ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ পর্ব ১৬
লেখনীতে_সাদিয়া
পর্ব_১৬
সকাল ১০ টা।
আজ খান বাড়িটা একটু শান্ত হয়ে আছে। কারণে বাড়ির সব বাচ্চারা গিয়েছে স্কুল কলেজে। রাহার শরীর এখন মোটামুটি ভালো। জাহানারা বেগম বলেছিলেন ওকে স্কুলে যেতে। কিন্তু পড়াচোর রাহা ভুংভাং মাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আজ তার পছন্দের পাকিস্তানি সিরিজের শেষ পর্ব আপলোড হবে ইউটিউবে। এতদিন একেকটা পর্ব দেখেছে শেষটা আরাম আয়েশে না দেখলে এতগুলি দিন বৃথা যাবে না?
জাহানারা বেগম রাগ করে চিল্লাচিল্লি করেছে, “আমি কিছু জানি না। বাড়িতে তো তোর জম আছেই। সে যখন জিজ্ঞেস করবে তার সামনে ভং ধরিস ফাঁকিবাজ মেয়ে।”
রাহা বেশ বুঝেছে মা কার কথা বলছে। মা চলে যেতেই ফাঁকা রুমে রাহা বিরক্তির সাথে বলে ওঠে, “এ্যা, বললেই হলো। ওই গন্ডারটা কি আমাকে খাওয়ায় না পড়ায়? ওর কথা আমি শুনতে যাবো কেন? কে সে? যে তাকে নমো নমো করে চলতে হবে আমার। পুরো আস্তো খাডাস একটা লোক।”
লিভিং রুমে টিভির সামনে বসে আছে রাহা। হাতে তার চিপস। সোফাতেও আরো কয়েকটা প্যাকেট পড়ে আছে। সব চিপস, চানাচুর, কয়েকটা ললিপপ আর ক্রিমি বিস্কিটের প্যাকেট। টিভিতে কার্টুনে চোখ ডুবিয়ে দিয়ে আপনমনে চিপস খাচ্ছে।
এমন সময় বাসায় প্রবেশ করলো শারহান। রাহা টিভিতে মগ্ন। তার আশেপাশে তাকানোর সময় নেই। শারহান নরম সুরে গলা কেশে বলল,
“এক্সকিউস মি, বাড়িতে কেউ নেই?”
রাহা অনড় চোখে টিভিতে তাকিয়ে হাতে থাকা কয়েকটা চিপস এক সঙ্গে মুখে নিলো। মুখ ভর্তি খাবার নিয়েই অস্পষ্ট সুরে হাতের ইশারা দিয়ে দেখিয়ে বলল,
“আছে। উপরে, রান্নাঘরে, আর গন্ডার আছে গন্ডারের রুমে।”
রাহার অবস্থা দেখে শারহান থ হয়ে গেলো। কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল কেমন করে রাহার পানে। ভিহান শেষে এই বাচ্চা মেয়ের প্রেমে পড়েছে? এমন অবুঝ পিচ্চি একটা মেয়ের কাছে আটকে গেলো ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ খান? ওর মতো দায়িত্ববান, ডিসিপ্লিন খুঁতখুঁতে একটা লোক শেষেমেষ ইমম্যাচিউর একটা মেয়েকে পছন্দ করে বসল? আর গন্ডার? গন্ডার কে? কোনো ভাবে কি কথাটা… ভাবতেই চোখ দুটি বড় হয়ে এলো শারহানের। আচমকা মুখ থেকে অস্ফুট স্বরে বের হয়ে এলো?
“হোয়াট?”
রাহা চিপস খেতে খেতে বেখেয়ালি ভাবেই তাকালো ঘাড় বাঁকিয়ে। ভিহান ভাই এর সেই বন্ধুটাকে এমন চোখ মুখ কুঁচকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাহারও কপাল কুঁচকে এলো। পরক্ষণে বিষয়টা অনুধাবন করে জিহ্ব কাটলো সে। মনে পড়ল কাল তো ভিহান ভাই ম্যাসেজ করে বলেছিলো,
“কাল আমার ফ্রেন্ড শারহান আসবে। তোকে যেন নিচে ঘুরঘুর করতে না দেখি। ভুলেও নিজের ঘর থেকে কাল বের হওয়ার চেষ্টা করিস না কিন্তু স্টুপিড।”
দ্রুত চিপস রেখে ওঠে দাঁড়ালো মেয়েটা। ভদ্রতাসুলভ মুচকি হেসে সালাম দিলো। শারহান ভ্রমের মধ্যে গলে থাকা যন্ত্রের মতো তার উত্তর নিলো।
“আপনি শারহান ভাই তাই না?”
“হ্যাঁ।”
রাহা চিপসের প্যাকেট গুলি সরিয়ে দিয়ে হেসে হেসে বলল, “বসুন না ভাইয়া।”
শারহান কোনো কথা বলতে পারলো না। সে যেন একদম বোকা বনে গেলো। প্রতিক্রিয়াহীন ভাবেই বসল সোফায়। এমন সময় রান্নাঘর থেকে এগিয়ে এলেন জাহানারা বেগম,
“কিরে কার সাথে কথা বলিস?”
বলে তাকালেন পাশে। সঙ্গেসঙ্গে শারহান হাসিমুখে সালাম দিলো। জাহানারা বেগম চিনলেন তাকে। তাই বসতে বলে তিনি ডাক দিতে গেলেন আফসানা বেগম কে। রাহাও হাসিহাসি মুখে শারহান কে বসতে বলল। ওর হাসি মাখা মুখ দেখে শারহান থ হয়ে গেলো। মেয়েটা আসলেই মারাত্মক কিউট। একটা বেবি বেবি ভাব থাকলেও দেখতে ভয়ংকর সুন্দরী। ভিহান কি এই কারণেই এই মেয়েটার জন্যে এত টক্সিক হয়েছে?
একজনের কড়া নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাহা আরাম করে শারহানের সাথে কথাবার্তা বলতে লাগল ওই সোফাতেই বসে। শারহানও ওর সাথে কথা বলতে বলতে চিন্তা করতে লাগল, মেয়েটা একদম সহজ সরল। একটু বাচ্চা স্বভাবের তবে বেশ কিউট আর মিশুক।
আফসানা বেগম নাস্তা দিয়ে গিয়েছেন। সে গুলি খাওয়ার ফাঁকে কথা বলতে বলতে হঠাৎ শারহানের নজর গেলো দুইতলার দিকে। করিডোরের রেলিং ধরে কেমন বিক্ষিপ্ত ভাবে জ্বলন্ত চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। হাসতে হাসতে প্রিয় বন্ধুর এমন ভয়ংকর হিংস্র রূপ থেকে আঁতকে ওঠে ছেলেটা। চমকে গিয়ে কেঁপেও ওঠল নির্দোষ শারহান। ভীতু চোখে আগুন লাল ভিহানের মুখের দিকে অসহায় ফেস করে তাকিয়ে রইল। যেন তার করুণ চাউনি আর চোখমুখ বলতে চাইছে,
“বিশ্বাস কর ভাই, আমি নির্দোষ কচি বাচ্চা। তোর ব্যক্তিগত মানুষটাই আমার সাথে গপ্পো জুড়েছে, আমার কোনো দোষ নাই মাইরি। মারিস না ভাই।”
শারহান কে মুখে তালা দিতে দেখে আচমকা রাহাও তাকায় উপরের দিকে। ভিহান ভাই কে আক্রোশের সাথে কটমট করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আঁতকে ওঠল সেও। ভিহান ভাই এর লাভার মতো ফুটতে থাকা চোখ গুলি দেখেই ঘাবড়ে গেলো রাহার কোমল তনু। ভয়ে শিরশির করল শরীরটাও। এই রে, গন্ডারটার আবার কি হলো? নিশ্চয়ই কথা শুনেনি বলে রেগে টগবগ করছে। এখন কি মারতে আসবে নাকি? ভয়ে হেঁচকি ওঠে গেলো ওর। কিছু বলবে তার আগেই বলে ওঠল ভিহান,
“তোকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবো ইডিয়েট।”
গলা শুকিয়ে কাঠ রাহার। পারে না পাখির মতো উড়াল দিয়ে বজ্জাৎ খাডাস লোকটার সামনে থেকে চলে যেতে। শুকনো ঢোক গিলল। মৃদু কম্পিত শরীর টা নিয়ে থেমে থেমে বলল,
“ও..ওই আ..আমার ডোরাটা বাগানে চলে গ..গিয়েছে। এত পা..পাজি হয়েছে কথাই শুনে না। ডোরা, মা..মাম্মাম কোথায়ই তুই? আমার সোনাবাচ্চা।”
বলতে বলতে ভিহান ভাই এর দিকে চোরাচোখে তাকাতে তাকাতে এক দৌড়ে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেলো। শারহান হতভম্বের মতো দেখল বিষয়টা। ওকে হ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে ভিহান ঝলসানো চোখে তাকিয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে বলল,
“এন্ড ইউ বাস্টার্ড, কাম টু মাই রুম।”
ভিহানের অবয়ব দেখে শারহানও ভয় পেলো। ঢোকও গিলল ভীষণ অসহায় ভাবে। পরক্ষণে দেখল ভিহান হাতের মুঠো শক্ত করে ক্ষিপ্ত ভঙ্গিমায় দাঁত কটমট করে বলল, “রুমে আয় শুধু তুই।”
শারহানের অবস্থা নাজেহাল হলো। চোখমুখে ভীতু ভাব উপছে পড়তে লাগলো। যেন পানিতে কুমির ঠাঙ্গায় বাঘের অবস্থা। দরকারে বাঘের রুমে যেতেই হবে। আবার গেলে আজ যে ওই ভিহান তার বারোটা বাজাবে তাতে তার বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ নেই। অসহায় ফকিরের মতো তাকিয়ে রইল সে ভিহানের দিকে। যেন বলতে চাইছে, “এবারের মতো মাফ ভিক্ষা দে বাপ!”
ভিহান হিংস্র খেপাটে চাউনিটা ছুড়ে দিয়েই নিজের ঘরের দিকে ছুটল। শারহান আশেপাশে তাকিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করলো। তখনি দেখতে পেলো রাহা মেইন দরজার ভেতরে গলা ঢুকিয়ে উঁকিঝুঁকি করছে বিড়ালের মতো। ভিহানের ভয়েই বোধহয় মেয়েটা ভেতরে ঢুকতে পারছে না। ভিহানের সাথে এই মেয়ের কেমনে কি? এই বাচ্চা মেয়েকে তো ওই রগচটা ভিহান আতঙ্ক দিয়েই মেরে ফেলবে। আদর করবে কখন?
ভয় ভয় নিয়ে শারহান ভিহানের ঘরে ঢুকতেই কোথা থেকে চিলের মতো এসে ছু মেরে ওর কলার ধরে নিলো ভিহান। লাভার মতো টগবগ করে ফুটতে থাকা চোখের দিকে তাকাতেই শারহান জমে গেলো। ক্রোধে হিসহিস করা ওর ধ্বনি শুনে আতঙ্কে ঢোক গিলল শারহান।
“ভা..ভাই আমার ধর্মের ভাই তুই। বিশ্বাস কর তোর কলিজার টুকরার দিকে আমি তাকাই নাই। ভোলা ভালা নিষ্পাপ মানুষ আমি। আমারে তোর টুনটুনি পাখিটাই ফাঁসাইয়া দিছে। হেয়ই আমার সাথে গপ্পোয় লাগছে। নাদান বাচ্চা আমি আর কি করমু কো? দুইটা কথার অপরাধে এত বড় আসামি আমারে বানাইস না। কিছু করিস না ভাই, মাফ কইরা দে আমারে।”
রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছে ভিহানের। দাঁতে দাঁত চিবিয়ে হিসহিস করে বলে,
“হারামির বাচ্চা, কাল ওয়ার্ন করেছিলাম না ওর দিকে তাকাবি না। আর তুই সোজা কথা শুরু করেছিস বাস্টার্ড? ইচ্ছা হচ্ছে তোর কন্ঠ একে বারে চেঁপে ধরে নিশ্বাসটাই বন্ধ করে দেই।”
শারহান কেঁপে ওঠে। মনেমনে ভাবে সামান্য একটা মেয়ের জন্যে তার বন্ধু ঠিক কতটা অবসেশন হলে এমন বেপরোয়া হতে পারে? কোন লেভেলের উন্মাদ হলে কথা বলার অপরাধে গলা চেঁপে ধরতে চায় তাও আবার নিজের বন্ধুর?
শারহানের মুখের কথা হারিয়ে যায়। দেখতে পায় ভিহান রাগান্বিত হয়ে একের পর এক নিশ্বাস নিচ্ছে। দেখে বুঝায় যাচ্ছে ও স্বাভাবিক নেই। বড্ড অস্বাভাবিক ওর আচরণ। শারহান শান্ত কন্ঠে বলল,
“রিলাক্স ইয়ার। তুই শান্ত হো। আমি জাস্ট ওর সাথে কথা বলেছি এটা নরমাল তুই হাইপার হচ্ছিস কেন?”
“রাস্কেল কোথাকার, ও শুধু আমার। তুই কথাই কেন বলতে যাবি?”
এই মুহূর্তে শারহান নিজের উত্তর হারিয়ে ফেললো। কি জবাব দিবে বুঝল না। তার বন্ধু ওর হাটুর বয়সী বাচ্চা মেয়েটা মেয়ের জন্যে এতটা ডেস্পারেট তা তো কখনো কল্পনাও করেনি সে।
“তাহলে বলতে চাইছিস ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদও বাচ্চা একটা মেয়ের জন্যে একেবারে ক্রেজি?”
“ওর জন্যে আমি শুধু উন্মাদ না হিংস্রও হতে পারি।”
ক্ষিপ্ত গলাতেই বলল ভিহান। একটু থেমে বলল আবারও, “ওর দিকে কেউ তাকালেও হিংসেয় আমার শরীর পুড়ে যাওয়া দগ্ধের মতো জ্বলে যায়।” সাপের মতো হিসহিস করে ভিহান, “তুনরা খান রাহা কেবল আমার। ও আগাগোড়া সবটাই আমি ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ খানের। শুনেছিস তুই?”
“শুনেছি ভাই। কিন্তু তার জন্যে কি আমাকে মেরে ফেলবি? গলায় ভীষণ ব্যথা পাচ্ছি।”
ভিহান কটমট করে আরেকটু চেঁপে ধরে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে এরপর ছাড়ল। ফোঁস করে দম নিয়ে বলল শারহান,
“ভাই তুই ওর জন্যে এতটা ডেস্পারেট আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না।”
“হারামির বাচ্চা, তোকে ভাবতে বলেছে কোন শালা? ওকে তুই কল্পনাতেও আনবি না। ওকে তুই ভাববি এই কতাটাও ভাবতে যাস না।”
বোকা হয়ে গেলো শারহান। কিসের মাঝে কি ঢুকাচ্ছে এই ছেলে?
“আরে ইয়ার আমি তো কেবল…”
“শাট আপ শারহান। মেজাজ চড়ে গিয়েছে ওকে নিয়ে একটা কথাও বলবি না তুই। আমি এখন তোকে জাস্ট খু’ন করে ফেলবো।”
“যা বাব্বাহ আমি কি করলাম? আমার উপর এত চটেছিস কেন?”
“ইউ বাস্টার্ড, ওকে তোর পছন্দ হয়েছে এটাই কি আমার তোর উপর ক্ষিপ্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ নয়?”
শারহান আজব হয়ে গেলো। হাবলার মতো তাকিয়ে রইল ড্যাবড্যাব করে। ভিহান বলল এবার, “আর হারামজাদার বাচ্চা, ব্লাডি ফুল তুই সেটা আমার সামনে স্বীকারও করেছিস।”
শ্লথ কন্ঠে বলল শারহান, “তো আমি কি জানতাম নাকি ওরে তুই আগে থাইকাই মনের ভেতর ঢুকাইয়া রাখছোস? আমি তো সরল মনে সত্যি কথাটাই বল…”
বাকি কথা আর বলতে পারলো না শারহান। তার আগেই ভিহান কে খেপাটে ষাঁড়ের মতো এগিয়ে আসতে দেখে এক দৌড়ে দরজার কাছে চলে গেলো।
আতঙ্কিত স্বরে বলল, “মারিস না ভাই। ভুল হয়ে গিয়েছে। কান ধরেছি কসম করেছি এই জীবন থাকতে তোর টুনটুনি পাখি কলিজার টুকরা তোর বাচ্চা প্রেয়সীর দিকে ভুল নজরে তাকাবো না।”
“ভুল আর সঠিক কি রে হারামির বাচ্চা। আবার ওকে তোর সামনে দেখলো তোর চোখ দুটি উপড়ে ফেলবো না আমি? ঘাড় টা একদম ভেঙ্গে দিবো যেন মাথাই না তুলতে পারিস।”
“ভাই রে ভাই। তোর মতো চাচাতো বোনের প্রতি এতটা ডেস্পারেট হতে আমি কাউকে দেখিনি। শালা তুই একটা জিনিস। বিয়ে হলে মনে হয় ওরে নিজের কলিজায় ঢুকিয়ে চলাফেরা করবি।”
“বিয়ে করলে মানে কি? আমি ভিহান সব তছনছ করে হলেও ওকে বিয়ে করবোই। হলেটলের প্রশ্নই আসে না। হবেই।”
বলতে বলতে ভিহান ওয়াশরুমের দিকে যেতে লাগল।
শারহান টিপ্পনী গলায় মৃদু স্বরে বলে ওঠল, “ভাই বাসর ঘরের দরজা জানলা কয় মাস পরে খুলবি?”
ভিহান হয়তো জবাব দিয়েছে ফিসফিস করে শারহান স্পষ্ট সেটা শুনতে পেলো না। কিন্তু তার মনে হলো ভিহান বলেছে, “আজীবন।”
রাহা লতিফা বেগমের পায়ের কাছে বসে আছে। উনি ছর্তা দিয়ে সুপারি কাটছেন। রাহা দুই গালে হাত দিয়ে দাদীর পায়ের কাছে টুলে বসে আছে। তবুও চঞ্চল রাহা স্থির নেই, পা দুটো অনবরত নাড়িয়েই চলছে। মনোযোগ দিয়ে দেখছে সুপারি কাটার দৃশ্য। হঠাৎ বলে ওঠল,
“দাদী আমাকে দাও। আমি কেটে দিচ্ছি।”
“না দাদাুমনি।”
“আরে দাও না। তুমি বুড়ি মানুষ আমি এত তরতাজা তোমার একটা নাতনি বসে থাকতে তুমি কাটছো এটা তো মানা যায় না বলো। আমার কাছে দাও।”
রাহা হাত বাড়িয়ে সেটা নিতে গেলে লতিফা বেগম সরিয়ে নেন।
“আমার কোনো শখ নেই তোমার বাপ চাচার বকা শুনার। তার উপর বাড়িতে আছে আরেক নবাব আমাকে কথার উপর ভাসিয়ে দিবে। আমার সুপারি কাটতে গিয়ে তোমার হাত কাটার কোনো দরকার নেই দাদু।”
রাহা মুখটা গোমরা করে বসে রইল। আড়চোখে তা দেখে বললেন লতিফা বেগম, “মন খারাপ?”
“না।”
“ভিহান দাদুভাই কোথায় আছে?”
“আশ্চর্য ওই গন্ডার কোথায় আছে আমি কি বলবো?”
“রাহা দাদাুমনি..”
“তা নয়তো কি? সে তো একটা গন্ডারই। আস্তো একটা জাঁদরেল। সবসময় আমার উপর মাত্তাবরি করে। সে কি আমার অভিভাবক নাকি?”
“অবশ্যই।”
“এ্যা, মানি না আমি উনাকে অভিভাবক। বললেই হলো নাকি? আমার বাবা মা নেই? ওরা থাকতে উনি কেন আমাকে আদেশ করবে? সব কিছুতে জোর করবে?”
“কারণ সে তোমার সর্বোচ্চ ভালো চায়। তোমার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ।”
“আপন না তো ছাই। আপন হলে কি বকাবকি করতো? সবসময় আদর করতো।”
লতিফা বেগম তাকালেন নাতনির মুখের দিকে। মুখ ফস্কে বলা কথাটায় রাহাও চমকে গেলো। আয়হায় কি বলে ফেলল এটা? সঙ্গেসঙ্গে দুই হাত চেঁপে ধরল নিজের মুখে। দাদীর ঠোঁট টিপা হাসি দেখে বেশ লজ্জা পেলো মেয়েটা।
রসিকতার সুরে বলল দাদী, “তা কেমনে তোরে আদর করতো লা আহ্লাদী?”
লজ্জায় তুলতুলে গাল দুটি তার লাল হয়ে গেলো।
“বুড়ি বাড়াবাড়ি করো না। আ..আমি তো বলতে চাইছিলাম ভা..ভালো ব্যবহার করতো। এই আরকি।”
হাঁসফাঁস করলো মেয়েটা। লতিফা বেগম আরেকটু খুঁচাতে বললেন, “ও আমি তো আরো ভাবলাম এই আদর মনে হয় অন্য আদর। ওই যে ঘরের ভেতর..”
“বুড়ি তুমি নষ্ট হয়ে গিয়েছো। তুমি একটা খারাপ বুড়ি। উনি আমার চাচাতো ভাই লাগে।”
“তাতে কি? আপন ভাই তো আর নয়।”
উনার এই কথাটা একেবারে থ বানিয়ে দিলো রাহা কে। মূর্তির মতো প্রায় বসে রইল মেয়েটা। দাদী কি বলতে চাইলো? ভাবনা গুলিও যেন তার থেমে গিয়েছে।
লতিফা বেগম আরেকটা আস্তো শুকনো সুপারি ধারালো ছর্তার মাঝে দিয়ে চাঁপ দিলেন। গ্যাচাং করে শব্দ হয়ে সুপারি টা দুই ভাগ হয়ে গেলো। সেটা আবার ঘুরিয়ে ছর্তার মাঝখানে রেখে টুকরো টুকরো করতে করতে তাকিয়ে দেখলেন থম মেরে বসে থাকা নাতনির মুখের দিকে। যেন উনার কথাটাই তার ভাবনা থামিয়ে দিয়ে এভাবে তাকে চুপ করিয়ে দিয়েছে। চালাক মহিলা বাঁকা ঠোঁটে হাসলেন। আরেকটু উস্কে দিতে সুপারি কাটতে কাটতে বললেন,
“চাচাতো খালাতো ভাইবোনের মাঝেও বিয়ে হয়। এই দুনিয়ায় কত মানুষ নিজেদের মাঝে সম্পর্ক করেছে। আপন চালাতো মামাতো ভাই বোনদের মাঝে বিয়েশাদি কত হয়েছে তার কোনো হিসেব আছে? এখন এসব কোনো বিষয় না। আপন চাচাতো মামাতো খালাতো ভাই বোনদের অহরহ বিয়ে হচ্ছে। কেন আমাদের নিজেদের ভেতরও তো এমন দুই তিন টা সম্পর্ক হয়েছে। আমার ভাইপো তার আপন খালাতো বোন কে বিয়ে করেছে। বছর চার এক আগে না দাওয়াত খেলি।”
রাহার মুখের ভাষা হারিয়ে গিয়েছে। অনুভূতি শূন্য পাথরের মতো জমে গিয়েছে। চোখের পাতা গুলিও যেন সামান্য নড়ছে না। তার সমস্ত চিন্তা চেতনা ভাবনা যেন দাদীর একটা কথাতেই গিয়ে আটকেছে, “চাচাতো খালাতো ভাইবোনের মাঝেও বিয়ে হয়।” এ ছাড়া আর দুনিয়ার কোনো চিন্তা ভাবনা কল্পনা বিন্দু পরিমাণ জায়গা পাচ্ছে না তার ছোট্ট মস্তিষ্কে। এই একটা কথা মস্তিষ্ক অনবরত নাড়াচ্ছে। দাদী কি বুঝাতে চাইলো? হঠাৎ এমন কথাই কেন বলল? দূরে কোথাও হয়তো রাহা এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। কোথায় তাকিয়ে আছে নিজেও জানে না। শুধু অপলক কোথাও দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আপনমনে এই কথাটাই ভাবছে। আস্তেআস্তে নিশ্বাসের ঘনত্ব হঠাৎ বেড়ে যাওয়া শুরু করেছে তার। ভেতরটা আবার কেমন অস্থির অস্থির করছে। অশান্তিরা সারা শরীর বোধহয় দখল করে নিতে চাইছে। সর্বনাশ ওই গন্ডারটার কথা ভাবতে বসলেই ভেতরে এত অশান্তি কেন হয়? এত তোলপাড় শুরু হয় কেন ওখানে? কিসের এই ব্যাকুলতা অস্থিরতা আর হাঁসফাঁস?
রাহা অনুভব করলো। নিজ কল্পনায় বোধহয় অনেকদূর এগিয়েও গেলো। চোখের সামনে ভেসে ওঠল সুঠাম দীর্ঘদেহী সদা গম্ভীর তীক্ষ্ণ নজরের সুদর্শন ভিহান ভাই কে। যাকে একবার দেখলে চোখ ফেরানো যায় না। হাজার অস্থিরতা অশান্তি নিয়েও তাকিয়ে থাকা যায়।
লতিফা বেগম ভাবুক নাতনির দিকে তাকিয়ে গলা কাশলেন। তাতেও কাজ হলো না রাহার। তাই শরীর ছুঁয়ে দিয়ে বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বললেন, “তোর পাশে থাকা সুপারির কৌটটা দে আহ্লাদী।”
রাহা থতবত খেলো। খানিক অস্বস্তিতে দমটা আটকে রাখলো কিছুক্ষণ। শরমে দাদীর চোখের দিকে আর চোখ মেলাতে পারছে না। কোনো রকম হাতে কৌটটা তুলে দিলো। লতিফা বেগম নাতনি কে পরোখ করে বুঝলেন কিছু। টুকরো সুপারি গুলি কৌটের ভেতর রাখতে রাখতে বললেন,
“সময়ের কাজ সময় থাকতেই করতে হয়। না হয় হারিয়ে গেলে দুঃখের শেষ থাকে না।”
রাহা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কুঁচকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে ওঠল, “কি” বলে।
লতিফা বেগম জবাব দিলেন না। সুপারির কৌটটা পানের বাটায় রাখতে রাখতে বললেন,
“দাদুমনি তোর মনে আছে ছোটবেলায় পান খাওয়ার জন্যে তুই কি করতি?”
রাহা উত্তর করলো না। কেমন চোখে তাকিয়ে রইল দাদীর পানে। এরপর বললেন তিনি নিজ থেকেই,
“ছোটবেলায় তুই পান খাওয়ার জন্যে অনেক কান্নাকাটি করতি। আমার মুখে পান দেখলেই দৌড়ে চলে আসতি। ঠোঁট গুলি লাল থাকলে আমার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে হা হা করতি মুখ খুলার জন্যে। আমার চিবানো পানই মুখে নিয়ে কুটকুট করে খেতি আর হাসতি। এটা তোর অভ্যাসই হয়ে গিয়েছিলো। প্রতিদিন একটু না একটু আমার মুখ থেকে পান খেতিই। এর জন্যে তোর বাপ চাচা যে কত বকাবকি করলো আমায়। আর ভিহান দাদুভাই? তোর ঠোঁট লাল দেখলেই সে কি বকা। বাড়ি মাথা তুলে নিতো। আমায় ধমকাতো কোন তোকে পান দেই।”
রাহা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে দাদীর মুখের দিকে। খুব মনোযোগ দিয়ে গালে হাত রেখে শুনছে নিজের ছোটবেলার গল্প।
“একদিন বিকেল বেলায় পান নিয়ে বসেছি লুকিয়ে। তবুও তুই আমায় খুঁজে পেয়ে দৌড়ে এলি। কত অনুনয় করে মুখের থেকে পান নিয়ে আনন্দ সহ চিবিয়ে খাচ্ছিলি। তখন তোর বয়স হয়তো ৪ কি ৫ হবে। ঠিক মনে নেই। ভিহান দাদু ভাই স্কুল থেকে এসে দেখল তোর ঠোঁট লাল। কি যে রাগ করলো সেদিন। তোকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখল বাগানে। হাতে একটা ইয়া বড় বাঁশের বেত নিয়ে বসে রইল সে বাগানে রৌদের মাঝে তোকে কান ধরিয়ে রেখে। ভয়ে নাকের পানি চোখের পানি এক করে ফেললি তুই। তবুও সে থামলো না। অনেকক্ষণ ওভাবে কান ধরিয়ে রেখে নিজেই হাত টেনে নিয়ে গেলো ওর রুমে। বাথরুমে নিয়ে গিয়ে নিজের ব্রাশ দিয়ে তোকে দাঁত ব্রাশ করিয়ে দিলো। তোকে জিজ্ঞেস করেছিলো, আর পান খাবি কিনা তুই মাথা নেড়ে কাঁদোকাঁদো মুখে না করেছিলি। এরপরেই না পান খাওয়া ছাড়লি আমার থেকে।”
রাহা ঘোরের মধ্যে চলে গেলো। ভাবনায় ঘটনা গুলির দৃশ্য আঁকতে লাগল। মনে করার চেষ্টা করলো সেটা। আসলেই ওই লোকটা এমন ছিলো? ওই লোক কি ছোটবেলা থেকেই কিছু হতে না হতেই তাকে কান ধরিয়ে রাখতো নাকি? আবার নিজেই যত্ন করতো? একেবারে ছোটবেলা থেকেই কি সে তার উপর জোর খাটাতো?
এমন সময় নিচ থেকে গলা শুনা গেলো ভিহান ভাই এর। বুকটা ধক করে ওঠল রাহার। কি মনে করে চটজলদি করে বসা থেকে ওঠে দাঁড়ালো সে। বারান্দায় এসে দেখল নিচে শারহান নামক লোকটার সাথে কথা বলছে ভিহান ভাই। তার দিকে তাকাতেই বুকটা ছলকে ওঠল। চোখের পাতা নড়লো না। বুকের ভেতর শুরু হলো আবারও ধুরুধুরু অনুভূতি টা। মৃদু অশান্তি আর অস্থিরতা মনের আনাচেকানাচে ঘুরলো। তবুও চোখ সরাতে মন চাইলো না। কেন যেন তাকিয়ে থাকতেই মন চাইল সুন্দর ওই লোকটার দিকে। তার ধারালো চাউনি, শক্ত চোয়াল, কঠিন কন্ঠ সব কিছু যেন তাকে আরো অশান্তি দিলো।
আচমকা ভিহান ঘাড়টা খানিক উঁচু করতেই চোখে চোখ পড়ল রাহার সাথে। বিষাক্ত কোনো তীর বুঝি তীব্র বেগে এসে বিঁধল রাহার বুকের ভেতর। এক মুহূর্তের জন্যে মনে হলো ওই তীক্ষ্ণ চাউনি তার দম বন্ধ করে দিবে। বুকের বা পাশটা এত জোরে লাফাচ্ছে যেন ফেটে একাকার হয়ে যাবে। কি সাংঘাতিক তেজস্বী চাউনি উনার।
অল্প সময় রাহা কে পরোখ করে নিয়ে ভিহান আবারও কথা বলতে লাগল। দুই মিনিট নিজেদের মাঝে কি কথা বলে বেড়িয়ে যেতে লাগল।
“আদর কইরা ডাকমু জান,
কাছে একটু আইয়া যান,
মনের কথা হুইনা যান,
কি জাদুতে মারছেন আমায় বান।”
হঠাৎ এমন গানে থেমে গেলো ভিহানের পা। থামলো পাশে থাকা শারহানও। ভিহান ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো দুইতলার বারান্দার দিকে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাহা হাতে পান নিয়ে তাতে চুন লাগাতে লাগাতে গান ধরেছে। পাশেই লতিফা বেগম বসা। শারহান পুরো তাজ্জব বনে গিয়েছে। থ হয়ে বোকার মতো নিষ্পলক তাকিয়ে।
ভিহান চোখ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে ওর দিকেই। রাহা আড়চোখে ভিহান ভাই কে দেখে হাতের পানটা মুচড়াতে মুচড়াতে আয়েশ নিয়ে আবারও সুর তুলল,
“হাতটা ধরেন না, ভাব নিয়েন না,
কেন চোখের ভাষা বুঝেন না।
জ্বালা দিয়েন না, দূরে যাইয়েন না
মইরা গেলে আমায় খুঁইজা পাইবেন না
ওরে কালাচান তোমার লাগি মন করে আনচান,
ওরে কালাচান একখান বাটার পান খাইয়া যান।”
চলবে….
Share On:
TAGS: ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ, সাদিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২১
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২৪
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ৮
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১১
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩১
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৭
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৪
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২৯
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১৭