অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৪৮)
সোফিয়া_সাফা
(৮১+ অ্যালার্ট)
রাত তখন পৌনে বারোটা। ডিনার শেষ করে সবেমাত্র রুমে এসেছে ফুল, সঙ্গে উর্বী। খাওয়ার টেবিলে প্রায় সবাই উপস্থিত থাকলেও অনুপস্থিত ছিল রিদম।
উর্বী বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। সে সুয়িং বেডে আরাম করে শুয়ে টিভি দেখছে। ফুল আনমনেই পিওনি গাছের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেঘে ঢাকা আকাশের পানে চেয়ে আছে।
হঠাৎ সে অনুভব করল, কেউ তার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে তার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। ফুলের খুব একটা অসুবিধা হলো না লোকটাকে চিনতে। লোকটার শরীর থেকে নির্গত পারফিউমের গন্ধই চিৎকার করে বলে দিচ্ছে লোকটা আর কেউ নয় বরং তার একান্ত ব্যক্তিগত পুরুষ।
“কী করছো পেটাল?” উদ্যানের কণ্ঠ অত্যন্ত পরিপক্ব আর গম্ভীর শোনালো। ফুল কিছুটা অবাক হলো; কণ্ঠটা এমন ভারী লাগছে কেন? লোকটা কি নেশা করেছে?
ফুলকে ভাবনার অবকাশ টুকুও দিল না উদ্যান। ঝরো হাওয়ার বেগে ফুলকে ঘুরিয়ে নিল নিজের দিকে। গলার ভাঁজে ডুবিয়ে দিল নাসারন্ধ্র। অজানা শিহরণে ফুলের চোখ বুজে এলো। তবুও সে অনুভূতিতে লাগাম টেনে আওড়াল, “উর্বী আপু পাশের রুমে আছে, ছেড়ে দিন।”
উদ্যান বুঝদারের মতো গলায় কয়েকটা চুমু এঁকে দিয়ে সরে গেল। তারপর খাটের ওপর রাখা একটা শপিং ব্যাগের দিকে ইশারা করে শান্ত গলায় বলল, “শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে আমার রুমে চলে এসো, পেটাল। তোমার জন্য অপেক্ষা করবো।”
কথাগুলো বলতে বলতে উদ্যান পিছিয়ে গিয়ে দরজার কাছে পৌঁছাল। যাওয়ার আগে আরও একবার তাগাদা দিয়ে বলল, “তাড়াতাড়ি এসো পেটাল। ঠিক আছে?”
ফুলের ফর্সা চিবুকে লাজুক রক্তিম আভা ফুটে উঠল। লজ্জায় যেন সে কুঁকড়ে যাচ্ছে, বলার মতো কিছু খুঁজেও পাচ্ছে না। তাকে লাজুকলতার মতো মিইয়ে যেতে দেখে উদ্যানের ঠোঁটের কোণ প্রসারিত হলো। শিস বাজাতে বাজাতে চলে গেল নিজের রুমে।
খাটের ওপর হালকা ঝুকে ব্যাগটা হাতে নিল ফুল। সেটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা লাল টুকটুকে শাড়ি। তার ভেতরে গোঁজা ছোট এক টুকরো চিরকুট। ভাঁজ খুলতেই নজরে এলো গোটা গোটা অক্ষরে ইংরেজিতে লেখা কিছু শব্দ:
“Let’s turn tonight into our wedding night.”
হাঁসফাঁস করে উঠল ফুল। দ্রিমদ্রিম শব্দে ধড়ফড় করছে তার বুকের ভেতর। সে নিজেকে ধাতস্থ করার উদ্দেশ্যে ঘন ঘন শ্বাস নিতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে উর্বী এসে তার কাঁধে হাত রাখল। চমকে উঠে পেছনে ফিরল ফুল। তার এমন অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখে উর্বী ঘাবড়ে গেল।
“কী হলো ফুল? ভয় পেয়ে গেলে নাকি?”
বুকে হাত দিয়ে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল ফুল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আচমকা হাত রাখলে তো তাই একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কিছু কি বলবে?”
“হ্যাঁ, চলো না একসাথে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাই।”
ফুল উর্বীর হাত থেকে রিমোটটা নিয়ে সন্তর্পণে টেবিলের ওপর রাখল। একটু দোনোমোনো করেই বলল, “আজ আমি খুব ক্লান্ত উর্বী আপু? তুমি কি অনিলা আপুর কাছে গিয়ে ঘুমাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে?”
উর্বী অবাক হয়ে তাকাল। “কেন ফুল? তুমি আমাকে সেখানে রেখে আসতে চাইছো কেন?”
“তেমন কিছু নয় আপু। আমি আজ এই রুমে ঘুমাবো না। তোমারও একা একা ঘুমানো ঠিক হবে না। তাই বললাম আরকি।”
“তুমি কোথায় ঘুমাবে?”
বিড়ম্বনায় পড়ে ফুল দৃষ্টি নিচু করল। খুব নিচু স্বরে বলল, “আসলে আমার হাজব্যান্ডের শরীর ভালো নেই উর্বী আপু। তাই উনি চাইছেন আমি যেন আজ উনার কাছে থাকি, একটু সেবাযত্ন করি।”
উর্বী অবুঝের মতো প্রশ্ন করল, “হাজব্যান্ড চাইলে বুঝি যেতেই হয়?”
