প্রিয়া_আমার (পর্ব — ৫)
দূর্বা_এহসান
আকাশের বুক চিরে অঝোরে বৃষ্টি নামছে। শ্রাবণের এই ধারায় চারপাশ ঝাপসা, কিন্তু আয়াশের বুকের ভেতর যে আগুন জ্বলছে, তা নেভানোর সাধ্য এই বৃষ্টির নেই। সে বারান্দার রেলিংটা এত জোরে চেপে ধরেছে যে, তার হাতের আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেছে। নিকষ কালো অন্ধকারে বৃষ্টির প্রতিটি ছাঁট তীরের মতো এসে তার চোখে-মুখে বিঁধছে, ভিজে একাকার হয়ে গেছে তার দামী শার্টা। কিন্তু সেদিকে আয়াশের বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। তার স্নায়ুর প্রতিটি তন্ত্রীতে তখনো একটা মুখই ভেসে উঠছে-মাইমা। সেই বিষাদভরা, আতঙ্কিত দুটো চোখ, যা তাকে আজীবনের জন্য অপরাধী করে দিয়েছে।
-১৬ বছর!
শব্দটা আয়াশের মগজে হাতুড়ির মতো পিটুনি দিচ্ছে। যে মানুষটা দিনের পর দিন আদালতে দাঁড়িয়ে নারী অধিকারের পক্ষে গলা ফাটিয়েছে, যে মানুষটা বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সমাজে আদর্শের প্রতীক হিসেবে পরিচিত, আজ সে নিজেই নিজের বাড়িতে এক জঘন্য অপরাধের রাজসাক্ষী। আইনের রক্ষক হয়ে আজ সে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে-এই সত্যটা আয়াশকে কুরে কুরে খাচ্ছে। নিজের বিবেক যেন আজ তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে জেরা করছে।
আয়াশ বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
-আমি কি করে পারলাম? আমি কেন একবারও ওর দিকে তাকাইনি? কেন ওর চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করিনি?
তার নিজের ওপর নিজের এই ঘৃণা যেন বৃষ্টির চেয়েও শীতল। সে নিজেকে প্রশ্ন করছে, আভিজাত্য আর অহংকারের চশমা কি তাকে এতটাই অন্ধ করে দিয়েছিল যে, একটা বাচ্চা মেয়ের আর্তনাদ তার কানে পৌঁছায়নি।পেছন থেকে আইজানের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, যা আয়াশকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনল।
-ভাই, রাত অনেক হয়েছে। তুমি এভাবে বৃষ্টিতে ভিজলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। ভেতরে এসো।
আয়াশ কোনো উত্তর দিল না। পাথরের মূর্তির মতো সে দাঁড়িয়ে রইল অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে। আইজান ধীরপায়ে এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল। বড় ভাইয়ের এই ভেঙে পড়া রূপ সে আগে কখনো দেখেনি। যে আয়াশ সবসময় ইস্পাতের মতো শক্ত ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলে, আজ সে বৃষ্টির ধারার মতো ঝরে পড়ছে।
আইজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল,
-ভাই, নিজেকে এভাবে শেষ করো না। বাবা আর মা খুব চিন্তিত। মা আসলে পরিস্থিতির চাপে পড়ে এমনটা করেছেন। তুমি তো জানো না মাইমার পেছনের গল্পটা। ওর বাবা-মা মারা যাওয়ার পর ওর চাচারা ওকে মানুষ করার বদলে পণ্য হিসেবে দেখেছিল। ওকে বিক্রি করে দেওয়ার সব আয়োজন তারা সেরে ফেলেছিল। মা কোনো উপায় না দেখে, মেয়েটাকে বাঁচাতেই তড়িঘড়ি করে এ বাড়িতে নিয়ে এসেছেন।
আয়াশ এবার মাথা ঘুরিয়ে আইজানের দিকে তাকাল। তার চোখে জল না কি বৃষ্টির জল, তা চেনা মুশকিল। তবে তার কণ্ঠে ছিল বরফশীতল কাঠিন্য। সে ফিসফিস করে বলল,
-উপায় ছিল না, সেটা আমি মানছি। মা হয়তো ওর জীবন বাঁচাতে চেয়েছেন। কিন্তু আইজান, আমার কি অধিকার ছিল ওর ওপর ওভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার? আমি কি মানুষ ছিলাম তখন, না কি জানোয়ার হয়ে গিয়েছিলাম?
আয়াশ দম নিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে আইজানের কাঁধে হাত রেখে ভারী গলায় আদেশ দিল,
-আইজান, তুই কালই কোনো নামী টিউটর আর দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্টের সাথে কথা বলবি। ওর জন্য যা যা প্রয়োজন, তার ব্যবস্থা করবি। ওর শরীরের ক্ষত হয়তো সেরে যাবে, কিন্তু মনের যে ক্ষত আমি তৈরি করেছি, তার চিকিৎসা দরকার। ওর শারীরিক আর মানসিক -দুটো অবস্থারই সেরা চিকিৎসা চাই আমি।
আইজান মাথা নিচু করে বলল,
-আমি সব করব ভাই। কিন্তু তুমি?
আয়াশ রেলিং ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি এবার তীক্ষ্ণ।
-আমি থাকব না। আমি থাকলে ওর ভয় কাটবে না। আমি ওর সামনে যাওয়া মানেই ওকে সেই কালরাতের কথা মনে করিয়ে দেওয়া। আমি কাল সকালেই ঢাকার বাইরে চলে যাচ্ছি। যতদিন না ও সুস্থ হচ্ছে, যতদিন না ওর চোখে আমার জন্য ভয়টা কাটছে, ততদিন আমি ফিরব না।
আয়াশ আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। ভেজা কাপড়ে, ভারী পায়ে সে ভেতরে চলে গেল। পেছনে পড়ে রইল অন্ধকার বারান্দা আর অবিরাম ঝরতে থাকা বৃষ্টি।
ভোর হওয়ার ঠিক আগে, যখন চারপাশ হালকা কুয়াশা আর বৃষ্টির শেষ ছিটেফোঁটায় ভিজে আছে, আয়াশ তার কালো রঙের স্যুটকেসটা হাতে নিয়ে নিচে নেমে এল।
আয়াশ যাওয়ার আগে শেষবারের মতো নিজেকে সামলাতে পারল না। পা দুটো যেন অবাধ্য হয়ে মাইমার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। হাতে ধরা স্যুটকেসটা মেঝেতে নামিয়ে রাখল সে। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর বাইরে বৃষ্টির একটানা রিনিঝিনি।
খুব সাবধানে, অতি সন্তর্পণে আয়াশ দরজার হাতল ঘোরাল। দরজাটা সামান্য ফাঁক হতেই ভেতর থেকে ওষুধের কড়া গন্ধ।ঘরের কোণে একটা ডিম লাইট জ্বলছে, যার ম্লান নীলচে আলোয় ঘরটা এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে।
আয়াশ ভেতরে ঢুকল না। চৌকাঠের ওপর দাঁড়িয়েই সে দেখল,বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে ১৬ বছরের সেই মেয়েটি। চাদরটা বুকের ওপর শক্ত করে মুঠি করে ধরা, যেন ঘুমের ঘোরেও সে কোনো এক অদৃশ্য আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইছে। নীল আলোয় ওর ফ্যাকাশে মুখটা দেখা যাচ্ছে। চোখের নিচে কালচে ছায়া, আর ঠোঁটের কোণে এখনো শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতের দাগ।
আয়াশের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। এই সেই মেয়ে, যার জীবনটা সে এক রাতের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। ঘুমন্ত মাইমাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক দেবশিশু ভুল করে এই নরকে চলে এসেছে। ওর শান্ত নিশ্বাস পড়ার শব্দ আয়াশের কানে তীরের মতো বিঁধছে।
আয়াশ দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো মাইমার দিকে তাকালো। মাইমার গায়ের পাতলা চাদরটা একপাশে সরে গিয়েছিল, সেখান দিয়ে ওর ব্যান্ডেজ করা পায়ের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে।আয়াশের ইচ্ছে করছিল এগিয়ে গিয়ে চাদরটা টেনে দিতে, পরম মমতায় ওর কপালে হাত রেখে বলতে—
— আমাকে ক্ষমা করো।
কিন্তু সে সাহস ওর হলো না। তার মনে হলো, ওর ছায়া মাড়ালেও হয়তো মেয়েটা ঘুমের ঘোরেও আতঙ্কে চিৎকার করে উঠবে।
আয়াশ ধীর পায়ে ঘরের ভেতর পা রাখল। মেঝের কার্পেটে ওর পায়ের শব্দ হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু ওর নিজের হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি যেন ওর কানেই হাতুড়ির মতো বাজছে।
ঠিক তখনই ঘুমের ঘোরে মাইমা একটু নড়েচড়ল। ওর ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, যেন কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে সে। আয়াশ দ্রুত নিজেকে সরিয়ে নিল আড়ালে। ওর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। অপরাধবোধ যখন পাথরের মতো ভারী হয়ে বুকের ওপর চেপে বসে, তখন নিশ্বাস নেওয়াও কষ্টের হয়ে দাঁড়ায়।সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
ড্রয়িংরুমে তখনো রাতের অন্ধকার পুরোপুরি কাটেনি। সে একবার মাইমার ঘরের বন্ধ দরজার দিকে তাকাল। তার পা জোড়া যেন মাটির সাথে গেঁথে আছে। মনে হচ্ছে, এক পা বাড়ানো মানেই এক বিশাল পরাজয় মেনে নেওয়া।
আহিনুর বেগম সোফায় বসে ছিলেন, হয়তো ছেলের অপেক্ষায় সারারাত ঘুমাননি। আয়াশকে দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। ছেলের চোখের নিচে কালচে দাগ আর উষ্কখুষ্ক চুল দেখে তাঁর বুকটা ফেটে যাচ্ছিল।
আয়াশ নিচু স্বরে বলল,
–আমি আসছি, মা। আইজানকে সব বুঝিয়ে দিয়েছি। ওর যেন কোনো কষ্ট না হয়, সেটা দেখো।
মা এগিয়ে এসে আয়াশের কপালে হাত রাখলেন। আয়াশ ছিটকে সরে গেল, যেন সে কোনো পবিত্র স্পর্শের যোগ্য নয়। তার কণ্ঠে এক তীব্র ঘৃণা, যা নিজেরই প্রতি।
–আমাকে ছুঁয়ো না মা। আমার শরীর থেকে এখনো সেই অপরাধের গন্ধ যাচ্ছে না। আমি জানি না কবে ফিরব, কিংবা আদেও ফিরব কি না। শুধু এটুকু জেনে রেখো, আমি পালিয়ে যাচ্ছি না, আমি নিজেকে শাস্তি দিতে যাচ্ছি।
আয়াশ আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। বড় বড় কদমে সে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে রাখা গাড়ি প্রস্তুত। ড্রাইভার কাসেম আলী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার সাহেবের দিকে। যে মানুষটা সবসময় ইস্ত্রি করা নিখুঁত পোশাকে বের হয়, আজ তার শার্টের হাতা গোটানো, চোখ দুটো রক্তবর্ণ।
গাড়িতে উঠে বসার পর আয়াশ জানালা দিয়ে ওপরের তলার ওই অন্ধকার ঘরটার দিকে তাকিয়ে রইল। শহরটা পেছনে ফেলে গাড়ি যখন হাইওয়েতে উঠল, আয়াশ চোখ বন্ধ করল। কিন্তু সেই বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠল নীল আলোয় মাখামাখি এক কিশোরীর বিধ্বস্ত মুখ।
সকালে সূর্যের স্নিগ্ধ আলো যখন মাইমার জানালার কাঁচ ভেদ করে ঘরে এল, সে ধীরে ধীরে চোখ মেলল। ভোরের আলোয় ঘরটা উজ্জ্বল দেখালেও মাইমার মনের কোণে তখনো কাল রাতের সেই নিকষ অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। সারা শরীর যেন এখনো ব্যথায় টনটন করছে, প্রতিটি হাড়ের জয়েন্টে এক অসহ্য যন্ত্রণার রেশ। নড়াচড়া করতে গেলেই শরীর জানান দিচ্ছে গত সেই ঝড়ের কথা। কিন্তু ঘরে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ। সেই ভয়ংকর মানুষটি -আয়াশ,এখন আর এই ঘরে নেই। এই শূন্যতা মাইমাকে এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তি দিলেও মনের ভেতর এক অজানা আশঙ্কা তখনো কাজ করছিল।
ঠিক তখনই দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। ভয়ে মাইমার বুকটা ধক করে উঠল। সে দ্রুত গায়ের চাদরটা টেনে নিজেকে আরও ছোট করে নিল। ভেতরে ঢুকলেন আহিনুর বেগম। তাঁর হাতে সুন্দর করে সাজানো একটি নাস্তার ট্রে। মাইমা তাঁকে দেখেই বিছানায় আরও জড়সড় হয়ে বসল, যেন সে কোনো অপরাধী। আহিনুর বেগম ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসলেন। পরম মমতায় মাইমার এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন। তাঁর স্পর্শে আভিজাত্যের চেয়ে মাতৃত্বের ছোঁয়া ছিল বেশি।
তিনি নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
-কেমন আছিস রে মা? শরীরটা কি একটু ভালো লাগছে?
মাইমা নিচু স্বরে কোনোমতে বলল,
-জি
তার কণ্ঠস্বর এতটাই ক্ষীণ ছিল যে, ঘরের নিস্তব্ধতায় তা হারিয়ে যাওয়ার মতো।আহিনুর বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
-আয়াশের ওপর রাগ করিস না মা। ও আসলে বুঝতে পারেনি। ও মানুষ হিসেবে একদমই খারাপ নয়, পরিস্থিতি ওকে এমন করে তুলেছে। ও আজ সকালেই আমার কাছে এসেছিল। ওর চোখেমুখে আমি এক অদ্ভুত অনুশোচনা দেখেছি। সে নিজেই এসে তোর পড়াশোনার সব ব্যবস্থা করতে বলেছে। তুই তো কলেজে যেতে চেয়েছিলি, তাই না?
মাইমার চোখের কোণে এক পলক নোনা জল উপচে পড়ল। পড়াশোনা! যে স্বপ্নটা তার কাছে ধূসর হয়ে গিয়েছিল, তা কি আবার সত্যি হবে? সে কোনো উত্তর দিতে পারল না, শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। এই বিশাল অট্টালিকায়, নামী-দামী আসবাবপত্রের ভিড়ে সে নিজেকে ভীষণ অসহায় আর একা বোধ করছে। একদিকে অপমানের ক্ষত, অন্যদিকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার হাতছানি -দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ১৬ বছরের কিশোরী মাইমা শুধু বুঝতে পারল, তার জীবনটা চিরতরে বদলে গেছে।
আহিনুর বেগম ট্রে থেকে গ্লাসটা তুলে নিলেন,
-নে মা, এই দুধটুকু খেয়ে নে। শরীরটা শক্ত করতে হবে তো। আজ থেকেই তোর জন্য ফিজিওথেরাপিস্ট আসবে। আয়াশ কথা দিয়েছে, সে তোকে সব দিক থেকে আগলে রাখবে। ও হয়তো একটু রুক্ষ, কিন্তু ওর মনটা অনেক বড়।
মাইমা জানালার বাইরের আকাশটার দিকে তাকাল। আয়াশ মানুষটা তার কাছে এক ধাঁধা। যে মানুষটা এক রাতে তাকে ভেঙে চুরমার করে দিল, সেই আবার কেন তাকে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিচ্ছে? অপরাধবোধ না কি করুণা?
ঘড়ির কাঁটা তখন দশটা ছুঁই ছুঁই। হুইলচেয়ারে মাইমাকে নিয়ে অহনা বাগানে এসেছে। ভোরের বৃষ্টির পর বাগানটা এখন সতেজ, পাতায় পাতায় জমে থাকা জলের ফোঁটাগুলো রোদে মুক্তোর মতো চিকচিক করছে। অহনা পরম যত্নে মাইমার চাদরটা ঠিক করে দিল।
মাইমা চুপচাপ বসে আছে। তার দৃষ্টি বাগানের এক কোণে ফুটে থাকা রক্তজবার দিকে। অহনা হালকা হেসে বলল,
— জানো মাইমা, এই বাগানটা আয়াশ ভাইয়ের খুব প্রিয়। ছোটবেলায় যখনই মন খারাপ হতো, ও এখানেই এসে বসে থাকত।
মাইমা কোনো উত্তর দিল না। আয়াশ নামের মানুষটার প্রতি তার মনে এখন এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি। ঘৃণা? না কি ভয়? সে নিজেও জানে না। শুধু জানে, ওই মানুষটার ছায়া দেখলেও তার হৃৎপিণ্ড থমকে যেতে চায়।
অহনা মাইমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
–ভাইয়া চলে গেছে ঢাকার বাইরে। অনেকদিন ফিরবে না বলেছে। তুমি এখন একদম নিশ্চিন্তে থাক। ফিজিওথেরাপিস্ট তো কাল থেকেই। দেখবে, তুমি আবার আগের মতো দৌড়াতে পারবে ।
মাইমা ম্লান হাসল। পায়ের হাড়ের ক্ষত হয়তো ফিজিওথেরাপিতে সারবে, কিন্তু তার ১৬ বছরের কিশোরী মনের ওপর দিয়ে যে বুলডোজার চলে গেছে, তার থেরাপি কোথায়? সে ধীর গলায় প্রশ্ন করল,
–অহনা আপু, মানুষ কি চাইলেই সব ভুলতে পারে?
অহনা থমকে গেল। এই সহজ প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। সে শুধু মাইমার মাথায় হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই গেটের সামনে একটা গাড়ি থামার শব্দ হলো। আইজান এসেছে মাইমার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ আর বইপত্র নিয়ে।
দূর থেকে আইজানকে আসতে দেখে মাইমা আবার সেই কুঁকড়ে যাওয়া ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকাল। যদিও আয়াশ নেই, কিন্তু এই বাড়ির প্রতিটি পুরুষ সদস্যই এখন তার কাছে আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি।
আইজান কাছে এসে একরাশ বই মাইমার কোলে রেখে হাসিমুখে বলল,
–এই নাও তোমার নতুন পৃথিবী। ভাইয়া বলে দিয়েছেন, তোমার যা যা লাগবে সব যেন আজই চলে আসে। কোনো কিছুর অভাব হবে না তোমার।”
মাইমা বইগুলোর ওপর হাত রাখল। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ তার নাকে এল। যে পড়াশোনা তার কাছে বিলাসিতা ছিল, আজ তা এক প্রায়শ্চিত্তের উপহার হিসেবে তার কাছে এসেছে। সে কি পারবে এই উপহার গ্রহণ করতে? না কি আয়াশের দেওয়া এই ‘সুযোগ’ তার কাছে সারাজীবনের এক দায়বদ্ধতা হয়ে থাকবে?আকাশে মেঘ জমছে আবার। শ্রাবণের বৃষ্টি হয়তো শেষ হয়নি, ঠিক যেমন মাইমার জীবনের লড়াইটাও কেবল শুরু হলো।
চলবে?
Share On:
TAGS: দূর্বা এহসান, প্রিয়া আমার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডার্ক সাইড অফ লাভ পর্ব ২০
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ৮
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ১৬
-
প্রিয়া আমার গল্পের লিংক
-
ডার্ক সাইড অফ লাভ পর্ব ৬
-
ডার্ক সাইড অফ লাভ পর্ব ১
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ৭
-
ডার্ক সাইড অফ লাভ পর্ব ৯
-
ডার্ক সাইড অফ লাভ পর্ব ১৯
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ২