ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ
লেখনীতে_সাদিয়া
পর্ব_১৮
১.৬ রিয়েক্ট পূরণ করে দিও পাখিরা। তবে দ্রুত পরের পর্ব আসবে।
নেশা নেশা চোখ নিয়ে ভিহান ভাই কেমন করে যেন অনড় স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভিহান ভাই এর এমন অচেনা অপরিচিত চাউনি হাঁসফাঁস করে দেয় ভেতরটা। ব্যাকুল অস্থির হাওয়া হৃদয় আঙ্গিনায় ঘুরপাক খায়। নিশ্বাস টা আটকে আসতে চায়। অনুভব করে পা দুটি তার কাঁপছে। কন্ঠটা রোধ হয়ে আসতে চাইছে। নিজেকে নিয়ে কিছু সাফাই গাইবে সেই শক্তিটাও পাচ্ছে না। অদ্ভুত! হঠাৎ তার সাথে এমন হচ্ছে কেন? আর ওই অসভ্য পাজি গন্ডারটাই বা কেন এভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে?
ভিহানের চোখেমুখে নেশা উবছে পড়ছে। যেন সে ড্রাংক। এক রাশ ঘোর আর মুগ্ধতায় ডুবে আছে ও। চোখমুখের অবস্থা শোচনীয়। ওই প্রবল আসক্তি মেশানো চাউনি দিয়ে রাহার দিকে চোখ বুলাতে বুলাতে এগিয়ে গেলো। এক হাত দিয়ে শার্টের বোতল খুলতে খুলতে মোহাচ্ছন্ন ভাবেই ভিহান পা বাড়ালো রাহার দিকে।
অবুঝ বোকা রাহার টনক নড়লো। একটু ঘাবড়ালোও। পুরো শরীর নড়ে ওঠল ওর। হকচকিয়ে গিয়ে পা পিছনের দিকে এগিয়ে নিলো। আতঙ্কিত ভীতু কন্ঠে শুধালো,
“ক..কি হয়েছে ভি..ভিহান ভাই?”
ভিহান নেশাময় চাউনি রাহার উপর রেখেই এগিয়ে যেতে যেতে কেমন মাতাল মাতাল কন্ঠে বলল,
“গা।”
কেঁপে ওঠল মেয়েটা। গলা শুকিয়ে এলো ওর। এ কেমন সুরে কথা বলছে মানুষটা? ঠিক আছে নাকি? পিছিয়ে যেতে যেতে কাঁপা গলায় বলল আবারও,
“কি..কিই গাইবো?”
“সকালে যেই গানটা গেয়েছিলি সেটা গা আবারও।”
“ও..ওটা তো একটা গা..গানই ছিলো।”
“গা।”
ঢোক গিলল রাহা। পাগল নাকি এই লোক? আতঙ্কিত ভয় জমানো দৃষ্টি টা একটু নিচে নামাতেই পুরো জমে যাওয়ার অবস্থা ওর। ভিহান ভাই পুরো শার্টের বোতাম খুলে ফেলেছে। লাস্টের শুধু দুইটা বোতাল খোলা বাকি। কালো কালারের শার্টের ফাঁক দিয়ে উনার পেটানো খাঁজকাটা বুকের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে লম্বালম্বি ভাবে। এতেই দমটা আটকে আসতে চাইল ওর। কম্পিত চিকন চিকন কন্ঠে শুধালো মেয়ে,
“আআ…আপনি শার্ট খু…লছেন কেন ভিহান ভা..ভাই?”
“তোকে শরীর দেখাবো। সেদিন হয়তো ভালো করে দেখতে পাসনি আমি কালাচান কিনা।”
“আ..আপনি পা..পাগল নাকি?”
“নো। তোকে আমার পুরো শরীর দেখাবো আজ। তাই শার্ট খুলছি। নুড হতে হবে? প্যান্ট খুলবো?”
বলতে বলতে ভিহান কোমরে প্যান্টের বোতামে হাত রাখতেই রাহা চোখমুখ খিঁচে মৃদু চিৎকার দিয়ে ওঠল। চোখে হাত চেঁপে রেখে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়েছে ও। আস্তাগফিরুল্লাহ, নাউজুবিল্লা। অসভ্য লোকটা কি করতে চাইছে? শার্টের সবগুলো বোতাম খুলে ফেলেছে। এবার কি সত্যি প্যান্টের বোতামও খুলবে নাকি? রাহা থরথর করে কাঁপছে।
ভিহান ঠোঁট কামড়ে হাসলো। ওর এই অবস্থা দেখে খুব আনন্দ পেলো। শ্লথগতিতে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, “আমায় কি ডাকবি যেন বলেছিলি?”
রাহা এবার চোখের উপর থেকে আঙ্গুল কিছুটা ফাঁক করে দেখে নিলো জাঁদরেল গন্ডারটাকে। না অসভ্য খবিশ লোকটা প্যান্ট খুলেনি। দুই কাঁধে শার্টটাও জড়ানো। তবে শার্টের সবগুলি বোতাম খুলা। শার্টের ফাঁক দিয়ে গলা থেকে নাভি পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে সব। অসভ্য লোকটার সেদিকে বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। কিন্তু ওই লোকের উদোম শরীর দেখলেই তো জান যায় যায় অবস্থা।
“সে এগেইন কি ডাকবি বলেছিলি?”
“ক…কি?”
“ডিডন্ট ইউ সে ইউড কল মি জান লাভিংলি?”
গলা কেঁপে ওঠে রাহার। ভিহান ভাই এর হঠাৎ কি হলো? টিভিতে দেখা মানুষের মতো মাল পানি খেলো নাকি গন্ডারটা?
“ও..ও ভিহান ভাই আপনি কা..কাছে আসছেন কেন?”
“তুই আমাকে কাছে আসতে বলেছিস তাই..”
“ক..কখন বললাম..?”
“সকালে।”
“আ..আমি তো গান গাইছিলাম।”
“কাকে দেখে গাইছিলি? কার জন্যে বলছিস মরে যাবি? আমি?”
“ন..না..”
“তাহলে কে? কে ছিলো আর ওখানে? শারহান?”
এগিয়ে আসতে আসতে জিজ্ঞাস করল ভিহান।
“জীবনেও না।”
ভিহান এবার বড় কদম ফেলেই খপ করে চেঁপে ধরল রাহার হাতটা। ধড়ফড়িয়ে ওঠল মেয়েটা। নিশ্বাসটা আটকে রাখলো নিজ গহ্বরেই। নিশ্চল পাথরের মতো তাকিয়ে রইল ভিহান ভাই এর দিকে। ওর স্থির ভাবটা দেখেই ভিহান ভাই হাতটা ছেড়ে দিয়ে কোমর চেঁপে ধরল। এক টানে কিছুটা কাছে নিয়ে এসে গভীর চোখে তাকালো রাহার চোখের দিকে।
এদিকে রাহার প্রাণপাখি টা একেবারে উড়াল দেওয়ার পথে। মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়ে দিয়েছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে ভিহান ভাই এর দিকে। শরীরের মধ্যে যেন কারেন্ট প্রভাবিত হচ্ছে। শিরা উপশিরা গুলি যেন বুদবুদ করে ফুটছে। পুরো শরীর অবশ হয়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছে হাওয়ায় উপর দাঁড়িয়ে আছে সে। কি হলো এটা? কি করছে এই লোক? মানুষটা নিজের সজ্ঞানে আছে?
বুকের ছাতিটায় অক্সিজেনের বড্ড অভাব হচ্ছে। তবুও অবুঝ নিরলস স্থির চাউনি দিয়ে দেখছে ভিহান ভাই কে। লোকটা কি অস্থির ভঙ্গিতে রাহা কে দেখছে? কেমন এলোমেলো দৃষ্টি দিয়ে পুরো মুখ পর্যবেক্ষণ করছে। বারবার চোখের থেকে দৃষ্টি যেন ওর ঠোঁটের উপর গিয়ে নিবদ্ধ হচ্ছে। এমন মনে হচ্ছে কেন তার?
হিসহিস করে বলল ভিহান, “শ্বাস টান ইডিয়েট।”
অথচ তাকে সেটার সুযোগ না দিয়ে পরক্ষণে আরেকটা ভয়ংকর কাজ করে বসল লোকটা। তার কোমরের দুই পাশে শক্ত করে চেঁপে ধরে পাশে রাহার পড়ার টেবিলটার উপরে রাহাকে বসিয়ে দিয়ে ভিহান ঝুঁকল। বাম হাতটা আতঙ্কিত রাহার পাশে টেবিলের উপর রেখে শরীর খানিকটা ঝুঁকে দিলো মেয়েটার উপর। ভীষণ অস্বস্তিতে রাহা শ্বাস টেনে আটকে রাখলো ভেতরে। কি হচ্ছে কেন হচ্ছে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না সে। শুধু মনে হচ্ছে আজ সে মরে যাবে। এই লোক হার্ট অ্যাটাক করিয়ে তাকে মেরে ফেলবে।
ভিহান রাহার দিকে ঝুঁকে ওর চোখের দিকে তাকায়। ঘোরাচ্ছন্ন কন্ঠে শুধায়,
“কি আছে তোর চোখে? কোন ভাষা বুঝি না আমি?”
রাহা উত্তর করবে দূরের কথা এদিকে দম আটকে তার মরে যাওয়ার উপায়। ভেতরে কেউ যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এক রত্তি শান্তি পাচ্ছি না সে। আবার মুখ ফুটে না কিছু বলতে পারছে আর না নিজের অকেজো শরীরটা নাড়াতে পারছে। ঢ্যাবঢ্যাব চোখে কেবল তাকিয়ে দেখছে ভিহান ভাই এর আসক্তি মেশানো নজর।
“কিরে বল, কি আছে তোর চোখে? তোর চোখের ভাষায় কিছু থাকলে সেটা ভিহান বুঝবে না এমনো হয় নাকি?”
“ভি..ভিহান ভাই..”
“হুম বল। শুনছি।”
“আ..আমার কষ্ট হচ্ছে।”
“কষ্ট হচ্ছে?”
রাহা দুই হাত পিছনে ঠেকিয়ে নিজেও কিছুটা পেছনে হেলে রয়েছে। ভিহান ভাই এর দিকে ভ্রু উঁচু করে তাকিয়ে আছে অদ্ভুত চোখে। বোকার মতো উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলো,
“হু।”
“কেন কষ্ট হবে? আমি তো তোর সাথে কষ্ট দেওয়ার মতো এখনো কিছু করলামই না।”
ভিহান ভাই এর ডাবল মিনিং কথার সঠিক মানে বুঝলো না গাধা রাহা। এটা বুঝবে তা ভিহান কোনো কালে আশাও করেনি। আস্তো বলদ কিনা!
“এবার বল আমার জন্যে তোর মন আনচান আনচান করে কেন?”
রাহার ভেতরটা খামছে ধরল কিছু একটা। দাঁতে দাঁত খিঁচে নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করলো সে। সত্যি হৃদয়টা এবার আনচান আনচান করছে। শুকনো গলাটা ভেজানোর চেষ্টা করলো সে ভিহান ভাই এর দিকে তাকিয়ে থেকেই।
ভিহান মন ভরে দেখলো ভয়ে লাল চোখমুখের রাহার। ওর ওই অস্বস্তি মাখা ঘাবড়ানো চোখমুখ ভেতরে আলোড়ন তুলল। তৃপ্তির প্রবাহ বইলো। তবুও বাহির থেকে স্বাভাবিক আছে ছেলেটা। রাহার দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে আচমকা ঠোঁট গোল করে ফু দিলো মেয়েটার মুখের উপর।
একে তো ভিহান ভাই এর শরীর থেকে জেন্টাল মাতাল করা একটা সুঘ্রাণ ভেসে আসছে। তারউপর ওমন উষ্ণ আবহাওয়ায় রাহার নাজুক শরীর শিউড়ে ওঠে। চোখ মুদে ঘাড়টা খানিক বাঁকিয়ে নেয়। এতে ফর্শা দুধে আলতা গলার নিচভাগে লালচে মাঝারি আকারের তিলটা উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে।
মুহূর্তে খেঁই হারায় ছেলেটা। তপ্ত এক ধাক্কা লাগে ভিহানের বুকের ভেতরে। হৃদয়ে খরস্রোতা ঢেউ বইতে থাকে। ধীর সম্পূর্ণ ভিহানের সংযম হারায়। ভেতরটা অধৈর্য হয়। পুরুষালী সত্তা টা হঠাৎ খেপাটে হয়ে ওঠে। সবসময় ধৈর্যের সাথে সব কিছু মেনে নেওয়া কঠিন পুরুষটাও নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হয়। চোখের পলকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে উত্তপ্ত হাওয়া ছড়িয়ে পড়ে সেই সাথে নিশ্বাসের ঘনত্বও বেড়ে ওর যায় প্রবল বেগে। দাঁতে দাঁত চেঁপে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে অবিচলিত ধীর মানুষটা নিজেকে সামলে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে। কিন্তু আজ যেন নিজের সংযম নিয়ন্ত্রণ উন্মাদ হতে চাইছে। ভিহান বেশ বুঝতে পারছে নিজেকে আটকানো তার জন্যে বড্ড কঠিন। মেজাজটা মুহূর্তে নিজের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে গেলো। কটমট করতে করতে হুট করেই রাহার ঘাড়ের পিছনে হাত গলিয়ে ওর চুল গুলি মুঠোয় চেঁপে ধরে। হাতের মুঠটা বুঝি সামান্য জোড়ালোই ছিল। মেয়েটা মৃদু গোঙ্গিয়ে ওঠে। সেই চাঁপা আর্তনাদ খেপাটে ভিহান কে আরো উন্মাদ করে। দাঁত কেটে সে চুলের মুঠো চেঁপে রাখা হাতটা একটু ঘুরিয়ে রাহার মুখটা একেবারে নিজের সন্নিকটে নিয়ে আসে।
মেয়েটা চোখমুখ মুদে রেখেছে। চিকন চিকন ভ্রু দুটি কুঁচকে আছে। আপেলের মতো লাল আভা ছড়ালো তুলতুলে গাল দুটিও জড়সড়। লাল চেরির মতো ঠোঁট দুটি তিরতির করে কাঁপছে। সেই সাথে অবাধ্য অস্থির আর অস্বাভাবিক ভাবে লাফিয়ে যাচ্ছে ভিহানের হৃদপিন্ডটা। সূক্ষ্ম গভীর নজরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ভিহান দেখে চলছে সেসব। বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে দিচ্ছে তার। নিজেকে যথেষ্ট শক্ত করে হিসহিস কন্ঠে মৃদু আওয়াজ তুলে আওড়ালো,
“তুই আমার জন্যে আগুনের মতো রাহা। দূরে থাকলে উত্তাপ দিয়ে জ্বালাস কাছে এলে আমায় একেবারে ঝলসে দিস।”
ভীতু রাহা একবারো তাকায় না। চোখ মুখ খিঁচে রাখে। ভিহান ভাই এর মুঠোয় থাকা চুলে এখন তার একটু টান লাগছে। কিন্তু কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। অস্বস্তিতে নিজেও জমে যাচ্ছে। পাথরের মতো ভিহান ভাই যেভাবে তার ঘাড় ধরে মুখটা উপরে তুলে রেখেছে ঠিক সেভাবেই আছে মেয়েটা।
ভিহান অদ্ভুত মাতাল নজরে দেখল রাহার ভয়ে তিরতির করে কাঁপতে থাকা মোলায়েম ঠোঁট দুটি। ভেতরটা জ্বলে ওঠল ওর। সঙ্গেসঙ্গে বুকের ভেতর হওয়া অধৈর্যের সেই জ্বলুনি তে চোখ দুটি খিঁচে নিলো। এসেছে মেয়েটাকে একটু জ্বালিয়ে শান্তি নিতে। অথচ এই মেয়ে তাকে ঝলসে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে নিজের মাঝে। কি সাংঘাতিক বারুদ!
ভিহান ঝট করে চোখ খুলল। তাকালো থেমে থেমে শ্বাস টানা করুণ ভীতু মুখটায়। সেই মুখের দিকে গভীর নজর রেখে ফিসফিস করে বলে ভিহান,
“আর কত জ্বালাবি আমায়? আর কত ভাবে জ্বালিয়ে একটু শান্তি দিবি?”
ভিহানের গলা ধরে আসে। তার অস্বাভাবিক ভাবে নেওয়া শ্বাস স্বাভাবিক কন্ঠও রোধ করে দেয়। ঢোক গিলে বলে আবারও,
“আর কত দিন আমাকে চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করাবি স্টুপিড?”
ভিহান একটু অপেক্ষা করে। এলোমেলো ভাবে খুব কাছ থেকে দেখে যায় চোখ মুদে রাখা ভারি শ্বাস টানা রাহার মুখটা।
“শুধু জ্বালায় দিয়ে যাচ্ছিস অথচ আমায় শান্ত করার ক্ষমতা এখনো হয়নি তোর।”
ভিহান ভাই এর হাস্কি স্বরে বলা কথার আগামাথা কিছুই বুঝে না রাহা। শুধু নিজের বেসামাল অস্বস্তি টা টের পায়। ভিহান ভাই এর উপস্থিতি, উনার গায়ের মাতাল করা সুঘ্রাণ, গরম নিশ্বাস তারউপর নিজের অবাধ্য চঞ্চল ব্যাকুল অনুভূতি তে মেয়েটা মরণ দ্বারে উপনীত।
ভিহান রাহার ঘাড়ের পিছনে ওর চুল মুঠ কর রাখা হাতটা আরেকটু শক্ত করে। সেই সাথে ওর মুখটা আরেকটু উঁচু করে হিসহিস সুরে বলে,
“তাকা আমার দিকে ইডিয়েট, লুক এট মি।”
অস্থির উচাটনে বুদ হওয়া রাহা সেসব শুনে না। তাকায়ও না। আপন মনে নিজের অস্বস্তি টুক সম্বল করে চুপটি মেরে চোখ বন্ধ করে রাখে। তা দেখে আরেকটু ব্যগ্র হয় ভিহান। চুলের মুঠো চেঁপে রাহার মুখ আরেকটু উপরে তুলে বলে,
“তাকাতে বলেছি স্টুপিড। চোখ খুল।”
গলাটা মরুভূমির মতো চৌচির হয়ে গিয়েছে। তবুও একটু ভেজানোর জন্যে আকুল রাহা ঢোক গিলল। আস্তেধীরে পিটপিট করে তাকালো। চোখের সামলে ঝলমল করে ওঠল ভিহান ভাই এর অদ্ভুত চোখজোড়া। আশ্চর্য এই চোখ দুটি হঠাৎ এত অন্যরকম লাগছে কেন? এত টা ভালো লাগছে কেন সেই চাউনি। এই চাউনিতে কি নেশা মিশিয়ে এসেছে ভিহান ভাই?
ভিহান কিছুসময় এলোমেলো চোখে দেখে গেলো রাহার চেয়ে থাকা। বেসামাল চোখে পর্যবেক্ষণ করল রাহার দৃষ্টি। এক নিমিষে মনে হলো এই চোখে ডুবে যেতে। একেবারে মিশে যেতে ওর সাথে। নিজের ভাবনায় লাগাম টানার চেষ্টা করলো ভিহান। রাহার করুণ মুখ দেখে হাতের মুঠো আলগা করে দিলো। তবে ধারালো কন্ঠে বলল,
“ফারদার আমার সামনে আজেবাজে গান গাইবি না। খেয়ে ফেলবো।”
পলক ঝাপটায় রাহা। ভিহান ভাই কেমন অস্বাভাবিক ভাবে শ্বাস টানছে। সেসব ভ্রু উঁচু করে দেখে চলছে মেয়েটা।
ভিহান এক পা পিছনে সরিয়ে দাঁড়ায়। রাহার পুরো মুখে আলতো নজর বুলায় বেশ সন্তপর্নে। শেষে গলার দিকের ওই লালচে তিলের দিকে। সেকেন্ড কয়েক পর দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকালো ওর চোখের মাঝখানে। তর্জনী আঙ্গুল উঁচিয়ে হুশিয়ারি কন্ঠে বলল,
“ফাস্ট বড় হো ইডিয়েট। আমার ধৈর্যে আর কুলাচ্ছে না।”
এরপর ভিহান ভাই আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করলো না। গটগট পায়ের আওয়াজ তুলে বের হয়ে গেলো রুম থেকে। টেবিলের উপর তখনো রাহা ঠাই বসে ছিলো। কিছুক্ষণ নিশ্বাসও চলছিল না তার। এরপর বেশ সময় নিয়ে বুকের ভেতর একটু আরাম বাতাস ঢুকিয়ে নেয়। চোখের পাতা কেমন স্থির হয়ে আছে। হাত পা নাড়াচ্ছে না একচুলও। উপর থেকে দেখলে মনে হবে একটা যান্ত্রিক কোনো পুতুল বসে আছে। অসাড় হাতটা আস্তেধীরে বুকের উপর বা পাশে রাখলো। টের পেলো হৃদযন্ত্রটা বেসামাল হাড়ে লাফাচ্ছে। ধুকধুক ধুকধুক শব্দ করছে ছন্দের তালে। ভিহান ভাই কি বলে গেলো কিছুই তার মাথায় ঢুকল না। সে ডুবে রইল সেই অদ্ভুত আবেশ মাখা নতুন অনুভূতির রেশে। এক মিষ্টি মিষ্টি যন্ত্রণা দায়ক অনুভূতি!
লিভিং রুমে বসে আছে জিদান কামিলি রুশমি। পাশেই ফ্লোরে সামি রাফি রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি নিয়ে খেলা করছে। সোফায় পা গুটিয়ে হেলান দিয়ে বসে জিদান কখন থেকে চেঁচাচ্ছে,
“মা ঘরে কিছু থাকলে দাও। আমার পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।”
কামিলির হাতে একটা ইংরেজি উপন্যাসের বই। সে এসব উপন্যাস খুব বেশি পছন্দ করে। চোখ তুলে দেখল জিদান সোফার উপর পা তুলে ফোন টিপছে আর গুনগুন করে গান গাইছে। এই লোকটাকে দেখলেই শরীর জ্বলে যায় তার। অসহ্যকর একটা মানুষ। দাঁত কটমট করে বিড়বিড় করে,
“এত দৌড়াদৌড়ি করলে বেঁধে রাখতে পারে না? পাজি লোক।”
জিদান মনোযোগ দিয়ে ফোন টিপলেও সে কথা শুনলো। ভ্রু কুঁচকে ধমকে ওঠল, “কি বললি তুই শাঁকচুন্নি? আবার বলে দেখ।”
“কি বলেছি?”
“তুই আমায় বকাবকি করেছিস। শুনেছি আমি।”
“শুনলে তো ভালোই তাহলে তোমার কান পরিষ্কার আছে।”
“ঠাটিয়ে দুটা চড় লাগাবো বেয়াদব। সম্মান দিয়ে কথা বলতে পারিস না? আমি তোর মুরুব্বি।”
একটা ভাব নিয়ে বলল জিদান। কামিলি মুখ মুচড়ে জবাব দিলো “যার নেই কোনো মান তাকে দিবো আবার সম্মান..”
জিদান পাশে থাকা একটা বড় ফুলে টব হাতে তুলে নিলো। মেকি চোখ রাঙ্গিয়ে বলল, “এটা দেখেছিস? একদম মাথা ফাটিয়ে ফেলবো।”
এবার ফোন রেখে রুশমি তাকালো ভাই এর দিকে। এরা দুজন সবসময় কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে। তাই এসব তার পাত্তা দেওয়ার সময় নেই। শুধু মেজাজ গরম হবে। কিন্তু ভাই এর হাতে এত বড় টব দেখে ভড়কে গেলো ও। চেঁচিয়ে বলল,
“আরে ভাইয়া কি করছো তুমি? রাখো ওটা।”
জিদান টব রাখতে রাখতে বলল, “ওই পেত্নী কে বল চুপ থাকতে নয়তো একেবারে ওকে যমের ঘরে রেখে আসবো সংসার করার জন্যে।”
রুশমি তাকালো কামিলির দিকে। মেয়েটা রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে ফোঁসফোঁস করছে। সে কিছু বলবে তার আগেই ও চেঁচিয়ে ওঠল,
“বড়মা, দেখে যাও তোমার ছেলে আমাকে মা*র্ডার করে ফেলছে।”
“মা*র্ডারের দেখেছিস কি তুই? চুপ করে থাক নয়তো এখুনি তোকে ইন্নানিল্লাহ করে দিবো।”
কামিলির চোখ দুটি রাগে লাল হয়ে গিয়েছে। পারছে না শুধু এগিয়ে গিয়ে জিদানের গ*লাটা চেঁপে ধরতে। সে আবারও চিৎকার করে বলল, “বড়মা, কোথায় তুমি? এদিকে আসো।”
জিদান চোখ বড় করে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে বলল, “ওই ছেমড়ি, ঢেঁড়সের ঢেঁড়স। মুখ অফ যা নয়তো বাঁশ আনছি আমি। একেবারে..”
থেমে গেলো সে।
রুশমি বলল, “ভাইয়া চুপ করো না।”
“আমাকে বলছিস কেন? ওই আলু ভর্তা মা কে ডাকে কেন এখানে? নানির ঝি কি করবে আমার?”
মোটা শক্ত গলা শুনা যায় তখুনি, “হারামির বাচ্চা, শুনছি আমি।”
মুহূর্তে জিদান নিজের চোখমুখ পাল্টে হাসিহাসি মুখে বলল, “আসসালামু আলাইকুম আম্মাজান। দিন কাল ভালো যাচ্ছে তো আপনার?”
আফসানা বেগম চোখ গরম করে ক্ষীণ স্বরে বলেন, “ফাজিল কোথাকার।”
উনার হাতে একটা প্লেট। তাতে কিছু সুইট রুল সেগুলি টেবিলে রেখে ছেলের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমি যেন কোনো আওয়াজ না করি। আমার মেয়েদের সাথে ঝগড়া করবি না একদম।”
“আর ছেলে দুটিকে কি কুড়িয়ে পেয়েছিলে?”
“ছেলে দুটো কে নয়। শুধু তোকে।”
বলে আফসানা বেগম চলে গেলেন জিদান বোকার মতো তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। কামিলি আর রুশমি এই পর্যায়ে মুচকি হাসলো।
“এই বৈষম্য আল্লাহ সইবে না মা দেখে নিও।”
কামিলি কে ঠোঁট টিপে হাসতে দেখে জিদান কটমট করে বলে, “নাক কাটা পেত্নী কোথাকার। হোস।”
কামিলি আর কিছু না বলে জিদান কে দেখিয়ে মুখ ভেংচি দিয়ে ওঠে।
একটুপর হেলতে দুলতে নিচে আসে রাহা রানি। দেখতে পায় সবাই সবার মতো ব্যস্ত। জিদান ভাই আর রুশমি আপু রুল খেতে খেতে ফোন ঘাঁটছে। আর কামিলি আপু বই পড়ছে। রাহা কে দেখে জিদান প্লেট থেকে আরেকটা রুল নিয়ে তাতে কামড় দিতে দিতে বলে, “আরে আমাদের রাহা রানি যে। আসুন আসুন।”
গাল ভরে হেসে এগিয়ে এসে বলল রাহা, “কি খাচ্ছো তোমরা?”
প্লেটে অবশিষ্ট আর একটা আছে রাহা সেই রুলটা নিয়ে চট করে কামড় দিলো।
“রাহা” কামিলি প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে। “তুই আমার রুলটা কেন খেলি?”
রাহা হতবাক রূপে একবার কামিলির দিকে দেখে আবার তাকায় হাতের রুলের দিকে।
“এটা তোমার? কোথায়? নাম লেখা ছিলো বুঝি?”
কামিলি রেগে মেগে কথা শুনাতে লাগল ওকে। জিদান এবার খানিকটা শক্ত ধমক দিয়ে বলল,
“একটা সামান্য রুলের জন্য তুই এমন করছিস কেন?”
“ও আমারটা কেন খাবে?”
“আমি কি জানতাম নাকি এটা তোমার?”
বলল রাহা।
“না জেনে ধরবি কেন? এতো জিহ্ব চলে কেন তোর?”
রাহা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। জিদান ভয়ংকর এক ধমক দিয়ে বলে ওঠে এবাট, “আমায় রাগাস না কামিলি। মুখ সামলে কথা বল। সবসময় কিছু বলি না বলে ভাবিস না এই ঘটনাটাতেও ছাড় পেয়ে যাবি।”
কামিলি তাকিয়ে দেখল জিদান ভাই এর চোখমুখ লাল হয়ে আছে। লোকটা হয়তো খুব রেগে গিয়েছে। তাই চুপ করলো। রুশমি বলল, “এখানে সবার সামনে খাবার দিয়েছে। ও এসে সামনে পেয়েছে নিয়েছে। তুই এতক্ষণ নিলি না কেন? যেই ও নিয়েছে ওমনি তোর নিজেরটা মনে হলো?”
নীলা বেগম এসে মেয়েকে একবালতি বকে গেলেন। জাহানারা বেগমও ধরলেন রাহা কে।
“ভিহান আসার সময় এক বক্স রুল নিয়ে এসেছে। সব গুলো তো তুই একাই খেয়েছি। বাকি গুলি ওদের সামনে দেওয়া হয়েছে। ওখান থেকেও কেন খেতে হবে তোর?”
সবসময় মজা করা জিদান এই মুহূর্তে বেশ রেগে আছে। তাই গরম সুরে বলল, “বোনু কে বকবে না মেজো মা। খাবার জিনিস খেয়েছে। এটা নিয়ে এত কথা কেন হবে? রুলের যদি এত অভাব পড়ে আমি না হয় কাল এক বস্তা নিয়ে আসবো। তখন যার আপত্তি সে যেন গলায় ঝুলিয়ে রাখে।”
কামিলি বুঝল জিদান ভাই যে তাকে বিদ্রূপ করেই কথাটা বলেছে। তবুও সে কিছু বলল না আর।
এরপর লিভিং রুমটা অনেকক্ষণ এভাবে নীরবই গেলো। রাহার মন ভালো করার জন্যে জিদান একটু আশকারা দিতেই মেয়েটা প্রফুল্ল চিত্তে বলল, “চলো না জিদান ভাই আমার সবাই কোথায় একটা গিয়ে ঘুরে আসি। অনেক হয় কোনো জায়গায় যাই না।”
ভাবুক চিত্তে বলল জিদান, “হুম যাওয়া যায়। নট বেড আইডিয়া।”
রুশমিও বলল, “বেশ ভালো হবে। অনেকদিন আমরা ভাইবোন মিলে কোথাও যাই না।”
“হুম চলো জিদান ভাই চলো চলো।”
রাহার জোরাজুরি তে বলল জিদান, “যাওয়া তো যায়। তবে সমস্যা আছে একটা।”
“কি সমস্যা?”
রুশমির প্রশ্নে জবাব দিলো রাহা, “কোনো সমস্যা নেই। তুমি আমাদের নিয়ে চলো জিদান ভাই। প্লিজ প্লিজ প্লিজ।”
“আহহ, বোনু। বাড়িতে আমার বড়জন উপস্থিত আছে। উনার উপর মাতাব্বরি করতে গেলে আমার পাছার ছালচামড়া হাওয়া করে দিবে।”
ওদের কাউকে কিছু বলতে না দিয়ে এই সুযোগে কামিলি বই রেখে ওঠে দাঁড়ালো। কাঠকাঠ গলায় বলল, “ঠিকই তো আছে। উনি থাকতে তোমায় কেন এতো তেল মারতে হবে? আমি যাচ্ছি ভিহান ভাই এর কাছে। উনাকে বললে নিশ্চয়ই রাজি হবে। আমার কথা ফেলবেন না উনি।”
কামিলি আত্মবিশ্বাস নিয়ে সিঁড়ির দিকে হাটা দিলো। তা দেখে জিদান বেশ মজা নিয়ে হাসতে লাগল।
একটু পর কামিলি মুখ গুমড়া করে নিচে ফিরলো। তা দেখে টিপ্পনী গলায় বলল জিদান, “কিরে রাজি হলো তোর ভিহাআআন.. ভাইইই…?”
কামিলি জবাব দিলো না। অদ্ভুত এক রেশে থম মেরে বসে রইল। মুখটা পুরো কালো ছাই হয়ে আছে। যেন বুকের ভেতরটা বড্ড আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে। জিদান ভাই এর বিদ্রূপ হাসি ঠাট্টা কিছুই আর কানে তুলল না সে।
তাদের হম্বিতম্বি তে এবার যোগ দিলো সামি রাফিও এক পর্যায়ে সবাই ধরলো রাহা কে। অবশেষে ভিহান ভাই এর থেকে পারমিশন আনতে রাহাই যেতে রাজি হলো। জিদান আর রুশমি মুচকি হাসতে লাগলো। তারা জানে তাদের ভাই এই মেয়ের কথা কোনোভাবে ফেলতে পারবে না।
বুকে ভয় আর কাঁপা হাত পা নিয়ে ঘুরার লোভে রাহা ভিহান ভাই এর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা পুরোপুরি লাগানো নয়। চাঁপ দিয়ে রাখা। সামান্য ফাঁক দিয়েই রাহা ভেতরটা দেখার চেষ্টা করলো কিন্তু পারছে না। অগত্যা সে আস্তেধীরে দরজাটা খুলতে খুলতে ক্ষীণ মধুর সুরে ডাকলো,
“ভিহান ভাই?”
খানিক ভেতরে ঢুকতেই আচমকা থমকে গেলো সে। স্পষ্টত দেখতে পেলো ভিহান ভাই ভেনিটির দিকে দাঁড়িয়ে আছে এক পাশের শার্টটা কাঁধের দিক থেকে একটু নিচের দিকে নামিয়ে রেখে। অর্ধ উন্মুক্ত ভিহান ভাই এর বাম দিকের পিঠে পুরো রক্তাক্ত হয়ে আছে।
চলবে….
গল্পের মোড় আস্তেআস্তে ঘুরবে। কেমন লাগছে অবশ্যই কমেন্ট জানাবেন।
Share On:
TAGS: ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ, সাদিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ৮
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৬
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১৩
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩৮
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২২
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩৪
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ১৫
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১৪
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২৫