ফুল নিঃশব্দে মাথা নাড়াল। উর্বী কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইল। তারপর বিড়বিড় করে বলল, “কই, আমার হাজব্যান্ড তো এমন কিছু চায়নি কখনো। হয়তো তার কখনো শরীর খারাপই হয়নি, কী বলো?”
ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল ফুল। “তাই হবে হয়তো। তুমি কি যাবে অনিলা আপুর রুমে?”
উর্বী এবার বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়াল। “হ্যাঁ, তার সমস্যা না হলে আমারও কোনো সমস্যা হবে না।”
ফুল মিষ্টি করে হাসলো। উর্বী মাঝেমধ্যেই ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করে। বোধহয় খুব শীঘ্রই সুস্থ হয়ে উঠবে মেয়েটা। ফুল জিজ্ঞেস করল, “খাবার খাওয়ার পরের ঔষধ গুলো খেয়েছো?”
“হ্যাঁ, খেয়েছি।”
“ঠিক আছে, চলো তাহলে।”
↓↑
“রিদম তুই কেন এমন করছিস? খাবার এনেছি খেয়ে নে।”
সোহমের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি। রিদম খাটে হেলান দিয়ে বসে ছিল, সে দ্বিগুণ বিরক্ত হয়ে পালটা প্রশ্ন ছুড়ল, “কেন এনেছিস খাবার? এতো আদিখ্যেতা দেখানোর কী আছে?”
সোহম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোর পেছনে খাবার নিয়ে ছোটাছুটি করার বিন্দুমাত্র শখ আমার নেই। শুধু ডাক্তার বলেছে নিয়মমতো খাওয়া-দাওয়া করতে, তাই বাধ্য হয়েই এই আদিখ্যেতাটুকু করতে হচ্ছে।”
রিদম অনাগ্রহ প্রকাশ করে জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “খেয়ে নেবো, যা তুই।”
“দেখ আমি বুঝতে পারছি, তুই উর্বীর বিষয়টা নিয়ে অনেক ডিপ্রেশনে আছিস। কিন্তু এটা বুঝতে পারছি না যে কেন ডিপ্রেশনে আছিস। উর্বীই কি একমাত্র মেয়ে যার সাথে তোর ভাই এমন কিছু করেছে? কই অন্য কোনো মেয়েকে নিয়ে এতোটা ভাবিস নি তো কখনো।”
রিদমের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “উর্বীর সাথে যা হয়েছে তার জন্য আমি দায়ী ছিলাম সোহম। আমার কি গিল্টি ফিল করা অনুচিত?”
“উচিত বলেই গিল্টি ফিল করছিস নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?”
এই পর্যায়ে রিদম কোনো রাখঢাক রাখল না। অবশেষে সে স্বীকার করেই নিল। “আমি প্রেমে পড়ে গেছি সোহম।”
এই একটা স্বীকারোক্তিই যেন সোহমকে স্তব্ধ করে দিল। “কী বললি?”
রিদম পুনরায় বলল, “হ্যাঁ আমি ভালোবেসে ফেলেছি মেয়েটাকে। তাই কষ্ট হচ্ছে ওর জন্য। খুব কষ্ট হচ্ছে, তোকে বোঝাতে পারবো না।”
“কবে, কখন প্রেমে পড়ে গেলি?”
“অনেক আগেই, যদিও আমি কখনো নিজের কাছেও এটা স্বীকার করতে চাইনি। কারণ আমি কখনোই নিজেকে ওর যোগ্য মনে করিনি। ও আমাকে নিজের বন্ধু বানিয়েছিল সেটাই অনেক বড় পাওয়া ছিল। সেটুকু নিয়েই আমি সন্তুষ্ট ছিলাম। কিন্তু দেখনা আজ কোন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমাকে নিজের ভালোবাসার কথা স্বীকার করতে হলো।”
সোহম এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি রিদমের কথার মানে। “তুই বলেছিলি ভালোবাসা মানে তোর কাছে বোকামি। বিয়ে, ভালোবাসা, সংসারের পেছনে সময় নষ্ট না করে লাইফটাকে এনজয় করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে কী এমন হলো যার জন্য তুই…”
উরুর ওপর কনুই রেখে দু-হাতে মাথা চেপে ধরল রিদম। অত্যন্ত অসহায় শোনাল তার কণ্ঠ, “ভালোবাসা আমার সমস্ত চিন্তাধারা ওলটপালট করে দিয়েছে। আমি জানিনা কীভাবে ভালোবেসে ফেললাম। শুধু জানি, ওর চোখে নিজের প্রতি ঘৃণা দেখা যন্ত্রণাদায়ক। ওকে কষ্টে দেখা আমার জন্য দুঃস্বপ্ন। ওর সব কষ্ট মুছে দেওয়ার জন্য নিজেকেও মুছে ফেলতে পারি আমি।”
সোহমের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। রিদমের মতো ‘প্লেবয়’ কিনা প্রেমে পড়ে গেছে! এ যেন কোনো অলৌকিক ঘটনা থেকে কম কিছু নয় তার কাছে। সে রিদমের পাশে বসে পড়ল। তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “চিন্তা করিস না দোস্ত। আমি পুরোদমে সাহায্য করবো তোকে।”
সোহমের মুখে ‘দোস্ত’ শব্দটা শুনে রিদম একটু হাসলো বোধহয়। কিন্তু পরক্ষণেই সেই হাসি এক কঠিন সংকল্পে রূপ নিল। সে পাশ ফিরে সোহমের চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে বসল, “তুই বিয়ে করে নিবি উর্বীকে?”
কথাটা কর্ণগুহরে পৌঁছানো মাত্রই সোহম ছিটকে দূরে সরে গেল। অভাবনীয় ভঙ্গিতে উচ্চারণ করল, “আমি?”
রিদমের কপালে ঘাম জমলো। শরীর টা ঝিমঝিম করছে তার। সে নিজের সংকল্পে অটল থেকে বলল, “হ্যাঁ, তুই বিয়ে করে নে না উর্বীকে।”
“তুই পাগল হয়ে গেছিস? না মানে তোর কোনো আইডিয়া আছে তুই কি বলছিস? একটু আগেই বললি তুই ভালোবাসিস মেয়েটাকে। এখন আবার বলছিস আমাকে বিয়ে করে নিতে?”
রিদমের মাঝে প্রতিক্রিয়ার লেশমাত্র পরিলক্ষিত হলো না। “হ্যাঁ বলছি।”
“কেন বলছিস? তুই ভালোবাসিস, বিয়ে করতেই হলে তুই বিয়ে করে নিবি।”
“ও আমাকে ঘৃণা করে সোহম। আমি বিয়ে করতে পারব না ওকে। আমি ওর যোগ্য নই।” কথাটা বলতে গিয়ে রিদমের চোখ থেকে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এই পাথরচাপা কষ্টের তীব্রতা শুধু সেই অনুভব করতে পারছে। সোহম প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি, ভেবেছিল ভুল দেখছে। সে চোখ কচলে আবারও তাকিয়ে সবিস্ময়ে বলল, “তুই জানিস, তুই কাঁদছিস!”
রিদম দ্রুত মুখ সরিয়ে নিল। “ভুল দেখছিস তুই। কাঁদছিনা আমি। তুই বিয়ে করে নিবি উর্বীকে, আর এটাই ফাইনাল।”
সোহম এবার ফেটে পড়ল, “হোয়াট দ্য ফা*কিং কথাবার্তা? তুই কীভাবে এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করতে বলতে পারিস, যেই মেয়েটা কিনা অগণিত পুরুষের লালসার শিকার হয়ে এসেছে। তুই যদি ওর যোগ্য না হোস তবে ও-ও কিন্তু আমার যোগ্য…।”
সোহম তার কথা শেষ করার আগেই রিদম তার শার্টের কলার চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠে বলল, “একটাও বাজে কথা বলবি না ওকে নিয়ে। জাস্ট শাট আপ!”
“বলবো না, তুইও আমাকে বিয়ে করতে ফোর্স করিস না। আমি কোনো ভার্জিন মেয়েকেই বিয়ে করবো, প্রয়োজনে ল্যাবে নিয়ে গিয়ে টেস্ট করিয়ে সিওর হবো মেয়েটা আসলেই ভার্জিন কি-না।”
রিদম ধাক্কা মেরে সোহমের শার্টের কলার ছেড়ে দিল। খাট থেকে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল সোহম। রিদম ঠান্ডা গলায় বলল, “তোকে ফোর্স করতে হবে কেন রে? পৃথিবীতে কি শুধু তুই একপিসই শুদ্ধ পুরুষ অবশিষ্ট আছিস নাকি? আমি উর্বীর জন্য তোর থেকেও শুদ্ধ পুরুষ খুঁজে আনবো।”
সোহম হাপাতে হাপাতে নিজের শার্টের কলার ঠিক করল। তারপর কিছুটা আড়ষ্ট গলায় বলল, “হ্যাঁ, সেটাই ভালো হবে।”
রিদম আচমকা দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর থাকা কাঁচের বোতল থেকে একগ্লাস টেকিলা ঢেলে নিল। বিড়বিড়িয়ে বলল, “পরেরবার কক্ষনো ‘দোস্ত’ বলে ডাকবি না। তোর মুখে শব্দটা মানায় না।”
সোহম আহত হলো। এগিয়ে এসে রিদমের ঢেলে রাখা টেকিলার গ্লাসটা হাতে নিয়ে বলল, “আমি তোদেরকে নিজের বন্ধু বলেই মনে করি। তুইও করিস, তোদের জন্য দুনিয়ার সব আইন ভঙ্গ করতেও রাজি আছি। যদি উর্বীকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলে তুই সেটা বিশ্বাস করিস তবে আমি রাজি আছি।”
রিদম অবাক হলো না। বরং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাহু প্রসারিত করল। অন্য গ্লাসে টেকিলা ঢেলে দুজন একসাথে চিয়ার্স করল। রিদমকে কিছুটা শান্ত হতে দেখে সোহম সুযোগ বুঝে হালকা গলায় বলল, “তবে একটা কথা বলে রাখি, আমি কিন্তু আমার বউকে খুব ভালোবাসব, অনেক আদর করব। জানিসই তো, জন্মগত সিঙ্গেল আমি; বউকে নিয়ে কত শত ফ্যান্টাসি মনের ভেতর পুষে রেখেছি তার হিসেব নেই। সেই কল্পনাগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করতে গেলে তখন আবার মারবি না তো আমাকে?”
কথাটা শোনামাত্র রিদমের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ছ্যাৎ করে উঠল। এই প্রথম সে জেলাসি অনুভব করল। জেলাসি যে এতো তিতকুটে স্বাদের হয় সেটা তার আগে জানা ছিল না। তবুও সে মুখে হাসি টেনে বলল, “তোর বউয়ের সাথে তুই যেমন খুশি তেমন ভাবে রোমান্স করতে পারিস আমি কেন মারতে যাবো? তাছাড়াও তোর সাথে আমি পারবো নাকি?”
“পারতেও পারিস, শুনেছি রাগ আর জেলাসি মানুষকে শক্তিশালী করে তোলে। একটু আগেই তো রাগের বসে আমাকে বাস্কেটবলের মতো ছুড়ে ফেলে দিলি। যদি বাই চান্স আমার হাত পা ভেঙে যেতো তখন তোর উর্বীকে কে বিয়ে করতো বল। যতোই বলিস আমার চেয়ে ভালো ছেলে খুঁজে নিবি কিন্তু বুকে হাত দিয়ে কি বলতে পারবি সেই ছেলেটা আমার চেয়েও বিশ্বস্ত হবে?”
রিদম উত্তর দিল না। নির্বিকার ভঙ্গিতে টেকিলা গিলতে লাগল। সোহম টেবিলের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। গভীর গলায় বলল, “অ্যাটলিস্ট একবার ট্রাই করে দেখতে পারতি, তোর ভালোবাসার মধ্যে একমাত্র বাধাটাই হলো উর্বী তোকে রিহান মনে করে ঘৃণা করছে। তুই যদি কোনোভাবে ওকে বোঝাতে পারতি যে তুই রিহান না—রিদম। তাহলেই হয়ে যেতো।”
“ও আমাকে রিহান ভেবে ঘৃণা করছে না, রিদম ভেবেই করছে। ওর মনে হচ্ছে ওর সাথে যা যা হয়েছে সব আমি মানে রিদমই করেছি।”
“তাহলে ওকে বোঝাতে হবে ওর সাথে জঘন্য কাজ গুলো তুই মানে রিদম নয়, রিহান করেছে।”
“বুঝিয়ে কী হবে? আমি তারপরও ওর যোগ্য হবো না।”
সোহম এবার অভিজ্ঞের মতো বলল, “শোন, একটা মেয়েকে যে যতবেশি ভালোবাসে সেই তার চোখে সবচেয়ে বেশি যোগ্য তার ওপর যদি আবার মেয়েটার মনেও সেই লোকটার জন্য ভালোলাগা থেকে থাকে তাহলে তো কোনো কথাই নেই।”
রিদম ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “বাহ! তুই এতোকিছু জানলি কীভাবে? আমার জানা মতে তোর তো মেয়েদের সাথে সাধারণ কানেকশন টুকুও নেই।”
সোহম একটু ভাব নিয়েই বলল, “বাইরে যেতে হয়নি, আমি যেটুকু জেনেছি ইভেন্টফুলকে দেখে জেনেছি।”
রিদমের নাকমুখ কুচকে গেল। “বোকাফুলকে দেখে?”
“ইয়েস, ওকে দেখেই বুঝতে পেরেছি মেয়েরা ভালোবাসার পাগল। তুই যদি উর্বীকে বোঝাতে পারিস তুই ওকে ভালোবাসিস আর ওই নিকৃষ্ট ঘটনার পেছনে তোর কোনো হাত নেই তাহলেই কেল্লা ফতে। ও আর কোনো যোগ্যতার তালাশ করবে না।”
“তুই ওকে বিয়ে করতে চাস না তাই এগুলো বলছিস তাই না?”
“নো ডিউট, ও তোকে বন্ধু ভাবতো। সেই হিসেবে ওর মনে নিশ্চয়ই তোর জন্য একটু হলেও ভালোলাগা আছে। সেটা মাথায় রেখেই একবার ট্রাই করতে বললাম। তুই যদি ব্যর্থ হোস আমি খুশি খুশি ওকে বিয়ে করে নেবো। নইলে তোর জন্য আমার খুব দুঃখী দুঃখী লাগবে রে।”
রিদম বোধহয় সাহস পেল। তবুও সংশয় কমছেই না যেন। “যদি ওকে বোঝাতে গিয়ে হিতে বিপরীত হয়ে যায়?”
সোহম হঠাৎই রিদমকে পেছন দিয়ে জড়িয়ে ধরে নাটুকে গলায় বলল, “সোহম ক্যা রেহতে হুয়ে ফিকার কিস বাত কা?”
রিদম বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল, “তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে তোর অভিজ্ঞতা আছে।”
“হুম আছে। তুই তখন ছিলি না। বান্দরবানে তোকে খুঁজতে গিয়ে আমরা অনেক মজা করেছি। একদিন ‘ট্রু অর সাইলেন্স’ খেলা হয়েছিল। তুই বিশ্বাস করবি না তেহ সেদিন পাওয়ারফুলের কাছে হেরে গিয়েছিল।”
রিদম আকাশ থেকে পড়ল। “কিহ! তুই ওয়ান শটেই আজ ড্রাংক হয়ে গেলি নাকি?”
সোহম বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিমায় বলল, “না রে, সত্যিই বলছি।”
“বোকাফুলের গায়ে এতো শক্তি? দেখে তো মনে হয় একটা মশা মারতে গিয়েও ওর অর্ধেক দম বেরিয়ে যাবে। সেই মেয়ে কি না পাঞ্জা লড়াইয়ে তেহুর মতো ভাল্লুককে হারিয়ে উল্লুক বানিয়ে ফেলেছিল?”
“আরে শক্তি দিয়ে নয় কৌশল খাটিয়ে জিতে গিয়েছিল স্কিলফুল।”
“তারপর কী হলো?”
“কী আবার হবে, পারপাসফুল প্রশ্ন করলো তেহ ওকে সত্যিই ভালোবাসে কিনা।”
রিদম আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। সোহম বলল, “তুই তো জানিসই তেহ কার্মাতে বিশ্বাস করেনা। তাই ও বিনা দ্বিধায় মিথ্যা বলে দিল।”
“কী বলেছে?”
“বলেছে ভালোবাসে। তারপর মাইন্ডফুল আমাকে জিজ্ঞেস করল ও কার্মাতে বিশ্বাসী কিনা। আমি বলে দিলাম, হ্যাঁ খুব বিশ্বাস করে।”
“তোর কেন মনে হচ্ছে তেহ ভালোবাসার কথা মিথ্যা বলেছে? এমনও তো হতে পারে তেহ সত্যিই ভালোবাসে বোকাফুলকে।”
“আমরা সবাই ধরেই নিয়েছিলাম তেহ ভালোবাসে বিউটিফুলকে। ভেবেই নিয়েছিলাম মনস্টার তো তাই ভালোবাসা ঠিকমতো এক্সপ্রেস করতে পারছে না। আমিও তাই ফ্রাইটফুলকে বিশ্বাস করানোর জন্য বলে দিয়েছিলাম তেহ কার্মাতে বিশ্বাস করে। কিন্তু…”
“কিন্তু কী?”
“ধাক্কাটা তখন খেলাম যখন শুনলাম তেহ তোকে বাঁচানোর জন্য সোলফুলকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছে। ও জানতো ট্রি হাউসের আশেপাশে রিহানের লোকেরা ওত পেতে আছে। সেটা জেনেও পিটিফুলের পিছুপিছু যায়নি। আর নাতো লুহানকে যেতে দিয়েছে।”
রিদম থম মেরে গেল। চাপা গলায় বলল, “হিশশ! বোকাফুল যেন ব্যাপারটা জানতে পারে না। তেহ যে কী চায় বুঝে ওঠা মুশকিল। তবে আমরা কিন্তু চাই তেহ যা চায় তাই যেন পায়।”
সোহম মাথা নেড়ে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল। “হ্যাঁ সেটাই বলছিলাম। সেদিন আমি যদি সেটুকু মিথ্যা না বলতাম তাহলে ফেয়ারফুল হয়তো হেলিকপ্টারে বসে তেহকে ভালোবাসার কথা স্বীকার করার সাহস পেতো না। , আমার যেহেতু ফিল্ড এক্সপেরিয়েন্স আছে, আমি তোকেও সাহায্য করতে পারব। বুঝলি?”
রিদম গ্লাসে চুমুক দিয়ে হালকা হাসল। “ঠিক আছে লেটস ট্রাই।”
↓↑
টালমাটাল পায়ে নিজের রুমে ঢুকে বিছানার ওপর ধপ করে বসে পড়ল ফুল। তার মস্তিষ্ক যেন এক নিরেট শূন্যতায় ডুবে আছে। বুকের ভেতরটা হু হু করছে, ভীষণ কান্না পাচ্ছে; কিন্তু সেই কান্নার শক্তিটুকুও যেন ভেতর থেকে নিঃশেষ হয়ে গেছে। পাশে পড়ে থাকা সেই রক্তিম শাড়িটার দিকে সে কিছুক্ষণ উদ্দেশ্যহীনভাবে তাকিয়ে রইল। অতঃপর ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে এলো সে; যদি অস্থিরতা কিছুটা কমে।
ওদিকে উদ্যান খাটের কিনারায় বসে একহাতে ফোন টিপছিল। পায়ে স্লিপার, ডান পা বাম হাঁটুর ওপর তুলে রাখা আয়েশি ভঙ্গিতে। অন্য হাতে তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে ব্যস্ত সে। গায়ের সাদা শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা, যেখান দিয়ে উঁকি দিচ্ছে তার চওড়া পুরুষালি বক্ষপট।
ডোরবেল বেজে উঠতেই হাতের তোয়ালেটা একপাশে ছুড়ে মারল উদ্যান। ফোনটা বেডসাইড টেবিলে রেখে দ্রুত পায়ে গিয়ে দরজা খুলল। সামনে ফুলকে দেখামাত্রই তার চোখের মণি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে ‘অ্যালেক্স’কে আদেশের সুরে বলল, “অ্যালেক্স, টার্ন অফ দ্য লাইটস ফার্স্ট অ্যান্ড দেন গো কমপ্লিটলি শাট ডাউন ফর টু নাইট।”
লাইটের আলো নিভে যেতেই রুমে জ্বলতে থাকা মোমবাতির ক্ষীণ আলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। ফুল কিছু বুঝে ওঠার আগেই উদ্যান তার কোমর জড়িয়ে ধরে হ্যাঁচকা টানে ভেতরে নিয়ে এল। দরজার বিপরীতে নিজের পিঠ ঠেকিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে লক করে দিল দরজাটা। ভয়ার্ত চোখে ফুল একবার ডানে-বায়ে তাকিয়ে নিল। উদ্যান ফুলের চুলের বাঁধন আলগা করে দিয়ে তার নরম গালে হাত রাখল। ফিসফিস করে বলল, “তান রুমে নেই, শুধু তুমি আর আমি আছি।”
হঠাৎ কোনো একটা কথা মনে পড়তেই উদ্যান তাকে সামান্য আলগা করে দিয়ে একটু সরে দাঁড়াল। তারপর ফুলকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। খোলা চুলে ফুলকে অত্যন্ত আবেদনময়ী দেখাচ্ছে। মাথা নিচু করে মেয়েটা হাত কচলাচ্ছে অনবরত। মোমবাতির টিমটিমে আলোয় ফুলের এই কুণ্ঠিত রূপ যেন উদ্যানের ভেতর এক বিশেষ তৃষ্ণা জাগিয়ে তুলল।
কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সে আবারও ফুলকে নিজের দেহের সাথে লেপ্টে নিল। আকস্মিকতায় আঁতকে উঠল ফুল। উদ্যান এক ঝটকায় ফুলের বুকের উপরিভাগে জড়িয়ে রাখা ওড়নাটা খুলে ফেলে উন্মুক্ত গ্রীবাদেশে মুখ ডুবিয়ে দিল। এক অদ্ভুত ঘোরলাগা কণ্ঠে বলল, “শাড়িটা কেন পরলে না পেটাল? পছন্দ হয়নি তোমার?”
উদ্যানের একের পর এক উন্মুখ স্পর্শে ফুলের তখন নাজেহাল দশা। সে উত্তর দিতে গিয়েও খেই হারিয়ে ফেলছে। উদ্যান উত্তরের অপেক্ষা করল না; কামিজের নিচ দিয়ে ফুলের স্পর্শকাতর উদরে হাত রাখতেই মারাত্মকভাবে কেঁপে উঠল ফুল। উদ্যান একটুও দয়া দেখাল না, বরং জায়গাটা আরও শক্ত হাতে খামচে ধরল। ফুল আর নিজেকে সামলাতে পারল না, যন্ত্রণায় না কি সুখে, কে জানে, তার ঠোঁটের ফাঁক গলে বেরিয়ে এল এক অস্ফুট আর্তনাদ, “আহ্!”
পরক্ষণেই উদ্যান ফুলের চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে তার রক্তিম ঠোঁটজোড়া নিজের দখলে নিয়ে নিল। চুমুর তীব্রতা যেন চারপাশের উত্তাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। উদ্যান অবলীলায় ফুলের তুলোর মতো হালকা শরীরটা শূন্যে তুলে ধরল। পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ফুল দু-হাতে উদ্যানের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। উদ্যান আরও প্রগাঢ় আলিঙ্গনে ফুলের পা-জোড়া নিজের কোমরে জড়িয়ে নিয়ে খাটের দিকে হাঁটা ধরল।
ফুলকে বিছানায় বসিয়ে রেখে উদ্যান আলতো করে চুমু ভাঙল। তারপর ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে ফুলের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড়াল, “শাড়ি খোলা তুলনামূলক সহজ হতো পেটাল। থাক, দু-একটা জামা ছিঁড়ে গেলে তোমার খুব একটা সমস্যা হবে না, নিশ্চয়ই? প্রয়োজনে কাল পুরো শপিংমল কিনে দেবো তোমায়।”
উদ্যান যখন ফুলের কামিজের নিচের অংশ ধরে উপরে ওঠানোর উপক্রম করল, ঠিক তখনই ফুল সম্বিৎ ফিরে পেয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, “প্লিজ থামুন আপনি, আমি এখানে একটা প্রশ্ন করতে এসেছি।”
সঙ্গে সঙ্গেই উদ্যানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কামনার অনল যেন মুহূর্তেই ক্রোধে রূপান্তরিত হলো। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছো পেটাল? যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে বলবো আমি ধৈর্য্যের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি।”
“জি না, আমি আপনার ভালোবাসার পরীক্ষা নেবো। এখন এইমুহূর্তে আপনি ফেলে দেওয়া ওড়নাটা তুলে এনে পরিয়ে দেবেন আমায়। তারপর দূরত্ব বজায় রেখে পাশে বসে আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন।”
কথাটা শ্রবণগোচর হতেই উদ্যান সাপের মতো ফোঁসফোঁস করে উঠল। পরিস্থিতি যে কতোটা কঠিন সেটা শুধু সেই অনুভব করতে পারছে।
“যদি আমি তোমার কথা না শুনি কী করবে তুমি?”
“না শুনে নিশ্চয়ই জোরজবরদস্তি করবেন? খাঁটি ইংরেজিতে যাকে ম্যারিটাল রে’প করা বলে। আর আমার ওপর জোর খাটালে আমি নিজের সাথে কী করতে পারি, তা আপনি খুব ভালো করেই জানেন,” ফুলের বিষাদমাখা উত্তর উদ্যানকে মুহূর্তেই থমকে দিল।
উদ্যান প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে দাঁড়াল। ফুলের বাহু শক্ত করে চেপে ধরে বিক্ষিপ্ত স্বরে গর্জে উঠল, “ভালোবাসো না তুমি আমায়?”
“বাসি, কিন্তু আপনি বাসেন না।”
“আমি খুব ভালোবাসি তোমায়… তুমিও ভালোবাসো আমায়। তাহলে কেন বারবার সু’ইসাইড করার ভয় দেখাচ্ছো?”
“যদি সত্যিই ভালোবেসে থাকেন, তবে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তা প্রমাণ করে দিন।”
“ভালোবাসা হাইপোথিসিস নয়। কতোবার বলবো?”
“আপনার ভালোবাসা হাইপোথিসিস থেকে কোনো অংশে কম নয়। আপনাকে প্রমাণ দিতেই হবে। যদি না দিতে চান তাহলে যা খুশি করে ফেলুন।”
এক চরম মুহূর্ত! উদ্যান তার সমস্ত পুরুষালি দম্ভ আর তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে বহু কষ্টে অবদমিত করল। ফ্লোর থেকে ওড়নাটা তুলে এনে অবহেলায় ফুলের গলায় জড়িয়ে দিল সে। তারপর ড্রয়ার থেকে একটা সিগারেট বের করে মোমবাতির শিখায় জ্বালিয়ে নিয়ে সেটা ঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরল। ঘুরে এসে ফুলের পাশে দূরত্ব রেখে বসল। নির্দ্বিধায় বিষাক্ত ধোঁয়ার কুন্ডলী বাতাসে উড়িয়ে দিতে দিতে বলল, “তোমার ভালোবাসা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে আমার। যদি সত্যিই ভালোবাসতে তাহলে আমি তোমার সাথে জোরাজুরি করলেও নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ভয় দেখাতে পারতে না।”
ফুল অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লোকটা সব বিষয়ে মাত্রাতিরিক্ত চতুর হলেও অনুভূতির ব্যাপারে বড্ড কাঁচা। সে বুঝতে পারছে ফুল তাকে ভয় দেখাচ্ছে অথচ এটা বুঝতে পারছে না ফুল আসলেই শুধুমাত্র ভয় দেখানোর জন্যই কথাটা বলছে কারণ ফুল জানে এই একটা কথা বলেই দানবটাকে ভয় দেখানো সম্ভব।
“এই যে আমি সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য করতে পারিনা জেনেও আমার সামনে বসে ধূমপান করছেন, এর কারণেও কিন্তু আপনি পরীক্ষায় ফেল করতে পারেন।”
উদ্যান আঁড়চোখে একবার তাকাল ফুলের দিকে। মেয়েটা অন্যদিকেই তাকিয়ে আছে। উদ্যান নিষ্প্রভ কণ্ঠে বলল, “তো বেরিয়ে যাও আমার রুম থেকে৷ তোমাকে কি আমি জোর করে বসিয়ে রেখেছি নাকি! চলে যাও আমার চোখের সামনে থেকে।”
ফুল অবাক হয়ে চট করে তার দিকে তাকাল। অবিশ্বাসের সুরে বলল, “আপনার বলা উচিত ছিল ‘ঠিক আছে আমি আর সিগারেট খাবো না।’ তা না বলে আপনি আমাকে চলে যেতে বলছেন?”
“ওহ সরি, আচ্ছা তুমি থাকো তাহলে আমিই বেরিয়ে যাচ্ছি। এমনিতেও এখানে বসে থাকার সব ইচ্ছা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছো তুমি।” কথাটুকু বলে সিগারেটটা মেঝেতে ছুড়ে পা দিয়ে পিষে ধরল উদ্যান। তারপর তাড়া দিয়ে বলল, “যা বলার তাড়াতাড়ি বলো, কাজে যাবো আমি।”
“এই রাতের বেলা কী কাজে যাবেন?”
“রাতের বেলা আর দশটা বিবাহিত পুরুষ যা করে তা তো তুমি আমাকে করতে দেবেই না। তাই অন্য কোনো কাজ করেই টাইম পাস করবো গিয়ে।”
ফুল আলতো গলায় বলল, “আমি কিন্তু বসে বসে গল্প করতে রাজি আছি।”
“বাট আমি আগ্রহী নই। গল্প করা ভীষণই বোরিং কাজ। যা বলার তাড়াতাড়ি বলো। বেশিক্ষণ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে পারবো না, মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরানো দরকার।”
ফুল গলা পরিষ্কার করে ধীরস্থির ভাবে শুধাল, “আপনি জেনেশুনেই আমাকে রিহানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তাইনা?”
এহেন প্রশ্ন শুনেও উদ্যানের পাথুরে মুখচ্ছবিতে কোনো বিকার দেখা গেল না। সে শুধু শান্ত গলায় পালটা প্রশ্ন করল, “হঠাৎ তোমার এমনটা কেন মনে হলো, পেটাল?”
“মনে হয়নি, আমি সিওর। আপনি জানতেন রিহানের লোকেরা আশেপাশেই ওত পেতে আছে। সব জেনেও আপনি আমার পিছু যাননি, আমাকে একলা ছেড়ে দিয়েছিলেন।”
আসলে ফুল সোহম আর রিদমের কথাগুলো শুনে ফেলেছিল। উর্বীকে অনিলার রুমে রেখে আসার সময় সোহম যখন ‘ট্রুথ অর সাইলেন্স’ এর প্রসঙ্গ তুলল, ফুল তখন রিদমের রুমের সামনে দিয়েই যাচ্ছিল। দরজা আলগা থাকায় সোহমের বলা কথাগুলো পরিষ্কার শুনতে পেয়েছে ফুল। সে আড়ি পেতেছে এমনটা নয়, পাজোড়া আপনা-আপনি থেমে গিয়েছিল তার।
উদ্যান দু আঙুলে কপাল ঘষতে ঘষতে বলল, “দেখো পেটাল আমি তোমার বড় কোনো ক্ষতি হতে দিইনি। এটাই সবচেয়ে বড় কথা, হ্যাঁ তুমি মাথায় আঘাত পেয়েছো, তার জন্য তুমি শাস্তি দাও। প্রয়োজনে আমাকে আঘাতও করতে পারো।”
ফুল তাজ্জব বনে গেল। লোকটার মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই! সে আর্তনাদ করে উঠল, “শাস্তির কথা ছাড়ুন! আপনি শুধু বলুন আমাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছেন কিনা।”
এই প্রথম উদ্যান ভাষা হারিয়ে ফেলল। তীরের কাছে এসেই যেন তরীটা ডুবে গেল তার। উদ্যানের এই নির্লিপ্ততা ফুলের মনে জ্বলতে থাকা শেষ আশার প্রদীপটাও নিভিয়ে দিল। হ্যাঁ ফুল কখনোই উদ্যানের ভালোবাসা অনুভব করে নি। কিন্তু তাও সেই তীরের ফলাটাকে হাত দিয়ে ধরে ফেলা, ট্রুথ অর সাইলেন্সে উদ্যানের স্বীকারোক্তি এবং সবশেষে রিহানের হাত থেকে যেভাবে উদ্যান তাকে বাঁচিয়েছিল সেই ঘটনাগুলোর জন্য মনের কোথাও একটু আশা ছিল যে উদ্যান সত্যিই ভালোবাসে তাকে। সেই আশা টুকুও আজ নিঃশেষ হয়ে গেল।
বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর উদ্যান বলল, “হ্যাঁ আমি জানতাম রিহানের লোকেরা আশেপাশেই আছে। তবুও আমি তোমার পিছু নিইনি কেন নিইনি জানো? কারণ তুমি আমাকে খুব রাগিয়ে দিয়েছিলে, আজও খুব রাগিয়ে দিয়েছো। আমি ভালোবাসি তোমাকে কিন্তু তুমি ভালোবাসো না আমায়।”
উদ্যান উঠে দাঁড়াল। শার্টের বোতামগুলো একে একে আটকে পকেটে হাত গুঁজে দরজার দিকে এগোল। যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ঘুরে তাকিয়ে বলল, “তোমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখাটাই তো ভালোবাসার পরীক্ষা তাইনা? এতে উত্তীর্ণ হতে পারলেই তো প্রমাণ পেয়ে যাবে আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি! ঠিক আছে, আমি তাই করব। আমি প্রমাণ করে দেব।”
কথাখানা বলেই দ্রুত পদক্ষেপে রুম ত্যাগ করল উদ্যান। ফুল আবারও ঘুরে ফিরে এক গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে গেল। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে তার। বিছানার ওপর অসহায়ভাবে ঢলে পড়ল সে। মাথার কাছের বালিশটা টেনে নিয়ে কোলের মধ্যে জাপটে ধরল। বালিশের ভাঁজে মুখ গুঁজে দিয়ে বড় করে শ্বাস নিল সে; টেনে নিতে চাইল উদ্যানের সেই অতি পরিচিত গায়ের ঘ্রাণ। হঠাৎ কান্না পেয়ে গেল তার। হু হু করে কেঁদে উঠল সে।
“খুব ভালোবাসি আপনাকে। শুধু ভয় হয়, আপনি যদি আবার পাল্টে যান? আবারও যদি সেই আগের মতো নিষ্ঠুর আচরণ করেন? আমি তা সহ্য করতে পারব না। তার চেয়ে এভাবেই দূরত্ব থাকুক আমাদের মাঝে, এটাই বোধহয় ভালো হবে।”
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৬৫০+
(আজ হয়তো ফুলকে অনেক তোপের মুখে পড়তে হবে। বাট আমি এনজয় করবো ব্যাপারটা।)
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৫ (এর বর্ধিতাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪০