জলতরঙ্গেরপ্রেম
পর্ব সংখ্যা;০৭
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
মাগরিবের আজান পড়ে গেছে।
বিরক্তি নিয়ে ভাতের প্লেট হাতে তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে আছে তরী। তিন্নি ভাত মুখে নিয়ে বিছানায় বসে তরঙ্গের ফোনে কাটুন দেখছে। তরী কে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে; তিন্নির দিকে একবার তাকিয়ে। তরীর উদ্দেশ্যে তরঙ্গ সুধালো;-
–” মূর্তির মতো না দাঁড়িয়ে থেকে ভাত দিন তরকারি জান!”
দীর্ঘ শ্বাস চাপলো তরী। গালের উপর পড়ে থাকা চুল গুলো বাম হাতে কানের পেছনে গুঁজে নিলো সে।
–” নীচে চলুন, আমি আপনাকে ভাত বেড়ে দিচ্ছি।”
নাছোড় বান্দা তরঙ্গ নড়ল না। বরং লুঙ্গি সামলে পা জোড়া বিছানায় তুলে নিয়ে। দু’হাতে চুল গুলো পেছনে ঢেলে সোজা হয়ে বসলো সে। তরী ফের তিন্নির মুখে ভাতের লোকমা তুলে দিলো। তরঙ্গ মলিন মুখে সেদিক পানে এক পলক তাকিয়ে উঠে যেতে চাইলো। তা দেখে ডান হাতে ভাতের প্লেট ধরে। বাম হাতে তরঙ্গের হাত টেনে ধরলো তরী। তরীর হাতে মুঠোয় নিজের হাতের অস্তিত্ব টের পেতেই মিটিমিটি হাসি ফুটলো তরঙ্গ অধরে।
–” আটকালি কেন? খাওয়ানো লাগবে না। চলে যাচ্ছি আমি।”
–” বসুন।”
–” কি? কি বললি? শুনতে পেলাম না।”
–” সামনে বসুন।”
–” আমি ঠিক শুনতে পাইনি!”
দাঁতে দাঁত চেপে কটমটিয়ে উঠলো তরী। তরঙ্গের হাত ছেড়ে ঘুরে দাঁড়াল সে। তিন্নির অগোচরে, নিচু কণ্ঠে তরীর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে উঠলো তরঙ্গ—
–” ভালো তো ঠিক ই বাসিস। তবে স্বীকার করতে অসুবিধে কি?”
কথা শেষে আগের জায়গায় গিয়ে বসে পড়লো তরঙ্গ। তরী ভাতের লোকমা তুলে দিলো তার মুখে। ভাত মুখে নিয়ে তিন্নির সাথে কাটুন দেখায় মনোনিবেশ করলো তরঙ্গ। ধৈর্য্য সহকারে একে একে দুইজন কে খাইয়ে দিয়ে প্লেট নিয়ে হাত ধুতে নিচে চলে গেলো তরী। তাকে যেতে দেখে, তরঙ্গ ও নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো।
সন্ধ্যা সাতটা বাজে।
ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছেন বুশরা আর সাহনারা। কিচেনে তরী চা বানাচ্ছে। তিন্নি রুমে ঘুমাচ্ছে। ফোনের স্ক্রিনে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে দোতলা থেকে নেমে এলো তরঙ্গ। চুল থেকে টপাটপ পানি ঝরছে তার। দেখেই বুঝা যাচ্ছে মাত্র গোসল করেছে। লুঙ্গি পাল্টে ট্রাউজার পরেছে সে। গ্রে কালারের ট্রাউজারের সাথে সাদা টি-শার্টে অসম্ভব সুন্দর লাগছে তরঙ্গ কে।
ভেজা চুল গুলো এলোমেলো হয়ে কপালের উপর পড়ে আছে। সেখান থেকে গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটা তার শ্যামল কপাল বেয়ে নেমে আসছে গালের ধারে। প্রশস্ত কাঁধ, সুঠাম বুক আর দৃঢ় বাহুর রেখা সাদা টি-শার্টের ভেতর থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায়। হালকা বের্য়াডে ঘেরা চোয়ালটা তাকে আর ও গম্ভীর আর আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তীক্ষ্ম ভ্রু যুগলের নিচে কঠিন দৃষ্টির এক জোড়া চোখ। হাঁটার ভঙ্গিতে এক আত্মবিশ্বাস, অযত্নে যে সৌন্দর্য ফুটে ওঠে— তরঙ্গ ঠিক তেমন সৌন্দর্যের অধিকারক।
অলস ভঙ্গিমায় মা-চাচির সামনের সোফায় গিয়ে বসলো সে। সোফায় বসে ফোনের সাইড বাটনে প্রেস করে পাশে ফোন রেখে দিলো তরঙ্গ। সারা ড্রয়িং রুমে চোখ বুলিয়ে তরীকে খুঁজলো সে। তরীকে না দেখতে পেয়ে উঠতে নিলো তরঙ্গ।
–” দাঁড়া তরঙ্গ তোর সাথে একটু দরকারি কথা আছে।”
মায়ের প্রফুল্ল কন্ঠের ডাকে থেমে গেলো তরঙ্গ। পুনরায় সোফায় বসে পড়লো সে।
–” বলো?”
টিভি থেকে চোখ সরিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন সাহনারা। এগিয়ে এসে তরঙ্গের পাশ ঘেঁষে বসলেন তিনি। হাসি হাসি মুখেই সাহনারা বলে উঠলেন;-
–” তোর মামী ফোন দিয়েছিলো।”
মামীর কথা শুনতেই, সোফায় আয়েশি ভঙ্গিমায় পিঠ এলিয়ে বসে। ফোনের লক স্ক্রিন খুলে ফের ফোন স্ক্রল শুরু করলো সে। কারণ মামীর কথা যেহেতু মা বলবে। তার মানে এই কথাতে দশ পার্সেন্ট ও দরকারি কিছু আছে কিনা তাতে ও তরঙ্গের সন্দেহ।
–” কেনো?”
–” তোর মামাতো বোন রমু আছে না। তরীর ছোটো যে। এইবার ইন্টার পরীক্ষা দিবে।”
–” না পেঁচিয়ে সোজাসুজি বলো মা। এখানে তরী নেই যে তুমি তাকে অপমান করবে।”
অপমান চুপসে গেলো সাহনার মুখশ্রী। ছেলের থেকে এমন উত্তর আশা করেননি তিনি। তেতো মুখে জবাব দিলো সাহনারা।
–” রমুর বিয়ে ঠিক হয়েছে। তোর মামী বলেছেন, আমরা যাতে কালকেই রওনা দেই।”
–” বিয়ে কবে?”
–” আগামী শুক্রবার।”
–” কাল বুধবার। এতো জলদি যাওয়ার কি প্রয়োজন?”
–” বৃহস্পতিবার গায়ে হলুদ। কাল গেলে তোর মামার হাতে হাতে একটু সাহায্য করতে পারবি। জানিস ই তো তোর মামার বড় কোনো ছেলে নেই। দুটো মেয়ে ছাড়া।”
–” হুমমম।”
–” যাবি কাল?”
–” জানাচ্ছি।”
ছেলের নিমরাজি উত্তরে আবার নিজের আগের জায়গায় গিয়ে বসলেন সাহনারা। ঠোঁট বাঁকিয়ে একবার তাকালেন তরঙ্গের দিকে। ছেলেটা দিন দিন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এখুনি না বাঁধতে পারলে একদিন পুরোটাই হাত ফসকে যাবে। কিছু একটা ভেবে কুটিল হাসলেন সাহনারা। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বুশরার কথার দিকে মন দিলেন তিনি। বুশরা নতুন শাড়ির ডিজাইন নিয়ে উৎসাহ ভরে বলছে— কোনটা নেবে, কোন রঙটা বেশি মানাবে তাদের।
সাহনারা মাঝে মধ্যে মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছেন। কখনো বা নিজের পছন্দের কথা বলছেন। দু’জনের কথা বার্তায় আবার প্রাণ ফিরে এলো ড্রয়িং রুমে। শাড়ি, গয়না, সব মিলিয়ে শপিংয়ের আলাপে মশগুল হয়ে পড়লেন তারা। তরঙ্গ এক পলক তাকিয়ে আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। ওনাদের এতো আনন্দের মাঝে ও তার মন অন্য কোথাও আটকে আছে। ফোন স্ক্রল করতে ও ভালো লাগছে না তার। ফোন রেখে চোখ বন্ধ করে বসে রইলো তরঙ্গ।
চায়ের ট্রে রাখার স্বল্প বিস্তর শব্দে অন্যমনস্ক তরঙ্গ চোখ মেলে তাকালো। তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো তরীর উপর। মুহূর্তেই চারপাশের সবকিছু ফিকে হয়ে গেল তার নিকট।
কলা পাতা আর সাদার মিশেলে পরা থ্রি-পিছ টা তরীর শ্যাম বর্ণের দেহে অপূর্ব মানিয়েছে। রঙ দুটো তার ত্বকের শ্যামবর্ণের সাথে মিশে নতুন আভা সৃষ্টি করেছে। তরীর কোমর ছুঁয়ে নেমে আসা হালকা এলোমেলো চুল গুলোতে বেণী পাকানো। কপালের ধারে ছোটো ছোটো কয়েক গোছা চুল; তার মুখের গড়নটাকে দ্বিগুণ মায়াবী করে তুলেছে। টানা টানা অক্ষিযুগল, ঘন পাপড়ির আড়ালে লাজুক দীপ্তি ছড়াচ্ছে। গরমে তরীর সরু নাকের পাশে হালকা ঘেমে উঠেছে। গোলাপি আভা মেশানো ঠোঁট জোড়া শুকিয়ে চৌছির।
ছোটো খাটো গড়নের তরীকে, মুহূর্তে জীবন্ত পুতুলের অনুরূপ ঠেকলো তরঙ্গের নিকট। যেই পুতুল হাসে, কথা বলে, সংসারের কাজ সামলায়, সবার খেয়াল রাখে। যার মাঝে কৃত্রিমতা নেই; আছে নিখাদ স্নিগ্ধতা। তার চলাফেরায় কোমল ব্যাক্তিত্ব বহন করে। কথায় মৃদু সুর, আর উপস্থিতিতে অদ্ভুত শান্তি। কিন্তু সেই পুতুল তরঙ্গের মন বোঝে না।
বুক ছিঁড়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার। অতঃপর নিজেকে সামলে সোজা হয়ে বসল তরঙ্গ।
–” আপনার চা।”
নিঃশব্দে চায়ের কাপ নিয়ে তাতে চুমুক বসালো সে। একে একে বুশরা আর সাহনারা কে চায়ের কাপ দিয়ে ট্রে হাতে কিচেনে ফিরে গেলো তরী। বিস্কুটের বয়াম আর পানির জগ নিয়ে ফিরে এলো সে। সব কাজ শেষ হতেই সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো তরী। তাকে যেতে দেখে গলা ছেড়ে ডাকলেন সাহনারা।
–” তরী শোন!”
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পড়লো তরী। ঘুরে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে জবাব দিলো সে।
–” বলো চাচি।”
–” রাতে তোর আর তিন্নির জামা কাপড়ের ব্যাগ গুছিয়ে নিস।”
ভয় আর অনিশ্চয়তারা চেপে ধরলো তরীর বুক। হঠাৎ, চাচির এমন কথার মানে বুঝলো না সে। কিন্তু পুনরায় পাল্টা প্রশ্ন ও করতে পারলো না তরী। হিতে চাচির রাগ বাড়তে পারে।
–” আচ্ছা “
–” হ্যাঁ, সুন্দর দেখে জামা নিবি। যাতে কেউ আমাদের দিকে আঙুল তুলে দুটো কথা না বলতে পারে। যে তোদের আমরা ভালো রাখি না। আমার বাপের বাড়িতে গিয়ে তোদের জন্য অপমানিত হতে পারবো না।”
–” আচ্ছা।”
সাহনারা বিস্কুট হাতে নিয়ে দৃষ্টি ফেরালেন টিভির পর্দায়। দু’জনে মগ্ন হয়ে দেখছেন স্টার জলসা–র ধারাবাহিক। মাকে টিভির স্ক্রিনে মগ্ন থাকতে দেখে তরঙ্গ আর সময় নষ্ট করলো না। তাড়াহুড়ো করে শেষ চুমুকটা দিয়ে কাপ টেবিলে রেখে দিলো। তারপর প্রায় ছুটেই সিঁড়ির দিকে এগোল সে। বড় বড় কদমে সিঁড়ি টপকে দোতলায় উঠে এলো তরঙ্গ।
পদ শব্দে যেন তার ভেতরের অস্থিরতা প্রকাশ পাচ্ছে। দোতলার লম্বা গলির মাঝখানে এসে তরী কে দেখে থেমে দাঁড়ালো সে। নিঃশব্দ করিডোরে তার দ্রুত শ্বাসের শব্দ প্রতি ধ্বনিত হলো। মুহূর্তের জন্য চারদিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলে নিলো তরঙ্গ।
–” এই তরী জান দাঁড়া।”
তরী দাঁড়িয়ে পড়লো,
–” টেমার নতুন জামা আছে?”
–” কেনো?”
–” যা জিজ্ঞেস করেছি; তার উত্তর দে। বেশি বকতে কে বলেছে তোকে?”
–” আছে।”
–” কয়টা?”
–” দুটো।”
–” আর তোর?”
–” আমার টা জেনে আপনি কি করবেন?”
–” বউ হোস আমার। তরঙ্গ দেওয়ানের বউ! আমি জেনে কি করবো মানে?”
চলবে
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ১৯
-
She is my Obsession পর্ব ২৮
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৩
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২
-
She is my Obsession পর্ব ৪
-
She is my Obsession পর্ব ১৪
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৫
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১
-
She is my Obsession পর্ব ১৮
-
She is my Obsession পর্ব ৭