নয়নারএমপিসাহেব
পর্ব:- ২১
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি
ডাইনিং টেবিলে মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে তরী। বেচারি আড়চোখে কখনও মায়ের দিকে তাকাচ্ছে তো কখনও হৃদয়ের দিকে তাকাচ্ছে। চারপাশে এমন গম্ভীর পরিবেশ যে ওর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে বারবার। মনে হচ্ছে যেন ভয়ংকর কোনো অপরাধ করে ফেলেছে ও।
আহা ও যদি জানত , একটু দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ার ফল এমন হতে পারে! তাহলে কখনোই ঘুমাতো না। আজ মনে মনে দৃঢ় পণ করল ও, আজকের পর আর কখনো দুপুরে ঘুমাবে না। যাই হোক না কেন। তবে এতকিছুর মধ্যেও তরী হৃদয়ের উপর খুব চটে আছে। একটু আগেও ও হৃদয়কে ভয় পাচ্ছিল কিন্তু এখন ভয়ের জায়গায় অভিমান এসে বসেছে।
অন্যদিকে নীলা চৌধুরী কপাল কুঁচকে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন নিজেকেই ধিক্কার দিচ্ছেন, তিনি ভুলে গেলেন কিভাবে, এই মেয়েটা তারই মেয়ে! আর তার দ্বারা সবই সম্ভব। এইসব ভেবেই অসন্তুষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন তিনি।
উনার আদরের মেয়ের জন্যই আজ অকারণে হৃদয়কে এতটা ব্যতিব্যস্ত করতে হলো। ছেলেটা এমনিতেই ব্যস্ত, খাওয়ার পর্যন্ত সময় পায় না, আর আজ সে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে ছুটে এসেছে তরীর জন্য। লজ্জা আর অনুশোচনায় উনার গলা ভারী হয়ে এল,
__হৃদয়, আমি আর কি বলব বল তো আব্বা! এই মেয়েটা আমাকে একদণ্ড শান্তি দেয় না। এত বড় কাণ্ড ঘটালে যে ! তুমি কি হৃদয়কে সরি বলেছো, আম্মু? উনার কণ্ঠে সামান্য রাগের সুর থাকলেও তা কঠোর নয়। তিনি সচরাচর তরীর সঙ্গে গলা উঁচু করে কথা বলেন না, তাই আজও পারলেন না।
অতঃপর তিনি আবার বললেন,
__ তোমার জন্য হৃদয়কে এত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে আসতে হয়েছে। তুমি কবে বড় হবে বলো তো? তোমার জন্য আমি ওকে এতটা বিরক্ত করলাম । অন্তত তোমার তো তাকে সরি বলা উচিত। নাকি সেটাও বলবে না? সকলের আদরে তুমি দিন দিন বাঁদর হয়ে যাচ্ছো। আর যদি আমরা কিছু বলি, তাহলে সারাদিন মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবে। কথাগুলো বলে এবার তিনি মুখ তুলে তাকালেন হৃদয়ের দিকে।
__ আমি খুব দুঃখিত হৃদয়, তোকে এভাবে বিরক্ত করার জন্য। তাহির থেকে শুনলাম গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং নাকি ফেলে এসেছিস?
হৃদয় তখন বড় ইলিশ মাছের কাঁটা বেছে নিচ্ছিল ধীরে ধীরে। সে হাতের কাজ থামাল না, কিন্তু চোখ তুলে তাকাল তরীর দিকে। মায়ের বকা খেয়ে মুখটা কেমন কালো করে বসে আছে মেয়েটা। চোখ দুটো টলমল করছে , এখনই কেঁদে দেবে দেবে ভাব।
হৃদয় দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর শান্ত, স্থির কণ্ঠে বলল,
__ ওর ক্ষেত্রে আমি কখনোই বিরক্ত হই না, মনি। সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো। তাও তুমি এই শব্দটা ব্যবহার করলে। এখন আমার নিজেকে বাইরের লোক মনে হচ্ছে।
নীলা চৌধুরী আঁতকে উঠলেন মুহুর্তেই,
__ এমা, কি বলছিস এসব হৃদয়! তুই নিজের কাজ ছেড়ে এসেছিস, তাই তো আমি…
তখনই হৃদয় নীলা চৌধুরীর কথা কেটে দিয়ে বলল,
__ যতই গুরুত্বপূর্ণ কাজ হোক না কেন, ওর থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয় আমার কাছে কিছুই। কথাটা বলেই নিজের পাত থেকে যত্ন করে বেছে নেওয়া মাছের অংশটা তরীর মুখের সামনে ধরলো।
তরী একটুকুও ইতস্তত করল না। বাধ্য মেয়ের মতো চুপচাপ মুখ বাড়িয়ে খেয়ে নিল। নীলা চৌধুরীও আর কিছু বললেন না।
ওদিকে অনিমা বেগম চুপচাপ ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। উনার দৃষ্টি গভীর, ভাবুক।
তরী যে হৃদয়ের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তিনি খুব ভালো করেই জানেন। উনার ছেলে তরীকে পাগলের মতো ভালোবাসে। সে প্রকাশ করে না, মুখে স্বীকার করে না কিন্তু তার প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি উদ্বেগ, তার ভালোবাসার সাক্ষী। মাঝে মাঝে উনার বুক কেঁপে ওঠে। নিজের ছেলের রাগ, একরোখা স্বভাব যদি কোনোদিন তরীর মনে ভুল বোঝাবুঝির দেয়াল তুলে দেয়? তার এই রাগটার জন্য তরীর মনে যদি অন্য কেউ এসে পড়ে, তখন তার এই ছেলেটা যে মরেই যাবে। কিন্তু উনি কিছু বলতে পারেন না ছেলেকে। বললে দেখা যাবে সে তরীর সাথেই এইটা নিয়ে রাগারাগি করবে। তাই উনি ছেলেকে কিছু বলেন না।
সবাইকে চুপ থাকতে দেখে হৃদয় আবারও বলল,
__ আমি ওর জন্য হাজারটা কাজ ফেলে প্রতিদিন আসতে পারব। আমার কোনো সমস্যা নেই। কথাগুলো বলার সময় তার দৃষ্টি একবার তরীর দিকে ছুঁয়ে গেল। মেয়েটা তখনও মাথা নিচু করে বসে আছে। অতঃপর সে আবার বলল,
__ কিন্তু এইসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ওকে বকাঝকা করা আমার পছন্দ নয়, মনি।
হৃদয়ের কথায় নীলা চৌধুরী একমুহুর্ত থমকালেন, হৃদয়ের কথাগুলো অভিযোগের সুরে নয়, বরং অনুরোধের মতো শোনাল। ব্যস হৃদয়ের কথার পর আর কেউ সাহস পেল না কিছু বলার। টেবিলের ওপর নেমে এল নীরবতা।
হৃদয় এমন ভঙ্গিতে নিজের পাতের পুরো মাছটাই ধীরে ধীরে কাঁটা বেছে তরীর মুখে তুলে দিতে লাগল। যেন ওর নিজের খাওয়ার কথা মাথাতেই নেই। অনিমা বেগম, নীলা চৌধুরী এবং হৃদিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, হৃদয় বলে উঠলো।
__ তোমাদের এখানে থাকতে হবে না। সবাই গিয়ে রেস্ট নাও।
জবাবে নীলা চৌধুরী একটু ইতস্তত করে বললেন,
__তোদের কিছু প্রয়োজন হলে?
__ আমি নিয়ে নিতে পারব মনি। তোমরা যাও।
হৃদয়ের দৃঢ় স্বরে আর প্রশ্ন তোলার জায়গা রইল না। একে একে সবাই চলে গেল। ডাইনিং স্পেসে রইল শুধু দুজন হৃদয় আর তরী। কিছুক্ষণ নীরবতা চলল দুজনের মধ্যে, তারপর হঠাৎই হৃদয় সামনে ঝুঁকে তরীর বেনি করা চুলটা টেনে ধরল। তবে খুব জোরে নয়।
__আহ্…. অস্পষ্ট শব্দ বেরিয়ে এল তরীর মুখ দিয়ে। চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছে মুহুর্তেই। অতঃপর ও তাকাল হৃদয়ের দিকে, অভিযোগভরা দৃষ্টিতে।
হৃদয় সেসব পাত্তা না দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
__ এইবার বল, তোর সমস্যা কি?
তরী কিছু বলল না। উল্টো মুখ ঘুরিয়ে নিল অভিমানে।
এইদিকে হৃদয় ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
অন্য সময় হলে এক ধমকেই এই মেয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলত। ভয়ে হাতপা কাঁপতে থাকত। কিন্তু এখন ওর চোখে মুখে ভয়ের ছিটেফোঁটাও নেই। ওর চোখ ভিজে উঠেছে ঠিকই, তবে সেটা ভয়ে নয়! স্পষ্ট অভিমানে। যা হৃদয়ের বুঝতে কোনো অসুবিধা নেই।
সে আবারও জিজ্ঞেস করল,
__সমস্যা কি তোর?
জবাবে তরী দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
__ আমার কি সমস্যা হবে? আমি কি আপনাকে বলেছি, আমার কোনো সমস্যা।
__ নয়ননন! ধমকে উঠলো সে। তার ধমক যেন পুরো ঘর কাঁপিয়ে দিল।
ধমক খেয়ে তরীর অভিমান যেন দশগুণ বেড়ে গেল। হঠাৎ করেই দুহাত তুলে হৃদয়ের বুকে ধাক্কা দিল ও। কিন্তু হৃদয়কে একচুলও নড়াতে পারলো না। বরং সে আরও স্থির হয়ে গেল এবং ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল ওর দিকেই। তরীর খাবারে মাখো মাখো হাতটা হৃদয়ের সাদা টিশার্টটা নষ্ট করে দিয়েছে একদম। তেলমসলার দাগ ছড়িয়ে গেছে হৃদয়ের বুকের ওপর।
তাও যেন তরী ক্ষ্যান্ত হয়নি, তরীর রাগের কারণ দাঁড়িয়েছে কিছুক্ষণ আগে হৃদয়ের ফোনে আসা ইনায়ার কল। যা হৃদয় বুঝতে পারছে না।
এইদিকে হৃদয় কিছু বলছে না, তরীর এমন আচরণ সে আগে কখনো দেখেনি। সাধারণত এই মেয়ে তার সামনে এলেই গুটিসুটি মেরে থাকে, ভয়ে, আতঙ্কে কিংবা সংকোচে। কিন্তু আজ যেন সব উল্টো। আজ ওর চোখে ভয় নেই, বরং একরাশ রাগ আর অভিমান জমে আছে। তাই হৃদয় কিছুটা বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে তরীর দিকে।
তখনই তরী দাঁত চেপে বলে উঠল,
__ চুল ছাড়েন। অসভ্য, নির্দয় লোক!
মুহুর্তেই হৃদয়ের ভ্রুদ্বয়ে ভাঁজ পড়লো ।
__ তুই কাকে এসব বলছিস, জানিস তো?
তরী কোনো জবাব দিল না। ওর মাথায় এখন হৃদির বলা একটাই কথা ঘুরছে।
—— ময়দানে নামতে হলে ওকে আটঘাট বেঁধে নামতে হবে। শুরুতেই হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।
হৃদয় আবারও নরম কিন্তু গম্ভীর স্বরে বলল,
__ তোর কি সমস্যা, সেটা আমাকে না বললে আমি কিভাবে বুঝব?
তরীর হঠাৎ কি জানি হল, মুখ ঘুরিয়ে হৃদয়ের পেশীবহুল বাহুতে কামড় বসিয়ে দিল। তীক্ষ্ণ দাঁতের চাপ। শুধু কামড়েই শেষ নয়! ও সঙ্গে সঙ্গে ছাড়লও না। কয়েক মুহূর্ত সেইভাবেই দাঁতে চেপে ধরে রইল হৃদয়ের বাহু। যেন এতক্ষণ জমে থাকা সমস্ত রাগ, অভিমান আর অস্থিরতা এই কামড়ের মধ্যেই উগরে দিচ্ছে। এইদিকে হৃদয় চোখ খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার মুখ দিয়ে একটি শব্দও বের হল না। না কোনো ধমক, না কোনো প্রতিবাদ। কিছুক্ষণ পর তরী নিজেই ছেড়ে দিল। অতঃপর ওর দৃষ্টি গেল হৃদয়ের মুখের দিকে। মুহূর্তেই যেন বাস্তবে ফিরে এল ও।
ও কি করে ফেলল এটা?
ভেবেই মাথা ঝিমঝিম করে উঠল তরীর। হৃদয় এখনই হয়তো ঠাস ঠাস করে কয়েকটা চড় বসাবে ওর নরম গালে। এই ভয়ে বুক ধড়ফড় করতে লাগল ওর। ভয়ে তরী আস্তে করে এক পা পিছিয়ে যেতে চাইল।
কিন্তু তার আগেই হৃদয় শান্ত স্বরে বলল,
__ দিলি তো সাদা টিশার্টটা একদম শেষ করে। এখন এটা আর পড়া যাবে?
তরী থমকে গেল। একমুহুর্তে চোখ বড় বড় হয়ে গেল ওর। তরী অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে হৃদয়ের দিকে যেন ও বিশ্বাসই করতে পারছে না। হৃদয় ওকে মারা তো দূরের কথা একটা ধমক পর্যন্ত দেয়নি। তাতে তরীর সাহস খানিকটা বেড়ে গেল, ও তরতরিয়ে বলে উঠলো,
__ বেশ করেছি, আমার ইচ্ছে হলে আমি আবার করবো।
হৃদয় হাসলো, অতঃপর বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে তরীর ঠোঁটের লাগা খাবার মুছতে মুছতে বলল,
__ তার বদলে আমি কি পাবো?
চলবে।
আমি মনে হয় রাইটিং ব্লকে ভুগছি। নয়তো এমনটা এর আগে কখনো হয়নি আমার সাথে। লেখার মান ভালো হচ্ছে না তাই হয়তো।
আপুরা জিজ্ঞেস করছিল আগের পর্বটা ছোট কেন! কারণ ঐটা খন্ডাংশ ছিল।
Share On:
TAGS: নয়নার এমপি সাহেব, সঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৩
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৭
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৫
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৯
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২৯
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৮
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৪
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৮
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৩১
-
নয়নার এমপি সাহেব গল্পের লিংক