Golpo romantic golpo অন্তরালে আগুন

অন্তরালে আগুন পর্ব ৫৪


অন্তরালে_আগুন

পর্ব:৫৪

তানিশা সুলতানা

একটা পুলিশ বার কয়েক নুপুরের মুখপানে তাকিয়েছে। তার উদ্দেশ্য সৎ না অসৎ ছিলো সেসব দেখার সময় নওয়ান তালুকদারের নেই। সে হাতের সিগারেট ফেলে এগিয়ে যায় পুলিশটার কাছে। এবং তাকে কিছু বুঝে ওঠার সময় না দিয়ে এলোপাতাড়ি মা/র/তে শুরু করে।
বাকি পুলিশ সদস্য নুপুর বল্টু সকলেই চমকায়।

“বাস্টার্ড তোর সাহস হলো কি করে আমায় চাঁদের দিকে তাকানোর?

স্নেহার হাত পা কাঁপছে। এমনিতেই নওয়ান অভিযুক্ত এখন এই পুলিশকে মে/রে ফেললো পুলিশ তো কখনোই ছাড়বে না তাকে। জামিন পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
ব্যাপার খানা নুপুরও ভাবছে।
এদিকে বাকি পুলিশরা এগিয়ে আসার সাহস পাচ্ছে না। নওয়ান তালুকদারকে থামানোর সাধ্য তাদের নেই।।
অগত্য নুপুর এগিয়ে যায়। নওয়ান এর হাত খানা ধরে। ব্যাসসস অনলের মতো জ্বলতে থাকা মানুষটা পানির ঠান্ডা হয়ে যায়৷ ছেড়ে দেয় পুলিশটাকে। চোখ মুখ স্বাভাবিক করে তাকায় তার চাঁদের মুখপানে।
নুপুর দুপাশে মাথা নাড়িয়ে “না” বোঝায়।
বাকি পুলিশরা আহত পুলিশকে নিয়ে হাসপাতালে চলে যায়। এসিপি আশিক বলে
“এতো হাইপার হলে কিভাবে চলবে? ভুলে যাচ্ছেন যে আপনি জেলখানায় রয়েছেন।

ফেলে দেওয়া সিগারেটে এখনো আগুন রয়েছে। নওয়ান সেটা কুড়িয়ে ঠোঁটের ভাজে গুঁজে নেয়।
” আমার চাঁদের দিকে তাকালে কলিজা কেটে হাতে ধরিয়ে দিবোই।
সে আমি জাহান্নামে থাকি আর জেলখানায়। নওয়ান তালুকদার এক আল্লাহ ব্যতিত আর কাউকেই ভয় পায় না।

আশিক আর কিছু বলে না। বল্টু নিজ স্থানে গিয়ে বসে।
নওয়ান এবার স্নেহার দিকে তাকিয়ে ধমকে বলে ওঠে
“এখানে কি চাই তোর?
নাটক করিস?
এখন সোজা বাড়ি যাবি। আর যেনো তোকে না দেখি

সব সময়কার মতোন চুপ থাকে স্নেহা। একটা কথাও বলে না৷ শুধু নওয়ানের মুখ পানে তাকিয়ে থাকে কিছু মুহুর্ত। আসলেই সে নাটক করছে।।
কতোটা বেহায়া হয়ে উঠেছে। না না এতোটাও বেহায়া হওয়া উচিত নয়।
বুক চিঁড়ে দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে আসে স্নেহার। সে মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায়।
নওয়ান স্বেচ্ছায় গিয়ে জেল খানার ভেতরে ঢোকে। হাঁটু মুরে ফ্লোরে বসে পড়ে। বল্টু নওয়ানের পাশেই বসে।
নুপুর এক পা দু পা করে এগোয়

“আমি কি চাই বুঝতে পারছি না৷ এখানে আসার মনে হচ্ছিলো আপনাকে না দেখতে পেলে বাঁচবো না। যে কোনো মূল্যে আপনাকে দেখতেই হবে।
এখানে আসার পরে মনে হচ্ছে প্রতিটা অপরাধীর শাস্তি পাওয়া উচিত।
ক্ষমার অযোগ্য পাপী আপনি।
দুই হাতে অনেক মানুষকে খু/ন করেছেন। এখনো শাস্তি না পেলে আরও অনেক মানুষকে খু/ন করবেন৷

“দুর্বল হইও না।
তোমাকে শক্ত থাকতে হবে।

নুপুরের দুচোখ বেয়ে দুফোঁটা অশ্রুকণা গড়িয়ে পরে। সে হাতের উল্টো পিঠপ চোখ মুছে বলে
” শক্ত থাকবো আমি। ভেঙে পড়বো না৷
শুধু কষ্ট হয় স্নেহা আপুর জন্য। আপনার অভাবে সে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

এযাত্রায় তাচ্ছিল্য হাসলো নওয়ান।
সিগারেট এর শেষ অংশ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিরবির করে বলে
“আমিও যে শেষ হয়ে গেলাম নুপুর।
আমারও যে কষ্ট হয়।
আমিও যে দুঃখ পাই।
তুমি আমায় একটু ভালোবাসতে।
একটু মায়া করে আমার বুকে মাথা রাখতে।
ব্যাসস আর কিছু চাওয়ার থাকতো না আমার।


কেউ অপেক্ষায় মরে, আবার কেউ অপেক্ষাকেই বেঁচে থাকার অবলম্বন করে বাঁচে।
মানুষ বলে “কেনো ভালোবাসলে? কেনোই বা এতো পাগলামি করছো?
একটা মানুষ ছাড়া জীবন থেমে থাকবে না কি? সময় তো তার নিয়মে চলতেই থাকবে। শূন্যস্থান সারা জীবন শূন্য থাকে না।
কোনো না কোনভাবেই সেটা পূরণ হয়ে যায়।
নিজেকে এতো দুঃখ দিও না। মুভ করে ফেলো।
এটা কি আসলে সম্ভব হয়?
কাউকে ভালোবাসলাম আর তাকে পেলাম না। তারপর তাকে ভুলে নতুন কাউকে ভালোবাসলাম। নতুন কারো সঙ্গে জীবন সাজালাম।
এটা কি করে সম্ভব হতে পারে?
ভালো কয়জনকে বাসা যায়?
বা একজনকে ভালোবেসে আরেকজনের সাথে সংসারী বা কি করে করা যায়?
স্নেহা তো পারে না।
তার মতে শূন্যস্থান সারা জীবন শূন্যই থাকে।
গোটা আড়াই পৃষ্ঠার অংকে একটা প্লাস মাইনাস ভুল হলে অংক মেলে না। আড়াই পৃষ্ঠা পরিশ্রমের কোনো মূল্য থাকে না।
নওয়ান তালুকদার স্নেহার সেই আড়াই পৃষ্ঠা অংকের একটা ভুল মাইনাস।
গোটা জীবন পেরিয়ে গেলেও এই ভুল কখনো সংশোধন হবে না। হয় গোটা অংক কাটা দিয়ে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলে নতুন পৃষ্ঠায় শুরু করে অংক করতে হবে।
না হয় এই ভুল অংকের সঠিক সমাধান খুঁজতে খুঁজতে একটা জীবন কেটে যাবে।
স্নেহা দ্বিতীয় রাস্তা বেছে নিয়েছে। সে ভুল অঙ্কের পেছনেই ছুটবে। সঠিক মানুষ বা সুন্দর জীবনের কোনো প্রয়োজন নেই তার।

বড় মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে জেলখানা থেকে ছুটতে ছুটতে মুন্নু হাসপাতলে চলে আসে স্নেহা। হাসপাতালের গেটের সামনে অভিকে দেখা যায়। গতকাল রাত থেকে এই অবদি কতবার কল করলো এই মানুষটাকে। কতবার তার সাথে কন্টাক্ট করার চেষ্টা করলো অথচ সে যোগাযোগ করলো না।
এখন এই মুহূর্তে তাকে দেখে স্নেহা একবার মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে নেয় পরবর্তীতে কিছু একটা মনে করে অভির সামনে এসে দাঁড়ায়।
চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে
“কেনো করলেন এমনটা?

অভিও সমানতালে জবাব দেয়
“প্রয়োজন ছিলো

” আমি তো বলেছিলাম আপনাকে বিয়ে করবো৷

“চলো কোথাও বসে কথা বলি।

” বলবো। তার আগে নওয়ানকে মুক্ত করুন।

“আগামীকাল কোর্টে নুপুর কথা না বললেই সে মুক্ত হবে।
তুমি বরং নুপুরকে অনুরোধ করো কিছু না বলতে৷


গোটা বাংলাদেশের মানুষ নওয়ান তালুকদারের মুক্তি চায়। এমনটা নয় যে তারা বলছে সে নির্দোষ।
হ্যাঁ সে দোষী তবুও তাকে স্বসম্মানে মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই কোর্টের কার্যক্রম শুরু হবে। ইতিমধ্যেই সকলেই উপস্থিত হয়েছে। মানিকগঞ্জ কোর্টের সামনে সাধারণ মানুষের ভিড়।
মুখে মুখে স্লোগান।
আমিনা বেগমও এসেছে ছেলেকে দেখতে। আসে নি শুধু স্নেহা। সিনথিয়া তাকে নিয়ে ঢাকা গিয়েছে।
নায়েব তালুকদার আজ বড্ড ক্লান্ত। চোখে মুখে হতাশা। কোনো কথা বলতে পারছে না।।
কাঠগোড়ায় নওয়ানকে দাঁড় করানো হয়৷ জর্জ উপস্থিত হয়। দুই পক্ষের উকিল উপস্থিত হয়েছেন সকলের আগে৷
নুপুর তার বাবা এবং ভাইয়ের সঙ্গে এসেছে।
শুরু হয় কোটের কার্যক্রম। জর্জ কোনো উকিলের বক্তব্য শোনার আগেই নুপুরের কথা শুনতে চায়।
নুপুর এসে কাঠগড়ায় দাঁড়ায়।

” আমিই বোধহয় পৃথিবীর একমাত্র মেয়ে যে নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে।
এই ভরা মজলিসে আমি অবলীলায় স্বীকার করছি যে নওয়ান তালুকদার পৃথিবীর সব থেকে শ্রেষ্ঠ স্বামী। তার ভালো হাজব্যান্ড দুটো হতে পারে না। উনি আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে।
আমার খুশির জন্য নিজের জীবনটাও দিয়ে দিতে প্রস্তুত।
তবে মানুষ হিসেবে উনি ভীষণ খারাপ। ক্ষমতা মানুষকে কতোটা খারাপ করে দিতে পারে আমি জানি না। তবে নওয়ান তালুকদারকে খারাপ করে দিয়েছে।
মানিজগন্জ ৩ আসনের এমপি শাহাবুদ্দিন এবং তার মেয়ে ইরাবতীকে বিষ মিশিয়ে খু/ন করেছে উনি।
ওনাদের অপরাধ ছিলো ওনারা নায়েব তালুকদারের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন।
মজার ব্যাপার হলো ইরাবতীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক ছিলেন নায়েব তালুকদারের। তাদের একটা পুত্র সন্তান রয়েছে। তার নাম আয়াশ। বর্তমান নায়েব তালুকদারের স্ত্রী বাচ্চাটার দেখাশোনা করেন।
দৌলতদিয়ায় তৈরি পতিতায় নায়েব তালুকদারের তৈরি। আজ থেকে ২০ বছর আগে মেয়েদের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করতেন এবং তাদের ভোগ করে সেই পতিতায়ে রেখে আসতেন।
এবং কিছু বছর পর পর মেয়েগুলোকে বিদেশে পাচার করেন। হারিয়ে যাওয়া সব গুলো মেয়ের ঠিকানা ওই প/তি/তা/ল/য়।
সেখানে সুমি একটা মহিলা থাকতেন। যার বোনের নাম আশা। নায়েব তালুকদার ওই দুইবোনের সঙ্গেই অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন৷
বাধ্য হয়ে একজনকে বিয়ে করেছিলেন। যার ঘরে দুটো সন্তান। আবির এবং আয়রা।
আর সুমিকে প/তি/তা/ল/য়ের বাসিন্দা বানিয়েছিলেন।
আবির আমার বন্ধু আনুর সঙ্গেই এই অন্যায় করে। তাকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখিয়ে প/তি/তা/ল/য়ে রেখে আসে।
বিদেশেও পাচার করতে গিয়েছিলেন। পাসপোর্ট বানাতে পারে নি বলে পাচার করতে পারলো না।
কিন্তু ওকে বাঁচতেও দিলো না৷ মে/রে ফেললো।

একটু থামে নুপুর। জোরে শ্বাস টেনে বলে
“বেঁচক ছিলো আমার আনু। সে মুন্নু হাসপাতাল থেকেই সুস্থ হতো।
কিন্তু সে বেঁচে থাকলে প্রমাণ পেয়ে যেতাম আমি। কি করে বাঁচতে দিতো তাকে?
তাই তো পরিকল্পনা করে ঢাকায় পাঠানো হলো। তারপর স্যালাইন এ বিষ মিশিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিলো।

জর্জ চোখের পানি মুছে বলে
“অভিযোগ করছো নায়েব তালুকদারের বিরুদ্ধে
অথচ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছো নওয়ান তালুকদারকে।

” ওই যে বললাম নওয়ান তালুকদার আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে।
তাকে নিয়ে করা অভিযোগ গুলো স্বীকার করে নিবে। তার চাঁদের ইচ্ছে পূরণ করার জন্য সে সত্যিটা বলবে।
কিন্তু নায়েব তালুকদার তো বহুরূপী। সে খুব সহজেই সত্যিকে মিথ্যে আর মিথ্যেকে সত্যি বানিয়ে ফেলতে পারবে।
তাই কাঠগড়ায় নওয়ান তালুকদার।

চলবে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply