Golpo ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ ডিফেন্স রিলেটেড

ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১৯


ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ

লেখনীতে_সাদিয়া

পর্ব_১৯

২k রিয়েক্ট হলে পূরণ হলেই পরবর্তী পর্ব আসবে পাখিরা।
“আসবো ভিহান ভাই?”

ভিহান তখন সোফায় বসে আছে। হঠাৎ কামিলির কন্ঠে মুখ তুলে তাকায়। ওকে জড়তার সাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ রুক্ষ গলায় “আয়” বলে আবারও ভিহান নিজ কাছে মনোযোগ দেয়। মাথা নিচু করে কামিলি ভেতরে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ইতস্তত বোধ নিয়েই। কিভাবে কি বলবে সে বুঝে না।

কিছু সময় যাওয়ার পরও কামিলিকে কোনো কথা বলতে না দেখে এবার ভিহান চোখ তুলে তাকায় ওর দিকে। গম্ভীর কন্ঠে শুধায়,

“কি প্রয়োজনে এসেছিস?”

ভিহান ভাই এর মোটা গলায় বেশ চমকে ওঠে কামিলি। নিজেকে সামলে ক্ষীণ সুরে বলে,

“তুমি কি আমার উপর রাগ করে আছো ভিহান ভাই?”

কামিলি তাকালো। ভিহান ভাই এর তীক্ষ্ণ চোখা চাউনিতে কেঁপে ওঠল কেমন।

“তোর উপর রাগ করে থাকতে যাবো কেন?”

“ও..ওই যে রাহা কে..”

থেমে গেলো কামিলি। ভিহান ভাই কে চুপ থাকতে দেখে নরম গলায় বলল আবারও, “তুমি আমায় ভুল বুঝছো ভিহান ভাই।”

“কেন এসেছিস সেটা বল।”

“আমি দেখছি তুমি ওই ঘটনার পর আমাকে কেমন এড়িয়ে যাচ্ছো। আমি তো ভুল কিছু বলিনি। ও তো সত্যিই এমন।”

“স্টপ ইট কামিলি। ও তোর বোন হয়। আর কারো বিষয়ে কোনো কথা বলতে গেলেও ভেবে চিন্তা বলা উচিৎ। তোর থেকে এসব আশা করা যায় না। তুই রাহার মতো এতটা অবুঝ না।”

“আমি..”

“ওই বিষয়টা নিয়ে আমি আর কিছু শুনতে চাইছি না। এবার আসতে পারিস।

“আমি কি এমন বলেছি বলো তো। তুমি সবসময় রাহার দিকটা কেন দেখছো? ও যা করে তাই তো বলেছি আমি। ও তো আসলেই একটা বেয়াদব সারাক্ষণ তোমাকে উল্টাপাল্টা নামে ডাকে।”

“এবার তুই আয়।”

কামিলির মৃদু রাগ হলো। কান্নাও পেলো। সে নিজের সাফাই গাইতে বলল, “ভিহান ভাই আমি তো মিথ্যে বলিনি। রাহা সবসময় বাড়াবাড়ি করে। ওকে তুমি কিছু বলো না।”

“জাস্ট শাট আপ। ওকে কিছু বলি কি বলি না সেটা তোর কাছে বলতে হবে না আমার। এখন বের হো। আমার কাজ আছে।”

কামিলি কান্না আটকে রুম থেকে বের হয়ে গিয়েছে। সেই তখন থেকে এই ঘটনা মনে করতে করতে ফুঁপিয়ে কাঁদছে কামিলি নিজ কামরায়। ভিহান ভাই এভাবে বলতে পারলো? একবারও তার দিকটা ভাবলো না? তার কষ্ট হতে পারে সেটা চিন্তা করলো না?

অশ্রুসিক্ত নয়নে কামিলি বলতে লাগলো, “তোমার সামান্য কথা আমার বুকটা চৌচির করে তুলছে ভিহান ভাই। কেন আমাকে একটু বুঝতে চাও না তুমি? কেন আমার অনুভূতি তোমার চোখে পড়ে না? কেন ভিহান ভাই? কেন?”

রাহার শরীর থরথর করে কাঁপছে। নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারছে না একটুও। মনে হচ্ছে এই বুঝি বলহীন শরীরটা নিয়ে ঢলে পড়ল ও। চোখের সামনে ভিহান ভাই রক্তাক্ত পিঠ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বোধহয় রক্তে ভেজা ব্যান্ডেজ টা খুলে ভেনিটির সামনে দেখতে চাইছিলো নিজের বাম দিকের ক্ষতবিক্ষত পিঠটা।

কাঁপাকাঁপা পা আর অশ্রুসিক্ত নয়নে কখন ভিহান ভাই এর কাছে চলে এসেছে সে টেরও পেলো না। ওর নিশ্বাস যেন বুকেই আটকে গেল। বুকের ভেতর তীব্র চাপ অনুভব করল সে, যেন শ্বাস নিলেই বুকটা ফেটে যাবে। ভিহানের পিঠ বেয়ে নেমে আসা রক্তের দাগগুলো তার চোখ আরো ঝাপসা করে দিলো। বাম বাহুর দিকের পিঠটায় গভীর এক ক্ষত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ক্ষতের চারপাশ ফুলে ওঠে লালচে হয়ে আছে, যেন সামান্য নড়াচড়াতেই ব্যথাটা আরও তীব্র ভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠবে। মাংসের গভীর পর্যন্ত কেটে গিয়ে দগদগে হয়ে আছে জায়গাটা। কি বিবৎস দেখাচ্ছে রক্তে ভেজা জায়গাটা কে। গভীর ক্ষতের মাঝ বরাবর মাংসও বোধহয় বের হয়েছে খানিক। এখনো তাজা রক্ত চুয়েচুয়ে পড়ছে। দেখলেই শরীর কাটা দিয়ে শিউড়ে ওঠে।

রাহা পুরো বাক হারা হয়ে গিয়েছে। শরীর অসহায় ভাবে কাঁপছে। ভিহান ভাই কে এই অবস্থায় দেখে কলিজা এফারওফার হয়ে যাচ্ছে। এক অসহ্য যন্ত্রণা কলিজায় খামছে ধরেছে ওর। রক্তলাল ঠোঁট তিরতির করে কেঁপে যাচ্ছে। চোখে বোধহয় এক সমুদ্র লুকিয়ে নিয়েছে মেয়েটা। কি নিদারুণ অসহায় ভাবে মেয়েটা নিস্তেজ হাতটা বাড়িয়ে দিলো ক্ষতটা ছুঁয়ে দিতে।

ওই রক্তে ভেজা ক্ষততে হাত দিয়ে ছুঁয়ার সাহস হলো না রাহার। বুকটা হুহু করে ওঠল ওর। চোখ দুটি দিয়ে আপনাআপনি পানি গড়িয়ে পড়তে চাইল। বুকের ভেতর তীব্র ব্যথা নিয়ে মনে হলো যদি পারত, সব কষ্টটুকু নিজের শরীরে টেনে নিত। তবুও ভিহান ভাইকে এভাবে দেখতে হতো না। অসহ্য জ্বালায় হৃদয় চিড়ে যাচ্ছে ওর।

ভিহান এতক্ষণ আয়নার প্রতিবিম্বে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখে গেলো রাহা কে। পাগল মেয়েটা কি তার আঘাত দেখে কষ্ট পাচ্ছে? গাধাটা কি কাঁদছে তার কষ্টে? সে স্তব্ধ নির্বাক চোখে এতক্ষণ মেয়েটার আতঙ্কভরা অশ্রুসিক্ত অবয়ব দেখে গেলো। এবার ভিহান ঘাড়টা একটু ঘুরিয়ে পিছনে থাকা রাহা কে দেখার চেষ্টা করল। মেয়েটা বুক ভাঙ্গা কষ্টে হাউমাউ করে কাঁদতে চেয়েও যেন পাড়ছে না। ঠোঁট দুটি বরফ শীত কনকনে ঠান্ডার মতো কাঁপিয়ে চলছে শুধু। বাড়িয়ে ধরা হাতটা থরথর করে দুলছে। ঠোঁট দুটি গলিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। কোনো শব্দ বের হচ্ছে না কন্ঠ দিয়ে। মাত্রাতিরিক্ত ভয়ে মেয়েটা যেন বোবা হয়ে গিয়েছে। ভেতরের ফাঁপরটা বের করার জন্যে ঠিক ভাবে কাঁদতেও পারছে না।

ভিহান পুরোপুরি এবার রাহার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। দাঁত চিবিয়ে বাম বাহুটা খানিক নাড়িয়ে ঝুলিয়ে রাখা শার্টটা কাঁধের উপর তুলে নিলো। এরপর তাকালো মেয়েটার দিকে। সত্যি মেয়েটা যেন জমে গিয়েছে। একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে হাত কিছুটা তার দিকে বাড়িয়ে। অথচ না তাকে ধরছে আর না এক চুল নড়ছে। ছোট্ট শরীরটা এখনো ঠকঠক করে কেঁপে যাচ্ছে। মেয়েটা চাইলেও না কিছু বলতে পারছে আর না নিজেকে সামলাতে পারছে। রাহা কে এভাবে স্থির অচল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে কাঁপতে দেখে ভিহান ওর দুই বাহু আলতো করে চেঁপে ধরল। এতে মেয়েটার কোনো হেলদোল হলো না। ভিহান ভ্রু কুঁচকে এবার রাহাকে কিছুটা ঝাঁকালো। মেয়েটা তবুও মূর্তির মতো একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইল প্রতিক্রিয়াহীন। এবার কিছুটা চমকালো ভিহান। ওর বাহু ছেড়ে তুলতুলে মোলায়েম গাল দুটি যত্নে তুলে নিলো নিজ হাতের আজলায়। আদর ভঙ্গিমায় বলল,

“হেই আদুরী? হোয়াট হ্যাপেন?”

রাহার ঠোঁট দুটি ভয়াবহ ভাবে কাঁপছে। হরিণী চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে আছে ঘন কুয়াশা ঢাকা অতল গহ্বরের মতো।

“রাহা, লুক এট মি। কি হয়েছে? বল আমায়?”
রাহা ফ্যালফ্যাল করে ভিহান ভাই এর দিকে পাথরের মতো তাকিয়ে থাকলেও শরীরটা কাঁপছে তার। ওকে এভাবে আতঙ্কে জমে থাকতে দেখে ভিহানের অশান্তি শুরু হলো। মেয়েটাকে স্বাভাবিক করার উদ্দেশ্যে গাল দুটি আরো একটু চেঁপে ধরে মুখ উপরে তুলল কিছুটা। লম্বাচওড়া ভিহান নিজের ঘাড়টা খানিক নুয়ে দিলো মেয়েটার দিকে। আহ্লাদ কন্ঠে বলল,

“কি হয়েছে? এভরিথিংক ইজ ফাইন, তাকিয়ে দেখ। সব ঠিক আছে। তাকা আমার দিকে। রাহা তাকা।”

রাহা যন্ত্রের মতো দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটা যেন সত্যি ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছে। তাই তো এভাবে জমে আছে কথাও বলতে পারছে না। ভিহান ঢোক গিলল। ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে তার ভেতর। এই মেয়েটা স্বাভাবিক চঞ্চল না থাকলে ভেতরটা তার অশান্তিতে ছটফট করে। ভিহানের শ্বাস তপ্ত হয়ে ওঠে। ঢোক গিলে সে গভীর ভাবে তাকায় রাহার মুখের দিকে। মেয়েটার মুখে এখনো তার হাতদুটি আটকে আছে ভীষণ গাঢ় ভাবে। খানিক উঁচুতে থাকা মেয়েটার মুখটা লাল হয়ে আছে। পাতলা চামড়ার গাঢ় লাল লাল ঠোঁট দুটি কাঁপছে ধীরে ধীরে। হঠাৎ ভিহান কেমন ঘোরে চলে গেলো। রাহার সান্নিধ্য, ওর ছোঁয়া, কম্পিত মুখ, চোখ, ঠোঁটে হঠাৎ আকর্ষণ অনুভব করল। রক্তকোমল ঠোঁট গুলি বারংবার টানলো ওকে। এত তীব্র ভাবে টানলো যে মনে হলো এখুনি মেয়েটাকে নিজের গভীরে মিশিয়ে নিতে। গাঢ় ভাবে মেয়েটার মাঝে ডুবে যেতে। নিজ ভাবনায় আচমকা খেঁই হারিয়ে বসল ও। বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় কাতড়াতে লাগলো। মনে হলো তার কাঁধের ব্যথা এই যন্ত্রণার কাছে অতি তুচ্ছ। কি নিদারুণ মরণ যন্ত্রণায় দিনদিন সে নিপতিত হচ্ছে। ভেতরের সংযম টুক হারিয়ে ভিহান অসহায় তেজি ভঙ্গিতে দাঁতে দাঁত পিষল। চোখ দুটি বন্ধ করে হঠাৎই ছেড়ে দিলো ওকে। ভেতর থেকে প্রতি নিশ্বাসে নিশ্বাসে আগুনের গোলা বের হতে লাগল ওর। নিজেকে ধাতস্থ করতে নিজের ধৈর্য কে শাণ দিতে ভিহান কটমট করতে করতে আবারও পিছু ঘুরে কিছুটা দূরে সরে গেলো রাহার থেকে। ভেতরের এই দাবানল দিনদিন বৃহৎ আকার ধারণ করছে তার। ইদানীং মেয়েটার কাছে এলেই ধৈর্যচ্যুত হয় সে। দিনকে দিন নিজের ধৈর্য আর সংয়মের লাগাম হারা হয়ে যাচ্ছে ও। এত কিছুর পরেও নিজেকে আটকানো তার জন্যে মরণ যন্ত্রণার চেয়ে কম নয়। ভেতরের সেই তীব্র দাবানল সওয়ার ক্ষমতা কমে এসেছে তার।

‘নিজের অনুভূতির সাথে নিজে যুদ্ধ করার চেয়ে কঠিন যুদ্ধ বুঝি আর এই দুনিয়াতে হয় না।’
ভিহান এই মুহূর্তে সেই দ্বন্দ্বে লিপ্ত। ভেতর থেকে গলিত লাভা নির্গত হচ্ছে। নিজের অশান্তির চরম সীমায় গিয়ে ভিহান ডান হাত টা তুলে দিলো কাঁধের দিকে। বেশ কয়েকবার গাঢ় ভাবে ঘাড়টা ঘষতে ঘষতে চট করে কেমন হিংস্র হয়ে ওঠল ও। ক্ষিপ্রে তাকালো রাহার দিকে। দুই কদম পা বাড়িয়ে ওর দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দাঁত পিষে বলল,

“ড্যাম, তোকে বলেছিলাম তো তোর ওই ফুলকো ফেস নিয়ে আমার সামনে আসবি না। কেন এসেছিস তুই? বারণ করার পরও কেন শুনিস না আমার কথা ইডিয়েট?”

এই পর্যায়ে রাহার শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠল। কিছুটা সুযোগ পেয়েই বুঝি মেয়েটা ঠোঁট ভেঙ্গে এবার কেঁদে দিলো। ভিহান ভাই এর দিকে করুণ ঝাপসা চোখে তাকিয়ে শরীর দুলিয়ে মৃদু শব্দ তুলে কাঁদতে লাগল। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে ভিহানের মনে হলো তার চেয়ে অসহায় মানুষ বুঝি এই দুনিয়াতে আর দুইটা নেই।

চোখের সামনে রাহা কে এভাবে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখে ভিহানের পিঞ্জিরায় আগুন জ্বলে ওঠে। ধৈর্যশীল ভিহান আর সহ্য করতে না পেরে মেয়েটার এক হাত টেনে ধরে নিজের কাছে নিয়ে এসেই বজ্র বেগে ঝাপটে ধরে নিজের অশান্ত বুকে। রাহার মাথাটা ক্ষিপ্ত অস্থির বুকে চেঁপে ধরে চোখ বন্ধ করে নেয় ভিহান। রাহা যেন এবার ভেতরের সমস্ত কষ্টটা উগলে দেয় ভিহান ভাই এর তপ্ত বুকের মাঝে।

এক হাত দিয়ে রাহা কে আগলে ধরে অন্য হাত ওর মাথায় চেঁপে ধরে রাখে ভিহান। বেশ আবেশে চোখ দুটি মুদে রাখে ও। যেন তার উত্তপ্ত অশান্ত বুকে রাহা বারিধারার মতো শান্তি ঝড়িয়ে সেই আগুন নিভিয়ে পানি করে দিচ্ছে একটু একটু করে। ভীষণ আরামে আর প্রশান্তিতে ভিহানের পুরো শরীর জুড়ে শীতলতা ছড়িয়ে গেলো।

আলতো নরম কোমল গলায় বলল, “এই আদুরী কান্না থামা এবার। দেখ আম ফাইন।”

রাহা ফুঁপিয়ে কাঁদে। এক প্রকায় হেঁচকিই তুলে ফেলছে মেয়েটা।

ভিহান এবার ওর দুই বাহু ধরে নিজের বুক থেকে আলগা করে। প্রস্থ হাতটা এগিয়ে দেয় ওর মুখের দিকে। কানের পিছনে চার আঙ্গুল গলিয়ে দিয়ে রাহার মুখটা আলতো করে স্পর্শ করে। গালের উপর থাকা বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলে ওঠে,

“বোকার মতো কাঁদছিস কেন ইডিয়েট? আমি ঠিক আছি।”

কম্পিত ঠোঁট নিয়ে অস্ফুটবাকে বলে, “আ..আপনার পিঠে ব্য..ব্যথা।”

“সামান্য।”

“অনেক গভীর ভিহান ভাই।”

“তাতে তোর কি?”

“আ..আপনার কষ্ট হচ্ছে।”

“আমার কষ্ট হচ্ছে তবে তুই কেন কাঁদছিস?”

আর জবাব দিতে পারে না রাহা। চুপ করে নাক টানে। তা দেখে হাসে ভিহান।

“কিরে ইডিয়েট বল কাঁদছিস কেন?”

“…..

“গর্দভ একটা।”

রাহা এখনো জবাব দেয় না। মাথা নিচু করে থাকায় নাক দিয়েও পানি টপটপ করে পরার চেষ্টা করছে। অপরিষ্কার রাহার নাক টানার ফলে সেই পানি পড়তে পড়তেও গিয়ে পড়ছে না। তা দেখে ভিহান ঠোঁট কামড়ে পাশ ফিরে হাসে। এতেও যেন টান লাগে ঘাড়ে। তবুও সেটা সয়ে নেয় সে।

নরম সুরে বলে, “রুমাল লাগবে?”

জবাব দেয় না রাহা। ভিহান নিজেই পকেট থেকে রুমালটা বের করে এগিয়ে দেয় রাহার দিকে। অবশ্য এসব রুমাল টুমাল ব্যবহার করে না সে। কেবল নিজের কাছে সবসময় রাখে এই যা। কারণ এটা এই গাধাটাই তাকে দিয়েছিলো।

ভিহান ভাই এর এগিয়ে দেওয়া রুমালটা রাহা হাতে তুলে নেয়। ফ্যাত করে নাক টা পরিষ্কার করে সেটা আবারও এগিয়ে দেয় ভিহান ভাই এর দিকে। ভিহান তীক্ষ্ণ চোখে এগিয়ে দেওয়া সেই অপরিষ্কার রুমাল টা দেখে নিয়ে আবারও তাকায় রাহার পানে। সূক্ষ্ম কন্ঠে বলে,

“এটা দিয়ে আমি কি করবো এখন? পরিষ্কার করে আবারও ফিরত দিবি।”

রাহা মাথা কাত করে সায় দেয়। আস্তেধীরে চোখ তুলে তাকিয়ে বলে, “একটু দেখি?”

“কি? আমার বডি?”

লজ্জায় গাল দুটি আবারও লাল হয়ে ওঠে রাহার। ভিহান সেটা দেখেও চুপ থাকে। কিছু সময় এভাবেই গড়ায়। রাহা আবারও থেমে থেমে বলে,

“আপনার ব্যথাটা একটু দেখি?”

“দেখে কি করবি?”

“এমনি..”

“এমনি দেখে কি হবে যদি মলমই লাগাতে না পারিস।”

“লাগিয়ে দিবো।”

“কি?”

“মলম।”

“আমি ভাবলাম অন্য কিছু।”

“অন্য কিছু কি?”

শ্বাস ফালে ভিহান।
“স্টুপিড একটা। যা দরজা লাগিয়ে আয়।”

ভ্রু দুটিতে কুঞ্চন হয়ে ওঠে রাহার। নাক টেনে বলে, “দরজা লাগাতে হবে কেন?”

“যেটা বললাম সেটা কর। যা গিয়ে দরজা লাগা।”

দরজা বন্ধ করে রাহা এগিয়ে আসে। ভিহান তাকিয়ে দেখতে পায় আহ্লাদীর মুখ ফুলে আছে। মেয়েটাকে বড্ড আদুরে লাগছে। ধৈর্যচ্যুত হওয়ার আগেই ভিহান নিজের ভবনার লাগাম টেনে ধরল। রাশভারী কন্ঠে বলল,

“ড্রয়ার থেকে ফাস্টএইড বক্সটা নিয়ে আয়।”

বাধ্য মেয়ের মতো রাহা সেটা নিয়ে এগিয়ে এলো। ভিহান সোফায় বসে আছে। তার সুচালো বাজপাখির মতো নজর সম্মুখে থাকা আয়নার দিকে। রাহা শান্ত মেয়ের মতো বক্স নিয়ে এসে তার পিছেই বসল। ভিহান শার্টটা পুরোপুরি না খুলে সেই আগের মতো কেবল বাম দিকের কলারটা নিচে ঝুলিয়ে দিয়ে বসল ক্ষতটা উন্মুক্ত করে দিয়ে।

সেই বিবৎস ক্ষতটা দেখেই বুকটা হুহু করে ওঠল রাহার। কলিজটা মুচড় দিয়ে ওঠেছে ফের। চোখ দুটি আবারও ঝাপসা হয়ে এলো। মাঝখানের জায়গাটা কি গভীর ভাবে ঢেবেছে। কিভাবে এত ব্যথা পেলো এই লোক? মানুষটার এত স্বাভাবিকই বা কি করে আছে? কষ্টও হচ্ছে না উনার?

ভিহান ভাই এর কষ্ট হচ্ছে কিনা তা না জানলেও রাহার অন্তর জ্বলে যাচ্ছে। বুক ফেটে যাচ্ছে তার। আপনাআপনি টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল ওর চোখ বেয়ে। আয়নায় সেই চোখের পানির দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল ভিহান। কাঁপাকাঁপা হাতে তুলো দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করার সময় ভিহান ভাই মৃদু শব্দ করে একটু কেঁপে ওঠতেই ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে রাহার। কাঁদতে কাঁদতেই তুলো দিয়ে পরিষ্কার করে দেয়। আর ওর কান্নামাখা মুখের দিকে গভীর নয়নে তাকিয়ে থাকে ভিহান।

ক্ষতস্থান টা পরিষ্কার করে ঔষধ লাগিয়ে দিয়ে রাহা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিলো।

“এবার চোখের পানিটা মুছ ইডিয়েট। নাক দিয়েও পানি পড়ছে তো।”

রাহা জবাব দিলো না সে কথার। অন্য সময় হলে নিশ্চয়ই কিছু বলতো। সে উল্টো প্রশ্ন করলো ভিহান ভাই কে, “আপনি কি ডক্টরের কাছে গিয়েছিলেন ভিহান ভাই? এটায় তো সেলাই এর দরকার ছিলো।”

“এতো পাকনামি করার প্রয়োজন নেই তোর।”

“কিভাবে ব্যথা পেলেন আপনি?”

ভিহান সে জবাব দিলো না। শার্টটা কাঁধে তুলে নিয়ে তাকালো রাহার পানে। জানতে চাইল,

“কেন এসেছিলি?”

“অনুমতি নিতে।”
মাথা নিচু করে বলল রাহা।

“কিসের?”

“ঘুরতে যাওয়ার।”

“এখন যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ঘরে যা।”

একটু থেমে আবারও বলে, “আর শুন, এই বিষয়ে যদি বাড়ির কেউ জানে তবে তোরে আমি খাইছি।”

ঢোক গিলল রাহা। লোকটা আস্তো একটা জল্লাদ টাইপের। মিনমিন গলায় বলল রাহা আবারও, “আরেকটু থাকি?”

“কোন দরকারে?”

মাথা নিচু করে ক্ষীণ গলায় জবাব দিলো সে, “এমনি।”

ভিহান রাহার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে বলল, “প্রয়োজন নেই। তুই আরেকটু থাকলে আমার বুকে ঝড় শুরু হবে। বের হো।”

রাহা মুখ তুলে তাকিয়ে ভোতা করে বলে, “আপনি কেমন কেন ভিহান ভাই?”

“কেমন?”

“কেমন কেমন জানি।”

ভিহান গাঢ় নজরে রাহার আহ্লাদী মুখে নজর বুলিয়ে বলল, “আমি কেমন তা জানার হলে আমার ভেতরে ঢুকতে হবে। ঢুকবি?”

রাহা বোকার মতো কপালে কিছু ভাঁজ তুলে আচমকা বলে, “মানে?”

শক্ত গলায় জবাব দেয় ভিহান, “তোর মতো রাম ছাগল সেই মানে বুঝতে পারবে না স্টুপিড। বের হয়ে যা।”

অগত্যা ভিহান ভাই নিজেই রাহা কে বাহু ধরে ঘর থেকে বের করে দিলো।

পরপর দুইদিন কেটে গিয়েছে। রাহা সময় করে করে ভিহান ভাই এর ক্ষতের খুঁজ নিয়ে এসেছে। রাহা ভিহান ভাই এর আঘাত নিয়ে বাড়ির কাউকে কিছু বলেনি যে এটাই বেশি।

পড়ন্ত বিকেল চলছে। সেই কখন থেকে রুশমি আপুর ঘরে বসে আছে ও। কিছুক্ষণ দুজন এক সাথে মুভি দেখেছে। এবার কিছু খাওয়ার জন্যে পেটটা চুকচুক করে ওঠল ওর। তাই রুশমি আপুর থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়ার সময় হাতে একটা বই ধরিয়ে দিয়ে বলল রুশমি,

“যাওয়ার সময় এটা কামিলি কে দিয়ে যাবি।”

“আচ্ছা।”

ধেইধেই করে রাহা ছুটে গেল কামিলির রুমের দিকে। বই দিয়ে নিচে গিয়ে মা কে বলবে দুটো আলুর পরোটা বানিয়ে দিতে। খাওয়ার চিন্তায় রাহা উল্লাস এগিয়ে গেলো কামিলি আপুর রুমের দিকে। তবে দরজা দিয়ে ঢুকার আগেই অনাকাঙ্ক্ষিত এক দৃশ্যে পাজোড়া থমকে গেলো ওর। নিশ্বাস আটকে স্তব্ধ হয়ে পা ওখানেই থেমে গেলো ওর। কামিলি আপুর রুমে এই সময় এভাবে ভিহান ভাই কেন?

চলবে….

দয়া করে আপনারা নাইস নেক্সট কমেন্ট করবেন না। প্রয়োজনে এক লাইন কিছু লিখে যাবেন। না পারলে কমেন্ট করার দরকার নেই। তবুও নাইস নেক্সট টা দিয়েন না। গল্প লিখতে আমার কষ্ট হয়। অথচ আমার উৎসাহ বাড়ানোর জন্যে আপনারা এক দুই লাইনও গল্প নিয়ে কিছু লিখতে পারেন না।…🙂

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply