অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৭
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব-৪৭
“সবার জীবনে একসাথে সুখ আসে না কেন? আমি চাই আমার সব প্রিয় মানুষগুলো সুখে থাকুক।”
জিয়ান হাই তুলতে তুলতে বলল, “তোমার সব প্রিয় মানুষ মানে! এই আমার সামনে একাধিক সংখ্যা বলতে বুক কাঁপলো না? সংখ্যাটা একক হবে।”
নয়না জিয়ানের হাতে আলতো করে চিমটি কেটে বলল, “মোটেই না। সংখ্যাটা একাধিক। আমার তো অনেকগুলো প্রিয় মানুষ।”
জিয়ান নয়নার দিকে চোখ ছোট করে তাকিয়ে বলল, “আবার বলো?”
নয়না এবার শব্দ করে হেসে বলল, “আরেহহহ বুদ্বু! তুমি হলে আমার একান্ত ব্যক্তিগত আপনজন। কিন্তু তুমি ছাড়াও তো আমার কাছের প্রিয় কিছু মানুষ আছে—বাবা, মা, ভাইয়া, মাহি, সূচনা, আরও কয়েকজন। তাদের সবাইকে সুখী দেখতে চাই।”
জিয়ান বলল, “ওহহহহ! এটা আগে বলবে তো। আচ্ছা, সব কথা বাদ। এবার বলো, আগে চৌধুরী ম্যানশন যাবে নাকি তালুকদার ম্যানশন?”
“তুমি যেখানে নিয়ে যাবে, সেখানেই যাবো। তুমি পাশে থাকতে গন্তব্য নিয়ে চিন্তা কিসের!”
জিয়ান কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “তবে আজ আমার শ্বশুরবাড়ি চলো। আগামীকাল সকালে তোমার শ্বশুরবাড়ি যাবো। এই রাতে নতুন বউ নিয়ে হুট করে চলে গেলে তোমার শ্বশুরবাড়ির মানুষ রাগ করবে।”
নয়না হেসে বলল, “আমার শ্বশুরবাড়ির মানুষ রাগ করার মানুষ না। বরং তারা খুশি হবে আমাকে দেখে।”
“খুব কনফিডেন্স?”
“স্বামী যদি পাশে থাকে, তাহলে কনফিডেন্স লেভেল থাকে সীমাহীন।”
রাতে বারোটা চল্লিশের কাছাকাছি সময়ে গাড়ি থামলো তালুকদার ম্যানশনের সামনে।
🌿
অন্তর এই সপ্তাহ জুড়ে বাসা থেকে বের হয়নি। পনেরো তলা বিশিষ্ট বিল্ডিংয়ের গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটা পরিত্যক্ত ঘরে বন্দি হয়ে আছে জাহিন। পুরো সপ্তাহে সে জাহিনের কোনো খোঁজ নেয়নি। নেয়নি বললে ভুল হবে, নিজের ব্যক্তিগত ঝামেলায় সময় হয়ে ওঠেনি। রাতের খাবার খেয়েছে প্রায় দু’ঘণ্টা আগে। মনে মনে বলছিল, এক কাপ কফি হলে মন্দ হতো না।
এর মধ্যেই নীলাঞ্জনা অন্তরের দিকে এক কাপ কফি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এত রাতে কফি খেলে রাতে ঘুম হবে?”
অন্তর কফির কাপের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “সে তো বছর তিনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। শেষ কবে ঠিকমতো ঘুমিয়েছি, মনে নেই। ঘুম যেন সোনার হরিণ, সে আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে।”
নীলাঞ্জনা অন্তরের এলোমেলো চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে বলল, “অতীত ধরে রেখে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছো তুমি। কেউ মারা গেলে আমরা তার সাথে সাথে মরে যেতে পারি না। আমাদের বেঁচে থাকার অভ্যাস গড়ে নিতে হয়—সেই মানুষটাকে ছাড়াই।”
অন্তর কফিতে একটা চুমুক দিয়ে মগটা টেবিলের উপর রেখে দিল। চুপ করে নীলাঞ্জনার কোলে মাথা রাখলো। নীলাঞ্জনা পরম যত্নে অন্তরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। এত সুন্দর মুহূর্ত বেশিক্ষণ দীর্ঘ হলো না। হুট করে অন্তরের ফোনে একটা আওয়াজ হতে লাগলো। সাইরেন বাজানোর মতো তীক্ষ্ণ আওয়াজে অন্তর ধড়ফড়িয়ে উঠলো। শার্টের খোলা বোতামগুলো বন্ধ করে দ্রুত ড্রয়ার থেকে মানিব্যাগ বের করে দরজার দিকে যেতে লাগলো।
নীলাঞ্জনা অন্তরের পিছু পিছু এসে বলল, “এত রাতে কোথায় যাচ্ছো?”
“জরুরি কাজ আছে। দ্রুত ফেরার চেষ্টা করবো। চিন্তা করতে হবে না। দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে যাও।”
আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ পেল না নীলাঞ্জনা। তার আগেই অন্তর লিফটে উঠে পড়েছে।
নীলাঞ্জনা দরজার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, তারপর দরজা বন্ধ করে রুমে এসে মনমরা হয়ে শুয়ে পড়লো। জীবনে মানুষের মন পাওয়া হয়তো সবচেয়ে কঠিন কাজ। শরীরের মিলন হয়তো খুব সহজেই হয়ে যায়। কিন্তু মনের মিল যেন যুগ যুগ ধরে একসাথে থাকলেও হয় না। এজন্মে কি তোমার মন পাওয়া হবে? তবে আমার সৌভাগ্য, তোমার মতো একজন দায়িত্ববান পুরুষকে স্বামী হিসেবে পেয়েছি। আমার অন্ধকার জীবনে তুমি একমাত্র আলোর ফোয়ারা, যে আমার আর আমার সন্তানের জীবনের আঁধার কাটিয়ে দিয়েছো।
🌿
অন্তর দ্রুত পাতাল ঘরে এসে জাহিনের অবস্থা দেখে গাবড়ে গেলো। জাহিনের চোখ থেকে রক্ত ঝরছে। গালের ক্ষতটা দগদগে হয়ে আছে।
অন্তর ডাক্তার মিত্রকে বলল, “কী হলো ডাক্তার? জাহিনের এই অবস্থা কীভাবে হলো?”
“স্যার, আমি প্রতিদিন একবার করে ওনার চিকিৎসা করতে এসেছি। কিন্তু প্রতিদিন দেখতাম উনি হাউমাউ করে কাঁদছেন। তিনদিন আগে আমার জেঠা মারা গেছেন, ওনার শেষকৃত্যের কাজে ব্যস্ত ছিলাম, তাই আসতে পারিনি। আজ এসেই দেখি এই অবস্থা। মনে হচ্ছে কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানির পরিবর্তে রক্ত আসছে। অতিরিক্ত কান্নার ফলে হাত দিয়ে গালের ক্ষতস্থানে আঘাত করেছে।”
অন্তর জাহিনের সামনে হাঁটু মুড়ে বসলো। তারপর জাহিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ থেকে তোকে আমি মুক্ত করে দেবো। ডাক্তার মিত্র, দ্রুত এখান থেকে বের হওয়ার গোপন পথের গেটে ইমার্জেন্সি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসুন। আমি জাহিনকে নিয়ে বের হচ্ছি।”
স্ট্রেচারে করে জাহিনকে নিয়ে এগোতেই জাহিন বলল, “আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে, অন্তর। তুই আমার প্রতি শেষবারের মতো একটা দয়া কর। আমার উপর একটু করুণা কর, বন্ধু। আমার সন্তানকে আমাকে একবার দেখা। আমি মৃত্যুর আগে আমার সন্তানকে এক নজর দেখে মরতে চাই।”
কথা পুরোপুরি বলতে পারছিল না, কথা জড়িয়ে আসছিল।
অন্তর জাহিনের হাত ধরে বলল, “আমি তোকে তোর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেবো। তুই একটু শান্ত হ।”
জাহিনের চোখ দুটো উল্টে আসছে, চোখের কোণে জমাট রক্ত। শ্বাস বেড়ে গেছে। তবুও কোনোমতে বলল, “একবার আমার সন্তানের মুখটা আমাকে দেখা। আমার হাতে আর সময় নেই।”
অন্তর নিজের ফোন বের করে দ্রুত মেহনুরের নম্বরে কল করলো।
মেহনুর বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ছোট জারিফ। জারিফ আজ ঘুমাচ্ছে না, বারবার কাঁদছিল। শেষে বিরক্ত হয়ে জারিফকে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে মেহনুর। মেহনুরের ফোনটা পড়ে আছে বারান্দার দোলনায়। জারিফ আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদ দেখছে। মেহনুর জারিফের হাত ধরে জারিফের দিকে তাকিয়ে আছে। পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ জারিফ। জারিফ না থাকলে হয়তো মেহনুর নিজের জীবন শেষ করে দিতো। অথচ এখন সে বেঁচে থাকতে চায় জারিফের জন্য। সে হাসে জারিফের জন্য, তার মন খারাপ—সবকিছু জারিফকে ঘিরে।
তার ভাবনার মাঝেই ফোনটা সশব্দে বেজে উঠলো। মেহনুর দেখলো অন্তরের নম্বর থেকে ভিডিও কল আসছে। ফোন হাতে নিতে নিতে ফোনটা কেটে গেলো। ফোন আবার রাখতে যাবে, ঠিক তখন আবার কল এলো।
অন্তরের হাত ধরে জাহিন আকুতির স্বরে বলল, “একটু পানি দিবি আমাকে? আমার ভেতরটা কেমন শুকিয়ে আসছে।”
অন্তর দ্রুত পানি এনে জাহিনের মুখের সামনে ধরলো। পানি খাওয়ানো শেষ করে আবার কল করলো মেহনুরকে।
জাহিন শেষবারের মতো অন্তরের হাতটা ধরে বলল, “আমার সন্তানের নাম কী?”
অন্তর বলল, “জারিফ।”
জাহিনের চোখ থেকে রক্ত ঝরতে লাগলো। জারিফ নামটা সে পছন্দ করে রেখেছিল। আচ্ছা, মেহনুর কি তার ডায়েরি থেকেই নামটা জেনেছে! জাহিন জড়ানো গলায় “জারিফ” উচ্চারণ করলো।
ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হয়েছে আরও মিনিটখানেক আগে। মেহনুর অপর পাশ থেকে “হ্যালো হ্যালো” বলছে। ফোনটা পড়ে আছে ফ্লোরে। মেহনুর দেখছে উপরের ছাদ।
কিছুক্ষণ পর অন্তর ফোনটা জাহিনের মুখের সামনে ধরলো। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ততক্ষণে জাহিন ইহজগৎ ত্যাগ করেছে। চোখ দুটো আধখোলা, চোখের কার্নিশে তাজা রক্ত। গাল দুটো ক্ষতবিক্ষত। এত ভয়ংকর অবস্থা দেখে মেহনুর ভয় পেয়ে গেলো। মোবাইলের ক্যামেরা সরিয়ে বলল, “এসব কী, অন্তর ভাই?”
অন্তর চিৎকার করে বলল, “জাহিন ওঠ! তোর সন্তানকে শেষবারের মতো না দেখে তুই মরতে পারিস না! ওঠ জাহিন, ওঠ!”
চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১০
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪০
-
অর্ধাঙ্গিনীর সিজন ২ পর্ব ৩৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৭