Golpo ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ ডিফেন্স রিলেটেড

ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ৯


ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ

লেখনীতে_সাদিয়া

পর্ব_৯

বড় ভাই এর কথা মতো জিদান কলেজ থেকে রুশমি রাহা আর কামিলি কে বাড়ি নিয়ে পৌঁছেছে। সামি রাফির স্কুল ছুটি হতে দেরি তাই ওদের সাদমান খান নয়তো আরমান খান কেউ নিয়ে আসবেন। এবার মরে গেলেও আর জিদান যেতে পারবে না কোথাও। তার জীবনটা তেজপাতা হয়ে যাচ্ছে, বাড়ি কলেজ, স্কুল, আরদ, ইট ভাটায় কেবল যাতায়াত করতে করতেই।

গাড়ি ব্রেক কষে জিদান বলে উঠল, “শেষ। এবার আমায় বাড়ি থেকে কেউ বের করতে পারবে না। আর কোথাও যাচ্ছি না। একেবারে বিছানাকে ঝাপটে মেরে শুয়ে থাকবো। আফসোস এই দিনে কাতুকুতু খেলার জন্যে একটা বউ নাই।”

বড় ভাই এর কথায় তিন বোন হেসে উঠে। বাহিরে তখনো টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিলো। আজ সারাদিন বৃষ্টি ছিল। রুশমি আর কামিলি কোনোরকম বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লেও রাহা বজ্জাৎ আর ভেতরে ঢুকলো না। গাড়ি থেকে নেমেই খোলা বৃষ্টিময় আকাশে হাত মেলে দাঁড়ালো। মনে হয় শুধু ভিহান ভাই এর কড়া আদেশেই কলেজ থেকে ভিজে বাড়ি ফেরেনি। নয়তো ওভাবেই ঢ্যাং ঢ্যাং করে ফিরতো।

চোখ বন্ধ করে দুই হাত মেলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাহা। গগন থেকে ঝড়ে পড়া ফোঁটাফোঁটা বৃষ্টি ওর আদুরে মুখটা স্পর্শ করে যাচ্ছে। একটু একটু করে ভিজিয়ে দিচ্ছে ওর ছোট্ট কায়া। রাহা ঠোঁট প্রসারিত করে মেলে দিয়েই একটু একটু ঘুরছে। সারা শরীর বৃষ্টি ছুঁয়ে দিতেই মেয়েটা লাফিয়ে উঠল। উপর থেকে পড়া বৃষ্টির পানি তালুতে নিয়ে নাচানাচি করতে শুরু করল।

দুতলায় নিজের রুমের জানলা থেকে ভিহান সে সবটাই দেখছে। একহাতে ধোঁয়া উঠা কফি আরেক হাত টাউজারের পকেটে গুঁজা। ওভাবেই বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে বিভোর নয়নে তাকিয়ে দেখছে রাহা কে। মেয়েটার আহ্লাদী তার বড্ড ভালো লাগে। সেই ভালো লাগা আবার বিরক্তিতে পরিণত হতেও সময় লাগে না। বিমুগ্ধ নয়নে অপলক দেখে চলছিলো আহ্লাদী রাহার বৃষ্টি বিলাস।

মাঝেমাঝে রাহার দিকে নজর রেখেই একবার দুবার কফির মগে আনমনে চুমুক দিয়ে যাচ্ছিল। বৃষ্টিতে জবজবে হয়ে গিয়েছে ও। এতটুক সময়ে এক বারের জন্যেও ভিহান নজর সরালো না ওর থেকে। বৃষ্টি ভেজা রাহা কে দেখে বুকে অদ্ভুত তোলপাড় শুরু হলো। হৃদপিন্ডটা ধিকধিক আওয়াজ শুরু করে দিলো আচমকা। চোখে ঘোর লেগে যাচ্ছে নেশার মতো। তবুও দৃষ্টি সরালো না। রাহার দিকে তাকিয়ে আনমনে ভিহান বিড়বিড় করে বলল,
“একদিন আমি তোর বৃষ্টি হবো মেয়ে।
সেদিন এভাবেই তোকে গভীর ভাবে ছুঁয়ে দিবো।
মিশে যাবো তোর অঙ্গে।
লেপ্টে থাকবো তোর ওই রক্তাভ অধরে।
বিলিন হবো তোর প্রতিটি নিশ্বাসে, প্রশ্বাসে।”

অনেকক্ষণ যাবত বৃষ্টিতে ভিজচ্ছে সে। এখনো উঠার নাম নেই। আর না তো ভিহানের নিজের দৃষ্টি সরাচ্ছে ওই আহ্লাদী রাহার থেকে। মেয়েটা আগাগোড়াই যেন আহ্লাদে আহ্লাদে মাখা। একটু ছুঁয়ে দিতেই যেন গলে গলে পড়ে। ভিহানের অধরে মিগধ হাসি ঝুলছে। বুকের ভেতরে সহস্র ঢেউ আছড়ে পড়লেও সে নির্বিকার তাকিয়ে আছে বৃষ্টি বিলাসী রাহার পানে। মেয়েটা কি পাগল? এতটা অবুঝ কেন? কবে বড় হবে এই মেয়ে? এভাবে এই সাদা কাপড়ে বৃষ্টিতে কেন ভিজচ্ছে? বোকাটা কি বুঝতে পারছে না সাদা কাপড় ভিজে তার অঙ্গে লেপ্টে আছে? বৃষ্টির ফোঁটায় আঁকড়ে ধরা কাপড় তার অবয়বকে আরও প্রকট করে তুলেছে। অথচ তার যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই সেদিকে।

ভিহান অনুভব করছে নিজের বুকের ভেতরের কালবৈশাখী ঝড় বইছে। চোখে মোহাচ্ছন্নতা নেশার মতো উবছে পড়ছে। হিমেল হাওয়া গায়ে অদ্ভুত শিহরণ দিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিস্নাত রাহার পানে তাকিয়ে গুন গুন করে উঠল ভিহান,
Pee loon tere neele neele nainon se shabnam
Pee loon tere geele geele hothon ki sargam
Pee loon hai peene ka mausam
Tere sang ishq taari hai, tere sang ik khumari hai
Tere sang chain bhi mujhko, tere sang bekarari hai

বাহিরে ঠাণ্ডা আবহাওয়া বিধায় সন্ধ্যার পর লেখাপড়া বাদ দিয়ে সব ভাই বোন আড্ডায় বসেছে। জিদান গলা উঁচু করে বলল,

“মা গরম গরম কিছু ভাজাভুজি করে দাও। মুখ কেমন কুড়মুড় কুড়মুড় করছে।”

রাহা বলল, “ভাইয়া কুড়মুড় কুড়মুড় টা কি?”

“ওই তুই যেভাবে আমাদের সবার হাড্ডি চিবিয়ে খাস তেমন।”

নাক ফুলিয়ে বলল রাহা, “ভাইয়া আমি মুটেও এমন নই। শান্তশিষ্ট ভদ্র কিউট কিউট একটা মেয়ে।”

“হ্যাঁ বোনু, শুধু খিউঠ টা বাদে সব গুলি ভুল।”

“মানে কি বলতে চাইছো তুমি ভাইয়া?”

“ওই তো তুই যেটা বুঝলি সেটাই।”

রাহা আহ্লাদী গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “বড় মা তোমার ছোট ছেলে আমায় পঁচা কথা বলে।”

মাঝ থেকে কামিলি বিরক্ত সুরে বলল, “তুই একটু তোর এসব ড্রামা বন্ধ করবি রাহা? বিরক্তিকর। এতো ড্রামা কিভাবে করিস?”

কামিলির চোখে মুখে স্পষ্ট বিদ্রূপ। বিষয়টা বুঝে রুশমি বলে উঠল, “কামিলি, কেমন ধরনের কথা এসব? কিভাবে কথা বলতে হয় সেসব কি ভুলে গিয়েছিস?”

তিক্ত কন্ঠে জবাব দেয় কামিলি, “কিছু ভুলিনি আপু। আমাকে না বলে বরং ওকে বলো একটু ড্রামা আর ন্যাকামি টা কম করতে।”

রুশমি গরম চোখে তাকালো কামিলির দিকে। তার আগে রাহা হাসিমুখে গদগদ সুরে বলল, “আমার ড্রামা করতে ভালো লাগে তাই করি। তোমার মন চাইলে তুমিও করো। সারাক্ষণ জাঁদরেল ভিহান ভাই এর মতো বই না নিয়ে বসে থেকে একটু ড্রামা সিরিজ দেখো তাহলে আমার চেয়েও পাক্কা ড্রামাবাজ হয়ে যাবে। হান্ডেড পার্সেন্ট।”

জিদান হেসে ওয়াজ করার সুরে বলল, “জোরে কন ঠিক কিনা..”

জিদানের মুখ দেখে রুশমি সহ সামি রাফিও হেসে উঠল। কামিলি রাগ দেখিয়ে সামি রাফি কে বলে উঠল, “একদম হাসবি না। দাঁত ভেঙ্গে ফেলবো।”

জিদান সোফায় আরাম করে বসে। ওর ফোনে গান ছেড়ে দিয়ে নিজেও গাইতে শুরু করলো, “জ্বলে জ্বলে জ্বওওলেএএএ…”

জিদান গানের সাথে তাল দিতে দিতে আড়চোখে তাকায় কামিলির দিকে। এদিকে কামিলিও কটমট করে তাকিয়ে আছে ফাজিল লোকটার দিকে। সামি রাফিও গলার সুর ধরেছে। রুশমি ঠোঁট টিপে হাসছে।

রাহা বলল, “ভাইয়া এমন নিরামিষ গান না একটু ঝাকানাকা জিংকু নাকুর গান দাও।”

“কোনটা দিবো বনু? মশা বেনবেন করে মশা বেনবেন করে এটা?”

জিদান ঠোঁট চেঁপে হেসে আড়চোখে তাকায় ক্ষিপ্ত কামিলির দিকে। আহারে বেচারা শুধু ফুলছেই।

“আরে না ভাইয়া, একটু চমল্কো গান দাও যেটা শুনলে শরীরে হিট আসবে এই সময়ে।”

সামি রাফি হইহই করে উঠল। “হ্যাঁ ভাইয়া দাও ভাইয়া” বলে তুলে নিলো ড্রয়িংরুম। এই দুটো বিচ্ছু বাহিনীও হয়েছে রাহার অন্ধভক্ত। একেবারে নিজের দলে নিয়ে নিয়েছে। যেন রাহা তাদের মহারাণী আর ওরা তার প্রজা। পাজিটা একটা কথা বললো কি ওরা এর জয়জয়কার শুরু করে দিবে।

জিদান নড়েচড়ে বসল।
“চমলকো গান দিলে আমার পাছায় লাল বাত্তি জ্বলবে বোনু। অভদ্র গান শুনা যাবে না এখন। কারণ উপরে ভদ্র লোক আছেন।”

জিদানের দৃষ্টি অনুসরণ করে সবাই সেদিকেই তাকালো। ভিহান ভাই এর রুম। রাহা তবুও নাছোড়বান্দা হয়ে একটা গান ছেড়ে দিলো স্বল্প আওয়াজে।

আনোয়ারা বেগম প্লেট হাতে এক গাদা পকোরা নিয়ে এলো সাথে ফুলকো বেগুনী। জিদান খুব পছন্দ করে এটা। এর সাথে গরম গরম নুডলস সবার জন্যে। চা তো লোকাল এই বাসায়। যে যখন পারছে তিন গিন্নিকে অর্ডার করে দিচ্ছে। বাড়িতে আবার এসেছে এক নবাব। সে আবার চা খাবে না। তার জন্যে আলাদা করে কফি বানাতে হয়।

জিদান মাকে বলল, “মা আমার মুখটা খুব করে তোমার হাতের মুঘলাই মুঘলাই করছে কি করবো বলো তো?”

আফসানা বেগম মেকি রাগ দেখিয়ে বললেন, “সারাক্ষণ তোর মুখ খালি খাই খাই করে না? ওই রাক্ষুসে মুখটার জোরে নিজেরটা নিজে বানিয়ে খেতে পারিস না? সারাক্ষণ অর্ডার করিস।”

“খবরদার মা। আমাকে যা খুশি বলো আমার ফুলচন্দন যুক্ত মুখ কে নিয়ে কোনো কথা হবে না। রুচি চলে যাবে…”

কামিলি চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “মুখ তো না ডাস্টবিন একটা।”

জিদান ওর মাথায় গাট্টা মেরে বলল, “কি বললি? ওই ছেমড়ি কি কইলি তুই?”

“আহহ, দেখেছো বড় মা তোমার পাজিটা কি করছে? পিঠে দাও দুটো।”

আফসানা বেগম হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতেই জিদান গুটিয়ে গেলো।

“মা এই বয়সে এসে আমাকে আর মেরো না। বছর দুই এক পেরুতে দাও তখন আমার বাচ্চাকাচ্চা কেই মারতে পারবে। একটু না হয় সবুর করো। সবুরে মেওয়া।”

“হতোচ্ছাড়া কি বললি তুই?”

আফসানা বেগম এগিয়ে আসতে গেলে জাহানারা বেগম ডেকে ওঠেন, “আহহ, ভাবি থাক না।”

“থাকবে মানে? ওই গোলাম বলে কি?”

“ঠিকি তো বলছে ভাবি। আজবাদে কাল বিয়ে দিলে দুই তিনটা বাচ্চা কাচ্চা বাড়িতে হৈহুল্লোড় করবে।”
বললেন নীলা বেগম।

আশকারা পেয়ে জিদান এবার বলে উঠল, “হ্যাঁ ছোটমা তুমি একটু বুঝাও তো। বড়টাকে বিয়ে দিয়ে আমার লাইনঘাট ক্লিয়ার করতে?”

নীলা আর জাহানারা হাসছেন। আফসানা বেগম বললেন, “আগে আমার মেয়েদের বিয়ে হবে পরে তোদের। আমার মেয়েদের কেউ কিছু বললে আমি সহ্য করবে না।”

“পাগল নাকি তুমি? এই শাঁকচুন্নি দের বিয়ে হতে হতে আমার কবরে যাওয়ার সময় হয়ে যাবে। তখন আর বিয়ে করতে হবে না।”

“না করলে না করবি।”

“তুমি বিশ্বাস করো মা। খুব লক্ষ্মী বউ এনে দিবো তোমাকে। তোমার মতো একটুও ঝগড়ুটে হবে না।”

“তবে রে..”

আফসানা বেগম তেড়ে আসতে চাইলেই বাকি দুই জা মিলে উনাকে আটকে নিলেন। নিজেকে ঝগড়ুটে বলায় মেজাজ চড়ে তিনি ছেলেকে বকতে শুরু করে দিয়েছেন।

“বাব্বাহ গো বাব্বাহ। ঝাড়ুর বাড়ি থেকে বেঁচে গেলাম।”

রাহা হেসে বলল, “সত্যি ভাইয়া বিয়ে করবে নাকি?”

জিদান অসহায় সুরে বলল, “বড়টা না করলে কি আমার পথ খালি হবে? বউ নিয়ে বাড়ি ফিরলে বউ সমেত আমাকে ঝাড়ু পেটা করে বিদেয় করবে।”

“তাহলে বড়টাকেই ধরে বেঁধে বিয়ে করিয়ে দাও।”

রাহার কথা শুনে হুট করে কামিলি চটে গেলো, “তোকে এত কথা কে বলতে বলে? সারাক্ষণ ছাগলের মতো চাবলাস কেন? একটু চুপ থাকতে পারিস না?”

পাশ থেকে জিদান উত্তর দিলো, “আর তুই পাগলের মতো বিলাপ পারিস কেন ওর পিছনে? শাঁকচুন্নি।”

“ভালো হবে না জিদান ভাই। আমি আবার বড় মাকে ডাকবো।”

“ডাক তোর বড় মাকে। ওই নানীর ঝি কি করবে আমার?”

“বড়মা ও বড়মা? তোমার ছেলেকে দেখে যাও।”

আফসানা বেগম রান্নাঘর থেকে রুটির ডো বানাতে বানাতে বললেন, “আমি যদি রান্নাঘর থেকে বের হয়েছি ওই হারামির পিঠে খুন্তি ভাঙ্গবো বলে দিলাম।”

রান্নাঘর থেকে নীলা বেগমও এসে মেয়েকে বকে গেলেন। সব কটা এক সাথে হলে শুধু লেগে যাবে।

ঝাল মুঘলাই ডুবিয়ে রাহা আর জিদান চা খাচ্ছে। বাকিরা সস মিশিয়ে খাচ্ছে। রাহা সস মিশিয়ে মনমতো খেয়ে এবার চা দিয়ে ডুবিয়ে খাচ্ছে। ওরা দুই ভাই বোন এমন করে খাচ্ছে যেন অমৃত। কামিলি নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“দেখো আপু গাবর গুলি কিভাবে খাচ্ছে। মুঘলাই এর সাথে চা কে খায়? হাপিত্তিস করে কিভাবে গিলছে। খাবারের কোনো লজিক নেই ওদের।”

জিদান চায়ে মুঘলাই ডুবিয়ে মুখে পুড়ে উত্তর করলো, “ওই শাঁকচুন্নি। তুই কি বুঝবি? ডেমড়ি কোথাকার। খাবারের আবার লজিক কিসের রে পেত্নী? সব ঘুরেফিরে পেটে গিয়ে ওই গু ই হবে।”

খাবারের সময় এমন কথা শুনে রাহা রুশমি কামিলি নাক শিটকে তাকালো। বিরক্তিতে চেঁচিয়ে উঠল কামিলি, “জিদান ভাই, তুমি একটা অসভ্য।”

জিদান মেয়েদের মতো বিদ্রূপের সুরে বলল, “এ্যা, ঢং পাটক্ষেতে আইছে ভাব মারাইতে। যানি হেয় হাগে না।”

কামিলি রেগেমেগে হাতের মুঘলাই ছুঁড়ে মারলো। রুশমিও বলতে লাগল, “খাবারের সময় আজেবাজে কথা কেন বলছো ভাইয়া? দেখছো সবাই খাচ্ছি এর মাঝে তোমার ফাইজলামো কথা না বললেই না হয়?”

“হয়েছে হয়েছে আমার ভুল হয়েছে। তোরা সব ভদ্র সুশীল লোক। হাগু টাগু হয় না তোদের মেনে নিলাম। সবাই কোষ্ঠকাঠিন্যের রোগী।”

এক ফাঁকে রাহা বলল, “আপু চলো না কিছু খেলি। এভাবে বসে থাকতে বোর লাগছে।”

কামিলি বলে উঠল, “বোর লাগলে পড়তে বোস গিয়ে। এই বয়সে খেলা কিসের?”

রাহা তাকালো। কামিলির হাতে তখনো ইংরেজি সাহিত্যের বই। তা দেখে রাহা চটপট বলল, “দরকার নেই আমার এত শিক্ষিত হওয়ার। অ আ ক খ A B জানলেই বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করতে পারবো। এর বেশি শিক্ষিত হওয়ার কি দরকার? আমি তো আর তোমার মতো চাকরিজীবী হতে চাই না। আমি ভাই আরাম প্রিয় মানুষ। বিয়ের পর জামাই এর ঘাড়ের উপর বসে বসে খাবো আর আরাম করবো। বিয়ে করে জামাই থাকতেও বাহিরে খেটে কাজ করে খেতে পারবো না।”

জিদান মাথা নিচু করে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, “হ্যাঁ সেটাই তো। জামাই এর ঘাড়ের উপর বসে চুষে চুষে খাবি। একেবারে ঘাড় মটকে দেওয়ার মতো খাবি।”

“কিছু বলছো ভাইয়া?”

“এ্যা? না না বলছিলাম ঠিকি তো বলছিস এত পড়াশুনা দিয়ে কি করবি? গুলে তো আর খেতে পারবি না।”

“হুম এটাই তো। কলেজ পাস করে আমি আর পড়বোই না।”

কামিলি ওদের কথাবার্তায় বিরক্ত হয়ে আর কিছু না বলেই বইয়ে মনোযোগ দিলো।

“ও ভাইয়া চলো না খেলি।”

ফোন টিপতে টিপতে জানতে চাইল জিদান, “কি খেলবি?”

“তুমি বলো।”

“গানের কলি খেলি।”

“না। এমন বসে বসে খেলা মজা আসবে না।”

“তো কি ট্রুথ ডেয়ার?”

“না। এটাও বোরিং।”

“তবে?”

“আসো লুকোচুরি খেলি।”

“উঁহ, পাদের খেলা।”

মুহূর্তে জায়গা টা নীরব হতে দেখে জিদান ফোন থেকে চোখ সরিয়ে তাকালো। তিন বোনকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসার চেষ্টা করলো। বলল, “না মানে এসব তো ছোট খেলা। মানে বাচ্চাকাচ্চার খেলা বেনু।”

রাহা এবার ওর হাত ঝাঁকিয়ে বলতে লাগলো, “না লুকোচুরিই খেলবো। আসো আসো।”
সাথে দুই বিচ্ছু পালোয়ান সামি রাফিও যোগ দিলো।

“দেখ এসব কানামাছি বউ বউ বাচ্চাদের খেলা। এসব কানামাছি খেলার সময় আমার আর নেই। এখন আমার শুধু বউ বউ খেলার সময় হয়েছে। দুদিন পর আমার বাচ্চাকাচ্চা রা তোদের সাথে এসব কানামাছি টাছি খেলবে।”

“এখন তুমি তোমার বাচ্চাকাচ্চার বদলে খেলো। পরে ওরা এসে খেলবে। এসো খেলবো।”

অবশেষে রাহার জোরাজুরি তে রাজি হলো। সামি বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই যে বিদ্যাসাগর আপা। তুমিও খেলবে?”

রাহা জবাব দিলো, “দেখছিস না আপু পড়ছে?”

কামিলি সঙ্গেসঙ্গে বইটা বন্ধ করে কড়া গলায় বলল, “তো তোকে কি আমি বলেছি খেলবো না?”

“বারে তুমি তো বই ছাড়া কিছু বুঝো না।”

“তোর মতো ছাত্রী তো আর আমি না।”

শেষে রুশমি ওদের থামালো।

“জিদান ভাইয়া একা। আর আমরা সবাই। ভাইয়া যদি আমাদের সবাই কে খুঁজে পায় তবে আমরা ভাইয়া কে স্পেশাল একটা ট্রিট দিবো। আর যদি হেরে যায় তাহলে ভাইয়া আমাদের এক হাজার টাকা দিবে মজা খাওয়ার জন্যে।”

জিদান প্রথমে রাজি হতে না চাইলেও পরে রাজি হয়েছে। কিন্তু সর্ত দিয়েছে যাকে খুঁজে বের করবে সে তার সাথে বাকিদের খুঁজতে সাহায্য করবে। রুশমি কামিলি মানতে না চাইলেও দুষ্টু রাহা রাজি হলো। রুশমি কানে কানে বলল,

“রাজি হলি কেন? আমাদের তো লস হয়ে যাবে?”

“কিসের লস? দেখোই না কি করি।”

একেএকে সবাই লুকিয়ে গেলো। এদিকে জিদান ড্রয়িংরুমে বসে ৫ বছরের বাচ্চার মতো ১,২ গুনছে।

সবার আগেই রাফি ধরা পড়ল। রাফির পরে কামিলি। এরপর সামিকেও দেখে ফেললো জিদান। বাকি রইলো রুশমি আর রাহা। ওরা সবাই মিলেও দুটোকে পেলো না। জিদান বলল, “তোরা বাগানের দিকটাও দেখে আয়। রাহা বান্দরকে দিয়ে ভরসা নেই। গাছে উঠেও বসে থাকতে পারে মজার লোভে।”

এঘর ও ঘর করে করে রাহা লুকাতে লাগলো। কখনো ওয়ারড্রবের পিছনে তো কখনো ঘাটের তলায় তো কখনো কারো কার্বাডে। শেষেমেষ পালাতে গিয়ে ওরা এদিকে আসছে বুঝে উপায়ন্তর না পেয়ে রাহা টুক করে ঢুকে গেলো বাঘের গুহা তেই। ভাগ্যিস দরজা খুলো ছিলো।

রাহা দরজা দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিলো। দেখতে পেলো রুশমি আপুকে ধরে ফেলেছে ওরা। বাকি শুধু সে। তাই দরজার লাগিয়ে অল্প খোলা রেখে সেদিকে উঁকি দিয়ে হাসছিলো। যখন টের পেলো ভিহান ভাই এর রুমে চলে এসেছে তখনি অস্থির হলো। একদিকে ভয় পাচ্ছিলো ভিহান ভাই কে। আবার অন্যদিকে খুশিও হচ্ছিলো এই ঘরে ওরা কেউ ঢুকার সাহস পাবে না বলে।

রাহা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সর্তক দৃষ্টি দিলো ঘরের ভেতর। জাঁদরেল টা কোথাও নেই। সে আবারও দরজার ফাঁক দিয়ে ইতিউতি করছিলো। কিছুসময় যাওয়ার পর তার খুব কাছে কিছু অনুভব করলো রাহা। সেই সাথে সাফরানের মিষ্টি মিষ্টি একটা জেন্টাল ঘ্রাণ তার ইন্দ্রিয় কে শান্ত করে দিলো। মুহূর্তে আবেশে ওভাবে দাঁড়িয়েই চোখ বন্ধ করে নিলো রাহা। বুঝতে পারলো তার কাছাকাছি ভিহান ভাই চলে এসেছে। গরম নিশ্বাসও অনুভব করলো রাহা। ভেতরটা উত্থলিত হচ্ছিলো তার। কিন্তু বুঝতে পারছিলো না এটা কেন হচ্ছে। ভিহান ভাই কাছাকাছি এসেছে বলে নাকি ভয়ে? বারবার মনে হচ্ছে এই না ভিহান ভাই ঘাড় ধরে ঘর থেকে বের করে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। ভেতরটা ধকধক করে আওয়াজ হচ্ছে রাহার। গলাটা শুকিয়ে আসছে। সেভাবেই পাথরের মতো জমে দাঁড়িয়ে রইল রাহা। এক চুলও নড়লো না।

ভিহান দরজায় মুখ করে লুকিয়ে থাকা রাহা কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করলো। ওর গা থেকে আসা মিষ্টিমিষ্টি সুভাস টা নিঃশব্দে ভিহান শুঁকে নিলো নিজ গহ্বরে। কিছুসময় যাওয়ার পরও যখন দেখলো রাহা তাকচ্ছে না নড়ছে না তখন গম্ভীর গলায় বলল ভিহান,

“তাকা এদিক।”

গলাটা বুঝি ওই কন্ঠে আরো শুকিয়ে এলো রাহার। শুকনো ঢোকও গিলল দুবার। আস্তেধীরে পিছন ফিরলো। দেখলো ভিহান ভাই এর কাঁধে টাওয়াল ঝুলছে। পরনেও টাওয়াল। বুকটা আগেরদিনের মতো একেবারে উন্মুক্ত। লোকটা এই ভরসন্ধ্যায় গোসল করেছে নাকি? চুল দিয়ে যে পানি ঝড়ছে। রাহার বুকটা ধক করে উঠল। মনে হচ্ছে জোয়ারে এখনি ভেসে যাবে সে কোথাও। শরীরটা অসাড় অসাড় লাগছে কেন? দূর্বল হয়ে গেলো নাকি। ড্যাবড্যাব করে ভিহান ভাই এর ফুলো উন্মুখ বুকের দিকে তাকিয়ে পরপর ঢোক গিলছে। রাহা কে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভিহানের কপাল সরু হয়ে আসে। কিছু বলবে তার আগে বাহিরের শব্দে রাহা হকচকিয়ে যায়। অস্বস্তি ভুলে উঁকি দেয় বাহিরে। দেখতে পায় সবাই এদিকেই আসতে চাইছে।

ভিহান ভাই তখন খুব কাছে। দুই ভয় রাহার ভেতরে ঝড় তুলে। ব্যাকুল হয়ে যায় তার হৃদয়। কি হবে কি হবে চিন্তায় অস্থির লাগে। জিদান সহ বাকিরা এদিকেই তো আসছে।

“তুই এ..”

বাকি কথা শেষ হওয়ার আগেই রাহা হুড়মুড় করে পিছন ঘুরে আচমকা ভিহান ভাই এর ঠোঁটে আঙ্গুল গুঁজে দিলো। দ্রুত গলায় বলল, “হুসসস, প্লিজ কথা বলবেন না ভিহান ভাই।” নির্বোধ রাহা বুঝলোও না কি করতে গিয়ে কি করলো। দরজায় সর্তক নজর রেখেই রাহা এখনো হাত চেঁপে ধরে রাখলো ভিহান ভাই এর ঠোঁটের ওপর।

রাহার মোলায়েম ছোট আঙ্গুলের স্পর্শে একেবারে বিমূঢ় হয়ে গেলো ভিহান। জমে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বুকের গহীনে একটু একটু করে ঝড়ের মাত্রা বাড়তে লাগলো। স্তব্ধ চোখের চাউনি একপল রাহা কে দেখে নিয়ে শীতল নজরে তাকালো নিজের দিকে। যেখানে এখনো বোকা রাহা আঙ্গুল চেঁপে আছে তার ঠোঁটে।

চলমান….
সবাই রেসপন্স করবেন। আর অবশ্যই এক দুই লাইন লিখবেন গল্প নিয়ে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply