Golpo ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ ডিফেন্স রিলেটেড

ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১১


ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ

লেখনীতে_সাদিয়া

পর্ব_১১

⭕কপি করা নিষেধ⭕

[পরবর্তী পর্ব পেতে এই পর্বে ২k রিয়েক্ট পূরণ করে দিয়েন]
হন্তদন্ত হয়ে রাহা ছুটলো। ডান বাম কোনো দিক না তাকিয়ে এক দৌড়ে নিজের ঘরে এসে পৌঁছালো সে। হুড়মুড় করে দরজা লাগিয়ে বুকে হাত চেঁপে লম্বালম্বা করে নিশ্বাস নিতে লাগলো। বুকটা ধড়ফড় করে লাফাচ্ছে তার। শরীরটাও প্রায় নিস্তেজ। এটা যে কেবল দৌড়ে আসার ফলে হচ্ছে এমন নয়। একটু আগে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছুটে চলা এক অদ্ভুত অনুভূতির দরুনে অসাড় হয়ে আসছে। রাহা বোকার মতো ঠাই দাঁড়িয়ে রইল। ঘনঘন নিশ্বাস নিতে নিতে অনুভব করলো তার বুকের অস্বাভাবিক কম্পন। পাথুরে হাতে সে আস্তেআস্তে হাতটা বুকের উপর রাখলো। বিহ্বল চেহারায় বোধ হলো তার বুকের ভেতর থেকে ধুকপুক ধুকপুক ধ্বনি আলোড়িত করে তুলছে। ভেতরে মিষ্টি এক ব্যাকুলতা ঘুরপাক খাচ্ছে। যা তাকে সম্পূর্ণ নতুন আর অনাকাঙ্ক্ষিত এক অনুভূতি দিচ্ছে। এমন অনুভূতি আজ পর্যন্ত পায় নি সে। এই মিষ্টিমিষ্টি ব্যাকুল ব্যগ্রতা কখনো তার হৃদয় ছুঁতে পারেনি। তবে হঠাৎ কেন এই নতুন নাম না জানা অনুভূতির আগমন? কেন এই মোলায়েম অস্থিরতা? কিসের কারণ।

রাহা কেমন যান্ত্রিক বস্তুর মতো একপা দুই পা করে এগিয়ে গেলো বিছানার দিকে। হৃদয়টা তখনো উত্থলিত করছিলো। চোখের পাতায় ভেসে উঠছিলো ভিহান ভাই এর ওই সুগভীর চাউনি, শিউড়ে তুলা কন্ঠ আর কাছাকাছি আসার উষ্ণতা। তখন ভেতরে বিদ্যুৎপ্রভের মতো ছুটে চলা সেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। সব মনে বুদবুদ করছিলো। মনে মনে ভাবতে লাগল,

“আচ্ছা এমন অস্বস্তি কি কেবল আমার ভিহান ভাই এর সামনে গেলেই হচ্ছিলো? আগে তো এমন কষ্টদায়ক অনুভূতি হয়নি। তাহলে ওই জাঁদরেল টার কাছাকাছি গেলে এখন আমার এত অস্বস্তি এত অস্থির লাগে কেন?”

বোকা রাহার মাথায় তখন অনেক কিছু চলছিল। নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজার চেষ্টা করছিলো। সেদিন দাদীর ফোনে রাহেলা আন্টিকে বলা কিছু কথা কানে কড়া নাড়ছিলো। দাদী আন্টিকে বলছিলো, কেউ জাদুটোনা করলে নাকি শরীর এমন অসুস্থ লাগে। ভেতর ছটফট করে, অস্থির অস্থির লাগে। শরীর জ্বালাপোড়া করে। আরো কি কি জানি বলছিলো। সেসব কথাই মনে হতে লাগলো এই মুহূর্তে।

“ভিহান ভাই নিশ্চয়ই আমারে জাদুটোনা করতে চাইছে। আমি যে তারে সহ্য করতে পারি না। কথা শুনতে চাই না। এই কারণে হয়তো আমাকে হাতের পুতুল বানাতে চাইছে। খচ্চার টা তো আমাকে দু চোখে দেখতে পারে না। না না ভিহান ভাই এর কাছে আর যাবোই না। ওই খাডাস লোক এরপর সত্যি সত্যিই আমাকে বশ করে ফেলবে।”

রাতের খাবার টেবিলে রাহা আজ একেবারে চুপচাপ খাচ্ছে মাথা নুয়ে। একটু পর পর আড়চোখে তাকাচ্ছেও ভিহান ভাই এর দিকে। দুই একবার চোখাচোখি হতেই কলিজা কেঁপে ওঠে রাহার। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয়।

খাবার টেবিল নীরব পেয়ে বলে উঠল জিদান, “কিরে বুড়ি? আজ চুপচাপ কেন?”

লতিফা বেগম মাঝখানে বলেন, “আমারে কছ নাকি বদমাইশের হাড্ডি?”

জিদান উনার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাড়িতে কি শুধু তুমি একটা বুড়ি নাকি? এই বাড়িতে তোমার চেয়েও এক বড়ো বুড়ি আছে আমাদের।”

“তা আমার চেয়ে বড় বুড়ি কিভাবে হলো?”

রায়হান খান বললেন, “হলোই তো আম্মা। আপনি কেবল ৫ সন্তানের জননী। আর এদিকে আমার রাহা মা ৮ সন্তানের মা।”

“কিভাবে?”

“এই যে আমি সাদমান আরমান আফসানা জাহানার নীলা আর তোমার দুই মেয়ে।”

“আমার ভাগের পোলামাইয়া নিয়া হেয় বুড়ি হইছে নাকি?”

“ওই একই হলো আম্মা। আমরা দুইটা করে মা পেলাম।”
বললেন সাদমান খান।

রুশমি জবাব দিল, “বাহ ভালোই তাহলে আমি আর কামিলি বানের জলে ভেসে এসেছি মনে হচ্ছে।”

খেতে খেতে উত্তর করলেন আরমান খান, “হ্যাঁ ঠিকি তো ভাইজান এটা তো ভুলই হলো। আমাদের মা তো অনেকগুলা আপনি এটা ভুলে গেলেন কি করে?”

“ভুল হয়েছে আমার। দুঃখিত আম্মা।”

লতিফা বেগম কিশোরীর মতো মুখ মুচড়ে বললেন, “ঢং জন্ম দিছি আমি পোলা আমার আর আম্মা ডাক শুনার হকদার তারা।”

মায়ের মিছেমিছি অভিমান দেখে খান বাড়ির তিন ছেলে একসাথে হেসে ওঠে। এই একটা মাত্র মানুষ তাদের তিন ভাই এর কলিজা। বাবা মারা যাওয়ার পর এই মাকে তিন ভাই মিলে তাদের ছোট্ট বাচ্চার মতো আগলে রেখেছেন। মায়ের এমন কোনো আবদার নেই যা উনারা তিন ভাই কেউ অপূর্ণ রাখেন। বাবা কে হারিয়ে এই মায়ের মমতায় ভরসা গুঁজে পেয়েছেন। আল্লাহ এই মানুষটাকে নিয়ে গেলে তিন ভাই কি করে দিন কাটাবেন তা কেবল আল্লাহ ভালো জানেন। মা যে উনাদের কলিজার টুকরা।

সবাই টুকটাক কথা বললেও আজ রাহা একেবারে চুপ। বিষয়টা সেই কখন থেকে তীক্ষ্ণ নজরে পর্যবেক্ষণ করছে ভিহান। তার কপালে একেবারে সূক্ষ্ম কয়েক ভাঁজ ফুটেছে। এই বদের হাড্ডি এত চুপচাপ কেন আজ? কি হয়েছে? অন্যদিক তো একাই খাবার টেবিলে সবার মাথা খেয়ে নেয়। তাহলে বলদটা আজ থম কেন মেরেছে? কি হয়েছে গাধাটার?

রায়হান খান খেতে খেতে প্রশ্ন করলেন রাহার উদ্দেশ্যে, “আমার ছোট্ট আম্মা। কি হয়েছে আপনার? আজ এত চুপচাপ কেন আপনি?”

রাহা সবার প্রথমে তাকায় ভিহান ভাই এর দিকে। মুহূর্তে চার চোখ এক হয়। হাঁসফাঁস করে ওঠে রাহা। তাকিয়ে দেখে সবাই তার দিকে চেয়ে আছে। রাহা ঢোক গিলে হাসার চেষ্টা করে,

“কিছু হয়নি বড়বাবা। এমনি।”

“এমনি এতো চুপচাপ কেন মা? কেউ তোমায় কিছু বলেছে কি?”

রাহা মাথা নাড়ায়।

“তাহলে কি হয়েছে কথাবার্তা বলছো না কেন?”

“এমনি?”

“এমনি তুমি তো চুপচাপ থাকো না আম্মা। বলো আমায় কি হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে? কারো উপর রাগ করেছো?”

রাহা আড়চোখে একবার ভিহান ভাই এর তাকায়। পরক্ষণে কি জবাব দিবে ভেবে আচমকা বলে উঠল, “জিদান ভাই।”

রাহার হুট করে ডেকে ওঠায় জিদান হকচকিয়ে গেলো। খাবার গিয়ে গলায় আটকাতেই কেঁশে নিজেই পানি তুলে নিলো হাতে। বোকার মতো ড্যাবড্যাব করে নিষ্পাপ মুখে তাকিয়ে রইল রাহার পানে।

রায়হান খান কে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাহা বলে উঠল, “হ্যাঁ জিদান ভাইয়া বড়বাবা। জিদান ভাইয়া আজ আমাদের সাথে বাজি ধরে খেলেছিলো। হেরে গিয়েও আমাদের টাকা দিচ্ছে না। আর মজাও কিনে এনে দিলো না।”

জিদান একেবারে তাজ্জব বনে গেলো। এবার তালু জিহ্বা এক হওয়ার উপায়। এই মেয়ে কত হাড়ে বজ্জাৎ চিন্তা করা যায়? শান্তশিষ্ট পরিবেশটা এই মেয়ে একাই বোম মেরে নষ্ট করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। জিদান হাবলার মতো তাকিয়ে রইলো রাহার পানে।

রাহার এমন চোখের পলকে পল্টি খাওয়ার দৃশ্য দেখে ভিহানের হাসি পেলো। তবুও সে একেবারে নির্বিকার ভঙ্গিতে খাবার খাচ্ছে যেন এসব অহেতুক বিষয় কে পাত্তা দেওয়ার তার সময়ই নেই।

“কেন? জিদান ওদের কে কিছু এনে দিলি না কেন? আর হেরে যখন গিয়েছিসই টাকাটাই বা দিলি না কেন?”

জিদান এখনো নির্বোধের মতো তাকিয়ে আছে রাহার দিকে। মেয়েটা এখন মিনে বিড়ালের মতো তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কে বলবে এত মিষ্টি করে হাসা মেয়েটা একেবারে বিচ্ছু। মুহূর্তে ঘুম হারাম করে দেওয়ার কারিশমা রাখে নিজের ভেতর। দেখো এতক্ষণ চুপচাপ ঘাপটি মেরে থাকা মেয়েটা কেমন দাঁত কপাটি মেলে কি করে হাসছে তাকে কেস খায়িয়ে। যেন সাধু, ভাজা মাছ উল্টে খাবে কি খাওয়াই চিনে না।

জিদান থতমত খেলো। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “ক্ষ্যামা কর মা।”

“মা কিসের আমি তোমার বোন হই ভাইয়া।”

“হ্যাঁ আমার সাত কপালের ভাগ্য যে তোর মতো এত লক্ষ্মী বোন পেয়েছি। কপালডা মাঝেমাঝে পাথরের মাঝে ঘষতে মন চায়। আল্লাহ এত সুখ কেমনে দিলো আমারে?”

“আমার ভাই যে তাই।”

“হো বইন। আমি শুধু তোগো ভাই না। ফ্রি ফ্রি একটা কামলা। যারে যেমনে মন চায় ঠাপানো যায়।”

আফসানা বেগম পাশ থেকে ছেলেকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললেন, “এসব কি কথা? কামলা কি? কামলা কি আর তুই নাকি? এই বাড়ির কামলা চাকর তো আমি। তোর বাপে বিয়ে করে এসে চাকর বাকরের মতো সেই যে ফেলেছিলো আমাকে এই বাড়ি আজো খেটে যেতে হচ্ছে। আমার কোনো দাম আছে? কোনো ইচ্ছার কোনো মূল্য আছে এই লোকের কাছে?”

রায়হান খান হতভম্ব হয়ে গেলেন। ফ্যালফ্যাল করে অবুঝের মতো তাকিয়ে রইলেন স্ত্রীর দিকে। কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়াচ্ছে? কথা হচ্ছিলো কি নিয়ে আর কথা যাচ্ছে কোন দিকে?

লক্ষ্মী মন্ত বউটার হঠাৎ কি হলো? কি নিয়ে এতো রেগে আছে সে? কিছু ঠাউর করতে পারলেন না। নিরপরাধী কন্ঠে বললেন তিনি, “তোমার কি হলো হঠাৎ? এভাবে কথা বলছো কেন?”

“তো বলবো না? আমার কথার কোনো দাম আছে আপনার কাছে? এই বাড়িতে এনে যে দাসীর মতো ফেললেন আর তাকান আমার দিকে? কখন কোনটা প্রয়োজন কোনো খেয়াল রাখেন সেদিকে? আপনার শুধু গ্রাম আর ব্যবসা আছে। আর এদিকে বাড়ি ভেস্তে যাক। সেদিকে আপনার দেখার কোনো দরকার নেই।”

“বাড়ি দেখার জন্যে তো তুমি আছো গিন্নী।”

“হ্যাঁ বিনা পয়সায় তো দাসী একটা এনেছেনই। এবার খেটে মরে যাক। তাতে আপনার কিছু না। বাড়ি গোল্লায় যাক আপনি থাকেন আপনার গ্রামবাসীর উন্নয়ন আর ব্যবসা নিয়ে। আর এদিকে বংশ ছাই হোক।”

আফসানা বেগম রেগে হনহন করে তরকারির বাটি ফেলে চলে গেলেন। সেদিকে হতবিহ্বল নয়নে তাকিয়ে রইলেন রায়হান খান। আরমান খান আর সাদমান খান কে মিটিমিটি হাসতে দেখা গেলো। মনে মনে তারা যেন বলছে, “আজকে ভাইজানের খবর আছে।”

ভিহান যখন নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিলো তখন একপ্রকার ছুটে এলো কামিলি। কাছাকাছি এসে নরম গলায় ডাকল, “ভিহান ভাই” বলে। ভিহানও থামলো। পিছন ফিরে দেখল কামিলি একটু বড় বড় করেই শ্বাস টানছে। তাড়াতাড়ি এসে তাকে ধরতে যে মেয়ের কষ্ট হয়েছে বুঝা গেলো।

“হ্যাঁ বল। কিছু হয়েছে?”

একটু সময় নিয়ে কামিলি বলল, “তোমায় একটা কথা জানানোর দরকার ভিহান ভাই।”

“বল।”

“…

“কিরে?”

“তুমি রাহা কে একটু শাসন করো ভিহান ভাই। ও দিন দিন লিমিট ক্রস করে যাচ্ছে। বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে। ও সবার সামনে তোমাকে আজেবাজে সম্বোধন করে। এটা তো ঠিক না বলো। সবাই কি ভাববে? ওকে বললেও ও শুনবে না। তুমি তো জানো আস্তো বেয়াদব একটা।”

ভিহানের কপাল কুঁচকে এলো। সে সূক্ষ্ম নয়নে একপলক দেখল কামিলি কে। এরপর ধারালো গলাতেই বলল,

“সেটা নয় হয় আমি দেখবো। কিন্তু কামিলি তোরও উচিৎ এটা জানা যে ও তোর কোনো পাড়াপড়শি হয় না। তোর বোন হয়। কিভাবে কথা বলতে হয় কাউকে নিয়ে সেটাও জানা প্রয়োজন তোর।”

ভিহান হনহন করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। কামিলি মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইল সেদিকে। ভীষণ কান্না পাচ্ছে। রাহার নামে বিচার দিতে এসে কি নিজেকে অপরাধী বানালো নাকি ভিহান ভাই এর সামনে? চোখ দুটি মুহূর্তে ভরে উঠল ওর।

রাত তখন ১২ টার উপরে। রাহা পা পিটপিট করে সামনে এগিয়ে আশপাশ তাকালো। সবাই ঘুমিয়ে গিয়েছে। ড্রয়িংরুমে আবছা আলো দেখা যাচ্ছে। কেউ নেই বুঝায় গেলো। হাতে তার একটা পারসিয়ান ক্যাট। অন্ধকারে একটু রাহার ভয় হয়। তাই কোলে নিজের পোষা প্রাণী কে নিয়ে এসেছে। ওর নাম ডোরা। যেন তুলোর বলের মতো নরম আর রাজকীয় এক সৌন্দর্যের প্রতীক। তার লম্বা, ঘন, সিল্কি লোম তুষারের মতো শুভ্র। আলো পড়লে ঝিকমিক করে ওঠে। গোলগাল মুখ, চাপা ছোট্ট নাক, আর বড় বড় কাঁচের মতো উজ্জ্বল চোখ কখনো নীল, কখনো সবুজাভ বা সোনালি আভায় ভরা। তবে ডোরার চোখ দুটি একদম নীল। সাদা ধবধবে লম্বা লম্বা কোমল লোমের সাথে ঘন নীল চোখের ডোরা কে দেখতে বড্ড আদুরে লাগে। তাকালে যেন মনে হয় এক টুকরো আকাশ। নীল এক টুকরো আকাশের সবটা তুলোর মতো কুয়াশায় ডাকা। অবশ্যই মাঝে মাঝে আলোর প্রতিফলনে রং টা একটু ভিন্নও দেখায়।

এই ডোরা কে নিয়ে যে তার কত কাহিনী আছে তা বলার মতো নয়। ওকে পেতেও তার যে কত মেহনত করতে হয়েছে তা শুধু সে জানে। ওর সতেরোতম জন্মদিনের উপহার হিসেবে পাওয়া এই ডোরা তার কাছে খুবই দামী। কারণ এই ডোরা কে সে এমনি এমনি পায়নি, উপহার হিসেবে ওকে চেয়ে কান্নাকাটি করে নিতে হয়েছে।

একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে একটা ছেলের হাতে ওমন সাদা একটা বিড়াল দেখতে পেয়েছিলো ও। এক চোখ নীল আরেক চোখ হ্যাজেল রঙ এর। ওই তুলতুলে সাদা বিড়াল টা দেখে ওর বড্ড লোভ হয়েছিলো। বাড়ি ফিরে নেটে ঘাটাঘাটি করে পারসিয়ান ক্যাট তার মাথায় ঢুকে গিয়েছিলো। যেন যেকোনো মূল্যে তার এটা চাই।
এরকিছু দিন পরই ওর জন্মদিন ছিল। সেই উপলক্ষ্যে বাড়ির এমন কাউকে বাদ রাখেনি হাতে পায়ে ধরতে তাকে একটা পারসিয়ান ক্যাট কিনে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু কেউ কিনে দিতে রাজি হয়নি। জিদান ভাই এর পায়ে পড়েও বসেছিলো। কিন্তু কেউ কিনে দিলো না। কারণ ভিহান ভাই এর কড়া নিষেধ ছিলো বাড়িতে কোনো পোষাপ্রাণী না আনার।

এর অবশ্য একটা কারণ আছে ছোটবেলার। রাহার বয়স তখন ৭ কি ৮। ভিহানের বয়স তখন ১৬। ও শখ করে রাস্তার ধার থেকে একটা কুকুর ছানা নিয়ে এসেছিলো। সেটাই যেনো কাল হয়েছিলো ওর। রাহা নাওয়া খাওয়া ভুলে দিনরাত সেই কুকুরছানার পিছনে পড়ে থাকতো। একসময় বাড়ির সবাই অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলো রাহার ওমন কাণ্ডে। একদিন হঠাৎ করে ঘুম থেকে ওঠে দেখলো কুকুরছানা টা বাড়ির উঠানে মরে পড়ে আছে। তা দেখে রাহার সে কি কান্না। সেই কুকুরছানার শোকে মেয়েটা ভীষণ অসুস্থও হয়ে গিয়েছিলো। এমনকি দুই দিন হসপিটালেও থাকতে হয়েছিলো ওকে নিয়ে। সেই থেকে ভিহান সবাই কে বারণ করে দিয়েছিলো বাড়িতে আর যেনো কোনো পোষাপ্রাণী না আনা হয়।

শেষেমেষ রাহা ভিহান ভাই কে কল দিলো বিড়ালের জন্য। কেঁদেকেটে নিজের আবদার জানালো,

“ভিহান ভাই, আপনি খুব ভালো ভিহান ভাই। বাড়ির সবাই পঁচা। কেউ আমায় একটা বিড়াল কিনে দিচ্ছে না। আপনি তো অনেক ভালো চাকরি করেন, টাকা আছে আপনার। আপনি একটা বিড়াল কিনে দিন না আমায়। আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো। আপনার সব কথা আমি শুনবো। তবুও একটা বিড়াল কিনে দিন না আমায়। জন্মদিনের উপহার হিসেবেই একটা বিড়াল চাই আপনার কাছে। কিনে দিন না একটা বিড়াল।”

কিন্তু সেদিন ভিহান মুখের উপর না করে দিয়েছিলো। রাহার সে কি কান্না। এরপর উঠতে বসতে অনবরত ভিহান ভাই কে কল করেছে সে। তার জ্বালায় ভিহান নিজের ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে। এরপরই রাহা কান্নাকাটি করে খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। পুরো একদিন জেদী মেয়েটা কিছু খায়নি। একেবারে বিছানায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

ঢাকায় বসে ভিহান এই খবর পেয়ে নিজেই কল দিয়েছে রাহা কে। নরম সুরে কথা বলে জানিয়েছে, “আমায় যদি কথা দিস বিড়াল পাওয়ার পরও তুই খাওয়া গোসল পড়াশোনা বন্ধ না করে সময় মতো সব করবি তবেই ভেবে দেখবো আমি।”

ভিহান ভাই এর কথায় রাজি হয়েছিলো রাহা। এরপরই ঠিক জন্মদিনের সকাল বেলায় বড় একটা পার্সেল এসেছিলো খান বাড়িতে। খুব সুন্দর ফুল দিয়ে ডেকোরেশন করা বড় বক্সটাতেই ছিল ধবধবে সাদা লোমশ একটা পারসিয়ান ক্যাট। ওটা পেয়ে রাহার সে কি উচ্ছ্বাস। ওর আনন্দ আর খুশির ভিডিও দূর থেকে ঢাকায় বসে একজন লোক যে গভীর ভাবে দেখেছে সেটা বোধহয় রাহা আজও জানেনি।

খিদে পেয়েছে রাহার তাই পা টিপে টিপে চলে গেলো কিচেনের দিকে। ডোরা কে কোল থেকে নামিয়ে শাসিয়ে বলল, “একদম দুষ্টিমি করবি না বলে দিলাম। এদিক ওদিক ছুটোছুটি করে যদি কিছু ফেলিস তাহলে মাম্মাম কিন্তু মারবো। ওকে?”

অবুঝ ডোরা কি বুঝল কে জানে? নীল চোখ গুলি নিয়ে তার মালকিনের দিকে তাকিয়ে মোটা লেজটা নাড়িয়ে মেউ করে উঠল। ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে রাহা ফ্রিজ খুলল। এই মাঝরাতে খুব ভারি কিছু খায় না ও। চিপস চানাচুর বিস্কিট একটা হলেই হয়। কিন্তু ঘরে আর কিছু নেই। আবার মনটা অন্য কিছু খেতে চাইছিলো তাই নিচে এসেছে। বিকেলে যে মা পুডিং বানিয়েছে তা রাহা দেখেছে। সেটা নিতেই এলো। ফ্রিজে লোভনীয় পুডিং দেখেই খুশি হয়ে যায় ও। ফ্রিজের ঢালা লাগিয়ে যেই পিছন ঘুরতে যাবে ওমনি শক্তপোক্ত কিছু একটার সাথে লেগে চমকে ওঠে রাহা। অন্তরআত্মা কেঁপে ওঠে ওর। আচমকা হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে, “ও মাগো ভূত” বলে চেঁচিয়ে উঠল। ভারসাম্য রাখতে না পেরে যেই পিছনে হেলে গিয়ে পড়তে যাবে ওমনি আবছা মানবটা শক্তহাতে তার কোমর পেঁচিয়ে ধরল। এক হাতে রাহার হাতে থাকা পুডিং আর অন্য হাতে মেয়েটার কোমর চেঁপে ধরে সামলে নিলো সবটা। রাহার পুরো শরীর অবশ হয়ে গেলো। হীম শীতল স্রোত বইতে লাগলো শরীরে। এখুনি বুঝি লুটিয়ে পড়বে ও।

ভুত তার কোমর পেঁচিয়ে ধরেছে। বিষয়টা ভেবেই তড়তড় করা রাহা বোবা হয়ে গেলো। হাত পাও কাঁপছে। সবসময় শুনে এসেছে ভূত মানুষের ঘাড় মাটকে দেয় আর তার সাথে ঘাড় মটকে দেওয়ার বদলে কি কোমর মটকে দিবে নাকি?

ভূতের মুখ দেখা যাচ্ছে না। পুরো কালো দেখাচ্ছে শুধু। আবছা মানব টার অন্ধকার মুখটা দেখে রাহা তোতলায়, “ভূ..ভূওত..”

“ইডিয়েট ঠিক করে দাঁড়া।”

ওই রাগী গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনে আবারও হুঁশ উড়ে যাওয়ার উপায় রাহার। লেগে আসা কন্ঠে বলল,

“কে..কে আপনি? ভূওত? আ..আপনি ভিহান ভাই এর কন্ঠ ন..নকল করছেন? সর্বনাশ! ওই জল্লাদ লোকটা যদি জানতে পারে আপনি উনার কন্ঠ নকল করেছেন ভূত ভাই তবে উনি আপনাকে কসাই এর মতো টুকরোটুকরো করে কেটে ফেলবে কিন্তু। বাঁচতে চাইলে পালান তাড়াতাড়ি। নয়তো উনাকে ডাকছি আমি। দাঁড়ান বলছি উনাকে আপনি উনার কন্ঠ নকল করছেন।”

“স্টুপিড কোথাকার।”

ভিহান রাহা কে ধরেই একটু ঘুরতেই আবারও হকচকিয়ে যায় রাহা। চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকে রাহা। এক প্রকার ঘোরের মাঝে বলে ওঠে,

“এ কি ভূওত ভাই, আপনি তো দেখতে একেবারে হুবহু আমার ভিহান ভাই এর মতো। উনার লেবাসও মেরে দিলেন?”

সজাগ থাকলে মাঝরাতে রাহার খিদে পায় এটা ভিহান ভালো করেই জানে। সেই কারণে আগে থেকেই যেন অপেক্ষা করছিলো রাহার আসার। কিন্তু গাধাটা এক মুহূর্তে মেজাজ বিগড়ে দিতে পারে। ভিহান রাগে দাঁত কটমট করে বলল,

“কানের নিচে দুইটা খেলে তোর মাথা থেকে ভূত বাপ বাপ করে পালাবে স্টুপিড।”

“আপনি তো দেখি কথাও বলেন একেবারে ভিহান ভাই এর মতো। সত্যি কি আপনি ভিহান ভাই নাকি ভূতই?”

“বললামই তো থাপ্পড় না খাওয়ার আগে হয়তো বুঝবি না কোনটা সত্যি আর কোনটা তোর ভ্রম।”

রাহা থতমত খেলো। না এবার যেন তার বিশ্বাসই হচ্ছে এটা ভূত হতেই পারে না। এই জাঁদরেল কে হুবহু কপি করার ক্ষমতা এই পৃথিবী তে কারো নেই। ভূতেরও নয়। পরপর পলক ঝাপটে রাহা নিজেকে ধাতস্থ করলো। ভিহান ভাই এখনো তার কোমর পেঁচিয়ে রেখেছে বিষয়টা বোধগম্য হতেই আবার সেই ধুকপুক ধুকপুক ধ্বনি বাড়তে আরম্ভ করলো। আলোড়িত করে তুলল বুকের গহীনটা। সর্বনাশ! এই লোকের কাছাকাছি এলেই কি তার সেই অস্বস্তি কিলবিল করে ওঠে? বিচলিত হয়ে রাহা হাঁসফাঁস করার আগেই ভিহান তাকে ছেড়ে কিঞ্চিৎ দূরে দাঁড়ালো। প্যান্টের পকেটে হাত রেখে মোটা গলায় প্রশ্ন করলো,

“চুরের মতো এখানে কি করছিস?”

রাহার সমস্ত অনুভূতি অস্বস্তি মুহূর্তে উবে গেলো। কপালে বিস্ময়ে ভাঁজও পড়ল। ভিহান ভাই তাকে চোর বলল? বিষয়টা বোধহয় ঝগড়ুটে রাহার গায়ে লাগল। জোর গলায় বলল,

“আপনি আমায় চোর বলছেন?”

“তো?”

“তো মানে কি? আপনি আমায় চুর বলতে পারেন না। এটা আপনার ঘর নয় আর না তো আমি চুরি করতে এসেছি। এটা যেমন আপনার বাড়ি আমারও বাড়ি। সমান সমান অধিকার। আর এটা তো রান্নাঘর। আপনি আমায় চোর বলবেন কেন?”

“কারণ তুই চুরি করিস তাই।”

রাহার রাগ লাগল। দাঁত কেটে সেও প্রশ্ন করলো,

“কি চুরি করেছি আমি? আপনি কেন আমায় চোর বলবেন হ্যাঁ?”

“তুই কি ভাবিস আমার রুম থেকে যে তুই আমার পারফিউম চুরি করিস সেটা আমি জানি না?”

এবার রাহার মুখটা চুপসে গেলো। মুখের উপর চোর সাব্যস্ত করায় অপমান বোধ আর লজ্জায় মাথা নুয়ে নিলো সে। খবিশ লোকটা ভুল কিছু বলছে না। তাই বলে একজন কে এভাবে মুখের উপর বলবে নাকি? বিষয়টা একটু পছন্দ হলো না ওর। কথায় আছে চোরের মার বড় গলা। নিজের সাফাই গাইতে বলল সে,

“আ..আপনি এভাবে আমায় চু..চুর বলতে পারেন না। কে কেএএ বলেছি আমি আপনার পারফিউম চুরি করি? হ্যাঁ? কোনো প্রমাণ আছে আপনার কাছে?”

ভিহান ঠোঁট কামড়ে হাসলো। আবছা আলোয় সেই গূঢ় হাসি দেখতে পেলো না রাহা। ওর দিকে একটু ঝুঁকে কন্ঠ খাঁদে ফেলে ফিসফিস করল ভিহান,

“আছে। দেখাবো?”

এবার সত্যি ধরা গেলো। আমতাআমতা করলো মেয়েটা। ভিহান ভাই যে ধুরন্ধর মানুষ তা জানার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এই লোক কি করে জানে সে পারফিউম আনে ওখানে থেকে। ভিহান তার চাচাতো ভাই হয়। একটা পারফিউম নিতেই পারে। এটাকে নিশ্চয়ই চুরি বলে না।

গলা টেনে টেনে নিজেই আগ বাড়িয়ে বলতে লাগল রাহা, “দ..দেখুন আপনি আমার চাচাতো ভাই হোন। সম্পর্কে আমরা চাচাতো ভাই বোন হই। একটা পারফিউম নিতেই পারি। এটা দোষের কিছু না। ভাই এর জিনিস তো বোন নিতেই পারে তাই না?”

ভিহানের কানে গলিত লাভা পড়ল মনে হয়। চোয়াল দৃঢ় হয়ে এলো। প্রচণ্ড রাগে দাঁত পিষে বলল, “বলদের বাচ্চা মুখ সামলে কথা বল। তোকে ইহজন্মে আমি বোন বলে কোনো দিন মানি নি আর মেনে নিবোও না। আই রিপিট এগেইন স্টুপিড, মানি না তোকে বোন বলে।”

রাহা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল ভিহান ভাই এর দিকে। আবছা আলোতেও চোখ দুটি লাল দেখালো। লোকটা হঠাৎ রেগে গেলো কেন সে বুঝলো না। তবু ক্ষীণ গলায় বলল,

“এটা তো আমার সাথে বৈষম্য হয়ে যায় বলুন ভিহান ভাই। আপনি কামিলি আপু রুশমি আপু কে বোন বলে মানুন কিন্তু আমায় কেন বোন বলে মেনে নিতে পারেন না? কি করেছি আমি? আমার কি দোষ সেটা তো বলুন।”

“এই দুনিয়ার সকল নারীলোক কে আমি মা আর বোন বলে মেনে নিলেও তুই স্টুপিড কে কোনোদিন মানবো না।”

ভিহান ভাই এর কথা শুনে রাহার চিত্তে ভাবুক ভাব ফুটে ওঠে। কপালে কিঞ্চিৎ রেখা তুলে জানতে চায়,

“কিন্তু ভিহান ভাই সবাই কে যদি আপনি মা বোন বানান তাহলে বউ বানাবেন কাকে? কাকে বিয়ে করবেন পরে?”

রাহার এই বলদমার্কা কথা শুনে ভিহানের শরীর জ্বলে উঠল। ইচ্ছা হলো এই গাধাটাকে এখানেই আছাড় মারতে।

“ও ভিহান ভাই, বললেন না তো সবাই মা বোন হলে বউটা হবে কে।”

রাগে ভিহানের শরীর নিশপিশ করলো। দাঁতে দাঁত চেঁপে বলল, “তুই হলি মাথামোটা বলদ। তোর ওই গাধার গিলুতে এত কঠিন প্রশ্নের উত্তর আসবে না ইডিয়েট।”

আবারও রাহা অপমান বোধ করলো। পাল্টা কিছু বলবে তার আগে ভিহান বলল আবারও,

“এবার বল আমাকে উদ্ভট নামে বকিস কেন?”

রাহা শুকনো গলায় ঢোক গিলল। তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো ভিহান ভাই এর মতিগতি।

“বকি? আমি? আমি আপনায় বকি ভিহান ভাই? মাথা খারাপ আমার? আপনার মতো জ..”
থেমে গেলো মেয়েটা। হাসার চেষ্টা করে বলল, “আমি আপনায় বকি না ভিহান ভাই আপনি ভুল করছেন।”

বেশ শান্ত আর স্বাভাবিক গলায় জবাব দিলো ভিহান, “একটু আগে আমার সামনেই আমাকে জাঁদরেল বলেছিস।”

এই রে এবার কি হবে। রাহা গাঁইগুঁই করে বলল, “বড় মা তুমি এখানে? ভিহান ভাই ওই দেখুন আপনার পিছনে বড় মা দাঁড়িয়ে আছে।”

ভিহান শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে ঠোঁট প্রসারিত করলো। একটুও বিচলিত হলো না আর না ভুলেও পিছন ঘুরলো। সে হাত বাড়িয়ে রাহার হাতে থাকা পুডিং এর প্লেটটা টেনে নিয়ে টেবিলের উপর রাখল। স্থির কন্ঠে বলল,

“তোর স্টুপিড ব্রেইন আমার মাথায় নেই। বোকা বানাতে চাস নাকি?”

রাহা বুঝলো এই খাডাস লোক তাকে শাস্তি দেওয়ার পায়তারা করছে। তাই আগবাড়িয়ে বলল,

“রাত ফুরিয়ে যাচ্ছে ভিহান ভাই আমি এখন ঘরে যাই। দে দেখুন আমার ডোরাও আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছি আমি বরং যাই।”

রাহা দ্রুত বেগে হাটতে চাইলে পথ আগলে দাঁড়ালো ভিহান।

“উঁহু। কোথাও যাবি না।”

“আমার ঘুম পেয়েছে ভিহান ভাই।”

“এতক্ষণ পায়নি?”

“না।”

“তবে এখন কেন পাচ্ছে?”

“আ..আপনাকে দেখে।”

“বাহ আমি তোর ঘুমের মেডিসিন নাকি? আমাকে দেখলি আর ঘুম চলে এলো?”

রাহা বুঝলো এই লোক তাকে শাস্তি না দিয়ে ছাড়বে না। খবিশ কি না!

“দে দেখুন ভিহান ভাই আপনার শাস্তি কাল নিবো। এখন দয়া করে আমাকে যেতে দিন। এই রাতের বেলায় কঠিন কোনো শাস্তি দিয়েন না দয়া করে।”

“ঠিক আছে কঠিন শাস্তি দিবো না। কান ধরে তিন বার উঠবস কর। প্রতিবার উঠবস করায় বলবি, আমার ভুল হয়ে গিয়েছে ভিহান ভাই আপনায় আর বকবো না।”

রাহা মুখ হা করে তাকিয়ে আছে ভিহান ভাই এর দিকে। তা দেখে ভ্রু নাচিয়ে বলল ভিহান,
“কি হলো? ছোট শাস্তিই তো দিলাম। নে শুরু কর।”

“আ আমি পারবো না।”

“কি বললি?”

ভিহান ভাই এর গরম চোখ দেখেই কাবু হয়ে যায় রাহা। চোখে মুখে ফুটে করুন ভাব।

“মাফ করে দিন না। বললাম তো আর করবো না।”

“হ্যাঁ সেটা কান ধরে উঠবস করতে করতে বলল।”

“ওভাবে না বললে কি আপনার কোনো ক্ষয় হবে? হাত পা কোনোটা পঁচে যাবে? ঘুম হবে না রাতে?”

“না হবে না। শুরু কর এবার। যত দেরি করবি রাত তত বাড়বে।”

রাহা জানে এই খাডাস লোক যা বলবে তা করেই ছাড়বে। উপায়ন্তর না পেয়ে ভোতা মুখ করে কান ধরল সে।

নিরেট গলায় বসতে বসতে বলল, “আমার ভুল হয়ে গিয়েছে ভিহান ভাই আপনায় আর বকবো না।”

ভিহানের বড্ড হাসি পেলো। ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে ঠোঁট ঢেকে সেই হাসি আড়াল করার চেষ্টা করলো সে।

“কিরে বসা থেকে আজ উঠবি না নাকি?”

ভিহান ভাই এর টিপ্পনী কথার জবাব দিলো না রাহা। গম্ভীর চোখ মুখে কান ধরে উঠতে উঠতে বলল আবারও, “আমার ভুল হয়ে গিয়েছে ভিহান ভাই আপনায় আর বকবো না।”

“সবে একবার। আরো দুবার বাকি।”

রাগে রাহা দাঁত কটমট করল। দ্রুত বেগে কান ধরে বিড়বিড় করতে করতে উঠলো আর বসলো।

বিষয়টায় ভিহান মনে মনে খুব মজা পেলেও বাহিরে স্বাভাবিক থাকলো। হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে একটা আপেল তুলে তাতে কামড় বসালো। দেখলো পায়ের কাছে রাহার ডোরা ঘেঁষাঘেঁষি করছে।

“এটাকে আমার থেকে দূরে রাখবি।”

আপেলের গায়ে আরেকটা কামড় বসিয়ে সেটা আবার রাহার হাত টেনে ওর হাতে ধরিয়ে দিলো। ভিহান ভাই এর কামড় দেওয়া আপেলের দিকে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থেকে বলল রাহা,

“এটা কি হলো? আপনি আমাকে আপনার এঁটো আপেল কেন দিলেন?”

“খাবি তাই।”

“আপনার কামড়ে দেওয়া আপেল খাবো আমি? পেটুক হতে পারি তাই বলে রাহা ছোঁচা না।”

ভিহান প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে মিটিমিটি হাসতে হাসতে কিছুটা এগিয়ে গেলো। সিঁড়ির কাছে খানিক ঘাড় বাঁকিয়ে রাহার মুখ পানে তাকিয়ে মিহি গলায় বলল এবার,

“তুই তুনরা খান রাহা একদিন স্বেচ্ছায় আমার এঁটো খাবার তৃপ্তি নিয়ে খাবি। এবং ওটা তোর দুনিয়ার সবচেয়ে প্রিয় খাবার হবে। মার্ক মাই ওয়ার্ড।”

ভিহান ভাই গা ছাড়া ভাব নিয়ে কেমন চলে যাচ্ছে। সেদিকে নির্বোধের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রাহা। বিষয়টা বোধগম্য হতেই তাকালো হাতে থাকা আপেলটার দিকে।

“উমমম, জীবনেও না।”
বলতে বলতে আপেলটা টেবিলের উপর রেখে দিলো। ভিহান দুতলায় যেতে যেতে রাহার কথা শুনে মুচকি হাসলো,

“তোর এই এক জীবন ভিহান আরভিদ খানের লিখিত দলিল, মাই বাটারফ্লাই।”

চলমান……

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply