কাজরী-৩৩
সাবিকুননাহারনিপা
সন্ধ্যেয় শুরু হওয়া পার্টি শেষ হলো বারোটা বাজার আগেই। চৌধুরী প্যালেসে ডিনার পার্টি হলো, সেখানে ম*দের আয়োজন নেই, হই হুল্লোড়, আড্ডাবাজি নেই। খাবারের মেনুও দেশী স্টাইলে পরিবেশন করা হয়েছে। ইশানের সো কল্ড ফ্রেন্ড সৌমিক খোঁচা মেরে বলল,
“ব্রো, তোমার পার্টি এমন ম্যারম্যারে কেন? জোশ নাই তো। “
ইশান হালকা হেসে বলল,
“এখন আমি তোদের নিয়ে মদের আসর জমাবো বাড়িতে? সোশ্যাল স্ট্যাটাস রাখতে তোদের পার্টিতে ইনভাইট করা। নাহলে এখানে যাদের ইনভাইট করা হয়েছে তাদের সঙ্গে তোরা ইনভাইটেড হবার মতো যোগ্যতা অর্জন করিস নি। “
সৌমিক থতমত খেয়ে যায়। ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে সৌমিক। তার বাপেরও পয়সার অভাব নেই, তবে ইশানের বাপের মতো দিলখোলা না। পুরো সাম্রাজ্য দিয়ে গেল ছেলের নামে লিখে। সাম্রাজ্য পেয়ে ইশান নিজের স্বভাব চরিত্র শুধরে নেবার চেষ্টা করছে। পার্টি, ক্লাবে এখন ওদের দেখা, সাক্ষাৎও হবে খুব কম। ইশান বিচিত্র চরিত্রের মানুষ। ওদের মতো লাগামছাড়া জীবন যাপন করে নি। সিগারেট, মদ খেলেও সেটাকে নেশার পর্যায়ে নেয় নি। ফ্যামিলির সমস্যা বলে একটা সিম্প্যাথি আদায় করতো, অথচ বাপ ও’কে রাজকীয় সিংহাসনে বসিয়ে দিয়ে গেছেন রানি সহ।
ইশান পার্টিতে ঘোষণা করলো যে ওর মা শিরিন চৌধুরী বাবার অপূর্ণ ইচ্ছে পূরণ করতে রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছেন। সেই ব্যাপারে ওর পূর্ণ সমর্থন আছে।
সবকিছু নির্বিঘ্নে ঘটলো। আখতারউজ্জামানও এসেছিলেন। শিরিন আজ তার সঙ্গে ভালো করে কথা বললেন। স্বাভাবিক হবার সবরকম চেষ্টা করলেও পরিচিত মানুষের কাছে তার অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লো।
এই পার্টিতেই অনামিকা আর ওর পরিবার জেনে গেল যে চৌধুরী গ্রুপের সবকিছু ইশানের কন্ট্রোলে থাকবে। এই খবরে তারা মুষড়ে পড়লো। এখন তারাও সন্দিহান বিয়ের কথাবার্তা আর আগাবেন কী না!
সব কিছু মিটিয়ে ইশান যখন ঘরে প্রবেশ করলো তখন ঘড়ির কাঁটায় দেড়টা বাজে। কাজরী ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে বসে অলংকার গুলো খুলে রাখছিল। ইশানের প্রবেশ উপলব্ধি করে সতর্ক হলো।
ইশান ব্লেজার টা খুলে সোফার উপর রাখার সময় প্রশ্ন করলো,
“আর ইউ ওকে নাউ?”
কাজরী জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো। ইশান বলল,
“তুমি ভয় পাচ্ছিলে যে কিছু একটা ঘটবে! সবকিছু শান্তিপূর্ণ ভাবেই হয়েছে কিন্তু। “
কাজরী জবাবে স্মিত হাসলো। মনে মনে ভাবলো, প্রবল ঝড়ের আগে সবকিছু শান্তই থাকে।
ইশান কাজরীর পাশে এসে দাঁড়ালো। পারফিউমের হালকা গন্ধটা অনুভব করলো কাজরী। ও তাকালো ইশানের দিকে। ইশান বলল,
“পুলসাইডে বসবে কিছুক্ষন আমার সঙ্গে? “
বাক্যটায় কী যেন ছিলো। অনুরোধ, অনুনয় কিংবা আদেশ না। নরম গলায় উচ্চারণ করা ভালোবাসার আকুতি যেন। কাজরী মাথা নেড়ে সায় দিলো।
পুলসাইডে লাল, নীল মৃদু আলো জলছে। পানির রঙটা দুইরকম দেখাচ্ছে। আকাশভরা অগুনিত তারকা মেলা বসেছে। কাজরীর গা ঘেঁষে ইশান আধশোয়া অবস্থায় আছে। ইশান গভীর গলায় বলল,
“আজকের দিনটা আমার স্পেশাল একটা দিন। “
কাজরী প্রশ্ন করে,
“কেন? আজ উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেছে। তোমার গার্লফ্রেন্ড তো আজ ইনভাইটেড ছিলো না!”
ইশান হেসে ফেলল। বলল,
“এক্স! এক্স গার্লফ্রেন্ড হবে। এক্সদের আমি তেমন গুরুত্ব দেই না। তাছাড়া আমার এক্স গার্লফ্রেন্ড পার্টিতে থাকলে তুমি স্বাভাবিক থাকতে?”
কাজরী ড্যাম কেয়ার ভাব আনার চেষ্টা করলো। বলল,
“আমি কেন অস্বাভাবিক হতাম? স্ট্রেঞ্জ!”
ইশান মৃদু হাসে। কিছু সময় চুপ থেকে বলে,
“আমার এখন যে সময় টা চলছে সেটাকে গোল্ডেন টাইম বললেও কম বলা হবে! ডায়মন্ড টাইম বলা যেতে পারে, তাই না?”
কাজরী ঠোঁট উল্টে বলল,
“সেরকম ই। তোমার স্বভাবেও বেশ পরিবর্তন আসছে। “
“আগেও একবার বললে তো! তোমার ভালো লাগছে না? নাকি বোল্ড, এগ্রেসিভ হাজবেন্ড বেশী পছন্দ? বাই দ্য ওয়ে, আমি ওরকমই আছি। শুধু একটু ম্যাচিউর হবার চেষ্টা করছি। “
“ভেরি গুড ইশান। “
ইশান কাজরীর চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলো,
“ভেরি গুড? শিওর?”
কাজরীকে বিভ্রান্ত দেখালো। কপালের পাশে লেপ্টে থাকা চুলগুলো কানের পাশে গুজে দিয়ে ইশান হঠাৎই বলল,
“আই লাইক ইউ কাজরী। “
কাজরী বিস্মিত হলো না। ওর এক্সপ্রেশন বলছিল, ও জানে ব্যাপার টা। কিছু বলল না। ইশান আবারও বলল,
“তুমি কতটুকু সৎ, তোমার ইনটেনশন কী? আর কী কী রহস্য লুকিয়ে রেখেছ মনে সেসবের বাইরে এই ব্যাপার টা সত্যি যে আমি তোমাকে পছন্দ করি। আই ফিল সামথিং…
কাজরী কানে, গালে গরম ভাপ অনুভব করে। বুকের ভেতর বিদ্যুৎ চমকানোর মতো অনুভব হয়। শব্দমালা এলোমেলো ঠেকে। ইশান তাকিয়েই আছে। হয়তো প্রত্যাশা করছে কাজরীর অনুচ্চারিত শব্দগুলো যেন হৃদয় কাঁপার মতো হয়।
কাজরী নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
“অনেক রাত হলো…. উঠি এখন?”
ইশান মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। কাজরী দ্রুত প্রস্থান করলো।
ইশান শুয়ে আকাশ দেখছে। তারাগুলো যেন ঝলমল করছে। ঠোঁটে লেগে আছে এক চিলতে মিষ্টি হাসি। চৌধুরী প্যালেসের পুলসাইডে যে ইশান শুয়ে আছে সে এখন প্রচন্ড স্বার্থপর। মায়ের টালমাটাল জীবন, নিশানের ট্রমা, কোনোকিছুই স্পর্শ করছে না। ও শুধু ভাবছে এই ভালো সময়টায় একজন ওর সঙ্গে সারাজীবন থেকে গেলে ভালো হয়। যাকে ওর নিজের বলে মনে হয়। ও’কে ভালোবাসলে তার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকবে। কাজরী যদি আরও কিছুক্ষন এখানে ওর সঙ্গে থাকতো তবে ও অনুনয় করে বলতো,
“থেকে যাও কাজরী, আমার জীবনে থেকে যাও। অতীতের ট্রমা, রিভেঞ্জ গেম এসবের বাইরে আমাদের একটা অন্যরকম গল্প হোক। স্বাভাবিক মানুষের জীবনের গল্প যেমন হয় তেমন। “
কাজরী চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে বিছানার নরম গদিতে। ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে যাবার কথা। কানে শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠছে বারবার। আই লাইক ইউ কাজরী। স্বাভাবিক একটা কথা। কিন্তু আসলেই কী স্বাভাবিক। ওরা দুজন দুজনকে প্রচন্ড অপছন্দ করেছে। অপমানও করেছে একজন আরেকজনকে। অনেকটা সময় কাছাকাছি থেকে মায়ায়ও পড়ে গেছে। কাজরী অস্বীকার করতে পারবে না যে ইশানের জন্য ওর মায়া আছে। রক্তাক্ত হাত দেখে ওর আতঙ্কিত হওয়া, প্রবল জ্বরে উত্তাপ মাপা সবকিছুতে মিশে ছিলো মায়া। কাজরী দূর্বল হতে চায় নি বলে মন শক্ত করতে বাধ্য হয়েছে। নিজের প্রতি বিরক্ত হয়েছে বারবার। কিন্তু অবচেতন মন ইশানের কথা ভাবতে বারবার বাধ্য করেছে।
কাজরী অস্থির হয়ে উঠে বসে। এক নি:শ্বাসে অনেকটা পানি খেয়েও তৃষ্ণা মিটাতে পারে নি। নিজের প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণায় মন ভরে ওঠে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে, মনে মনে প্রশ্ন করে, কার জন্য দূর্বল হচ্ছো কাজরী! কেন দূর্বল হচ্ছো! তুমি কী ভুলে গেছ সব! তোমার মা, তোমার শৈশব, কৈশোরের সেই সব খারাপ দিনগুলো। তোমার কাছে কোনো পরিবার ছিলো না। বাবা ছিলেন না, মা ছিলেন না, কেউ ছিলো না। অন্যের আশ্রয়ে, করুনায় বড় হয়েছ। তোমার কাছে কিচ্ছু ছিলো না কাজরী! কেউ ছিলো না!
ঠিক সেই সময় আরেকটা সত্তা বেরিয়ে এসে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
“যা কিছু ছিলো না, সেসব কিছু এখন তো হতে পারে কাজরী! তোমার একটা পরিবার হতে পারে। হাজবেন্ড, সংসার, বাচ্চা সবকিছু তো হতে পারে। আক্ষেপ করার সময় তো নিজের না থাকা সবকিছু নিয়ে আক্ষেপ করো। এখন যদি তোমার আঁচলে এসে সব ধরা দেয় তখন তুমি অন্যের প্রতি করা প্রতিজ্ঞার কথা কেন ভাবো! আগে তুমি নিজেকে নিয়ে ভাবো কাজরী! আগে তুমি নিজের জন্য লড়ো, আগে নিজের কথা ভাবো! এই আয়নায় নিজেকে তুমি দেখো কাজরী। কতো সুন্দর তুমি! কী চমৎকার ব্যক্তিত্ব তোমার! কেউ ভালোবাসতে চাইলেই তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে কেন? ফিরিয়েই যদি দাও, তাহলে তোমার জীবনে ভালোবাসা বলে কোনো কিছু তো কখনো থাকবেই না। আফসোস ই বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন।
কাজরী ছুটে চলে যায় ওয়াশরুমের দিকে। চোখে, মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। চুল খামচে ধরে বুকভরে নি:শ্বাস নেয় বারবার। বুকের বা পাশে হাত রেখে অনুভব করতে চায় সত্যিই হৃদয় বলে কিছু অবশিষ্ট আছে ওর এখনো। আছে নিশ্চয়ই, নাহলে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো অনুভূতি সৃষ্টি হবার কথা নয়।
ইশান যখন ঘরে প্রবেশ করে তখন রাত শেষের দিকে। মৃদু আলোয় কাজরীকে দেখা যাচ্ছে। ইশান নি:শব্দে হাসে, নিখুঁত ঘুমের অভিনয় করেও কাজরী ওর কাছে ধরা পড়ে যায়। ইশান তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষন। সেই প্রথম রাত থেকে, কোনো কারণ ছাড়াই ভালো লাগতো তাকিয়ে দেখতে। মাঝেমধ্যে আলতো করে ছুঁয়েও দেখেছে ওর গাল, নাক, কপাল। কাজরী তখন সত্যিই ঘুমে ছিলো, টের পায় নি। পেলেও বোধহয় ক্ষতি ছিলো না। তবে ওই কাজটুকু লুকিয়ে করার মজাই আলাদা।
ইশান কাজরীর গা ঘেঁষে শুয়ে পড়লো। কপালের পাশের চুলগুলো সরিয়ে দিলো আঙুলের ডগার আলতো ছোঁয়ায়। গভীর আবেশে গালে চুমু খেল। কাজরীর চোখের পাতা কাঁপছে। ইশান ও’কে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিলো। কাজরী বাঁধা দিলো না। চোখ বন্ধ করে আছে। কিছু সময় কেটে যায় এমনই। ইশান তাকিয়ে আছে। কাজরী চোখ খুলল। ইশান তখনও ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে দেখছে। আলতো ছোঁয়ায় ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো। কাজরী বাঁধা দিলো না, পিছিয়েও গেল না। ইশান কোমড় জড়িয়ে ধরে নিজের আরও কাছে টেনে নিলো।
চলবে……
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী পর্ব ১০
-
কাজরী পর্ব ২২
-
কাজরী পর্ব ৩
-
কাজরী পর্ব ২৩
-
কাজরী পর্ব ২১
-
কাজরী পর্ব ২৫
-
কাজরী পর্ব ৫
-
কাজরী পর্ব ২৭
-
কাজরী পর্ব ২৪
-
কাজরী পর্ব ১৫