে সে ফিরে চলল।
নাহিয়ান বাসায় ঢুকল,তখন সন্ধ্যার আলো জানালার উপর নরম ছায়া ফেলছে।চারদিন অস্বাভাবিক নিরব।সে ধীরে সুস্থে এহসান বাড়িতে প্রবেশ করল।দেখল লিভিং রুমে নিহান দাড়িয়ে আছে। হাত দুটো বুকে গুঁজে রেখেছে,মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।
—”এত দেরী হলো কেন?”
নাহিয়ান চোখ নামিয়ে বলল,
—”কাজ ছিল।”
নিহান কয়েকমুহুর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরপায়ে সামনে এগিয়ে থুতনিটা আঙুল দিয়ে তুলল।চোখদুটো হালকা লাল বর্ণ ধারণ করেছে।নিহান গলার স্বর নরম করে বলে,
“কবরস্থানে গিয়েছিলি?”
নাহিয়ান চমকে উঠল।উত্তর দিল না।
নিহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
—”মিথ্যা বলার দরকার নেই।আমি তোর ভাই মনে রাখিস।যা ফ্রেশ হয়ে নে তারপর খেতে বসবি দুপুরেও কিছু খাসনি।”

নাহিয়ান ধীরে মাথা নাড়িয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।কয়েক ধাপ উঠে আবার থামল।পেছনে না তাকিয়েয় বলল,
—”ভাইয়া?”
—”হুম?”
—”তোমরা আছো বলেই আমি এতো ভালো থাকি।তোমরা না থাকলে আমার কী যে হতো।”

নিহান কিছু বলল না।শুধু দাঁড়িয়ে রইল। তার শক্ত মুখবায়বের ভেতরে কোথাও এক নীরব কোমলতা জেগে উঠল।

নিহান পেছনে দাঁড়াতে যাচ্ছিল,ঠিক তখনই পেছনে থেকে হালকা কেশে তুবা বলে উঠল,
—”এই যে,মিস্টার রাগী মানুষ।”
নিহান থামল।ঘুরে তাকাতেই দেখল সিড়ির রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে তুবা।মুখে দুষ্টু হাসি।
—”কিছু বলবে?”শীতল গলায় জিজ্ঞেস করল সে।
তুবা নিচে নেমে এল ধীরে ধীরে।—”বলবো তো।কিন্তু আগে একটা প্রশ্ন।”
—”আমি উত্তর দিতে বাধ্য নয়।”
তুবা নিহানের দিকে তাকাল।দুজনের চোখাচোখি হলো।তুবা আস্তে করে বলল,
“আপনি সবসময় এমন রেগে থাকেন কেনো?”
নিহান গম্ভীর স্বরে বলে,
—”তোমার জানার দরকার নেই।”
—”আমার জানার দরকার আছে।”
—”কেন?”
তুবা কাঁধ ঝাকাল।
—”কারণ… আমি এখানে থাকি।”
কথাটা শুনে নিহান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।যেন উত্তর খুজে পায় না।তারপর ধীরে বলল,
—”যেখানে যত কম প্রশ্ন সেখানে তত কম বিপদ।”
তুবা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—”আপনি নিজেকে কী মনে করেন?কোনো মাফিয়া বস?”
নিহান এবার ঝুকে এলো তার দিকে।
—”ধরো তাই।”
তুবার বুক ধক করে উঠল।কিন্তু মুখে স্বাভাবিক ভবা রেখে বলে,
—”আমি ভয় পায় না।”
—”পাবে।”
নিহান হাত বাড়িয়ে তুবার চিবুকটা শক্ত করে ধরল।
—”পাবে হ্যা ঠিকই পাবে।”
তুবার চোখ বড় হয়ে উঠল।নিহান তুবার চিবুক ছেড়ে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।তুবা ফিসফিসিয়ে বলে,
—”লোকটা একদম বিরক্তিকর। বদমাশ একটা।”


অফিসে নিজের কেবিনে বসে আছে নিশান। মনটা বেশ উৎফুল্ল, হবেই বা না কেন? ব্যাবসায় যে লাভে লাভ হচ্ছে।
তাদের তিন ভাইয়ের দেশে আসার প্ল্যান নিশানেরই ছিলো, কাডানার মাটিতে এতো এতো খু’ন কররে এক সময় ঠিকই ধরা পরতে হতো, কিন্তু দেশের মাটিতে ধরা পরার কোন চান্সই নেই। দেশের আইন দিয়ে তাদের খুঁজে পাওয়া এক প্রকার অসম্ভব বইকি।
নিশান ভাবে যেহেতু মন ভালোই আছে সেহেতু রাতে একটা পার্টি রাখা যাক। মজাও হবে আর মালও পাবে। যেই ভাবনা সেই কাজ। সেক্রেটারিকে ডেকে নিশান বলে,

—”আজ রাতে ক্লাবে একটা পার্টি রাখো।”

হাতে একটা লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে বলে,

—”এদের ফোন করে ইনভাইট করো। আর হ্যা একটা সাদা শাড়ি পরে আসিও।”

হাতে ফাইন নিয়ে দাঁড়ানো মেয়েটা হালকা হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। হায় হিলের শব্দ করে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।
মেয়েটার নাম নোভা কম্পানির শুরু থেকেই নিশানের এসিস্টেন্ট, এর একটা কারনও আছে বটে, নোভা খুবই বিশ্বস্ততার সাথে কাজ করে, নিজের কাজ মনে করেই কাজ করে। ভেতরে যা যা হয় তার কিছুটা হলেও নোভা যানে কিন্তু কাউরে বলে না। এইসব কারনেই নোভা নিশানের এতো পছন্দের।
নোভার বাবা নেই শুধুমাত্র এক বৃদ্ধা মা আছে। তার সাথেই থাকে নোভা।

রাতের পার্টিতে নিশান, নাহিয়ান আর নিহানকে বলেইনি। সব সময় এরা তিন ভাই পার্টি করে বেড়ায় তাই এবার আর বলার প্রয়োজন মনে করে না নিশান।
একটা নাইট ক্লাবে নিশান প্রবেশ করতেই তার উপর ফুলের বৃষ্টি পরে। নিশান এক গাল হেসে সামনে অগ্রসর হয়। নোভা একটা ফুলের তোরা দেয় নিশানকে। নিশান নোভার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে।
ধবধবে সাদা জরজেট শাড়ির সাথে টকটকে লাল ব্লাউজ পরেছে। ব্লাউজ পরলেও সেটা স্লিভলেস ব্যকলেস ব্লাউজ। কোমর পর্যন্ত চুল কার্ল করা। মুখে কোনরকম প্রসাধনী নেই শুধু নোড রঙের হালকা শেডের হালকা লিপস্টিক।
পায়ে সব সময়ের মতই উঁচু হিলস্। মুখ ভর্তি হাসি।

নিশান কিছু সময়ের জন্যে থমকে যায়। কিছু পল তার জন্যে যেন সময়কে আকরে ধরে, সব কিছু স্থগিত করে দেয়।
নিশানের ভাবনা ভাঙে নোভার কথায়,

—”কি হলো স্যার চলুন?”

—”কি? ওহ হ্যা চলো চলো।”

নিশান ফুলের বুকে টা আবারও নোভাকে দিয়ে বলে,

—”তোমাকে একেবারে অপ্সরার মত লাগছে অপ্সরা!”

শেষের সম্মধোন টা হয়তো নোভা শুনতে পায় না, তাই জন্যে আবার জিজ্ঞাসা করে,

—”জি স্যার? কিছু বললেন?”

—”উহু.. চলো। “

নোভা আর মাথা ঘামায় না সে সবে। নিশান ষ্টেজে উঠে বলে,

—”হেই লেডিস এন্ড জেন্টালম্যান। আজ আমি আপনাদের জন্যে এই ছোট্ট পার্টি অর্গানাইজ করেছি, আপনাদের যেভাবে মন চায় সেভাবেই মজা, আনন্দ করুন। থ্যাংকস ফোর এক্সেপ্ট মাই ইনভেটিশন।”

নিশানের কথা শেষ হতেই নানার রঙের উজ্জল বাতি সাথে চারিপাশে গান বেজে উঠে,

Tere liye aaya hai..
ow mene hi bulaya hai
dj and dimand hai
jo popular poorah..”

নিশান ষ্টেজ থেকে নেমে বারের দিকে যায়। হাতে একটা ডিংক্সের গ্লাস নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে হাত নাচিয়ে নাচিয়ে নাচতে থাকা নোভার দিকে তাকিয়ে থাকে।
আজ যেন নোভার দিক থেকে নিশানের চোখ সরছেই না। সেই দিকে তাকিয়ে থেকেই নিশান হাতে থাকা গ্লাসের সবটুকু ডিংক্স পান করে নেয়।
আবার হাতে নেয় আরেক গ্লাস। পরপর কয়েক গ্লাস পান করার পরে নোভা নিশানের দিকে তাকায়। নোভার হরিনের মত ডাগর ডাগর চোখের সাথে নিশানের নেশালো রক্তিম চোখের মিলনে কেটে যায় কিছু পর সময়।
নিশানের অবস্থা নোভার কাছে ভালো মনে হলো না তাই সে নাচ রেখে আসতে লাগলে এক মধ্যোবয়স্ক লোক নোভার হাত ধরে বলে,

—”কই যাও ডার্লিং? “

নোভা বিরক্ত হয়ে হাত ছাড়িয়ে নিশানের দিকে আসতে লাগে। নিশান নোভার দিকে তাকিয়েই হাতে থাকা গ্লাসটা জোরে চাপ দিয়ে ভেঙে ফেলে। বিরবির করে আওড়ায়,

—”জীবনের প্রথম কোন পুরুষ আমার হাতে খু’ন হতে যাচ্ছে।”

চলবে_ইনশাআল্লাহ

(১কে রিয়েক্ট হলেই পরবর্তী পর্ব চলে আসবে ইনশাআল্লাহ💙)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply